পথে এক বিপন্ন কাঙাল : জাহিদ হায়দার

মূল রচনা : শব্দঘর নির্বাচিত সেরা বই ২০২২
ইতি ও নেতির মাঝখানে অথবা ঐ দুই ব্যবহার-ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যাপনের জীবনকে নিয়ে, চারপাশের সকল প্রেক্ষাপটের মধ্যে জেগে থেকে প্রতিটি মানুষকে অর্জনের বা ক্ষরণের আঁধার হতে হয় এবং দেখা গেছে, যে-জন অনুভব ও অনুভূতির বিশেষ মাত্রায় সমগ্রের মধ্যে নিরন্তর পীড়িত হন এবং কিছু অর্জন করেন, তিনি কখনও কখনও বলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তার অভিজ্ঞতার কথাসরিৎ। এই অর্জিত অভিজ্ঞতা শব্দের সমবায়ে চিত্রিত করবার চেষ্টা করেন কবি। ঐ চিত্রায়নে কখনও আড়ালের বিভাব থাকে, কখনও জায়মান থাকে ‘আমরা কজন মীরার ভজন শুনি’র ধ্বনি-প্রতিধ্বনিমূলক উচ্চারণের নিবিড়তা।
পৃথিবীর প্রথম কবি সেই জন, যে-জন সীমাহীন কল্পনার প্রহরে ভেসে যেতে যেতে প্রথম বলেছিলেন ঈশ^র, স্বর্গ-নরক, প্রথম মানব-মানবী, ফল খাওয়া এবং পৃথিবীতে মানুষের চলে আসবার আখ্যান। লক্ষ্য করবার ব্যাপার, ঐ আখ্যানে আছে আনন্দ, কষ্ট, প্রেম, দূরত্ববোধ, স্পর্শ, স্পর্শহীনতা, জন্ম পাবার দায় ও অলৌকিকে বিশ^াস এবং অবিশ^াস এবং এক আশ্রম ও সঙ্গ খোঁজার শ্রমযাত্রা।

ঐ প্রথম কবির ভাবনা ও কর্ম প্রকাশের (উল্লিখিত বিষয়গুলোর) ভার কতটা বহন করছেন এবং কীভাবে করেছেন খালেদ হোসাইন তাঁর শব্দ, ভাব ও গল্পবুননে (যা বুনন করতে প্রতীক, চিত্রকল্প, অনুপ্রাস এবং বিষয়ের বিবেচনায় ছন্দ-গ্রহণ) তার রসায়ন বোঝার চেষ্টা করতেই হবে। সব নির্মাণেই রসায়ন আছে।
খালেদ হোসাইন পৃথিবীর প্রথম কবির পরে কততম কবি সে হিসাব করবার দরকার নেই। তাঁর কাব্যগ্রন্থ পথ ঢুকে যায় বুকে-র কবিতাগুলো পড়ে আমরা পাঠকেরা কী কী পাচ্ছি তার একটা হিসাবরেখা, এই হিসাবরেখা সরল বা বক্র বা ভুলও হতে পারে, আর ভুল হতে পারে বলেই অন্য এক জন পাঠক পেতে পারেন অন্য এক পথ। সব পথের গন্তব্য আনন্দপূর্ণ হবে, এমত আশা করে বলেই মানুষ পথনির্মাণ ও অতিক্রম করে।
পথ ঢুকে যায় বুকে কাব্যগ্রন্থে পাঠক জীবনের সামনে পড়া, পেছনে ও সঙ্গে থাকা অনেক প্রশ্নের মুখোমুখী হবেন, নিজের জন্যে, সমাজের জন্যে কতটা উত্তর পাওয়া যাবে সে-কথা ব্যক্তি সাপেক্ষে বিচার্য, যা জীবনকে দেখার ও বোঝার জন্যে সহায়ক। দ্রষ্টব্য : ‘কবিতা পড়ো না তুমি, মিছিলে যাবে না?’ কবিতাটি। এই কবিতার শেষ আট পঙ্ক্তি প্রশ্নমুখর এবং লেখা ক্যাটালগিক ফর্মে।
কবি মাত্রেই কাঙাল। কাঙাল কী পেতে চায় ? (‘হরিনাথ আসবেন’ কবিতার পঙ্ক্তি : ‘নইলে আমি কাঙালের মতো/ দাঁড়িয়ে আছি কেন?’।), কী ত্যাগ করতে চায় ? প্রশ্ন মৌলিক। উত্তর পেতে হলে পথ ঢুকে যায় বুকে-র ‘অতিপর্ব’-র চারটি পর্ব : (১) ‘তবু এ কেমন ব্যবহার?’, (২) ‘অন্ধ’, (৩) ‘গল্পটি মাঝ-রাত্তিরের’ এবং (৪) ‘ধুলোতে এবং ঘাসে ঘাসে’, পড়তে হবে। (বিশেষ ভাবে খেয়াল করবার মতো ব্যাপার, আর তা হলো, এই ‘অতিপর্ব’ অংশটি খুবই সচেতনভাবে আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের মাঝখানে রাখা হয়েছে, যেন পথ ঢুকে যায় বুকের মেরুদণ্ড।)
গ্রন্থটির নামে ‘বুক’ শব্দটি না লিখে কেন ‘হৃদয়’ লেখা হলো না ? কবিদের একটা প্রিয় শব্দ ‘হৃদয়’। কিন্তু সাধারণ মানুষরা বলে, ‘বুকে ব্যথা’, ‘বুকের মধ্যি ফাঁকা ফাঁকা লাগে’, ‘বুকটা খালি হ্যয়ে গেল’ ইত্যাদি। ‘আমরা কজন’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘হৃদয়তীর্থে’ মনে রেখেই বলছি, খালেদ সাধারণ মানুষের উচ্চারিত শব্দটি ব্যবহার করেছেন। খুব ভালো করেছেন। ‘অতিপর্ব’র তিন সংখ্যক পর্বটির বানান লক্ষ্যণীয়, লিখেছেন ‘রাত্তির’, লিখতে পারতেন রাত্রির। সব পর্বের আগে জীবনের নানান অবস্থার মধ্যে একটা অদৃশ্য ‘অতি’ থাকে (খালেদ এই ‘অতিপর্ব’ অংশে ৩, ৫, ৪, ২ ও ৬ মাত্রা অতিপর্ব করেছেন) যা পরের অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতেও পারে। ঐ ‘অতিপর্ব’গুলি শেষ পর্ব হিসাবে ব্যবহার করলেও মাত্রাবৃত্তের ছন্দমাত্রা ঠিকই থাকত। যেমন, ‘খুঁজি তাকে সকল সমতলে/ শিকড়ে এবং বল্কলে’, এই দুই পঙ্ক্তির অতিপর্ব যথাক্রমে ‘খুঁজি তাকে’ এবং ‘শিকড়ে।’ ঐ চার মাত্রার ‘খুঁজি তাকে’ ‘সকল সমতলে’র পরে অতি মাত্রা বা পর্ব হিসাবে সহজেই ব্যবহার করা যেত। এবং পরের পঙ্ক্তির ক্ষেত্রেও ‘এবং বল্কলে’-এর পর তিন মাত্রার ‘শিকড়ে’ অতিপর্ব হিসাবে রাখতেই পারতেন খালেদ। মাত্রাবৃত্তের সহজ হিসাবে (৬/৬/২) তিনি থাকেননি। অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
‘পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!’ বড়ো ফিলোসফিকাল বিস্ময় (বরীন্দ্রনাথ বিস্ময়চিহ্নটি কেন ব্যবহার করেছেন মনে রাখতে হবে)। গীতবিতানের পূজা পর্বের ৬১৫ তম সংগীত। অশেষ সম্পর্কে বিস্মিত হয়ে অসহায় হয়ে যাওয়া। ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম’ অন্যরকম শান্তি আশ্রমের দিকে যাবার হাহাকার। খালেদের ‘পথ’ও গন্তব্য খোঁজায় চলমান। যদিও বলছেন, অঞ্চল তার ‘বুক’।
খালেদ হোসাইন-এর অন্য একটি কাব্যগ্রন্থের নাম পায়ের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে পথ। আমরা ভাবতেই পারি, পায়ের তলায় দাঁড়ানো পথ এখন কবির বুকে ঢুকে যায়। এই যাওয়া নিরন্তর। ঢুকে যাবার পর গন্তব্য দেখায় কি না সন্দেহ হতে পারে। ‘অতিপর্ব’ অংশে চার বার ‘বুকের মধ্যে থাকে’ এবং এক বার ‘বুকের মধ্যে ভয়’ যে-দাবি করে বা যে-কথার মধ্যে পাঠককে নিয়ে যেতে চায় তার হিস্যা ‘বুক ভরা ঘোলাজলে’ ‘গুপ্ত যাতায়াত’-এ সচল থাকে। ‘পথ’ শিরোনামের কবিতায় খালেদ মৃত্যুর কথা বলছেন : ‘যারা পথ আগলে ছিল―/ মাটির গভীরে যাচ্ছে। / কেউ অগ্নিগর্ভে।’ অবশ্য ‘খালি হাতে ফিরে যাচ্ছি, ভারাক্রান্ত মন’ বলবার পরেও ‘হরিনাথ আসবেন’ কবিতায় খালেদ অপেক্ষা করেন আশা নিয়ে : ‘নিশ্চয়ই হরিনাথ আসবেন―নইলে আমি কাঙালের মতো/ দাঁড়িয়ে আছি কেন?’
পথ ঢুকে যায় বুকে-র উৎসর্গ-পত্রর নিচে দুটো পঙ্ক্তি : ‘আমার পায়ের তলায় ভাসমান আকাশ/ আমি এক অতি সামান্য মেঘপালক’ যে-সাক্ষ্য দিচ্ছে তা থেকে বোঝা যায়, ‘মেঘপালক’ আসলে অনন্ত পথের পথিক। (অবশ্য কারও মনে পড়তে পারে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বোদলেয়ারের ‘অচেনা মানুষ’ কবিতার বিখ্যাত পঙ্ক্তি : ‘আমি ভালোবাসি মেঘ… চলিষ্ণু মেঘ… ঐ উঁচুতে…, ঐ উঁচুতে।’ কিন্তু আমরা বলতে পারি, খালেদ-এর ‘মেঘপালক’ শব্দনির্মাণ নতুন এবং অন্য চিত্র সার্থকভাবে ধারণ করছে। আমরা আরও বলতে পারি, ‘পালক’ হতে চাইলে ভালোবাসতে হয়।)
২.
খালেদ হোসাইন জানেন, কোন কবিতার জন্যে, কোন বিষয়ের জন্যে কোন ছন্দ এবং শব্দ পরিমিতের গ্রাহ্যে নিতে হয়। প্রবহমান গদ্যে (দ্র. ‘পৃথিবীর বাইরে’) কবিতা লিখতে গেলে প্রতিটি শব্দের পারস্পারিক দৃশ্য ও ধ্বনিরূপ না বুঝলে বা না জানলে গদ্যে বলা কবিতা অপাঠ্য হয়ে যায়। (কোনও পাঠকের ইচ্ছে হলে রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’ পড়বেন।) খালেদ সাবলীল দক্ষতায় আমাদের সামনে তার রূপ দিয়েছেন। আবার ‘বুকভরা ঘোলাজল’-এ খালেদ যখন তাঁর বদলে যাওয়া জীবনের গল্প আমাদের বলেন, সেখানে তিনি সামাজিক-চর্যায় ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে (‘তাহাজ্জুতের নামাজ’, ‘গজারি-লাকড়ি’ ইত্যাদি) সংস্কৃত শব্দের (‘প্রতীক্ষা’, ‘প্রতিবিম্বিত’, ‘ভস্ম’, ‘ক্ষিপ্র’ ইত্যাদি) ব্যবহার করে অনেকরকম চিত্র সামনে তুলে ধরেন।
যদি কবিতার কোনও পাঠক আগ্রহী হন ছন্দ-ব্যবহারের (অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত এবং সনেট) রীতি ও কৌশল-প্রকৌশল সম্পর্কে, তা হলে ‘পথ ঢুকে যায় বুকে’ পড়তে পারেন। এবং দেখা যাবে, খালেদ নিজের পরিচর্যায় ঐসব ছন্দকে কী ভাবে কবিতার বিষয় ও ভাবের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন।
আমরা ‘পথ ঢুকে যায় বুকে’ পড়ে ক্যাটালগিক পয়েট্রির ফর্মের (দ্র. ‘দৃশ্য নয়, যেন দীর্ঘশ^াস’, ‘শান্তি আমি অনেক পেয়েছি জীবনে―’, ‘আমরা কজন’, ‘যে আমি সে-ই তুমি’, ‘আমার কষ্ট’ ইত্যাদি) ব্যবহার দেখছি। খালেদ ঐ ফর্ম নিয়েছেন নিজের মতো করে। যেমন, ‘শান্তি আমি অনেক পেয়েছি জীবনে―’ কবিতার মাঝখানের সাতটি স্তবকে ক্যাটালগিক (শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ স্মর্তব্য) ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে নিপুণ দক্ষতায়। অন্য যেসব কবিতার শিরোনাম ব্রাকেটের মধ্যে করেছি সেখানেও ঐ ফর্ম ব্যবহার করেছেন সার্থকভাবে।
‘পথ’ কবিতায় ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ পঙ্ক্তিটি বিষ্ণু দে’র বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম। খালেদ পঙ্ক্তিকে ঊর্ধ্বকমায় আটকে না দিয়ে ভালো করেছেন। বিষ্ণু দে’র কবিতা না পড়ে খালেদের কবিতা পড়তে আসবার দরকার নেই। অনেকে জানেন, বিষ্ণু দে কবিতার বিষয় বলবার প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথের অনেক পঙ্ক্তি (বিখ্যাত উদাহরণ : কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে রজনীগন্ধা বনে।) ব্যবহার করেছেন। এবং রবীন্দ্র-পঙ্ক্তিতে ঊর্ধ্বকমা দেননি। কারণ রবীন্দ্রনাথ না পড়ে আমার কবিতা (বিষ্ণু দে’র) পড়বে না।
কোনও পাঠক যদি ‘পথ ঢুকে যায় বুকে’ অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হন তা হলে কাব্যগ্রন্থটির দুই ব্লার্বে অভী চৌধুরীর লেখাটি পড়তে পারেন। এবং কবিতাগুলো পড়বার পর নিজেই বিচার করতে পারবেন ব্লার্বের কথন বা অতিকথন খালেদের কবিতার সৌন্দর্য, দর্শন-ভিত্তি এবং ভাষ্যকে আপন করে কি না।
৩.
আমি যখন কোনও গন্থের আলোচনা করবার চেষ্টা করি, তখন গ্রন্থটির মধ্যে বিষয়পর্ব কোন্ কোন্ শ্রম-প্রচেষ্টায় লেখক কীভাবে বলবার চেষ্টা করেছেন তার সূত্র ধরিয়ে দিতে আগ্রহী হই। হতে পারে, আমার তুলে ধরবার রীতি ও বুঝ ভুল, কিন্তু ঐ রীতি ও বুঝ বুঝে নেবার দায় কেবল আমারই।
লেখক : কবি, গল্পকার



