
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
ছ্যাতেন মাছের সাইজ যা-ই হোক, আধার এক্কেবারে গপ করে গিল্যে খায়―ইসুফ এই কথা জানে। তাই বশ্যি ধরে থাকার থেকে ক্যাদোর মধ্যে গেড়ে থুয়ে ক্যাদোর উপর পঞ্জের সেন্ডেল রেখে তার উপর আলতো করে বসে থাকা ছাড়া আর কোনও কাম নাই। এই করতোয়া নদী বাপ-দাদা-তার দাদা, তার দাদার সময় থেকেই ইসুফদের পরিচিত। মাছ মারার কাম গুষ্টি ধরে চলি”ে”। এখন কত গুষ্টি পর্যন্ত যাওয়া হবে সেটা হলো ব্যাপার। ইসুফ স্কুলত যায় কিন্তু মাছও মারে। না মারলে কিছু হয় না কিন্তু মাছ মারা তার রক্তে আছে। মাও বাপ কিছু কবিন্যে কিন্তু মাছ না মারলে মনে হয় কী একটা করা হয়নি ইসুফের। রক্তের টান। পানির মতন যাওয়া আসা করে। থামে না। সরসর করে চলতে থাকে। বাধা পেলে আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে।
মাঝে মাঝে ফৎনায় টান পড়ে। ইসুফের চোখ নড়ে না। কিন্তু এগুলা বউমাছ। না হলে ট্যাংরা। খালি চ্যারাগুল্যে ঠোকরায়। মাছগুল্যের মুখ ছোট বলে পুরা আধার গিলতে পারে না। ইসুফ জানে এই মাছ উঠবে না। তাকে আরও বসে থাকা লাগবে। বসে থাকতে থাকতে ক্যাদোর মধ্যে স্যেন্ডেল ডুবুডুবু। ক্যাদো যখন বেশি নরম ঠেকে ইসুফ তখন উঠে বসে। না হলে হাপপ্যান্ট ভিজে যাবে। যেমন এখন পঞ্জের সেন্ডেলের পাশ দিয়ে ক্যাদো উঠে পাছা ভিজ্যে দিচ্ছে। সেন্ডেল জোড়া সরে নিয়ে একটু শক্ত ক্যাদোর উপর থুয়ে আবার বসে পড়ে ইসুফ। কুঞ্চির বশ্যিটা তার নিজের বানানো। বাপ দাদারা তার বয়সে কুঞ্চি বশ্যি দিয়াই মাছ মারত। বড় হলে জাল মারা। তখন আর বশ্যি না। তবে ‘তরে’ জাল সে এখনই মারতে পারে কিন্তু বশ্যির মধ্যে মজা আছে। নদীর পাড়ের প্যাক-কাদার একটা আলাদা বাস্না আছে। বশ্যি নিয়ে ধুম মেরে বসে থাকা লাগে বলে ক্যাদোর বাস্না নাকে লাগে বেশি। ইসুফের দারুণ ঠেকে ব্যাপারটা। পাটগাছ জাগ দিলে যেমন একটা বাস্না, প্যাক―ক্যেদোর বাস্নাও কাছাকাছি। কিন্তু করতোয়ার এইখানে জাগ দেয়া নিষেধ। কিন্তু পুবে বা পশ্চিমের কোন ঢিবির আড়ালে কেউ যদি জাগ দেয় তাইলে সেটা অন্য কথা। ইসুফের মনে হয় এই বাস্না তার সঙ্গে কথা বলে। এই কথা কানে আসে না যদিও। আসে নাকে। এই বাস্না নাকে লাগলেই সে ঢেউয়ের মাথাত ফেনা দেখতে পায়। ঢেউ নদীর পাড়েত বাড়ি খায়ে আরও ঘন ফেনা তোলে। ইসুফ জানে খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লাম মনে হয় তখন নদীর পাড়ে গত্ত করে মাছগুলো খেদায়ে দেয়। এই ঘটনা সে তার বাপের কাছ থেকে শুনেছে। খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের সঙ্গে তাদের গুষ্টির দোস্তানি আছে। যখন কোথাও কোন মাছ পাওয়া না যায়, বিশেষ দোয়া পড়লে খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লাম শাবল-কোদাল নিয়ে নদীর পাড়ের মাটি কাটতে শুরু করে। এনারা নাকি পিঁপড়ের মতন। সবাই একসঙ্গে কাজ করে। এই দোয়া ইসুফও জানে। মাছমারা শেখার আগে, স্কুলোত যাওয়ারও আগে রাতের বেলা ঘুমানোর সময় বাপজান বুকের উপর নিয়ে এই দোয়া শিখাইত। ভুলে যাতে না যায় তাই প্রতি রাতে এই দোয়া শুনে শুনে তার মুখস্থ হয়ে গেছে।
তাই নদীর পাড়ে ফেনা দেখলে আর পাট জাগ দেওয়ার গন্ধটা প্রকট হলে সে বুঝতে পারে মাছ আসবে। ফৎনায় কোনও টান নাই। ভরা একটু বেশি ভারী করে দেওয়া যেন খালি ছ্যাতেন―বাইলা মাছ ধরা পড়ে। এই দুই মাছের ভত্তা খুব ভাল লাগে। টেঙ্গরা, বউ, পুটি মাছের ছালুন তার ভাল লাগে না। এই বয়সেই সে ঠিক করতে পারে সে কী মাছ ধরতে চায়। বাড়ির উঠানের জাঙ্গলার তলে আম্মার বেগুনের চারায় বেগুন হয়। খোসাসহ হাগড়াই আলু আর বেগুন দিয়ে যে পুরপুরি রান্না হয় তার থেকে সিদ্ধ ছ্যাতেন-বাইলা মাছের ভত্তা দিয়ে একথাল ভাত খাওয়া যায়।
ফস করে ফৎনার এক ডুক্কি। বশ্যির লাইনোনের সুত্যে দেখা যায় খালি। ফৎনা ডুক্কি মারছে। ফৎনা ডুক্কি মারছে। বশ্যিতে হাত ইসুফের। মনে মনে জপে―
ফৎনা ফৎনা ফৎনা কই
মাছ খায় না ঠোঙ্গার লই
লইআলার বাড়ি কই
বেড়া ভাঙ্গছে গাছের মই
মই গেল ওপার
মাছে খাইছে আদার
ফৎনা ফৎনা ফৎনা কই
ব্যল্যা খাছে চ্যারার লই
গাছের শিকড়ের মতন সুত্যে টান ধরে আছে। সুত্যে গোড়াত বলগের মতন বুদবুদ ওঠা দেখে ইসুফ। এনবার নিশ্চিন্ত ছ্যাতেন না হয় ব্যালামাছই হবে। স্যাত করে আসমানের দিকে টান মারে বশ্যি। সুত্যে বাতাসে বাড়ি খাওয়ার আওয়াজ ওঠে। এই আওয়াজ যত ভারী, মাছও তত বড়। সেই বিবেচনায় মাছটা ছোটই হবে। আওয়াজটা কানে আসে কিন্তু ঠাসা না। মন বেজার হলে হবে না। মাছ তো উঠছে। হো একটুকোনা ছ্যাতেন।
প্রথম মাছ আজকের। ত্যানা দিয়ে মুখ আটকানো সিলভরের পাতিলের মধ্যে মাছটা রাখে ইসুফ। ডান পাশে ডুঙ্গির মধ্যে চ্যারাগুল্যে আছে। আম্মার বেগুনের ভিয়ের যে দিকে চাপকলের পার, সেদিকের মাটিতে ম্যালা গত্ত আছে। চ্যারাগুল্যা ওখান থেকে নেয়া। তার থেকে আরেকটু উজানে মুরগির ঘর। মুরগির গু পড়ে মাটির উপর। চ্যারাগুল্যেন মনে হয় সেই গু খাওয়ার জন্যে এখানে থাকে। আজকে বেশি চ্যারা পাওয়া যায়নি। এমন হলে তো মাছ মারা যাবে না। চ্যারা লাগবে। মানুষের বাড়ির চ্যারাতে কাম হয় কম। ইসুফের চোদ্দগুষ্টির কেউ মানুষের বাড়ির চ্যারা দিয়ে মাছ ধরেনি। এতে বাপ দাদার দোয়ায় কাম হয় না। হলেও খুব কম। মাছ মারতে সময় বেশি লাগে। কিন্তু ক্যান যে অন্য বাড়ির চ্যারা দিয়া মাছ কম ধরে সে ব্যাখ্যা ইসুফের কাছে ধরা পড়ে না। মাছ বেশি ধরতে পারা তাদের গুষ্টির শান।
চ্যারাগুলা ডুঙ্গির মাটির মধ্যে কলবল করে। এর থেকে একটা তুল্যে ইসুফ বশ্যির মধ্যে পুরু করে গুঁজে দিতে থাকে। বশ্যির পাছাত যেখানে সুত্যের গিট্টু সেখানে গিয়ে ঠেকে চ্যারার এক মাথা। আরও চাপ দিয়ে আলগোছে গিট্টুর সুত্যের মধ্যে ঠেসে দেয়। আর বশ্যির মাথা যেন না দেখা যায় তাই চ্যারাটা একটু বাড়তি রাখে। আধমরা চ্যারা অনেকক্ষণ লরাচরা করবে আর এর গাওত থেকে যে ল্যেলপা বের হবে সেটা খাওয়ার জন্যে মাছদের মাথা হবে নষ্ট। খুব ছোট মাছ ঠুকরে খাবে চ্যারার বাড়তি অংশটা। তখন ফৎনা আলগোছে টিপ্পনী কাটবে। কিন্তু সিলভরের ভরার ভার আর আস্ত জ্যান্ত চ্যারার ভারে ফৎনার খুব একটা লোরচোর হবে না। ছোট মাছেক খাবার দিলে বড়মাছ সেই ছোট মাছ খাওয়ার জন্য পিছা করবে। আর চ্যারার থেকে যে ল্যেলপা বের হবে তার গন্ধ্যে বশ্যির আধার খাওয়ার লোভ সামলাতে পারবে না ছ্যাতেন-বাইলা মাছ। ইসুফ আবার চ্যারার আধার সমেত বশ্যিটা নদীর কিনার ঘেঁষে ফিকা মারে। ম্যালা দূরে মারলে পানির টানে চ্যারা খুলে যায়। স্রোতের মধ্যে ভত্তা করার মাছ ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে আরও বড় মাছ যা দিয়া তরিতরকারির ছালুন হয়। কিন্তু ইসুফ ছালুনের মাছ এখনও ধরা শুরু করে নাই। আরও বড় হয়ে জালের খেও মারার আগে সে বড় মাছের বশ্যি মারবে। এ বয়সে তার বড়মাছ ধরার দোয়া কামে দিবে না। দুয়েকবার যে সে নাফরমানি করে নাই তা না। একবার সে নদীর মাঝখানে বশ্যি ফিকে বড় মাছ ধরার জন্য বসে ছিল। ফৎনাও ডুক্কি মারছিল। কিন্তু মাছ মনে হয় বড়ই ছিল, সুত্যে ছির্যা নিয়ে গেছে। বাড়িত যাইয়া এই কথা বাপের হাতে পিটন খাওয়ার ভয়ে আর বলতে না পারলেও আম্মার সঙ্গে আলাপ করেছে সে। এই নাফরমানি বাপে বরদাস্ত করত না। গুষ্টির বিদ্যা যখন শেখানো হয়েছে তখন এও বলে কয়ে দেয়া হোছে কখন তা আওড়াতে হবে। এর বরখেলাপ গুষ্টির সঙ্গে বরখেলাপের সমান। এটা কেউ মানবে না। ছোট, তাই সিমটার মুটির বাড়ি খাওয়া লাগতো। সিমটা নরম মনে হলেও একমুটি সিমটা ম্যালা শক্ত। হাত-পাছার চামড়া ভ্যাদা ভ্যাদা হয়ে যায়। তাই বাপের কাছে আর বলা হয় না। আম্মা গোপন করে ফেলে। সোমিক জানায় না যে ছোল নাফরমানি করছে। বশ্যি দিয়া মাঝনদীর বড় মাছ মারার চেষ্টা করছে। খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের দোয়া ঝারছে। ফৎনাও গিলসে মাছে কিন্তু বশ্যি গায়েব। মায়ের সামনে নাকে মাথায় চিমটি দিয়া ধরে পুবে মুখ করে, ডুমুরের দিব্যি দিয়ে মানত করতে হয়েছে ইসুফকে :
পুবের চ্যারা দিঙ্গলা নাড়া
খোয়াজ খিজির শুনুক ঝাড়া
আর করমুনা এই ভুল
গর্তে দিমু ডুমুর ফুল
এই ঝাড়া আওড়াতে হবে নাকের চিমটির দাগ মিলে না যাওয়া পর্যন্ত। এর কারণ কী তা ইসুফের জানা নাই। গুষ্টির রীতি মানতে হয়। মানতেই হয়। তাই তো তাদের গুষ্টি আলাদা। এই গুষ্টির কৃষ্টি হয়তো বড় হলে জানা যাবে। কিন্তু এই কৃষ্টিতে ভেজাল ছোঁয়ানো যাবে না। এই রীতির রতি পরিমাণ রদবদল গুষ্টির জন্য অশনি। এই আদেশ বাপে বুকের উপর রেখে রোজ রাতে দোয়া শিখানের সময় পইপই করে বলেছেন। মাও যেন ক্যংকা করে। নাকের ডগার দাগ থাকলে কী হয় ?
এই ছ্যাড়া দাগ না তোলা পর্যন্ত তুই যদি ঝাড়া আওড়াতে না থাকিস, তোর ঝাড়া আর কাম করবি ন্যে। তখন তুই কী করবু ? গুষ্টির ইজ্জত মারবু তুই। তোর বাপ জানলে সিমটার মোতার বাড়ি খাবু। জীবনে আর এই কাম করবু ন্যে। এই বয়সে তোর ছালুনের মাছ ধরার দরকার নাই। তোর ভত্তা মাছই ভাল।
আওড়াতে আওড়াতে ফড়িং-এর পাখার আওয়াজ কানে বাজে ইসুফের। চিমটিটাও এত জোরে যে ক্যান দিছিল―ইসুফ নিজেই ভেবে পায় না। হালকা চিমটি দিলে দাগ হালকা হতো। বিড়বিড় করে আওড়াতে থাকলে মনে মধ্যে গেঁথে যায়।
তোর মন হলো প্যাক ক্যাদোর মতন। এখন যা বিরবির করবু, বুড়াকালেও মনে থাকপি। আম্মার ব্যাখ্যা শোনা হলেও ইসুফের মনে ধরে না।
তাই দ্বিতীয় বশ্যি ফেকার আগে নাকে চিমটি কাটার ঘটনা মনে চলে আসে। চ্যারা লাগানো বশ্যিটা আবার নদীর পার ঘেঁষে ফেকে। দুপ করে একটা আওয়াজ তুলে পানির মধে ডুবে যায়। ফৎনার মাথা আলগোসে উঁকি মারে পানির উপর। এইবার ভরায় আরও ভার। বড় সাইজের চ্যারা দেওয়া হোছে। চ্যারার ল্যেলপায় আঙ্গুল আঠাআঠা। প্যান্টে মুছতে গিয়েও ইসুফ থেমে যায়। পরে একটা চাপা বাস্না লেগে থাকবে প্যান্টে। তবে পকেটের মধ্যে হাত ঢুকায়ে ভিতরের কাপড়ে মুছে ফেলা যায়। এতে বাস্না কম হয়। কিন্তু হাত নদীর পানিতেই ধোয়া ভাল। এত কাবিলাতির দরকার নাই।
বশ্যি ফিকে আবার পঞ্জের স্যান্ডেলের উপর বসে পড়ে ইসুফ। ক্যাদো পাছায় লাগতেছে বুঝতে পারে। কিন্তু এখনই আর নড়ার ইচ্ছা নাই। পানিতে কোনও ফেনা নাই। এ এক চিন্তা। অল্প দূরে ঠাটারুর বেটা বাপ্পি বশ্যি ফিকছে। তার আগে পাউরুটির আটা ছিটেছে। এর তেলে মাছ আসে। যেখানে যেখানে পানির উপর আটা পরে, সেখানে তেলের গোল্লা গোল্লা হয়ে মালা তৈরি হয়। ছোট মাছ সেই তেল আগে খায়। বড় মাছ তার পিছে নেয়। কিন্তু আজ মাছ আসবে না। নদীর টান আছে। টানে সুত্যে ছিলার মতন হয়ে আছে। ভরা ভার না হলে মাছ মারা যাবে না আজ। ঠাটারুর বেটা টিন পিটাইয়া বালতি, চোঙ্গা বানাতে পারে ভাল তবে মাছ মারার ঝাড় তার জানা নাই। পানির গন্ধও তার নাকে আসবে না। তাই ঈষৎ মুচকি হাসি হেসে ইসুফ হাঁক দেয়―
কিরে মাছ পালু ?
পামো রে পামো। বাপ্পির পাল্টি হাঁক।
বাপ্পি বড় বয়সে। সেও হাফ প্যান্ট পরে তবে মাছ মারায় সে শিশু। তার কোনও বিদ্যা নাই। খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের দোয়া তার জানা নাই। ল্যাংটিরাও এই ঝাড় জানে। বাপের দোস্ত গুলেন কাকু দিব্যি দোয়া আওড়ায়। মাছ মারায় ওস্তাদ। বাপেও তাকে ওস্তাদ মানে। তবে সব ল্যাংটি এই কালাম জানে না। সবার দোয়াও কাজে লাগে না। গুলেন কাকু বাপদের সঙ্গে জাল ফেলে। বশ্যি ফিকে না। ওনার কোন ছোলপোলও নাই। ইসুফই তার ব্যাটার মতন। আম্মাও তাকে সালাম দিয়ে কথা বলে। ল্যাংটিদের সালাম দেয় না কেউ। কিন্তু ইসুফের পরিবার সেই বারণ মানে না। খোয়াঁখিজির আলাহেওসাল্লাম কার দোয়া শুনবেন সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তাই ইসুফ আরও ছোটত থেকে সালাম দেয়। কিন্তু ঠাটারুর ব্যাটা বাপ্পি বিষ ল্যাংটি। আদপ কম। ময়মুরুব্বি মানে না। এই কথা পাড়ার লোকে বলে। ইসুফের তাতে কচু হয়। ভত্তা মাছ মারতে পারলেই ইসুফের হলো। এগলার কোন দরকার নাই। যে পারবে সে-ই পাবে। নদীর ভাষা এটাই। মাছ ঘুরে বেড়াবে পানির নিচে, কারটায় ঠোকরাবে সেটার জন্য পানির উপরের বিদ্যা লাগে। ইসুফ সেই বিদ্যা জানে।
আধার খায়া গেছে রে! বাপ্পির হাঁক। আবার তাকে পাউরুটির আটা ছিটাতে দেখে ইসুফ। এর মাঝে বশ্যির সুত্যের গোড়াত বলগের মতন বুদবুদ ওঠে। দেখতে না দেখতে ফৎনা আবার ডুক্কি মারে। ছ্যাতেন না বাইলা! ছিপ আসমানের দিকে হ্যাঁচকা টানে মাছটাকে তুলে আনে ইসুফ। এবার বাইলা। দূর থেকে মাছের সাদা প্যাটটা ঠিক চিনতে পারে। ফড়িং এর পাখার মতন পাখনাগুলা টানটান হয়ে আছে মাছটার। আলগোছে মাছটা হাতে নেয় ইসুফ। মাছের ঠোঁটের মধ্য দিয়ে ঢুকে কান দিয়ে বের হয়ে গ্যাছে বশ্যিটা। ডান হাতে মাছের চোয়ালে চাপ দিতেই মুখ হা হয়ে যায়। বাম হাত দিয়ে বশ্যিটা বের করে ফেলে। এই মাছটা আগের থেকে বড়। এবার দোয়াও পড়তে হয়নি। ত্যানা দিয়ে মোড়া সিলভরের পাতিলের মধ্যে আগের মাছের মচমচানির আওয়াজ পায়। আরেকটা মাছ সেই আওয়াজকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এক অদ্ভুত আনন্দ হয় মনে। সেই আনন্দে নদীর দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে ফেলে ইসুফ। এই নদীই সব। সব জানমালের শুরু এই নদীতেই।
বাপজান বার বার করে বলে দিছে―
নদী তোর মা
নাও তোর না
নদী তোর বোন
গুষ্টির কথা শোন।
গুষ্টির কথা শুনেই মাছ মারে ইসুফ। তাই ঠাটারুর ব্যাটা পাউরুটির আটার আধারেও মাছ পায় না। দোয়ায় কাজ হয়। দোয়ায় ফল হয়।
দুইটা মাত্র মাছে কিছু হবে না। আবার চ্যারার আধার বশ্যিত গুঁজে ইসুফ। মনে মনে জপে যায় দোয়া। শেষ মাছ দোয়া ছাড়া উঠছে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মাছের আকাল। সেই জাগের গন্ধটাও হালকা। পানিতে বুদবুদ কম। কিসের আলামত তা ধরতে পারে। খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের দেমাগ কড়া। হয়তো দেমাগই উঠছে। এখন তাকে ধৈর্য ধরে, মনের সঙ্গে তাল ঠিক রেখে বশ্যি ফিকতে হবে। তার আগে ফিকার জায়গার আশেপাশে ছিপ দিয়ে আলতো করে পানির উপর বাড়ি মারতে হবে। এটা যে কেন করে তা এখনও জানে না ইসুফ। কিন্তু জানে এতে কাজ হয়। খোয়াজ খিজিরের দেমাগ ঠান্ডা করার জন্য এই রীতি তার গুষ্টির কাছ থেকে শেখা। এই কামের ধরন রোজা রাখার মতো। একটু এদিক ওদিক হলেই রোজা কাজা হয়ে যাবে। পানিতে ছিপের বাড়ি দেয়ার পর আসমানমুখী করে তুলে ধরে আবার দোয়া-ঝাড় দিতে হবে। এইবার প্রথমে বাম হাতে ছিপ আর বশ্যির সুত্যে আর ডান হাতে ভরা ধরে জোরো জোরো ঘুরেন লাগবি যাতে বাতাস কেটে শব্দ ওঠে। এই শব্দই নাকি সব। এই শব্দের তীব্রতায় দোয়া-ঝাড় গাঢ় হয়। এভাবে বাম দিকে দুইবার, ডান দিকে তিন বার করে ডান হাতের ভরা পানিতে ফিকে ছিপের গোরা ক্যাদোর মধ্যে পুঁতে, থুতনি দুই হাঁটুর মধ্যে থুয়ে পঞ্জের স্যান্ডেলের উপর পাছা ঠেকায় ইসুফ।
গণেশের প্যাটের মতন বাঁকা হয়ে থাকে তার পিঠ। গণেশের প্যাট এত গোল ক্যান এই উত্তরও জানে না ইসুফ। কচির দোকানের কোনায় যে ফাঁকা জায়গা ওখানেই ফিবছর নানা পূজা হয়। দু¹ার মেলা ম্যালা বড়। বাড়ির বউঝিরাও বাদ দেয় না। এই মেলায় কেউ আর ভাবে না কে লেংটি আর কে বিষ লেংটি, কে ঠাটারু, কে মাছ মারে, কে বৈঠা মারে, কে মাস্টার, কে মুচি, কে নাপিত, কে মসজিদত যায়। এই ব্যাপারটা কাবাকের লাগান। সমাজের ফারাক মাটির সঙ্গে মিশ্যে যায়। ধুলা হয়ে হাওয়াই মিঠাইয়ের গোলাপি রংএর উপর দুধের সরের মতন ভেসে থাকে। যে ব্যাটা মিঠাই বানানোর হ্যান্ডেল মারে তার কপালে টিপ থাকে। তবে এই টিপ সাদা রঙ্গের। লেংটি। লেংটি ব্যাটারা কপালে টিপ দেয়। কিন্তু সে ব্যাটার কাছ থেকে হাওয়াই মিঠাই কিনতে কারও বাছবিচার নাই। দু¹ার পায়ের কাছে গণেশ থাকে। দু¹ার বড় বড় চোখ আর মায়া মাখা মুখের জন্যে এই পূজা ভাল লাগে ইসুফের। তখন থেকে গণেশের প্যাট আর দু¹ার মুখ দেখার টানে মেলায় যায়। মেলায় খালি দু¹ার মুখ কেন আরও হুঁশ হারানো বেটিছেলেদের মুখও দেখা যায়। বেটিদের কে লেংটি কে লেংটি না ধরা যায় না। সবাই আসে। এই পাড়ায় লেংটির থেকে মোছলমান বেশি। তাই মেলাতে যাওয়া বেটিরাও মোছলমান বেশি হবার কথা। কিন্তু পূজাটা তো খালি লেংটিদের। ব্যাপারটায় কোনও দিক পায় না ইসুফ।
নদীর পার ধরে দুইএকটা বুদবুদ ওঠা দেখে ইসুফ। কিন্তু এও বোঝে এতে হবে না। জাগের গন্ধটা আসতে হবে। বুদবুদের বলগ আরও বড় হতে হবে। না হলে বউ-পুটি মাছের দল খালি চ্যারা খাইয়ে যাবে, ফৎনা ডুক্কি মারবে না। আজকে ঠাটারুর ব্যাটার জন্য একটু রাগ হচ্ছে। পাউরুটির আটায় মাছ ধরা পড়ে তবে তা গুষ্টির রীতি মাফিক লয়। মাছ মারার জন্য গুষ্টিতে কেউ পাউরুটির আধার, বাস্না ওটা পচা খোলের চার দেয়ায় মানা আছে। কিন্তু এই লেংটির ব্যাটা বাপ্পি এই কথা শোনে না। কতবার কলেম, কানেই ঢোকে না। পাউরুটির আটার ত্যালে খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের অসুবিধা হয়। তাই ঝাড়ে আছে :
ফৎনা ফৎনা ফৎনা কই
মাছ খায় না ঠোঙ্গার লই
কিন্তু কে শোনে কার কথা।
কিরে মাছ পালু ?
পামো রে। পামো, পামো।
ইসুফ জানে আজ বাপ্পির কপালে মাছ নাই। এই জানার কারণটাও জানা নাই ইসুফের। আরও ছোট থেকেই সে জানে মাছ ধরায় তারা আলাদা। এই করতোয়া কেন, তার আদিগুষ্টির লোকজন নাকি বিদেশ থেকে আসছিল, তারাও মাছমারায় পট্।ু গুষ্টির সঙ্গে খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লামের দোস্তি ম্যালা পুরাতন। সে হিসাব ইসুফ তার বাপের জন্মেও পায়নি। আম্মাকেও কিছু বলা যায় না। বললে―
পান্টির বাড়ি খাবু ? এ ছ্যারা এ!
এই প্রশ্নের উত্তর মাথার মধ্যে গেঁথে আছে। ঠিক যেমন গেঁথে আছে দোয়া কালাম, ঝাড়।
এইবার বশ্যির সুত্যের চারপাশে বুদবুদের বলগ আসে। মাছ। মাছ। গণেশের মতন বাঁকা হয়ে থাকা পিঠটা সোজা করে ইসুফ। হাঁটু থেকে থুতনি উঠে যায়। দুই চোখে বুদবুদ গোনা শুরু আনমনে। নাকে জাগের গন্ধ জোরালো হয়। ফৎনার কোনও লরচর নাই। ঠোকরানি বউ-পুটির দল নাই। ফৎনা আসমানের নিশানা খোঁজে। এই মহাক্ষণে শিকার আর শিকারির মধ্যে খেলা চলে। নদী তার মতন করে দুই জনের সঙ্গে থাকে। খেলায় কে জিতবে তাতে নদীর কিছু যায় আসে না। নদীর কাছে দুইজনই তার ছোলের মতন। কারও জন্যে তার মায়া কম না। তবে খেলা যখন, হারজিত আছে। এই খেলায় নদীর কোনও হাত থাকে না। নদী এখানে দু¹ার মতন। নিদারুণ নিরুপায় হয়ে দুই সন্তানের জন্য নিরপেক্ষতা, মমতা, ক্রোধ ধরে রাখে। শিকার আর শিকারির খেলা জীবিকার। জীবন ধারণের। কারও ভত্তা মাছ চ্যারার জন্য শিকারি। আবার চ্যারা খাওয়া ভত্তার মাছ হলো মানুষের শিকার। কী অদ্ভুত লীলা।
ঝাড়ে নদী কাবু হয় না। কাবু হয় শিকার। খোয়াজ খিজির আলাহেওসাল্লাম নদীর কিছু করে না, করে নদীর পাড়ের। ক্যাদোর, প্যাকের, ডিবির, গত্তের। আর মা দু¹া নদীগর্ভে বিন্দ্যে থাকে। নদী দু¹ার সব খেমতা শুষে নেয়। নদী তাই বিধাতার মতন সাধু, নদী তাই কাবিলের মতন লোভী, নদী তাই গণেশের মতন গৃহী।
বুদবদু ফাটার আওয়াজ কানে বাজে ইসুফের। সুত্যের টানে, নদীর বানে বুদবুদ ফাটে। এই শব্দ গুষ্টির ব্যাটাছোলপোল পায় খালি। ঠাটারুর ব্যেটা দু¹ায় মানত করলেও দু¹ার ধরা পায় না। মাছমারা কম্মের কাম। এর বিদ্যা কামাক্ষার বাপ। ডাকিনির দাদা। সেই ছোট থেকে ইসুফের কানে সিসার মতন ঢেলে দেয়া আদেশের সঙ্গে মাছমারা বিদ্যা ভরে দেয়া হয়। ইসুফ কখনই ভোলে না। তাই বুদবুদের বলগ ফাটার শব্দ তার কানে বাজে।
এইবার পাতিলের মধ্যে মাছের আরচারের আওয়াজ পায়। সব মিলে যায়। সব কিছু মিলতে থাকে। মাছ খাবে আধার। এই আভাস পাতিলের দুই মাছও পেয়ে গেছে। কীভাবে এত কিছু ঘটে ইসুফের জানা নাই। তবে ঘটে যায়। পাতিলের দুই মাছে কুরুক্ষেত্র বাঁধায়। ত্যানা দিয়ে ঢাকা না থাকলে লাপ দিয়্যে ক্যাদোর মধ্যে উড়ে আসতো মনে হয়। বাম হাতে পাতিল নেড়ে দেখে ইসুফ। একটুকোনা ভর দিয়ে ক্যাদোর মধ্যে ঠাসি দেয় পাতিলটাকে যাতে লরেচরে না যায়।
ফৎনা ডুক্কি মারছে। সঙ্গে সঙ্গে সুত্যের চারপাশে গোল্লা গোল্লা পাক তৈরি হয়। এখনই টান মারা হবে না। মাছ আধারটা আরও গিলুক। এখন টান মারলে চ্যারাগুল্যা খসে যাবে। বশ্যি আটকাবিনে। তাই আদেশ মতন শূন্য থেকে ৭ গোনে। ৬ এর পরে ৭-এর সঙ্গে সঙ্গে আসমানে ছিপ টানতে হয়। টানলোও তাই। ইসুফের চোখ চকচক করে বাইলা মাছের প্যাট দেখে। টানটা বেশি জোরে আছিল, মাছের কানটা অক্তে লাল।
কিরে পালু ? বাপ্পি হাঁকে।
দেকিস ন্যে ?
তিনট্যা হোলো। একটা ছ্যাতেন। দুডে বাইলা। ভাল লক্ষণ। হয় আজ ৬টা নয় ৯টা মাছ মারতে হবে। সময় আছে। বেলা বাড়েনি। শুককুর জুম্যের দিন। বিয়ানে আসা। নমাজের আগে বাড়িত যাওয়া লাগবি। এই মারা মাছে দুপরের ভত্তা হবি। না হলেও ক্ষতি নাই। ছালুন ছাড়া বাপের ভাত রোচে না। বাপ সে মাছ নিজেই মারে। তার বিদ্যা আলাদা। বড় বিদ্যা। বড় মাছ। ছালুনের মাছ। ভত্তা মাছ হলো আচারের মতন। সঙ্গে থাকলে ভাল। না থাকলে নাই। তাই ইসুফের তাড়া নাই। তবে বেলা চড়ার সঙ্গে মাছ আরও কমে যায়। এটা জানা আছে। তার বাদে শাক তোলার জন্য বেটিরা আসপি। সেও এক গ্যাঞ্জাম।
বেটিরা কচুশাক তুলব্যার আসে এদিক। মাছ মারা জায়গায় একটুএনা আগে ম্যালা ঝোপঝাড়। নদীর ওপারে পাথার। চাষবাস হয় কিন্তু এই পারে ফাঁকা। এসপি সাহেবের বাড়ি সঙ্গে বলে। বিশাল। বিশাল শিকের দরজা। দুডে পুলিশ হামানদিস্তার মতন চাকু লাগান বন্দুক লিয়ে খাড়ায় থাকে। তাকালেই―ঔ ভাগ।
তাই আর তাকানো দায়। ইসুফ, বাপ্পিকে চিনলেও হাঁক-ডাকে তাদের কমতি নাই। কচুঘ্যাচু তোলা বেটিরা অবশ্য তোয়াজ করে না। ত্যানা কাপড় পিনদ্যে যার দিনকাল, তার আবার পুলিশ কী! কচুঘ্যাচু না তুললে তাদের চুল্যে জ্বলে না। ভয় তাই চুল্যেয়, পাল্যেয়, প্যেটের জন্যই বেশি।
বাড়ির দেওয়ালের উপর দিয়ে ফুচকি দিয়া পরের বাড়ির এই ঘটনা ইসুফের দেখা। ছালার উপর বোসে কচুঘ্যাচুর তরকারি দিয়া ভাত খাওয়া। একটা কান্দা ভাঙ্গা কাড়াই আর গোত্তা খাওয়া পাল্যের ভাতই এদের সব। খিদ্যে যে কী তা আঁচ করতে না পারলেও, কষ্টের আছে তা ইসুফ ধরে ফেলে। দু বাড়ি দূরে হলেও ঠাটারু বাড়ি প্রায় সঙ্গে লাগোয়া। দুই বাড়ি আলাদা করা মাঝের দেওয়ালটাও ধসা। তাই ফুচকি মারলে দেখা যায়। ফুচকি মারা ভাল লয়। কিন্তু জানার চেষ্টা ভাল। কোনটা যে ভাল, কোনটা যে ভাল না, তা আর জানা হয় না ইসুফের।
আম্মা খাওন পাঠায়। মাসক্যে ঈদে বেশি। এই ঈদে সব ভাল থাকে। সবাই সব কিছু খেতে পারে। বকরি ঈদ সব নিজেদের। বাড়ির আম গাছের ডান দিকে লেংটি বাড়ি। বকরি ঈদের গরু গোস্ত দেওয়া চলে না। তবে চামার পাড়ায় গরুর চল আছে। খায় কি না জানে না ইসুফ। তবে চামের কাজ করে যখন!
সেই কচুঘ্যাচু তোলার বেটিরা আসলে বিরক্তি হওয়া স্বাভাবিক। কলবলাইয়া কতা আর কতা খালি। সঙ্গে জুয়ান ছুড়ি থাকলে তো হছে। কতা আরও বাড়ে। বশ্যিতে চ্যারা ভরতে ভরতে পানির দিকে তাকায় ইসুফ। আরও মাছ লাগবে। তবে যাতনা হলো বেটিদের আওয়াজ। বাপ্পির খোশ মেজাজ। হিন্দি গানের বাহার ছুটাবে, খালি জুয়ান ছুড়ি যদি আসে।
ঘাড় কাত করে দেকা লাগে বেটিদের। কচু এদিকে নাই। এত দূরেও না যে ওদের কলকলানি কানে আসে না। বিঘত বিশেক দূরে ঠাটারুর ব্যেটা। তার থেকে দূরে বেটিরা। দু দলকে দেকতে ডানে বাঁয়ে তাকান লাগে। দু দলকেই দেকা লাগে। নদীর পানি দেকা লাগে। বলগ দেকা লাগে।
বশ্যিতে চ্যারা ভরে আবার আগের জায়গায় ফিকে মারে ইসুফ। মন আনচান। শাক তোলা বেটিরা আরেকটু বাদে আসলে কি এমন খারাপ হতো ? বাপ্পির গানে ভ্রƒ কুঁচকে গেলেও গুনগুনে সুর তোলে ইসুফ :
আইলে দেও নিশানে
সকালে কি বিকালে
মাঠে ঘাটে নামলো পানির ঢলরে
ঢিলে মিলে ঢেউ খেলে যায়
ছলাৎ ছলাৎ ছলরে, ছলাৎ ছলাৎ ছল।
দেকছু রে দেকছু।
বাপ্পির আধার খায়য়া গেছে। ল্যাংটা বশ্যি ঝুলে আছে বাতাসে। ভরাটাও হালকা বলে জালি লাউয়ের ডগার মতন লকলক করতেছে। আজ হবে না তো বাপ্পি। আমার সাতে বসে তোর মাছ ধরা হবিনে। এডেসেডে করাই হবি খালি। তোর খলির মধ্যে মাছ আর পড়বি ন্যে। ইসুফ ভাবে আর মুচকি হাসে নিজে নিজেই।
ছ্যারা বয়সে এনা বড়ই। তাই আর পাতিল আনে না। বয়সীরা খলি আনে। বেশি মাছ ধরে খলিতে। তবে কুঞ্চির খলির গায়ে মাছের কষ্ট হয়। এটা ইসুফ কেন ভাবে জানে না। ধরা মাছ পাতিলের মধ্যে থাকলেই কি আর কুঞ্চির খলির মধ্যে থাকলেই কি। কিন্তু চিন্তাটা মাথায় থেকে যায়। বড় হয়ে বেটা হলে খলি না নিলে কি গুষ্টির বিদ্যা ফানা হবে ? আম্মাক কয়ে দেখা লাগবি।
মাছ এবার দেরি করল না। আবার সেই ব্যাইলা। একটু বড়। আরেকটু বড় হলে ছালুনের মাছ হতো। পরের বার এত বড় ধরা হবি ন্যে। বড় মাছের মাপ আলাদা। বশ্যি আলাদা। বয়সও আলাদা। তাই বশ্যিতে চ্যারা ভরে থু করে ছ্যাপ দিয়ে অন্য দিকে ফিকে মারে ইসুফ। ভত্তা মাছ লাগবি। খালি ভত্তার মাছ।
বাপ্পি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠে এল ইসুফের দিকে। বশ্যিতে চ্যারো ভরার সময় চোখাচোখি।
ক্যারে তুই দেকি মারেই যাচ্চু একটার পর একটা। আমার খালি আধার খায়ে যায়। কী করমু ক তো ?
কী আর করবু। ঠাটারুর বেটা ঠাটারু। পাউরুটির আধারে কাজ হবিনে। তোর নিয়ত ঠিক নাই। তুই বলে সব মাছ ধরবু। ক্যাংকা করে ? আগে নিয়ত ঠিক কর। নদী তোর কতা শুনবি তালে। না হলে ফাঁকা বশ্যি আর খলি নিয়ে বাড়িত যাওয়া ছাড়া তোর কোন উপায় নাই।
ইসুফের কথায় রাগ না হয়ে উপায় কি। তবে সত্য হলো মাছ তো আর উঠছে না। এদিকে কচুঘ্যাচুশাক তোলা বেটিরা মচমচ করে লতি ভেঙ্গে যায়। সেই শব্দ কানে আসে ইসুফের।
একটা চ্যারা নিয়ে যা। পাউরুটির আধার না দিয়া চ্যারা দে। আমার চ্যারা ভাল। মন সামলা। নিয়ত মান। মন থেকে চাইতে থাক। মাছ পাবু। ইসুফের থেকে বড় হলেও বাপ্পি আর রা করতে পারলো না। মাছ মারতে এসে যদি একটা কানাপুটিও না পায়, তালেও আর হয় না। ইসুফের গুষ্টির নাম আছে মাছ মারায়। ক্যামনে যে পারে, সেটা অবশ্য বাপ্পির জানা নাই। বাপের থেকে পাছে―এই কতা লোকেমুকে। সবাই তাই কয় যে এরা নাকি খাবলা দিয়া নদীর মাছ মারবের পারে। লোকে যখন কয় তার তো একটা মানে থাকে। এত কতা শুনলেও আজ দেকা যাক ইসুফের বুদ্দিতে মাছ পায় কি না।
প্যাকক্যাদা পারায়ে বাপ্পি তার বশ্যি ঠিক করে। চ্যারা ভরে ফৎনার গিট্টু আরেকটু মাতার দিকে দেয় যাতে ফৎনার ভার নিচের দিকে বেশি হয়। ইসুফের কতা মেনে মাজ নদীতে ফিকে না মারে্য পারের কোনাত বশ্যি ফিকে বাপ্পি।
কোণঠাসা বাপ্পিকে পথ বাতলাতে ভালই লাগে ইসুফের। এও জানে একবারই বাপ্পি নিজের মাথা ঠান্ডা রাখবে। মন মেলে দিবে নদীতে। মাছ ধরা পড়লে সব উবে যাবে। সমস্যা এখানেই। বিদ্যা বড় ধন যখন তা ধরে, ভরে রাখা হয়। নচেৎ ঔ একবারই। বারবার নয়।
তিন বাইলা আর এক ছ্যাতেন ধরে বসে থাকা যায়। এখন মনে বলে, বাকিগুল্যা মারা যাবি। বেটিরা শাক তুলুক। বাপ্পি মাছ মারুক। তাতে ইসুফের কিছু কমে না। ৬ গুনে ৭-এ বশ্যি ফিকে ইসুফ। ক্যাদোর মদ্যে ছিপখান গুঁজে দিয়ে মইমা খালার দিকে হাঁটা ধরে। খালাও আসতেছে শাক তুলতে। মইমা খালা আম্মার কাজে হাত আগায় দেয়। আরও ছোটবেলা থেকে দেখে আসতেছে ইসুফ। বাড়িত কোন বড় কামের চাপ আসলে মইমা খালার উদয় হয়। কামের বিটি না হলেও কামের জন্যই যে আসেন সেটা বলা যায়।
মইমা খালার জামাই মাছমারা জিনিসপত্তের দোকানের কর্মচারী। বাপের সঙ্গে সে দোকানে যাওয়া হয় মাঝেমধ্যে। পুরান জালই বেশি। মইমাখালার জামাই তদারকি করে। পুরানের মধ্যে ভাল কোন জাল তা চট করে ধরে দিবার পারে। এই কারবারের দোকানখান মলিন। বাঁশের আড়ের উপর টিনের চাল। সামনে মহাজনি বাসকোটার ছালবাকল ছাড়া ছাড়া। উইয়ের ঢিবি নিচে। তেল চিটচিটে কাঠে নানা মাপের ওলাওঠার মোতন গোল্লা গোল্লা দাগ। এগল্যে যে ঘুণের তা আর না বললেও চলে। চেলোপাড়া বাজারের গলি ধরে আগালে মাছের দোকান ছাড়ায়ে একটু পরে আল সুরেশ্বরী জালের দোকান। এই দোকানেই মইমাখালার সোমি কাম করে।
ক্যাংকা আছুরে বাজান ?
আলগোছে বুকে টেনে ধরে খালা। গা থেকে মেটে মেটে একটা গন্ধ পায় ইসুফ। মায়ের গায়েও এমন গন্ধ পায়। মইমা খালা মায়ের আপন বোন না হলেও কোথায় যেন একটা মিল পায় ইসুফ। আম্মার কাছে জানতে চাইলে খালি এই শুনেছে―সব খালার সম্পর্ক রক্তের হওয়া লাগে না। রক্তের থেকেই বড় গাঢ় হতে পারে যদি নিয়তে লেখা থাকে। এত গূঢ় কথা না বোঝাই ভাল। মইমাখালাকে ভাল লাগে। মা মা লাগে। দু¹া মেলাত নোনতা বিস্কুট কিনে দিতে না পারলেও তার গায়ের নোনতা গন্ধ অনেক বেশি ভাল লাগে ইসুফের। তবে তার সোমি নাকি হাড় বজ্জাত। কী নাকি করছিল গুলেন কাকু আর বাপজানের সঙ্গে। সে বৃত্তান্ত জানা হয়নি যদিও। তবে এতে খালার গায়ের গন্দ কমে যায়নি। খালা খালাই আছেন।
মাছ মারলু কয়ডারে বেটা ?
চাইরডে খালা। আরও বাকি আছে।
ঠাটারুর ব্যাটাও দেকি আছে। কীরে মাছ পালু ? বাপ্পির দিকে হাঁক দেয় খালা।
পামো। পামো। বাপ্পির উত্তরে এবার ঝাঁঝ আছে।
খালা ধরতে পারল কিনা তা ভাবাই যায় তবে ইসুফের কানে ঠিক ধরা পড়ে। এই ঝাঁঝে মাছ ধরা পড়ে। খালার সঙ্গে এগিয়ে এসে স্যান্ডেল খুলে তার উপর আবার বসে পরে ইসুফ। খালা আরও দুইচারখান কথা কয়ে চলে যায় শাকতোলা বেটিদের দিকে।
ছিপে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে মাছে আধার খায়ে গেছে কি না। ভরার ভার আর চ্যারার ভারের ভারটা ইসুফ বুঝতে পারে। না খায়নি। এমন ম্যালা মানুষের ছিপে মাছ ধরে বসে থাকে। তিনচারটা ছিপ ফেলে বিড়ি খেতে দেখছে ইসুফ। আবার কখন রাতের বেলা এমন বশ্যি ফেলে সকালে মাছ মেরে নিতেও দেখছে। কিন্তু এইটা ইসুফ পারে না। তার বিদ্যা এক বশ্যিতে। যে বশ্যিতে খালি নিজেদের বাড়ির চ্যারাই দিতে হয়। না হলে খোয়াজখিজিরের দোয়া আর নদীর ঝাড় কোনওটাই কাজ করে না। এই ছিপ বানানের জন্যে ম্যালা কিছু করতে হয়। সঠিক বাঁশ লাগে। আর সেই বাঁশ কেল্লাকুশির মেলা থেকে নিতে হয়। এই বাঁশ আবার সব আড়ায় হয় না। জনা দুয়েক সাদা দাড়িআলা চোখে সুরমা পড়া বুড়া মানুষ খালি নিয়ে আসে। বাপজানের সঙ্গে যে কয়বার এই মেলায় গেছে ইসুফ, বাছে বাছে দুই-একটা বাঁশ কিনছে তাদের কাছ থেকে। কোন বাঁশ কিনবে তা বাপ আর সুরমা পরা বুড়্যে দুইজন মিলে বাছে। ইসুফও থাকে সঙ্গে তবে ঠাওর করে উঠতে পারে না। এক আড়ার বাঁশ থেকে কোন বাঁশ কেনা হবি তা সে আঁচই করতে পারে না। বাঁশ তো বাঁশই। কিন্তু না। গুষ্টির বিদি মোতাবেক এই নিয়ম বহুত কড়া। সেই জ্ঞান আসেনি এখনও। তবে ধীরে ধীরে এই অবাক করা বিষয়গুলো খোলাসা হওয়া শুরু করেছে। কিছু যে একটা আছে তাদের মধ্যে যার জন্য এত বাছবিচার। আরও কত মানুষ বাঁশ কিনে তার কঞ্চি দিয়ে ছিপ বানায়। খালি তাদের বেলায় এই বাছবিচার।
কেল্লাকুশির মেলার আরও ব্যাপার আছে। শুধু যে বাঁশের জন্য তা নয়। যদিও মেলায় বাঁশই মেলা কিন্তু ঐ সুরমা দেয়া বুড়্যেেদর সঙ্গে নৌকার কাঠ জোগাড়ের এনতেজামে বাপজান গুলেন কাকুর সঙ্গে যান। নৌকার মেরামত নিত্য ব্যাপার তবে বছরে ঘোর বর্ষার আগে যে মূল মেরামত চলে তখন এই বিশেষ কাঠের দরকার পড়ে। নৌকার পাটাতন যেখানে দাঁড়িয়ে জাল ফেকা হয়, সেখানে এই কাঠের দরকার পড়ে। দেখতে এক হলেও প্রয়োজনটা কী তা ইসুফ আদতেই ধরতে পারে না। গুষ্টির আদপ। বরখেলাপে মাছ উঠে না।
ফৎনা ডুক্কি মারছে। আড় চোখে মইমাখালার দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে। খালাও তাকায়ে আছে ইসুফের দিকে। খালার কোছা প্রায় ভরে গেছে শাকে। ছেঁড়া শাড়ির কোছার ফুট্য দিয়ে কচুশাকের মোতা বের হওয়ার যো।
পালুরে আবার ?
এই শুনে ইসুফের সম্বিত ফেরে। খালা জানলো কী করে যে তার ফৎনা ডুক্কি মারছে ? আসমানমুখী হ্যাচকা টানে আবারও বাইলা মাছের লাল হয়ে যাওয়া কান দেখতে পায় ইসুফ। সাদা পেটের কাছে অন্য যে কোনও কিছুই বিচ্ছিরি লাগে। এই টানটাও বেহিসেবি। তা না হলে কান দিয়ে রক্ত আসতে না।
হ খালা পালেম।
তবে কি খালার মধ্যেও তাদের গুষ্টির বিদ্যা আছে ? না হলে তিনি বুজবেন কেমনে ? চিন্তা আটকে যায়। এর সুরাহা হবে কীভাবে ? আম্মাক বলা লাগবি। আরেকটা মাছ হলে আজকের মত শেষ। ৬টা হলেই হলো। নমাজের টাইম আছে তবে আজ তার আগে মাও গা ঘষে দিবি। ফি শুক্রবার গোছলের এই নিয়ম ইসুফের ভাল না লাগলেও করার কিছু থাকে না। আম্মা জোর করে গা ধুয়ে দেয়। কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে দেয়। নমাজের আগে সাফসুতর করার প্রাণান্ত চেষ্টা জন্মের পর থেকে। স্কুলের দিন এই কাজ করতে পারে না বলে ধরেধরে শুক্রবার।
আরেকটা মাছ পেতে সময় লাগে না। খালাও হাঁটা ধরছে বাড়ির দিকে।
ও খালা, ও খালা। এন্যা খাড়াও। এন্যা খাড়াও। একসঙ্গে যাই। উন্মুখ ইসুফ কোনও মতে মাছের পালল্যে এক হাতে আর ছিপটা অন্য হাতে নিয়ে বাপ্পির দিকে হাঁক দিয়ে বলে―এই চ্যারাগুলা তোর। মাছ মারে ডুঙ্গিডা বাড়িত দিয়ে যাস।
খালা মাছগুল্যে লেও।
নারে ছোল, কষ্ট করে মারছু, তোর মাও ঝারবিনি।
কিছু হবিল লয় খালা। তুমি লেও। মাও কিছু কবিনে।
কলবল করা মাছের পাতিলটা আস্তে করে খালার দিকে বাড়িয়ে দেয় ইসুফ। এক হাতে ফুট্যে হয়ে যাওয়া শাকভরতি কোছার মাতা কোমরে গুঁজে আলতো করে বুকে টেনে নেয় ইসুফকে। চোখের দিকে না তাকিয়ে ইসুফ আসমানের দিকে তাকায়। কড়ই গাছের ডালে গুড্ডি আটকে আছে। আরও ওপরে খোলা আসমানে দুডে চিল ডিলমিল করতেছে। খালার চোখের দিকে তাকাতে পারে না ইসুফ। দু¹া মেলার দু¹ার মতো একথালি মুখে ঘুরে ফেরে তার চোখ। পেছনের বিশাল আসমান ছোট হতে থাকে তার চোখের নিশানায়। আসমান হয়ে ভেসে আসে খালার মুখ। খালার চোখে বর্ষার ক্ষোভ ভাল লাগে না। এই যে এখন কপাল দেখছে, তাতেই আসমান ফাটা মেগের ডাক। আহ আল্লাহ তুমি এ কী বিদ্যা দিলা যে আমি এত বেশি মাছ মারতে পারি। আজ কোনও মাছ না মারতে পারলে এই পলাতক তুফানে পড়তে হতো না। খালার ঘরে দুপুরে পাকের কিছু থাকলে তাকে শাক তুলতে আসতে হতো না। এই সমীকরণের অংক খুব সোজা। তাই খালা যতবারই কো’ক ইসুফ কোনও মতেই রাজি হয় না মাছগুলা নিতে। খালা ফস করে ঘোমটা টেনে আসমানে পর্দা ঢেলে দেয়। উবুচ্ছাল ওঠা আঙ্গুলের স্পর্শে কচুঘ্যচুর আটালো বাসনা নাকে লাগে ইসুফের। গন্ধ্যে মাতোয়ারা হয়ে করতোয়ার কোল জুড়ানো মালতিনগরের পথ ধরে দুজন।
পরিভাষা
ক্যাদো : কাদা
গুষ্টি : গোষ্ঠী
আধার : মাছের খাবার
জাগ: পাট ভেজানো
সিমটা : পাটখড়ি
ছোল : সন্তান
চ্যারা : কেঁচো
পিছা : তাড়া
ক্যংকা : কেমন
করবু : করা হবে
খেও মারা : জাল ফেলা
ভত্তা মাছ : ছোট মাছ যা দিয়ে সচরাচর ভর্তা তৈরি করা হয়
ফিকা : ছুড়ে দেয়া
বাস্না : গন্ধ
ঠাটারু : টিন বা নরম ধাতব থেকে যারা বাসানকোসন তৈরি করে
পামো : পাবো
বিষ লেংটি : গোঁড়া হিন্দু
পান্টি : লাঠি
ছোলপোল : ছেলেপেলে
ডুক্কি : ডুব দেওয়া
পালু : পাওয়া
প্যাক : নরম কাদা
সোনারু : স্বর্ণকার
হবিল লয় : হবে না
কুত্যে : কুকুর
ডুঙ্গি : মাটির তৈরি ছোট হাঁড়ি
অ্যনা : একটু
আংগেরের : আমাদের
পাল্যে : পাতিল
ঠসা : কানে কম শোনা
চুচচুরে : ছোট মাছ
ভিয়ের : জমির
লই : এক ধরনের জনপ্রিয় মিষ্টান্ন বিশেষ
ল্যেলপা : লালা
সোমি : স্বামী
লোরচোর : নড়াচড়া
মোতা : গোড়া
রতি : ওজন মাপার মানদণ্ড
বলগ : বুদবুদ
কাবাকের : কেমন জানি
আরচারের : নড়াচড়া
বিন্দ্যে : গেঁথে থাকা
খলি : মাছ রাখার খলই
ফুচকি : লুকিয়ে দেখা
আড়ায় : বাঁশের ছোক
মাসক্যে ইদে : রোজার ইদ
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



