আর্কাইভগল্প

কসাই : রেহেনা মাহমুদ

প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প

শুরু শুরুতে বিউটির মাথায় অন্য খেলা চলছিল। এই যে দিনের পর দিন বিহারি কসাই লোকটার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, এমনটা হবার কথা ছিল না। বড়জোর সপ্তাহ খানেক। সেটি এখন পক্ষকাল পেরিয়ে মাসের পর মাস পেরোচ্ছে।

মোবারক বিউটিকে নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে বছরখানেক হলো। উঠেছে ঝাউতলা রেল স্টেশনে। ঝাউতলা রেল স্টেশনে নতুন-পুরনো-কাঁচা-সেমি পাকা-পাকা নানা কিসিমের ঘর আছে। আছে অনেক কলোনি। বিশ-তিরিশটা ঘর নিয়ে লম্বা লাইনের এক-একটি কলোনি। ছোট, ছোট এক বা দুই কামরার। একটাই রান্নার ঘর, একটাই বাথরুম। সবাই মিলে ব্যবহার করে। ঝগড়া ফ্যাসাদ সেখানে নিত্যদিনের ব্যাপার।

শিক্ষিত নেই, তা নয়। তবে তারা অপেক্ষাকৃত ভালো কলোনিতে থাকে। এখানে বেশির ভাগই দিনমজুর। এমনকি চোর, ডাকাত, খুনিও। মোবারকও জেল পালানো আসামি। কুষ্টিয়া কারাগার থেকে পালিয়ে এখানে উঠেছে। রেল স্টেশনে কাজের অভাব নাই। লুকানো যায় সহজে, পালানোও। হুট করে রেলে উঠে গেলেই হয়। তাছাড়া কাজেরও সুবিধা। কোনও না কোনও কাজ জুটেই যায়। তাই মোবারক রেল স্টেশনের আশেপাশে থাকাই পছন্দ করে সব সময়।

আসার সময় বিউটিকেও ধরে নিয়ে এসেছে সে। বিউটি সুন্দর না, তবে ওর ভেন্দা মার্কা চেহারায় অত্যাচার করে মোবারক যে সুখ পায় সেটি কোনও সুন্দরী বেশ্যার কাছেও পায় না। বিউটি কয়েকবার পালালেও মোবারক ঠিক  খুঁজে বের করে ফেলে।

দিনে মোবারকের কাজ নেই। সারাদিন মরার মত ঘুমায়। ওর সব কাজ রাতের। এখানে আসার পর বিউটি দুটো বাসায় কাজ নিয়েছে। সকালেই বেরিয়ে যায়। ঝাউতলা বাজার ফেলে মিনিট পাঁচেক হেঁটে পাহাড়িকা আবাসিকে।

সেদিন যেদিনটায় তার মনে ঝড় বইছিল, উসকোখুশকো চুল আর গালে শুকোনো কান্নার দাগ নিয়ে বেশ সকাল সকালই কাজে বেরিয়ে বাজারে বিহারি কসাইয়ের দোকানের পাশে, যেখানে গরু জবাই হচ্ছিল, হঠাৎ সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। বিহারি তখন গরু জবাইয়ে ব্যস্ত। সহযোগী দুজনের সাহায্যে গরুটাকে রশি দিয়ে বেঁধে চিৎপটাং করে শুইয়ে ফেলেছে সে ইতিমধ্যে। একটা ছুরির সঙ্গে আরেকটা ছুরি লাগিয়ে শান দিতে দিতে গরুর গলায় ‘আল্লাহু আকবার’ বলে পোচও বসিয়ে দিয়েছে। বিউটি দেখে গরুটার সারা শরীর প্রচণ্ডভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

গরু জবাইয়ের এ দৃশ্য প্রতিদিনই কাজে যাবার পথে দেখা হয়েই যায়। কিন্তু কখনও ভালো করে দেখা হয়নি গরুর এই বড় শরীরটাকে কেমন ধরাশায়ী করে জবেহ করে ফেলা হয়। কেমন ফ্যালফ্যাল করে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে গরুটা, আজ  মরা চোখে দেখেও শিউরে ওঠে বিউটি।

বিহারি এর মধ্যে আবারও গরুটির কণ্ঠনালিতে ছুরি ঢুকিয়ে চিরে দেয়। ফিনকি দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এসে বিহারির পুরো হাত মুখ ভিজিয়ে দেয়। কী বীভৎস!

সারাদিন কাজের ভেতরে থেকেও বিউটির চোখ থেকে সে দৃশ্য সরে না। কিন্তু সে ভয়ংকর দৃশ্যের পাশাপাশি তার মনে আরেক দৃশ্যেরও তৈরি হয়। আর সেদিনই সে সেই রোমহষর্ক পরিকল্পনা করে। সে রাতে তার আর ঘুম হয় না। সারারাত ছটফট করতে থাকে। পরদিন সকালে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবার যায় বিহারির দোকানের সামনে গরু জবাইয়ের আগেই। পরদিন আবার। এভাবে চলতে থাকে।

বিউটি প্রতিদিন উত্তেজনা নিয়ে বিহারির গরু জবাই দেখে। দুইজন ছোট ছোট ছেলে নিয়ে কীভাবে সে গরুটাকে পাইট করে, মোটা রশি দিয়ে সামনের দুই পা আর পেছনের দুই পা বেঁধে একসঙ্গে এনে গরুর শরীরটাকে বাঁকিয়ে শক্ত করে বেঁধে  কাত করে মেঝেতে ফেলে। এরপর গরুটার পেটের ওপর একজন বসে লেজটাকে পায়ের ভেতর দিয়ে এনে ধরে রাখে, আরেকজন বিহারির সঙ্গে থেকে সাহায্য করে। সব কিছু বিউটি খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।

জিহ্বার তাড়নায় এ অসহনীয় দৃশ্যও কেমন স্বাভাবিক আমাদের চোখে। চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেলে কোনও কিছুই আর গায়ে লাগে না মানুষের। বিউটির গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় ভেবে। গরুর জান বেরিয়ে যাবার আগেই চামড়া ছিলে বুকের খাঁচা বরাবর ছুরি বসিয়ে শিনার মাঝবরাবর টান দিয়ে দু ভাগ করে ফেলেছে কসাইটা কেমন নির্দয়ভাবে! ঘোৎ ঘোৎ আওয়াজ করতে করতে নিস্তেজ হয়ে যায় অতঃপর শরীরটা। আর ওদিকে কসাই বুকের পাঁজর থেকে সোজা টান দিয়ে মেরুদণ্ডের একপাশ নিয়ে ছুরিটা টেনে সোজা মাথা বরাবর নিয়ে আলাদা করে ফেলে সামনের রান। সামনের অংশের কাজ শেষ করে পেছনের রান দুটা কাটে। অণ্ডকোষ সরিয়ে রান দুটোর মধ্য দিয়ে চিরে ওপর দিকে নিয়ে আলাদা করে ফেলে পেছনের রান দুটা। এভাবে চারটা রানই আলাদা হয়ে গেলে ভুঁড়ি আলাদা করে, কলিজা কাটে, পিত ফেলে সুনিপুণভাবে।

ধীরে ধীরে বিউটির যেন নেশা ধরে যায়, চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে তার পরিকল্পনার আগাম সাফল্যে।

বিহারির ছেলেরা দোকানে রানগুলো ঝুলিয়ে দিলে গরম গরম রক্তে বিহারি হাত ধুয়ে টাটকা মাংসগুলোকে  টুকরো টুকরো করে রাখে। বিহারিরা ভোজনপ্রিয়। মুসলমানরাও মাংসখেকো। এ এলাকায় বিহারি আর মুসলমানদের সংখ্যা বেশি। তাই বেচা বিক্রি হতে সময় লাগে না।

শুরুতে কিন্তু প্ল্যান এমন ছিল না। গোটা এক সপ্তাহ ধরে বিহারির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও সে করে। একটা চুক্তি করতে চায়, কিন্তু পারে না বোঝাতে। সামনে গিয়ে কেবল আমতা আমতা করে। ওর অস্পষ্ট  কথাকে বিহারি পাত্তাই দেয় না। ছেই ছেই করে বরং তাড়িয়ে দেয়। ভাবে গরিব, মাংসের লোভে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু বিউটি হাল ছাড়ে না। আসতেই থাকে, প্রতিদিনই।

 মোবারকের সারা রাতের অত্যাচার ভুলে যায় সে এখানে এসে। ভুলে যায় মোবারকের অক্ষম আক্রোশে লিকলিকে আঙ্গুলে পোকার মত সারা শরীরে কিলবিল করা। ভুলে যায় সারা শরীরে কামড়ানো রক্তের দাগ, সারারাত ব্যথায় কাতরানো চিৎকার আর মোবারকের পিশাচী হাসি―সব।

কলোনির সবাই জানে মোবারকের অত্যাচারের কথা, শোনে বিউটির করুণ কান্না। প্লাইউডের পার্টিশন দেওয়া এক একটা ঘরের খবর এক একটা ঘর জেনে যায়। টুঁ শব্দও শোনা যায় এখানে। কয়েকজন শুরুতে শুরুতে মোবারককে বুঝিয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কার বউকে কে, কীভাবে পেটালো না আদর করল, সেটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার। উলটো অনেকে পরে তাদের ব্যাপারে নাক গলাতে নিষেধ করে। বলে, তাদের মরদ যা খুশি করছে, অন্য কারও এর ভেতর আসার দরকার নাই। তাই, মেরে ফেললেও বা এখানে কার কি করার থাকে। স্টেশনের জীবন ভাসমান। এখানে অহরহ এমন ঘটে। কিছুদিন কানাকানির পর একসময় সবাই নির্লিপ্ত হয়ে যায়। কতজন হারিয়ে যায় প্রতি মাসে, কতজন নতুন আসে, কে কাকে আর অত ভালো করে চেনে-জানে!

মোবারকের কাজই শুরু হয় সন্ধ্যার পর থেকে। এখানে এসেই গ্যাং খুঁজে নিয়েছে। এরা গাঞ্জা পার্টি। নেশার আড্ডায় গিয়ে এদের পেয়েছে। সেখানেই প্ল্যান করে এরা ছিনতাই করে, কখনও কখনও আবাসিকের ফ্ল্যাটের জানালা কেটে মোবাইল চুরি করে, বাসে পকেট মারে, আদতে যা পায় তা-ই করে।

শেষ রাতের দিকে নেশা করে ঘরে ফিরে শুরু হয় মোবারকের বউ আদর। হাতকড়া পরিয়ে, মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে পেটাতে পিটাতে বেহুঁশ করে ফেলা, রক্তাক্ত করে ফেলার বিকৃত আনন্দই মোবারকের বউকে সোহাগ করা। বিউটি সয়েই গেছে এতকাল। কিন্তু এবার জেল থেকে পালিয়ে মোবারকের হিংস্রতা যেন দ্বিগুণ বেড়েছে।

বিউটির কাছে কিছু টাকা আছে। কাজ করে করে মোবারক থেকে লুকিয়ে এগুলো জমিয়েছে। বিহারির হাতে পায়ে ধরে যেভাবেই হোক রাজি করাবে সে। বিহারি কেবল হাত-পা বেঁধে চিত করে ফেলে কল্লাটা  বিউটির দিকে ঘুরিয়ে দেবে মোবারকের। বাকি সব বিউটিই করবে। ওর ভীত সন্ত্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। যেমন করে শয়তানটা ওর কষ্ট উপভোগ করে। কসাইয়ের মতো এমনভাবে রগ কাটবে যেন শয়তানটার রক্ত তির বেগে বেড়িয়ে এসে সোজা ওর  মুখে পড়ে। বিউটি ওর রক্ত দিয়ে গোসল করতে চায়।

এহেন নানা রকম পরিকল্পনা করতে করতে বিউটি কল্পনায় যেন বাস্তবের বিহারি কসাইকেও ছাড়িয়ে যায়। কসাইয়ের গরুর সঙ্গে সঙ্গে বিউটি মোবারককেও টুকরো টুকরো করতে থাকে দারুণ দক্ষতায়। এখন আর তার বিহারি কসাইকেও প্রয়োজন নেই।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button