
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
গলিটাতে ঢুকেই তার সন্দেহ হয়েছিল। আর মূল ফটকের সামনে এসে চোখজোড়া পুরোই স্থির হয়ে গেল! মাঠটা আকালের দিনের মত খাঁখাঁ করছে, যেন আকাশের মুখগহ্বর থেকে একটা ধূসর বিশাল জিহ্বা নেমে এসে নেতিয়ে পড়ে আছে! একটাও মানুষ নেই কেন কোথাও! প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে এরপর যেই ভেতরে ঢুকেছে, বিশাল একটা হলরুম তাকে এমন করে আহ্বান করতে থাকে, যেন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে অন্দরে! এই প্রাঙ্গণটা তার সখীর মতই, নিত্য যার সঙ্গে ওঠ-বোস! কই আগে তো প্রাচীন এই ভবনটাকে এমনি করে চোখে পড়েনি! অচিরেই কিছু সহপাঠীকে চোখে পড়ল; কী যেন লিখছে তারা মন দিয়ে! আচ্ছা, কী হয়েছে সবার আজ ? পৃথিবীর গতিপথ কোনও কারণে উলটে গেছে! নিয়ম-কানুন সব বদলে গেছে!
হঠাৎ একটি তেড়ে আসা কণ্ঠ তার সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে দিল, ‘অ্যাই, তুই বাইরে খাড়াইয়া রইছস ক্যান ? ভেতরে ঢুইকা লেখা শুরু কর তাড়াতাড়ি।’
আফসোস, শোক, বিস্ময়, ক্ষোভ―একে একে ঢেউ তুলতে তুলতে তার রক্তনালির সরু পথটিকে চৌচির করে দেয়! আর মুহূর্তের মধ্যেই রং-বেরংয়ের অচেনা সব পালে বোঝাই হয়ে যায় তার পুরো অবয়বটি! কিছু একটা হাতছাড়া হয়ে গেলে যেমন হয়; বিশেষত যা ছিল নিশ্চিত, ছিল প্রবল আকাক্সক্ষার সুতায় বোনা, তাই যদি ছুটে যায়! আচ্ছা, কেন সে জানত না যে পরীক্ষাটা আজই ?
পরীক্ষার তো একটা রুটিন থাকে, আর সে অনেক আগে থেকেই তাকে টেবিলের সামনের দেয়ালে শক্তিশালী আঠা দিয়ে সেঁটে রাখে। তবে কি পরীক্ষার শিডিউল এগিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর কোনওভাবে মিস হয়ে গেছে তার! অথবা, ব্যাপারটি কি এমন যে কোনও একটি বিশেষ পরীক্ষা হতে পারেনি―হয়তো হরতাল, হয়তো জাতীয় কোনও দুর্যোগ―সাইক্লোন, সুনামি! কিন্তু তা হলেও নতুন তারিখটা সে জানবে না! সে কি তাহলে মনভুলো কোন অসুখে আক্রান্ত! কিন্তু তার এত্ত এত্ত বন্ধু! তারাও এই পরীক্ষাটার কথাটা তার কাছে পাড়বে না!
এখন কী করে সে! এত লম্বা একটা এক্সাম অনেক আগের পড়া থেকে মনে করে করে কতখানি এগোনো যায়! আজকের এক্সামিনারটিও খুব কড়া; ঘাড় ফেরানোর সুযোগ দিচ্ছে না! যতই সময় গড়াতে থাকে, তার হাত-পা অবশ হতে থাকে! দরদর করে ঘাম ছুটতে থাকে! নাড়িভুঁড়ি থেকে জন্ম নিয়ে ক্রমে পাঁক দিতে দিতে কণ্ঠদেশের আউটলেট দিয়ে এক সময় বেরিয়ে পড়ে একটা চাপা গোঙ্গানি, আর সেই স্বরে গুমরে মরতে থাকে বাতাসের মিহি গলিপথ!
বেডসুইচটা খুঁজে পেতে অনেকক্ষণ হাতড়াতে হলো অরুণিমাকে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছিল তার! আর ঐ অবস্থাতেই পাশ ফিরে চোখটা খুলেছিল সে। এরকম আগেও হয়েছে তার―একটা ‘এক্সাম মিস’ তাকে ভীষণ তাড়া করতে থাকে রাত একটু গভীর হলেই! এমনকি কোন পরীক্ষাটা―তাও মনে করতে পারে না সে। সব থেকে যন্ত্রণাদায়ক হলো, প্রতি মিলিসেকেন্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটা সময় অবলুপ্ত হতে থাকে জিনিসটা। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে যে ধরে রাখবে ওকে, সে সুযোগও তো নেই! শেষ রাতে একটু না ঘুমুলে হবে কী করে! সকাল হতে শুধু যে অফিস দৌড়ুনো―তা তো নয়, আরও কত কাজ থাকে অরুণিমার!
ঘরটা আলোয় ভরে গেলে উঠে বসে সে, যেন এখনই পেয়ে যাবে এক্সামটার সব খবর! কিন্তু আবিরের ক্ষুদে দেহখানা ছাড়া আর কিচ্ছু চোখে পড়ে না। ওর ঘুমন্ত চোখদুটো কেমন অদ্ভুত বেঁকে আছে আজ―মনে হচ্ছে চেয়ে আছে কারও দিকে। আরে… আরে… এইমাত্র… আবিরের ঠোঁটটা সামান্য নড়ে গেল না! আচ্ছা, কোথায় আছে তার মানিকটা এখন ? যেখানেই থাকুক না কেন, নিশ্চিত কিছু একটা ঘটে চলেছে সেখানে! হতে পারে ফসল কাটার উৎসব; রাজ্য জুড়ে আনন্দ, পান, ভোজ! হঠাৎ আবিরের কানে কানে কিছু একটা বলে গেলেন উজির মশায়! তারপরেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে একটা জরুরি সভা! আবিরের কপালটার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকে অরুণিমা। কিছু রেখা তড়পাতে তড়পাতে এক সময় স্থির হয়ে যায় সেখানে!
আচ্ছা, ঘুমন্ত মানুষের দিকে তাকিয়ে তার ঘটনাগুলো সব বলে দেওয়া যায় ? ধ্যাত! কী সব আবোলতাবোল ভাবনা জুড়ে বসেছে আজ! এবার ডান দিকে কাত হয় অরুণিমা, আবিরের ঠিক উল্টা দিকে। কালকের দিনের জন্য কত কাজ যে জমে আছে! তার কিছু কাজ থাকে যা সে কেন করে তার উত্তর যেমন মানুষের কাছে নেই, তার কাছেও নেই। কিন্তু পাড়ার সকলেই জানে, কাজগুলোতে তাকে প্রয়োজন হবে। ধরা যাক, একটা বিজ্ঞান মেলা হতে যাচ্ছে, আর তার দরজার কড়া নড়তে শুরু করবে প্রজেক্টের জন্য। অথবা, একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেখানেও তাকে ঠিক করে দিতে হবে কে কী গাইবে, কোন কবিতাটা আবৃত্তি হবে, আর কোন নাচটা মঞ্চে ধিন-তা-ধিন ধ্বনি তুলবে। কোনও ফাংশান-টাংশান না থাকলে সে ছোটদের নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়বে, আর একটা ফাঁকামতো মাঠ দেখে শুরু হয়ে যাবে গল্পের আসর।
তবে ছোটদের যতটাই প্রিয়, বড়দের কাছে ঠিক ততটাই অপ্রিয় অরুণিমা। এই ব্যাপারটা প্রায় সর্বজনীন তার পাড়াতে যে, বড়দের তীব্র একটা পালপিটেশান হতে থাকে, তাকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই। আর যতক্ষণ পর্যন্ত যাওয়ার নাম করে না, আল্লা আল্লা জিকির উঠে যায় শ্রোতাদের অন্তরে! আগামীকালকের কাজটা অবশ্যি এই বড়দের নিয়েই। তার কাজিন পরাগের জন্য একটি মেয়ে খুঁজে দিতে তাকে বড়রা কেউ, মানে, তার মামা-মামি বলেনি; সে যেচেই নিয়েছে ভারটা। সেদিন যখন গলির মুখের পেট্রোল পাম্পটার পাশ দিয়ে অফিস যাচ্ছিল, সিগারেটের জ্বলন্ত ধোঁয়ার মধ্যে পরাগের মুখটা আবিষ্কার করে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল। কয়েকটা বাস তখন হাত-পা ছেড়ে দিয়ে আয়েশ করে ডিজেল গিলে যাচ্ছিল; আর ডিজেলের ঝাঁঝাল গন্ধটা অরুণিমাকে বাধ্য করেছিল গোলাপি ওড়নায় নাক-মুখ চাপা দিয়ে স্থানটা ছেড়ে আসতে।
তার আর পরাগের মধ্যে কে যে বড়, তার মীমাংসার চেষ্টা অনেকবারই হয়েছে, কিন্তু কোনও সর্বসম্মত মতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যেমন, হয়তো পরাগের নানি মত প্রকাশ করল, ‘কওন যাইব না ক্যান! ঐ যে বানের বছরডা, বড় আম গাছডা মইরা গেল, তার এক মাসের মধ্যেই তো ঘর আলো কইরা আইলো আমাগো পরাগ! হেই সময় অরুণিমারে আমার কোলে দিয়া ভাইস্তারে একটা চেইন পরাইয়া দিতে গেলে যেই চিক্কুর পাড়ছিল অরুণিমা, তা মনে আইলে অহনো ডর করে!’ কিন্তু এই মত আবার মোটেও গ্রাহ্য হলো না অরুণিমার দাদির, ‘বেবাক আওলায় হালাইতেছেন, বুজি! বানের বছরডা ঘুরতে যহন ঘরবাড়ি ভইরা গেল জিরাতপাতি দিয়ে, অরুণিমা তহন পাঁচ মাসের পেডে! পরাগরে নিয়ে পিডাআডা খাইয়া গেলেন, মনে কইরা দেহেন!’
বুড়াদের মধ্যে যখন এইসব বাহাস ফুটতে ফুটতে পাতিল উপচাতো, তখন পরাগ অরুণিমার ঘরের সোফাটায় বসে হয়তো সেদিনকার ঘটে যাওয়া কোনও কাহিনি বয়ান করত। যেগুলো সবসময়ই বেদনাবিধুর হতো। আর বয়ানটা হতো এমনি এক প্রথা ও রীতিতে যে অরুণিমার চৌকো ঘরটা ধীরে ধীরে এজলাসের পাটাতনগুলোর মত শীতল হয়ে পড়ত। আর কত যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় সেখানে উঠে আসত! যেমন, পরাগ যদি কোনও ক্রিকেট ম্যাচে সহজ একটি ক্যাচ মিস্ করে, তখন তার পেছনে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ বিদ্যমান ছিল, তার অমনোযোগিতা বা অদক্ষতার ওপরই সব দায়ভার দিয়ে দেওয়া চলে না! আবার বাবা যদি তার ক্রিকেট প্রতিভাটাকে বিস্মৃত হয়ে শহরের নাম-করা কোচিংটাতে ভর্তি না করে দেয়, তাহলেই যে সে স্টার মার্কস নিয়ে পাস করে ফেলবে, তার কোনওই নিশ্চয়তা আছে!
হঠাৎ একটা খিঁচুনি দিয়ে কর্কশ স্বরে কেঁদে উঠল আবির! আর হুড়ুমুড় করে আলো জ্বেলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল অরুণিমা, ‘এই তো মা আছে সঙ্গে, কোনও ভয় নেই, বাবা!’ দিন দিন আরও দুষ্ট হচ্ছে বিচ্ছুটা! ও এত আদুরে যে আরও অনেক নাম জুটে গেছে ইতিমধ্যে! ইঁদুর, বিড়াল, চিতা। তিন পেরিয়ে চারে পড়েছে সবে, এখনও পরিষ্কার নয় তার মুখের বুলি; ভেঙ্গেচুড়ে গিয়ে ধ্বনিগুলো যে ভাষাটি তৈরি করে, তার মর্মোদ্ধার হয়তো কোনও অচিন দেশেই সম্ভব কেবল! মাঝে মাঝে ভাবে অরুণিমা, আবিরকে ডানায় মেখে যদি সে উড়ে যেতে পারত সেই অচিন দেশে! সেখানে এক চিলতে জায়গার ওপর ঠিক বাবুই পাখিদের একটি গোলঘর!
অরুণিমা সুন্দর ছিল না। চেহারাটা কুশ্রী না হলেও সে মোটা ছিল, কালো ছিল। তার ওপর ছিল তার গা ভরা দেমাগ। কাউকেই সে পাত্তা-টাত্তা দিত না। মুখের ওপর কথা শুনিয়ে দেওয়ার চাইতে প্রিয় মনে হয় আর কিছু ছিল না তার কাছে। আশেপাশের বেশির ভাগ মানুষই তাকে ভয় পেত, আর চুপ হয়ে যেত সে কথা বলতে শুরু করলে। তার সাজগোজের বাহার এত উৎকট ছিল যে, মায়েরও চোখে লাগত। মা তো অনেক ঝগড়া-টগড়ার পর ক্লান্ত হয়ে এক সময় আর না ঘাটানোরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শুধু বাবাই সহ্য করে যেত অরুণিমার সব কিছু। তাকে নিয়ে কথা উঠলেই, বাবা তাক করত তার বহুল ব্যবহারে জীর্ণ গুলিটি, ‘একদিন দেশের নাম-করা ব্যারিস্টার হবে আমার মা!’
সে পড়াশোনায় ভালো ছিল; কিন্তু এমন নয় যে দেশ সেরা ব্যারিস্টার হয়ে যাবে, বা, বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান করে নেবে, আর টিভিতে তার ইন্টারভিউ দেখাবে। কিন্তু অরুণিমাও বাবার মত মনে করত যে, সে একটা কিছু হবে একদিন। নিজের গুণপনার কথা সবাইকে উঠতে-বসতে বলে বেড়াতে তার বাঁধত না মোটেই। আসলে মনের মধ্যে রেখে দেওয়া কোনও কিছু―এই ব্যাপারটাই তার মধ্যে ছিল না। বছর কয়েক পূর্বে পিত্তথলির পাথর অপসারণের জন্য কিছুদিন হাসপাতাল-বন্দি ছিল অরুণিমা। সে সময়ও তার কথার স্রোত পুরো চলমান ছিল। একদিন তো এক খালা মুখের ওপরই বলে বসলেন, ‘একটু কথা কম বলতে পারিস না! এত্তগুলা পাথর হইল, তারপরেও কেমনে পারোস!’
সে হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই একদিন পরাগ এল। সবে একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে ঢুকেছে তখন, চেহারা দিন দিন আরও চেকনাই হচ্ছে! তার আগমনের হেতু জানা না থাকলেও তাকে দেখার জন্য যে নয়, এ বিষয়ে অরুণিমা নিশ্চিত ছিল। তাই পরাগ যখন মাথা নিচু করে একটা মেয়ের ফটোসমেত সিভিটা অরুণিমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘দেখ, কোনও মানে হয়! আব্বাকে বললাম যে, সবে জয়েন করছি… দুইটা বছর যাক… তারপর না হয়..’, অরুণিমা অবাক না হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল জীবন-বৃত্তান্তটা! টানা টানা চোখ, ভ্রƒ, নাক, ঠোঁট সব যেন পেন্সিলে আঁকা! ‘তোর পছন্দ হইছে ?’ জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল অরুণিমা, কিন্তু তার আগেই পরাগ কেবিনের আবলুশ কাঠের কপাটটা খুলে ফেলেছে। ‘যাইরে… দোয়া করিস যেন সামাল দিতে পারি…’ এই কথাগুলোকে ভেতরে নিয়ে কপাটটা আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ করেই যেন গরম লাগতে শুরু করেছে! আবার পাশ ফিরল সে বিছানাটার। এ নিয়ে যে ঠিক কবার এপাশ-ওপাশ করল, সে হিসাব তার কাছে ছিল না। তবে যতবারই পাশ ফিরছিল, একটা অচেনা ভীতি চেপে ধরছিল তাকে। একবার মনে হলো, ফ্যানটা ফুল স্পিডে দেওয়া নেই, রেগুলেটরের নব্ একটু ঘুরিয়ে দিলে বেশ হয়! কিন্তু বিছানা ছেড়ে ওঠার কথাটা মাথায় আসতেই চিন্তাটা বিদায় করে দিল অরুণিমা, আর গায়ের অর্ধেকটা থেকে কাঁথাটা সরিয়ে ফেলল! এই এক অদ্ভুত ব্যাপার! গরমে মরে যাওয়ার উপক্রম হলেও পুরো কাঁথাটা শরীর থেকে কখনও সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয় না তার পক্ষে। কোমর থেকে পা পর্যন্ত, অথবা হাঁটু থেকে পা অবধি কাঁথায় ডুবে থাকা… নিদেনপক্ষে কাঁথাটাকে ভাঁজ করে চাদরের মত করে বুকের ওপর রাখা চাই। না হলে কেমন উদোম উদোম লাগে তার, আর গরমটা আরও তাতিয়ে বসে!
‘ধুর, কে একটা বুড়াকে বিয়ে করতে যাবে!’ কথাটা যখন বলছিল, পরাগকে তখন ঐদিনের থেকে অনেক বেশি সভ্য দেখাচ্ছিল। গত সপ্তাহের কথা, পরাগদের বাসায় গিয়ে সোজা ওর ঘরে ঢুকে পড়েছিল সে! কী এক তাড়া যেন ছিল অরুণিমার, এমনকি মামা-মামির সঙ্গে কুশল বিনিময়ের কথাটাও ভুলে গিয়েছিল সে।
“কে আবার তোকে বুড়া বলল! আর বয়স তো সব মনে! আমার কথাই ধরনা! এই সেদিন আমার অফিসের বস বললেন, ‘আপনি এত নড়াচড়া করেন কেন সব সময়! বাচ্চা বাচ্চা লাগে!’ এরপর আমি কী করলাম জানিস ? লম্ফঝম্ফ আরও বাড়ায়ে দিলাম! ঠিক করছি না, বল তো ?” দু-তিনটে পাত্রীর প্রোফাইল অরুণিমার মোবাইল স্ক্রিনে জুমের মাধ্যমে বড় করে ধরা ছিল তখন। হাসপাতালের দিনটার কথা মনে পড়ে যায় অরুণিমার, মাসখানেকের মধ্যেই পরাগের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গিয়েছিল, ঐ মেয়েটির সঙ্গেই; আর বিয়ের যাবতীয় জোগাড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল অরুণিমাকেই, যেমনি করে বিয়ের দুদিন আগে যখন মেয়েটি তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে পালিয়ে যায়, তখনও তাকেই সব সামলাতে হয়েছিল।
‘সবাই তো আর তোর মত না’ নিচু স্বরে কফ ঝাড়তে ঝাড়তে বলেছিল পরাগ! কফের ঘনত্ব ও ফ্রিকোয়েন্সি দুইয়ের সঙ্গেই প্রবল এক যুদ্ধে লিপ্ত তখন সে।
‘তা অবশ্য ঠিক। আমার মত আর কাউকে পাবা না! তবে বিশ্বাস হবে কিনা তোমার… তোমার এই যে বয়সটা… জীবনকে উপভোগ করার জন্য এর থেকে সুন্দর সময় হয় না। এই বয়সে তোমার ইচ্ছেগুলো, মনের সুপ্ত বাসনাগুলোর বেস্ট মূল্যায়ন করবে তোমার লাইফ পার্টনার। এই যেমন, আমি হলে কিন্তু তোমার মত পাত্রকেই খুঁজতাম!’ শুধু পরাগের সঙ্গে থাকলেই অরুণিমার মধ্যে এই ব্যাপারটা চলে আসে, মানে, কখনও তুমি, কখনও তুই…।
পরাগ অরুণিমার দিকে এক ঝলক তাকিয়েছিল, তারপর মাথাটা নিচু করে ফেলেছিল। ওদিকে অরুণিমার মাথাটা কিন্তু আগের মতই ছিল, একটুও উঁচু বা নিচু হয়নি! সে জানে, সে চিরকালই এমন। যখন যা ইচ্ছে হয়েছে, বলেছে; যা ইচ্ছে, করেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর বারো ভূতে লুটে খাচ্ছিল তাদের জায়গা-জমি। এর মধ্যে তার চাচারাও ছিল। সে যখন মামলা করে বসল, তখন বড়দা তো ভয়ে শিউরে গিয়েছিল! এসব ঝুট-ঝামেলা একদমই পছন্দ নয় বলে বড়দা কখনও এমনকি বেড়ানোর ছলেও ঢুঁ মারেনি পূর্বপুরুষের ভিটেয়। কিন্তু অরুণিমার কেবলই মনে হয়েছে, তার বাবার কোনও চিহ্ন থাকবে না, তা হয়! মামলার নিষ্পত্তিতে কিছু অর্থ গচ্চা গেছে বটে; কিন্তু জমিগুলো ফেরত পেয়েছিল অরুণিমা। আর দখলকারীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রেজিস্ট্রিটাও করে ফেলেছিল সে সময় নষ্ট না করে।
এই ঘটনাটার পরই সম্ভবত অরুণিমা রাজনীতিতেও নাম লেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে দেখেছে, পাওয়ারের কোনও বিকল্প নেই। আদর্শের বুলি কপচে সমাজ পরিবর্তন করতে কেউ আগে পারেনি, সামনেও পারবে না। এই চিন্তার সূত্র ধরেই অরুণিমা এমন একটি ল কলেজে পড়তে শুরু করল, যার অবস্থান ঢাকা থেকে কয়েকশ কিলো দূরে। আর প্রতি সাপ্তাহিক ছুটিতে সেখানে গিয়ে ক্লাসও করতে হয়! পুরো একটা রাত যায় তার ট্রেনে, এরপর দুটো দিন ও একটি রাত যায় তার একটি জেলায় যেখানে একটি লোকও আগে থেকে চেনা নেই! ওখান থেকে ফিরে এলে মানুষ তার দিকে তাকায় অদ্ভুত চোখে; মনে হয়, তারা তাকে দেখেই বুঝে নিতে চাইছে কী ঘটেছে সময়টাতে! অরুণিমা অবশ্যি তাদের হতাশ করে না, সে তারিয়ে তারিয়ে বলে মেসের গল্পগুলো; স্মার্ট ফোনে ছবি দেখায় অনেকগুলো ছেলে সহপাঠীর সঙ্গে সে একা একটি মেয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে!
‘কী বলিস! ও তো একটি বুড়ি!’ অরুণিমার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা একটা সিভির দিকে তাকিয়েই কাশতে শুরু করেছিল পরাগ। সিগারেটের মাত্রা কতটা বাড়িয়েছে আন্দাজের চেষ্টা করতে করতে ভাবনার অতলে তলিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল অরুণিমা।
হঠাৎ কিছু একটা পতনের শব্দ রাত্রির স্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দিতে থাকে! শুধুই একটা ধপাস ধ্বনি, কোনও ঝনঝনানি নেই! মোটাসোটা কিছু হবে নিশ্চিত, আর ওজনও থাকবে তার! কী হতে পারে! টেবিলের কোনও বই ? দেয়ালের ক্যালেন্ডার ? সদ্য কেনা ব্যাগটা ? হঠাৎ তার মাথায় আবার ফিরে আসে হারানো এক্সামটা! আর ছটফটানিটা ধূমকেতুর মত ছুটে চলে! কিন্তু সে যতই গোড়ায় যেতে চায়, ধরতে চায় বস্তুটাকে, অসংলগ্ন দৃশ্যেরা ভেসে উঠতে থাকে একে একে! স্বপ্নগুলোকে সব ভুলিয়ে দিতে জগতে এই ষড়যন্ত্রটা মনে হয় সর্বদাই চলে, ভাবে অরুণিমা! কখনওই ঠিকঠাক মনে করে পারা যায় না তাদের! নতুন নতুন ছবি আর পাত্র-মিত্র ঠিক সময়মতো তার গলা টিপে ধরবে!
তাহলে পরাগ কলেজপড়ুয়া বা বড়জোর অনার্সে ভর্তি হয়েছে এমন কাউকে চাইছে ? তাও ভালো সংবাদ। এতদিন তো বিয়ের কথা উঠলেই প্রসঙ্গ পালটে ফেলত, নতুবা কোনও একটা উছিলায় সামনে থেকে সটকে পড়ত। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ নয় মোটেই, পরাগের বয়সী একজনের জন্য অমন মেয়ে! পরাগটারই ভাগ্য বলতে হবে! না হলে, কেন দুদিন পরেই তাদের দালানটার সামনের লনটি দিয়ে যেতে দেখবে মেয়েটিকে, আর দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করে জানবে, নতুন ভাড়াটে; আর তারপরই মেয়েটির অপূর্ব স্বভাবের বাবা-মায়ের সম্মতি আদায় করা যাবে একটি মুখোমুখি সাক্ষাতের!
মেয়েটিকে পছন্দ না করে পারবে পরাগ! সেই টানা টানা চোখ, পেন্সিলে আঁকা ভ্রƒ, নাক আর মুখ… আর অদ্ভুত এক পলি পুরো অবয়বে! কিন্তু মেয়েটির যদি পছন্দ না হয় পরাগকে! তাহলে! অরুণিমা হঠাৎ দোয়া দরুদ পড়তে শুরু করে দেয়, ‘আল্লা, পরাগটার একটা হিল্লে করে দাও! ওর একজন কাউকে দরকার! একজন কেউ যাকে ও নিজের মনের কথাগুলো সব খুলে বলতে পারে!’
হঠাৎ কেন জানি শীত লাগতে শুরু করে অরুণিমার! আর কাঁথাটা আবার পুরো পেতে দিয়ে তারা সারা দেহ, এমনকি কান ও চোখের পালককে পর্যন্ত তার নিচে লুকিয়ে ফেলে।
‘উম..আম..দা…’ অদ্ভুত একটা ভাষায় মৃদু চিৎকার উঠে তটস্থ করে তোলে অরুণিমাকে। লাইট জ্বেলে দেখতে পায়, আবিরের মুখটা বিকৃত হয়ে আছে। বালিশটা কোথায় ছিটকে গেছে, হুঁশ নেই! আর পুরো মুখ রক্তবর্ণ! শিউরে উঠে সে! নিশ্চয়ই যুদ্ধটা এখন রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে! হয়তো সৈন্যদের বিপর্যয় দেখে রাজা নিজেই অসি চালাতে শুরু করে দিয়েছে! প্রবল বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তার আবির!
‘ভয় পেয়ো না বাবা, মা পাশে আছে, কখনও চলে যাবে না তোমায় ছেড়ে!’ অরুণিমা প্রবল করে আঁকড়ে ধরে ছেলেকে; দুনিয়ার যত শক্তিই থাকুক, কাউকে সে এতটুকু ক্ষতি করতে দেবে না ছেলের। ছেলের জন্যই তো এত কষ্ট করে জমানো টাকাগুলো দিয়ে বাড়িটা বানালো। কেউ কেউ বলেছিল অবশ্য, ‘ভাইয়ের নামেই তো করতে পারতি!’ কিন্তু ছেলেটাকে তো কোলে-কাঁখে করে সেই বড় করে তুলেছে। প্রথম প্রথম ঘুমিয়ে পড়লে পাশের ঘরেই বড়দা আর ভাবির কাছে দিয়ে আসত। কিন্তু ঘুম ভেঙে অরুণিমাকে দেখতে না পেলে আবির এমন একটা কান্না জুড়ত আর এমন একটা হুলুস্থূল বেঁধে যেত পুরো ঘরখানায় যে বড়দা আর এক্সপেরিমেন্ট না চালাতে কড়া হুকুম করেছে অরুণিমাকে!
ছেলেটাকে বড় করতে হবে, অনেক অনেক বড়! আস্তে আস্তে রাজ্যের ঘুম নেমে আসতে থাকে অরুণিমার দু চোখে! আর ফের এক্সামটাতে ঢুকে পড়তে থাকে সে!
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



