
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
আমার আসলে সময়ক্ষেপণ করার গুরুত্বপূর্ণ কোনও কারণ ছিল না। শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষা। হাতে অগণিত টাকা থাকলে কি চারপাশের সবাইকে সুযোগসন্ধানী আর মিথ্যুক মনে হয় ? মনে হয় সবাই ছলে বলে কৌশলে আমার টাকা হাতিয়ে নিতে চাইছে ? অগণিত টাকা নিয়ে আমার মাথাব্যথা কিংবা মাথা ঠান্ডা কোনও উপসর্গই ছিল না। কিন্তু শুরু হলো, বেশ ভালো রকম মাথাব্যথা শুরু হলো। যেমন এই মুহূর্তে আমার মনে হলো, আচ্ছা এমন কিছু যদি আমি করতে শুরু করি, বস্তা বস্তা টাকা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে ছড়াতে থাকি তাহলে কী হবে ? আমার মাথাব্যথা কমবে ? পাভেল আর ফিরবে ? পাভেলের সঙ্গে আমার কী করা উচিত ছিল―কিংবা কী করা উচিত ছিল না―কোনও প্রশ্নের মীমাংসা হবে ? হবে না।
তবু আমার ভেতরে তৈরি হওয়া অনুতাপময় অন্তর্জালা আর নীরব দর্শকের মতো আমার নিজের বদলে যাওয়া জীবন দেখতে থাকার দমবন্ধ অসহায়ত্ব আমাকে এই মুহূর্তে প্রচণ্ড অস্থির করে তোলে। আমি ক্রমশ অচেনা হতে থাকি আমার কাছে। অনিয়ন্ত্রিত একটি ইচ্ছা আমাকে অযৌক্তিক কল্পনার মতো কিছু বাস্তবিকই করতে প্ররোচিত করে তীব্রভাবে।
আচ্ছা সত্যি আমি যদি এক বস্তা টাকা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে ছড়াতে থাকি, কী কী হবে বা হতে পারে ? আমার অন্তর্জ্বালা কি লাঘব হবে ? মীর মশাররফ হোসেনের টাকার গোডাউন কি জাতির কাছে উন্মুক্ত হবে ? উন্মুক্ত হলে কি সচকিত জাতি এই অভিজাত পাড়ার ঘরে ঘরে গোডাউনগুলোতে হামলা করে সব টাকা লুট করে নেবে ? আমার মতো মীর মশাররফ হোসেনের উদাসীন কিংবা লোভাতুর স্ত্রীদের সুখের ফানুস ফুটো করে আসল চুপসে যাওয়া চেহারা পাভেলের আয়নায় দেখিয়ে দেবে ? হঠাৎ ফেঁপে উঠা টাকায় রিসোর্ট আর দামি দামি পাড়ায় ফ্ল্যাটের মালিকদের ধরে ধরে জেলে পুরবে ? ফাঁসি দেবে ? কী কী হতে পারে ?
কল্পনা করে আর সময় নষ্ট না করে আমি আমার ইচ্ছার অনুগামী হই। রান্নাঘরের কাবার্ড খুলে একটা বস্তা নামিয়ে টেনে নিই সিঁড়ি পর্যন্ত। গোড়ায় এসে নিচে নামার সুদীর্ঘ সিঁড়ির শেষ মাথাটা দেখে উপলব্ধি করি, না এই ভারী ব্যাগ আমার পক্ষে টেনে নামানো সম্ভব না। দীর্ঘদিন কোনও শারীরিক পরিশ্রম না করতে করতে ভার বহনে অক্ষম এক অথর্ব ঘোড়ায় পরিণত হয়েছি আমি।
আমি আশিককে ফোন দিলাম। আশিক প্রথমটায় বোঝেনি কীসের ব্যাগ কোথায় যাবে। আমার টানা-হেঁচড়ার কষ্ট দেখে আশিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ম্যাডাম ম্যাডাম আপনি রাখেন, আমি নিচ্ছি। গাড়ি তো বের করিনি, আগে গাড়িটা বের করি, আপনি তো আগে গাড়ি বের করতে বলেননি… ইত্যাদি। আমার বিস্রস্ত বেশভূষা দেখে সে নিশ্চিত হতে পারে না আমি বাইরে কোথাও যাব কিনা। নিজেই হয়তো আন্দাজ করে, যাব কিন্তু এখনও তৈরি হইনি। দীর্ঘদিন আমার গাড়ি চালানো আশিক, নিজের অভ্যাসে বিশ্বস্ত থেকে বলে, আপনি তৈরি হন ম্যাডাম, আমি ব্যাগডা গাড়িতে তুলে রাখি। আমি আশিককে বিস্মিত করে বলি গাড়ি নয়, ব্যাগটা লেকের পাড়ে নিয়ে যাও, আমি আসছি। লেকের পাড়ে! বিষয়টির আগামাথা কিছুই না বুঝে আশিক আমার মুখের দিকে হা করে তাকায়। আমি ওর বিস্ময়কে পাত্তা না দিয়ে ধমক দিই, তাড়াতাড়ি যাও। আশিক দ্রুত ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিচে নেমে যায়। আমি পেছনে পেছনে সিঁড়ি ভাঙি। সেলফোনটা বাজছে। কার ফোন ? হোক যার। আমার এই মুহূর্তে কারও সঙ্গে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।
আশিক লেকের পাড়ে বস্তাটা নিয়ে গিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে অচেনা আমাকে দেখে। আমি তো নিজের কাছেই নিজে অচেনা হয়ে গেছি, আশিকের বিস্ময়ে আমি তাই বিস্মিত হই না। ঠান্ডা মাথায়, সুস্থির হাতে আমি বস্তার মুখটা খুলে টাকা ছড়ানো শুরু করি। বান্ডিল বান্ডিল টাকা। তোড়া তোড়া টাকা। পাঁচশ টাকার নোট। বিস্মিত আশিক এবার হতভম্ব হয়ে যায়। প্রাথমিক হতভম্বতা কাটিয়ে পকেট হাতড়াতে থাকে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে তার স্যারকে ফোন দেয়। স্যার মানে জনাব মীর মশাররফ হোসেন। আমার হাসব্যান্ড। ওর বারবার ব্যস্ত হয়ে ফোন দেওয়ার ভঙ্গি আর স্যারের না ধরাতে বুঝতে পারি ওর স্যার ঘুমাচ্ছে। এটা স্যারের ঘুমেরই সময়। বাইরে পৃথিবী ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেও স্যারের এখন মাত্র মধ্যরাত।
সারাদিন ক্ষেতে খামারে খেটে রাতে মুন্সি বাড়ির উঠানে বিষাদসিন্ধু শুনে কাঁদতেন মীর মশাররফ হোসেনের বাপ। একসময় নিজেই পুরো বিষাদসিন্ধু মুখস্থ বলতে পারতেন তিনি, আমি শুনেছি। ছুটিতে গ্রামে গেলে রাত গভীর হওয়ার আগে তিনি আমাকে ডাকতেন, বড় বউ… বড় বউ…। উঠানের শেষ মাথায় নিমগাছটায় একই সঙ্গে ডাকত কানাকুয়ো। অন্ধকারের নিজস্ব আলো মোলায়েম কাপড়ের মতো শুয়ে থাকত উঠান জুড়ে। তালপাতার পাখা নিয়ে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে তিনি বলতে শুরু করতেন বিষাদসিন্ধু, ‘সীমার খণ্ডিত মস্তক বর্শায় বিদ্ধ করে দ্রুতবেগে চলতে থাকে, তখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে রব ওঠে, হায় হোসেন! হায় হোসেন!’ বৃদ্ধের কণ্ঠ পুত্রহারা পিতার মতো আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসে হোসেনের মৃত্যুশোকে। যেন তিনি কারবালার ময়দানে, যেন কুফায় আটকে যাওয়া ঘোড়ার খুর তিনি প্রাণপণে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন, যদি ঘোড়া আবার দৌড়ায়, হোসেন বেঁচে যায়, অকপট আকুল আকুতি ঝরে বৃদ্ধের কণ্ঠে।
ঘরে ঘরে ততদিনে ঢুকে গেছে রঙিন টেলিভিশন আর ডিশ অ্যানটেনার ‘তু চিজ বড়ি হায় মাস্তমাস্তৃ’-এর দুনিয়া। বুঝতে পারি, দুদিনের জন্য গ্রামে বেড়াতে আসা পুত্রবধূর শালীনতা, শ্বশুরের ডাক মুখের ওপর অগ্রাহ্য করতে না পারার ভদ্রতার সুযোগটাই তিনি নেন। নইলে এই রঙিন বাক্সের আজব দুনিয়া ফেলে সময়ে অসময়ে কে আর বসে বসে তার মুখস্থ বিষাদসিন্ধু শোনার ধৈর্য দেখাবে ? আমি শুনে শুনে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই বটে তার চেয়ে মুগ্ধতায় দেখি শুনিয়ে তার কী যে পরিতৃপ্তি! ভাবের সঙ্গে কণ্ঠ উঠান-নামান, কাঁদেন হাসেন। হিন্দি সিরিয়াল দেখার মোক্ষম সময়টাকে তার পরিতৃপ্তির কাছে আমি বিসর্জন দিতাম। আহা একজন বৃদ্ধকে মানসিক পরিতৃপ্তি দেওয়ার তৃপ্তি পূর্ণ করত আমার তরুণী আবেগ।
সেই বৃদ্ধ শখ করে ছেলের নাম রেখেছেন লেখকের নামে। মীর মশাররফ হোসেন। পুরা বিষাদসিন্ধু মুখস্থ রাখা বাপের মুখস্থ বিদ্যার মাথাটাই পেয়েছে ছেলে, মীর মশাররফ হোসেন। যার গুণে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পেশাগত জীবনে একের পর এক কৃতিত্বে সে আজ এতদূরে। বাপের আকাক্সক্ষা আর কল্পনার অনেক ঊর্ধ্বে।
আমি তোড়ার পর তোড়া খুলি, পিন ছাড়িয়ে টাকা উড়াই। আলি বাবা চল্লিশ চোরের আবিষ্কৃত টাকার খনি, যতই উড়াই, ফুরায় না।
আশিকের মুখের আতঙ্কিত ভাঁজ পড়া যায়। তার স্যার ফোন ধরছে না। ধরবে কী করে। রাত তিনটা পর্যন্ত ঘরে পার্টি করে ভোরের দিকে ঘুমাতে গেছে মীর মশাররফ হোসেন। পাকস্থলীতে সঞ্চিত হওয়া বিদেশি তরলের প্রতিক্রিয়া শেষ না হওয়া অবধি ঘুম ভাঙবে না। আশিকের মুখে আমি ভয়-আতঙ্ক আর হতম্ভম্বভাব যুগপৎ ভাঁজের উত্থান পতন দেখি আর টাকা উড়াই। বস্তা থেকে টাকার তোড়া খুলি, আবার উড়াই…। স্যাঁত করে চলে যাওয়া হাল মডেলের গাড়ি দুয়েকটা পিছিয়ে এসে দেখে ঘটনা কী। কিছু একটা জানতে চায় আশিকের কাছে। ঠিক কী জানতে চায় আর আশিক কী উত্তর দেয়, কোনওটাই আমার কানে আসে না। তারা কৌতূহল গুটিয়ে নির্বিকার চলে যায়।
এবার আশিকের সন্ত্রস্ত কথা বলার ভঙ্গিতে বুঝতে পারি তার স্যার ফোন ধরেছে। ততক্ষণে উৎসাহী পথচারী জমে গেছে বেশ কয়েকজন। কেউ কেউ আবার লাইভে চলে গেছে। কেউ এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের ভেতরে সাহস সঞ্চয় করে কম্পিত হাত এগিয়ে দিচ্ছে উড়তে থাকা, পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ টাকার দিকে। আশিকের ধমকে আবার গুটিয়ে নিচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার অভিজাত পাড়াটা এখানে এসে অচেনা হয়ে গেছে। একটা প্লটে একটাই বাসা। তিনতলার বেশি করার অনুমতি নেই। অনেকটা অতীতে ফেলে আসা পাড়ার মতো। সেই অতীতে শহরের মাঝ বরাবর যে রাস্তাটা চলে গেছে শহরকে বেকার প্রেমিকের মতো একলা ফেলে রেখে, তার ভেতরে ঢুকলেই যে পাড়াটা ছিল, তার ঠিক মাঝখানে ছিল বাবুর দিঘি। পাড়ে দাঁড়ালে দূর থেকে দেখা যেত ইট ভেঙে ভেঙে পড়া বাবুদের লাল দালান। পাভেল আর আমি লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই লাল দালানে লুকিয়ে পড়তাম। পাভেল নিজে ধরা দিয়ে আমাকে লুকিয়ে রাখত। এই পোড়ো লাল দালানেই কিশোর-কিশোরীদের দলে পাভেলের পক্ষপাতিত্বে শিহরণের সিঁড়ি ভাঙার সর্বনাশা আওয়াজ শুনতাম আমি। বিকেলের অর্থহীন খেলায় আমাকে বাঁচিয়ে কেবল নিজেকে ধরিয়ে দিয়েই আমাকে প্রেমের প্রথম পাঠ দিয়েছিল পাভেল। এখানেই পাভেল আমাকে ছোঁয়াছুঁয়ি শিখিয়ে বলেছিল বড় হলে আমাকে বিয়ে করবে।
তারপর খেলার বেলা শেষ হলে আমার বুকে উড়না উঠলে আর পাভেলের ঠোঁটের উপরে গোঁফের উঁকিঝুঁকি যখন কেবল উঁকি দিতে শুরু করেছে তখন পাড়ার ছেলেরা কী করে টের পেয়ে আমাকে দেখলেই পাভেলকে ডাকা শুরু করত আর পাভেলকে দেখলে আমাকে।
প্রায় পঁচিশ বছর পর পাভেলের সঙ্গে আমার সেদিন হঠাৎ দেখা। চুল থেকে নখ পর্যন্ত পরিচর্যা করিয়ে আমি তখন লিফট ধরে নিচে নেমে ড্রাইভারের নাম্বারে ফোন করছি। হঠাৎ সামনে অপরিচিত একজন, ডায়না না ? হ্যাঁ আমি, আমিই তো ডায়না। কিন্তু এই অভিজাত বাজারের শীতলে কে আমাকে ডায়না নামে ডাকে ? এই নাম তো অনেক আগেই ‘মীর ভাবি’ নামের দোর্দণ্ড প্রতাপে বিলীন হয়ে গেছে। আম্মা ছিলেন শেষ মানুষ, আমাকে এই নামে ডাকার। আম্মার কাছে গল্পটা শুনতে শুনতে বিরক্ত লাগত, অসুস্থ বিছানায় মায়ের পছন্দের বিস্কুট আর পান-সুপারি নিয়ে গেলে কিংবা কোনও দিন বাজারের সবচেয়ে ওজনদার রুই মাছ কিংবা হাঁড়িভাঙা আমের ঝুড়ি নিয়ে গেলে আহ্লাদে গদগদ হয়ে মা কেবল একটা গল্পই বলতেন, জানিস কী শখ করে আমি তোর নামটা রেখেছি, ডায়না…। জানতে জানতে আমি অতিষ্ঠ, বিরক্ত। সাদা-কালো টিভিতে রূপকথার রাজকন্যার মতো ফুটফুটে ডায়নার ছড়িয়ে যাওয়া সাদা সার্টিনের ম্যারেজ গাউনের পুচ্ছ দেখে মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পেটের সন্তান মেয়ে হলে নাম রাখবেন ডায়না। এই নামে আমাকে খুব কাছের মানুষেরা ডাকতেন। শেষ হয়ে যেতে যেতে এ নামে ডাকার আর কেউ আছে কিনা আমি তৎক্ষণাৎ মনে করতে পারি না। আমি পাভেল…, আমার হতভম্বভাব কাটাতে পাভেল দ্রুতই নিজের পরিচয় দেয়।
আমি ততক্ষণে ডায়না নামের ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার-কামিজের স্মৃতিতে হারিয়ে গেছি অতীতের অলিগলিতে। শৈশবে কৈশোরে। বড় জেঠা ডাকছেন, ডায়না… তর জেঠিরে ক, তামুকের আগুন দিতে। কালো রঙের টিক্কায় ফুঁ দিতে দিতে দেখতাম গনগনে আগুনের ফুলকি কেমন প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে হারিয়ে যায় বাতাসে, তারপর বড় জেঠার হুক্কায় গুঁজে দিতাম যত্ন করে। যেন তাড়াতাড়ি জ্বলে ফুরিয়ে না যায়। টিক্কা পোড়া তামুকের গন্ধটা যে কী ভীষণ প্রিয় ছিল আমার! জেঠা কাপড় দিয়ে বাঁকানো আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে হুক্কায় টান দিলে পানির গুড়গুড় শব্দ আর মিষ্টি পোড়া যে গন্ধটা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত তার সঙ্গে আমার দুশ্চিন্তাহীন জীবনও পা ছড়িয়ে পাটিতে ‘ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ’ পড়তে বসে যেত ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনা নিয়ে। বড় জেঠার মৃত্যুসংবাদ যেদিন এল আমেরিকার ডেট্রয়েট থেকে, আমি গুলশান ক্লাবে… আলো-আঁধারি তরল আর চিকেন ফ্রাইয়ের গন্ধ ছাপিয়ে টিক্কা পোড়া তামাকের গন্ধ শেষ বারের মতো নাকে লেগেছিল আমার। বড় জেঠার জন্য চোখের জল ফেলার ফুরসত মেলেনি আমার, মানে মিসেস মীরের, অনেক দূরে ফেলে আসা আমার জেঠার সাধ্য কি আমার ধনাঢ্য ব্যস্ততাকে ছোঁয়! আম্মা মারা গেলেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। আইসিইউতে ঢোকানোর আগে পর্যন্ত আম্মা ডাকছিলেন, ডায়না… ডায়না…। আম্মা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে আমাকে ডায়না ডাকার মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
আমি, আমাকে চিনতে পারছ না। আমি পাভেল। পা-ভে-ল!
আমি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে সেই মুহূর্তে পৌঁছাই। যে মুহূর্তে পাভেলকে ছেড়ে এসেছিলাম। আমার চেয়ে পাক্কা বারো বছরের বড় মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে বিয়ের আগপাছতলা প্রস্তুতির কোথাও পাভেলের কোনও ছায়া পড়েনি। যেন প্রতিষ্ঠিত পাত্র মীর মশাররফ হোসেনকে বিয়ে করে চলে যাওয়াতে পরোপকারী পাভেলের কিছুই যায় আসে না। ও যেন তৈরিই ছিল। কিংবা ও জানত এমনটিই হবে। প্রেম-চিঠি-ছোঁয়াছুঁয়ি এসব নিছকই খেলা, খেলার মাঠেই রেখে আসা। মাঠ আর লাল দালান ডিঙিয়ে আমরা অন্তরে ততটা পৌঁছাইনি, যতটা পৌঁছালে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা যায়। গভীরে যাওয়ার রাস্তাটা আমরা তৈরিই করিনি। আমারও তেমনই মনে হচ্ছিলো। বিয়ে বাড়ির হৈ চৈ, পোলাও মাংসের তীব্র আমিষ গন্ধ, গয়নার ঝনঝনানি সব ছাপিয়ে বৈষয়িক দায়িত্বজ্ঞানহীন, এর দাফন, ওর ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ানো―পাভেলের কোনও ইচ্ছাই ছিল না আমার বিয়ের জমকালো আয়োজনে কোনও ছায়া ফেলে।
অভিজাত বাজারের শীতল বাতাসে আমি পাভেলের মুখের ভাঁজগুলি পড়ার চেষ্টা করি। তারুণ্যের ঝাঁকড়া চুল, ভরাট লাবণ্য আর পেটানো পেশিতে যে পাভেলকে আমার কাছে জ্যাকি স্রফ মনে হতো, আজ তার চিহ্নমাত্র ছায়া নেই কোথাও। আকর্ষণীয় চোখজোড়ায় নির্ঘুম রাতের কালি। মাথায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েক গাছা চুল, ভেতরে ঢুকে যাওয়া চোয়াল, চোখের পাতায় ‘আর পারছি না’র ক্লান্তি। তারপরও ভাঙাচোরা, বিধ্বস্ত চেহারায় স্পষ্টই শনাক্ত করা যায়, হ্যাঁ এটা পাভেল, পাভেলই। অস্বীকার করতে পারি না এই পাভেলের ছায়া দেখলে একসময় আমার বুকে কাঁপন হতো, পরিবারের বাইরে যে একজন মাত্র মানুষ আমার পোশাকি নাম রেখে ডায়না নামে ডাকত।
এই মুহূর্তে আমার মনে হলো সেই পাভেলকে আসলে পঁচিশ বছর আগেই রেখে এসেছি। এই পাভেলের মাঝে ডায়নার কিশোরী অতীত নেই। এ যেন অন্য কেউ। এত বছর পর দেখা হওয়ার কোনও বিস্ময় কিংবা আবেগ পাভেলের মাঝে কাজ করে বলে মনে হয় না। পাভেল খুব স্বাভাবিক স্বরে অস্বস্তিকর আবদার করে, চলো কোথাও চা খাই। পাভেলের এদিক ওদিক তাকানোতে টের পাই, রাস্তার পাশের কোনও চায়ের দোকান খুঁজছে সে।
পাভেল বোধহয় জানে না, আমি মীর মশাররফ হোসেনের স্ত্রী। মীর মশাররফ হোসেন। পুলিশ কর্মকর্তা থেকে যে এখন বিজনেস ম্যাগনেট। ঢাকায় গোটা কয় আলিশান ফ্ল্যাট। হাল মডেলের কয়েকটি গাড়ি। গাজীপুরে ফাইভ স্টার রিসোর্ট। কানাডায় আমাদের মানে আমার আর মীর মশাররফ হোসেনের ছেলের অত্যাধুনিক ভিলা। মফস্সল থেকে ঢাকায় আসার মতোই আমাদের ছুটিছাটায় ওখানে হলিডে কাটাতে যাওয়া ইত্যাদি পাভেল বোধকরি আন্দাজও করতে পারে না। পাভেল জানে না পাভেলের সঙ্গে আমার দূরত্ব এখন আকাশ-পাতাল, পাভেল জানে না মীর মশাররফ হোসেনের স্ত্রীর এখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া খালি বেমানান নয়, অসম্ভব।
পাভেলের আবদার চা নয়, কফিতে মেটানো যায়। ড্রাইভারকে গ্লোরিয়া জিন্সের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ইচ্ছে হয় পাভেলকে আমার বর্তমান অবস্থানের কথা জানাই। কিন্তু পাভেলের চেহারায় শ্মশান যাত্রীর মতো নির্লিপ্ততা। আমি কেমন আছি তা পাভেলের কল্পনা অতিক্রমকারী হলেও সেটা জানা বা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই পাভেলের অবয়বে। শুনলেও তার মাঝে কোনও ঈর্ষা কিংবা আফসোস জন্ম নেবে তেমন কোনও লক্ষণও নেই। বরং সে অনর্গল অর্থহীন এমন কিছু বকবক করে যায় মিনিট দশেক পর গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে দেখি ওর একটা কথাও আমি শুনিনি এবং শুনিনি যে এতে ওর বা আমার কারও কিচ্ছু ক্ষতিবৃদ্ধিও হয়নি।
গ্লোরিয়া জিন্সে দু কাপ ক্যাপাচিনোর অর্ডার দিয়ে আমার খুব সামান্য আগ্রহ হয়, পাভেলের খবরাখবর জানার। কী করছে, কেমন আছে ? বিষয়টি তেমনও নয় যে ফাল্গুনের এক দুপুরে তরুণ পুলিশ অফিসার মীর মশাররফ হোসেনকে বিয়ে করে শহর ছেড়ে চলে আসি তারপর কোনওদিন কোনও ফাঁক গলে পাভেলকে আমার মনে পড়েছে, পাভেলের খবরাখবর জানতে ইচ্ছে করেছে। তবু কথায় কথায় জানা হয়, পাভেল বলার মতো তেমন কিছুই করে না। জানলাম পুরান ঢাকার পুরানো কোনও বাসায় থাকে। বায়িং হাউজে কম্পিউটার অপারেটরের চাকরিটা কোভিডের সময় চলে গেলে নতুন করে আর কিছু শুরু করতে পারেনি। বউ ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে ঢাকায় থেকে কাজ খুঁজছে। এখনও খুঁজছে।
আমি কেমন আছি জানার মতো বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা লুকানো প্রেমজাত কোনও আগ্রহ নয়, আমার চেহারায় উদ্ভাসিত সম্পদের জেল্লা দেখেই সম্ভবত সে আমার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে শুধু ধারণা নয়, নিশ্চিতই হয়ে যায়। তাই কথার ফাঁকে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে তার কণ্ঠ কাঁপে না একটুও, প্রাক্তন প্রেমিকাকে এই কথাটা বলা উচিত কিনা এ জাতীয় কোনও দ্বিধাও পীড়িত করে না তাকে অথবা প্রেম, প্রাক্তন ইত্যাদি আবেগগুলো ছাপিয়ে ওর কাছে আমার আর্থিক অবস্থানটাই বড় হয়ে উঠে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কাছে আবেগ বিষয়টি সম্ভবত খুবই তুচ্ছ। তোমার জামাইয়ের তো অনেক ক্ষমতা, আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দাও না।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়, দীর্ঘদিন মনে না পড়া পাভেলের সঙ্গে দেখা না হলেই ভালো ছিল। কিংবা এতো বছর পর পাভেল ভালো আছে দেখতেই আমার ভালো লাগত। পাভেলের এই পরাজিত, নতজানু, ব্যক্তিত্বহীন অবস্থা আমাকেও পরাজিত করে দেয়। প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে যারা পঁচিশ বছর পর হঠাৎ দেখায় লজ্জার মাথা খেয়ে চাকরি প্রত্যাশা করতে পারে, তাদের করুণ জীবন-যুদ্ধের সঙ্গে আমার আদৌ পরিচয় নেই। আমি তো গত পঁচিশ বছর ধরে ক্রমশ সুখে থেকে আরও সুখে থাকায় উন্নীত হচ্ছিলাম। পঁচিশ বছর পর হঠাৎ পাভেল সব ভালো থাকায় কেমন মন-কেমন-করা ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করে দিল। সপ্তাহে সপ্তাহে তরল সহযোগে ব্যুফে পার্টি, মাসে মাসে সিলেট কক্সবাজারে ফাইভ স্টার যাপন, বছরে বার কয়েক ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা মালদ্বীপ, মারিশাসে ঘোরা জীবনকে আসলে কী বলে! উন্নত নাকি অবনত। যখন মধ্য দুপুরে রাজধানীর শপিং কমপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে প্রেমিক চাকরি চায়!
এমন নয় যে পাভেলের জন্য আমার কিছু প্রেম না হোক, মায়া কিংবা পিছুটান ছিল কিন্তু পাভেলকে ভালো থাকতে দেখলে আমার ভালো লাগত, আমার ভালো থাকাটাকে হঠাৎ এমন অন্যায্য মনে হতো না। দীর্ঘদিন পর আমার ভালো থাকায় ভালো-না-থাকার মৃদু ঝড়ো বাতাসের ধুলা ওড়ে। সেই ধুলাতে আরও কিছু অনুকম্পার ঝরা পাতা যোগ করে, পাভেলের হঠাৎ টাকা চাওয়া। কোনও ভূমিকা ছাড়াই পাভেল আবার বলে, আমাকে একটা হাজার টাকা দেবে ডায়না, হাতটা একদম খালি। আমি এর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। মধ্যদুপুরে রাজধানীর শপিং কমপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে প্রেমিক মাত্র এক হাজার টাকা চায়! আহা মীর মশাররফ হোসেনের ক্লজেটে কত হাজার এক হাজার টাকা আছে আমি তো আমিই, স্বয়ং মীর মশাররফও কি সঠিক জানে!
কেউ হাজার টাকার জন্য হাত পাতে… আমার বুকটা কেমন চিনচিন করে উঠল। বিস্ময় আর বেদনা লুকিয়ে এক মুঠায় যা উঠে, হয়তো হাজার পাঁচেক টাকা হবে আমি পাভেলের হাতে দিই। পাভেলের বাবা সজীব আলি চাচার শহরে নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কমরেড’। হেঁটে হেঁটে একতা পত্রিকা বিলাতেন শহরে। ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের উপর জং ধরা টিনের বেড়াওয়ালা দুটি ঘর নিয়ে থাকতেন সজীব আলি চাচারা। একটি ঘরের দেয়ালে ঠেস দেওয়া ভাঙা রেক আর টেবিল ভরতি খালি বই আর বই। দেয়ালে পাশাপাশি দুটো ছবি ভাঙা জানালা আড়াল করে, মার্কস আর লেনিন। চাচাই চিনিয়ে দিয়েছিলেন দুজনকে। গেলেই কঠিন কঠিন শব্দ দেয়ালে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক গাঁথার মতো মাথায় ঠেসে দিতেন চাচা। কীসব শব্দ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, অক্টোবর বিপ্লব। অধিকাংশই মাথার ওপর দিয়ে গেলেও মুখ বুজে শুনতে হতো, নীহাররঞ্জনের বই নেওয়ার আবশ্যিক শর্ত হিসেবে। টিমটিমে আলো জ্বলা ঘরে নীরস শব্দমালা আর গল্পের তোড়ে চাচার মুখ থেকে ছুটে আসা পানের পিকের ছিটা থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেত পাভেল, চল সন্ধ্যা হয়ে গেছে তোরে বাড়ি দিয়ে আসি। সজীব আলির অনেক বইয়ের ভিড়ে একটা তাক ছিল নীহাররঞ্জন আর আগাথা ক্রিস্টির। সজীব আলি চাচাকে শহরে ছেলেও ডাকত কমরেড, বাবাও ডাকত কমরেড। আজীবন কমিউনিস্ট ছিলেন তিনি। একদিন নীহাররঞ্জন, আগাথা ক্রিস্টি না দিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির মা পড়তে দিয়েছিলেন আমাকে। সেখানেই আমি পাভেল নামটি খুঁজে পেয়েছিলাম।
হয়তো এই একবার না গোনা টাকা মুঠো করে পাভেলকে দেওয়াটাই কাল হলো আমার। মনে হলো পাভেল আমার অগণিত টাকার গন্ধ পেয়ে গেছে। তার দিন কয়েক পর থেকেই নানা অজুহাতে টাকা চাইতে থাকলো পাভেল।
মীর মশাররফ হোসেনের কাভার্ড ভরতি টাকা। খাটের জাজিমের নিচে স্তূপ স্তূপ টাকা। রান্নাঘরের কাভার্ড ভরতি টাকার বস্তা। ব্যাংকের খবর অবশ্য আমার জানা নেই। চাকরি শেষ হওয়ার পর পেনসন পাওয়া কোটি টাকা ব্যাংকে রাখা পর্যন্তই আমি জানি। মীর মশাররফ হোসেন আমাকে জানিয়েছে। তারপর থেকে টাকা কত আসে, কনভেনশন আসে কিচ্ছু আর আমাকে জানায় না মীর মশাররফ হোসেন। একদিন মুখ খোলা বস্তায় কল্পনাতীত টাকার বান্ডিল দেখে চীৎকার করে উঠলে ঠান্ডা মাথায় মীর মশাররফ হোসেন আমার মুখ চেপে ধরে শাসিয়েছিল, চুপ একদম চুপ। তারপর থেকে আমি একেবারে চুপ হয়ে সুখের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রেখেছি কাগজের নৌকার মতো আর উপলব্ধি করেছি কৌতূহলের ঢেউ একটু ফুলে উঠলে আমাকে ডুবিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না মীর মশাররফ হোসেন। আমার চেয়ে বস্তাগুলোর মূল্য অনেক বেশি তার কাছে।
আমি ইচ্ছা করলেই যে কোনও কোনা থেকে এক বস্তা টাকা নামিয়ে পাভেলকে দিয়ে দিলে মীর মশাররফ হোসেন হয়তো টেরও পেত না। কিন্তু আমার ভীষণ আক্ষেপ হয়। একদা খেলতে খেলতে তার কাছে শিহরণের পাঠ পেয়েছিলাম বলে সে আজ সেটার সুযোগ নিচ্ছে! নিজেকে অনুকম্পা করি এমন একটা ব্যক্তিত্বহীন ছেলেকে রাত জেগে দিস্তা দিস্তা চিঠি লিখতাম বলে। প্রাইভেট স্যারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম বেহায়ার মতো, তার সাইকেলের টুংটাং একবার শুনবার জন্য!
প্রথমবারের পর দ্বিতীয় বার। তৃতীয়, চতুর্থ গুনতে থাকা সময় যখন তোয়াক্কা ছেড়ে দিল, যখন তখন পাভেল টাকা চেয়ে ফোন করতে লাগল, পাভেলকে আমার অসহ্য লাগতে লাগল। খুব বিরক্ত হয়ে তারপরও কয়েকবার ফোন ধরেছি। আশিককে দিয়ে টাকা বিকাশ করেছি। তারপর আবার ফোন ধরিওনি অনেক দিন। পাভেল ক্লান্তিহীন ফোন করে গেছে।
তারপর একদিন আবার হঠাৎ ফোন ধরলে খুব ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের অসুস্থতার কথা বলল পাভেল। চিকিৎসার জন্য আমি তার চাওয়া এমাউন্ট শুনে নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম। কত বড় প্রতারক পাভেল, দশ-বারো হাজার নয়। চিকিৎসার অজুহাতে ত্রিশ লাখ টাকা চায়।
পুলিশ এসে প্রথমে আমাকে অনুরোধ করে ঘরে ফিরে যাবার। আমি তাকিয়ে দেখি দোতলার ঢাউস গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে চিৎকার করছে মীর মশাররফ হোসেন। যার একটাও দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার কাচ ডিঙিয়ে কারও কানেই পৌঁছাচ্ছে না। কয়েকজন টিভি রিপোর্টারও জুটে গেছে ইতোমধ্যে। লাইভ করছে পাড়ার গুটিকয় ছেলেমেয়ে। আভিজাত্যের রীতি ভেঙে প্রতিটি জানালায় বস্তির পাড়ার মতো উৎসুক কৌতূহলী মুখ। টাকাগুলো পড়ে আছে মৃত মানুষের মতো অসহায়। মৃত মানুষের তবু সৎকার হয়, নেহায়েৎ পরিচয় না পাওয়া গেলে আঞ্জুমানে মফিদুল। বেওয়ারিশ টাকার কী হয় ? বস্তার বাঁধন খুলে ছড়িয়ে পড়লে কেউ ছুঁতেও ভয় পায়। পুলিশের অনুরোধ আমার একগুঁয়েমির কাছে পরাস্ত হলে তারপর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে।
সকালে ফেইসবুক স্ক্রল করে দেখছিলাম পাভেল মারা গেছে। পাভেলের জন্য আমরা―চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদান চেয়ে পেইজটা চলছিল বছরখানেক ধরে। কারা চালাত জানি না। প্রতি মুহূর্তের আপডেটে চোখ রাখছিলাম আমি। খুব ধীর গতিতে হলেও টাকা সংগ্রহ হচ্ছিলো। হ্যা আমি পারতাম, তার চিকিৎসার পুরো খরচটাই দিতে। মীর মশাররফ হোসেনকে বলেওছিলাম একবার, লোকটার চিকিৎসার জন্য চলো না কিছু টাকা দিই। মীর মশাররফ হোসেন নেশাতুর ঘোলাটে চোখে আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়েছিলেন, যেন আমি বলছি, চলো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেই। তারপর মুখ ঘুরিয়ে গ্লাসে চুমুক দিয়ে উপহাস করেছিলেন, গোপন প্রেমিক নাকি! এই বলে থেমে গেলেও হতো। আমাকে ভেঙেচুরে আহত করার মতো হিসাব করে আরও কয়েকটি বাক্য যোগ করে তবে থেমেছে, আচ্ছা আমি সারাদিন বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত থাকি আর আপনার তলে তলে এই করা হয় ? আমিও ভাবি বেগম সাহেবা সারাদিন করেনটা কি! খুব রেগে গেলে মীর মশাররফ হোসেন আমাকে আপনি করে বলেন। তার রাগের মাত্রা টের পেয়ে আমি চুপসে যাই। কে জানে আবার কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরিয়ে যায় কিনা!
ফাঁক খুঁজছিলাম এক সুযোগে বড় একটা বস্তা আমি দিয়ে আসব ওকে, যেন মীর মশাররফ হোসেন টের না পায়। পাভেলের কাছেই দিয়ে আসব। কত থাকে একটা বস্তায় ? আমার ধারণা নাই। নিশ্চয়ই ত্রিশ লাখের উপরে। আমি অপেক্ষা করছিলাম একটা সুযোগের, উদ্দেশ্যহীন অপেক্ষা। আজ নয় কাল। কিন্তু খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটেছে তার। কোনও চিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই পাভেল হঠাৎ চলে গেছে আজ সকালে।
সচিত্রকরণ : রজত



