বার্তা : মূল : বেন ওকরি : অনুবাদ : দীপেন ভট্টাচার্য

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : আফ্রিকান গল্প
[বেন ওকরি―নাইজেরিয়ার একজন জনপ্রিয় ও সফল ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কবি। তাকে উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশক আফ্রিকার লেখকদের মধ্যে অন্যতম সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ১৯৫৯ সালের ১৫ মার্চে দক্ষিণ নাইজেরিয়ার মিন্না শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র দুবছর বয়সে তিনি বাবা-মার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি দেন। তবে ১৯৬৮ সালে তিনি লাগোসে ফিরে আসেন। পরবর্তীসময়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য পুনরায় লন্ডনে যান এবং এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশনা করেন। লাগোসে থাকাকালীন গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা এবং স্বদেশী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তার লেখার মূল বিষয়। যদিও কবিতা দিয়ে তিনি সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, কিন্তু তেমন সাড়া ফেলতে না পেরে ছোটগল্প লেখায় মনোনিবেশ করেন।মাত্র একুশ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের পরপরই তার নাম বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে প্রশংসিত এবং আলোড়িত উপন্যাস দ্য ফ্যামিস্ড রোড; এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৯১ সালে ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার অর্জন করেন। তার প্রথম গল্পসংকলন ইন্সিডেন্টস্ অ্যাট দ্য শ্রাইন ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। তার অন্য দুটো গল্পগ্রন্থ হলো স্টার্স অফ দ্য নিউ ক্যার্ফু (১৯৮৮) এবং টেইলস্ অফ ফ্রিডম (২০০৭)। অ্যান আফ্রিকান এলেজি (১৯৯৭), মেন্টাল ফাইট (১৯৯৯) এবং ওয়াইল্ড (২০১২) তার কবিতার বই। তার অনেক উপন্যাস এবং ছোটগল্প বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার ছাড়াও তাকে বৃটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানিত ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করছেন।]
তু মি পৌঁছালে, তুমি ছিলে মলিন ও ক্ষুধার্ত। তোমার শরীর ময়লায় ঢাকা। তুমি এসেছিলে তুষাররেখার ওপার থেকে। এই ছিল তোমার মহা অভিযান।
তুমি ভ্রমণ করেছিলে বনের মধ্য দিয়ে, অগণন শহর ও গ্রামের মধ্য দিয়ে, প্রায় না থেমেই, বেশির ভাগ সময়ই পায়ে হেঁটে, গায়ের কাপড়ও বদলাওনি।
তোমার যাত্রা ছিল সেইসব এলাকায় যেখানকার ভাষা ও আচার ছিল তোমার অপরিচিত। তুমি ঘুমিয়েছিলে রাস্তার ধারে, বিচিত্র সরাইখানায়। তুমি একাই চলেছিলে, তোমার সাথে ছিল এমন একটি বার্তা যা কি না শুধু তুমিই বহন করতে পার।
কত দিন ধরে তুমি ভ্রমণ করছ ? তুমি জান না, হয়তো সারা জীবন ধরেই।
তুমি সব সুখ পরিহার করেছ এই পথে চলতে। শুধু চলাই ছিল আসলে কঠিন। তুমি চলেছিলে রাতে না ঘুমিয়ে, দিনের বেলা না খেয়ে। যেখানে তুমি যাচ্ছিলে সেটাই ছিল তোমার বিশ্রামস্থল, খাদ্যস্থল। বার্তাটা পৌঁছাতে হবে, তারপর হবে তুমি মুক্ত।
পার হয়েছ বহু দেশ, লড়াই করেছ নেকড়ের সাথে, জিতেছ শক্তিশালী পুরুষদের বিরুদ্ধে, এড়িয়েছ ধূর্ত মানুষদের, পালাতে পেরেছ ফুসলিয়ে বেড়ানো নারীদের হাত থেকে।
যৌবন তোমাকে পরিত্যাগ করেছিল আদিম জঙ্গলে, তবু তুমি চলেছ যৌবনের সাথে, তাকে তুমি হারাওনি কখনও। যৌবন রয়েছে তোমার মধ্যেই, তোমার স্বাধীনতায়, তোমার সত্তার সরলতায়। রাস্তার ময়লার আবরণে সংরক্ষিত হয়েছিল তোমার সজীবতা।
এই যাত্রার শেষ অংশটা ছিল সবচেয়ে খারাপ। গন্তব্যের কাছে আসা মানে, একই সঙ্গে, দূরে চলে যাওয়াও বটে। প্রাসাদটাকে যেখান থেকে দেখা যায় সেখানে হারিয়ে যাওয়া ছিল সহজ। যখন দেখা যায় দুর্গ-ছাদের পাঁচিল ও মিনার, দেখা যায় পতাকা ও ব্যানার, তখন মনে হয় গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। তারপর নতুন আশা ও উল্লাসে তাড়াহুড়ো করা যায়। কিন্তু পথ তবু শেষ হয় না। দূরত্ব হলো এক বিভ্রান্তিকর জিনিস। আশা সবকিছু কাছের মনে করাতে পারে, তাই সেটা হতে পারে ভয়ংকর।
তুমি তোমার চোখ রাস্তার ওপরই রেখেছিলে। তুমি গ্রামটিতে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিলে। তুমি রাতে সেখানে থাকতে প্রলুব্ধ হয়েছিলে, একজন বৃদ্ধার কাছে তোমার গন্তব্যস্থলকে প্রকাশ করতে গিয়েছিলে, কিন্তু তাহলে পরস্পর-বিরোধী বা নিজ-স্বার্থ-অনুকূল উপদেশ শুনতে। কিন্তু তুমি সেটা নিজের মধ্যে রেখেছ। তুমি কল্পনা করেছ তুমি এখনও তোমার যাত্রার শুরুতে। এই পথ যে ঝুঁঁকিপূর্ণ আর তোমাকে যে অনেক দূর যেতে হবে সে সম্বন্ধে তুমি সচেতন ছিলে।
তোমার সমস্ত জীবনই ছিল একটা অভিযান। তুমি যদি থেমে এই সম্বন্ধে একটু ভাব, যদি তুমি স্বীকার কর তোমার হতাশা, কে জানে তোমার নিজের তৈরি কোন ফাঁদে তুমি আটকা পড়বে ? তাই তোমার সমস্ত জীবন এই অভিযানের ওপর তুমি বাজি রেখেছ। এই যাত্রাই হলো তোমার জীবন, এই পথই তোমার জীবন। তুমি হয়তো সে পথে মারাই যেতে, কিন্তু তুমি সজাগ ছিলে। তুমি প্রতিটি মুহূর্তকে সম্পূর্ণ জীবন হিসেবে নিয়েছ, সেটাই তুমি করেছ।
আর তারপর দেখলে তুমি পৌঁছে গেছ। তুমি কোর্টে, তুমি সেই জায়গায়। তোমার ভ্রমণের ময়লা ও ধূলার মাঝ থেকে তোমার বার্তাটা নিয়ে নেওয়া হলো। কাজটায় তোমার কোনও যন্ত্রণা হলো না। এমনকি তুমি বুঝলেও না ব্যাপারটা কী। বার্তাটা তোমার ওপরেই লিখিত ছিল। তোমার ময়লায়, তোমার অধৌত শরীরে, তোমার ক্লান্ত কিন্তু জীবন্ত সত্তায়। সেই বার্তা ছিল তোমার চোখে। এটা ছিল তোমার আগমনে, তোমার স্বপ্নে, তোমার স্মৃতিতে। এটা ছিল তুমি যা কিছু এনেছ তার মধ্যে এবং যা কিছু আনোনি তার মধ্যেও।
তোমার কাছ থেকে বার্তাটা ছিনিয়ে নেয়া হলো। সেটা তোমার থেকে কেটে নেয়া হলো আর তুমি হাল্কা হলে। তোমার বার্তা থেকে তুমি পরিষ্কার হলে। তোমাকে মাজা হলো, কামানো হলো, ধোয়ানো হলো, প্রক্ষালন করানো হলো সেই বার্তা থেকে। তোমার নোংরা পোষাক খুলে নেয়া হলো, আর তোমাকে দেয়া হলো নতুন কাপড় যা কিনা ছিল উজ্জ্বল ছিল আলোর মত।
তোমার বীরোচিত অভিযানকে স্বীকার করে একটা রহস্যময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু আসল পুরস্কার ছিল তোমার সত্তা, তোমার ভেতরের মুক্তি। তোমার মধ্যে দেখা দিয়েছিল এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
সজীব, তরুণ ও স্বাধীন হয়ে তুমি ঘুরে বেড়ালে সেই রাজ্যের রাস্তায় রাস্তায়। তোমার মনে হচ্ছিল তুমি একটা নতুন পৃথিবীতে, আলোকোজ্জ্বল জগতে। এই রাজ্যে এখন তুমি একটা বিমুগ্ধ জীবন যাপন করছ।
তুমি সকাল-সকাল রওনা দিয়েছিলে এবং যখন পৌঁছাবে ভেবেছিলে তার আগেই পৌঁছেছিলে। তোমার সামনে এখন একটা পুরো নতুন জীবন। আর তুমি এখন এখানে, তুমি একজন তরুণ যার সত্তা উজ্জ্বল সোনার মতো, যা কি না সমস্ত পরিমাপের বাইরে, যা কি না তোমার অস্তিত্বের লঘুতায় ঐশ্বর্যান্বিত। সবকিছুই এখন তোমার সামনে। তোমার মূল অভিষ্ট ও অভিযান পূর্ণ হয়েছে, কারণ তোমার কাজ তুমি শুরু এবং শেষ করেছ যথাসময়ের পূর্বেই। এখন এসব রয়েছে তোমার বাঁচার জন্য, অতুলনীয় স্বাধীনতায়। কী ভাগ্য তোমার। দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই, এখন শুধু বাঁচবে তুমি সেই জীবনে যা তুমি চেয়েছিলে।
এক বিরাট শহরে এক যুবক সবে এসেছে, হৃদয়ে আশা নিয়ে, তার ভাগ্য গড়তে, তার সবচেয়ে সুখের ও নির্দোষ দিনগুলোতে তার খাঁটি প্রেম আবিষ্কার করতে। সেই যুবকের মতো তুমি সেই রহস্যময় রাজ্যের রাস্তায় হাল্কা পদক্ষেপে ঘুরছ। পাস্তেল আকাশকে তখন নীল রঙ ছুঁয়েছে, এসেছে ভোরের সূর্যালোক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে
সচিত্রকরণ : আবু হাসান



