
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
শ্যাটাপকে যে জিনে ধরেছে এই কথা সবার আগে জানতে পারল কাজি বাড়ির লোকেরা। বড় কাজি তখন মাগরিবের নামাজ শেষে খালি গায়ে বড় ঘরের রকে বসেছেন। অস্বস্তিকর গরম আর গাছের পাতাও নড়ে না এমন ক্ষমাহীন এক ভাদ্রের সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছিল রাতের দিকে। তিনি দেখতে পেলেন একটা ছায়ামূর্তি উঠোনের পূর্ব কোণের সদর দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল আর খুব দ্রুত এগিয়ে এল তার দিকে। বেতের চেয়ারটার পায়ের কাছে বসে বড় কাজির বিস্ময়কে আগ্রাহ্য করল মোমেনা, যে কিনা শ্যাটাপের মা, ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘হুজুর, আমার শ্যাটাপরে জিনে ধরিছে। আমার ছুয়ালডারে বাঁচান।’
ঘটনার আকস্মিকতায় বড় কাজি খুব দ্রুত সাড়া দিয়ে উঠতে পারলেন না। হয়তো তার কয়েক মুহূর্ত লেগে যায়। বয়স হয়েছে। এত দ্রুত মানুষের কথা তার করোটির ভিতরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে উঠতে পারে না কিন্তু এর মধ্যেই তিনি দেখতে পান মোমেনা উচ্চস্বরে কাঁদছে। বড় কেরোসিন লম্পোর ধ্যাবড়া শিখাটা জ্বলছিল। কান্নার শব্দে সেই লম্পোটা হাতে নিয়ে রকে এসে দাঁড়ান তার বউ হামিদা বানু, কিছুটা কৌতূহল কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে মিশিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এ মোমো, কী হইছে ? কানতিছিস কেন ?’ তারপর ওরা সবাই মোমেনার চারপাশ ঘিরে বসে। একে একে জড়ো হয় দুই ছেলে আর ছেলের বউয়েরা, এক হালি নাতি-নাতনি আর বাড়ির আশ্রিত কাজের লোকটি। কাজি বাড়ির প্রশস্ত রকটায় আর বসার জায়গা থাকে না।
কিন্তু মোমেনা, যার নাম গ্রামের নারী-পুরুষ সকলের কাছে মোমো অথবা মোমোবু সে চায় না বসতে। এ মুহূর্তে কাউকেই বিস্তারিত কিছু সে জানাতে সক্ষম হয় না। কিছুটা ফুঁপিয়ে কিছুটা আতঙ্কে কেঁপে সে বলে, ‘আমার ছুয়ালডার পাউ ভাইঙ্গে দিছে জিনে, খুব খারাপ জিনে ধরিছে ওরে, হুজুর আপনি চলেন।’
গায়ে সুতির জোব্বাটা চড়িয়ে নিজের চার ব্যাটারির টর্চলাইট নিয়ে বের হন বড় কাজি। মোমেনা আগে। তার পিছে দশাসই আকারের কাজি সাহেব আর তার বড় ছেলে হালিমুদ্দিনের একমাত্র পুত্র সোবহান। সরল তীব্র একটা আলোর রেখায় ঘন হতে থাকা অন্ধকার যেটুকু কাটে ওতে বৃদ্ধের পথ চলায় অসুবিধা হলেও মোমেনার হয় না, সে যেন তাদের থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ায়, প্রায় উড়ে চলে। সোবহানের যদিও পথ চলতে সমস্যা হচ্ছিল না, তার গতি কমে দাদা যেন পড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে। যতক্ষণে বড় কাজি মোমেনার ঘরের দাওয়ায় আধো অন্ধকারে একটা কাউকে বসে থাকতে দেখেন, খবরটা ছড়িয়ে গেছে আশেপাশে।
তাই মোমেনাদের কলাপাতা ঘেরা আঙিনায় রাতের এই প্রথম প্রহরে হাতে একটা হারিকেন অথবা টর্চলাইট নিয়ে চলে আসে অনেকেই। তারা শুনতে পায় অনবরত কেউ কুরআন শরিফ পড়ছে। কণ্ঠটা তাদের চেনা লাগে। না এ বড় কাজির কণ্ঠ নয়। ঠিক একজন ক্কারির মতো সুললিত কণ্ঠে কুরআন পড়ে যেতে থাকে যে কণ্ঠ, অনেকেই নিশ্চিত হয় যে তা শ্যাটাপের। কিন্তু শ্যাটাপ কীভাবে তা করতে পারে ? অনেকেই জানে ছেলেটা মুতে পানি পর্যন্ত নেয় না, বহু লোক কতবার তাকে রাস্তার পাশের কোনও গাছের আড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে দেখেছে। জুম্মার দিনেও শ্যাটাপকে মসজিদে দেখা যায় না। সেই ছেলে কিনা এমন সুর করে ধর্মের কেতাব পড়ছে ? তাদের খুব অবিশ্বাস্য লাগে। শাদাটে বেলে মাটির উঠানের এক কোনায় দাঁড়িয়ে তারা শুনে যায়।
…তুমি দেখতে পেতে সূর্য উদয়ের সময় তাদের গুহা হতে ডান দিকে হেলে যেত, আর যখন তা অস্তমিত হত তখন তা তাদের থেকে বাম দিকে নেমে যেত, আর তারা ছিল গুহার অভ্যন্তরে বিশাল চত্বরে। এ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথ দেখান সে সঠিক পথপ্রাপ্ত আর যাকে তিনি পথহারা করেন, তার জন্য তুমি কক্ষণও সৎপথের দিশা দানকারী অভিভাবক পাবে না। তুমি মনে করবে যে তারা সজাগ, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত, আমি তাদের ডানে বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম। আর তাদের কুকুরটি ছিল গুহাদ্বারের সম্মুখে তার সামনের পা দুটি প্রসারিত করে। তুমি যদি তাদেরকে তাকিয়ে দেখতে তাহলে অবশ্যই পেছন ফিরে পালিয়ে যেতে, আর অবশ্যই তাদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে।
দাওয়ার ওপরে একটা হারিকেন জ্বলছে। তার অস্বচ্ছ আলোয় শ্যাটাপকে বসে থাকতে দেখা যায়। পা ছড়িয়ে সে বসে থাকে আর দুলে দুলে যে আয়াতগুলো আউড়ে যায়, বড় কাজি সহজেই তা বুঝতে পারেন। ছেলেটা সুরা কাহফ পড়ে যাচ্ছে টানা। যেন তার চোখের সামনে কেউ একটা কুরআন মেলে রেখেছে। জিনে-ধরা লোককে এর আগেও এমন করতে দেখেছেন তিনি। দৃশ্যটি তার কাছে নতুন কিছু নয়। যা কিছুই ভর করে থাকুক, সে খুব একটা মন্দ কিছু নয় বলে প্রতীতি হয়। সুরা ইয়াসিন, সুরা নাস, সুরা ফালাক আর আয়াতুল কুরসি পড়ে ছেলেটির সারা দেহে তিনি হাত বুলান, ফুঁ দেন মাথায়। এক পাত্র পানিতে ফুঁ দিয়ে মোমেনাকে বলেন, ‘আল্লার নাম নিয়ে এইটে খাওয়াবি ছুয়ালরে, বুঝিছিস ?’
মোমেনা ভারী কণ্ঠে জানতে চায়, ‘হুজুর ও সাইরে যাবেনে তো ?’
‘যাবে, ইনশাআল্লাহ।’
‘জিন কি কথা কইছে আপনার সঙ্গে ?’
বড় কাজি নির্মল চোখে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে হাসেন, ‘দরকার হলি আমি বলব কথা এই সব নিয়ে। এখনে যা কলাম, মন লাগায়ে শুনিস। সাইরে যাবে তোর ছুয়াল।’
ঝাড়ফুঁকের পর শ্যাটাপ শান্ত হয়। কুরআন পড়া থামায় সে। কোনও একটা ব্যথায় ককিয়ে উঠে বলে, ‘ও মা, আমার পায়ে এত জ্বালা, পা ডা ভাইঙ্গে দিছে মা।’
অতিপ্রাকৃতের চিন্তা এই বাস্তব দিকটি থেকে এতক্ষণ স্বয়ং বড় কাজিকেও দূরে সরিয়ে রেখেছিল। টর্চের আলো ফেলে দেখলেন ছেলেটির বাম পা হাঁটুর নিচ থেকে ফুলে নীলচে হয়ে উঠেছে। সেখানে হাত দিয়ে তিনি চমকালেন, যেন আগুন জ্বলছে এত গরম।
‘রশিদ কোবরেজরে খবর দে মোমেনা। তোর ছেলের পাউ বাইন্ধে দিয়া লাগবে। পাউ তো মনে হয় ভাঙ্গিছে।’
মোমো আবার ছুটে বাইরে বেরিয়ে যায়। রশিদ কবিরাজের অপেক্ষায় বড় কাজি বসে থাকেন। সোবহান এতক্ষণ চুপচাপ দাওয়ার এক ধারে বসে ছিল। সে জানায়, ‘দাদা, আমি একটু হাঁইটে আসি।’ শ্যাটাপ প্রচণ্ড ব্যাথায় প্রথমে উচ্চকণ্ঠে আর্তনাদ করছিল, ধীরে ধীরে কণ্ঠটা নিস্তেজ হয়ে আসে। পুবের আকাশে সরু চাঁদ ভাসছে, পূর্ণিমা হতে আর কয়দিন ? বড় কাজি আঙুলের কড়ে গুনে বের করতে চেষ্টা করেন। লোকজন এখনও দাঁড়িয়ে আছে উঠোনের এক কোণে। দাওয়া থেকে নিচে নেমে সেদিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে তিনি আদেশ করেন, ‘তুমরা আর দাঁড়ায়ে কেন ? বাসায় যাও। অযথা হাঙ্গামা কইরো না।’
‘কী হইছে হুজুর ছুয়ালডার ? জিনে কি কথা বলিছে ?’
খেজুর পাতার পাটিতে বসে থাকা শ্যাটাপ তখন বলে, ‘তুরা কী জানতি চাস, আগোইয়ে আয়। বুঝায়ে বলি।’
অনেকেই চুপ করে থাকে। সামনে আগানোর সাহস করে না। তরুণ ছেলেটির কণ্ঠে যেন বিদ্রƒপ খেলা করে যায় একটা, ‘ভয়ে মুইতে দিচ্ছিস নাকি একেকজন ? কাছে আয় কলাম। আয় তুরা।’
আহ্বানটি শুনে লোকজন এই পচা গরমেও হয়তো শীতলতা অনুভব করে। তড়িঘড়ি করে তারা মোমেনাদের উঠান ছেড়ে বাইরের রাস্তায় গিয়ে পড়ে। কেউ বলে, ‘শ্যাটাপরে ধরিছে এক বুইড়ে পিচেশ’, কেউ বলে, ‘শ্যাটাপের চিহারা নষ্ট করে দিছে শইতানে আর সকালের মধ্যিই দেখপি ওর মাথায় এখ্যান শিং গজায়ে গিছে। কেউ আশ্বস্ত করতে চায় যে জিনটা ভালো না হলে ঐ রকম টানা কুরান কি পড়ে যেতে পারত ? বাসায় ফিরতে ফিরতে কাঁচা মাটির রাস্তা থেকে অদূরের নদীর দিকে তাকায় অনেকে। গাছপালার আধিক্য সেখানে অন্ধকারকে জমাট বাঁধিয়ে রেখেছে থোকায় থোকায়, কিন্তু মনে হয় যেন ওগুলো ভয়ানক কোনও জন্তু।
রশিদ কবিরাজ আসে আরও অনেকক্ষণ পর। পিছে পিছে মোমেনা। বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে একটু ঝিমানো ভাব ধরে গিয়েছিল বড় কাজির। রশিদের ডাকে তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চান যে সজাগ আছেন।
‘রশিদ আসিছিস ?’
‘জি হুজুর।’
‘কী অবস্থা ছুয়ালডার পায়ের দেখদিন।’
‘দেখিছি হুজুর। পায়ে ওষুধ লাগায়ে পট্টি বাইন্ধে দিয়া লাগবে। হাড় ভাঙ্গিনি। মচকাইছে।’
রশিদ সময় নিয়ে শ্যাটাপের পায়ে পট্টি বাঁধে। উপকরণ কলার মোচা, ট্যালকম পাউডার, আর সুতির ব্যান্ডেজ। ব্যথা কমার জন্য একটা আরকের বোতল মোমেনার হাতে দিয়ে বলে, ‘সব মিলায়ে চার টাকা দিস কিন্তু।’
বড় কাজি হাত নাড়েন, ‘টাকা কাইল নিস আমার থেকে।’
রশিদ হাত উঁচিয়ে সালামের ভঙ্গি করে ‘আমি যাই তালি।’
‘যা। সকালে আইসে কিন্তু দেইখে যাবি। গরিবের ছুয়াল। এইটে তোর দায়িত্ব কিন্তু।’
‘জি হুজুর, আমি খিয়াল রাখব।’
সোবহানের জন্য আরও কিছুক্ষণ বড় কাজি মোমেনাদের বারান্দায় বসে থাকেন। শ্যাটাপ তখন অনবরত বকবক করছে। অসংলগ্ন সব কথা, যার কোনও পরিষ্কার মানে হয় না। তিনি ওর পিঠে হাত রেখে বলেন, ‘ঘুমায় যা বাপ। ঘুম পায় না ?’
‘রক্ত না খালি ঘুম হয় না আমার।’
‘তুই রক্ত খাবি কেন ? তুই কি পিচেশ ?’
‘আমি খিমরাউল।’
‘কুথায় তোর বাসা ?’
‘কুকাফ শহর আমার ঠিকানা।’
‘সেইখেনে ফিরে যা খিমরাউল। এই গিরামে এই ছুয়ালের সাতে তোর কী কাজ ?’
‘কাজ মেলা। তা তোরে আমি বলব না। রক্ত আইনে দে। নাহলি আমি শান্ত হব না।’
বড় কাজি আয়াতুল কুরসি পড়ে আবার ফুঁ দেন শ্যাটাপের গায়ে। মুখটা শ্যাটাপের কানের কাছে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে হুঁশিয়ারি করেন, ‘কাল সন্ধ্যায় আমি আবার আসপো। তুই যদি তখনও এইখেনে থাকিস, তোরে দেইখে নেবে এই কাজির বেটা।’
মুখ দিয়ে কুৎসিত একটা শব্দ করল তখন শ্যাটাপ অথবা খিমরাউল। বলল, ‘কাল সন্ধ্যায় তুই এইখেনে আসতি পারবি ? তুই নিজের খিয়াল রাখিস আগে, যা যা।’ অকস্মাৎ এক অট্টহাসির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল তখন। মোমেনা কাঁদতে শুরু করল আবার। তবে ব্যাপারটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। হাসতে হাসতে হয়তো ক্লান্ত হয়েই শ্যাটাপ শুয়ে পড়ে। মোমেনা যখন তার মাথার নিচে একটা বালিশ এনে রেখেছে, বড় কাজি উঠে দাঁড়িয়েছেন।
‘আমি যাই রে মোমো। আসবানি কাইলকে ফিরে।’
‘হুজুর, ছুয়ালডা সুস্ত হইয়ে যাবেনে তো ?’
‘যাবে কলাম না ? চিন্তা করিস না।’
সোবহান হয়তো বাসায় চলে গেছে এসব ভেবে বড় কাজি টর্চের আলো ফেলেন বড় রাস্তায়। অনেক দিন ধরেই শুনছেন ইট বিছানো হবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়ে গেছে প্রায় দুই বছর হতে চলল। উন্নয়নের কোনও নাম নিশানা নেই। উঁচু মাটির রাস্তাটা সোজা চলে গেছে অনেক দূর, তারপর ঘুরে তার বাড়ির পথের দিকে বাঁক নিয়েছে। রাস্তার দুই পাশের সরু গাছগুলো বাতাসে নাচানাচি করছে। হাওয়া এতক্ষণ ছিল না, এখন প্রচুর। কাছেই নদী। সেদিকে তাকিয়ে তারও মনে হয় আসনগুড়ি দিয়ে একপাল জন্তু বসে আছে নদীতীরে, কাছে গেলেই যেন ঝাঁপিয়ে পড়বে। বেশিদূর তখনও এগোতে পারেননি, এমন সময় শুনলেন শ্যাটাপ আবার সুরা কাহাফ পড়ছে, আগের চেয়েও উঁচু তানে, টেনে টেনে।
…এরপর সে আরেক পথ ধরল। চলতে চলতে সে দু পাহাড়ের মাঝে এসে পৌঁছল। সেখানে সে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল। যারা কথাবার্তা কমই বুঝতে পারে। তারা বলল, ‘হে যুলক্বারনায়ন! ইয়াজুজ মা’জুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে, অতএব আমরা কি আপনাকে কর দেব যে, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে একটা বাঁধ নির্মাণ করে দেবেন ?’ সে বলল, ‘আমাকে আমার প্রতিপালক যা দিয়েছেন তা-ই যথেষ্ট, কাজেই তোমরা আমাকে শক্তি-শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক সুদৃঢ় প্রাচীর গড়ে দেব। আমার কাছে লোহার পাত এনে দাও।’ শেষ পর্যন্ত যখন সে দু পাহাড়ের মাঝের ফাঁকা জায়গা পুরোপুরি ভরাট করে দিল সে বলল, ‘তোমরা হাপরে দম দিতে থাক।’ শেষ পর্যন্ত যখন তা আগুনের মতো লাল হয়ে গেল তখন সে বলল, ‘আনো, আমি এর ওপর গলিত তামা ঢেলে দেব।’
অনুমানে তিনি বুঝতে পারলেন রাত নয়টার মতো বাজে। এশার জামাতটা ধরতে পারেননি এতে মন একটু খারাপ হলো। এখান থেকে মসজিদে নামাজ সেরে বাজার হয়ে তারপর ফিরবেন নাকি সরাসরি বাড়ি যাবেন এ নিয়ে ভাবলেন একবার। বড় রাস্তা ধরে তার বাড়ির পথ বেশ কিছু সময়ের ব্যাপার। হাতে যেহেতু টর্চ আছে, তিনি ভাবলেন গনুর বাগানের ভিতর দিয়ে যাবেন। এতে রাস্তা খাটো হয়ে আসবে। গনুর বাগান ভরা শালগাছ, বড় বড় শালপাতা বিছিয়ে ছড়িয়ে আছে বনের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু পথের ওপরেও। মচমচ শব্দ হয় ওর উপর দিয়ে হেঁটে গেলে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে অপুষ্ট চাঁদও দেখা যায় আকাশে, সেদিকে একবার চেয়ে বড় কাজি বলেন, ‘সুবহানাল্লাহ।’ তখন আধো অন্ধকারে দেখতে পান সোজাসুজি তার উল্টোদিক থেকে একটা কেউ এগিয়ে আসছে। প্রথমে ভয় পেলেও দ্রুতই ভয়টা কাটিয়ে ওঠেন তিনি, জানতে চান, ‘কিডা আসতিছ ?’ ছায়ামূর্তির দিকে তিনি টর্চের আলো ফেলেন, কিন্তু বুঝে ওঠার আগেই ওটা তার অনেক কাছে চলে আসে। বড় কাজি খুব একটা শব্দ করার সুযোগ পান না।
পরের দিন আলো ফুটতে না ফুটতেই সারা গ্রামে খবরটা ঝোড়ো হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ল, ‘বড় কাজিরে জিনে তুইলে নিয়ে গেছে।’ কারণ শ্যাটাপের জিন তাড়াতে সেই যে তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন, আর ফেরেননি। কোথাও যেন ছিলেনই না লোকটা কখনও। কাজিবাড়ির রকে বসে মোমেনা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানায়, ‘হুজুর মেলাক্ষণ ছেলেন আমাইগে বাড়িতি। শ্যাটাপরে ঘুম পাড়াই দিয়ে উনি বাইরোইছেন। আর কিছু আমি জানিনে। কী হইয়ে গেলো, হুজুর কুয়ানে চইলে গেছেন বোঝলাম না গো…’ কান্নার রোলটা সারা বাড়িতেই ঝমঝম শব্দ করতে থাকে, পাড়ার লোকজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে তা শোনে, এ ছাড়া কী করবে তারা ভেবে পায় না। বৃদ্ধ একজন মানুষ, সবার এমন সম্মানের পাত্র, এইরকম গভীর রাতে গ্রাম থেকে যে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন, অবিশ্বাস্য হলেও সবার মনে হয় বড় কাজিকে জিনে ছাড়া আর কিসে নেবে ? সারা জীবন কম জিন তিনি তাড়ান নাই, এই অশরীরী শক্তির সঙ্গে আজীবন লড়েছেন। কত দূর দূর থেকে লোকজন আসত তদবির নিয়ে, আর কাজি সাহেব তো ছুটেও যেতেন। এই দীর্ঘ সংগ্রামে সেই মহাশক্তিধর গায়েবি প্রাণিদের কারও সঙ্গে কি তার শত্রুতা হয়ে থাকবে না ? এ কাজ জিনেরই, আর কারও নয়।
শ্যাটাপকে দেখতেও লোকজনের ভিড় বেড়ে যায়। অনেকে ধরেই নেয় যে কাজি সাহেবের এই অন্তর্ধানের পিছনে শ্যাটাপকে আছর করে থাকা গায়েবি শক্তিটিরই হাত আছে। কেননা প্রতি রাতে ছেলেটির প্রলাপের মাত্রা বাড়তে থাকে, সে জানায় তার রক্ত দরকার, নইলে রাতে ঘুমাতে পারছে না। সপ্তাহখানেক পরে রশিদ কবিরাজ যখন তার পায়ের পট্টিটা খোলে, সবাই দেখতে পায় যে ফোলাটা কমে গেলেও কেমন একটা কুৎসিত বক্রতা দখল করে নিয়েছে জায়গাটা। বিছানায় শুয়ে থেকে সে রশিদ কবিরাজকে গাল পাড়ে, ‘শাউয়োমারানির ছুয়াল, আমার পা খান নষ্ট কইরে দিলি।’
গ্রামের বাতাসে কিরকম একটা চাপা আতঙ্ক ভেসে বেড়াতে থাকে। ফজরের জামাতে মুসল্লির সংখ্যা কমে যায় মসজিদে, এশার ওয়াক্তেও একই অবস্থা দাঁড়ায়। চন্দনীমহল বাজারে সন্ধ্যার পর আর তেমন লোকজন দেখা যায় না, বিশেষ করে অনেক দূর থেকে যারা আড্ডা মারতে আসত। কেননা বাড়ি ফেরার পথে তাদের কপালেও যে দুর্যোগ নামবে না, এই নিশ্চয়তা মেলে না কোথাও।
এমন চাপা আতঙ্কের দিনগুলোতেই এক রোদে গাঁগাঁ করতে থাকা বেলা এগারোটায় সবাই জানতে পারে ভৈরবের কয়েক মাইল উত্তরে শিরোমণির ঘাটে এক বৃদ্ধের লাশ পাওয়া গিয়েছিল সাত-আট দিন আগে। এই লাশ বড় কাজি ছাড়া আর কারও কি হতে পারে ? সেই দুপুরেই একটা তিন চাকার ভ্যানে বড় একটা কাঠের বাক্স প্রবেশ করে, পিছনে আরেকটি ভ্যানে থানার দুজন হাবিলদার। লোকজন একটা মিছিলের মতো করে সেই বাক্সটির পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করলে টের পায় বাতাস ভরে উঠেছে কিরকম একটা ওষুধ আর মাংসপচা দুর্গন্ধে। কাজিবাড়ির ব্যক্তিগত গোরস্থানে খুব দ্রুতই বাক্সটিকে কবরস্থ করা হয়।
ভুলে যেতে চাইলেও এমন অলৌকিক মৃত্যুর বিষয়টি ভুলে যাওয়া খুব কঠিন লাগে সবার। তাই গল্প থামে না। বরং আরও ডালপালা ছড়ায়। গনুর বাগানে ভোরে বা সন্ধ্যায় অনেকেই বড় কাজিকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে এটা নিশ্চিত করে। আর তাদের স্মৃতিতে আরও বড় একটা দাগ রেখে যায় নতুন একটি ঘটনা। কাজি সাহেবের বড় ছেলে হালিমুদ্দিন গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে এক শনিবার দুপুরে, কেন তা কেউ বুঝে উঠতে পারে না, কেননা সে কাউকে কিছু বলে যায়নি বা লিখে রেখে যায়নি। কিন্তু অনেক কিছুই অনেকে অনুমান করতে পারে। তবে মোমেনা, যে এক সময় কাজিবাড়ির বিশ্বস্ত কাজের মানুষ ছিল, সেই মোমেনার ছেলে শ্যাটাপের জিনের আছর কাটে না। কোনও কোনও গভীর রাতে পাড়ার লোকজন শুনতে পায় অনবরত কেউ কুরআন পড়ে যাচ্ছে। তারা বোঝে এটা ল্যাংড়া শ্যাটাপের কণ্ঠ, কিন্তু কী সে পড়ে আর কেনোই বা পড়ে বোঝে না কেউ।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



