আর্কাইভদেশে দেশে বইমেলাবইকথা

মুক্তধারা বইমেলা : যেন দর্পণে নিজের মুখ : মনিজা রহমান

দেশে দেশে বইমেলা ২০২২

‘সময়ের সঙ্গে বাজি ধরে হেরে গেছি সেই কবে!’

কথাটা আমার নয়। কবি বিনয় মজুমদারের। মানুষ যদি ষাট বছর বাঁচে তবে প্রথম ত্রিশ বছর সে শুধু অভিভূত হয় আর শেষ ত্রিশ বছর সেই অভিভূত হওয়ার স্মৃতির গন্ধ খুঁজে বেড়ায়। জীবনের আয়ু রেখা যত লম্বা হয়, স্মৃতির জাবর কাটা তত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

নয়তো ডিটমার্স বুলভার্ড ধরে এস্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে যখন ইস্ট রিভারের তীরে হাঁটি, প্রথমেই বরিশালের অজপাড়াগাঁয়ে নানাবাড়ির গ্রামের কথাই প্রথম মনে হয়। অথচ সেই গ্রামে যাই না কতদিন! অযত্নে গড়ে ওঠা আধা জঙ্গলের মতো পার্কের ওই জায়গাটা। পাতা বা কাঠের শরীর থেকে ভেজা ভেজা, মেদুর একটা গন্ধ ভেসে আসে। ডাহুক কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ডাক কোথায় গিয়ে যেন স্পর্শ করে। একটা মালবাহী জাহাজ চলে যাবার পরে প্রচুর ঢেউ ওঠে নদীর গাঁয়ে। দূরে ম্যানহাটনের আলোকউজ্জ্বল টার্মিনাল দেখে স্মৃতিতে দুলে ওঠে বলেশ্বর নদীর হুলারহাট ঘাট।

নিউইয়র্কে দেশান্তরী জীবনের সূচনায় এমন সাদৃশ্য খুঁজে বেড়ানোতেই ছিল আমার প্রশান্তি। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হোমসিক’ মানুষ আমি। যে কখনও পুরান ঢাকার বাইরে থাকবে বলেই ভাবেনি, সে কি না এসে পড়ল সাত সাগর তের নদীর পার হয়ে আটলান্টিকের তীরে। তবে সূচনার প্রথম পাঁচ বছর জ্যাকসন হাইটসে থাকার কারণে ফেলে আসা জন্মভূমির অনেককিছু পেতাম। যে বাসাতে দীর্ঘদিন থেকেছি, সেখান থেকে সোজা গেলে মুক্তধারার অফিস। আর ডান দিকে গেলে পিএস সিক্সটি নাইন, যেখানে প্রতি বছর বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর দুটি জায়গা আমাকে ফিরিয়ে দিল জীবনের মূল্যবান স্মৃতি―একুশে বইমেলা।

বইমেলা এলে মনে পড়ে স্কুল বয়সে আব্বা-আম্মার সঙ্গে রিকশায় বাংলা একাডেমিতে যাওয়ার স্মৃতি। রাহাত খানের ‘দিলুর গল্প’ কিংবা শাহরিয়ার কবিরের ‘নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরা’ বই কিনে বাসায় ফেরার আনন্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হালকা শীতের দিনে সহপাঠীরা মিলে যেতাম। দলবেধে ঘুরতাম ধুলোময় পথে। কখনও সেখানে পানি ছিটিয়ে দিলে কেমন একটা ভাপ উঠত মাটি থেকে। সেই ধুলোর ঘ্রাণ এখনও নাকে লেগে আছে।

নাকে লেগে আছে নাগকেশরের গাছের ঘ্রাণও। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে কণ্ঠশীলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে টিএসসিতে যাওয়া হতো। বিশেষ করে শুক্রবার। নাগকেশর গাছের তলা দিয়ে আমরা সবাই যেতাম বইমেলায়। বিখ্যাত লেখকদের ঘিরে ভক্তদের উপচে পড়া আগ্রহ দেখতাম দূর থেকে। বইমেলায় গেলে অবশ্যই জাগৃতি প্রকাশনীতে যাওয়া হতো। বিশেষ করে সহপাঠীরা যেদিন এক সঙ্গে হতাম। বন্ধু দীপন আর জলি ভাবির সঙ্গে দেখা হতো। এখন দীপন নেই। বইমেলা আছে।

দেশ ছাড়ার পরে আমার একুশে বইমেলায় যাবার সৌভাগ্য হয়নি। আমার স্পেশাল নিডস সন্তান থাকার কারণে যেকোনও জায়গায়, যেকোনও সময়ে স্বাধীনভাবে যেতে পারি না। আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছিল নিউইয়র্ক মুক্তধারা বইমেলা। সৌভাগ্যক্রমে আমার বাসা ছিল তখন বইমেলা চত্বরের সঙ্গে। যে কারণে সকাল, বিকাল ও রাত মিলে তিনবেলা গেলেও কোনও সমস্যা ছিল না। রাতে সর্বশেষ দলের সঙ্গে গান শুনে দুইপাশে দুই ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম। গুনগুন করে গাইতাম―সৈয়দ আবদুল হাদির ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসত/ আমার নয়ন দুটি জলে ভাসত’ কিংবা সামিনা চৌধুরীর ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে/ রাতের নির্জনে’।

যখন জ্যাকসন হাইটসে ছিলাম, সকালে ছেলেদের নাস্তা খাইয়ে একবার, দুপুরে ভাত খাইয়ে আরেকবার আর রাতের খাবার শেষে শেষবার―মোট তিনবার আসতাম। আসলে বইমেলার কোনওকিছু বাদ দিতে চাইতাম না। পুরোটাই আস্বাদন করতে চাইতাম হৃদয়-মন দিয়ে। জ্যাকসন হাইটস ছেড়ে এস্টোরিয়া বাসা নিলাম এই উদ্দেশ্যে যেন দূরে চলে না যাই। যেন যেকোনও সময়ে উপস্থিত থাকতে পারি! কিন্তু ২০২২ সালে এ বছরের বইমেলা জ্যাকসন হাইটসে হয়নি। হয়েছে কুইন্সেরই বাঙালি অধ্যুষিত আরেকটি এলাকা জ্যামাইকায়। যেদিন প্রথম বইমেলার ভেন্যু পরিবর্তনের খবর শুনলাম, তখন মনে হলো দ্বিজ চণ্ডীদাসের কবিতার কথা―

সই, কেমনে ধরিব হিয়া

আমারি বধুয়া আন বাড়ি যায়

আমারি আঙিনা দিয়া।

দিনটা ছিল এ বছর ২৮ জুলাই। চারদিকে উপচেপড়া মানুষ। বাইরে ঢাকের আওয়াজ। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার রূপ নিল যেন এক খণ্ড বাংলাদেশে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক আয়োজিত নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলার প্রথম দিন ছিল সেদিন। নানা রঙের ব্যানার, পোস্টারে সাজানো প্রাঙ্গণ আর দেশীয় শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরিচিত নারী পুরুষের ভিড়ে বইমেলা যেন প্রাণের মিলনমেলায় রূপ নিল।

বইমেলা এবার জ্যামাইকার এই খোলা জায়গা হওয়াতে যেন শাপে বর হলো। খোলা আকাশের নিচে বইয়ের স্টল, ঢাকা একুশে বইমেলার যেন মেজাজ পেলাম। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের বিল্ডিংটি অনেকটা দেখতে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের মতো ছিল। পাওয়া তথ্যমতে, এবার বাংলাদেশ থেকে মোট ১৪ জন প্রকাশক পাঁচ হাজারের বেশি বই নিয়ে এবারের বইমেলায় যোগ দিয়েছেন। ছিল বাংলাদেশ, আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে আগত লেখকগণ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও এসেছেন অনেকে। আর বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র।

৩১টি মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে ৩১তম বাংলা বইমেলা উদ্বোধনের পরে প্রধান অতিথি কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র বললেন―‘আমি এই বইমেলায় প্রথম এলাম। এসে বুঝলাম আমার বাংলা ভাষাটি হারিয়ে যাবে না। হেরে যে যাবে না সেটা ১৯৭১ সালে বোঝা গিয়েছিল। তারপর পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। পৃথিবী যেমন বদলে গেছে, ভাষাও বদলে গেছে। শাসকের ভাষা গিলে খাচ্ছে শাসিতের ভাষা। যা আমার দেশে অনেকটা হচ্ছে। তবে তার প্রতিরোধও হচ্ছে। ভাষা থাকলেই বই থাকবে, বই থাকলেই মানুষে মানুষে দেখা হবে, মিলনমেলা হবে।’

আলোচনা, নৃত্য, সঙ্গীত, সম্মাননা প্রদান ছিল প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ। তবে দ্বিতীয় দিন থেকে নিউইয়র্ক বইমেলা যে বাঙালির প্রাণের মেলা সেটা প্রমাণিত হয়। যার খুশি ভিতরে গিয়ে আলোচনা-গান বা কবিতা পাঠ শুনছে, কেউ বাইরে দলবেধে ছবি তুলছে। সন্ধ্যার পরে অনেকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে একতারা হাতে, ঢোল বাজিয়ে, খঞ্জনি বাজিয়ে নাচে আর গানে বইমেলা চত্বর উৎসবমুখর করে তুলছে। এদের কেউ কবি, কেউ গল্পকার, কেউ সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী কিংবা কেউ নাট্যশিল্পী। কেউ হয়তো সাধারণ পাঠক। বইমেলা চত্বরের অস্থায়ী মঞ্চে তারা দলবদ্ধভাবে নাচ-গান করতে থাকে। মঞ্চের বাইরেও চলতে থাকে নাচ-গান। বলাবাহুল্য এই সব গান ছিল বাংলাদেশের লোকজ সঙ্গীত।

এ বছর মেলার বিক্রিও ছিল ভালো। এ বছর মেলায় কোন শাড়ি-কাপড় বুটিকের স্টল ছিল না। প্রকাশকদের মেলা শেষে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মহামারির কারণে দুই বছর বন্ধ থাকার পরে বইমেলা হওয়াতে মানুষের ঢল ছিল এবার। বইমেলায় যেসব প্রকাশনা সংস্থা যোগ দেয়, তারা হলো―বাংলাদেশ অংকুর প্রকাশনী, অনন্যা প্রকাশনী, অন্বয় প্রকাশ, আকাশ প্রকাশনী, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, কথা প্রকাশ, কবি প্রকাশনী, কাকলী প্রকাশনী, নালন্দা; নিউইয়র্কের মুক্তধারা, ছড়াটে, পঞ্চায়েত, কালের চিঠি, তিন বাংলা, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব এবং টেনেসি স্টেট থেকে আগত ঘুংঘুর।

উদ্বোধনের পরদিন থেকে প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত ছিল এই উৎসবমুখরতা। মানুষের হাতে বইয়ের ব্যাগ। সবাই যেতে যেতে একে অপরকে বলছে, ‘আবার দেখা হবে আগামী বছর।’ সবারই দাবি―বইমেলা যেন জ্যামাইকার এই উন্মুক্ত প্রান্তরেই হয়। কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, মুক্তধারা বইমেলা থেকে কিছু পান না। একদল মানুষ আসে শাড়ি কিনতে, খাওয়া দাওয়া করতে, হৈহুল্লোড়, সেলফি তুলতে আর ফটোসেশন করতে। তারা অডিটোরিয়ামে গিয়ে কোনও অনুষ্ঠান দেখেন না। তারা স্টলে স্টলে ঘুরে কারওই বই হাতে নেন না। তাই হয়তো তারা বইমেলা থেকে কিছু পান না।

প্রতি বছর নিউইয়র্ক বইমেলার দিনগুলো আমার বছরের সেরা উৎসব। আমার ঈদ! সেরা পোশাকটা আলমারিতে তুলে রাখি, বইমেলার দিনগুলোতে পরব বলে। বইমেলা আমার খোলা জানালা। জীবনের এই সুকুমার অনুভববের কথার জানার ইচ্ছে আমার আজন্ম। তাইতো পুরনো ঢাকা থেকে এক কিশোরী মেয়ে রিকশা-বাসে যেত―বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে। কখনও টিএসসিতে কণ্ঠশীলনের ক্লাসে। জীবনের নানা উত্থান-পতনে মনটা মরতে দিইনি। জ্বালিয়ে রেখেছি অন্তরের তৃষ্ণা। মুক্তধারা বইমেলা সেই তৃষ্ণা মেটায়।

কবিতা বুঝিনি আমি; অন্ধকারে একটি জোনাকি

যৎসামান্য আলো দেয়, নিরুত্তাপ, কোমল আলোক

এই অন্ধকারে এই দৃষ্টিগম্য আকাশের পারে

অধিক নীলাভ সেই প্রকৃত আকাশ পড়ে আছে―

(বিনয় মজুমদার)

নিউইয়র্ক থেকে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button