আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

পাঠ-প্রতিক্রিয়া : ফারহানা আজিম অনূদিত শূন্য বিন্দুতে নারী : এলহাম হোসেন

মূল রচনা : শব্দঘর নির্বাচিত সেরা বই ২০২২

ফারহানা আজিম এককথায় সফল অনুবাদক। নাওয়াল আস সাদাবির উয়োম্যান অ্যাট পয়েন্ট জিরো উপন্যাসের বাংলা ভাষান্তর করেছেন শূন্য বিন্দুতে নারী শিরোনামে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমা প্রকাশন। মূল উপন্যাসটি আরবি ভাষায় রচিত। এর শিরোনাম ইমরা আন্দ নোকতাত আস-সিফর। ফারহানা আজিম উপন্যাসটির ইংরেজি রূপ থেকে বাংলায় অনুবাদ করলেও এর নিবিড় পাঠ পাঠককে একেবারে মূলের স্বাদ দেয়। এর কারণ মূল গ্রন্থের সঙ্গে টার্গেট রিডার বা লক্ষ্য-পাঠকের দ্বিরালাপ তৈরিতে অনুবাদকের মুন্সিয়ানা।

ফেরদৌস নামের একজন মিসরীয় নারী তার ফাঁসি কার্যকরের ঠিক আগের রাতে উপন্যাসের লেখিকা যিনি পেশায় একজন মনোচিকিৎসক, তাঁকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের মর্মান্তিক ও করুণ উপাখ্যান হাজির হয়েছে। অনুবাদকের ভাষা-দক্ষতা, মূলানুগ অনুবাদের সক্ষমতা ও মচমচে বাংলাভাষার স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল ব্যবহার অনূদিত গ্রন্থটি সুখপাঠ্য করে তুলেছে। পড়ার সময় মনেই হয় না, এটি একটি অনুবাদ গ্রন্থ। অনুবাদকের পক্ষে এই বিশেষ গুণ অর্জন করা ঢের কঠিন। তাঁর পক্ষে এই গুণ অর্জন করা তখনই সম্ভব হয় যখন তিনি মূল গ্রন্থ ও অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে একটি সফল দ্বিরালাপ বা মিথষ্ক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হন। অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক যখন লেখকের মতোই আর ব্যক্তি থাকেন না, একটি প্রপঞ্চে পরিণত হন, তখন সফল অনুবাদ সম্ভব হয়। আবার কাজটি সম্ভব হয় অনুবাদকের মূল ভাষা ও টার্গেট ভাষার খামখেয়ালি প্রকৃতি ও উভয় ভাষার মধ্যকার মোচড়গুলো ধরতে পারার সক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়েও। এছাড়া যখন একটি টেক্সটের অনুবাদ করা হয় তখন সেই টেক্সট যে ভাষিক, ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্য থেকে উঠে এসেছে সেইসব উপষঙ্গ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে অনুধাবন করে টার্গেট পাঠকের একই উপষঙ্গগুলোর সঙ্গে সেগুলোর একটি বিশ^াসযোগ্য যোগ্যসূত্র তৈরি করতে হয় অনুবাদককেই। এটি শ্রমসাধ্য কাজ। কঠিনও বটে। এই কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ যে অনুবাদক সম্পন্ন করতে পারেন, তিনিই ভালো অনুবাদক এবং তাঁর অনুবাদ পড়ার সময় পাঠককে বার বার হোঁচট খেতে হয় না। আমার মনে হয়, ফারহানা আজিম এসব কাজ বেশ দক্ষতার সঙ্গেই করতে পেরেছেন এই অনুবাদ গ্রন্থে।

উপন্যাসের কাহিনি আমাদের মতো তৃতীয় বিশে^র পাঠকদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নাওয়াল আস সাদাবি যাকে মিশরীয় সাহিত্যের সিমন দ্য বুভেয়ার বলা হয়, তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পশ্চিমা বাঁধাছকের ছাঁচে ঢালাই করা নারীবাদের প্রতিপ্রপঞ্চ নির্মাণ করেছেন এই গ্রন্থে। ইউরোপ-আমেরিকার নারীরা যেখানে লিঙ্গ সমতার জন্য রাস্তায় মিছিল করে, সেখানে মিশরের মতো তৃতীয় বিশ্বের নারীকে যুদ্ধ করতে হয় সমাজের সংস্কার, দৃষ্টিভঙ্গি, মিথ, যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ প্রথা, এমনকি রাষ্ট্রীয় সব কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় পরিচালিত হতে হতে লৈঙ্গিক চরিত্র গ্রহণ করে। পুরুষ হয়ে ওঠে! মানবিক হয়ে ওঠে না। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষকে নারী আর পুরুষে ভাগ না করে যদি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে তাহলে সেখানে নারী তার প্রতি অন্যায়ের বিচার চাইতে পারে। নইলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়ে নারী যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তখন সে ঐ আইনের কাছেই অপরাধী বিবেচিত হয়। এমনই একটি বয়ান তৈরি হয়েছে উপন্যাসের মূল চরিত্র ফেরদৌসকে ঘিরে। শৈশবে তার বাবা তার ওজর-আবদার তেমন পাত্তা দেননি। বাবা-মা হারিয়ে চাচার পরিবারে আশ্রয় নিয়ে মাধ্যমিক স্কুলের পড়া সফলভাবে শেষ করেছে বটে―সমাজ ও সংস্কারের ঘেরাটোপে পড়ে তার আর কলেজের পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চাচির পিড়াপিড়িতে চাচা বিয়ে দেয় তরুণী ফেরদৌসকে চাকরি থেকে অবসর নেওয়া চাচিরই আত্মীয় এক বৃদ্ধের সঙ্গে। এই বৃদ্ধ তাকে ভাতেও মারে হাতেও মারে। তাকে আপাদমস্তক জুতাপেটা করে। শরীর চোখ-মুখ ফুলে ওঠে। কালশিটে পড়ে। চাচার কাছে তার কষ্টের কথা জানালে চাচা বলেন, ‘সব স্বামীই বউ পেটায়’।  চাচি ধর্মের দোহাই দিয়ে বলেন, ‘ধর্ম-জ্ঞানঅলা পুরুষরাই বরং বউ পেটায়। ধর্মে এমন শাস্তির অনুমতি আছে। কোনও সতী-সাধ্বী নারীর স্বামী নিয়ে অভিযোগ থাকতে নেই।’ ফলে ফেরদৌস চাচা-চাচির কাছে আশ্রয় পায় না। আর ধর্মের কাছেও তার কোনওরূপ নিরাপত্তা নেই। এমন পরিস্থিতিতে একদিন বৃদ্ধের মারধোর আর নিষ্ঠুরতায় শরীরে আঘাতের দগদগে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ফেরদৌস বাড়ি ছাড়ে। ক্ষুধা-পিপাসায় জর্জরিত ফেরদৌস কাজের খোঁজে বেইউমি নামক এক কফি হাউসের মালিকের হাতে পড়ে। তাকে আশ্রয় দিলেও শীঘ্রই সে যৌন নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সারাদিন  ফেরদৌসকে তালাবদ্ধ করে রেখে যায়। রাতে ফিরে এসে তাকে ধর্ষণ করে। শুধু সে নয়, তার সাঙ্গপাঙ্গও। প্রতিবেশীদের সহায়তায় পালিয়ে গিয়ে দুর্ভাগ্যক্রমে শরীফা নামের এক পতিতার সর্দারনির হাতে পড়ে। যে ফেরদৌস উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার স্বপ্ন দেখত এবং একটি ভদ্রোচিত জীবন-যাপন করতে চেয়েছিল, সে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার অভিঘাতে পরিণত হয় পতিতায়। কিন্তু সেই পেশাতেও প্রতারণা, নিপীড়ন আর নির্যাতন বিদ্যমান। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে পিছপা হয় না। কিন্তু ফেরদৌস বার বার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কোম্পানিতে ছোট্ট একটি চাকরি নেয়। সেখানকার বিপ্লবী নেতা ইব্রাহিমের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। সে-ও কোম্পানির কর্মচারী। শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থের কথা বলে। সম-অধিকারের কথা বলে। তার নৈতিকতা ও বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফেরদৌস তার প্রেমে পড়ে। ইব্রাহীমও তাকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করে। ফেরদৌস তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ইব্রাহিম নিজের নীতি- নৈতিকতা বিকিয়ে দেয় স্বার্থের বেদিতে। কোম্পানির চেয়ারম্যানের মেয়েকে বিয়ে করে সে। ফেরদৌসের আশাভঙ্গ হয়। হতাশায় ও পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয় আবারও পতিতাবৃত্তিতে ফিরে  যেতে। কিন্তু সেখানেও দালাল মারজুকের উৎপাত ঘটে। সে শুধু তার অর্থসম্পদই ভোগ করতে চায় না, তাকেও শারীরিকভাবে হেনস্তা করে। ছুরি দিয়ে ভয় দেখায়। ফেরদৌস কোথায় যাবে?  পুলিশের বড় কর্তাদের সঙ্গে মারজুকের আঁতাত আছে। তাঁরা মাসোহারা খান। তাঁরা কেন অসহায় ফেরদৌসের অভিযোগে কর্ণপাত করবেন? বিচার চাইতে ফেরদৌস আদালতে যেতে পারে না কারণ মারজুকের পকেটে অনেক প্রভাবশালী উকিল আছে। সে দেখে, রাজনীতিবিদদের ভূমিকাও দ্বিচারিতায় ভরা। সে আসলে কোথায় যাবে? সে তো মুক্ত জীবন-যাপন করতে চেয়েছিল। তাহলে তার মুক্তি কোথায়? জীবন তো তাকে মুক্তি, সুখ, স্বাধীনতা দেয়নি। শুধু তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। সমাজের ক্ষমতা-কাঠামো যা নানান উপষঙ্গের মদদে নিপীড়নকারী আধিপত্যবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা মাধ্যমিক স্কুল শেষ করা একজন স্বপ্নতাড়িত মেধাবী ছাত্রীকে টাকাঅলা ও প্রভাবশালীদের লালসা ও সম্ভোগের শিকার অর্থাৎ পতিতায় পরিণত করেছে। ফেরদৌস জীবনের কাছে তাই মুক্তি চায় না। সে মুক্তি চায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। সেটা  তো কাপুরুষতা। সে সাহসী। মৃত্যুকে মোকাবেলা করার জন্য যে সাহস দরকার তা তার আছে, আর এই সাহসিকতায় ভর দিয়ে সে মারজুককে হত্যা করে। তবে এই হত্যাকাণ্ড সে ঘটিয়েছে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে। মারজুক যে ছুরি দিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল ফেরদৌস ধস্তাধস্তি করে সেই ছুরি কেড়ে নিয়ে সেটা দিয়েই মারজুকের গলা কাটে। বুকে-পাঁজরে ধারালো ছুরি বসিয়ে দেয় চরম ঘৃণায়। পরিণতিতে সে জেলে যায়। তার ফাঁসি হয়। ফেরদৌস মৃত্যুকে ভয় পায় না। সে বলে, ‘ মৃত্যু আমাকে জীবন, ক্ষুধা, নগ্নতা ও ধ্বংসের ভয় থেকে রক্ষা করে’। মৃত্যুর প্রতি তার এমন দৃষ্টিভঙ্গি পুঁজিবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক  আধিপত্যবাদের ভ্রুকুচকানো, ঠোঁটবাঁকানো দাম্ভিক মুখে প্রচণ্ড ঘৃণায় চপেটাঘাত করেছে।

ফেরদৌস মনে করে, খুন করার জন্য ওর ফাঁসি হবে না বরং ও সমাজের যে কদার্য সত্যগুলো আবিষ্কার করেছে তা প্রকাশ হয়ে পড়লে সমাজের তথাকথিত ভদ্র ও প্রভাবশালী লোকদের মুখোশ খসে পড়বে বলে ভয়ে দ্বিচারিতায় ভরা এসব কাপুরুষই ওকে ফাঁসির দড়িতে অবশ্যই ঝোলাবে। ফেরদৌস বলে,

‘ওরা আমার ছুরি ভয় পায় না, ওদের আতঙ্ক আমার সত্যে। আর এই ভয় ধরানো সত্য আমাকে প্রবল শক্তি যোগায়।… এই ভয় ধরানো সত্যই পুলিশ ও শাসকদের অমানুষিক নির্যাতনের ভয়কে জয় করতে শেখায়।

আমি ওদের মিথ্যাভরা চেহারায়, কথায়, ওদের মিথ্যাভরা খবরের কাগজে অবলীলায় থুতু ছিটাই।’ (১০৮)

সারাটা জীবন যে ফেরদৌসের ছিল ভীতির মধ্যে বসবাস সেই ফেরদৌস এতটা সাহসী হয়ে ওঠার পেছনের কারণ একটাই। আর তা হলো―‘সত্য’ আবিষ্কার। কী সেই ‘সত্য’? আমরা সমাজে আমাদের চারপাশে যেসব মুখ দেখি সেগুলো কি আসলেই মুখ, নাকি মুখোশ? ফেরদৌস দেখেছে সেগুলোর সবই মুখোশ। এই মুখোশ সে টেনে খসাতে চেয়েছে। পারেনি। মুখোশধারীরাই তার কণ্ঠ প্রতাপের ইট-পাথরে তৈরি চারদেয়ালের অভেদ্য গরাদে আটকে দিয়েছে। চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়েছে। সে যা জানে তা প্রচার করতে পারলে তো পুরুষতান্ত্রিকতার আধিপত্যবাদের প্রাসাদ আর থাকে না। ধসে পড়বে। যাকে দেশবাসী হোমরাচোমরা বিদেশি অতিথি বলে জানে, সে-ও  তো রাতের অন্ধকারে ফেরদৌসকে তার শয্যাসঙ্গী হতে আহ্বান জানায়। অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ পাঠায় ওকে ধরে নিয়ে আসতে। তার শয্যাসঙ্গী না হলে ফেরদৌসের দেশপ্রেম নেই―এমন অভিযোগও উত্থাপন করে। কি এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর দ্বিচারিতা। আর এই দ্বিচারিতা চরিতার্থ করতে ধর্ম থেকে শুরু করে দেশপ্রেমের মতো উপষঙ্গগুলোও তাদের কপট ও স্বার্থপর প্রপঞ্চ নির্মাণের কাঁচামালে পরিণত হয়। যে সমাজ পতিতাদের গায়ে প্রান্তিক ও অস্পৃশ্যতার লেবেল সেঁটে দেয় সেই সমাজের কোনও চ্যারিটিতে ঐ পতিতা অর্থ দান করলে ছবিসহ সুন্দর সুন্দর কথা লেখে সাংবাদিকেরাতো খবর ছাপায়। ফেরদৌস বলে, ‘লেখে আমি কতই না সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক।’ এই যে দ্বিচারিতা, এসব দেখে ফেরদৌস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ‘মেয়েমাত্রই প্রতারণার শিকার। পুরুষেরা একদিকে মেয়েদের সঙ্গে প্রতারণা করে, আবার মেয়েদেরই সে জন্য শাস্তি দেয়; একদিকে মেয়েদের নিচে নামতে বাধ্য করে, অন্যদিকে মেয়েদেরই চরম অধপতনের জন্য দায়ী করে; একদিকে মেয়েদের বিয়ের বাঁধনে বাঁধে, আবার অন্যদিকে তাদের তাচ্ছিল্য করে―সংসারের মামুলি কাজের মধ্যে সারাজীবন আবদ্ধ রেখে, গালমন্দ আর লাথি-গুঁতায়।’ অসম বৈবাহিক জীবনে চরম নিগ্রহের শিকার হয়ে ফেরদৌসের উপলব্ধি হয়েছে যে, ‘বিয়ে হচ্ছে সমাজে নারীনিগ্রহের নিষ্ঠুরতম পন্থা’। ফেরদৌসের এই দৃষ্টিভঙ্গি ফরাসি নারীবাদী চিন্তক ও নারীবাদের বাইবেল বলে আখ্যায়িত দ্য সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থের রচয়িতা সিমন দ্য বুভেয়ারের কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দেয়। সিমন দ্য বুভেয়ার সারাজীবন ‘এন্টি ইউটেরাস মুভমেন্ট’ চালিয়ে গেছেন। নন্দিত হয়েছেন, নিন্দিতও হয়েছেন। কিন্তু সারাটা জীবন বিশ^াস করেছেন তার উল্লিখিত বইয়ের শুরুর উচ্চারণ, ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না; সমাজ তাকে নারী করে তোলে।’ সাদাবির শূন্য বিন্দুতে নারী উপন্যাসটি পড়ে পাঠক যদি তাঁকে মিশরের সিমন দ্য বুভেয়ার বলে আখ্যায়িত করেন তবে তা অতিরঞ্জন হবে না। তাঁর এমন অবস্থানের জন্য তিনি নন্দিত হয়েছেন। নিন্দিতও কম হননি। সরকারি চাকরি হারাতে হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ প্রপঞ্চ নির্মাণের অপরাধে।

ফারহানা আজিমের অনুবাদ শূন্য বিন্দুতে নারী বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে অনেক কারণেই একটি প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ। এর গভীর পাঠ আবশ্যক, কারণ পশ্চিমা গতানুগতিক যে নারীবাদ সারাবিশে^র সব নারীকে অর্থাৎ প্রথম ও তৃতীয় বিশে^র সব নারীকে একই চশমার ভেতর দিয়ে দেখে, তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। তৃতীয় বিশে^র দেশসমূহের নারীদের ভোটাধিকার অনেকাংশে নিশ্চিত হয়েছে বটে কিন্তু তাদের যেসব বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং অনবরত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় সেগুলো প্রথম বিশে^র নারীদের অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা। নারীবাদের শুরুতে এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল ইউরোপ আমেরিকার শে^তাঙ্গ মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে। এরা লেখাপড়ার সুযোগ আগে থেকেই পেতেন। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও এদের ছিল। তাই এরা সোচ্চার হন মূলত ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। ১৯৬০-এর দশকে এসে এই আন্দোলনে যুক্ত হয় লিঙ্গসমতা, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান মজুরির দাবি ইত্যাদি। কিন্তু তখনও পর্যন্ত নারীবাদী আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার মতো তৃতীয় বিশে^র নারীদের নানান সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সংশ্লিষ্ট নানান উপষঙ্গ এই আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে তেমন একটা আসেনি। ১৯৮০-এর দশকে এসে নারীবাদী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। ১৯৮৪ সালে আফ্রো-আমেরিকান লেখিকা অড্রে লোর্ড তাঁর প্রবন্ধে ঞযব গধংঃবৎ’ং ঞড়ড়ষং ডরষষ ঘবাবৎ উরংসধহঃষব ঃযব গধংঃবৎ’ং ঐড়ঁংব নতুন ধারার নারীবাদের সূচনা করে। এছাড়া চন্দ্রা তালপাড়ে মোহান্তির প্রবন্ধ টহফবৎ ডবংঃবৎহ ঊুবং তৃতীয় বিশে^র নারীবাদের নতুন ধারার সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই নারীবাদে ঔপনিবেশিকদের বয়ানে স্থানীয় নারীদের যেভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার একটি বিনির্মাণ এবং এর প্রতিপ্রপঞ্চ নির্মাণের জোরালো প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। ঔপনিবেশিকদের টেক্সটে স্থানীয় নারীদের কণ্ঠ ধ্বনিত হয় না। কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস উপন্যাসের কুর্টজ যে স্থানীয় কঙ্গোলিজ মহিলাকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে তার যৌন সঙ্গী বানিয়েছে, তাকে কখনও পাঠক কোনও কথা বলতে  শোনে না। ফর্স্টারের অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়াতে ভারতীয় নারীদের কণ্ঠে কোনও কথাই উচ্চারিত হয় না। যা-ই হোক, এমন উপস্থাপনার বিপরীতে তৃতীয় বিশে^র নারীবাদী লেখকগণ যখন তাঁদের নারীদের নিয়ে বয়ান নির্মাণ করেন, তাতে পাঠক তাদের কণ্ঠ শোনেন; সমাজের নানান আধিপত্যকামী দোর্দণ্ড বা প্রতাপচর্চাকারী উপষঙ্গের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া উচ্চারিত হতে শোনেন। তারা এখন ভোটের জন্য আন্দোলন করছে না কারণ এই ইস্যু বেশ আগেই মোটামুটিভাবে মিটে গেছে। এখন লিঙ্গ-সমতা, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান মজুরি ইত্যাদি ইস্যু ছাড়াও তাদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে প্রচলিত বিশ্বাস-ব্যবস্থা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাঁধাছকে আবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি, তা সেটা নারীর পোশাকের প্রতিই হোক বা তার চলাফেরার ধরন-ধারণের প্রতিই হোক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যিক এমনকি ভাষিক ব্যবস্থার সঙ্গে। বিয়ে, সংসার, সন্তান জন্মদান, যৌতুকপ্রথা ইত্যাদি এক একটি শক্তিধর প্রপঞ্চ নারীকে নানানভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তৃতীয় বিশে^র নারীদের এই শক্তিধর প্রপঞ্চগুলোর সঙ্গেও অনবরত নেগোসিয়েশন বা দ্বিরালাপ চালিয়ে যেতে হয়। আবার বিশ^ায়নের নামে অর্থনীতি যেভাবে কর্পোরেটাইজড হয়ে গেছে সেই কর্পোরেট অর্থব্যবস্থা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে বটে কিন্তু সেখানেও নারীকে যত সময় ও শ্রম দিতে হয় তাতে তার নিজের দিকে তাকানোর বা নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেবার তেমন সুযোগ থাকে না। সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, তার পুষ্টির দেখভাল করা এবং তাকে মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে যেটুকু সময় দিতে হয় সেটুকুও তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না কারণ কর্পোরেটরা চাকরি দিচ্ছে কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে নারীর নিজেকে দেখভালের মূল্যবান সময়। তৃতীয় বিশ্বের নারীকে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত কারণেই ঘর আর বাহিরের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বের কর্পোরেট অর্থকাঠামো যা এখন পুরো বিশ্বের অর্থব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা তো তৃতীয় বিশ্বের নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে ঐক্য স্থাপনে নারাজ। ফলে তৃতীয় বিশ্বের নারীকে  ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই ভিন্ন অভিজ্ঞতা এখন প্রচলিত নারীবাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই কাজ যাঁরা করেছেন তাঁদের অন্যতম মিশরের নারীবাদী লেখিকা নাওয়াল আন সাদাবি।

যাই হোক, এ কথা স্পষ্ট যে, নাওয়াল আস সাদাবি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশে^র দেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তার পাঠ জরুরি কারণ তিনি আমাদের দৃষ্টি আমাদের নিজেদের দিকেই ঘুরিয়ে দিয়েছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে আমাদের সমাজ, রাজনীতি, নৈতিকতা, সংস্কার ও দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে শূন্য বিন্দুতে স্থাপন করেছে। ফারহানা আজিম নাওয়াল আস সাদাবিকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমাদের জ্ঞানকাণ্ডে বিরাজমান বিশ^সাহিত্যের আঙিনাটির যে তাৎপর্যপূর্ণ দিগন্ত উন্মোচন করেছেন সে-ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

 লেখক : অনুবাদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button