বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি : প্রকাশনাশিল্পের ব্যাকরণ : স্বপন নাথ

মূল রচনা : শব্দঘর নির্বাচিত সেরা বই ২০২২
“বাংলাদেশে এখন এডিটরের কাজ হচ্ছে প্রুফরিডারের কাজ। কিন্তু ইংল্যান্ডে এডিটরকে মজা করে বলা হয়, ‘অক্সব্রিজ’। অর্থাৎ অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ দুটো মিলিয়ে উৎপাদিত একটা বুদ্ধিজীবী―সে হবে এডিটর। এতটাই মর্যাদাশীল একটা জায়গা।” [নাজির, চিহ্ন (ইকবাল) ২০২২ : ১৭৪]
বদিউদ্দিন নাজির সম্পাদনা ও প্রকাশনাশিল্পের অনন্য এক শিল্পী। এসব কাজে তাঁর এ নিবিষ্ট থাকার প্রমাণ রেখেছেন বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি [২০২২] গ্রন্থে। উল্লেখ্য যে, এভাবে তাঁর এ নিবিষ্টতা আর কারও মধ্যে আছে কি না, জানা নেই। বস্তুত, তিনি সম্পাদনা ও প্রকাশনা শিল্পেই তাঁর জীবনকে নিবেদন করেছেন। তিনি কীভাবে এ শিল্পকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিলেন, এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বলেছেন; এ বয়ানেও আছে সেই উপলব্ধি। তাঁর কথা :
“সময় কাটানোর জন্য প্রত্যেক মানুষের কিছু সখ থাকা ভালো। যেমন ধরুন, গান শোনা বা গাওয়া। খুব সিলেক্টেড কিছু লোক জানে যে, গান শুনে ভালো লাগে। মানুষের ‘নিজস্ব বিনোদন’ বলে একটা কথা আছে। তার নিজর ভালো লাগার একটা আলাদা জায়গা আছে। কারণ প্রত্যেক মানুষই তো একা। ফলে নিজের ভালো লাগার জায়গা থেকে ওগুলো করা আর কি। মূলত, শিল্প এমন একটা জিনিস―নানান জনে নানান কারণে শিল্প করে। আনন্দ পায়। আর মানুষ আনন্দে না থাকলে, মনকে আনন্দের মধ্যে না রাখতে পারলে তা দিয়ে ‘সৃষ্টি’ হয় না। ক্ষোভ দিয়ে, ক্রোধ দিয়ে, শিল্প সৃষ্টি হয় না। যত অভাবই থাকুক, যত কষ্টই থাকুক না কেন, মনের মধ্যে আনন্দের জগতটা তৈরি করতে হবে। না পারলে কোনও কাজই এগোবে না। গুতিয়েও এগোতে পারবেন না। কারণ ‘শিল্প’, ‘সৃষ্টি’ ও ‘আনন্দ’― তিনটি পরস্পর সম্পূরক।” [ইকবাল ২০২২ : ১৮৫]
এ আনন্দের মধ্য দিয়ে তিনি অনেক অভিজ্ঞতার ধাপ অতিক্রম করেছেন। ধাপ অতিক্রমণেই নাজির উপহার দিয়েছেন এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। যা আমাদের না জানার ভূগোল উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কারণ জেনে-বুঝে যে এ শিল্পে কাজ করতে হয়, এ বিষয়ে আমরা উদাসীন। তাঁর লেখালেখির লক্ষ্য লেখকের দায়-দায়িত্ব, সম্পাদনা এবং প্রকাশনার মানোন্নয়ন বিষয়ক হলেও, পরিশেষে প্রকাশনাশিল্পের শাখা-প্রশাখায় চিন্তা প্রসারিত করেছেন। যা থেকে সহজবোধ্য ভাষায় আমরা প্রকাশনাশিল্পের খুঁটিনাটি বিষয়ে ধারণা গ্রহণ করি। যেক্ষেত্রে এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বাস্তবতা যা-ই হোক, প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের বাজার-ব্যবসায় আমরা জড়িত। কিন্তু মুদ্রণশিল্পের নানা বিষয়, প্রকাশনা শিল্পের ভেতর-বাহির নিয়ে অতি অল্পই জানি আমরা। স্বীকার করতে হবে, না জেনেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে অনেকেই শুধু কাজ করতে করতে চমৎকারিত্বের নজির স্থাপন করেছেন। এছাড়াও প্রকাশনার কাজে স্বীয় কৃতী ও কৃতিত্বে নান্দনিক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।

তারপরও কারা যেন লেখক-প্রকাশক -সম্পাদক-মুদ্রণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক রাখতে রাজি নয়। এখানে কেমন জানি লুকোচুরি সম্পর্ক চলমান। তবে এর বিপরীতে আশার কথাও আছে। যেভাবে এ শিল্প এগোচ্ছে, তাতে প্রক্রিয়ার মধ্যেও প্রতিটি উপাদানের সম্পর্ক বিকাশমান, তা আমরা লক্ষ্য করছি।
মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস বিষয়ক বই বা নানা রচনা পাওয়া গেলেও বাংলা ভাষায় টেকনিক্যাল কোনও লেখা আছে বলে আমাদের জানা নেই। সম্পাদনা, প্রকাশনা শিল্প নিয়ে আমাদের দেশে ব্যবহারিক কোনও লেখালেখি এর আগে হয়নি। আমরা সাধারণত পাঠ করি―ছাপাখানা বা মুদ্রণযন্ত্রের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাদি। সম্প্রতি সম্পাদনা বিষয়ক কিছু লেখালেখি লক্ষ্য করছি। যেগুলোর মধ্যে অধিকাংশের বিষয় হলো সাংবাদিকতা ও বানান শুদ্ধিকরণ। সামগ্রিকভাবে সম্পাদনা ও প্রকাশনা নিয়ে বই এখনও অনুপস্থিত। এমন বাস্তবতায় বদিউদ্দিন নাজির লিখিত বই―বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি গ্রন্থটি এ শূন্যতা পূরণ করেছে। তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন―প্রকাশনা শিল্প, লেখকের করণীয়, প্রকাশনার অভিযাত্রা, বই প্রকাশনার প্রস্তুতি, গবেষণার বিষয়-আশয়সহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ। ফলে গ্রন্থটি লেখক-গবেষক-পাঠকের চাহিদা পূরণ করবে। একইসাথে সম্পাদনার কৌশল বিষয়ে জানা যাবে। ফলে লেখক-পাঠক-প্রকাশক-গবেষক সকলেই উপকৃত হবেন বলে আমাদের বিশ^াস।
পাণ্ডুলিপি তৈরি ও প্রকাশনাবিষয়ক বিবিধ কর্মকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা বই প্রকাশ করতে ইচ্ছুক। যে কারণে প্রকাশনা জগতে চলছে বিশৃঙ্খলা। আমরা টের পাই না, বা আমলে নিতে চাই না গলদটা কোথায়। পরিণামে চলছে ভুল, বিকৃতি ও অশুদ্ধতার উৎসব। পরিচ্ছন্ন প্রকাশনার অংশকে গ্রহণ করেই কথাগুলো বলছি। কিন্তু ভেজালের অংশ বেশি বলে আমাদের আরও সচেতন থাকা দরকার মনে করি। এ জরুরি বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। সকল কাজেই একটা প্রস্তুতি থাকে, প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তা-ই। সুতরাং, প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হয়, পাণ্ডুলিপি কীভাবে তৈরি করতে হয় এবং সম্পাদনার বিচিত্র প্রসঙ্গ এ গ্রন্থপাঠে উপলব্ধি করা সম্ভব। আমরা স্বীকার করছি―বইটিরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। বিস্তৃত বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, প্রয়োজনীয় উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও সমগ্রতা ধারণ এক মলাটে সম্ভব হয় না। এ পরিসরে বদিউদ্দিন নাজিরের যা-কিছু বলা সম্ভব হয়েছে, তা সবই আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বইটির মুখবন্ধে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন―‘বইটির একটা শক্তির জায়গা হচ্ছে এর ভাষা। মেদহীন, ঝরঝরে ভাষা, যে রকম ভাষা অনেক কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দিতে পারে। বোঝাই যায়, বইটি বদিউদ্দিন নাজিরের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফসল। তারপরও লেখক এই দাবি কখনো করেননি যে এটি কোনও মৌলিক কাজ, বরং তিনি জানাচ্ছেন, বইটি লেখার ধারণাটি মৌলিক। তবে আমার মনে হয়েছে শুধু ধারণা নয়, বাংলাদেশি লেখকদের কথা বিবেচনা করে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তাদের কতটা এবং কীভাবে পরিবেশন করা হবে, এই চিন্তা এবং লেখকের অন্তর্দৃষ্টিগুলো মৌলিক, যেমন মৌলিক নানা উদাহরণ, সাক্ষাৎকার ও মন্তব্যের সন্নিবেশও।’ [২০২২ : ী ]
পাঠক হিসেবে আমরা মনে করি―প্রকাশনাশিল্পের আপাত-চাহিদা ও শূন্যতা পূরণ করবে, তা বলাই বাহুল্য। উল্লেখযোগ্য যে, বদিউদ্দিন নাজির চমৎকারভাবে বইয়ের বিষয়বস্তু বিন্যস্ত করেছেন। গ্রন্থটি এগারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত। তা হলো : প্রথম অধ্যায় : পাণ্ডুলিপির বিষয়ে প্রকাশকদের পছন্দ-অপছন্দ; দ্বিতীয় অধ্যায় : লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা; তৃতীয় অধ্যায় : বই লেখার জন্য গবেষণা; চতুর্থ অধ্যায় : পাঠক আকর্ষণের অব্যর্থ তিনটি উপায়; পঞ্চম অধ্যায় : বই লেখার কয়েকটি গুপ্ত বিপদ; ষষ্ঠ অধ্যায় : কপিরাইট ও অনুমতিপত্র; সপ্তম অধ্যায় : থিসিস থেকে বই; অষ্টম অধ্যায় : রিভিজন ও সেল্ফ-এডিটিং; নবম অধ্যায় : প্রুফরিডিং; দশম অধ্যায় : বইয়ের ইনডেক্সিং বা নির্ঘণ্ট প্রণয়ন; একাদশ অধ্যায় : প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি। শেষে রয়েছে, পরিশিষ্ট―লেখক-প্রকাশক চুক্তির নমুনা, পরিভাষাকোষ ও নির্ঘণ্ট।
আনুপাতিক বিবেচনায় এ দেশে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশনার সংখ্যা মোটেও বেশি নয়। তবে যা আছে সেগুলোর কাম্য মান বজায় রাখতে পারছি না। লক্ষণীয়, লেখক-প্রকাশকের ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে কোনও পক্ষই সিরিয়াস নয়। অনেকেই প্রকাশনাশিল্পের ন্যূনতম মানদণ্ড না মেনে, কিংবা নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে প্রকাশনা কাজে নিয়োজিত। প্রায়শ শোনা যায়, প্রকাশকেরা লেখকদের মূল্যায়ন করেন না। অন্যদিকে প্রকাশনার জন্য মৌলিক কিছু বিষয়ে প্রস্তুতি লেখকদের মধ্যেও নেই। ফলে একুশের বই মেলা ও বছরব্যাপী এত বই প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও পাঠকদের হাতাশাবাচক কথা শুনে আমরা অভ্যস্ত। লেখা যেমন সৃজনশীল, প্রকাশনার কাজটিও তাই। কিন্তু বাস্তবতায় তা মানি না। এর মধ্যে লেখক নাজির এ বইয়ের মাধ্যমে কী বার্তা দিয়েছেন আমাদের। বস্তুত কোনও প্রস্তুতি, জরুরি সম্পাদনা, শুদ্ধাশুদ্ধি নিরীক্ষা ব্যতীত কোনও পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করা যাবে না। এক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত লেখক প্রকাশক উভয়কেই স্ব-উদ্যোগে মানতে হবে।
আমরা জানি নতুন লেখকের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকরা নির্বাচন করতে আগ্রহী নন। তারা জানেন যে, একজন লেখক নতুন থেকেই এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকেন। আবার কখনও লেখার মান যথেষ্ট ভালো হওয়া সত্ত্বেও তারা গ্রহণ করতে চান না। লেখকের পরিচিতি না থাকলে তিনি প্রথম দর্শনেই অগ্রাহ্য হন। যেখানে পেশাগত শব্দটি এখনও অনুপস্থিত। বাণিজ্যিক বিষয়াবলি মুখ্য। পাণ্ডুলিপি গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নির্বাচনে সব দেশেই কমবেশি সমস্যা আছে। তবে আমাদের দেশে বেশি বলে অনেকেই মনে করেন। মূলত প্রকাশকেরা কোনও রিস্ক নিতে চান না। এ পরিপ্রেক্ষিতে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, নির্বাচনে কয়েকটি প্রয়োজনীয় কথা বলেছেন তিনি। এক্ষেত্রে চারটি ‘এ’-র কথা বলেছেন। এগুলো হলো : ‘এ ফর অথরশিপ’, ‘এ ফর অথেনটিসিটি’, ‘এ ফর অ্যাকশন’, ‘এ’ ফর অথরিটি’। পাণ্ডুলিপি নির্বাচন, বাছাই, সম্পাদনায় ফিকশন ও নন-ফিকশন অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হয়। কারণ একই স্কেলে, একই মানদণ্ডে বিভিন্ন ধরনের পাণ্ডুলিপি বাছাই ও সম্পাদনা করা যায় না। এসব বিভিন্ন বিষয় প্রকাশক, সম্পাদকের ভাবনায় রাখা জরুরি। লেখকের উদ্দেশ্যেও কিছু কথা রয়েছে। যেসব না মানলেও কখনওই একটি ভালো প্রকাশনা সম্ভব নয়। কখনও লেখক নিজের লেখা যখন সম্পাদনা করেন, তখন লেখককে একই অস্তিত্বে লেখক ও সম্পাদকের বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল রাখতে হয়। প্রথমত নন-ফিকশন গবেষণামূলক, বা একাডেমিক পাণ্ডুলিপি লেখক কীভাবে সাজাবেন, এর একটি ক্রম-তালিকা নাজির উল্লেখ করেছেন। (১) শিরোনাম পৃষ্ঠা, (২) উৎসর্গ (অথবা এপিগ্রাফ), (৩) সূচি, (৪) ইলাস্ট্রেশনসমূহের তালিকা, (৫) সারণির তালিকা, (৬) ভূমিকা, (৭) প্রারম্ভ, (৮) কৃতজ্ঞতা স্বীকার, (৯) সূত্রপাত/ উপক্রমণিকা, (১০) সংক্ষেপকরণ বা কাল নির্ঘণ্টের তালিকা, (১১) রচনার মূল অংশ, (১২) পরিশিষ্ট, (১৩) টীকা, (১৪) শব্দকোষ, (১৫) গ্রন্থপঞ্জি, (১৬) যাঁরা লিখেছেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ তালিকা, (১৭) নির্ঘণ্ট। [৩২]
উল্লেখযোগ্য যে, পাণ্ডুলিপি বারবার প্রত্যাখ্যানের বিষয়ও রয়েছে। কখনও প্রকাশক সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলীর অভিমত ছাড়াই পাণ্ডুলিপি বাতিল করে থাকেন। পৃথিবীতে এমন ঘটনার সংখ্যা প্রচুর। জীবনের কোনও এক পর্যায়ে যে লেখক প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন বা বেস্টসেলার হয়েছেন, এমন লেখকদের লেখাও বাতিল হয়েছে। এ বইয়ে প্রত্যাখ্যাত এবং প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন লেখকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক হতে গেলে প্রাত্যহিক চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও লেখককে স্বনির্বাচিত শৃংখলা মানতে হয়। এ শৃঙ্খলা ছাড়া লেখা ও প্রকাশনার মানোন্নয়ন করা যায় না। এ বিষয়ে উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন কয়েকজন লেখকের কথা।
প্রকাশকের দায়িত্বের সঙ্গে লেখকের দায়িত্বও রয়েছে। পাণ্ডুলিপি প্রকাশনা সংস্থার কাছে প্রেরণের আগে লেখক নিজেই বারবার সংশোধন, পরিমার্জন ও উন্নয়ন করবেন। যাকে নাজির বলেছেন, স্ব-সম্পাদনা [ংবষভ-বফরঃ]। এর মানে হলো লেখককে স্ব-সম্পাদনা সম্পর্কে জানতে হবে। প্রকাশক তার মতো পাণ্ডুলিপি এডিট করবেনই তবে এ বিষয়ে প্রকাশকের অপেক্ষা করা হবে লেখকের জন্য বিপজ্জনক। এজন্য রিভিজন ও সেল্ফ-এডিটিং সম্পর্কে আলাদা অধ্যায়ে তিনি বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। অবশ্য সেল্ফ-এডিট ও পেশাদার সম্পাদকের কাজের মধ্যে একটি রেখা টেনে দিয়েছেন। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত একজন লেখকের পাণ্ডুলিপি চূড়ান্তকরণে খেয়াল রাখতে হয়। ‘একসঙ্গে সকল ইস্যু নিয়ে সেল্ফ-এডিটিং কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দক্ষ সম্পাদক হয়তো এটা করতে পারেন, কারণ সম্পাদনা তাঁর পেশা। কিন্তু আপনি লেখক, তাই চরিত্রগত ও দক্ষতার দিক থেকে আপনি ওই সম্পাদকের কাছাকাছিও নন। বারংবার ওই কাজ করে প্রকাশকের সম্পাদক যে দক্ষতা অর্জন করেছেন, আপনি লেখক থেকে সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে ওই দক্ষতা একেবারেই অর্জন করতে পারবেন না।… আপনি প্রথম দফায় খসড়াটির মূল্যায়ন করুন। কী কী অসঙ্গতি দেখলেন পৃষ্ঠা ধরে ধরে তার নোট করুন অথবা মার্জিনে পেনসিল দিয়ে লিখে রাখুন।… দ্বিতীয় দফায় খসড়া থেকে অতিরিক্ত শব্দ, দুর্বোধ্য শব্দ, ক্লিশে দূর করুন বা প্রয়োজনমতো বিকল্প শব্দ বসান। এভাবেই আপনি এক এক দফায় এক একটি ইস্যু সামনে আনুন এবং সেই মতো সম্পাদনার কাজ চালিয়ে যান।’ [২১৮-২১৯] সেল্ফ-এডিটের পর প্রকাশক উপযুক্ত সম্পাদনা পর্ষদ বা সম্পাদকের মাধ্যমে পাণ্ডুলিপিকে প্রকাশনাযোগ্য করে তোলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পেশাদার সম্পাদনা বা এ বিষয়ে পেশাদারিত্ব একেবারেই অনুপস্থিত। এখনও এ দেশে বাজারে প্রাপ্ত বই বা কোনও পাণ্ডুলিপির বেশির ভাগই সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত হচ্ছে। আবার পাঠক হিসেবে আমরা একটি পাঠকৃতির সম্পাদনা বিষয়টির দিকে খেয়াল না করে বানানের মধ্যেই দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখছি। আমরা মনে করছি বানান শুদ্ধ করাই সম্পাদকের কাজ।
মূলত আমাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা নেই বললেই চলে। ফলে আমরা লেখার ক্ষেত্রেও অসহিষ্ণু। নাজির দেখেছেন, লেখকরাও ইগো নামের অসুস্থতায় আক্রান্ত। ফলে লেখকরা তাদের লেখার কোনও বিষয়ে এডিটরের কাটাকাটি দেখতে চায় না। ‘অথচ উন্নত দেশে এমন কোনও লেখক নেই, যার পাণ্ডুলিপি এডিটিং প্রসেসের ভিতর দিয়ে যায় না’। সুতরাং সম্পাদনাকর্ম প্রকাশনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ বই পাঠকের কাছে চলে গেলে আর কিছু করার থাকে না। একটি পাণ্ডুলিপি গ্রহণ ও বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পাদক বা সম্পাদনাপর্ষদের অভিমত গ্রহণ করতে হয়। যেক্ষেত্রে ‘পাণ্ডুলিপির দু-চার পৃষ্ঠা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও লেখকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা নিষ্ঠুর মনে হলেও একজন পেশাদার সম্পাদক এই কাজ নিতান্ত খেয়াল-খুশি মতো ও পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে করেন না। পাণ্ডুলিপি দেখতে দেখতে এ ব্যাপারে তিনি এক অসীম দক্ষতা অর্জন করেন, যার ওপর নির্ভর করে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সময় নেন না।’ [২০৬] এক্ষেত্রে তিনি সম্পাদকের জন্য সতর্ক বার্তাও রেখেছেন। সম্পাদনা যেন অতিরিক্ত কিছু না হয়, যাতে লেখার ‘প্রাণভোমরা’ অর্থাৎ সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে যায়। পেশাদারি সম্পাদনায় ৪টি ধাপের কথা বলেছেন। দফায় দফায় সম্পাদনার সুপারিশ করেছেন তিনি। রিভিজন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করেছেন ডেভিড হিউসন, প্যাট্রিক রথফুস, ইমতিয়ার শামীম, ইফতেখারুল ইসলাম-এর অভিমত। ইমতিয়ার শামীমের অভিমত হলো : ‘এডিটিং হয় রিভিশনের ভিত্তিতে, সেখানে আরও থাকে ব্যাকরণ-বানান, বাক্যের অসঙ্গতি, অসম্পূর্ণতা ইত্যাদি দূর করা। এডিটিংয়ের সঙ্গে লেখক ছাড়াও অন্য কেউ যুক্ত থাকতে পারেন বা লেখক বাদে অন্য কেউ তা করতে পারেন; কিন্তু রিভিশন বোধকরি একান্তই লেখকের ব্যাপার।’ [২৩৩]
একটি লেখা বা বই চূড়ান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে লেখকের শ্রম, নিষ্ঠা অনস্বীকার্য। এজন্য তিনি বলেছেন বই লেখার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। আমরা মনের মাধুরীতে যা কিছু লিখতে পারি। এর স্বাধীনতাও আছে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন এর পেছনে তাড়া করাই স্বাভাবিক। কেন কী জন্য লেখা। লেখার জন্য যথার্থ তথ্য-উপাত্ত এবং সংগৃহীত তথ্যের যাচাই করতে হয়। না হলে পাঠকের প্রতিক্রিয়া হয় খুবই নাজুক। আবার লেখা যদি হয় গবেষণাধর্মী, তা হলে অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত সাইটেশনের নিয়ম, রীতি জানা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহার করা জরুরি। লক্ষণীয়, আমাদের দেশে এ বিষয়ে প্রায় সকল লেখকেরই একই দশা। ফিকশন বা নন-ফিকশন লেখক সকলেই একেবারেই উদাসীন। বস্তুত গবেষণাকর্মের উপস্থাপনায় যেকোনও সাইটেশন পদ্ধতির অনুসরণ করতে হয়। এজন্য তিনি সাইটেশন বিষয়ে নিবিড়ভাবে আলোকপাত করেছেন। সাইটেশন যে বা যারা ব্যবহার করছে, এর মধ্যে অধিকাংশই কিছু না জেনে নিজের মতো ব্যবহার করছে। এজন্য তিনি সাইটেশন ব্যবহারে স্বীকৃত পদ্ধতিগুলোর উদাহরণ দিয়েছেন। এতে অবশ্যই গবেষকরা উপকৃত হবেন বলে আমরা মনে করি। বই ও গবেষণা প্রতিবেদনে বিবলিওগ্রাফি উল্লেখ করতে হয়। তবে সবক্ষেত্রে বিবলিওগ্রাফি বা তথ্যপঞ্জি ব্যবহার করতে হবে এমন কোনও শর্ত নেই। কারণ পাঠকৃতিকে নিরর্থক ভারাক্রান্ত না করাই যুক্তিসঙ্গত।
লেখার লক্ষ্য থাকে পাঠকের কাছে পৌঁছা। সব লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে না, তা সম্ভবও নয়। অনেকক্ষেত্রে ভালো লেখকও পৌঁছাতে পারেন না। পাঠক গ্রহণ করে না। তবে এক্ষেত্রে অনেক উপাদান ক্রিয়াশীল থাকে। লেখা আকৃষ্ট করতে কয়েকটি প্রসঙ্গের কথা বলেছেন তিনি। বিশেষত বইয়ের পাঠক ও ক্রেতা আকর্ষণ তিনটি উপায়ের ওপর নির্ভর করে : (১) বইয়ের হুক, (২) বইয়ের শিরোনাম, (৩) লেখার স্টাইল। মূলত, বইয়ের হুকের দিকে নজর দিতে হবে। ‘আঁকশি শব্দ দিয়ে বইয়ের হুক সম্পর্কে একটা অনুমান মনে জাগে অর্থাৎ কিছুকে আটকে ধরার জন্য আঁকশি ব্যবহার করা হয়। বইয়ের হুক পড়ে পাঠক পরে কী আছে বা কী ঘটতে চলেছে সে ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইবেন। এই হুকের মধ্যে এমন সম্মোহনী শক্তি থাকবে যা পাঠককে আপনার বইকে ভালোবাসতে এবং সেটি পড়তে, কিনতে ও সংগ্রহে রাখতে উদ্বুদ্ধ করবে।’ [১২৫] রচনার মধ্যে রয়েছে ফিকশন ও ননফিকশন। এ দুই বৈশিষ্ট্যের রচনার জন্য তিনি ভিন্ন ভিন্ন হুক নির্ধারণ করেছেন। যেমন : ফিকশন রচনার জন্য : কোনও বিরাট অবিচার; অত্যন্ত চৌম্বক কনসেপ্ট অথবা গল্পের পেছনের আইডিয়া; যে প্রশ্নের উত্তর জোর করে চেপে রাখা হয়েছে; বড় কোনও গোপনীয় জিনিস; একটি বিশেষ ঔৎসুক্য জাগানো চরিত্র; অপ্রত্যাশিত কোনও কিছু; প্রথম বাক্য দিয়েই পাঠককে সক্রিয় করে তোলা; জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো মুহূর্ত; বাছাই অথবা পছন্দের বিষয়ের সম্মুখীন করা; রোম্যান্স অথবা কামজ টানটান উত্তেজনা; শুভ বা অশুভ পূর্বাভাস। নন-ফিকশন রচনার জন্য : একটি সুনির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান, একটি অদ্বিতীয় বা অনুপম, স্মরণীয় উপায়ে কৌতূহল বা ঔৎসুক্য সৃষ্টি করা, উপযুক্ত সময় বিবেচনা। প্রবন্ধের জন্য : আকর্ষণীয় প্রশ্নসংবলিত হুক, শক্তিশালী স্টেটমেন্ট বা ঘোষণাসংবলিত হুক, ফ্যাক্টস ও পরিসংখ্যানসংবলিত হুক, রূপকালংকার বা উপমা দিয়ে হুক, গল্প দিয়ে হুক, বিবরণমূলক বা ডেসক্রিপটিভ হুক, উদ্ধৃতি বা কোটেশন হুক। [১২৭-১৩৬] বিভিন্ন ধরনের হুক উল্লেখের সাথে দিয়েছেন উদাহরণ ও বিশ্লেষণ।
আমরা যারা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই, তারা বই লেখা ও প্রকাশের গুপ্ত বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকি না বা একেবারে নই। বই লেখা ও প্রকাশনার গুপ্ত বিপদগুলো নিয়ে চিন্তা করি না। তিনি উল্লেখ করেছেন, অপ্রাসঙ্গিকতা, আলস্য, অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ তথ্য, প্রয়োজনাতিরিক্ত লেখা, স্বীয় ধ্যান-ধারণাভিত্তিক লেখা, সংকোচ, দুর্বল পরম্পরা বা পারম্পর্য, কষ্টবোধ্য ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ রচনা, বাস্তবতার অতিরিক্ত বর্ণনা। গুপ্ত বিপদ কেমন করে তৈরি হয়, এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কেউই সম্পূর্ণ নিখুঁত বা পারফেক্ট নই। আমরা সকলেই লেখালেখি করতে গিয়ে প্রায়শ চোরাগর্তে পড়ি। সেই চোরাগর্তগুলো চিনে রাখা ভালো।’ এসূত্রে তিনি এমন গর্তে না পড়া বা গুপ্ত বিপদ এড়াতে কিছু কৌশলের উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ে যথাসম্ভব সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এগুলো হলো : অতিরিক্ত ক্লিশের ব্যবহার, অপরিচিত সংলাপ না লেখা, দুর্বল চরিত্র নির্মাণ করা, বলার পরিবর্তে দৃশ্যমান না করা, ভুতুড়ে বা অদ্ভুত লেখা, যে বিষয়ে অনাগ্রহ সে বিষয়ে লেখা, বই চূড়ান্ত হওয়ার আগে এডিট করা [১৬০-১৬১] প্রভৃতি।
কোনও কিছু সৃষ্টি ও শিল্পকলার বিষয় অবশ্যই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। সারাবিশে^ই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বেহাত হওয়ার বিভিন্ন নেতিবাচক কৌশলও চলমান। আমরা যখন কোনও সৃষ্টির কপি করা এবং ঋণস্বীকার ব্যতীত অনুকরণ করা যে আইন বিরুদ্ধ, তা আমরা জানি না। সৃষ্টির মৌলিকত্ব বজায়, স্বত্ব ধরে রাখতে কপিরাইট ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ আইন চালু হয়। এসব বিষয়ে লেখকসমাজও অসচেতন। মনে রাখতে হয় বিশ^ায়নের উন্মুক্ত পরিসরে সৃষ্টিশীল বিষয়গুলোর মেধাস্বত্ব সংরক্ষণে গ্যাট চুক্তিতে ক্লজ রাখা হয়। কারণ বাণিজ্যিক প্রয়োজনে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ জরুরি। ফলে এমন ক্লজ রাখার জরুরি প্রয়োজন ছিল। এটি না হলে অনুলিপির নিপীড়ন ও প্লেজিয়ারিজমের খপ্পর থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তিনি বলেছেনÑ‘দেশের দেশি কিংবা বিদেশি যেকোনও বই থেকে নির্বিচারে ফটোকপি করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফটোকপির মাধ্যমে যেকোনও বই হুবহু বই তৈরি ও বিক্রি একটি রমরমা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এতে শুধু বিদেশি রচয়িতা নন, বাংলাদেশেরও অনেক লেখক তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ যথাযথভাবে ভোগ করতে পারছেন না। কপিরাইটের গুরুতর লঙ্ঘন আজ সর্বব্যাপী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লেজিয়ারিজম। বাংলাদেশের গবেষকের লেখা বইয়ের শিরোনাম পৃষ্ঠা পাল্টিয়ে নতুন শিরোনাম ও ভিন্ন লেখকের নাম বসিয়ে বই তৈরি করার কথা কানে আসে এবং সাধারণ পাঠক তো প্রতারিত হচ্ছেনই, পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত এ সমস্ত বইয়ের ‘বাল্ক পারচেজ’ করেছে, সেই নিদর্শন রয়েছে।… বিশ^বৃত্তিক সংস্থা (ডওচঙ) ও বিশ^বাণিজ্য সংস্থা (ডঞঙ) বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষায় যেভাবে কোমর বেঁধে নেমেছে, তাতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসীর মতো হয়ে লেখকের কপিরাইট নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আমাদের মতো তৃতীয় বিশে^ও আর বেশিদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’ [১৮২] এ সময়ে কপিরাইট ও প্লেজিয়ারিজম প্রক্রিয়ার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিককর্ম জড়িত। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কর্মের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। এ থেকে আমরা স্থায়ী কোনও সমাধানে উপনীত হতে পারছি না। বোধকরি হওয়া সম্ভবও নয়। কেননা প্রতিটি কর্মই কোনও না কোনও কাজের বিনির্মাণ বা পুনর্নিমাণ। ওই ধরনের থিসিস উপস্থাপন করেছেন অনেকে। এজন্যই পদ্ধতিবাচক অনুসরণই হলো গবেষণা-সন্দর্ভ। নিয়তি হলো―অনেক গবেষণা-সন্দর্ভের বাণী অবশেষে পাঠকের কাছে উপস্থাপিত হয় না। অনেক কারণের একটি হলো―থিসিস ও বইয়ের মধ্যে পার্থক্য না বোঝা। এ সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্যের পার্থক্য নির্ণিত করেছেন কতগুলো বৈশিষ্ট্যে। যেমন : অভীষ্ট লক্ষ্য, আকার-আকৃতি, ব্যাপ্তি, রচয়িতা, উদ্দিষ্ট পাঠক, পাণ্ডিত্য, অ্যাপ্রোচ, বিষয় বিবেচনা, ভাষা, টোন ও স্টাইল, কাঠামো, বর্ণনার গতি, পরিসমাপ্তি, মেথডলজি, নজির উল্লেখ, উদ্ধৃতি প্রভৃতি। ‘সাধারণত থিসিস নিয়ে পরবর্তীকালে রচয়িতা তিনটি কাজ করতে পারেন : পুরোপুরি ভুলে যাওয়া; একে বইয়ে রূপান্তর করা; অথবা এ থেকে টেক্সট ও তথ্য ব্যবহার করে এক বা একাধিক নিবন্ধ তৈরি করা। অনেক থিসিস সোজাসুজি এবং একটিমাত্র উদ্দেশ্যসাধনের জন্য পরিকল্পনা ও সম্পাদন করা হয়। যখন তাদের কাজ শেষ হয় তখন সেসবের আর মূল্য থাকে না।’ [ ১৯২]
এ বইয়ের বাইরেও বদিউদ্দিন নাজির অনেক জরুরি কথা বলেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত চিহ্ন পত্রিকার সাক্ষাৎকারেও বলেছেন প্রকাশনা ও এডিটিং নিয়ে। বিশেষত আমাদের কাছে―প্রুফরিডিং বা মুদ্রণসংশোধনই হলো এডিটিং। এডিটিং তো আছেই, একটি লেখা বা বই প্রকাশনার আগে অনেক প্রয়োজনীয় কাজ বাকি থাকে, এ বিষয়ে আমরা শৃঙ্খলা মানতে চাই না। বস্তুত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের প্রুফরিডিং ও এডিটিং পরস্পর সম্পর্কিত। মূলত এ দুটি বিষয়ে আমাদের যেভাবে সচেতন থাকা প্রয়োজন, তা অনেক লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে অনুপস্থিত। প্রুফরিডিং কী, ও এ সংশ্লিষ্ট চিহ্নসমূহ বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের এখানে অধিকাংশ মুদ্রণকর্মী ও প্রকাশকরাও এসব চিহ্ন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত নন, তা আমাদের জানা। একইসাথে উল্লেখ করেছেন প্রুফরিডারের দায়িত্বসমূহ।
আমাদের প্রকাশনা শিল্পে পেশাদারিত্বের কাল এখনও মনে হয় শুরু হয়নি। ফলে লেখক প্রকাশককে বিশ^াস করেন না। নানা কারণে লেখক প্রকাশকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। প্রকাশক―লেখক আস্থাহীনতার কথা প্রায়ই শোনা যায়। এ অবস্থায় লেখক-প্রকাশক সমঝোতা বা চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণীয় প্রকাশনা কাজে চুক্তি করতে অধিকাংশ প্রকাশকই অনাগ্রাহী। তবে হতাশার মধ্যেও সম্প্রতি এ বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। লেখক ও প্রকাশক উভয় পক্ষই মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ, চুক্তি করতে হয় দায়িত্ববোধ থেকে। প্রত্যেকে তার অবস্থান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। তা হলে প্রকাশনাশিল্প বিকশিত হবে। বই প্রকাশনায় চুক্তির লক্ষ্য শুধু রয়্যালিটি নয়। এর সঙ্গে লেখকের মর্যাদাও নিশ্চিত হয়। প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি অধ্যায়ে এর প্রয়োজনীয়তা, লেখক ও প্রকাশকের দায়িত্ব ও সীমানা, অঙ্কের হিসাবে কার কী প্রাপ্যতা, চুক্তির উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য, কপিরাইট স্থানান্তর, চুক্তির কাঠামো প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে। এজন্য লেখক-প্রকাশক চুক্তি অবশ্যই প্রকাশনাশিল্পের বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখে। কারণ প্রকাশক পাণ্ডুলিপি গ্রহণ ও পরবর্তী ধাপে কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সেসব অনেক সময়ই লেখক জানতে পারেন না। এ সম্পর্কে বলেছেনÑ‘যথার্থভাবে প্রণীত লেখক-প্রকাশক চুক্তি করা ও তা বিশ্বস্তভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমেই এই অবস্থা থেকে আমাদের প্রকাশনা ব্যবসা মুক্তির আলো দেখতে পারে। এই চুক্তি অন্তত লেখক ও প্রকাশক পরস্পরকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণে একটি দলিল হিসেবে উপস্থিত থেকে উভয়পক্ষকে অঙ্গীকার পূরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ [২৮২] পরিশিষ্টে যোজিত হয়েছে লেখক-প্রকাশকের মধ্যে চুক্তির নমুনা।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ ধরনের গ্রন্থ বাংলাদেশে এই প্রথম। বইটি লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক সকলের জন্য উপকারী একটি প্রকাশনা। যাতে লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক সকলেই এ বইয়ের সহায়তায় উপকৃত হবেন বলে মনে করি। ভূমিকার কথাগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। লেখকের বিবৃতির মতো ভূমিকায় বদিউদ্দিন নাজির বলেছেনÑ‘এটি অনুসন্ধিৎসু লেখকদের জন্য একটি আত্মোন্নয়নমূলক বই। ফিকশন ও নন-ফিকশন, উভয় ধরনের বইয়ের লেখক যাতে প্রকাশকদের যাচিত (ংড়ষরপরঃবফ) বইয়ের পাণ্ডুলিপি অধিকতর আত্মবিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও যত্নের সঙ্গে প্রস্তুত করতে পারেন, ওই লক্ষ্যে কিছু দিক্ নির্দেশনা ও পরামর্শ এই বইটিতে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনও মতেই কোনও লেখককে বা লেখক হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে লেখা শেখানোর মতো ক্ষমাহীন ধৃষ্টতা দেখানো হয়নি। বইটি এক কথায় একটি চাহিদাভিত্তিক ‘টেলরমেড’ বই। একজন লেখক প্রথমে প্রকাশনা জগতের সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত হয়ে ধাপে ধাপে যেভাবে লেখার জন্য নিজেকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ ও প্রস্তুত করবেন, সেভাবে অধ্যায়গুলো পরিকল্পনামাফিক পরম্পরাগতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
পাঠক হিসেবে বলতে পারি বাংলাদেশে প্রকাশনা বিষয়ে এমন বিস্তারিত পাঠযোগ্য বই এর আগে আমাদের চোখে পড়েনি। আমাদের সকলের হয়ে বদিউদ্দিন নাজির জাতীয় কর্তব্য পালন করেছেন। কাজ করতে করতে তিনি অনুভব করেছেন―এ ধরনের একটি বই প্রয়োজন। ফলে লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকের অনেকদিনের কাক্সিক্ষত চাহিদা পূরণ হলো। এ বিষয়ে আগামীতে আরও চমৎকার ও উপযোগী বই লিখা হবে, এমন ইঙ্গিতও রেখেছেন লেখক বদিউদ্দিন নাজির।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক



