আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ : বাঙালির কাক্সিক্ষত জীবন-আখ্যান : নিঝুম শাহ্

মূল রচনা : শব্দঘর নির্বাচিত সেরা বই ২০২২

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে

কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে

সমুদ্রে হলো হারা।

            হেথায় আর্য, হেথা অনার্য

হেথায় দ্রাবিড়, চীন―

শক-হুন-দল পাঠান, মোগল

            এক দেহে হল লীন।

পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার

সেথা হতে সবে আনে উপহার

দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে

            যাবে না ফিরে

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

ভারততীর্থে রবীন্দ্রনাথের এই আকাক্সক্ষা বৈশ্বিক মানবমনের জন্যে হলেও বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এই ‘মিলাবে-মিলিবে’ এর মধ্যেই অন্তর্নিহিত। বাঙালির এই সংকরায়ণে রাজনৈতিক পালাবদল যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমন একইসঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাণ-প্রাচুর্যও সমভাবে জড়িত। কল্পনাতীত উর্বরাভূমি-প্রকৃতি মিলে এ জনপদের বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যে বৈচিত্র্য-শান্ত-পারমার্থিক বৈশিষ্ট্য শেকড় থেকে উত্তোলিত করে আসছে সেটিকেও এর সাথে যুক্ত করতে হবে।

কসমোপলিটন সংস্কৃতির যে রূপ বাঙালির রক্তে প্রবাহিত তারই এক আসাধারণ আলেখ্য পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ। লেখক নামকরণে ও উপন্যাসের শুরুতেই আমাদের ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আখ্যানটি বলতে যাচ্ছেন তা অবধারিতভাবেই সোনারগাঁ বা সুবর্ণনগরকে কেন্দ্র করে। উপর্যুপরি ‘কৈফিয়ত’ অংশে বলছেন ‘চারশ বছর আগে বাঙ্গালায় ভ্রমণে আসা উপনিবেশবিরোধী সেই তরুণ নাবিক ফ্রান্সিস রাফায়েলের হৃদয়ের আর্তি এই উপন্যাসের আকর’ যিনি কি না চারশ বছর আগে মাল্লাকা  থেকে পরিব্রাজক হিসেবে এই ভাটি বাঙ্গালায় এসেছিলেন এবং তাঁর লেখা একটি খণ্ডিত ডায়েরির অংশ থেকেই ভিনদেশির দৃষ্টিতে ভাটি-বাঙ্গালার ঐতিহ্য চিত্রণে বসেছেন ঔপন্যাসিক। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট ও সময়কাল অবশ্যই চারশ বছর পূর্বের অখণ্ড বাংলার ভৌগোলিক জনপদ-প্রকৃতি ও বসবাসকারীরের মধ্যে। প্রথমত আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন বা এতটাই প্রবঞ্চিত যে কয়েক দশক আগের ইতিহাসও আমরা বেমালুম ভুলে বসে আছি আর জাতিগত ইতিহাস তো বটেই। লেখক কী তবে স্বপ্রণোদিতভাবেই আমাদের মধ্যে সেই শেকড়লগ্নতায় প্রোথিত করতে চেয়েছেন ? বিভিন্ন যুগের সামাজিক ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের অতীত গৌরব, জাতিগত পরিচয় আমরা ভুলে বসে আছি। আমাদের কাছে এক যুগ হতে অপরের ভেদরেখা অতি-ক্ষীণ ও অস্পষ্ট। সনাতন অতীতের কথা বাদ দিলেও, এমন কী মুসলমান অধিকারের পরের বিশেষ রূপ-সম্বন্ধ, সামাজিক জীবনের ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট তো দূরের কথা আবছা ধারণাও নেই। সব শতাব্দীই আমাদের চক্ষে একাকার, বিস্মৃতির বৈচিত্র্যহীন ধূসর বর্ণে পরিব্যাপ্ত―এই অন্ধকারের মধ্যে রাজাগণের নাম, উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনাই যা কিছু ক্ষীণ আলো ছড়ায় মৃদুমন্দ। আমাদের অতীত ইতিহাসের কোনও অধ্যায়কে মনশ্চক্ষুর সম্মুখে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত করবার একমাত্র উপায় তৎকালীন রাজার নামের দিকে দৃষ্টিপাত করা! ইতিহাসেও যা পাওয়া যায় তা একেবারে শুষ্ক, কাষ্ঠ বিজিতের জয়জয়কার অথবা আরেক পক্ষের একপেশে কথকতা। সামাজিক ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারা এখানে সেভাবে গড়েই উঠেনি। এজন্য  বাংলা সাহিত্যে যাঁরা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ভার গ্রহণ করেছেন এবং সেই কাজের কঠোর দায়িত্ব উপলব্ধি করেছেন, তাঁরা অধিকাংশ জায়গাতেই রাজা বা সম্রাট জাতীয় পুরুষকে কেন্দ্র করে তাঁদের কল্পনার জাল বুনেছেন। পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি বিস্ময়করভাবে অথচ অবিসংবাদিত সত্যের উপর নিজ উপন্যাস-সৌধ নির্মাণ করেছেন এবং তা সামাজিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণের উপর ভিত্তি করে। ফলে এখানে যতটা গুরুত্ব নিয়ে সে সময়ের মানুষ, প্রকৃতি এবং একটি নির্দিষ্ট জনপদের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস প্রাধান্য পেয়েছে ততটা পায়নি মুসা খাঁ, বার ভুঁইয়া বা তাঁদের বীরত্ব-প্রতিরোধ-ইতিহাস। সামাজিক ইতিহাসের অংশ হিসেবেই উঠে এসেছেন এই ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো। রাজনীতি বা রাজাদের উপস্থিতি এখানে উপন্যাসের বাইরের দ্বন্দ্বরূপে কাজ করেছে। যা ক্রমশ প্রবেশ করেছে সাধারণ মানুষের জীবনে, প্রভাবিত করেছে তাদের যাপনকে।

ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসখ্যাত পুরুষই যে নায়ক হবে তার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং স্কটের উপন্যাসে ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা নায়কপদে বা কেন্দ্রীয় চরিত্রে উন্নীত না হয়ে অপ্রধান অংশই অধিকার করেছেন। যদিও ফ্রান্সিস রাফায়েল ঐতিহাসিক পাত্রই বটে তবু মুসা খাঁকে কেন্দ্র করে যে কাহিনি আবর্তিত হলো না এর দুটি কারণ আছে বলে মনে হয়। প্রথমত, ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো পাঠকের বিশেষ পরিচিত বলে, তাদের কল্পনার মধ্যে রূপান্তরিত করার পক্ষে বিশেষ বাধা আছে, ঔপন্যাসিকের রুচি ও আদর্শ অনুযায়ী তা যথেচ্ছ পরিবর্তন করা চলে না। ফলে লেখক যেসব বিপ্লব-অভিঘাত দেখাতে চান, যেসব বিরোধের ধারা পরিস্ফুট করতে ইচ্ছা রাখেন সেসব কাল্পনিক চরিত্রগুলোর মধ্যে ফুটিয়ে তোলা তাঁর পক্ষে সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, ঐ সময়ের সাধারণ জীবন, রীতি-নীতি ও আচার- ব্যবহার সম্বন্ধে লেখক এত গভীর অধ্যয়ন করেছেন যে ঐ শতাব্দীর বিশেষ প্রাণস্পন্দন তিনি এত সূক্ষè সহানুভূতির সাথে ধরতে পেরেছেন যে সমাজচিত্রের কেন্দ্রস্থলে ঐতিহাসিক রাজপরিবারের সদস্যদের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করার প্রয়োজন পরেনি। সুতরাং ঐতিহাসিক চরিত্রের আনাগোনা সত্ত্বেও তাদের প্রত্যক্ষভাবে আখ্যায়িকার মধ্যে না এনেও বাস্তবতার তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। ইসলাম শাহ, সুলেমান খাঁ, তাঁর ভাই কুতুব খাঁ, দুই পুত্র ঈশা খাঁ ও ইসমাইল খাঁ, মির্জা মোমিন, খাজা ওসমান, মজলিস দেলোয়ার, মজলিস কুতুব, বায়েজিদ করবানী, আনোয়ার গাজী, শামসুদ্দিন বাগদাদী, স্বর্ণময়ী বা সোনাবিবি, মানসিংহ, সম্রাট আকবর, পরবর্তীসময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরসহ ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর ব্যবহার  সুবর্ণনগরের বাস্তবতার গৌরব আরও বাড়িয়েছে মাত্র বা যৌক্তিতার প্রশ্নে সংশয়হীন ভিত্তির উপর স্থাপিত করেছে মাত্র।

অন্যান্য চরিত্র সৃষ্টির বেলাতেও পড়হাবহঃরড়হধষ পযধৎবপঃবৎ বা বিশেষত্বহীন চরিত্র নেই বললেই চলে। কোনও চরিত্রের মধ্যেই অস্পষ্টতা, ক্ষীণতা ও জীবনীশক্তির অভাব সেভাবে প্রকট হয়ে ওঠেনি। আবার উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট যেহেতু ভাটি বাঙ্গালার পেশাগত, সাংস্কৃতিক সর্বোপরি সামাজিক ইতিহাস নিয়ে রচিত ফলে প্রচুর চরিত্রের কলেবর বাড়িয়ে একটা মহাকাব্যিক আকার হয়তো দেওয়া যেত উপন্যাসটিকে কিন্তু ঐ যে লেখকের ‘পরিমিতিবোধ’ বলে শব্দটি তাঁকে তা থেকে দূরে রেখেছে বলে অনুভুত হয়। খুব বেশি চরিত্রকে টেনে এনে লেজেগোবরে করার চেয়ে পরিকল্পিত অল্পকিছু চরিত্রকে হাতে নিয়ে তিনি প্লট সাজিয়েছেন আর ইতিহাসের অংশটুকুকে বিধৃত করে গেছেন বয়ানে। ছোট ছোট চরিত্রও প্রাণবন্ত করেছেন স্বভাবজাত বিদগ্ধতা দিয়ে, যেমন মসলিন তাঁতি গৌরীপ্রসাদ, সুতোকাটুনি মায়াময়ীকে দিয়ে মসলিন বুননের নানা ধাপ আর কারসাজির আখ্যান, লেঠেল শিধু খ্যাপার মাধ্যমে লাঠিয়াল ঐতিহ্য ও পরবর্তীসময়ে বার ভুঁইয়াদের গৌরবময় প্রতিরোধ, দোভাষী গাইড জয়নুদ্দিনকে ব্যবহার করে মীনাবাজারের জৌলুস, খেদমতকার মোল্লা রহমতকে দিয়ে এই ভূমির মানুষের সহজাত বিনয়- আতিথেয়তা-আন্তরিকতা, দাস সুফিয়া (ধর্মান্তরিত হবার পর সোফিয়া) এবং বাইজিদের আশ্রিতা আয়শা কে দিয়ে মগ বা বর্মিদের দস্যুতা, নৃশংসতা, মানব বেচাকেনা, সাহায্যকারী জুলমতকে দিয়ে প্রয়োজনে সাহসিকতা, লখনৌর কলাকার জদ্দন বাই এবং তার কন্যা রওশন আরাকে দিয়ে কলার বিভিন্ন দিক এবং মানবীয় সম্পর্ক বিশেষ করে সুবর্ণগাঁয়ের মানুষের লোককাহিনি-লোকবিশ্বাস- সংস্কার-সংস্কৃতির পরিচয়, পর্তুগালে থাকা আদ্রিয়াকে দিয়ে পর্তুগালের সমাজ-সংস্কৃতি-পেশা-প্রকৃতি অর্থাৎ প্রত্যেকটি চরিত্রকে দিয়েই লেখক তাঁর কার্যসাধন করিয়ে নিয়েছেন, বলিয়ে নিয়েছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ততার সাথেই। 

স্কট বা থ্যাকারের ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাস ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে এরূপ বিচ্ছেদসাধন সম্ভবপর নয়। প্রকৃতপক্ষে যা বলার প্রয়াস চালাচ্ছি তা হলো ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকেরা ইতিহাসের যেরূপ ব্যবহার করেছেন, দৈনন্দিন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেভাবে ঐতিহাসিক ঘটনার প্রভাব বিস্তার  করেছেন, তা আমাদের পূর্বত ঐতিহাসিক উপন্যাসে খুব কম, বিশেষ করে, বঙ্কিমের মতো প্রতিভাতেও। বহিরঙ্গের ও অন্তরঙ্গের সমন্বয় সাধনের সমান্তরালে মানবমনের অন্তর্জগত ও সামাজিক ইতিহাসের সমন্বয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমতা রক্ষা করতে পারেনি সেখানে। সেক্ষেত্রে সত্যেন সেনের বিদ্রোহী কৈবর্ত আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে বটে। সত্যেন সেনের চরিত্রে বাহিরের ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে ব্যক্তিমানসের অন্তর্দ্বন্দ্ব অনেক পরিণত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে এসে চিলেকোঠার সেপাই-এ বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস এক নবধারার  মহাকাব্যিক শিল্পসংহতি লাভ করেছে। পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণকে এই নবধারার সামাজিক ঐতিহাসিক উপন্যাসের আরেক শিল্পিত সংযুক্তি বললে অত্যুক্তি হবে না। সেখানে যেমন অলক্ষ্যে ঐতিহাসিক চরিত্রাবলি একটা জাতির নতুন জীবনের দিকে ধাবিত হওয়া নির্ধারণ করেছে কিন্তু তাদের উপস্থিতি সেখানে আবহে, প্রত্যক্ষ সশরীরে নয়। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানে লেখক নিজেই নিজেকে দিয়েছেন আখ্যান বয়ানের চরিত্রনির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। একজন সম্পূর্ণ ভিনদেশি পর্যটক ফ্রান্সিস রাফায়েলের চোখে আমরা যখন আমাদেরই পূর্বপুরুষের জীবনবয়ান দেখছি, সে দেখাটার একটা চ্যালেঞ্জ তো আছেই এবং আমরা দ্বিধা না রেখেই বলতে পারি পারভেজ হোসেন সে চ্যালেঞ্জ নিতে পেরেছেন। শুধু একটা দিনলিপির মতো ডায়েরির কিছু খসড়া লেখাকে তাও পূর্ণাঙ্গ নয় এমনকিছু অংশ অবলম্বন করে যখন লেখক একটা পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ফ্রান্সিস রাফায়েলকে শৈল্পিক রূপে আঁকলেন তখন তা ঠিক ঐতিহাসিক সত্য না হয়ে উঠলেও যরংঃড়ৎরপধষ রসধমরহধঃরড়হ  বা ঐতিহাসিক কল্পনার অসাধারণ প্রয়োগ-দক্ষতার পরিচয় বহন অবশ্যই করে। এ ধরনের উপন্যাসের চরিত্রের ক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো  কল্পনা ও সত্যনিষ্ঠার মধ্যে দ্বন্দ্ব। চরিত্রে বা আখ্যানে কল্পনার আধিক্য অথবা সত্যনিষ্ঠার অধিক প্রাদুর্জভাব যেকোনও একটির প্রাধান্য বেশি হলে তা তার শিল্প সংহতি হারিয়ে ফেলে। রাফায়েলের সাথে ঘটনা পরিক্রমায় যা যা ঘটেছে যেমন এবনে আল আসাদের সাথে পরিচয়সূত্রে ভাটি-বাঙ্গালা সম্পর্কে তার পূর্বধারণা তৈরি করা, বণিক হাফিজুদ্দিনের মাধ্যমে এ দেশের বাণিজ্য দেশপ্রেমের স্ফুরণ বা রওশন আরার সাথে তার একটা সম্পর্কের ভিত্তিতে লৌকিকতার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া এককথায় যা কিছু এদেশের সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য যে ধরনের চিত্রমাধুর্যতা তৈরি করা উচিত সেভাবেই প্লট সাজালেন কিন্তু কোথাও অসংযমী হলেন না।

২৪ পর্বের উপন্যাসে ১১ পর্বে ইবনে আল আসাদের যুদ্ধ-আশঙ্কায় তড়িঘড়ি প্রস্থান প্রথমে সামান্য খটকা লাগলেও পরবর্তী সময়ে তাতে লেখকের পরিমিতিবোধেরই পরিচয় পাওয়া যায়। ইবনে বতুতার উত্তর পুরুষ ইবনে আবু আল আসাদের প্রজ্ঞা, সকল বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও তথ্যের সমাবেশ, প্রখর যুক্তি, ধারালো প্রশ্ন, বাচনিক স্বতঃস্ফূর্ততা এবং দার্শনিক উপস্থিতি রাফায়েলকে পুরোদমে প্রজ¦লিত হতে দিচ্ছিল না অধিকাংশ সময়েই। ভাটি-বাঙ্গালা ও ভাষাগত চ্যালেঞ্জ উত্তরণের পর (চারশ বছর পূর্বের প্রেক্ষাপট হলেও ভাষা বর্তমানের এবং প্রমিত) এই যে লেখক এই চরিত্রটিকে থামিয়ে দিলেন বা রাশ টেনে ধরলেন এই বোধ গুরুত্ববহ। রওশন আরার সাথের সম্পর্কটুকুর গাঢ়তা লেখক ২০২২ সালের পাঠককে চিন্তা করে খেলিয়ে টানটান উত্তেজনা তৈরি করতে পারতেন বইকি; সম্ভবত কল্পনার আধিক্য বিষয়ে তিনি পূর্ব থেকেই সচেতন ছিলেন বলে সম্পর্কটিকে একটা ইঙ্গিতময়তার মধ্যেই সংযত প্রকাশে বেঁধেছেন। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত বাঙ্গালার নিজস্ব ঘরানার মতোই একটা সিগ্ধতা, শান্তরসের ব্যবহার ঔপন্যাসিক করেছেন। কোথাও খুব টান টান নাটকীয়তার আশ্রয় নেননি বরং লাক্ষ্যার জলের মতোই একটা মৃদু স্রোতে প্রবাহিত হয়েছে।

পারভেজ হোসেন নিজ প্রতিভার জোরেই এই সাধারণ প্রেমের চিত্রটিকে একটা  ফৎধসধঃরপ পষরসবী বা নাটকোচিত পরিণতিতে নিয়ে গেছেন এবং তার মধ্যে মানবমনের গূঢ় তাৎপর্য ও বেদনা ঢেলে এটি সামষ্টিক করে তুলে আর্টের উচ্চস্তরে নিয়ে গেছেন। লাফায়েল-রওশন আরার বিচ্ছেদের সময় তিনি সংলাপের মাধ্যমেই এমন একটা বেদনা উসকে দেন যে তা আর রাফায়েল-রওশনের একান্ত না থেকে সামষ্টিক বিরহের ইঙ্গিত বহন করে―

‘এই জীবনে যুদ্ধ বলো, প্রণয় বলো তা কি কেবল ছাই হওয়ার জন্যে?’

শুধুমাত্র দৃশ্যের জন্ম হওয়া ছাড়া ধেয়ে আসা এই ঘোর সন্ধ্যার আলো-অন্ধকার পার হয়ে কোনও উত্তর আসে না।’ 

এমনকি দিনলিপিতে পর্তুগালকন্যা আদ্রিয়ার সাথে  বিপদসংকুল আরম্ভ হতে অনির্বচনীয় পরিণতি পর্যন্ত যেরূপ অভ্রান্তভাবে একটি সূক্ষè যবনিকার অন্তরাল রাখা হয়েছে, একটি আলো-আঁধারমেশা অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে নীত হয়েছে তা খুব উচ্চ অঙ্গের কলাকৌশলের পরিচায়ক। এই অস্পষ্ট সাংকেতিকতায় (ংঁমমবংঃরাবহবংং) এই প্রেমের রোমান্টিক সৌন্দর্যটি নিবিড়তর করে তুলেছে। যাঁরা হৃদয়বিশ্লেষণকে উপন্যাসের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করেন, প্রত্যেক মানুষকে শ্রেণি বিশেষের আবেষ্টন  ও বাহ্য সংঘাতের অনুচিত প্রভাব হতে মুক্ত করে তার নিজ স্বাতন্ত্র্যবিকাশকে খুব সূক্ষèভাবে যেন অনুবীক্ষণে পরখ করে দেখতে চান খুঁটিনাটি―তাদেরও রাফায়েল, আল আসাদ বা রওশনকে ভালো লাগবে। তাদের অন্তর্মনের যে দোলাচল-দ্বন্দ্ব তা উপন্যাসের প্রথমভাগের পরেই একটা বেশ ভালো জায়গা করে নিয়েছে। বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক তরঙ্গ হতে একটা প্রকাণ্ড ঢেউ মানুষকে নানাভাবে ভাসিয়ে নিতে চায়, এক্ষেত্রে তার সুদীর্ঘ যুগব্যাপী চিন্তার ধীর, মন্থর আত্মবিশ্লেষণ খুবই জরুরি। রাফায়েরের মধ্যে এই বোধ থেকেই হযতো লেখক বারবার তাকে দিনলিপিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। নিরন্তর বিশ্লেষণ করে চলেছেন নিজেকে, সাথে কসমোপলিট্রন মানুষের ইতিহাসে। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের এমনতর বুনন আর কোনও উপন্যাসে আছে বলে মনে পড়ে না। শুধু কৌমগত নয় বরং ইবনে আসাদ ও রাফায়েলের বয়ানে উঠে এসেছে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক শারীরিক, মানসিক, ভৌগোলিক সর্বোপরি সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের এক দলিল। 

প্রকৃতি-বর্ণনাতেও তাঁর কতকটা সজীবতা ও দক্ষতার চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রকৃতির শান্ত-স্তব্ধ-গাম্ভীর্য যেন তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন এবং প্রকৃতি বর্ণনার সময় এই নিবিষ্টভাব তিনি রাফায়েল, আবু আসাদ বা রওশন আরার বয়ানে তুলে এনছেন। বঙ্কিমের কবিত্বময় প্রকৃতি বর্ণনা বা রবীন্দ্রনাথের গূঢ় অন্তরঙ্গ স্পর্শ, জীবনানন্দের  প্রাণ-প্রকৃতির রহস্যময়তা এবং সবচেয়ে বেশি ইলিয়াসের মহাকাব্যিকতার একটা সূক্ষè প্রভাব সর্তক চোখ মাত্রই মিলিয়ে নেবে। সুবর্ণনগরে প্রবেশ পথের বর্ণনায় কাব্যিক ভাষায় ইবনে আল আসাদের বয়ান দেখে নেওয়া যেতে পারে―

এদিকটায় অগম্য গভীর জঙ্গল। মাঝেমধ্যে শস্যখেত চোখে পড়ছে। সবুজ মাঠে গরু, মোষ, ছাগলের পাল চড়ে বেড়াচ্ছে। খেতের ওপারে গাছপালার ফাঁক দিয়ে দু-চারটা বসতবাড়ির ছনে ছাওয়া চাল আর দুর্দিনের গোখাদ্য নাড়া-খরের কুঁড় উঁকি মারছে। এসব ছাড়িয়ে কোথাও কোথাও যতদূরে চোখ যায় সবুজধানের সমতল খেত যেন ফুরাবার নয়।

এরপর আবার নদীর দু’পাড় ঘিরেই শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। এমনই তার গহিনতা সূর্যের কিরণ ভেদ করতে পারে বলে মনে হয় না। গাছের ডালে অজস্র মৌমাছির চাক, কোথাও বা বাঁদরেরা এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফাচ্ছে। ওদের উত্যক্ততার কারণে কি না কে জানে নানা রকম পক্ষীর ওড়াওড়ির বিরাম নেই। আবার কোথাও বিস্তৃত আখের মাঠ পেরিয়ে আনাজ আর তিলের খেত। এসবের মধ্যে সাপ-জোঁক, বাঘ আর মানুষখেকো কুমিরও কিছু কম নেই এ দেশে। স্রোতের সঙ্গে আপনমনে ভেসে চলেছে খুদিপানার বিশৃঙ্খল ঝাঁক। তার উপর দাঁড়িয়ে জলে মাছ খুঁজছে সাদা বক। ভাটির নাও দ্রুতই উধাও হচ্ছে দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে। পালতোলা ওসব নায়ের মাঝিরা হাল ধরে একমনে ভাটির গান গাইছে―আমার গভীর গাঙ্গের নাইয়া―তুমি অফর বেলায় নাও বাইয়া যাওরে, কার বা পানে চাইয়া…’

সামাজিক, গিরস্থজীবন যেন ইতিহাস-বৃন্তে ফুলের ন্যায় ফুটে উঠেছে এখানে। বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা হতে নিজ রস ও বর্ণ গ্রহণ করে ছোট-বড় বন্ধনের নাগপাশে ইতিহাসের সাথে জরিত হয়ে গেছে সময়। ঠিক এ প্রভেদের কারণেই আমাদের এখানকার ইতিহাস ধারার গতি ইউরোপের থেকে ভিন্ন। ইতিহাস কখনও কখনও আমাদের সামাজিক জীবনকে বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরলেও এর সুকুমার বিকাশগুলোকে চূর্ণ-বির্চূণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর মুষ্টি অতি শিথিল। উপন্যাসের শেষটা তাই শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতের সাথে দ্বিরুক্ত করে না―‘সাধারণ লোক অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিপ্লবকেও নিজপ্রাণের মধ্যে কখনও গ্রহণ করে নাই। ―যতদিন সম্ভব ইহাকে অগ্রাহ্য করিয়া চলিয়াছে; যখন নিতান্তই ঘাড়ে আসিয়া পড়িয়াছে তখন ইহার প্রচণ্ড শক্তির তলে মাথা নত করিয়া দিয়াছে। কিন্তু কোনওদিনই ইহাকে অন্তরের বস্তু বলিয়া লইতে পারে নাই, ইহাকে হৃদয়ের আলোড়নের দ্বারা প্রাণবান করিয়া তুলতে চাহে নাই। পাঠান গিয়াছে, মোগল আসিয়াছে―ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রগুলি রক্তরঞ্জিত হইয়া গিয়াছে; কিন্তু এই পরম নিশ্চেষ্ট, পারমার্থিক জাতি তাহার ঔদাসীন্য ত্যাগ করিয়া এই রক্তপাতের সহিত নিজ হৃদয়-রক্তের জ্ঞাতিত্ব স্বীকার করে নাই, এই শোণিতোৎসবে নিজ প্রণমন রাঙ্গাইয়া দেয় নাই।’ এই অপার্থিব সহিষ্ণু হৃদয়ধর্মেরই প্রতিফলন আমরা দেখব উপন্যাসের সমাপ্তিতে নতুন উদ্যোমে এই জাতির সকল পেশাজীবীর নতুন জীবনের পথে হাঁটাকে। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন আসলে এই ভারতের এই সহজিয়া হৃদয়উত্থিত অমৃতকেই ভাষা দিয়েছেন শুধু―‘মনেরে তাই কই যে/ ভালো-মন্দ যাহাই আসুক/ সত্যরে লও সহজে’।

২৪টি ভিন্ন ভিন্ন পর্বে তিনি সুবর্ণনগর, তাদের পেশা, মসলিনের গৌরবময় ইতিহাস-কৌশল, সুবর্ণনগরের জৌলুস, কৃষ্টি, বিশ্বাস, কুসংস্কার, লৌকিক আচার, পরমার্থিক সাধনার সাথে লৌকিকতার মিশ্রণ, আবহাওয়া, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ইতিহাস, পর্তুগিজদের এদেশে বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন, পরবর্তী সময়ে শোষক-দস্যুতার ইতিহাস, মগ বা বার্মিজদের পৈশাচিকতা, মানবপাচার, পর্তুগাল ও মাল্লাকার ইতিহাস এবং সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক ঢাক্কার প্রবর্তনের সাথে সমান্তরালে যুক্ত করে দিয়েছেন উপনিবেশবিরোধী দর্শনের বীজ। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবে পাঠক। শিউরে উঠবে তার এবং পর্তুগিজদের পাশবিকতার কাহিনি পড়ে। এই যে বিজিতের পক্ষের ইতিহাস সম্পর্কে ডায়েরিতে রাফায়েল সামান্য একটি প্রশ্ন তুলেছেন তার মধ্যেই শেকড়সন্ধানী ও উপনিবেশবাদবিরোধী দর্শনের বীজ লুক্কায়িত এবং সম্ভবত এটিই উপন্যাসটির মূল সুতো যার বুননে পুরো সুবর্ণপুরাণ দাঁড়িয়ে আছে। সুবর্ণনগরকে লেখক কেন্দ্র করেছেন সম্ভবত এর বিচিত্র মিলনমেলার তীর্থতার জন্য, বাঙালির রক্তের মিলনের প্রতীকায়নরূপে বা সুবর্ণনগর বাঙালির সেই ‘হারিয়ে যাওয়া সোনার নোলক’ যা আমরা উপনিবেশের পর উপনিবেশে বিস্মৃত হয়ে গেছি। সুবর্ণনগর একইসাথে রাফায়েল বা ইবনে আসাদের কাছে বিশ্বমানবের প্রতীকায়নে নিজ জাতির সেই শেকড়মন্থনী অমৃতের ইউটোপিয়া। রাফায়েলের একটি সংযমী প্রশ্ন তাই নানা দ্যোতনা ছড়ায় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে―

‘এ পর্যন্ত তারা যা কিছু অর্জন করেছে ভবিষ্যতে আরও যা যা করবে, তার পেছনে কোথায়, কখন, কীভাবে ছারখার হয়েছে জনপদের পর জনপদ, অনেকেই হয়তো তার কিছুই জানবে না। জানতে চাইবেও না। সবাই বিশ্বাস করবে সবই তাদের বাণিজ্য দিয়ে অর্জন। সবই তাদের বীর নাবিকদের বুদ্ধিমত্তা, শ্রম আর সাহসিকতার ফসল। ইতিহাসবেত্তা, বুদ্ধিজীবী কলম খুলে নিজেদের গৌরব আর প্রসিদ্ধির কথা যখন লিখবেন সেই লিখনে এর কিছুই কী স্থান পাবে?… অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়ে কোন জাতি কবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে? দুনিয়ার এ-ই হয়তো রীতি!’

সুবর্ণপুরাণ ইতিহাসের সংশয়হীন ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত; এর সমান্তরালে যেসব কাল্পনিক বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে, তারা কেবল ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর মধ্যে দ্ব্যর্থহীনভাবে যোগসূত্র স্থাপন করেছে, শুষ্ক ইতিহাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে শূন্যস্থানটুকু আছে, তার রসে ও বর্ণে ভরে তুলেছেন। লোকসংস্কার-বিশ্বাসের অবতারণা করতে যেমন মনসা, চন্দ্রাবতীর পালা, সূর্যব্রত, মাঘব্রত এবং নানা শাস্ত্রীয়-অশাস্ত্রীয় আচারের কথা তুলে এনেছেন, ফুটিয়ে তুলেছেন সোনাবিবির বা লৌকিক কাহিনিগুলোও। মাজার কেন্দ্রিক মানতসম্প্রীতির দেখা তাতে যেমন ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আছে তেমন আছে নিম্নবর্গীয়দের নানান খেলাধুলো, আনন্দ-উৎসবের চিত্র। নানান পেশাজীবী যেমন―ধাঙর, চামার, ধোপা, কামার, কুমোর, শাখারি, ধীবর, তাঁতি―তাদের মধ্যেও আবার সুতাকাটানি, নারোদিয়া, কণ্ডুগার, চিকনকারি, নিকারি, বেইদ্যা ইত্যাদির প্রসঙ্গ মসলিনের জমিনের মতোই বুনে গেছেন। নৌ চলাচলই যেহেতু একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা তাই নানা আকারের, কাজের নৌকার নাম, যেমন―গয়না, পঙ্খীরাজ, কোষা, পেটফোলা পটলনাও, গাছি নাও, বাঘেলা, ঢাঙ্গি, দেশীয় বণিকদের বাণিজ্যপোতা―শঙ্খধর, চন্দ্রধর, শ্রীমন্ত প্রভৃতির ব্যবহার করেছেন সফলতার সাথে। মসলিনকেন্দ্রিক বা বলা যায় সুবর্ণনগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বলে এত ধরনের মসলিনের নাম এবং বিশেষ করে তার বিভিন্ন সুতাকাটা কৌশল থেকে শুরু করে মসলিন সম্পর্কে এত তথ্য ও জ্ঞান পাঠককে আলোড়িত মুগ্ধ করবে। যেমন―নয়নসুখ, বদনখাস, সরবুটি, সরবন্দ, কাসিদা, মলবুসখাস, বেগমখাস, খাস্সা, শবনম, আবে রঁওয়া, সরকার-ই-আলা, মল মল খাস। মানুষের পোশাক-গয়না, খাবার, স্থাপত্যশৈলী, ভারতীয় উদারনীতি, মিশ্র ভাববাদী দর্শন, প্রবাদ-প্রবচন, গানের প্রাসঙ্গিক ব্যবহার নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসটিকে একটি উচ্চমাত্রা দান করেছে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

ইতিহাসের রসহীন অস্থির মধ্যে প্রাণসঞ্চারের জন্য ঐতিহাসিক বাহ্যঘটনাকে মানুষের প্রকৃত জীবনের ও হৃদয়াবেগের সাথে মানবমনের নিগূঢ় রসলীলার সাথে সম্পর্কিত করতে যে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন এবং সে কল্পনার রাশ আবার সংহতিতে বাধা থাকবে― এতগুলো বিষয়ের সমন্বয়ে পারভেজ হোসেন সাবলীলভাবেই উৎরে গেছেন বলে দাবি করা যায়। ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধিতা নয়, অনুকরণ নয় বরং সত্যের দিকে অনুগামী হয়ে সুবর্ণপুরাণতার ঝরঝরে প্রবাহমান গদ্যে, উপমার কারুকার্যতায়, চিত্ররূপকল্পময়তায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙ্গলার মানুষের নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদের শেকড়সন্ধানী পুরাণ।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button