অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

বিশ্বসাহিত্য : অনুবাদ গল্প : এসবই ঘটে : মূল : কুনজাং কোডেন

বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন

[কুনজাং কোডেন ভুটানের বিখ্যাত নারী লেখক। তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালে। লেখেন ইংরেজি ভাষায়। লেখাপড়া করেছেন ভারত ও আমেরিকায়। ভুটানের লোককথা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে তিনি লেখেন। ছোটগল্প, শিশুতোষ রচনা ও উপন্যাস লিখেছেন। নারীবাদী লেখক হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন। অনূদিত গল্পটি তাঁর দিজ থিংস হ্যাপেন নামক ছোটগল্পের বাংলা ভাষান্তর।]

ও ওর সঙ্গীর ওপর দিয়ে তাকিয়ে ঘরটার চারপাশ সে ভালো করে দেখে নিল। এবার মুখের চারপাশে গোল করে তালু দুটো পাকিয়ে নিয়ে ওর সঙ্গীর সাগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকা কানের কাছে মুখটি নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বাচ্চাটাকে দেখতে অফিসারের মতো লাগছে। ওর কথা কি তোমার মনে নেই ? ঐ যে লোকটা, যে প্রায় দেড় বছর আগে আমাদের গ্রামে এসেছিল ?’

‘বুঝতে পারছি, তুমি কার কথা বলছ। ঐ যে সেই লোকটা যে সবসময় কালো রোদচশমা পরে থাকত,’ ওর পুরা গল্প শোনার জন্য অধৈর্য হয়ে পড়া সঙ্গীকে আশ্বস্ত করার জন্য কথাগুলো বলল।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই লোকটাই তো। তুমি কি জানো, ওর বাবা-মা কী করেছিল ? ওরা বলেছিল, ঐ মেয়েটার বর্তমান ছেলেবন্ধুই নাকি ঐ বাচ্চাটার বাবা। বাচ্চাটার ভরণপোষণের জন্য ওরা ওর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। অবশ্যি ওরা ঐ অফিসারের টিকিটাও স্পর্শ করতে পারেনি।’

বুঝতে পেরে ওর সঙ্গী মাথা ঝাঁকালো। ‘ও, তাহলে ব্যাপারটা সাজানো। বেশ। এমনটাই সচরাচর ঘটে।’ পান চিবায় আর জিহ্বাটা মুখের এদিক ওদিক গড়ায়। তারপর বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে ফেলে। এই দুজন বয়োবৃদ্ধ মহিলা গ্রামের একেবারে সর্বশেষ ঘটনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে একরকম হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। গল্পে গল্পে সবকিছু ওরা অতিরঞ্জিত করে ফেলে। তবে ওদের কথায় যে কোনও সত্যতা নেই, তা কিন্তু নয়। চুলে মেহেদি লাগানো আর চোখে ধরার মতো লম্বা ও সুন্দর একটি মেয়ে এখন ওদের গল্পের বিষয়। মেয়েটি গ্রামের আর সব মহিলার সঙ্গে নেচেছিল। বেশ স্মার্ট, সুশ্রী। আঙ্গিনা এবড়োখেবড়ো হলেও উঁচু তলাবিশিষ্ট জুতা পরে নেচে সে সবাইকে জমিয়ে দিয়েছিল। বেড়াতে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্মানে মহিলারা অবশ্য নাচে অংশগ্রহণ করছিল। দেড় বছর পূর্বে তাসি জাংমো স্থানীয় একটা স্কুলে পড়ত। দেখতে-শুনতে আহামরিও ছিল না, উচ্চাভিলাষীও ছিল না। পড়াশুনা শেষ করে সে একটি রোমান্টিক ও সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখত। এলাকার সচ্ছল মহিলাদের দেখে সে উৎসাহ পেত। যে মহিলারা ধনে-ধান্যে, ঐশ্বর্য্যে সমৃদ্ধ, তাদের জীবন-যাপন পদ্ধতি তাসি জাংমোর কাছে আদর্শ মনে হতো। যেসব রোমান্টিক সিনেমা সে দেখত সেগুলো থেকে দৃশ্য নিয়ে কল্পনার জাল বুনত। স্বপ্ন দেখত―তার এমন এক যুবকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে যে তাকে এ রকম একটি রোমান্টিক জীবন উপহার দেবে। আজ থেকে দেড় বছর আগে বেড়াতে আসা একদল গণ্যমান্য অতিথির সম্মানে সে গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে নৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল। তখন সবাই ওর স্বভাবসুলভ সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিল। বিশেষ করে রোদচশমা পরা অফিসার ছিলেন ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাত্র এক রাত সে ওই অফিসারের সঙ্গে রোমান্স করে। ফলে তাসি জাংমো গর্ভবতী হয়ে পড়ে। ভদ্রলোক বেশ উচ্চপদস্থ ব্যক্তি। তাই ব্যাপারটা তার কাছে তেমন কিছুই নয়। শুধু রোদচশমাটা খুলে হাতে নিয়ে চরম অস্বস্তিতে বলেছেন, ‘কোন মেয়েটা ?’

একটা স্কুলপড়ুয়া মেয়ে গর্ভবতী হলে তার কিছু এসে যায় না।

অফিসারের সঙ্গে তাসি জাংমোর সাক্ষাতের ঘটনা ছিল স্বপ্নের মতো। তার মতো একজন স্বপ্নচারী মেয়ে জানত, ঐ এক রাতের সহাবস্থান থেকে খুব বেশি আশা করা যায় না। ওর ছেলেবন্ধু শেরিং নামগিয়েল ছিল ওর প্রতিবেশী। বেড়ার ওপারে ওর বাসা। যখন সে ওকে বলল যে, সে গর্ভে ওর সন্তান বহন করছে, তখন শেরিং প্রমাদ গুনল। বিশ্বাস করতে পারল না। শুধু মাথাটা নাড়ল। ছেলেটির বয়স সবে বিশ। বছর কয়েক আগে স্কুল থেকে ছিটকে পড়েছে। লেখাপড়া এগোয়নি। ও বন্ধুসুলভ। লাজুক ও হৃদয়বান। স্কুলের প্রথম দিনে ও যখন শুনেছিল, যে ছেলেরা স্কুলে আসে তাদেরকে আর তাদের বাবার ক্ষেতে কাজ করতে যেতে হয় না। এরা অনেক বড় বড় কাজ করে। অফিসে কাজ করে। গাড়ি হাঁকে। দোকান চালায়। কন্ট্রাক্টরগিরি করে। ক্ষেতে-খামারে কাজ করতে যাওয়া এদের জন্য অসম্মানের। কিন্তু স্কুল থেকে ছিটকে পড়ার পর ওর ক্ষেতে কাজ করতে না গিয়ে কোনও উপায় থাকল না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ও আসলে যা প্রমাণ করার চেষ্টা করল, তা হলো―ও অন্য সব ছেলের মতো নয়। ও শিক্ষিত আধুনিক। অ্যালকোহল খায়। পশ্চিমা পোশাক-আশাক পরে। বিদেশি ব্রান্ডের চুরুট টানে। ক্যানজাত বিয়ার খায়। আর সময় পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে শহরে গিয়ে পুল খেলে। মাঝে মাঝে আবার হালফ্যাশানের ভাব ধরে। গ্লুর গন্ধ শুঁকে নেশা করে। নেশা পেয়ে বসলে ডিজেলও খেয়ে ফেলে। ওর বাবা-মা ওকে খুব ভালোবাসে। অধীর আগ্রহে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে―ছেলেটা একদিন বড় হবে। ‘বুদ্ধিশুদ্ধি হলে ছেলেটি আপনাআপনিই পথে ফিরে আসবে,’ ছেলেটার পক্ষে সাফাই গেয়ে ওরা প্রায়ই এমন সব কথা প্রতিবেশীদের বলে থাকে। সম্প্রতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেটি পারিবারিক কিছু বিষয়-আশয়ে অংশ নিতে শুরু করেছে। ‘দেখো দেখো, তোমাদের বলেছিলাম না,’ আনন্দের সঙ্গে ওর বাবা-মা সবাইকে বলে। ‘আমাদের ছেলে এখন বড় হচ্ছে। ও বেশ শক্তপোক্ত, কাজের। ওর সাহায্য ছাড়া আমরা চলব কীভাবে ?’

ইউনিফর্ম ঠেলে পেটটা বেরিয়ে আসতে শুরু করলে তাসি জাংমো স্কুল ছেড়ে দিল। স্কুলের সবাই ওর ওপর ক্ষ্যাপা। সাহস তো কম নয়। এই বয়সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে সে স্কুলের নাম-ধাম সব ডুবিয়ে দিয়েছে। স্কুলের কর্তাব্যক্তিরা একটা মিটিং-এ বসলেন। কয়েকজন শিক্ষক বললেন, তাঁরা জানতেন, মেয়েটি দুষ্টু। কেউ কেউ বললেন, তাঁরা নাকি মেয়েটিকে ক্লাসের ছেলেদের চোখ মারতে দেখেছেন। কেউ কেউ আবার বললেন, ওর পোশাক-আশাক যৌনআবেদন উদ্রেককারী। ‘ও বইপুস্তকের চাইতে নিজের চেহারার প্রতি অধিকতর বেশি মনোযোগী।’

এরপর জংক্ষ্যা ভাষাশিক্ষক, যিনি নিজেকে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অভিভাবক মনে করেন, তিনি একটি বিখ্যাত প্রবাদ আওড়ালেন, ‘উদাসীন বাবা-মা এবং শিক্ষক সমান অযোগ্য।’ ইংরেজির শিক্ষকও কম যান না। তিনি বললেন, ‘ঝুড়ির সব আপেল পচিয়ে দিতে একটি পচা আপেলই যথেষ্ট।’ এত সব ভারী ভারী কথা এবার পুঞ্জিভূত হলো একক সিদ্ধান্তে। সর্বসম্মতিতে তাসি জাংমোকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হলো। ও কয়েকদিন কান্নাকাটি করল। কেউ ওকে সান্ত্বনা দিতে পারল না। নিজে অপমানিত বোধ করল। নিজের ওপর করুণা হলো। অঝোর ধারায় অশ্রুপাত করল। বাবা-মার বকুনি শুনলেই ওর দু চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। বাবা-মা বলে, ‘আহা, বেচারা। ওর কী-ই বা করার আছে। শত হলেও শরীর তো।’

শেরিং নামগিয়েল এবার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো। কয়েক দিন অন্তর্যাতনায় ভুগে অবশেষে ঠিক করল, সে তাসি জাংমোকে বিয়ে করবে। ওর বাবা-মাও সম্মতি দিল। ওরা অবশ্য বেশ খুশিই হলো। তরুণ-তরুণীরা বিয়ে করবে―সেটিই তো স্বাভাবিক। অন্যদিকে তাসি জাংমো তখনও স্বপ্নের ভেলায় ভাসছে। যে ছেলেটির ভবিষ্যতে কৃষক না হয়ে কোনও গত্যন্তর নেই, সে তো তার স্বপ্ন পূরণের সারথি হতে পারবে না। তবে একটি ব্যাপারে সে অনড়। সেটি হলো―তার গর্ভের সন্তানের পিতা শেরিং নামগিয়েল। সে তাকে অবশ্যই বিয়ে করবে না। ওর বাবা-মারও একই মত। যে ছেলেটা মদ, গাজা, ভাংসহ সব নেশাজাতীয় দ্রব্য খায় এবং যার সামনে কৃষক হওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই, সে তাদের মেয়ের যোগ্য হতে পারে না। গ্রামের মাতবরের উপস্থিতিতে সালিশের পর শেরিং-এর বাবা-মা সম্মত হলো যে, সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্য ওরা তাসি জাংমোকে কিছু টাকা দেবে। ‘এখনও আমরা ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী। আমাদের বন্ধুত্বকে সম্মান করতে দাও। আমাদের প্রতি কঠোর হবে না, আশা করি। বাচ্চার জন্ম হলে লজ্জায় আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব না। বাচ্চাটার দাদা-দাদি হিসেবেই আমরা থাকব,’ শেরিং-এর বাবা-মা কাচুমাচু হয়ে বলল।

তাসি জাংমোর বাবা-মা বলল, ‘যেহেতু আমরা ভালো প্রতিবেশী, তাই তোমাদের বচ্চাটার ভরণ-পোষণের ব্যয় বাবদ এককালীন পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি জানাই। আমরা জানি, তোমাদের প্রতি মাসে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আগামী আঠার বছর তোমাদের প্রতি মাসে বিরক্ত না করে একবারে টাকাটা দিলেই ভালো হয়।’

হাঁ, ওদের পরিবারের কেউ তো চাকরি করে না। মাসে মাসে বেতনও পায় না। তাহলে মাসে মাসে টাকা দেবে কোত্থেকে ?

এই দুই পরিবার পাশাপাশি বসবাস করার সুবাদে ভালো বন্ধু ছিল। এখন এরা কেবল বন্ধু। একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করার জন্য এদের যে দুঃখ বা যাতনা, তা এরা একে অপরের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। পূর্বে এরা একটা যৌথ পরিবারের মতোই ছিল। একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যেত। খাবারসামগ্রী বিনিময় করত। এখন এরা নিজেরাই বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছে। শেরিং নামগিয়েলের বাবা-মা টাকা দিয়ে দেবে বলে সিদ্ধান্ত হলো। অবশেষে ওরা একখণ্ড জমি বিক্রি করল। একটা গরু বিক্রি করল। অনাগত শিশুর ভরণ-পোষণের খরচ জোগাড় করল। জমি আর গরু বিক্রির এত টাকা একসঙ্গে দেখে ওদের খুব খারাপ লাগল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকাটা দিয়ে দিতে চাইল। গ্রামের মাতবর দুই পরিবারকে ডেকে পাঠালেন। কিছু খানাপিনার পর শেরিং-এর বাবা-মার কাছ থেকে নিয়ে মাতবর তাসি জাংমোর হাতে টাকাটা তুলে দিলেন। তারপর মাতবর শেরিং-এর বাবা-মাকে কিছু নির্দেশনা দিলেন। তাসি জাংমোর বাবা যখন নোটগুলো গুনছিল তখন ওর মা বড় বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে ছিল। নোটগুলো গণনা করার সময় শেরিং-এর বাবা-মাও ওদিকে তাকিয়ে ছিল। এতক্ষণে ব্যাপারটি একটি ব্যবসায়িক দরকষাকষিতে গিয়ে ঠেকেছে। এখন আর বাচ্চার ভবিষ্যৎ ভালোমন্দ কোনও ব্যাপার নয়। মাতবর উপযাজক হয়ে একটি চুক্তিপত্র লিখলেন। তারপর সেটি জোরে জোরে পড়ে উভয় পক্ষকে শোনালেন। নির্ধারিত স্থানে উভয় পক্ষের টিপসই নিলেন। এরপর সালিশ শেষ হলো। সালিশের রায় মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিচারকাজ শেষ হলো।

গ্রামের অদূরে এক কেতাদুরস্ত অফিসার খুব সুন্দর করে প্রস্তুতকৃত একটি লিখিত বক্তৃতা পাঠ করলেন। আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘পতিতাবৃত্তি ও গর্ভপাত বিদেশ থেকে আমদানি করা পাপ। এসব ব্যাপার যেন ঘুণাক্ষরেও তোমাদের মাথায় না ঢোকে।’ ছাত্রছাত্রীরা ভয়ে জড়সড় হয়ে কথাগুলো শুনল। অফিসার সবাইকে সাবধান করে দিলেন। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই রোদচশমাটি ঠিক করে নিলেন। হাজার হাজার চোখের সামনে দাঁড়িয়েছেন অফিসার। নিজেকে তুলে ধরলেন ঐতিহ্য আর মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে। এ কাজ এতটাই তন্ময়তার সঙ্গে তিনি করলেন যেন যাদের জীবন তিনি তছনছ করে দিয়েছেন, তাদের কথা একেবারে বেমালুম ভুলে গেলেন। তাঁর ঐতিহ্য-জ্ঞান ও মূল্যবোধ পুঁথিগত। তাঁর বক্তব্য এখন অন্তর্জালের শিরায় শিরায় ঘুরছে।

তিন বছর চলে গেছে। তাসি জাংমোর সন্তান ওর নানির কোলে বসে আছে। হাসছে। আনন্দের সঙ্গে ওর মার নাচ দেখছে। মা আর নানির চোখে বাচ্চাটা বেশ সুস্থ, দেখতে শুনতেও বেশ। নানি যখন কথাগুলো ভাবে তখন আনন্দে তার মনটা নেচে ওঠে। তরুণী মা গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে নৃত্য করে। চুলে নতুন করে মেহেদির রং লাগায়। উঁচু হিলের জুতা কিছুটা ক্ষয়ে গেছে বটে, তবু সে নাচে আর স্বপ্ন দেখে। রোমাঞ্চের কথা ভাবে; সুদিনের কথা ভাবে।

বয়স বাড়তে থাকা নানি আর মা ফিসফিস করে গল্প করে।  চাপা হাসি দেয়। একজন বলে, ‘জারজ সন্তানরা যে প্রতিশোধ নেয়, সে ব্যাপারটি কিন্তু লোককথা অনুযায়ী সত্য।’

কিছুটা বিব্রত হয়ে অপরজন জিজ্ঞেস করে, ‘কী বুঝাতে চাচ্ছ ?’

‘এ কথা বলিস না যে, তুই বুঝিস না ? আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, জারজ সন্তান নাকি তার বাবার গুণ পায়। বাচ্চাটা দিন দিন অফিসারের মতো দেখতে হয়ে উঠছে। ওর চোখে একটা রোদচশমা পরিয়ে দে। দেখবি, ঐ অফিসারের চেহারার সঙ্গে ওর কোনও পার্থক্য নেই।’

ওরা মুখ টিপে হাসে। একে অপরকে কনুই দিয়ে আলতো করে টোকা দেয়।

‘তিন বছরেরও বেশ আগে তাসি জাংমো ছিল বেশ আবেদনময়ী। সবার আকাক্সক্ষার পাত্রী ছিল সে। লোকজন এখন বলে, এ বছর ওই মেয়েটা সবার পছন্দের।’ মহিলাটি সুপারির ছাল ছাড়াতে ছাড়াতে তাসি জাংমোর মেয়েকে ইঙ্গিত করে। বুড়িয়ে যাওয়া চোখ গিয়ে থিতু হয় নাদুস নুদুস মেয়েটির ওপর। মেয়েটি গান গায়। নাচে। নতুন কোনও অতিথির জন্য।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button