অন্তহীন… : আহমাদ মোস্তফা কামাল

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : বাংলাদেশের গল্প
এমন কোনও মানুষকে কি আপনারা চেনেন যার কোনও বর্তমান নেই ? জানি আপনারা বলবেন, কথাটার কোনও মানেই হয় না কারণ মানুষ বর্তমানেই বাস করে। তাছাড়া বর্তমান নেই মানে ভবিষ্যৎও নেই। ভবিষ্যৎ না থাকার কথা অবশ্য আপনারা অহরহই বলে থাকেন তবে অন্য অর্থে। মানে, লোকটার দ্বারা কিচ্ছু হবে না; হোপলেস! কিন্তু যার বর্তমান নেই তার অতীত কি আছে ? থাকার কথা নয়। তার মানে, এরকম কোনও মানুষের অস্তিত্বই নেই। কিন্তু আমি এমন একজনকে চিনি যার কেবল ওই অতীতটাই আছে। অতীত থেকে সে বর্তমানে ফেরেনি, ভবিষ্যতে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ভাবছেন, আমি কোনও মৃত মানুষের কথা বলছি ? হ্যাঁ, তা ভাবতেই পারেন। মৃতেরা তো কখনও কোথাও ফেরে না। না বর্তমানে, না ভবিষ্যতে। ধরুন আপনার একজন বন্ধু অনেকদিন আগে, যুবক বয়সে, মারা গেছে; আপনি ইতোমধ্যে বুড়ো হয়ে গেছেন কিন্তু আপনার স্মৃতিতে বন্ধুর সেই যুবা-বয়সের মুখটাই আঁকা আছে, বয়স তার বাড়েনি। কিন্তু আমি যার কথা বলছি, তার শারীরিক মৃত্যু ঘটেনি, বয়সের ছাপ তার শরীরেও পড়েছে। মুখমণ্ডলের বলিরেখা, শে^তশুভ্র চুল-দাড়ি-গোঁফ বার্ধক্যের কথা মনে করিয়ে দেয় বটে তবু তার, মানে সমীতের, বয়স পঁচিশের পর আর বাড়েনি। ফলে তার জীবনের যা কিছু ঘটনা-দুর্ঘটনা সবই ওই পঁচিশ বছর সময়কালের মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে।
ঘটনাটা খুলেই বলি। পঁয়ত্রিশ বছর আগে সমীতের জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যখন তার বয়স ছিল পঁচিশ। অবশ্য ওটাকে দুর্ঘটনা বলা যায় কি না তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই, কারও পরিকল্পনামাফিক সেটি ঘটে না, স্রেফ ঘটে যায় এবং জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু তার জীবনে যা ঘটেছিল তা বোধহয় কারও মস্তিষ্কজাত পরিকল্পনা ছিল। এই সন্দেহের কারণও আছে। সমীত ছিল সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীÑসাহসী, রাগি এবং একরোখা। সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ছিল তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যে। ঘটনার দিন ছিল হরতাল আর পিকেটিং করতে সে ছিল রাজপথে, আরও অনেকের মতো, তবে বরাবরের মতো একটু বেশিই সক্রিয়। একসময় পুলিশ আর আধাসামরিক বাহিনী তাদেরকে ধাওয়া করে। কেউ কেউ পালিয়ে যায়, বাকিরা সমীতের নেতৃত্বে কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু অবিরাম টিয়ারগ্যাস আর নির্মম লাঠিচার্জের আক্রমণে একসময় পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা, আর তখন যেন আরও হিংস্র হয়ে ওঠে বাহিনী। বাধ্য হয়েই ছুটে পালায় তারা আর ছুটন্ত অবস্থায়ই তার পায়ে এসে লাগে একঝাঁক গুলি। পায়ে গুলি না করে মাথায় করতে পারত কিংবা অন্য কোথাও। কিন্তু তারা সমীতকে মেরে ফেলতে চায়নি, চেয়েছিল পঙ্গু করে দিতে। এমনকি গুলি লেগে সমীত পড়ে যাওয়ার পর তারা আর সামনেও এগোয়নি। সে কি দেখেনি, যেদিন লাশ পড়ত কারও সেদিন পুলিশ কী ভীষণ তৎপরতায় সেই লাশ সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গুম করে ফেলত ? অথচ সে পড়ে যাওয়ার পরও পুলিশ পিছিয়ে গেল! পরিকল্পিত না হয়ে পারে ?
সহযোদ্ধারা সমীতকে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসে তখন সে অচেতন। এরপর আসলে কী ঘটেছিল তার আদৌ মনে নেই। সম্ভবত ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। যেদিন ঘুম ভাঙল সেদিন চোখ খুলেই দেখল মোনালিসা বসে আছে পাশে, তার চোখে-মুখে গভীর উৎকণ্ঠা, সমীতকে তাকাতে দেখে চোখে অশ্রু নেমে এল ওর আর ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু-মিষ্টি হাসি আর কিছুক্ষণ পরই সমীত আবিষ্কার করলÑতার একটি পা নেই, কেটে ফেলা হয়েছে। একদিকে মোনালিসার উৎকণ্ঠা-অশ্রু-হাসিমাখানো অপূর্ব মুখশ্রী দেখার অসহ্য সুখ, আরেকদিকে পা হারানোর বেদনা ও বিস্ময়Ñকোনটা যে বেশি তীব্র ছিল, সে আর মনে করতে পারেনি কোনও দিন। সেই মুহূর্ত যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য, এখনও তেমনই আছে। নইলে এতকাল পরও দৃশ্যটি সে স্পষ্ট দেখতে পায় কী করে ?
মেয়েটির নাম সিদরাহাতুল মুনতাহা। মোনালিসা তার নাম নয়, সমীত আদর করে ওই নামে ডাকত। আর আপনারা তো জানেনই, পরিচিত নামে না ডেকে ভিন্ন নামে ডাকাডাকির ব্যাপার তখনই থাকে যখন সেখানে বিশেষ কোনও সম্পর্ক থাকে। হ্যাঁ, মেয়েটিকে সমীত ভালোবাসত, মেয়েটিও তাকে এবং মোনালিসাকে সে বের করে এনেছিল। আপনারা আবার ভাববেন না ফুঁসলিয়ে ঘরের বাইরে এনে বিয়েটিয়ে করে ফেলেছিল। ঘরের বাইরে সে এনেছিল ঠিকই তবে বিয়ের জন্য নয়, প্রেমের জন্যও নয়, আসন্ন বিপ্লবের সাথী বানাবার জন্য। সমীত সত্যিই কমরেডদের কথায় আস্থা রাখত, বিপ্লব যে অনিবার্য এবং প্রায় এসেই গেছে তাতে তার কোনও সন্দেহই ছিল না। কিন্তু বিপ্লব তো আর এমনি এমনি হয় না, অনেক কমরেড লাগে, মোনালিসা তার বন্ধু ছিল, বন্ধু থেকে কমরেড বানাবার অভিপ্রায়েই সমীত তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ ছিল না। সে ছিল ধনীর কন্যা, আরাম-আয়েশ, বিলাস-বাহুল্যের মধ্যেই সে বড় হয়েছে। পঁয়ত্রিশ বছর আগে দেশে ধনাঢ্য লোকের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যুদ্ধের একযুগ পরও ধ্বংযজ্ঞের চিহ্ন রয়ে গিয়েছিল দেশে, ধনী লোক আসবে কোত্থেকে ? তবু কিছু লোক কী করে যেন বিপুল ধনসম্পদের মালিক বনে গিয়েছিল। মোনালিসার বাবাও ছিলেন তেমনই একজন। শহরের অভিজাত এলাকায় তাঁর ছিল বিশাল বাড়ি, নামে-বেনামে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি একটা মার্কেটের মালিকানাও ছিল তাঁর। তো এরকম পরিবারের মেয়ে হয়ে মোনালিসার পক্ষে সমীতের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার ব্যাপারটা বেশ অস্বাভাবিক হলেও প্রথমত বন্ধুত্বটি গড়ে ওঠে অজানা কারণেই। মোনালিসা তাদের আভিজাত্য আর ধনসম্পদের গল্প করত বেশ সরলভাবেই এবং মধ্যবিত্তদের গল্প শুনে বেশ অবাক হতো আর গরিবদের গল্প সে বিশ^াসই করত না। বিশ^াস করত না বলেই সমীত মোনালিসাকে কয়েকটি বস্তিতে নিয়ে গিয়েছিল গরিবরা কীভাবে থাকে, কী খায়, কী করে―দেখানোর জন্য। যতবার সে ওসব জায়গায় যেত, ফিরে এসে মনমরা হয়ে থাকত অন্তত এক সপ্তাহ। মেয়েটির যে একটা সংবেদনশীল মন আছে সেটি বোঝা যেত সহজেই। আর সেই সুযোগটিই নেয় সমীত। মোনালিসাকে একদিন সে বলেÑতোমার বাবা তো সরকারি কর্মকর্তা, খুবই অল্প বেতন পান। এত ধনসম্পত্তির মালিক কীভাবে হলেন তিনি, ভেবেছ কখনও ?
মোনালিসা অবাক হয়ে বলেছিলÑসরকারি কর্মকর্তারা কি খুব অল্প বেতন পান ?
খুবই অল্প। যে বেতন পান, তাতে তোমাদের বাসার মেইনটেইনেন্স খরচই ওঠার কথা না।
আমি তো ভেবেছিলাম…
বেতনের টাকায় এগুলো হয়েছে ?
হ্যাঁ।
ভুল জানো।
তাহলে ?
তোমার বাবাকেই জিজ্ঞেস করো।
সমীত কেবল মোনালিসার ভেতরে প্রশ্নটি তৈরি করতে চেয়েছিল, সত্যি সত্যি সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে, তা ভাবেনি। কিন্তু সে তা-ই করেছিল এবং পরের দিন এসে বলেছিলÑবাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
কী জিজ্ঞেস করেছিলে ?
ওই যে আমাদের এত সম্পদ হলো কীভাবে ?
ও! কী বললেন তিনি ?
প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, প্রশ্নটা কে শিখিয়ে দিয়েছে ?
তুমি কী বললে ?
বললাম, শিখিয়ে দেয়নি কেউ। কিন্তু একজনের কাছে শুনেছি, সরকারি কর্মকতাদের বেতন খুব অল্প। তাহলে তুমি এত সম্পদ পেলে কোথায় ?
তারপর ?
তিনি বললেন, যার কাছে শুনেছ, সে কে ? আমি তোমার কথা বললাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেনÑএরা ঈর্ষা থেকে এসব কথা বলে। তুমি ওদের সঙ্গে আর মেলামেশা কোরো না।
উত্তর পেয়েছ ?
না পেলাম না তো!
হাহাহা… পাবেও না। তা, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ ? আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না ?
ধুর। কী যে বলো! বাবা বললেই আমি শুনব নাকি!
না, শোনেনি সে তার বাবার কথা বরং সমীতের সঙ্গেই লেগে থাকত সবসময়। এক ধরনের পরিবর্তনও এসেছিল তার মধ্যে। ছোটবেলা থেকে কখনও গাড়ি ছাড়া চলাফেরা করেনি অথচ তখন গাড়ি ব্যবহার করতে চাইত না। বাসে উঠতে ভয় পেত বলে রিকশাতেই আসা-যাওয়া করত, যদিও সেটি তার জন্য সহজ ছিল না। যার অভ্যাস নেই তার পক্ষে রিকশায় ওঠা বা বসে থাকা বা রিকশা থেকে নামাও বেশ কঠিন ব্যাপার। নানা ধরনের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার একটা নেশা তৈরি হয়েছিল তার। বিশেষ করে গরিব মানুষদের সঙ্গে। প্রায়ই চলে যেত বস্তিতে, খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করত তাদের জীবন-যাপনের কথা। রাস্তার পাশে, পার্কে, স্টেশনে বাস করা অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গেও কথা বলত সে।
সাজতে খুব পছন্দ করত মোনালিসা। কিন্তু একদিন সে এল বেশ বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে। মাঝখানে বেশকিছু দিন দেখা হয়নি তাই হঠাৎ এই সাজসজ্জাহীন বিপন্ন চেহারা দেখে চমকে উঠল সমীত, জিজ্ঞেস করলÑকী হয়েছে তোমার ?
উত্তর দিল না মোনালিসা। বিষণ্ন মুখে বসে রইল। তার সারা মুখে বিষাদ, যেন ভীষণ কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সমীত আবার জানতে চাইল, কী হয়েছে!
দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে সে বললÑতুমি তো জানো, আমি সাজতে খুব পছন্দ করি।
হ্যাঁ, জানি। তোমাকে খুব সুন্দরও লাগে। আজ সাজোনি কেন ?
আমি আর কোনও দিন সাজব না।
সে কি! কেন ?
হিসাব করে দেখেছি, আমি সাজসজ্জার জন্য যে টাকা ব্যয় করি সেই টাকা দিয়ে বস্তির একটা পরিবার সারাবছর খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে।
এই হিসাব তোমাকে কে করতে বলেছে ?
কেউ বলেনি। নিজেই করেছি। জানো, ভীষণ অপরাধবোধে ভুগছি আমি। ভীষণ। নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না।
সমীত গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরেছিল মোনালিসাকে। সেই প্রথম। অনুভব করেছিল বন্ধুতারিক্ত কোনও অনুভূতি। জড়িয়ে ধরার কোনও পরিকল্পনা ছিল না, হঠাৎই ঘটে গেছে, কিংবা হয়তো মনে হয়েছিলÑ মেয়েটির একটা উষ্ণ আলিঙ্গন প্রাপ্য। মোনালিসাও আলিঙ্গনটি গ্রহণ করেছিল গভীর আবেগে। সেদিন আর এসব নিয়ে কথা হয়নি। পাশাপাশি বসে ছিল তারা, পরস্পরের হাত ধরে, চুপচাপ, যদিও বহু কথা বলা হয়ে গিয়েছিল সেদিন দুটো হৃদয়ের মধ্যে।
রাজনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা হতো প্রায়ই। মোনালিসা বুঝতে চাইত, সমীত আসলে কী করতে চায়। সমীতও বোঝাতে চাইত। একদিন বলল, এই সমাজটাকে আমি বদলে ফেলতে চাই, রাষ্ট্রটি ভেঙে ফেলতে চাই, তুমি আমার সঙ্গী হবে ?
সঙ্গী তো হয়েই আছি।
না, এই সঙ্গী নয়, আমার স্বপ্নের সঙ্গী।
আমি যে এসব বুঝি না।
বুঝবে। কঠিন কিছু নয় তো!
রাষ্ট্র ভাঙে কীভাবে ?
রাষ্ট্র মানে কিন্তু দেশ নয়, এটা একটা ব্যবস্থা। এই যে শোষণ-নিপীড়ন, এই যে বৈষম্য টিকিয়ে রাখা, এই যে অবিচার-অনাচার, এসবই রাষ্ট্রের তৈরি করা। আমি সেই ব্যবস্থা ভাঙতে চাই।
কেন চাও ?
আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। তোমার কি মনে হয়, এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়েছে ?
না হয়নি।
তাহলে স্বাধীনতা কি অর্থবহ হয়েছে ?
না তাও হয়নি।
তিরিশ লক্ষ মানুষের জীবনদান আর অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ কি যথাযথ মূল্য পেয়েছে ?
না পায়নি।
তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কি শেষ হয়েছে ?
না হয়নি।
আমাদের আরেকটি যুদ্ধ করতে হবে। মুক্তির জন্য। সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ।
আবার যুদ্ধ ? কার বিরুদ্ধে লড়বে এবার ?
যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের বিরুদ্ধে।
কিন্তু অস্ত্র পাবে কোথায় ?
অস্ত্র তো লাগবে না।
তাহলে ? কেমন যুদ্ধ সেটা ?
আমরা নিপীড়িত মানুষকে সংগঠিত করব, ন্যায়ের পক্ষে যারা তাদের সংগঠিত করব। তারপর একটা অভ্যুত্থান করব, একটা বিপ্লব…
তুমি কি সত্যিই মনে করো, এ দেশে বিপ্লব সম্ভব ?
অবশ্যই সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের আগে কি কেউ ভেবেছিল এই দেশের মানুষের পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব ?
না, তা ভাবেনি।
কিন্তু মানুষ ঠিকই যুদ্ধ করেছে। যে দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মতো এমন বিশাল এক ঘটনা ঘটিয়েছে সে দেশে অবশ্যই বিপ্লব সম্ভব।
কমরেডদের আশ^াসাবাণীতে সমীতের গভীর আস্থা ছিল। পার্টির মিটিংয়ে প্রায়ই বিপ্লবের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতো। পুরো দেশ যে একটি পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে এবং সেটি যে বিপ্লবী পরিবর্তন সে ব্যাপারে কারও কোনও সন্দেহই ছিল না। কমরেড ফরহাদ তো একদিন বলেই ফেললেনÑদুহাজার সালের মধ্যে এদেশে বিপ্লব হয়ে যাবে!
দুহাজার সাল! এতদিন অপেক্ষা করতে হবে! Ñমুখ ফসকে একজন বলে ফেলল।
এতদিন কোথায় ? মাত্র পনের বছর। বিপ্লব তো এমনি এমনি আসে না। অনেক ত্যাগ-তীতিক্ষার বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বিপ্লব অর্জিত হয়।
হ্যাঁ, তাই তো, একটি জাতির সার্বিক মুক্তির জন্য পনের বছরের সংগ্রাম তো কিছুই না। সে পারবে, নিশ্চয়ই পারবে লেগে থাকতে।Ñএসব কথা শুনে নিজেকে এভাবে প্রস্তুত করত সমীত।
কিন্তু তখন চলছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, পার্টি একে আখ্যায়িত করেছিল বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে। কর্মীরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিনা দ্বিধায়। তারই এক পর্যায়ে সমীত গুলিবিদ্ধ হয়। কতদিন অচেতন ছিল সে জানে না। যেদিন চোখ মেলে তাকিয়েছিল, প্রথমেই চোখে পড়েছিল মোনালিসার মুখ, সে-গল্প তো শুরুতেই বলেছি। ধীরে ধীরে সেরে উঠতে থাকে সমীত, মানে পা-হীন সেরে ওঠা। কত মানুষ যে দেখতে আসে তাকে! নিজের দলের কমরেডরা তো বটেই, এমনকি আদর্শিকভাবে যারা বিরোধী পক্ষের সেসব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা, ছাত্র-সংগঠনের নেতাকর্মীরাÑসবাই আসে। আসে আত্মীয়-স্বজনরাও। মোনালিসাও প্রায় সারাক্ষণই পাশে থাকে। কত যে গল্প করে সে! সমীতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী কীরকম প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, সবগুলো দল মিলে তিনদিনের হরতাল ডেকেছিল, স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে সে হরতাল, এমনকি পিকেটিঙেরও প্রয়োজন পড়েনি, কত কত মানুষ তাকে দেখতে এসেছে, হাসপাতালে ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছে কর্তৃপক্ষÑএইসব শুনে ভীষণ অবাক হয় সমীত। সামান্য এক কর্মী সে, বিরাট কোনও নেতা তো নয়, তার জন্য এতকিছু! মোনালিসা বলেছে, সারাদেশের মানুষ এখন তোমাকে এক নামে চেনে। সেরে ওঠ তাড়াতাড়ি, আমরা সত্যিই এবার বিপ্লবের ডাক দেব।
একদিন এলেন কমরেড ফরহাদ। দৃঢ়চেতা-ঋজু-সাহসী মানুষটিকে দূর থেকে দেখে বরাবরই দারুণ মুগ্ধ হয়েছে সমীত। বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে এই মানুষটির চুম্বক-আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ভূমিকাও কম নয়। সেই মানুষটি এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে! অভিভূত হয়ে গেল সে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল কান্না। না, পা হারানোর বেদনায় নয়Ñআবেগে-বিহ্বলতায়। তিনি হাত রাখলেন মাথায়, আদর-পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদুস্বরে বললেন কত কথা! আশা ও আকাক্সক্ষার কথা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা, প্রগতি ও শান্তির কথা। সে কিছু বলতে পারছিল না, বারবার চোখ ভিজে উঠছিল। হয়তো সেজন্যই তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছিলেন, হাত সরাচ্ছিলেন না একবারের জন্যও। যখন তিনি বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন, তখন সমীত ডাকলÑকমরেড!
কমরেড ফরহাদ ফিরে তাকালেন, কাছে এলেন আবার। বললেনÑকিছু বলবে ?
জি¦ বলব।
বলো।
বিপ্লব কি সত্যিই আসবে কমরেড ?
অবশ্যই আসবে। তুমি নিশ্চিত থাকো।
কিন্তু আমি যে পঙ্গু হয়ে গেলাম। অংশ নেব কীভাবে ?
তোমার একটা পা কেটে ফেলতে হয়েছে কিন্তু তুমি তো পঙ্গু নও। তোমার হৃদয় কি আর সাড়া দেয় না ?
দেয় কমরেড। সবসময় দেয়।
তাহলে নিজেকে পঙ্গু ভেব না। বিপ্লবের সহযোগী নানাভাবে হওয়া যায়। তুমি সেরে ওঠো, আমি তোমাকে কাজ বুঝিয়ে দেব। আর হ্যাঁ, যেদিন বিপ্লব হবে সেদিন জনতার মিছিলের সামনের সারিতে থাকবে তুমি। আমার পাশে।
কমরেড ফরহাদ তার হাতে শক্ত করে একবার চাপ দিয়ে বললেনÑআসি। ভালো হয়ে উঠবে তুমি। তখন আবার দেখা হবে।
তার আরও অনেক প্রশ্ন করার ছিল কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরলো না অথচ বহুদিন ধরেই সে প্রশ্নগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে। যেমন : ‘বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সঙ্গে একটি বিপ্লবী পার্টির জোট বাঁধা কতটুকু যৌক্তিক ?’ কিংবা ‘এদেশের জনগণ প্রচণ্ড নিপীড়িত, আমরা তাদের পক্ষেই কথা বলি, কাজ করি। তাহলে কেন তাদের কাছে আমরাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছি না ?’ অথবা ‘পার্টি মিটিংয়ে আমরা বিপ্লবের সম্ভাবনা এবং আমাদের করণীয় নিয়ে কথা বলি। কিন্তু জনগণকে কেন সেসব বলি না ? তাদের কেন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করছি না ?’ কিংবা ‘জনগণের সামনে বক্তৃতার সময় আমরা কেন বুর্জোয়া, মুৎসুদ্দী, সামন্ত, নয়া উপনিবেশবাদÑএসব কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করি ? জনগণ কি এগুলো বোঝে ? কেন তাদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় কথা বলতে পারি না ?’ এইরকম কত যে প্রশ্ন! একদিন সে সামনের সারিতে যাবে, এসব প্রশ্ন তুলবে সেরকম আকাক্সক্ষা ছিল অথচ আজ এত কাছে পেয়েও প্রশ্নগুলো করা হলো না। তবু তার মন ভরে রইল অদ্ভুত আনন্দে, মুগ্ধতায়, আচ্ছন্নতায়।
আরও কিছুদিন হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরে এল সমীত। দীর্ঘ বিশ্রামের প্রয়োজন তার, হাসপাতালের চেয়ে বাসায়ই সেটি ভালো হবে, জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু বাসায় তো সময় কাটতে চায় না। এমনিতেই সে বাউন্ডুলে ধরনের মানুষ, তারওপর দীর্ঘদিন বাসার কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথাই বলেনি, এখন নতুন করে কীভাবে মানিয়ে নেবে ? কিন্তু নিতেই হয়, উপায় নেই। ইচ্ছে করলেই তো আর বাইরে যাওয়া যাবে না, ক্র্যাচের সঙ্গে অভ্যস্ত হতেও সময় লাগবে।
মাঝে-মাঝে মোনালিসা আসত, গল্পটল্প করত, ওইটুকু সময় সে খুব ভালো থাকত। বাসায় বসে তো সব খবর পাওয়া যায় না! টেলিভিশনে কেবল সরকারি দলের গুণগান, পত্রপত্রিকায় কিছু খবর থাকলেও সেন্সরশিপ যে ওখানে আছে তা সে ভালো করেই জানত। মোনালিসার কাছেই সে জেনে নিত দেশের অবস্থা। রাজপথে আন্দোলন চলছে। সবাই খুব ব্যস্ত, সেজন্য কেউ তার কাছে আসার সময় পায় না, এই বুঝ দিত মোনালিসা। সে সবই বুঝত, তার প্রয়োজন যে ফুরিয়ে গেছে সেটুকু না বোঝার মতো বোকা ছিল না সে। তবু ক্ষীণ একটা আশার প্রদীপ তার ভেতরে জ¦লতে থাকতÑহয়তো তাকে কোনও কাজ দেওয়া হবে, আবার সে ব্যস্ত হতে পারবে।
একদিন সে খবর পেলো নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সামরিক সরকার, বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা তো দিয়েছেই, দিয়েছে প্রতিহত করার ডাকও। তার রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল, বাইরে যাওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিল, কিন্তু নিরুপায়। এই সময়েই একদিন মোনালিসা এল, এ-কথা সে-কথার পর অনেক দ্বিধা নিয়ে বললÑতোমাকে একটা কথা বলার দরকার। তুমি যে কীভাবে নেবে!
বলো! আমার কাছে সংকোচ কিসের ?
বলব ? রাগ করবে না তো!
না, রাগ করব কেন ? বলো।
বাবা-মা চাইছেন, আমি যেন দেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনাটা শেষ করে আসি। এখানে তো প্রায়ই ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেয় সরকার, কবে পাশ করে বেরোতে পারব তার তো ঠিক নেই…
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সমীত বললÑতুমি কী চাও ?
আমিও যাওয়ার কথাই ভাবছি। বেশি দিনের ব্যাপার তো নয়, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
কোন দেশে যাচ্ছ ?
আমেরিকায়।
আমেরিকায়! কেন ?
ওখানকার ইউনিভার্সিটিগুলো তো ভালো…
রাশিয়ায় গেলে হতো না ?
রশিয়ায়!
হ্যাঁ, বিপ্লবীদের স্বপ্নভূমি তো রাশিয়াই। গেলে দেখতে পেতে, একটা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়।
তা তো আমরা মোটামুটি জানিই। তাছাড়া আমাদের কমরেডরা তো অহরহ যাচ্ছেন, তারা সবই জানেন। তারচেয়ে কি এটাই ভালো নয় যে, সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী একটা পুঁজিবাদী দেশে গিয়ে দেখে আসি, ওরা কীভাবে চালাচ্ছে, ওদের সংকটগুলো কী, সমস্যাগুলোই-বা কী!
হ্যাঁ, তাও জানার দরকার আছে।
তুমি অনুমতি দিচ্ছ ?
সমীত হেসে ফেলল। বললÑযদি না দিই অনুমতি, যাবে না তুমি ?
না যাব না। Ñদৃঢ়কণ্ঠ মোনালিসার।
তার মন ভালো হয়ে গেল, বললÑআচ্ছা যাও। ঘুরে এসো।
থ্যাংকস।
তারপর দুজনেই চুপচাপ বসে রইল অনেকক্ষণ, কথাবার্তা তেমন হলো না আর যেন হঠাৎ করেই সব কথা ফুরিয়ে গেছে। এমনকি চলে যাওয়ার সময়ও মৃদু হাসি বিনিময় ছাড়া কেউ কাউকে কিছু বললও না।
অনেকদিন আর দেখা পাওয়া গেল না মোনালিসার। এদিকে খবরের কাগজে উত্তপ্ত সব খবর। আকস্মিকভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা থেকে সরে এসে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিল বৃহত্তম বিরোধী দলটি, সমীতদের পার্টিও তাদের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিলো। মুষড়ে পড়ল সমীত। এমন তো হবার কথা ছিল না! তার পার্টি কেন সামরিক শাসকের অধীনে নির্বাচনে যাবে ? তাদের না বিপ্লব করার কথা ? কিন্তু এ প্রশ্ন সে করবে কাকে ? কোথাও যাওয়ার উপায় নেই, কেউ আসেও না তার কাছে। এমনকি মোনালিসাও না। অবশ্য সে একদিন এল, বিদায় নেওয়ার জন্য। কাল সে চলে যাচ্ছে।
আমি কিন্তু দুবছর পরই ফিরে আসব। তারপর একসঙ্গে আবার রাজপথে নামব। ―বলল মোনালিসা।
সমীত কেবল মৃদু-ম্লান হাসল একটু।
নির্বাচন হয়ে গেল একসময় আর তার বছরখানেকের মাথায় কমরেড ফরহাদ আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করলেন মাত্র উনপঞ্চাশ বছর বয়সে। খবরটা বিশ^াস করতে পারলো না সমীত। মনে হলো, হয়তো বিপ্লবের প্রয়োজনেই তিনি আত্মগোপন করেছেন, নিয়েছেন ভিন্ন কোনও নাম, যেমন পাকিস্তান আমলে নিয়েছিলেন ছদ্মনাম ‘কবীর’! একদিন ঠিকই স্বনামে স্বরূপে আবির্ভূত হবেন তিনি।
সমীতের সময় যেন হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গেল। অনেক কথা শুনতে পেলো সে। গর্বাচেভ, গ্লাসনস্ত, পেরিস্ত্রোইকাÑএসব শব্দ শুনতে পেল সে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, তাদের পার্টিও ভেঙে গেলÑএকদল ভাবলেন সোভিয়েতের ভাঙনের পর এই পার্টির আর প্রয়োজন নেই; আরেকদল ভাবলেন, পার্টির প্রয়োজন কখনও ফুরায় না। দেশেও স্বৈরাচার সরকারের পতন হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, নির্বাচনের ঢাকঢোল বেজে উঠল। কিন্তু… কোথাও বিপ্লবের নামগন্ধও পাওয়া গেল না।
সত্যি বলতে কি, এসব ঘটনার সময়ক্রম সে মনে রাখতে পারেনি। পারবে কীভাবে, তার কাছে যে সময় স্থির হয়ে গিয়েছিল। সে অপেক্ষা করত। কখনও মোনালিসার জন্য, আর বেশির ভাগ সময় কমরেড ফরহাদের একটি ডাকের জন্য। তিনি বলেছিলেন, দুহাজার সালের মধ্যে এ দেশে বিপ্লব হবে। দুহাজার সাল কি আসেনি এখনও ? জানে না সে। মোনালিসা বলেছিল, দুবছর পর ফিরে আসবে। দুবছর কি শেষ হয়নি ? তাও জানে না।
একসময় সে ক্র্যাচে ভর দিয়েই বেরোতে শুরু করল। গন্তব্য প্রতিদিন একই। পার্টি অফিস। কিন্তু সেখানে পার্টির সাইনবোর্ড নেই। আছে মনিসিং-কমরেড ফরহাদ ট্রাস্টের সাইনবোর্ড। তবু সে প্রতিদিন ওই একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষা করে কমরেড ফরহাদের জন্য। একদিন নিশ্চয়ই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, সে বিশ^াস করে। দেখা হলে বলবে, আপনি বলেছিলেন বিপ্লব আসবে, অপেক্ষা করো। বলেছিলেন, তোমাকে বিপ্লবী কাজ দেবো, অপেক্ষা করো। সারাজীবন ধরে অপেক্ষা করে আছি কমরেড, কোনও কাজের সুযোগ তো পেলাম না, বিপ্লবও তো এল না!
ঢাকা থেকে
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



