আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

আমার চামড়ার কোনও দোষ নেই : মূল : নিমা কোমবা : অনুবাদ : হারুন রশীদ

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : আফ্রিকান গল্প

[নিমা কোমবা―তানজানিয়ার কবি ও লেখক। ২০১৪ সালে সাহিত্যে ‘ইতিসালাত’ পুরস্কার পেয়েছেন ফিকশন ক্যাটাগরিতে। তাঁর লেখা সি থ্রু দ্য কমপ্লিকেটেড কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। তাঁর সার্চ ফর ম্যাজিক্যাল এমবুজি প্রকাশিত হয়েছিল সেফ হাউস থেকে। তিনি আফ্রিকান লেখকদের সংগঠন ‘দিস ইজ আফ্রিকা’র সদস্য। গল্পটি অনুবাদের আগে সরাসরি লেখকের অনুমতি চেয়ে নিমা কোমবাকে ই-মেইল করা হয়েছিল। তিনি গল্পটা বাংলায় অনুবাদের অনুমতি দেন।]

এই এক হাতওয়ালা পঙ্গু শ্বেতী রোগীটা নিরাপত্তারক্ষীর ইন্টারভিউতে কী করছে ?

ওরা নিশ্চয়ই আমার দিকে তাকিয়ে কথাটা ভাবছে। তাদের দৃষ্টির অবিশ্বাসটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু সেটাকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছি না। আমি এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি শুধু চাকরিটার জন্য। চাকরিটা আমার খুব দরকার।

আমি আমার সবচেয়ে ভালো জামাটা পরে এসেছি। একটা নীল পোলো শার্ট পরেছি সাথে কমব্যাট কালারের ট্রাউজার। আমার মাথার সোলার হ্যাট বা সৌর টুপিটা ঠিকঠাক করে বসিয়ে লাইনের মধ্যে অপেক্ষা করছি।

‘ইয়োনা কাজাদি’, রিসেপশনিস্ট ডেকে উঠলেন।

আমার বুকটা ধড়ফড় করছিল, তবু আমি মাথা উঁচু রেখে ইন্টারভিউ রুমে ঢুকে পড়লাম। বড় একটা টেবিলের ওপাশে দুজন পুরুষ এবং এক ভদ্রমহিলা পাশাপাশি বসে আছে। তাদের সামনে একতাড়া কাগজের স্তূপ। আমি মাথা ঝুঁকিয়ে তাদের সম্ভাষণ জানালাম। ভদ্রমহিলা আমাকে বসতে বললেন। আমি আমার সানগ্লাস আর সোলার হ্যাট খুলে সামনের কাঠের চেয়ারে বসলাম। সমস্ত ঘরে ঘূর্ণায়মান সিলিং ফ্যানের শব্দ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানের ব্লেডগুলো ঘরের মধ্যেকার উত্তাপকে ফালি ফালি করে কেটে ফেলার চেষ্টা করছে।

গাঢ় নীল রঙের দীর্ঘ হাতার একটা জামা এবং হলুদ রঙের হিজাব পরিহিত ভদ্রমহিলা মিরিয়াম নামে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের রিসোর্স ম্যানেজার, বাকি দুজন তার সুপারিনটেনডেন্ট। তারা আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল তাতে মনে হচ্ছিল তারা শুধু একটা বিষয়ই জানতে চায়―কোন্ আক্কেলে এক হাত ওয়ালা একটা পঙ্গু লোক নিরাপত্তা রক্ষীর চাকরি করার জন্য এসেছে ?

ভদ্রমহিলা বললেন―‘আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন’।

আর তখনই আমি তাদের সামনে বসে আমার গল্পটা বলতে শুরু করলাম।

সেদিন গভীর রাত। আমি একটা পাতলা ম্যাট্রেসে শুয়ে শুয়ে মাথার ওপর প্লাইউডের ছাদে ইঁদুরের ছোটাছুটির শব্দ শুনছিলাম। আমি জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। আমার ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে সেদিন থেকে, যেদিন বাবা জোসেফ আমাকে বললেন যে আমার বয়স প্রায় ১৮ হয়ে গেছে। এখন আমাকে বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ খুঁজতে হবে। তিনি আমাকে বোঝালেন আইনের চোখে আঠার বছর বয়স হলো নিজের পায়ে দাঁড়াবার বয়স, পথে নেমে নিজের পথ নিজে খুঁজে নেবার বয়স। কিন্তু আমি তখনও সেটার জন্য তৈরি ছিলাম না। আমার কোনও ধারণা ছিল না সেরেমা শহরে একা একা কীভাবে টিকে থাকব। শহরটা গিজগিজ করছে এমনসব লোকে, যারা আমার মতো মানুষদের ঘেন্না করে।

শুয়ে শুয়ে যখন এসব কথা ভাবছিলাম, ঠিক সেই সময় আমাদের ডরমেটরির সদর দরজার মরচে পড়া কবজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠল। সেই শব্দে আমার চিন্তাটা বাধাগ্রস্ত হলো। হতে পারে এটা আমার দুর্বল মানসিক অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। আপনি যদি সারাক্ষণ একটা অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়ান, তাহলে আপনার ভয়ে কাতর না থেকে উপায় নেই। আমার জানালার বাইরে কারও পদশব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি দমবন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকলাম মৃতবৎ। কপাল থেকে ভুরু বেয়ে ঘামের ধারা নেমে আসছিল। আমার চোখে সেদিনের ভয়ানক দৃশ্যটা ভেসে বেড়াতে লাগলো যেদিন এই আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রিশটা ঘুমন্ত শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল আর আমি, ইয়োনা কাজাদি তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।

আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার চেষ্টা করছিলাম, যে ঈশ্বরকে আমার সবসময় কুহেলিকা মনে হয়েছে। কিন্তু আমার দাদি আর বাবা জোসেফ সবসময় জোর দিয়ে বলতেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সত্যি সত্যিই আছে।

ছেলেবেলা থেকেই আমাকে শয়তানের বাচ্চা বলে ডাকা হতো। লোকে বলত আমার মা শেতানি বলে কথিত এক দানবের সাথে শুয়েছিল বলে আমার চামড়ায় এমন শ্বেতরোগ হয়েছে, চোখ দুটো ফ্যাকাশে হয়েছে, চুলগুলো হয়েছে ভুট্টার মতো। রাস্তায় চলার সময় লোকজন আমাকে জেরুজেরু (শ্বেতী রোগী) বলে টিটকারি দেয়। আমার কাছাকাছি হলে তারা তাদের জামায় থুথু ছিটায় যেন আমার সাথে থাকা শয়তানের কাছ থেকে রক্ষা পায়। আমার চোখ পিটপিট করা কিংবা মাথা ঝাঁকানিকে তারা খুব ভয় পায়।

কিন্তু সে রাতে আমি আমার দাদির দেয়া তাবিজটা খুব শক্ত করে ধরে প্রার্থনা করলাম―‘ঈশ্বর তুমি যদি সত্যিই থেকে থাকো, তুমি যদি আমার কথা শুনতে পাও তাহলে এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করো।’

আমার কাছে ওটা ছিল একটা পরাজয়ের মতো, নিজের দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণের মতো। আমি খুব বিশ্বাস করতে চাইতাম মানুষের ভেতরে শয়তানের চেয়েও শক্তিশালী কেউ বাস করে। কোথায় ছিল সেই ঈশ্বর যখন দিনের পর দিন আমরা নিগৃহীত হচ্ছিলাম, যখন আমাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছিল ? কোথায় ছিল তার ক্ষমতা যখন দায়ের কোপে আমাদের হাত পা কেটে নেয়া হচ্ছিল ? আর তিনি যখন আমাদের সৃষ্টি করেন তার কাছে কী মেলানিনের ঘাটতি পড়েছিল ?

বেশকিছু কাল আগ থেকে শ্বেতী আক্রান্ত লোকদের অপহরণ এবং খুনোখুনির ঘটনা শুরু হয়েছিল। যাদের ওরা দিলি বলে। গ্রামের ওঝারা লোকজনকে বলেছিল যে ওইসব শ্বেতী রোগাক্রান্ত লোকের হাড় দিয়ে তৈরি আরক পান করলে তারা অনেক বড়লোক হতে পারবে। জেরুজেরু যত কচি হয় তত বেশি উপকার পাওয়া যায়।

যখন এই গুজব ছড়ানো হচ্ছিল তখন আমি আমার দাদি বিবি ঘাসিয়ার সাথে সিওয়ান্দা গ্রামে বাস করতাম। সিওয়ান্দা গ্রামের অধিকাংশ এলাকাই সমভূমিতে অবস্থিত। গ্রামে ছিল কয়েকটা বৃক্ষ আর লাল রঙের কাদামাটির তৈরি কিছু কুঁড়েঘর যাদের চালগুলো খড়ের তৈরি। গ্রামের সবটা পথ জুড়ে লাল মাটির ধুলো উড়ত সারাক্ষণ।

আমরা থাকতাম একটা টিলামতো জায়গায়। আমাদের পোষা মুরগি ছিল। আমরা কাসাভা আর গমের চাষ করতাম বাড়ির সামনের এক টুকরা জমিতে। আমাদের নিচের দিকে একটা পুরানো পরিত্যক্ত স্বর্ণখনি পুরো উপত্যকার মধ্যে একটা বিপুলাকৃতির গর্তের মতো ছড়িয়ে ছিল। আমরা দূর থেকে এমজুগুর খনি বা ভিক্টোরিয়া গোল্ডের চকচকে অ্যালুমিনিয়ামের ছাদগুলো দেখতে পেতাম। ওদিকে সাধারণ লোকজনের যাতায়াত নিষিদ্ধ ছিল। তবু মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকেরা স্বর্ণচুরির মতলবে ঢুকে পড়ত ফাঁক ফোঁকরে।

যখন শ্বেতীরোগী অপহরণটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল তখন আমি সবে প্রাইমারি স্কুলে পড়তে শুরু করেছি। এসব খুনখারাবির ঘটনায় দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ত্যক্ত ছিলেন। তিনি সবাইকে অনুরোধ করছিলেন এসব খুন অপহরণ থামানোর জন্য। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি।

আমার স্কুল ছিল বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে উপত্যকার অন্যপাশে। ওখানে একটা খ্রিস্টান মিশন আর একটা গির্জা আছে। রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমার মাথার ওপরে খাংগা (গামছা ধরনের কাপড়) পেঁচিয়ে দিয়ে আমাকে প্রতিদিন সকালে স্কুলে নিয়ে যেতেন আমার দাদি। তিনি বুড়ি হলেও বেশ শক্ত-সমর্থ ছিলেন, তার কোমরে একটা পাঙ্গা (এক ধরনের দা) গোঁজা থাকত সবসময়। তিনি গলায় লাল পুঁতির মালা পরতেন। তার সাথে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করতাম। লোকজন তাকে ভয় পেত। দূর থেকে ডাইনি বলে ডাকত। কিন্তু বিবি আমাকে বলতেন তাদের কটূক্তি উপেক্ষা করতে। এসব তাদের অজ্ঞতা। বলতে বলতে নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে থেমে পড়বে একসময়।

তখনও খুব বেশিদিন হয়নি শ্বেতী রোগীদের কুসংস্কর সিওয়ান্দাতে ছড়িয়েছে। তবে উচ্চাভিলাষী খনি শ্রমিকেরা আমাদের হাড়ের জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল।

সে রকম একটা দিনে আমি দাদির সাথে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে দুই খনি শ্রমিক তাদের হাতের ধারালো দা নিয়ে ছুটে এল একটা বেড়ার আড়াল থেকে। দৃশ্যটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। আমার দাদি চিৎকার করে উঠল যখন তারা আমাকে ধরে ফেলল। আমার এখনও মনে আছে দাদি কীভাবে হাতের পাঙ্গা দিয়ে তাদের সাথে লড়াই করছিল এবং আমাকে টেনে তাদের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল। কীভাবে ভোতা দায়ের আঘাতে আমার হাড় ভেঙে পড়ছিল মটমট করে। আমি সেই দৃশ্য এখনও ভুলতে পারি না। আমার সেই রক্তাক্ত বাহু, তীব্র ব্যথা আর আমাকে জড়িয়ে রাখা আমার দাদির কম্পিত দেহটা এখনও চোখে ভাসে। আমার আরও মনে পড়ে এত ঘটনার মধ্যে আমার দাদির ঈশ্বরের নীরবতার কথা।

ঘটনার কিছু সময় পর এক মিশনারি কর্মী আমাদের খুঁজে পেয়েছিল। আমার দাদি মারা গিয়েছিল আমাকে বাঁচাতে গিয়ে। তারা বলছিল যে আমার বেঁচে যাওয়াটা নাকি একটা অলৌকিক ঘটনা। তারা আমাকে লুবোন্দো হাসপাতালে নিয়ে গেল, যেখানে আমার হাতটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। পরে আমাকে কিভুলিনি নামের একটা আশ্রমে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিভুলিনি মানে ছায়ার নিচে। আমাকে যখন ওই আশ্রমে নেয়া হয় তখন আমার বয়স নয় বছর। জায়গাটা ছিল সেরেমা শহরের একটু বাইরের দিকে। ভাঙা কাচের টুকরো বসানো লাল ইটের দেয়াল ঘেরা আধা একরের মতো একটা জায়গায় আশ্রমটা নির্মিত। ওখানে বাচ্চাদের জন্য একটা বড় ডরমেটরি ছিল, কয়েকটা ক্লাসরুম, একটা মুরগির ঘর, একটা শুয়োরের খোঁয়ার, আর একটা ছোটখাটো সবজি বাগান ছিল সামনে। বাবা জোসেফ এই আশ্রম চালু করেছিলেন ২০০৭ সালে যখন তার স্ত্রী পুত্রকে একটা সন্ত্রাসী দল হত্যা করেছিল। তিনি ঘটনাটা আমাকে বলেননি কিন্তু আমি পত্রিকায় খবরটা দেখেছিলাম। আমাদের সবারই কমবেশি একই রকম গল্প। সবাই নানান জায়গা থেকে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে এসেছে, কেউ কেউ এমনকি নিজের পিতামাতার কাছ থেকেও পালিয়ে এসেছে।

আমি আমার বিছানা থেকে উঠে বসলাম। চুপচাপ শুয়ে থেকে কোনও অঘটন ঘটার অপেক্ষা করতে পারি না।

বাবা জোসেফ সবসময় বলেন―‘শোনো বাপুরা সাহস মানে শুধু ভয়ের অনুপস্থিতি নয়। আমি জানি তোমরা ভয়ে থাকো সবসময়। কিন্তু ভয় পেলেও তার মধ্যেই তোমাকে সাহস করে বেঁচে থাকার কায়দা শিখতে হবে।’

আমি পা টিপে টিপে ঘরের কোণে গিয়ে যেখানে আমি অস্ত্রপাতি রাখি সেখান থেকে একটা বর্শা তুলে নিলাম। ধারালো দা হাতে নিলে আমাকে তাদের মতো দেখাবে, আমি তাদের মতো হতে চাই না। পা টিপে টিপে দরজাটা খুললাম কাঁপা কাঁপা হাতে। আস্তে করে সোলেক্স তালার চাবিটা ঘোরালাম। যে ঘরে ছেলেরা ঘুমোচ্ছিল সে ঘরের দরজারটা খুলল। মেয়েরা থাকে ডরমেটরির অন্য প্রান্তে। তারা অন্য দরজার দিয়ে আসা যাওয়া করে। সোফিয়া নামের একটা মেয়ে তাদের দেখাশোনা করে এবং রান্নাবাড়ার কাজে সাহায্য করে।

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বাবা জোসেফ আর বাচ্চাদের সতর্ক করে দেবো আমার গলায় ঝোলানো বাঁশিটা দিয়ে। বাবা জোসেফের ঘরটা আশ্রমের দেয়ালের ঠিক পাশেই। কিন্তু আমি সেটা না করে ভাবলাম একবার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া যাক। নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো উপযুক্ত হয়েছি কিনা সেটা বোঝার এটাই সুযোগ। আমি চুপি চুপি আশ্রমের গার্ড পোস্টের দিকে গেলাম যেখানে একটা ধাতব গেট আছ। গিয়ে দেখি আমাদের দারোয়ান সায়মনি সেখানে নেই। গেটটা আধখোলা হয়ে আছে। গেটের তালার মধ্যে চাবিটা ঝুলে আছে। বুঝলাম, ওই দারোয়ান ব্যাটাই কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে।

আমার বুকের ভেতর একটা অনিশ্চিত ভয় তড়বড় করছিল। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল আমি অন্তত সে রাতে মরবো না। আস্তে করে গেটটা বন্ধ করে দিলাম। তালাটা লাগিয়ে চাবিটা আমার পকেটে পুরে নিলাম। তারপর বাড়ির চারপাশে পা টিপে টিপে ঘুরে দেখতে লাগলাম।

কিন্তু কোথাও কাউকে দেখা গেল না। আকাশে উজ্জ্বল জ্যোৎস্না, বাগানের মধ্যে গাছের ঘন ছায়া পড়েছে।

আমি বাচ্চাদের ক্লাসরুমের দিকে গেলাম। ওদিকে সব তালাবদ্ধ। তারপর মুরগির ঘর আর শুয়োরের খোয়াড়ে উঁকি দিলাম। সব ঠিকঠাক। কোনও অস্বাভাবিক নড়াচড়া নেই কোথাও। ময়লার ভাগাড় কিংবা সবজি বাগানেও কাউকে দেখা গেল না। দেখার মধ্যে শুধু কবরস্থানটা বাকি আছে।

চার বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে গত সপ্তাহে। আমরা তাকে দক্ষিণদিকে মুরগির ঘরের পেছনে একটা বড় কাঠবাদাম গাছের নিচে কবর দিয়েছিলাম। ওইসব বর্বর চোরের দল আমাদের মৃতদেহকেও ছাড়ে না। লাশের শরীর থেকেও কেটে নেয় নানা অংশ। লীনাকে তার মা এখানে দিয়ে গিয়েছিল দুমাস বয়সে। যে কটি বাচ্চার শরীরের সবগুলো অঙ্গ অক্ষত আছে লীনা ছিল তাদের একজন। এই আশ্রম বাইরের লোকদের কাছ থেকে নিরাপত্তা দিতে পারলেও মশাদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারেনি তাকে।

কবর দেবার সময় তার মা খুব কান্নাকাটি করছিল সন্তান হারানোর বেদনায়। কিন্তু তার কান্নার আন্তরিকতা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। কারণ সেও আমার মায়ের মতো তার বাচ্চাকে ফেলে চলে গেছে। লীনা যে চার বছর আমাদের সাথে ছিল, তিনি একবারও তাকে দেখতে আসেননি। সোফিয়াই তার সব সেবাযত্ন করত। তাকে গোসল করিয়ে দিত, অসুস্থ হলে তার দেখভাল করত। নিজের জীবনের হুমকি উপেক্ষা করে সোফিয়াই তাকে সেরেমা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়েছিল। বাচ্চাটার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাশে বসে ছিল।

অন্য শিশুরা লীনার জন্য কাঁদছিল। কয়েকটা শিশু তখনও বুঝে উঠতে পারেনি মৃত্যু বিষয়টা কী। কয়েকটা শিশু সামান্য কান্নাকাটি করে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। লীনার জন্য আমার খারাপ লাগছিল সত্যি কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে স্বস্তিকর বিষয় হলো যে সে একটা স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগ পেয়েছে। আমি নিজের জন্য সেরকম মৃত্যু চাই। চামড়ার কারণে আমার মরণ হোক সেটা চাই না।

সায়মনি আর সেই অজানা শয়তান লীনার দেহটা কবর খুঁড়ে বের করছে―কথাটা ভাবতেই আমার পেট মোচড় দিয়ে উঠল।

যা ভেবেছি তাই। কবরস্থানে পাওয়া গেল শয়তানটাকে। সে একজন মহিলা। দেখে মনে হচ্ছিল সে একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে দোল দিয়ে। পাশেই কবর খুড়ছে সায়মনি। তারা দুজনই আমার দিকে পিঠ দিয়ে ছিল বলে আমাকে দেখতে পায়নি। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম মহিলা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার কান্নার শব্দ আমার ভেতরের ক্রোধ আরও বাড়িয়ে দিল। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না প্রথমে কাকে খুন করব ? মহিলাকে নাকি আমাদের দারোয়ানকে ?

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হতে লাগল আমি যেন অনন্তকাল অপেক্ষা করছি। আমার আর সহ্য হলো না। লক্ষ্য স্থির করে আমার হাতের বর্শাটা ছুড়ে মারলাম। বর্শাটা সোজা গিয়ে সায়মনির পিঠে আঘাত হানল। আঘাত করে সেটা মাটিতে পড়ে গেল। সায়মনি চিৎকার করে উঠে হাতের শাবল ফেলে দিল তারপর আহত শরীরটা নিয়ে মোচড়াতে লাগল। মহিলা তার চিৎকার শুনেও তাকে কোনো সাহায্য করতে গেল না। যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই বসে আছে সে। তার হাতের গামছার মধ্যে কিছু একটা জড়ানো।

আমি তার মধ্যে একটু অন্যরকম প্রতিক্রিয়া আশা করছিলাম। কিছুটা অপরাধবোধ কিংবা লজ্জা থাকতে পারত। এমনকি রাগও হতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। আহত দারোয়ান সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। তাকে খুব হতভম্ব আর ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। মহিলার চোখে কোনও বিকার নেই, সে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে ঘটনা দেখছে। আমি আমার রক্তাক্ত অস্ত্রটা কুড়িয়ে নিয়ে আবারও তাক করলাম সায়মনির দিকে। কিন্তু খুনটা করতে পারলাম না। ছুটে গেলাম বাড়ির দিকে। হুইসেল বাজিয়ে সবাইকে হুঁশিয়ার করতে লাগলাম।

বাচ্চারা জেগে উঠে কান্নাকাটি করতে শুরু করল ডরমেটরিতে। তাদের অনেকেই অতীতেও এরকম আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিল। তাই তারা ভেবেছে দানবগুলো আবারও ফিরে এসেছে। আমি তাদের নির্দেশ দিলাম ডাইনিং রুমে জড়ো হবার জন্য। সোফিয়া একটু বড় মেয়েদের নিয়ে বাচ্চাদের তদারকি করতে লাগল। অন্যদিকে ছেলেরা হাতে অস্ত্রপাতি নিয়ে দরজারর পাশে পাহারা দেবার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। বাবা জোসেফ কয়েকজন প্রতিবেশিকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এলেন। তার হাতে একটা রাইফেল। আমি তাদের ভেতরে ঢুকিয়ে গেটটা আবার বন্ধ করে দিলাম।

এক নিঃশ্বাসে আমি বাবা জোসেফ এবং অন্যদের সায়মনি আর সেই মহিলার কাণ্ডকীর্তির কথা বললাম। বাবা জোসেফ তখুনি পুলিশের কাছে ফোন করলেন।

কবরস্থানের দিকে গিয়ে আমরা দুই আসামিকেই পেয়ে গেলাম একই অবস্থায়। সায়মনি হাঁটু গেড়ে বসে আছে, তার মুখটা ব্যথায় কুঁকড়ে আছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘দয়া করে আমাদের খুন করবেন না। আগে আমার কথা শুনুন আপনারা।’

বাবা জোসেফ সম্মতি দিয়ে একটু পিছিয়ে রাইফেল বাগিয়ে তৈরি থাকলেন। তখন সায়মনি বলতে শুরু করল ঘটনাটা।

জানা গেল, ওই মহিলা ২০ কিলোমিটার দূরের কানজেরা গ্রাম থেকে এই আশ্রমে এসেছে তার তিন সপ্তাহ বয়সি পুত্রের লাশ নিয়ে। এটা ইলেকশনের মৌসুম, এখন নাকি শিশুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খুব দাম। তাই তার স্বামী চেয়েছিল লাশটা বিক্রি করে দিতে। মা তার সন্তানের লাশ বিক্রিতে রাজি নয়। পাড়ার এক ধাত্রী তাকে কিভুলিনি আশ্রমের কথা জানাল। তাই তিনি এই মাঝরাতে তার বাচ্চাকে এখানে কবর দেবার জন্য ছুটে এসেছেন। সায়মনি বাচ্চাটাকে কবর দেবার জন্য মহিলাকে সাহায্য করছিল মাত্র। তার কোনও দোষ নেই।

পুলিশ আসার পর তারা বাচ্চাটা কবর দিল। তারপর সায়মনিকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। তারপর মহিলার পাষণ্ড স্বামী আর তার ওঝাকে গ্রেফতার করার জন্য রওনা দিল।

সবকিছু সেরে বাচ্চাদের বিছানায় পাঠাতে ভোর চারটা বেজে গিয়েছিল। সবাই ঘুমোতে চলে যাবার পর আমি গার্ড পোস্টে বসে থাকলাম চুপচাপ। বসে বসে ভোরের সূর্যোদয় দেখছিলাম। ভাবছিলাম সূর্য যদিও আমার শত্রু তবু একটা নতুন ভোর সবসময় নতুন কিছুর প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়। হয়তো বাবা জোসেফ ঠিক বলেছেন। মনে হচ্ছে এই নিরাপত্তা বলয় ছেড়ে বাইরের জগতে পা রাখার সময় হয়ে গেছে আমার।

আমি একবার শ্বেতী রোগে আক্রান্ত একটা লোকের কথা শুনেছিলাম। যে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে লোকদের ডেকে বলত তার চামড়া ধরে দেখতে। সে তাদের বলত―‘আমি একজন সামান্য মানুষ। একজন দরিদ্র মানুষ মাত্র। আমার হাড়ের মধ্যে এমন কী মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে থাকতে পারে আমি জানি না। আমি শুধু জানি আমার মধ্যে কোন শয়তান বাস করে না, আমি কোনও ধোঁকাবাজ জাদুকর নই। আমি চোখ পিটপিট করি কারণ আমি সূর্যের উজ্জ্বলতা সহ্য করতে পারি না। আমার চামড়ার তো কোনও দোষ নেই।’

হয়তো সেটাই সত্যিকারের সাহসিকতা। শত্রুর চোখে চোখে তাকানো। তাদের বুঝিয়ে দেয়া তুমিও একজন মানুষ।

সকালবেলা আমি বাবা জোসেফকে বললাম আমি দার শহরে যাব। ওখানে কোনও একটা কাজ খুঁজে পাব নিশ্চয়ই। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, ওই শহরে এমবিগালা নামে তার একজন আত্মীয় আছে। ওখানে নিরাপদ থাকব আমি।

বাসের মধ্যে আমি এক মাসাই উপজাতির লোকের পাশে বসেছিলাম যিনি নিরাপত্তা রক্ষীর চাকরি করেন। তিনি আমাকে জানালেন যে এই শহরে নিরাপত্তা রক্ষীর চাকরি প্রচুর। শোনার পর আমি দরখাস্ত করলাম একটার জন্য। এভাবেই আমি আপনাদের এখানে এসেছি।

ইন্টারভিউ শেষ করে আমি বাস স্টেশনে গেলাম। একটা ডালাডালায় (মিনিবাস ধরনের আফ্রিকান গণপরিবহন) চড়ে এমবিগালার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। রাস্তার মধ্যে অগণিত মানুষ আর যানবাহন গিজগিজ করছে। সেই ভিড়ের মধ্যে চ্যাপটা হয়ে যাবার দশা হলো আমার। কিন্তু কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। কেউ আমার পঙ্গু হাত কিংবা গায়ের রঙ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। আমি দেখলাম সবকিছু উপেক্ষা করার মধ্যে একটা জাদু আছে, সাধারণ হবার মধ্যে একটা অসাধারণত্ব আছে। আর ওখানে এত মানুষের ভিড়ে আমি প্রথমবারের মতো নিজেকে মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করলাম।

প্রায় এক মাস পর সেকেই সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে আমার ডাক আসলো। তারা আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি তাদের বললাম যে কারও কারও কাছে জীবনে একটা সুযোগই অনেক বড় প্রাপ্তি।

চট্টগ্রাম থেকে

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button