বিদ্রোহী কবিতার ছন্দ : আবিদ আনোয়ার
প্রচ্ছদ রচনা : সময়ের শব্দস্বর

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। একে নিয়ে বহুকাল এতই আলোচনার ঝড় বয়ে গেছে যে, নজরুলের কবি-পরিচিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এই কবিতাটি। এর ভাবসম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর; আঙ্গিক এবং ছন্দ নিয়েও কম হয়নি। অথচ গবেষকদের অপ্রসর পর্যবেক্ষণের ফলে এই কবিতার ছন্দ নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ঘটে চলেছে―কেবল এই সত্য উদ্ঘাটনের নিমিত্তেই আমার এই ক্ষুদ্র লেখাটির আয়োজন।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকের কবি ও প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর ‘ছন্দ’ নামের বইতে লিখেছেন বাংলা ছন্দের ইতিহাসে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাই ‘মুক্তক মাত্রাবৃত্ত’ ছন্দের প্রথম দৃষ্টান্ত। তথ্যটি ভুল এবং এই ভুলের মূলেও রয়েছে অন্যদের মতোই তাঁর অপ্রতুল জরিপ ও পর্যবেক্ষণ। তিনি লিখেছেন:
“বাংলা ছন্দে নজরুল ইসলামের নিজস্ব কোনও দান আছে কি ? একালের অন্তত একজন বিখ্যাত কবি-সমালোচক-ছান্দসিক শঙ্খ ঘোষের চমৎকার ছন্দোদর্শী বই ‘ছন্দের বারান্দা’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, মাঘ ১৩৮২) পড়ে তা মনে হয় না…শঙ্খ ঘোষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে বিষ্ণু দে পর্যন্ত কয়েকজন কবির ছন্দ ব্যবহার পরীক্ষা করে দেখেছেন। এমনকি তাঁর আলোচ্য হয়ে ওঠেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও, যিনি ঠিক কবি বলে পরিচিত নন, কিন্তু বইয়ের ভিতরে বা ভূমিকায় নজরুলের নাম পর্যন্ত অনুল্লিখিত থেকে যায়। তাহলে কি বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামের নিজস্ব কোনও দান নেই ?…শঙ্খ ঘোষ অবশ্য বলেছেন যে, তিনি কোনও ইতিহাস-বই লিখছেন না….হ্যাঁ, যে প্রশ্ন তুললাম, নজরুল তাঁর কবিতার আত্মার সঙ্গে তাঁর উচ্চারণকে মিলিয়েছিলেন; আর যে-ভাবে মিলিয়েছিলেন তাতেই বাংলা কবিতার ছন্দে তাঁর নিজস্ব উপহার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। কোন পথে সে মুক্তি লেখা হয়েছিল ? ―মুক্তক মাত্রাবৃত্ত। মুক্তক মাত্রাবৃত্ত বাংলা ছন্দে নজরুল ইসলামের একান্ত নিজস্ব দান এবং তা তাঁর ব্যক্তিস্বরূপে স্বাক্ষরিত…রবীন্দ্রনাথ কি মাত্রাবৃত্ত মুক্তকে কবিতাই লেখেননি ? লিখেছিলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অনেক পরে। মাত্রাবৃত্ত মুক্তকে লেখা তাঁর যে-দু’টি কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়, সে-দু’টিই লেখা ১৪৪৩ সালে, ‘শ্যামলী’-র উৎসর্গ (রচনাকাল: ভাদ্র ১৩৪৩) এবং ‘সেঁজুতি’-র ‘যাবার মুখে’ (রচনাকাল: মাঘ ১৩৪৩)।”
উল্লিখিত দুই কবিতা থেকেই আবদুল মান্নান সৈয়দ অতঃপর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন যা আমি নিচে তুলে ধরছি। আবদুল মান্নান সৈয়দ কবিতাগুলোর পঙ্ক্তিতে অসম মাত্রার পর্ব দেখাতে মাত্রার সংখ্যা দেখিয়ে দেননি কিন্তু আমি আমার উদ্ধৃতিতে, পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে, মাত্রার সংখ্যা (মধ্যখণ্ডনসহ) দেখিয়ে দিচ্ছি:
১.
ইটকাঠে গড়া (৬) নীরস খাঁচার (৬) থেকে (২)=১৪
আকাশবিলাসী (৬) চিত্তেরে মোর (৬) এনেছিলে তুমি (৬) ডেকে (২)=২০
শ্যামল শুশ্রƒ(৬)ষায় (২)=৮ [‘শুশ্রƒষায়’-তে মধ্যখণ্ডন]
নারিকেলবন (৬)-পবন-বীজিত (৬) নিকুঞ্জ আঙি(৬)নায় (২)=২০ [আঙিনায়’-তে মধ্যখণ্ডন]
২.
যাক এ জীবন (৬)=৬
যাক নিয়ে যাহা (৬) টুটে যায়, যাহা (৬)=১২
ছুটে যায়, যাহা (৬)=৬
ধূলি হয়ে লোটে (৬) ধূলি ’পরে, চোরা (৬)=১২
মৃত্যুই যার (৬) অন্তরে, যাহা (৬)=১২
রেখে যায় শুধু (৬) ফাঁক (২)=৮
যাক এ জীবন (৬) পুঞ্জিত তার (৬) জঞ্জাল নিয়ে (৬) যাক (২)=২০
আমি ধরে নিতে পারতাম আমার এই আলোচনার পাঠক মুক্তক মাত্রাবৃত্ত কাকে বলে তা তাঁরা জানেন। তবু, নবীন পাঠকদের জন্য বলে নিই: ú্রাথমিক বিবেচনায় মাত্রাবৃত্তে রচিত কোনও কবিতার পঙ্ক্তিগুলোতে মাত্রার সংখ্যা যখন সমান-সমান থাকে, তখন তাকে সমমাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বলা হয়, যেমন―
৩.
ভূতের মতন (৬) চেহারা যেমন (৬) নির্বোধ অতি (৬) ঘোর (২)=২০
যাকিছু হারায় (৬) গিন্নি বলেন (৬) কেষ্টা বেটাই (৬) চোর (২)=২০
উঠিতে বসিতে (৬) করি বাপান্ত (৬) শুনেও শোনে না (৬) কানে (২)=২০
যত পায় বেত (৬) না পায় বেতন (৬), তবু না চেতন (৬) মানে (২)=২০
[পুরাতন ভৃত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]।পুরো কবিতায় একই ধরনের পঙ্ক্তিবিন্যাস রয়েছে; সকল পঙক্তিতে ২০ মাত্রা রক্ষিত হয়েছে; অতএব, এর পঙ্ক্তিবিন্যাস সমমাত্রিক; তাই, একে মুক্তক মাত্রাবৃত্ত বলা যাবে না।
দ্বিতীয় বিবেচনায় এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে: মাত্রাবৃত্তীয় দীর্ঘ পঙ্ক্তির সঙ্গে হ্রস্ব পঙক্তি থাকলেই সব কবিতাকে মুক্তক মাত্রাবৃত্ত বলা যাবে না যদি সব হ্রস্ব পঙ্ক্তি একটি নির্ধারিত (সুষম) বিরতির পর সমান-সমান মাপের হয় এবং সকল দীর্ঘ পঙ্ক্তি সমান-সমান মাপের হয়; একেও সমমাত্রিক মাত্রাবৃত্ত বলে ধরে নেওয়া হয়, মুক্তক বলা হয় না, যেমন :
৪.
সেদিন শারদ (৬) দিবা অবসান (৬), শ্রীমতি নামে যে (৬) দাসী (২)=২০
পুণ্যশীতল (৬) সলিলে নাহিয়া (৬)=১২
পুষ্পপ্রদীপ (৬) থালায় বাহিয়া (৬)=১২
রাজমহিষীর (৬) চরণে চাহিয়া (৬) নীরবে দাঁড়াল (৬) আসি (২)=২০
শিহরি সভায় (৬) মহিষী কহিলা (৬): এ কথা নাহি কি (৬) মনে (২)=২০
অজাতশত্রু (৬) করেছে রটনা (৬)=১২
স্তূপে যে করিবে (৬) অর্ঘ্যরচনা (৬)=১২
শূূলের ওপরে (৬) মরিবে সে-জনা (৬) অথবা নির্বা(৬)সনে (২)=২০ [‘নির্বাসনে’তে মধ্যখণ্ডন] [পুজারিনি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]।
পুরো কবিতায় একই ধরনের পঙ্ক্তিবিন্যাস রয়েছে; সব দীর্ঘ পঙ্ক্তিতে একই ২০ মাত্রা এবং নির্ধারিত (সুষম) বিরতির পরপর একই ১২-মাত্রার পঙ্ক্তি রয়েছে। অতএব, একেও মুক্তক মাত্রাবৃত্ত বলা যাবে না।
যখন মাত্রাবৃত্তীয় রচনায় পঙ্ক্তিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে অসমান থাকে তখনই জন্ম নেয় মুক্তক মাত্রাবৃত্ত। ওপরের ১ নম্বরে উদ্ধৃত প্রথম কবিতাটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ১৪, ২০, ৮ ও ২০; এই দীর্ঘ ও হ্রস্ব পঙ্ক্তির বিন্যাসে ৪ নম্বর উদ্ধৃতির কবিতাটির মতো কোনও ধারাক্রম রক্ষিত হয়নি এবং দ্বিতীয় কবিতাটির ৬, ১২, ৬, ১২, ১২, ৮, ২০ পঙ্ক্তিবিন্যাসেও কোনও সুষম ধারাক্রম রক্ষিত হয়নি; দীর্ঘ ও হ্রস্ব পঙ্ক্তি ব্যবহৃত হয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। অতএব, এগুলোর ছন্দ মুক্তক মাত্রাবৃত্ত। আরও একটি উদাহরণ:
৫.
আজি এ প্রভাতে (৬)/ রবির কর (৫)=১১
কেমনে পশিল (৬)/ প্রাণের পর (৫)=১১
কেমনে পশিল (৬)/ গুহার আঁধারে (৬)/ প্রভাতপাখির (৬)/ গান (২)=২০
না জানি কেন রে (৬)/ এত দিন পরে (৬)/ জাগিয়া উঠিল (৬)/ প্রাণ (২)=২০
জাগিয়া উঠেছে (৬)/ প্রাণ (২)=৮
ওরে (২)/ উথলি উঠেছে (৬)/ বারি (২)=১০
ওরে (২)/ প্রাণের বাসনা (৬)/ প্রাণের আবেগ (৬)/ রুধিয়া রাখিতে (৬)/ নারি (২)=২২
[নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]।এটিও মুক্তক মাত্রাবৃত্তের রচনা কারণ দীর্ঘ ও হ্রস্ব পঙ্ক্তির সমন্বয় ঘটেছে এবং দীর্ঘ ও হ্রস্ব পঙ্ক্তিগুলো কোনও সুষম ধারাক্রম রক্ষা করে বিন্যস্ত হয়নি। সে-অর্থে, উপর্যুক্ত প্রাথমিক ও দ্বিতীয় বিবেচনা―কোনও মতেই এর ছন্দ সমমাত্রিক মাত্রাবৃত্ত নয়; এর ছন্দপ্রকরণ নিশ্চিতভাবেই মুক্তক মাত্রাবৃত্ত।
শেষোক্ত কবিতাটিকে কেন্দ্র করে এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন: রবীন্দ্রনাথ মুক্তক মাত্রাবৃত্তে কবিতা লিখেছেন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পর। কিন্তু ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটির রচনাকাল ১৮৮৩ সাল এবং রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রভাতসঙ্গীত’-এ মুদ্রিত হয়েছিল, আর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচিত হয়েছে এর ৩৪ বছর পর ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে। অতএব, আবদুল মান্নান সৈয়দের দাবি―নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রথম মুক্তক মাত্রাবৃত্ত―সঠিক নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ এই গবেষকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বলেই এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তিনি।
কাকতালীয়ভাবে, বিষয়বস্তুর দিক থেকে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ এবং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। দুই কবিতাতেই বিধৃত হয়েছে কবির আত্মশক্তির উন্মোচন, সৃষ্টিশীল মানুষের অন্তরের অসীম ক্ষমতা, এবং অশুভকে দমন করার কাজে সেই শক্তি ব্যবহারের অঙ্গীকার: ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার “থরথর করে কাঁপিছে ভূধর (১১)/ শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে (১১)/ ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল (১২)/ গরজি উঠিছে দারুণ রোষে (১১)/ হেথায় হোথায় পাগলের প্রায় (১২)/ ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় (১২)…চারিদিকে মোর বাঁধন কেন ? (১১)/ ভাঙরে হৃদয়, ভাঙরে বাঁধন (১২)/ লহরীর পরে লহরী তুলিয়া (১২)/ আঘাতের পরে আঘাত কর (১১)…(আমি) ঢালিব করুণাধারা (১০)/ (আমি) ভাঙিব পাষানকারা (১০)/ (আমি) জগত প্লাবিয়া বেড়াবো গাহিয়া (১৪)/ আকুল পাগল-পারা (৮)….শিখর হইতে শিখরে ছুটিব (১২)/ ভূধর হইতে ভূধরে লুুটিব (১২)-এর সঙ্গে তুলনীয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবির ‘আমিত্ব’। আত্মশক্তি-উন্মোচনকারী অহংবোধের বিবেচনায় দুই কবিতায় একই ধরনের ভাবসম্পদ রয়েছে। পার্থক্য কেবল রবীন্দ্রনাথের ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্বভাবসুলভ মৃদুকণ্ঠে, আর নজরুলের ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্বভাবসুলভ উচ্চকণ্ঠে এবং তিনি রূপকধর্মী বহু মিথ-ঐতিহ্য ব্যবহার করে তাঁর কবিতাকে বেশিমাত্রায় অলঙ্কারসমৃদ্ধ করে তুলেছেন। নির্মাণকলার দিকে থেকেও একটি সাদৃশ্য লক্ষণীয় যে, ‘বিদ্র্রোহী’র মতো ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায়ও প্রচুর অতিপর্বের, বিশেষ করে ‘আমি’র, ব্যবহার রয়েছে।
শেষ কথা: মাত্রাবৃত্ত মুক্তকের সব বৈশিষ্ট্য ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় রয়েছে কারণ অসমমাত্রিক পঙ্ক্তিগুলো ৪ নম্বর উদাহরণের কবিতার মতো কোনও সুষম বিরতির পরপর ব্যবহৃত হয়নি, হয়েছে বিক্ষিপ্ত আকারে। অতএব, নজরুলের পরে নয়, তাঁর প্রায় ৩৮ বছর আগে (১৮৮৩ থেকে ১৯২১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে রচিত হয়েছে প্রথম মুক্তক মাত্রাবৃত্তের কবিতা যার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কিন্তু তিনি এই প্রকরণের প্রবর্তক নন। এই সত্য উদ্ঘাটনের ফলে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূল্য কমে যাবে না কারণ প্রচলিত প্রকরণে কবিতা লিখেও প্রাক্তনের চেয়ে নতুন রচনা বেশি উত্তীর্ণ হতে পারে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার যথাযথ পাঠ নিয়ে একটি কথা বলা প্রয়োজন। কবিতাটি মুদ্রিত হয় এভাবে:
বল বীর-
বল উন্নত মমশির,
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশে^র মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ^বিধাত্রীর
… … …
ছন্দ-বিশ্লেষণের প্রয়োজনে, একে ৬-মাত্রার মুক্তক মাত্রাবৃত্ত দেখানোর প্রয়োজনে, প্রথম ও চতুর্থ পঙ্ক্তির ‘বল বীর’ এবং দ্বিতীয় ও পঞ্চম পঙ্ক্তির অতিপর্ব ‘বল’কে একত্রে গণ্য করতে হবে এভাবে:
বল বীরÑবল (৬)/ উন্নত মম (৬) শির (২)// শির (২)/ নেহারি আমারি (৬)/ নতশির ওই (৬)/ শিখর হিমাদ (৬)/ রির (২) [‘হিমাদ্রি’-তে মধ্যখণ্ডন]// বল বীরÑবল (৬)/ মহাবিশে^র (৬)/ মহাকাশ ফাড়ি’ (৬)// চন্দ্রসূর্য (৬)/ গ্রহতারা ছাড়ি’ (৬)// ভূলোক দ্যুলোক (৬)/ গোলক ভেদিয়া (৬)// খোদার আসন (৬) আরশ ছেদিয়া (৬)// উঠিয়াছি চির (৬)/ বিস্ময় আমি (৬)/ বিশ^বিধাত (৬)/রীর (২) [‘বিধাত্রী’তে মধ্যখণ্ডন। এই পর্ববিভাজন ছাড়া প্রথম ও চতুর্থ পঙ্ক্তিতে ৬-মাত্রা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
উল্লেখ্য, ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ তৈরি হয়েছিল মধ্যযুগের কবিদের হাতেই। চণ্ডীদাসের: ‘পীরিতি নগরে (৬)/ বসতি করিব (৬)/ পীরিতে বাঁধিব (৬)/ ঘর (২)// পীরিতি দেখিয়া (৬)/ পড়শী করিব (৬)/ তা বিনে সকলি (৬)/ পর (২)’ কিংবা জ্ঞানদাসের: ‘সুখের লাগিয়া (৬)/ এ ঘর বাঁধিনু (৬)/ অনলে পুড়িয়া (৬)/ গেল (২)// অমিয় সাগরে (৬)/ সিনান করিতে (৬)/ সকলি গরল (৬) ভেল (২) ৬-মাত্রার নিটোল মাত্রাবৃত্তের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ এই ছন্দকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন, চালের ভিন্নতা ঘটিয়েছেন, এবং মাত্রাবৃত্তে ৪, ৫ ও ৭-মাত্রার প্রবর্তন করেছেন। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা আরও জানতে পারলাম মুক্তক মাত্রাবৃত্তের প্রবর্তকও রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর। কাজী নজরুল ইসলাম থেকে বর্তমান প্রজন্মের কবিগণ মুক্তক মাত্রাবৃত্তকে ব্যাপক হারে ব্যবহার করছেন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
বাংলা একাডেমি ফেলো
(পূর্বে প্রকাশিত)



