আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : বাংলাদেশে বঙ্কিমচর্চা : চকিত সন্ধান : তপন বাগচী

অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) সাহিত্যের উত্তরাধিকার বহন করে চলছে প্রতিটি বাঙালি। বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তিনি চাকরিসূত্রে অবস্থান করেছেন। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণদায়ী বাঙালি বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলাভাষার একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবেই গ্রহণ করেছে। একসময় বঙ্কিমের আদর্শের বিরোধিতা করা হয়েছে, আবার তা যুক্তিতর্কের শক্তিতে মিলিয়েও গেছে। তবে তার সাহিত্যের শক্তিকে অস্বীকার করার সাহস কেউ দেখাতে পারেনি।

বাংলাদেশে বঙ্কিমচর্চচা শুরু হয়েছে অবিভক্ত ভারতবর্ষেই। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকায় এই চর্চা শুরু হয় মূলত বঙ্কিমসাহিত্যের আদর্শিক বিরোধিতার সূত্রে। ইতিহাসের স্বার্থে একথা বলা যায় মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদের (১৮৬১-১৯৩৩)  ইসলাম প্রচারক (১৮৯১), সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর (১৮৬৩-১৯২৯) মিহির ও সুধাকর (১৮৯৩), মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর ছোলতান (১৯০২), সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৭৫-১৯৫৬) নবনূর (১৯০৩), মোহাম্মদ আকরম খাঁর (১৮৬৮ -১৯৬৮) আল এসলাম (১৯১৫), আবদুল হাকিমের ইসলাম দর্শন (১৯১৬) প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), মোহাম্মদ কে কে চাঁদ, এসএম আকবরউদ্দীন (১৮৯৬-১৯৭৮), আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮) প্রমুখ সাহিত্যিক তাদের বঙ্কিমবিরোধী অভিমত প্রচার করেন। এঁদের সঙ্গে যোগ দেন নবনূর পত্রিকার তৎকালীন খ্যাতিমান লেখক নির্মলচন্দ্র ঘোষ। এঁরা প্রবন্ধ রচনা করেছেন বঙ্কিমের উপন্যাসের বিরূপ সমালোচনা করে, বলা যেতে পারে নিন্দা করে। কেউ কেউ দুর্বল শক্তি জেনেও বঙ্কিমের উপন্যাসের অনুকরণে উপন্যাস রচনা করে বঙ্কিমবিরোধিতা জারি রেখেছেন। আর্জুমন্দ আলীর  (১৮৭০-১৯১৪)  ‘প্রেমদর্পণ’ (১৮৯১), ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ‘রায়নন্দিনী’ (১৯১৬) ও ‘তারাবাঈ’ (১৯১৬) এবং মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ‘চাঁদতারা বা হাসন গঙ্গাবাহমনি’ (১৯১৭) এই ঔপন্যাস্যিক প্রবাদের নজির। এঁদের অনেকে বঙ্কিমচন্দ্রকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করলেও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) প্রমুখ মনীষীতুল্য লেখকগণ তাঁদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন।

দেশভাগের পরে বঙ্কিমবিরোধীরা সক্রিয় থাকলে বঙ্কিমচর্চায় এগিয়ে আসেন প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদগণ। এঁরা বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ লিখে বঙ্কিমসাহিত্যের পক্ষে দাঁড়ান। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২১)। ‘আনন্দমঠ’ নামে প্রবন্ধ লেখার পর ১৯৫৩ সালে একটি মহল তাঁকে ‘পাকিস্তান থেকে বহিষ্কারের’ প্রস্তাবও করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) ডাইডেন ও ডিএল রায় গ্রন্থে বঙ্কিমমানস উন্মোচনে ইতিবাচক মনোভঙ্গি পোষণ করেন।

কাজী দীন মুহম্মদ (১৯২৭-২০১১) ১৯৬৫ সালে ‘বঙ্কিমসাহিত্যে নারী-অন্বেষা’ প্রবন্ধের বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। আয়েষা ও জগৎ সিংহের প্রেমের মানবিক দিককে তিনি চিহ্নিত করেছেন। তবে মনীষীতুল্য অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফের (১৯২১-১৯৯৯) বঙ্কিমবীক্ষণ নতুন মাত্রা যুক্ত করে। রক্ষণশীল মুসলিমদের একপাক্ষিক নিন্দার জবাবে সরব হয়েছেন তিনি। বিচিতচিন্তা (১৯৬৮) গ্রন্থে ‘বঙ্কিমমানস’ প্রবন্ধে বঙ্কিমকে সাহিত্যের ‘যুগপ্রতিভু’ হিসেবে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, ‘… এ কথাটি যুগের পরিপ্রেক্ষিতে খুঁটিয়ে বুঝতে চাইনে বলেই বঙ্কিম আমাদের কারুর চোখে ঋষি আবার কারুর কাছে মুসলিম-বিদ্বেষী’। (পৃ. ৩২১) এর পরেও তিনি ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ (১৯৮৮), ‘বঙ্কিমচন্দ্রের মনোজগৎ’ (১৯৮৮), ‘বঙ্কিমবীক্ষা: অন্য নিরিখে (১৯৮৯), ‘মানবতাবাদী বঙ্কিম’ (১৯৮৯), ‘মুক্তচেতনার জীবনরস তাত্ত্বিক বঙ্কিমচন্দ্র’ (১৯৯২) প্রভৃতি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বঙ্কিমচর্চায় আহমদ শরীফের অবদান গুণগত বিচারে শ্রেষ্ঠস্থানীয়।

মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-১৯৬৯) ও সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) রচিত বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (ষষ্ঠ সং ১৯৮২) গ্রন্থে বঙ্কিমকে ‘কুশলী’ ভাষাশিল্পী হিসেবে অভিহিত করলেও ‘সীতারাম’ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে বহুবিবাহ ও কৌলিণ্যপ্রথার সমর্থন করায় তাঁকে রক্ষণশীল হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তবে আজহারুল ইসলাম তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রসঙ্গ (১৯৬৯) গ্রন্থে মুসলিম চরিত্রচিত্রণে বঙ্কিমের শিল্পনৈপুণ্যের প্রশংসা করেছেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে বঙ্কিমচর্চচায় গতি আসে। পাকিস্তানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটায় বঙ্কিমচর্চায় নতুনমাত্রা যুক্ত হয়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন ১৯৭৬ সালে। পরে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক হাসান হাফিজুর রহমান ‘প্যারালাল বাস্তব এবং বঙ্কিমচন্দ্র’ (সমকাল, ঢাকা, ১৯৭৭) প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছেন। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক কাজী আবদুল মান্নান  ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস: ভক্তি ও মুক্তি’ (সাহিত্যিকী, রাজশাহী, ১৯৮৮) এবং ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে নায়ক চরিত্র’ (রাজশাহী অ্যাসোয়িয়েশন পত্রিকা, রাজশাহী, ১৯৮৭) নামের দুটি প্রবন্ধে এই চর্চা বিস্তার লাভ করে। এরপর বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আমানুল্লাহ আহম্মদ ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও আমরা’ (আইবিএস জার্নাল, রাজশাহী, ১৯৮৫) এবং ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে বিধবার প্রেম: বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল’ (সাহিত্যিকী, রাজশাহী, ১৯৭৭) প্রবন্ধে বঙ্কিমমানস আবিষ্কারে ব্রতী হয়েছেন।

বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে বাংলাদেশের সর্বাধিক সংখ্যক প্রবন্ধ রচনা করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সারোয়ার জাহান (১৯৪৩-২০০০)। ‘বঙ্কিম উপন্যাসের উপসংহার’, ‘বঙ্কিম উপন্যাসের ব্যাঙ্গানুকরণ’, ‘উনিশ শতকের সাহিত্য সমালোচনা ও বঙ্কিমচন্দ্র, ‘বঙ্কিমচন্দের উপন্যাস: অনৈতিহাসিক উপাদানের উৎস’, সেকালের মুসলিম সমাজে বঙ্কিম উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যশৈলী: প্রসঙ্গ প্রবন্ধ’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যশৈলী: প্রসঙ্গ উপন্যাস’, ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও বাংলা উপন্যাস’, ‘বঙ্কিম দুহিতা: ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি’ প্রভৃতি প্রবন্ধে বঙ্কিমসাহিত্য বিশ্লেষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্কিম-সম্পর্কে তাঁর দুটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম উপন্যাসে মুসলিম চরিত্র ও প্রসঙ্গ (১৯৮৪) এবং বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস: মূল্যায়নের পালাবদল (১৯৮৫) নামের দুটি গ্রন্থই প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি।

যতীন সরকারের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শেখ আবদুল লতিফ, জুলফিকার মতিনের বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস বিচারের সূত্র, নূরুল আমিনের বঙ্কিমচন্দ্রের হাস্যরসাত্মক রচনা লুৎফর রহমানের বঙ্কিমচন্দ্র: লঘুরচনার আলোকে, নীলিমা ইব্রাহিমের বঙ্কিম উপন্যাসে রঙ্গরস, মেজবাহুল হকের ইংরেজ মাসন ও ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোেহর আলোকে বঙ্কিমচন্দ্র, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ: রচনার প্রেরণা ও পরিণাম, আবদুর রহিম খোন্দকারের বঙ্কিমচন্দ্রের লঘুরচনা বঙ্কিমচর্চচায় উৎসাহ সঞ্চার করে। আফজালুল বাসারের সামন্ত বুর্জোয়া চিন্তাবিদ বঙ্কিমচন্দ্র, আবদুস সোবহানের ফিল্ডিং ও বঙ্কিমচন্দ্র, আসাদুজ্জামানের বঙ্কিম উপন্যাসের প্রধান সংকট ও বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যসত্তা, ইজাজ হোসের অপরাভূত বঙ্কিমচন্দ্র: সামাজিক উপন্যাস প্রসঙ্গ, নরেন বিশ^াসের বঙ্কিমচন্দ্র: কৃষ্ণকান্তের উইল, বদরুদ্দীন উমরের বঙ্কিমচন্দ্রের আর্থসামাজিক চিন্তা, মনসুর মুসার বঙ্কিমে পাশ্চাত্য প্রভাব: ভাষা পরিচর্যার প্রেক্ষিত, মাহমুদা খাতুনের ‘বিধবা বিবাহ ও বঙ্কিমচন্দ্র’, শেখ আতাউর রহমানের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: মুসলিম প্রসঙ্গ আলী আনোয়ারের বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতি অন্বেষা, স্বরোচিষ সরকারের বঙ্কিমচন্দ্রের পাঠ-সম্পাদনা: দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের উদাহরণ এবং সৌদা আকতারের বঙ্কিম সমকালে রচিত উপন্যাসে ভিন্ন ধারা প্রভৃতি প্রবন্ধ বঙ্কিম-বিশ্লেষণে বৈচিত্র্য নির্দেশ করে।

সমকালীন পত্রপত্রিকায়ও বঙ্কিমচন্দ্র নিয়ে আলোচনা-নিবদ্ধ প্রকাশিত হয়। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফজলুল হক সৈকত বঙ্কিমচন্দ্র ও বাঙ্গালা ভাষা নামের একটি প্রবন্ধ রচনা করেন (বাংলানিউজটুয়েন্টিফোরডটকম, ৭ই জানুয়ারি ২০১৬)। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাসাহিত্যের বিকাশপর্বে ভাষা-প্রয়োগ -বিষয়ক চিন্তার দ্বন্দ্ব চলাকালে সমাজ-বিশ্লেষক, সাহিত্যের অনন্য সাধক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এমন সময়োপযোগী নিবন্ধ আমাদের জাতীয়তা ও ভাষার নিজস্বতা রক্ষায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে হয়। কেবল লিখে নয়, কীভাবে লিখতে হবে, কার জন্য লিখতে হবে―লেখার শক্তি-সৌন্দর্য-সামর্থ্য কেমন হওয়া চাই―এসব বিষয়েও ভেবেছেন, ভাবনার প্রকাশ করেছেন ‘সাহিত্যসম্রাট’ বঙ্কিম!’ তাঁর এই মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তবে বঙ্কিমবিদ্বেষ এখনও একশ্রেণির লেখকের মন থেকে দূরীভূতি হয়নি। এবনে গোলাম সামাদের মতো শিক্ষাবিদ ও বৃদ্ধিজীবীকে তাই ‘বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাঙালি মুসলমান’ (দৈনিক নয়াদিগন্ত, ঢাকা, ৫ অক্টোর ২০১৮) প্রবন্ধ লিখে সেই পুরনো অভিযোগকে নতুন করে প্রচার করতে দেখা যায়।

বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইদরিস আলী। কৃষ্ণকান্তের উইল ও বঙ্কিম নামের গ্রন্থটি ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উপন্যাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে বঙ্কিমগবেষণায় লেখক তাঁর দক্ষতা প্রকাশ করেন। এরপর অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের দুই পর্বে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র (প্রথম পর্ব ১৯৮২ সালে এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৯৮৪ সালে) প্রকাশিত হয় রূপম প্রকাশনী থেকে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। দুটি গ্রন্থই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম উপন্যাসে মুসলিম প্রসঙ্গ ও চরিত্র (১৯৮৪) লিখে তিনি বঙ্কিমের মুসলিম-বিদে¦ষ সম্পর্কিত ভ্রান্ত অভিযোগের যুক্তিপূর্ণ জবাব প্রদান করেন। তাঁর বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস: মূল্যায়নের পালাবদল (১৯৮৫) গ্রন্থটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভের উপর ভিত্তি করে রচিত। বঙ্কিম-মূল্যায়নে এই গ্রন্থ ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি প্রবন্ধই বর্ধিত কলেবরে গ্রন্থিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক (১৯৮৯) নামে। নতুন শতাব্দীতে এসে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল জলিল বাংলাদেশে বঙ্কিমচর্চা (২০০১) নামের গ্রন্থে নামপ্রবন্ধ ছাড়াও বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও বাংলার লোকসংস্কৃতি এবং প্রসঙ্গ আনন্দমঠ নামে দুটি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রবন্ধগুলো তাঁর ‘বঙ্কিমচর্চায় বাংলাদেশ’ (বাংলা একাডেমি পত্রিকা, ঢাকা, ১৯৯৩), ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে বাংলা লোকসংস্কার’ (সুন্দরম, ঢাকা, ১৯৯৫) এবং ‘স্ববিরোধী বঙ্কিম: প্রসঙ্গ আনন্দমঠ’ (দৈনিক বার্তা, রাজশাহী, ১৯৯৭) শিরোনামে পূর্বপ্রকাশিত প্রবন্ধের পরিমার্জিত রূপ। বঙ্কিমচর্চায় মুহম্মদ আবদুল জলিলের অবদানও যথেষ্ট। ‘বাংলাদেশে বঙ্কিমচর্চা’ (সাহিত্যিকী, রাজশাহী, ১৯৮৮) প্রবন্ধটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচর্চায় আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ (প্রাচ্যবিদ্যা, ঢাকা ১৯৯৭, দ্বিতীয় সংস্করণ খান ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯) গ্রন্থটি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ এই গ্রন্থে বঙ্কিম সম্পর্কিত দুই ধরনের সমালোচনারই জবাব তৈরি করেছেন।

বাংলাদেশে বঙ্কিমচর্চায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত ‘বঙ্কিমচন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষে’ (বাংলাদেশ উপন্যাস পরিষদ, ঢাকা, ১৯৯০), চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক রশীদ আল ফারুকী সম্পাদিত ‘বঙ্কিম সাহিত্য পরিক্রমা’ (মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৭), বিশিষ্ট কবি সমুদ্র গুপ্ত ও মুস্তাফা মজিদ সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে বঙ্কিমচন্দ্র’ (ডানা পাবলিশার্স, ঢাকা, ১৯৮৯) গ্রন্থত্রয় যথেষ্ট অবদান রেখেছে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষে’ গ্রন্থটি মূলত একটি সেমিনারের দলিলপত্র। বিশিষ্ট গবেষক ইসরাইল খান এটি সংকলন করেন। এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় জাগৃতি প্রকাশনী থেকে ২০০১ সালে। এই গ্রন্থে সম্পাদক ও সংকলকের ভূমিকা দুটিও গুরুত¦পূর্ণ প্রবন্ধের মূল্য পেতে পারে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ। ‘প্রসঙ্গ বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাধারা ও তাঁর উপন্যাস’ নামে প্রবন্ধটি নিয়ে আলোচনা করেছেন আহমদ শরীফ, বশীর আলহেলাল, আনিসুজ্জামান, হাসনা বেগম ও আমিনুল ইসলাম। প্রত্যেকের বক্তব্য এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সরদার আবদুস সাত্তারে ধন্যবাদ-বক্তৃতা এবং আবুল কাসেম ফজলুল হকের সভাপতির ভাষণও বঙ্কিম সম্পর্কে চিন্তাউদ্রেকী বক্তব্য ধারণ করে আছে। পরিশিষ্টে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী রেজাউল করিমের দুটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ নিয়ে। এই সেমিনার এ এই গ্রন্থ বাংলাদেশে বঙ্কিমবিরোধিতার মোক্ষম জবাব। বলা যেতে পারে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে বঙ্কিমকে রক্ষায় এর ভূমিকা প্রশংসিত।

‘বঙ্কিম সাহিত্য পরিক্রমা’ গ্রন্থে পশ্চিমবঙ্গে নয়জন এবং বাংলাদেশের চারজন লেখকের মোট ১৩টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশে বঙ্কিমচন্দ্র’ সংকলনে আহমদ শরীফ, সারোয়ার জাহান, মনসুর মুসা, বদরুদ্দীন উমর, আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রমুখের চিন্তাশীল প্রবন্ধ স্থান পায়।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকারের তত্ত্বাবধানে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস: ইতিহাসের সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ’ নামে অভিসন্দর্ভ লিখে পিএইচডি উপাধি পেয়েছেন জিএম মনিরুজ্জামান। এই অভিসন্দর্ভে বঙ্কিমচন্দ্রের নয়টি উপন্যাস বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে মোগল-পাঠান এবং রাজপুত-পাঠান প্রসঙ্গ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বঙ্গদেশীয় ইতিহাস প্রসঙ্গও বাদ যায়নি তাঁর আলোচনায়। বাস্তব ইতিহাস আর সাহিত্যের ইতিহাসের তুলনামূলক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই গবেষণা। বঙ্কিমচর্চায় এই গবেষণা নতুন চিন্তার রসদ যুগিয়েছে।

ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। নৈহাটীর বঙ্কিমভবনে উপস্থাপনের জন্য এটি রচিত। এই প্রবন্ধে তিনি  বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য মুসলিমজীবন উপস্থাপনের নতুন ভাষ্যে নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। 

বাংলাদেশে বঙ্কিমচন্দ্রকে ইতিবাচক মূল্যায়নে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের মধ্যে আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, কাজী আবদুল মান্নান, সারোয়ার জাহান, আবুল কাসেম ফজলুল হক, শান্তনু কায়সার ও মুহম্মদ আবদুল জলিলকে দেখা যায় একাধিক প্রবন্ধ কিংবা গ্রন্থ রচনা করে বঙ্কিমচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এখন বিশ^বিদ্যালয়ের পঠনপাঠনের সুযোগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ বাঙালির কাছে গ্রহণীয় হয়ে আছেন।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button