
আরিয়ান পিঠ সোজা করে হাঁটু মুড়ে ফ্লোরে বসে আছে। সে ইচ্ছে করে ফ্লোরে বসেনি। তাকে ফ্লোরে বসতে বাধ্য করা হয়েছে। আরিয়ানের কোলে বিড়াল। কিছুক্ষণ আগে সে একবার মিঁউ শব্দে ডেকে উঠে এখন চুপচাপ বসে আছে। আরিয়ান স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার সামনে চেয়ারে বসা দাজ্জালের দিকে। দাজ্জাল আওয়ামী ছাত্রলীগের হল কমিটির সভাপতি। জন্মসূত্রে তার নাম দাজ্জাল নয়, এ নাম সে নিজে রেখেছে। ভার্সিটিতে ঘোষণা করেছে, দাজ্জাল এসেছে পৃথিবীতে। সে নিজেকে দাজ্জাল বলে দাবি করেছে। তার বাঁ চোখের পাতায় ক্লান্ত ভাব। বাঁ চোখের পাতা কখনও সম্পূর্ণ খোলে না। তাতে তার সেই চোখ অর্ধেক খোলা বলে মনে হয়।
দাজ্জালের হাতে মদের গ্লাস। গ্লাসের নিচের দিকে খানিকটা হুইস্কি। রামপুর সিগনেচার রিজার্ভ। এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে দামি হুইস্কি। সম্প্রতি আলোড়ন তোলা বাংলাদেশি মুভি তুফানের শাকিব খানের স্টাইলে সে হাতে ধরা হুইস্কির গ্লাস ঘোরাচ্ছে। শাকিব খান তুফান মুভির এন্টাগস্টির ক্যারেক্টার হলেও তাকে প্রোটাগনিস্ট ভাইবে প্রেজেন্ট করা হয়েছে। তুফান মুভিতে শাকিব খানকে প্রশ্ন করা হয়, কী চাও তুমি ? সে বলে, পুরা দেশ। আরও বলে তুফান পোষ মানে না, পোষ মানায়।
আরিয়ানকে হলের এই বিশেষ ঘরে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে পোষ মানানোর জন্য। দাজ্জাল যাদের সহজে পোষ মানাতে পারে না তাদের এই ঘরে ধরে আনে। দাজ্জালের এই ঘরে সকলে সুস্থ অবস্থায় এলেও এখান থেকে কেউ সুস্থ অবস্থায় ফিরে যায় না। কেউ চোখ হারায়, কেউ হাত কিংবা পা হারিয়ে ফেরে। কেউ আবার মেরুদণ্ডের আঘাতে চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যায়। পোষ মানানোর জন্য একেকজনকে বীভৎসভাবে পেটানো হয়। আর পেটানোর সময় সাউন্ড সিস্টেমে ফুল ভলিউমে মিউজিক চলতে থাকে। তুমি কোন শহরের মাইয়্যা গো লাগে উরাধুরা… তোমার যে দেখলে পরে পুরা মাথা ঘোরা।
দাজ্জাল বলল, চোখ নামা। চোখের দিকে ওইরকম করে শয়তানের মতো তাকাইয়া থাকবি না। ফরসেপস দিয়ে চোখ উপড়ায়া নিয়া আসব।
দাজ্জালের চোখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আরিয়ান কোলে বসে থাকা বিড়ালের দিকে তাকাল। আলতোভাবে বিড়ালের শরীরে হাত বুলিয়ে আদর দিল। বিড়াল খানিক দীর্ঘ শব্দে মিঁউ বলে আরিয়ানের কোলের ভেতর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকল।
দাজ্জাল বলল, তোকে বলছি বিড়ালের ডাক বন্ধ। বলছি না ? তুই বিড়ালের ডাক বন্ধের ব্যবস্থা নিস নাই ক্যান ?
আরিয়ান কিছু বলল না। সে আবার চোখ তুলে দাজ্জালের দিকে তাকিয়েছে। আরিয়ানের চোখে ব্যাপার কিছু আছে। অসম্ভব তেজি অনমনীয় ভাব। যেটা দাজ্জাল সহ্য করতে পারছে না। সে আচমকা হাতের মদের গ্লাস ঘোরানো বন্ধ করে থমকে গেল। শীতল গলায় বলল, ড্রয়ারের ভিতর থিকে আমার পিস্তলটা নিয়া আয়। গুলি করে শুয়োরের বাচ্চার চোখ দুটো আন্ধা করে দিই।
দাজ্জালের দু পাশে দু জন দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর আরও তিনজন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ডান পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে সেখান থেকে পিস্তল নিয়ে এল। বাঁ পাশের জন দাজ্জালের চেয়ারের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে হাতের গ্লাস নিয়েছে। আগেরজন ড্রয়ার থেকে পিস্তল এনে দাজ্জালের হাতে দিল।
আরিয়ান চোখ নামিয়ে বিড়ালের দিকে তাকিয়েছে। শান্ত গলায় বলল, তাকে ঘরে ঢাকনার নিচে আটকে রেখেছিলাম। সে ঢাকনা সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
দাজ্জাল বলল, এই বিড়াল তুই পাইছিস কই ?
রাস্তায়। ড্রেনের ভেতর পড়ে ছিল। বাচ্চা বিড়াল। মাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। খ্বু কাঁদছিল। তাকে নিয়ে এসে আমার কাছে রেখে দিয়েছি।
তুমি এইটা কী করলা, ব্রো! রাস্তার ড্রেন থিকা একটা বিড়ালের বাচ্চা পয়দা দিয়া ঘরে নিয়া আসলা। এক্ষণ বিড়ালসহ তোমাকে ড্রেনের ভিতরে ঠেসে দেব। তোমার মা খুব কাঁদবে, ব্রাহ।
দাজ্জাল ডান হাত থেকে পিস্তল বাঁ হাতে নিয়েছে। যার কাছে মদের মদের গ্লাস ছিল সে এগিয়ে এসে দাজ্জালের ডান হাতে গ্লাস দিল। দাজ্জাল ঢক করে অনেকখানি মদ গিলে ফেলল। ঢোক গিলে বলল, আমি ঘুমাইতে গেলেই তোর বিড়াল আইসা আমার দরজার সামনে ডাকাডাকি করে। আমি কি তার ক্রাশ! সে এসে এত ডাকাডাকি করে ক্যান ?
বিড়াল কিছু বুঝতে পারল কি না বোঝা গেল না। সে আরও জড়োসড়ো হয়ে গেল। আরিয়ানের ভয় লাগছে। তার মনে হচ্ছে দাজ্জাল এখন তার সামনে বিড়ালকে জবাই করবে না হয় গুলি করে মেরে ফেলবে। সে যে তীব্র সাহস নিয়ে দাজ্জালের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল তা নয়, খানিক আতঙ্কে তাকিয়েছে। যেন মৃত্যুর আগে তার বাঁচার শেষ চেষ্টা।
দাজ্জাল হাতে ধরা গ্লাসের বাকি মদটুকু গলার ভেতর ঢেলে দিয়ে গিলে ফেলল। অমনি তার মাথার ভেতর বিদ্যুৎ চমকানোর মতো স্পার্ক করেছে। চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, মদে কী মিশিয়েছিস ?
বাঁ দিকে যে দাঁড়িয়ে ছিল তার নাম তানজিল। সে বলল, আপনি বলছেন কিছু না মিশাইতে। আমি সোডা মিশাইতে চাইছিলাম। আপনি র খাবেন বলছেন।
ডান দিকে যে আছে তার নাম সৌরভনাথ। সে নিচু গলায় বলল, কাইল রাইতে বোতল শেষ করছেন। বোতলে জিনিস ছিল কম। কয়েক ড্রপ মাত্র। অল্প রাম মিশাইছি।
দাজ্জাল হাতের গ্লাস সৌরভনাথের হাতে দিয়ে দিল। পিস্তল দিল তানজিলের কাছে। চোখের পাতা টেনে তুলে সামনে ঝুঁকে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, তোর বিড়াল নিয়া তুই এই রাতে, অক্ষনি হল থিকা বাইর হয়া যাবি। তোরে আর তোর বিড়ালরে য্যান পনেরো মিনিট পরে আর এই হলে না দেখি। যদি দেখি তাইলে তুই ফিনিস। তোর বিড়াল ফিনিস। তোর বাপ-মা, আত্মীয়স্বজন কেউ বাঁচব না।
বলতে বলতে দাজ্জাল সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে যাচ্ছিল। তানজিল আর সৌরভনাথ দু পাশ থেকে দাজ্জালকে শক্ত করে চেপে ধরল। এখন তাকে ধরে তার বেডে নিয়ে যেতে হবে।
আরিয়ান বুঝতে পারছে না সে কী করবে। বিড়াল কোলে নিয়ে মূর্তির মতো বসে আছে। দাজ্জালকে নিয়ে যাওয়ার সময় সৌরভনাথ বাঁ পা তুলে আরিয়ানে বুকে রাখল। জোরে লাথি দিয়ে বলল, বাইর হ হল থিকা। ফেরত আইসা যদি দেখি তুই হলে আছস তাইলে ভাই না, তোরে গুলি আমি করব।
বিড়াল কোলে নিয়ে আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে হল থেকে বের হয়ে এসেছে।
সেদিন ১৪ জুলাই ২০২৪, রোববার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ শুরু করেছে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে তারা ১ জুলাই থেকে টানা আন্দোলন করে আসছে। বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ নামের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। পুলিশ আর ছাত্রলীগ বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের পিটিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাতে আন্দোলন ভয়াবহ চেহারা ধারণ করেছে। কয়েক লক্ষ ছেলেমেয়ে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে এই আন্দোলনে। দেশের সব কয়টি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন বিক্ষোভে যুক্ত হয়ে গেছে।
দেশের ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটানা ১৫ বছর তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন। গতবারের ভোট হয়েছে প্রায় ভোটারবিহীন। বিরোধীদল ভোট বর্জন করেছিল। জনগণ ভোট দিতে আসেনি।
সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন কোটা আছে ৫৬%। তার ভেতর ৩০% কোটা রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের জন্য। কোটাব্যবস্থা সংস্কার করলে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনির কোটাও যৌক্তিকভাবে কমে আসবে। গতকাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা কোটা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-নাতনিরা কোটা পাবে ?
এই কথা শুনে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। মধ্যরাতে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে রাজু ভাস্কর্যের কাছে জড়ো হয়েছে। স্লোগান দিচ্ছে, মেধা না কোটা, মেধা মেধা। চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার। তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।
২.
আরিয়ান হলের বাইরে আমগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছে। তার পাশে ছোট ব্যাগ। হল থেকে বেরুনোর আগে রুমে গিয়ে কয়েকটা কাপড়, দুটো বই আর সামান্য যে কয়টা টাকা ছিল নিয়ে এসেছে। বিড়াল আছে কোলে।
অনিকে দু বার ফোন করেছে। সে কল রিসিভ করেনি। অনি কল ব্যাক করবে সেই আশা নিয়ে আরিয়ান বসে আছে।
অনি তার ক্লাস ফ্রেন্ড। শুধু ক্লাস ফ্রেন্ড বললে তাদের সম্পর্কটা স্পষ্ট হয় না। অনি তার বেস্ট ফ্রেন্ড। আর কেউ না বুঝলেও অনি তাকে বোঝে।
কল ব্যাক করেছে অনি। কল রিসিভ করে আরিয়ান ফোন কানে ধরে আছে। কী বলবে, কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। অনি বলল, কী হইসে ? তুই কোথায় ?
আরিয়ান বলল, ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাকে হল থেকে বের করে দিয়েছে।
কী রে ভীতু! তুই কি আন্দোলন করতেছিস! সাব্বাস, পুকি। উম্মা। তোরে চুমা দিলাম।
শোন, আমি ব্যাগ নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আসছি। রাতে কোথায় যাব বুঝতেসি না।
ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আসছিস মানে কী! তুই কী করছিলি বল তো।
আমার বিড়ালের ডাকে দাজ্জালের ঘুমের ডিস্টার্ব হয়। তাই সে আমাকে হল থেকে বের করে দিসে।
কী আউলবাউল বলতেছিস। শোন, টিএসসিতে যা। পশ্চিম দিকের গেটের কাছে যে এটিএম বুথ আছে সেখানে থাকবি। আমি আসতেছি।
চল্লিশ মিনিটের মাথায় অনি চলে এল। রাজু ভাষ্কর্য, টিএসসি দিয়ে হাকিম চত্বরে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে। তারা এখনও স্লোগান দিয়ে যাচ্ছে, কোটা না মেধা, মেধা মেধা।
অনি বলল, রাতে নিশ্চয়ই কিছু খাসনি।
আরিয়ান চুপ করে আছে। এতক্ষণ পর তার মনে হলো ক্ষুধা লেগেছে। অনি তাকে নিয়ে নীলক্ষেতে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত নীলক্ষেতের দোকান খোলা থাকে। অনি এক কাপ কফি খেয়েছে। আরিয়ানকে খাইয়েছে তেহারি।
অনিদের বাসায় আরিয়ানের থাকতে কোনও অসুবিধা হলো না। অনির বাবা-মায়ের কাছে আরিয়ান অতিপরিচিত। এর আগেও মাঝেমধ্যে এসে রাতে অনিদের বাসায় থেকে গেছে। আরিয়ান বলল, আগামীকাল ভোরে বাড়ি চলে যাব।
অনি বলল, তুই সত্যি কাওয়ার্ড। ছেলেমেয়েরা মুভমেন্ট করছে। অন্যায্য কোটা সিস্টেমের এগেইনেস্টে কথা বলেছি বলে প্রাইম মিনিস্টার আমাদের অপমান করল। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করল, আর তুই তার কোনও জবাব না দিয়ে বাড়ি চলে যাবি!
আরিয়ান কিছু বলল না। সে বিড়ালকে বুকের ভেতর চেপে ধরে ঘরে চলে গেল ঘুমাতে। ঘুম হয়তো আসবে না। তবু চেষ্টা করবে।
পরদিন প্রধানমন্ত্রী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ব্যঙ্গ করে বললেন, নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জাও করে না। তিনি বুঝলেন না কতখানি ক্ষোভে, দুঃখে, রাগে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ‘রাজাকার’ বলে অভিহিত করেছে। তবে ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার’ বলার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছে ‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
শেখ হাসিনাকে গত পনেরো বছর ধরে চাটুকাররা গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলে সম্বোধন করে আসছে। মনে মনে বললেও প্রকাশ্যে কেউ তাকে স্বৈরাচার বলতে পারেনি, যদিও তার সমস্ত কার্যকলাপে স্বৈরাচার সরকারের চরিত্র স্পষ্ট। প্রথম তাকে স্বৈরাচার বলার সাহস দেখিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছেলেমেয়েরা।
আর কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিয়েছে তাদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। তাদের হাতে ছিল হকিস্টিক, লাঠি, রড, জিআই পাইপ, দেশি অস্ত্র। তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছে।
অনি বলল, অরিয়ান, আমি বেরুচ্ছি, যাবি তুই ?
কোথায় যাচ্ছিস ?
ভার্সিটির দিকে যাব। প্রোগ্রাম আছে।
গণ্ডগোল হচ্ছে খুব। গোলাগুলি হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী আর চট্টগ্রাম ভার্সিটিতেও ছাত্রলীগ হামলা করেছে। সবার মাথায় হেলমেট আর হাতে ধারালো অস্ত্র। ভয়াবহ।
আরিয়ানের চোখের দিয়ে তাকিয়ে আছে অনি। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ন। আরিয়ান চোখ নামিয়ে নিল। অনি বলল, বলতো তুই এত ভীতু কেন ? লজ্জা করে না কাপুরুষের মতো বাঁচতে! যে কয়দিন বাঁচবি মাথা উঁচু করে সাহস নিয়ে বাঁচবি। তোর বাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে হলে চলে যা।
অনির গলায় কিছু ছিল। আরিয়ানের বুকের ভেতর প্রথমে মোচড় দিয়ে উঠেছে। তারপর মনে হয়েছে সে কাপুুরুষের মতো বাঁচতে চায় না। অনির মতো সাহসের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচবে। আরিয়ান বলল, তোর সঙ্গে যাব।
কোথায় যাবি আমার সঙ্গে ? বেহেস্তে না কি জাহান্নামে!
ভার্সিটিতে। বিড়ালটাকে নিয়ে যাব। অসুবিধা হবে না তো! আমাকে না দেখলে খুব কাঁদবে।
অনির কেন জানি ভীষণ মায়া হলো। সহজ-সরল মুখ। আরিয়ানকে এখন অতিরিক্ত সরল দেখাচ্ছে। যেন সে মায়ের কাছে যেতে চাইছে।
অনি বলল, তুই বাসায় থাক। তোকে এখন বেরুতে হবে না। আমার ঘরে গিয়ে দেখ বেডের ওপর একটা বই আছে। বইটা পড়। ফিরে এসে তোর সঙ্গে ডিসকাস করব। ইন্টেরেস্টিং বই।
অনি বেরিয়ে গেল। আরিয়ান বুঝতে পারল না অনি বেরিয়ে যাওয়ার পর তার বুকের ভেতর থেকে কেন এমনভাবে বাতাস বের হয়ে এল। খানিক হাহাকারের মতো। যেন সে একা হয়ে গেল। একদম একা।
৩.
১৬ই জুলাই ২০২৪। মঙ্গলবার।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বেলা তিনটায় সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল আর সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সরকার বিক্ষোভ দমন করতে দেশের সমস্ত স্কুল-কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দমানো গেল না। তারা তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকল। বেলা দুইটায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে গায়েবানা জানাজা আর কফিন মিছিল হবে।
রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে অনি হতভম্ব হয়ে গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ ভণ্ডুল করার জন্য ছাত্রলীগের নেতা-কমীরা রাজু ভাস্কর্যের কাছে জড়ো হচ্ছে। তারা আসছে রড, হকিস্টিক, লাঠি, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, দেশীয় অস্ত্র আর অত্যাধুনিক ফায়ার আর্মস নিয়ে।
ভার্সিটি ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে লাঠিসোটা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রছাত্রীদের হাতে কিছু নেই। থাকার কথা নয়। তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে অহিংস আন্দোলন করছে। তারা মারামারি করতে চায় না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়েছে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। অনি শহিদ মিনার এলাকায় চলে এসেছে। ভার্সিটির হল থেকে ছেলেমেয়েরা আসছে। তারা আসছে স্লোগান দিতে দিতে। তাদের চোখমুখ ভয়হীন উজ্জ্বল। স্লোগানে তারা ছাত্রলীগের হামলার বিচারের দাবি জানাচ্ছে।
মিছিল বড় হচ্ছে। বড় হতে হতে শহিদ মিনার ছাড়িয়ে দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল, কার্জন হল, চানখানপুলে ছড়িয়ে পড়ল।
ছাত্রদের সমাবেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগ একসঙ্গে হামলা চালাল। তারা গুলি ছুড়তে থাকল। কয়েকজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সহযোদ্ধারা তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আহত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। এমার্জেন্সিতে গিয়ে ভাঙচুর করেছে। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা নিতে দেয়নি।
আরিয়ান অস্থির হয়ে পড়েছে। তার এরকম লাগছে কেন সে বুঝতে পারছে না। ভার্সিটি এলাকায় ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার খবর দেখাচ্ছে টেলিভিশন নিউজে। অনিকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ফোনে রিং হচ্ছে। অনি কল রিসিভ করছে না। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, কল ব্যাক করেনি। অনির কী হয়েছে বুঝতে পারছে না।
আরিয়ান সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে শহিদ মিনারে যাবে। সেখানে গেলে নিশ্চয় অনিকে খুুঁজে বের করতে পারবে। যদিও প্রচণ্ড গণ্ডগোলের পর অনি সেখানে আছে কি না সে জানে না।
টেলিভিশনে এক মর্মান্তিক খবর দেখাচ্ছে। খবর দেখে আরিয়ান পুরোপুরি থমকে গেল। সে স্থির হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে তার নড়াচড়া করার মতো আর কোনও শক্তি অবশিষ্ট নেই। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় সমন্বয়ক। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সামনে পার্কের মোড়ে এসেছে। আবু সাঈদ আছে সকলের আগে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ করে গুলি ছুড়ছে। আবু সাঈদ আরও সামনে এগিয়ে গেছে। সে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছে। প্রসন্ন বুক, চোখে তেজ। বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একজন পুলিশ তখন আবু সাঈদকে তাক করে সরাসরি গুলি করল। হকচকিয়ে গেছে আবু সাঈদ। সে বিস্মিত চোখে তাকিয়েছে। পুলিশ আবার গুলি করেছে তার শরীরে। লাফিয়ে উঠে আবু সাঈদ স্থির হলো। তবু তার দুই হাত দু পাশে প্রসারিত। সরকারের পেটোয়া বাহিনী পুলিশের বুলেটের সামনে পেতে দেওয়া অসীম সাহসী বুক।
পুলিশ আবার গুলি করেছে আবু সাঈদকে। বুক চেপে ধরে আবু সাঈদ বসে পড়ল। ওপাশ থেকে সহযোদ্ধারা ছুটে আসছে। পুলিশ গুলি ছুড়ছে। পুলিশের গুলির ভেতর তারা দৌড়ে এসে আবু সাঈদকে হাতের ওপর তুলে নিল। সহযোদ্ধারা আন্দোলনের তেজস্বী বীর আবু সাঈদকে নিয়ে ছুটছে। পুলিশ তখনও বিরামহীন গুলি ছুড়ে যাচ্ছে।
অনি যখন বাসায় ফিরল তখন অনেক রাত। আরিয়ান বলল, আবু সাঈদ মারা গেছে। পুলিশ তাকে খুব কাছে থেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।
অনি কিছু বলল না। শান্ত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলে। অনির বাবা আর মা তখনও অনির জন্য খাবার নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন।
৪.
১৮ জুলাই ২০২৪। ৪ শ্রাবণ ১৪৩১। বৃহস্পতিবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা আজ সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করেছে। সর্বাত্মক অবরোধ।
সকালে নাস্তা করার সময় অনি অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোথাও যাবে। অনি বলল, আজ তো বাড়ি যেতে পারবি না। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলছে। সবকিছু বন্ধ।
আরিয়ান বলল, বাড়ি যাব না।
অনি আরও অবাক হয়ে বলল, তাহলে বাইরে যাওয়ার ড্রেস পরে আছিস কেন ? ভয় লাগছে ? যদি পালাতে হয়, তাই!
শান্ত গলায় আরিয়ান বলল, আমি মিছিলে যাব। কমপ্লিট শাটডাউনে পার্টিসিপেট করব।
রিয়েলি!
আমি ভীতু নই। আমাকে কখনও কাওয়ার্ড বলবি না।
অনি আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ নাস্তা খেয়ে উঠে পড়ল।
শহরজুড়ে বিক্ষোভ হচ্ছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, পুলিশ আর বিজিবির সংঘর্ষ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলি ছুড়ছে। শুধু পুলিশ গুলি ছুড়ছে না, পুলিশের সঙ্গে থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের লক্ষ করে গুলি করছে।
অনির পাশ থেকে আরিয়ান বের হয়ে গেছে। সে ছুটছে। পুলিশের ছোড়া বুলেট ছুটে আসছে তার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে। আরিয়ানের সঙ্গে অনি ছোটার চেষ্টা করল। পারল না। আরিয়ান রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানো পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে পড়েছে। পুলিশের দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে বলছে, আপনারা ছাত্রছাত্রীদের দিকে গুলি ছুড়বেন না। তারা আপনার সন্তান, আপনাদের ছোট ভাইবোন। তাদের হত্যা করবেন না।
আরিয়ানের বুক তাক করে প্রথম গুলিটা করেছে ছাত্রলীগের এক ছেলে। অমনি আরিয়ান দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর। তাকে দেখাচ্ছে আবু সাঈদের মতো। যেন সে শহিদ হতেই এসেছে। মৃত্যুবরণ করতে রাজি তবু পরাজিত হবে না। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না।
পরের গুলি করল একজন পুলিশ সদস্য। গুলি এসে লাগল আরিয়ানের কলারবোনের একটুখানি নিচে বুকের ওপর। আরিয়ান ধপাস করে সাঁজোয়া যানের ওপর পড়ে গেল।
একজন পুলিশ সদস্য ছুটে এসে টান দিয়ে আরিয়ানকে নামাল গাড়ির ওপর থেকে। ছুড়ে ফেলল রাস্তার ওপর। দলা পাকিয়ে ভেঙেচুরে পড়েছে। তখনও বেঁচে আছে আরিয়ান। সে নড়ছে। রাস্তার পাশ থেকে অন্যরা ছুটে এল। তারা আরিয়ানকে নিয়ে যেতে চাইল। ছাত্রলীদের এক কর্মী এসে খুব কাছ থেকে গুলি করল আরিয়ানের বুকে। দুজন পুলিশ সদস্য আর দুজন ছাত্রলীগ কর্মী আরিয়ানকে ধরে রাস্তার ডিভাইডারের ওপর দিয়ে ওপাশে ছুড়ে মারল। গাছের ডালে বসে থাকা গুলি খাওয়া পাখির মতো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল আরিয়ান।
বিক্ষোভকারীরা ছুটে আসছে। পুলিশ আর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ একসঙ্গে তাদের দিকে গুলি করে যাচ্ছে কোনও বিরতি না দিয়ে। শিক্ষার্থীরা দৌড় থামিয়ে দেয়নি। তাদের ধাক্কা দিয়ে পুলিশের সাঁজোয়া যান তীব্র বেগে বের হয়ে গেল।
অনি ছুটে এসে আরিয়ানের পাশে রাস্তার ওপর হাঁটু মুড়ে বসল। আরিয়ানের রক্তে ভিজে যাচ্ছে রাস্তা। তাজা লাল টকটকে রক্ত। আরিয়ানের মাথা যখন অনি নিজের বুকে চেপে ধরল তখন আরিয়ান মারা গেছে।
৫.
রাত। পদ্মা নদীতে ফেরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনি। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। জোৎস্না হয়েছে ফুটফুটে। পদ্মার পানিতে ফিনকি দিয়ে উঠছে চাঁদের আলো। অনি কুষ্টিয়াতে যাচ্ছে। আরিয়ানের বাড়ি। মৃত আরিয়ান শুয়ে আছে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে।
বন্ধু কয়েকজন আসতে চেয়েছিল। অনি বলল, তোদের এখানে দরকার হবে। সরকার আজ একশর ওপর মানুষ হত্যা করেছে। খুনের পথ ছাড়বে না। মৃত্যুবরণ করার জন্য আমাদের থাকা দরকার। আগামীকাল সকালে আরিয়ানের দাফন হয়ে গেলে চলে আসব।
অনি একা এসেছে। তার বিষণ্ন বোধ হচ্ছে। নদীর পানিতে ফিনিক ফোটা জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে অনি বলল, তোকে আমি ভুল বুঝেছিলাম রে আরিয়ান। তুই কাওয়ার্ড নোস। তুই সাহসী। অনেক সাহসী। তোর মতো আমরা অনেকে সাহসী হতে পারিনি। তুই পেরেছিস।
পানিতে চোখ ভরে উঠেছে অনির। জ্যোৎস্না ঝাপসা লাগছে। মনে হচ্ছে সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না।
অনি অ্যাম্বুলেন্সের কাছে এগিয়ে গেল। আলতোভাবে হাত রাখল অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে। কাঁচের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকাল। আরিয়ানের কফিনের পাশে মাথা নিচু করে বিড়ালটি বসে আছে। অনির মনে হলো আজ সারাদিন বিড়ালের কিছু খাওয়া হয়নি।
হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল। হেঁটে হেঁটে সিঁড়ির দিকে এগুতে থাকল। ফেরির দোতলায় গিয়ে বিড়ালের জন্য বিস্কিট কিনে আনবে।
৬.
পরদিন ১৯ জুলাই বিশে^র ইতিহাসে এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেল। আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে কারফিউ দিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিকে দিয়ে নির্বিচারে শিক্ষার্থীদের গুলি করে মেরেছে। একই সময়ে সামনাসামনি আর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়েছে। র্যাব, পুলিশ আর ছাত্রলীগ, যুবলীগ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ছোড়া গুলিতে শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, দিনমজুর-সহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ মারা গেছে। পৃথিবীর কোথাও এর আগে এত কম সময়ে এত অল্প জায়গায় এত বেশি মানুষ মারা যায়নি। সরকারি হিসাবেই মারা গেছে ৬০০ জন। মানুষের বিশ^াস মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।
আন্দোলন এককভাবে শিক্ষার্থীদের রইল না। আন্দোলন হয়ে গেল ছাত্র-জনতার। এখন আর ছাত্র-জনতা কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা বলছে না। তারা বলছে হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। আন্দোলন হচ্ছে সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে।
ছাত্র-জনতার ২৩ দিনের দেশ কাঁপানো আন্দোলনে পতন হলো দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী আওয়ামী লীগ সরকারের। আগস্ট মাসের ৫ তারিখ ২০২৪, ২২ শ্রাবণ ১৪৩১ সোমবার শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।
সন্ধ্যায় দাজ্জাল আর সৌরভনাথকে পাওয়া গেছে হলের পাশে ড্রেনের ভেতর। নোংরা কাদাপানি মেখে ড্রেনে পড়ে ছিল। কয়েকজন তাদের দুজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা দাজ্জাল আর সৌরভনাথকে মারতে দেয়নি। তাদের সেনাবাহিনীর কাছে সোপর্দ করেছে।
শ্রাবণ মাসের সকাল। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। বরফ-সাদা মেঘের জন্য আকাশকে আরও বেশি নীল দেখাচ্ছে। বাঁশের বেড়া দিয়ে আরিয়ানের কবর ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কবরের বেড়ার পাশে মুখ তুলে বসে আছে আরিয়ানের বিড়াল। তার গায়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে। ঝলমলে রোদ্দুরে বিড়ালটিকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। তার চেহারায় প্রশান্ত ভাব। স্বাধীনতা আর মুক্তির প্রশান্তি।
বিড়ালটি মুখ তুলে ওপরে তাকাল। সূর্যের মুখোমুখি হয়ে বাতাসে অদ্ভুত কম্পন তুলে গম্ভীর আওয়াজে ডেকে উঠল, মিঁয়াও।
সচিত্রকরণ : রজত



