আর্কাইভগল্প

গল্পের স্বর : শেকল ভাঙার শব্দ : আসাদুল্লাহ্ মামুন

হাতটা কপালে দিতেই ছ্যাঁত করে উঠল। এত জ্বর! হঠাৎ করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও হুট করে বসে পড়লাম। পড়ে যাওয়ার মতন অবস্থা হয়েছিল। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। আমি বুঝতে পারছি না কখন জ্বর এল ? মাঝে মাঝে গুলির শব্দ, ছাত্রদের মুহুর্মুহু সেøাগানের মধ্যে, কখনও বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে, কখনও বা রক্ত জেগে ওঠে। কাল অস্ত্রধারী পেটোয়াদের সামনে পড়ে গেছিলাম। কোনও মতে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেছি। এরা স্বৈরাচারের দল। হাতে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রপাতি। চারিদিকে পুলিশ বিজিবি ঘিরে রেখেছে, অথচ তাদের অস্ত্রগুলো প্রকাশ্য। প্রাণকে হাতের মুঠায় নিয়ে, নিজেকে স্বাভাবিক রেখে দূরে সরে এসেছি। তারপর একটা অটো গাড়িতে উঠে পড়েছিলাম। এক বয়স্ক ভদ্রলোক চমকে উঠে বলেছিল, আপনি কেন এর মধ্যে, আপনি তো, এটুকু বলেই ভালো করে একবার দেখে নিলেন।

কোনও মতে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেছিলাম, আমি তো শিক্ষক। গত ১৫ বছর আগে ছাত্র ছিলাম। কিন্তু আপনার চেহারা থেকে ছাত্রের গন্ধ এখনও যায়নি। আপনি সতর্কভাবে চলাফেরা করুন। আমি অটোওয়ালাকে বলতে পারছিলাম না দ্রুত চালাও। তবে যত জোরে যাচ্ছিল, ততই মনে হচ্ছিল আমি নিরাপদ স্থানে সরে আসছি। তরতরে তাজা গতকালের ঘটনা। ভাবছিলাম ছাত্রদের সঙ্গে মিলতে পারছি না কেন ? এক সময় তো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় ছিলাম। মিছিল, টিয়ার শেল, গুলির সামনে দাঁড়িয়ে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। জেলেও যেতে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। তখন রক্ত ছিল টগবগে। হঠাৎ সুকান্তের সেই কবিতাটার কথা মনে পড়ে গেল ‘১৮ বছর বয়স, এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। ছাত্রদের সামনে এই কবিতা আমাকে পড়াতে হয়। পড়াতে হয় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’। এখানে বয়স কোনও বিষয় নয়, সব বয়সের মানুষই ১৮ বছরে এসে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এখন ছাত্রদের বড্ড প্রয়োজন আমাদের। মাথার ওপর খড়গ ঝুলছে। একটু এদিক ওদিক হয়েছে তো বেতন চলে যাবে। চাকরি চলে যাবে। স্বৈরাচার। আমার তো কোনও পৈতৃক সম্পত্তি নেই, কোনও ব্যবসা, টাকা-পয়সা কিচ্ছু নেই। আমি খড়গের নিচে দাঁড়িয়ে। এসব ভাবনার মধ্যে কখন যে জ্বর এসে গেল বুঝতে পারিনি। স্ত্রী শাওনকে ডেকে বললাম, দেখো তো আমার জ্বর কিনা। শাওন মাথায় হাত দিয়ে বলল, কই না তো। সামান্য গরম। কী বলছো আমি তো দেখলাম অনেক জ্বর। তোমার মনের ভুল। থার্মোমিটার নিয়ে এসে জ্বর মাপলো। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলাম। থার্মোমিটারে জ্বর ওঠেনি। আমি এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। মেঝেতে পায়চারি করতে করতে ভাবলাম, আবারও কি নেমে যাব রাজপথে, বয়সের কারণে মানুষ পিছিয়ে যায়, কিন্তু যখন সময়ের প্রয়োজন, তখন বয়স কোনও বিষয় না। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কেননা আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমি আবার রাজপথে নামব। মিশে যাব মিছিলে। এ দেশ স্বৈরাচারীর নয়, এ দেশ আমাদের সকলের। প্যান্ট-শার্ট পরলাম। শাওন বলল, কোথায় যাচ্ছ ? বেশি দূরে নয়, বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াব। ও কোনওভাবেই যেতে দেবে না। আমার একটা ছেলে একটা বউ। অন্যদিকে বাংলাদেশ। মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বক্ষ নিয়ে আবু সাঈদ, তার বুক থেকে ঝরে পড়ছে  অসংখ্য রক্তগোলাপ। আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি। এক একটা পদক্ষেপ যেন যুদ্ধ ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাওয়া। আমি দেখছি আবু সাঈদের বুকের ভেতর থেকে কোটি রক্তগোলাপ বেরিয়ে গোটা রাজপথ গোলাপময় হয়ে পড়ছে। আমি জানি আমার গলির মধ্যে পুলিশ ঢুকে যায়, তবু আমি নেমে যাচ্ছি। শাওন পিছন থেকে আমাকে টেনে ধরে আছে, অথচ আমাকে যেতে হবে। পাঁচ বছরের ছেলেটা ঘুমাচ্ছে। বাংলাদেশ আমাকে ডাকছে। আমার রক্ত আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গলিতে নেমে দেখলাম পুরো গলি ফাঁকা। সবাই বাড়িতে তালাবন্দি অথবা রাজপথে। গলি থেকে বেরিয়ে রাজপথে দাঁড়ালাম। অনেক ছাত্র আসছিল; সারি সারি।  সেøাগানে বাতাসে কাঁপন। আমার বয়স কত জানি মনে ছিল না। আমি ছাত্রদের মত হাত ওপরে তুলে মিশে গেলাম মিছিলে। স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক। বৈষম্য নিপাত যাক। স্বৈরাচার নিপাত যাক। বেশ কিছুদূর মিছিল যাওয়ার পর হঠাৎ টিয়ার শেলের ঝাঁঝালো ধোঁয়া ঢুকে চোখ জ্বালা করতে লাগল। রাবার বুলেটের ঠাস ঠাস শব্দ আসছে। ক্রমাগত কাছে, আরও কাছে। হ্যাঁ একেবারে সামনে। আমি ছাত্রদের সঙ্গে সেøাগানে মুখর হয়ে গেলাম। মনে হলো আমিও আজ কোনও কিছু ভয় পাই না। বুলেট অথবা টিয়ার শেল। রক্তে ছেলেদের উন্মাদনা ছিল, সত্যের পক্ষে রাস্তায় যারা নামে, তাদের কোনও ভয় থাকে না। আমার দিকে তাকিয়ে অনেকে খুব উৎসাহিত হলো। বলল চলুন ভাই আমরা আছি।

 তারপর গুলির শব্দ আর শেল। এর মধ্যে কিছুটা পিছিয়ে আসতে হলো। পিছিয়ে আসতে গিয়ে কয়েকটা ছাত্রের সঙ্গে রাস্তায় পড়ে গেলাম। উঠে আবার এগিয়ে গেলাম সামনে। অনেকে আহত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল, তাদেরকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো ওরা তাজা গুলি চালাচ্ছে। পিছিয়ে আসছিলাম। আবার এগিয়ে গেলাম, যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। মুহুর্মুহু গুলি, রাবার বুলেট। আমরা ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করলাম। অথবা যুদ্ধটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। আবারও পেছনে আসতেই কে যেন আমাকে ধরে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত লাঠির দাগগুলো শরীরে বসে গেল। আমার মনে হল এক একটা আঘাত আমাকে আবার জাগিয়ে তুলছে। প্রথমে চেঁচিয়ে উঠলাম। তারপর নীরবে আঘাতগুলো নেওয়ার মতো মন শক্ত হয়ে গেল। আমাকেসহ কয়েকজন ছাত্রকে টেনে নিয়ে গেল গাড়ির কাছে। তারপরে গাড়ির মধ্যে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল।

আমি লড়াই করতে পারলাম না, তার আগেই আটকে গেলাম।

আমাদের গাড়িটা ক্রমাগত আহত ছাত্রে ভরে গেল। ইট পাথর এসে পড়ছিল গাড়ির কাছাকাছি। একজন পুলিশ অর্ডার করল গাড়ি চলে যাবে। আমাদের গাড়িটা নিয়ে চলতে শুরু করলো। ভাবতেই পারিনি এত দ্রুত আমাকে গ্রেফতার হতে হবে। গাড়িতে থাকা দুজন পুলিশ আমাদের চোখ, হাত বেঁধে ফেলতে লাগল। আমরা সবাই আহত। জানি না আমরা কোথায় যাচ্ছি। হঠাৎ বুটের একটা লাথি মাথা বরাবর এসে লাগল। তারপর মনে নেই।

অনেক পরে নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি রুমের মধ্যে। তাহলে কি এতক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছিলাম। একটা ছোট্ট দশ বাই দশ ফিট রুম। আমি শুয়েছিলাম, পাশে দশ-বারো জন ছাত্র, বসে-শুয়ে কাতরাচ্ছিল। আমার চোখের সামনে বসে আছে আমার এক ছাত্র। বলল, স্যার ঠিক আছেন তো ? আমার মাথা খুব ব্যথা করে উঠল। বললাম ঠিক আছি। অথচ ঠিক নেই। রুমের মধ্যে একটা পাওয়ারফুল লাইট। ভ্যাপসা গরম, একটা ফ্যানের অর্ধেক পাখা এদিকে আরেকটি পাখা পাশের রুমের মধ্যে। এখন রাত না দিন কিছুই বুঝতে পারছি না।

 একজন পুলিশ এসে দাঁড়াল, ক্রুর হেসে বলল, স্যার ভালো আছেন ? তাকে দেখে হানাদারদের মতো মনে হলো। কিন্তু এরা তো স্বাধীন বাংলাদেশের। কোনওমতে বললাম, জি। আপনার নাম কি রিফাত ? অবাক হলাম সে কীভাবে আমার নাম জানল। বলল, আপনার জন্য নাস্তার ব্যবস্থা আছে, আসুন। আগেই আমার হাত খুলে দেওয়া হয়েছিল। আমি উঠে বসলাম। তার কথার উত্তরে বললাম, দরকার নেই। আপনি তো শিক্ষক, আপনাকে আলাদা সম্মান করা প্রয়োজন। আসুন। বললাম পরে যাব। পুলিশ চলে গেল। আমার ছাত্র আমাকে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দিল। বলল স্যার, আপনি কোথায় ছিলেন ? আমি হেসে বললাম, মিছিলে। এ কথা শুনে সবার মনের হতাশা যেন কিছুটা হলেও কমল। আমাদের খেতে দেওয়া হয়েছিল। নামমাত্র খাদ্য। তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। তখন ঠাওর করছিলাম এখন বুঝি রাত। তাহলে আমরা কি গুম হয়েছি ? আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে বুঝতে পারলাম আসলে আমরা গুমের মধ্যে আছি। হয়তো হয়তোবা সকাল হয়েছিল।

দুজন পুলিশ দাঁড়াল। নাম ধরে ডাকল একজনের। তারপর নিয়ে গেল। অন্যজন বলল, স্যার ওকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অকথ্য অত্যাচার করা হবে। আমি বিস্মিত হলাম। আরও একজন বলল, স্যার আমি কিছু জানি না, যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন আমাকে করে। আমি কিছুই বলতে পারি না। তখন তারা পা ওপরে বেঁধে গোটা শরীরে টর্চার করেছে। ছেলেটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর কথা শুনে মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। সবার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন। চিকিৎসার ব্যবস্থা নাই। ভাবছিলাম কেন এই অমানবিকতা! বোতল দেওয়া হলো, প্যাকেট খাবার দেওয়া হলো। কেউ খাচ্ছিল, আবার কেউ মুখে দিতে পারছিল না। যদিও ক্ষুধা ছিল বাঘের মতো। আমরা হয়তো ধরা পড়ে অত্যাচারিত হচ্ছি কিন্তু তার বিনিময়ে কি আমরা বৈষম্যহীন দেশ পাব ? এরকম এক চিন্তা-প্রশ্ন বারবার সবার মনে ঘুরছে ?

আমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারিনি, কিন্তু যারা বাইরে আছে তারা কি এখনও রাজপথে, এমন ধোঁয়াশা চিন্তার মধ্যে যে ছেলেটাকে নিয়ে গেছিল তাকে পুলিশ রেখে গেল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল ছেলেটা। তাকে শুইয়ে দেওয়া হলো। অনেক টর্চার। তারপর আরেকজনের নাম ধরে ডাকা হলো। আমি বললাম আর কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এ কথা শুনে ক্ষেপে গিয়ে একজন পুলিশ আমার হাত বেঁধে ফেলল, মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দিল। তারপর যাকে ডাকছিল তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল। পরে একজন ছাত্র মুখ থেকে রুমাল বের করে বলল, স্যার কোনও প্রতিবাদ করবেন না। হয়তোবা আপনাকেও নিয়ে যাওয়া হবে। চুপচাপ থাকলে টর্চার কম হতে পারে। বুঝলাম।

ঝিম মেরে বসেছিলাম, হঠাৎ করে একজন আমাকে ডাকল, মনে হলো সব দোষ আমার। আমার আর দুশ্চিন্তা নাই। যাই করুক না কেন মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমাকে ড্রয়িং রুমের মতো একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সোফায় বসিয়ে রাখল। চার-পাঁচজন পুলিশ অফিসার ছিল। দুজন ছাড়া সবাই চলে গেল।

একজন বলল স্যার, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। তাহলে আপনাকে এবং সব ছাত্রকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমি মুখ তুলে দেখলাম।

সে আবার বলল, আপনি শুধু ভিডিওতে বলবেন, আমি একজন শিক্ষক বলছি। তোমাদের সব দাবি সরকার মেনে নিয়েছেন, তোমরা শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাও। দেখলাম সামনে একটি ক্যামেরা স্ট্যান্ড করা আছে। আমি রাজি হলেই ক্যামেরা চালু হয়ে যাবে। আমি বললাম, না। কখনওই না।

অফিসার বললেন, স্যার আমরা কিন্তু এখানে চাকরি করতে আসি। কীভাবে না-কে হ্যাঁ করাতে হয় সেটুকু শিখেছি।

আপনি কিন্তু জেনেও সাহস করছেন।

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর আমাকে টানতে টানতে দুজন কনস্টেবল নিয়ে চলল একটা রুমের মধ্যে। সেখানে টর্চার করার যত ইক্যুপমেন্ট প্রয়োজন, সবকিছুই আছে। আমাকে শুইয়ে পা বেঁধে ফেলা হলো। তারপর একটা রশি টানতে লাগল। আমি ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম উল্টোদিকে। বুঝলাম প্রতিদিন ছাত্ররা এ টর্চারের মুখোমুখি হচ্ছে। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত হলাম। দুজন মোটা বেত নিয়ে এসে দাঁড়াল। বলল স্যার, আপনাকে মারব না, সময় দেব, আপনি যখন রাজি হবেন তখন নামানো হবে। আমার পা আসমানে, মাথা জমিনে, মেঝেতে। তেমন নয়, যেমন আবু সাঈদের প্রসারিত হাত  বাংলাদেশকে আগলে রাখতে দাঁড়িয়েছিল। আমি বললাম, আমাকে মারো। আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।

তারা কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাল না। মুখে জঘন্য খিস্তি করতে লাগল। আমি জানি এমন তারা করবে। একজন আমাকে একটা লাঠি দিয়ে আঘাত করল। প্রচণ্ড আঘাত, অথচ মনে হলো তেমন কিছুই না। আরেকজন নিষেধ করে বলল, এক বেলা সময় দেওয়া হলো। ভেবে দেখো, না হলে ব্যবস্থা করা হবে। তারপর দু’জন হাহা করে হাসতে শুরু করল। তাদের হাসি দেখে আমারও হাসি চলে এল, দুঃখে রাগে আমিও হাহা করে হেসে উঠলাম। আমাকে হাসতে দেখে তারা হঠাৎ করে থমকে গেল। যেন তারা ভয় পেয়েছে। অথচ আমাকে ঝুলিয়ে রেখেই তারা চলে গেল। ছাত্রদের কথা মনে হলো তারা বলছিল মুহুর্মুহু গুলি আর আহত- নিহতের কাকুতির কথা। অজস্র রক্ত। তবু তারা পিছু হটেনি। বরং পুলিশ-বিজিবি আতঙ্কে পিছু হটে গেছে। শুনে এই জেনারেশনের ওপর যে ক্ষোভ ছিল, এটা মুহূর্তে উবে গেল। মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত অলস জাতি হয়ে পড়ছে। তারা মাথা নিচু করে ফেলছে। ভবিষ্যতে এদের দিয়ে কী হবে ? এ জাতি কী করবে ? তাদের এই আন্দোলন দেখে আমার মধ্যে জেগে ওঠা মিথ্যা ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিলাম। হয়তো আমরা মিলেনিয়ামরা যা করেছি তার চাইতে এরা বেশি করেছে। হঠাৎ দুজন ছাত্র হন্তদন্ত হয়ে এসে হাসতে শুরু করল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম কি হয়েছে ? তারা কোনও উত্তর না দিয়ে দ্রুত দড়ি বাঁধা অবস্থা থেকে আমাকে নামিয়ে আনল। তারপর বলল, স্যার আমাদের রক্তের বিনিময়ে অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। চলুন, সব তালা ভাঙতে হবে। এই বলে তারা ছুটে গেল। চারিদিকে গুঞ্জন কানে আসতে শুরু করল। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শুধু শুনছিলাম শেকল ভাঙার শব্দ। সম্প্রতি শোনা সেই গানটা কানে বাজছিল―কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট, রক্ত জমাট, শিকল পূজার পাষাণ বেদী…

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button