আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

আমার বাবা, ইংরেজ লোকটি আর আমি : মূল : নুরুদ্দিন ফারা : অনুবাদ : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : আফ্রিকান গল্প

[নুরুদ্দিন ফারা―সোমালিয়ার একজন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক ও নাট্যকার। জন্মেছিলেন ১৯৪৫ সালে। তিনি একেবারে প্রথমে সোমালি ভাষায় লিখলেও ফারার বেশির ভাগ লেখালেখি ইংরেজিতে। আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি সৃষ্টিশীল এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ঔপন্যাসিকদের একজন। তাঁর প্রথম উপন্যাস, কোঁকড়ানো পাঁজরের থেকে নারীবাদীদের কাছে যুগান্তকারী কাজ হিসেবে সম্বর্ধনা পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালে দেশের বাইরে থাকাকালে খবর পান যে দেশে ফিরলে তাঁর একটি নগ্ন ছুঁচ উপন্যাসের বিষয়বস্তুর কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা হবে। পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকা কালীন সারা পৃথিবীর অজস্র দেশজুড়ে লেখালেখি ও শিক্ষকতা করেন। ভূষিত হন দুনিয়া জুড়ে সাহিত্যের বিবিধ সম্মানে। বর্তমানে থাকেন আমেরিকা আর দক্ষিণ আফ্রিকায়। নোবেল পুরস্কারের মনোনয়নে নিয়মিত উঠে আসে নুরুদ্দীন ফারার নাম।]

আদরের মিনাকে

তখন আর কত বড় হব আমি―দাঁড়ানো অবস্থায়, একজন বসে থাকা পিগমির হাঁটু বরাবর! সেই তখন একদিন প্রথম কোন ইউরোপীয় দেখলাম, কোন ইংরেজ দেখলাম, ওগাডেনের প্রশাসক, যাঁর অধীনে আমার বাবা দোভাষীর কাজ করতেন। তিন বছরও হয়নি তখন আমার, আমি যে ঐ ঔপনিবেশিক আধিকারিরের সঙ্গে দেখা হওয়াটা পছন্দ করি না সেটা ভালো রকম জানা থাকা সত্ত্বেও বাবা একদিন জরুরি তলব পেয়ে আমাকে তার সঙ্গে জুড়ে নিল। ঐ সাদা লোকের প্রতি আমার মায়ের খোলাখুলি অপছন্দের কথাটা কোনও লুকোনো ব্যাপার ছিল না। কিন্তু কীসের জন্য ইংরেজ লোকটির দেওয়া মিষ্টি এবং অন্যান্য উপহার আমি নিতে চাইনি সেটা শুধু এটুকু দিয়েই ব্যখ্যা করা যাবে না মনে হয়।

বাবার যখন-তখন ক্ষেপে যাওয়া, অদম্য রাগ, পরবর্তী-সময়ে আমার নিজের জীবনে আমাকে যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং নিজের মতের সঙ্গে না মিললে হঠাৎ করে মেজাজ হারানো, এসব মিলিয়ে আমার মায়ের প্রিয় সন্তান হিসেবে, আমার মনে হয় শুধু ঐ ইংরেজ লোকটির বিরুদ্ধে নয়, আমার বাবার প্রতিও আমার মধ্যে একটা বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছিল। পরিবারের বাইরের লোকদের কাছে বাবা ছিল দয়ার অবতার, আর যারা তার উপর নির্ভর করে আছে তাদের উপর তার মেজাজের অন্ত ছিল না। কিন্তু ওই ইংরেজ লোকটির প্রতি তার আচরণ ছিল একজন একান্ত অনুগামী প্রজার। সাদা লোকটির খাস চাপরাশি বলা যেতে পারে তাকে, তার সমস্ত আদেশ মেনে নিত, কখনও তার সম্পর্কে একটা কটু কথা বলেনি কোনও দিন।

বাবার সঙ্গে দিয়ে দেওয়া মিষ্টিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে নিজেকে রাজি করানোটা আমার পক্ষে বিরাট ব্যাপার ছিল, কারণ সেসব দিনে আমার জগৎ ছিল মুখ-সর্বস্ব। প্রলোভন আটকাতে আমি ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা মুখে পুরে দিয়েছিলাম, বাঁ হাতে না খাওয়া মিষ্টিটা শক্ত করে ধরা আছে, বাবার সঙ্গে সঙ্গে আছি, আমার কব্জি ধরে বালির বস্তার মতো আমায় টানতে টানতে নিয়ে চলেছে সে। প্রবলভাবে মন চাইছিল মিষ্টিটা খেয়ে ফেলতে কিন্তু মায়ের না বলা ইচ্ছাটি সম্মান দিতে সেটা করতে পারলাম না আমি। অনেক পরে আমি বুঝেছিলাম, এক ঐতিহাসিক আনুগত্যের জন্ম হয়েছিল সেই দিন।

আমার মনে পড়ছে বিষয়টা নিয়ে আগেও আমার মা-বাবার মধ্যে উঁচু গলায় কথা কাটাকাটি হয়েছে, ঔপেনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামোয় বাবার নিজের অতি নিচু অবস্থান মেনে নেওয়াতে মায়ের একেবারে মত ছিল না। পরে, বহু বছর বাদে, জোর তর্কাতর্কির সময় মা একদিন বাবাকে ‘রাজনৈতিক দালাল’ বলে গাল দিয়েছিল, পুরনো স্মৃতি তুলে আনলো ঘটনাটা।

যা বলছিলাম, পারলে আমি মায়ের সঙ্গেই থেকে যেতাম। মা আজকাল আর কিছুতেই নিজের বিষণ্নতা ধরে রাখতে পারছিল না, সবটা বোঝার পক্ষে বয়সটা কম ছিল আমার। অতি দুঃখের সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম আমি। মা কাছে থাকলে কোনও কথা বলতে একটুও অসুবিধে হতো না। কিন্তু অন্য লোকেদের সামনে মুখ খোলার সময় কথা আটকে যেত আমার। আজকে তো মনে হচ্ছিল, জিভটাই গিলে ফেলেছি। মাকে ভালোবাসতাম আমি, সে ছিল আমার একান্ত আশ্রয়, তার ধৈর্য্য ধরে চুপ করে থাকা আমায় তোতলামি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করত।

আফসোস এটাই যে ঘটনাপ্রবাহের ব্যখ্যায় আমার এই ভাষ্যের সমর্থন করার জন্য আমার মায়ের সাহায্য পাওয়ার আর উপায় নেই আমার। ভাগ্যের লিখন, আমার স্মৃতিগুলো নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলাবলি করতে পারার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে সে।

সবচেয়ে বেশি করে আমার যা মনে পড়ে―হাত, কোনও হাত আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ঠেলা দিচ্ছে কোনও হাত। আমি দেখতে পাচ্ছি, ইংরেজ লোকটি এগিয়ে আসছে, আমার দখল নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে আমার বাবার খোলা পাঞ্জা আমায় এগিয়ে দিচ্ছে ঐ সাদা লোকের ঝুঁঁকে আসা মুখের দিকে। নাকি আমাদের স্মৃতি এক অবাধ্য সত্তা যার সঙ্গে আমাদের লড়াই চলতে থাকে, যে সচেতনভাবে আমাদের স্মরণের সততা, অখণ্ডতা নিয়ে ভাঙচুর চালায় এবং আমাদের অতীতকে এমনভাবে পাল্টে নেয় যাতে তা আমাদের বর্তমানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে ? সম্ভবত নয়। কারণ আমিই একমাত্র লোক নই যে আমার বাবাকে হাতের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবে―কোনো সাহায্যের হাত নয়, আঘাত করতে এগিয়ে আসা হাত। আমার বড় ভাইদের একজন যাকে আমাদের বাবা প্রায়ই তার দুষ্টুমির জন্য মারধোর করত, আমার সঙ্গে একমত যে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারত না যে আমার বাবার হাত কাউকে বাঁদর-পেটা করতে যাচ্ছে নাকি তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তার মাথা চাপড়ে দিতে যাচ্ছে।

আমি যে বাবার সঙ্গ নিয়ে সেদিন ঐ ইংরেজ লোকের সঙ্গে দেখা করতে গেছি, তার একমাত্র কারণ এই যে আমার কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। নিজেকে মানসিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের চারপাশে যে আবেগের প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছিলাম আমি, তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল আমায়। কারণ তিন বছর বয়স হওয়ার আগেই আমি, বুঝে গেছিলাম, হয়তো সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই, যে ঐ ইংরেজ লোকটির প্রতি বশ্যতা স্বীকার না করার অপরাধে বাবা আমায় শাস্তি দিতে পারে। কিছুটা পাকামি করেই সামনে এগিয়ে গেলাম আমি, একটু যদি খুশি করা যায়, শুধু কোনও মতে আটকে রাখা চোখের জলের বেইমানিতে আমার মনের আসল অনুভূতি ফাঁস না হয়ে গেলেই হয়। কী আর বলব! ইংরেজ লোকটির আদরে কেঁদে না ওঠা বা লজ্জায় কুঁকড়ে না-যাওয়া রীতিমত কঠিন ছিল।

বাবাকে খুশি হতে দেখে মনের থেকে কী বোঝা যে নেমে গেল! বাবা আর ঐ ইংরেজে লোকের সম্পর্কের একটা সুনির্দিষ্ট ধরন ছিল। বাবা কথা বলত শুধু তাকে কিছু বলা হলে অথবা কিছু বলার অনুমতি দেওয়া হলে। আমার অবাক লাগত দেখে যে ঐ ইংরেজের সঙ্গে আমাদের বাড়ির কর্তাটির আচরণ ছিল একটি ছাত্রের মতো, শিক্ষক যা বলেছেন সেটাই আবার আউড়ে যাওয়া। যেটা আমার জানা ছিল না যে বৃটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হিসেবে আমার বাবার কাজটাই ছিল ইংরেজ লোকটি সোয়াহিলিতে যা বলছেন সেটাই সোমালিতে অনুবাদ করে দেওয়া।

সবে ইংরেজ লোকটি আমায় তার কোলে বসিয়েছে, আমার মনে হলো আমার চারপাশে কিছু একটা বদল ঘটে যাচ্ছে। কারণ, মেঝেতে মোষের চামড়ার চপ্পলের ঘষটানির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় জনা বারো লোকের একটা দম বন্ধ করা গুঞ্জন আমাদের ঘিরে ধরছিল। আর হঠাৎ করেই আমি উত্তরাধিকারী বনে গিয়েছিলাম এই সদ্য আসা মানুষগুলোর মুখের দুঃখের ছবির, যে দুঃখ বহন করে চলে হিজড়ারা। আমি এখন যা জানি, যদি সেইদিন সেইসময় তা জানা থাকত আমার, যদি জানতাম যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাথারা সেদিন ঐ ইংরেজ লোকটির প্রশস্ত ঘরটিতে জড়ো হয়েছিল ইতিহাসের কতগুলো জটের মুখোমুখী হবে বলে, আমেরিকার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে ইথিওপিয়া আর ব্রিটেন মিলে যে চুক্তি বানিয়েছে তাতে বুড়ো আঙুলের সিলমোহর বসাবে বলে, তা হলে আমি হয়তো ধরতে পারতাম যে সেই সময় যে অসহায়তার অনুভূতি আমার হচ্ছিল তা এসব মানুষের অনুভূতির থেকে একটুও আলাদা ছিল না। ১৯৪৮ সালের ক্যালেন্ডারে তখনও অনাগত সেই দিন-তারিখ নিয়ে আমি ঠিক নিশ্চিত নই, যে দিনটিতে সম্প্রসারণবাদী ইথিওপিয়ার হাতে ওগাডেনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটিতে আমার ভূমিকাটি কী ছিল ? ইংরেজ লোকটির আলিঙ্গনে আটকা পড়ে আছি আমি; কর্তৃত্বের খোলসে মোড়া যেসব শব্দ আমার বাবার মুখে সোমালিতে অনূদিত হওয়ার আগে আমার হৃৎস্পন্দন ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাদের অনুতাপ উপলব্ধি করতে পারছিলাম আমি এবং আমি কিচ্ছু করিনি। আমি যদি নিজেকে ঐ ইংরেজের লুটের মাল হয়ে যেতে বাধা দিতাম, যে লুটের জন্য তাকে একটি বুলেটও খরচ করতে হয়নি, তা হলে কি ঘটনাপ্রবাহ অন্যরকম হতো ? আমি যদি চ্যাঁচামেচি করে ইংরেজ লোকটার ঐসব নোংরা কথা সোমালিতে অনুবাদ করতে বাবাকে বাধা দিতাম, তা হলে কি ওগাডেনের ভাগ্যে ন্যায়সঙ্গত কিছু জুটত ?

আমার মনে আছে, গোষ্ঠীর মাথারা আমার বাবার সঙ্গে তুমুল বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ল। বাবা নানাভাবে ইংরেজ লোকটির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে নিরুৎসাহিত করছিল। তর্কবিতর্ক থেকে পুরোপুরি বাদ পড়ে যাওয়া ইংরেজ লোকটি, একসময় ক্ষমতাধারী লোকেজনেরা যা হর-হামেশাই করে থাকে, তাই করল, বিশাল তর্জন-গর্জনের উচ্চ ঘোড়াটিতে সওয়ার হয়ে গেল এবং সব চুপচাপ হয়ে গেল। আর ঠিক এই সময়ের এই সংঘর্ষে আমার প্রবেশ ঘটল। আমার জীবনের আদি মুহূর্তটি থেকে জমিয়ে রাখা সমস্ত ক্রোধ এক করে তীব্র এক চিৎকার ছাড়লাম আমি। আমার কাছে মাপ চেয়ে ইংরেজ লোকটি অন্য কোনও দিন আবার বসা হবে বলে সেদিনের মতো সভা মূলতুবি ঘোষণা করে দিল।

পরবর্তী সভায় চুক্তিপত্রে সই করার জন্য নির্ধারিত জায়গায় গোষ্ঠীপতিরা যার যার বুড়ো আঙুল নামিয়ে এনেছিল এবং চুক্তি সই হয়ে গিয়েছিল। যদি আমি সেখানে হাজির থাকতাম বা আমার মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া হতো, চুক্তি সইয়ের এই ঘটনা হয়তোবা ঘটত না।

ন্যাশভিল, টেনিসি থেকে

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button