স্যাম্পল জেনারেশন : ইমতিয়ার শামীম

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : বাংলাদেশের গল্প
তিথি―রিমলেস চশমাপরা তিথিই একদিন বলেছিল কথাটা। আর এর পরপরই ওর চশমাটা ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল মেঝের ওপর পড়ে।
এরকম অবশ্য মাঝেমধ্যেই ঘটে। একমাস যায় কি না যায়, তিথির চশমা হঠাৎ নাক থেকে খসে পড়ে। ভেঙে খান খান হয়। কার্তিক তাই ওকে পরামর্শ দিয়েছিল, নিদেনপক্ষে ক্লাসিক হাফ রিম চশমা নেয়ার। কিন্তু তিথির রিমলেস চশমাই বেশি পছন্দের। অবশ্য চশমা ভাঙার পর নতুন করে কিনতে যাওয়ার আগে ও একশ কি একশ দশবার প্রতিজ্ঞা করে, এবার আর রিমলেস চশমাই নেবে না। কিন্তু পরের দিন ওর চোখে রিমলেস চশমাই দেখি আমরা। আরও দেখি, মাসখানেক যেতে না যেতেই তিথি ছুটছে চশমার দোকানের দিকে।
তবে স্বীকার করতেই হবে, রিমলেস চশমায়ই ওকে বেশি ভালো লাগে। কেমন স্কলার―স্কলার, আবার কেমন অন্ধকারের সমুদ্রে একচিলতে মোমের আলোর মতো। কখনও আবার সেই আগোরার হাইপাসিয়ার মতো। যদিও হাইপাসিয়া কখনও চশমা পরেছে কি না, তা ঠিক জানি না আমি।
সেই তিথিই সেইদিন তীব্র অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে আমাকে, ‘মনে হয়, চোখ দুইটাকে ছুরি দিয়ে খোঁচায়ে খোঁচায়ে ফালা ফালা করে ফেলি… ফাক দিস স্যাম্পল জেনারেশন ?’
দুপুর তখন গড়িয়ে পড়ছিল, যেমন দুপুরে রাজ্যের পিকুদের পৃথিবী অন্যরকম হয়ে যায়। ‘অন্তরে-বাইরে’ সময়টায় বলতে গেলে ফাঁকা হয়ে পড়ে, শূন্য হয়ে পড়ে তার হাড়িপাতিলও। আমরা কোনওমতে এক টুকরা ভাজা রুই পেয়েছিলাম। তবে ভাগ্য ভালো, সেটা প্রায় আধ হাত লম্বা। তাছাড়া পেটির দিকের। সাথে ছিল ডাল আর খানিকটা টমেটো ভর্তা। তাই খেয়ে বেশ সুখি-সুখিই লাগছিল আমাদের। আর একটু অলস সময় কাটাচ্ছিলাম নিরলসভাবে। কিন্তু সুখটা কপালে সইল না। তিথির ফোন এল বাসা থেকে। কী দিয়ে যে কী কথাবার্তা হলো, আল্লা মালুম। তার পরও তিথি দেখি, অসহিষ্ণু কণ্ঠে ওই কথা বলল।
আমার মনে হলো, কেউ একটা এইমাত্র কাটা পেন্সিলের তীক্ষè শিস দিয়ে আমার মেরুদণ্ডের ওপর দিয়ে জিব্রালটার প্রণালীর রেখা টেনে যাচ্ছে। ঠিক তখনই চশমাটা খসে পড়ল ওর নাক-চোখের ওপর থেকে!
দুই
‘স্যাম্পল জেনারেশন’… একেবারে খারাপ না কথাটা। তবে খারাপ হোক আর আর ভালো হোক, তাতে কীই-বা আসে যায়। সেদিনের পর তিথির সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। দেখা হওয়ার মতো কোনও কারণও ছিল না অবশ্য। সন্ধ্যার পর―সময়টাকে কেউ কেউ অবশ্য রাতও বলে থাকে―তা সন্ধ্যা হোক আর রাতই হোক কিংবা সন্ধ্যারাতই হোক―তিথি বাসায় আর আমি হলে ফেরার পথে খানিকটা সময় একটু নির্জনে একসঙ্গে হাঁটার সময় পেতাম। মানে রাস্তাটা বা জায়গাটা যে নির্জন, সেরকম না; নির্জন বলতে এটুকুই যে, আমাদের আশপাশে আর কোনও বন্ধু থাকত না, অন্য কেউ আমাদের কথার মধ্যে কথা বলে উঠতে পারত না, আমাদের দুজনের প্রসঙ্গগুলো নিজের দিকে টেনে নিতে পারত না। কিন্তু তাও তো সব দিন নয়। তাছাড়া ব্যাপারটা এমনও নয় যে, ওভাবে একটু নির্জনতা নিয়ে হাঁটতে পেরে আমরা খুশি হয়ে উঠতাম এবং এরকম অলিখিত কোনও প্রতিশ্রুতির দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিলাম যে, এভাবেই আমরা রিকশায় কিংবা হেঁটে একদিন একই কোনও ডেরার দিকে যাব।
মাস পেরুতে না পেরুতেই রিমলেস চশমা ভেঙে যায়, এরকম কোনও মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরা করা যে কত বিরক্তিকর, সেটা এখন আমি হাড়ে হাড়ে বুঝি। আর কেন যেন জানি না, আমি সঙ্গে থাকলেই তিথির বোধহয় এ ঘটনাটা বেশি ঘটে। একবার তো ব্যাপারটা চূড়ান্ত অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছল। ফুটপাতে উঠতে গিয়ে তিথির পা ফসকে গেল। ও অবশ্য কখনও হাই হিল স্যু পরে না; যেটা পরে সেটাকে বলা যায় ‘মিডিয়াম হিল স্যু’। এরকম অবশ্য আমি বলি না, তিথির খাতিরের বন্ধুরাই বলে থাকে। তো একদিকে সেই মিডিয়াম হিল স্যুর ফিতে ছিঁড়ে গেল, অন্যদিকে রিমলেস চশমাটা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল। তারপর আমাকে এক দিকে সেই ছিঁড়ে যাওয়া স্যু আর আরেক দিকে ব্যথা পেয়ে প্রায় খোঁড়াতে থাকা তিথিকে সামাল দিতে দিতে তার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হলো। আর এমন একটা দিনে এই ঘটনা ঘটল, যেদিন সন্ধ্যাতেই নিউ মার্কেটের সামনে রিকশাওয়ালা আর ছাত্রদের মধ্যে মারামারির পর রাস্তাঘাট একেবারে এতিম হয়ে গেছে। সাধারণত আমরা দুজন একসঙ্গে খানিকটা পথ এসে দুদিকে চলে যাই। কিন্তু সেদিন তিথির বাড়ি অবধিই যেতে হলো আমাকে। ব্যাপারটা, সরাসরিই বলি, আমার জন্যে সুখকর ছিল না; বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়েও ব্যাপারটির নিষ্পত্তি ঘটল না। কেননা দোতলার বারান্দা থেকে তিথির বাবা তীক্ষè চোখে তাকিয়ে আছে―দেখতে পাওয়ার পরও আমার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলো, পরদিন সকালে নিউমার্কেট থেকেই হোক আর যেখান থেকেই হোক, চশমা বানিয়ে এনে ওর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
আমি অবশ্য এই অস্বস্তির প্রতিশোধও নিয়েছিলাম। চশমাটা বানানোর পর সেটা পৌঁছানোর জন্যে আমি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম আজিজকে। গ্রামের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ার সুবাদে আজিজ ২৪ ঘণ্টাই তিথির ওপর মাতব্বরি ফলানোর চেষ্টা করে। অবশ্য ভার্সিটিতে এরকম ছাত্রের তেমন অভাব নেই আর তাদের নিয়ে গল্পেরও শেষ নেই। অতএব আজিজকে নিয়েও গল্পের শেষ নেই। সেই আজিজ তিথির বাসায় যাওয়ার এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করবে কেমন করে! সে আমার সঙ্গে চশমার দোকান পর্যন্ত গেল, যাওয়ার পথের রিকশাভাড়া দিল, চশমা যতক্ষণ বানানো হলো ততক্ষণ আমার সঙ্গ দিলো আর আমাকে চা-নুডলস-কফি―এসব খাওয়াল। কিন্তু চশমা তুলতে গিয়ে আমি বেকুব হয়ে গেলাম; শপের সেলসম্যান আমার দিকে পরম যত্নে একটি মোটা কালো ফ্রেমের চশমা বাড়িয়ে দিল।
‘এটা কী দিচ্ছেন ? আমি কি এই ফ্রেম দিয়েছি ?’
‘আমি―আমি পাল্টায়ে দিছি।’―পেছন থেকে সোৎসাহে বলতে শোনা গেল আজিজকে―‘এইটা পরলে ওর চশমা সারা জীবনেও ভাঙবে না।’
আমার মনে পড়ল, হ্যাঁ, কফি নিয়ে বসার পর আজিজ টেবিল থেকে একবার উঠে গিয়েছিল। অথচ কী আশ্চর্য, মুখে আমি এর কিছুই বললাম না। মনে মনে শুধু ভাবলাম, ‘চশমা হয়তো ভাঙবে না কিন্তু এইটা দিলে যে ভোগান্তি হবে, তাতে তোর মৃত্যু ঘটবে রে বাপধন।’ আর মুখে বললাম, ‘বাহ! বেশ হয়েছে তো। ঠিক আছে, এখন এটা হাতিরপুলে ওদের বাসায় গিয়ে পৌছে দিয়ে আয়।’
‘তুইও চল না! তোর ওই প্রোগ্রামে এক-আধঘণ্টা দেরি করে পৌঁছালে কি জাতকূল সব যাবে ?’
বলছে বটে আজিজ কিন্তু আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম, এটা সে একদমই মন থেকে বলছে না। সে চায় এই সুযোগে একটু একা-একাই তিথিদের বাসা থেকে ঘুরে আসতে, তিথির সঙ্গে চশমা দিতে দিতে একা একা খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলতে।
আজিজের মনোবাঞ্ছা যেন পূর্ণ হয়, আমি সে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আজিজ কিংবা আমার, কারও মনের ইচ্ছাই পূর্ণ হয়নি আর। ‘শরীর খারাপ’ বলে তিথি আজিজের সঙ্গে দেখা করেনি। চশমার বাক্সটাও খুলে দেখেনি। অবশ্য সেটা ছুঁয়েছিল একটু; একটা হাতুড়ি দিয়ে সেটাকে ভেঙে ফেলতে যতটুকু ছুঁতে হয় ততটুকু। আমি ভেবেছিলাম, এ ঘটনার পর তিথির সঙ্গে আমার কথাবার্তা দূরে থাক, দেখাও হবে না আর। কিন্তু সব অনুমান মিথ্যা করে তিথি একদিন বাদেই এক বিকেলবেলা আমার হলে এসে হাজির হয়েছিল।
সরকারি দলের পোলাপান তখন হলের গেস্ট রুমটা টেম্পোরারি টর্চার সেল বানানোর উদ্যোগ নিচ্ছিল। কার বিরুদ্ধে যেন শমন জারি করে নিজেদের বরকন্দাজ বাহিনী পাঠাচ্ছিল। তিথি এসে সেখানে ঢুকে পড়ায় তাদের এই মহৎ কাজে খানিকটা বিরতি পড়ে। তারা নিজেদের স্বার্থেই আমাকে তাড়াতাড়ি রুম থেকে ডেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। এই ঘটনায় আমি নিজেও খানিকটা আতংকিত হয়ে পড়ি। আমার মনে হয়, রাতেই এই গেস্টরুমে কিংবা কোনও এক গণরুমে আমাকে ডেকে পাঠানো হবে। যদিও সেরকম কিছু ঘটে নি। অথবা ঘটেছিল। এখন মনে হচ্ছে, সেদিনের পর আমাদের দেখাসাক্ষাৎ একটু কমেই এসেছিল। যদিও আমাদের কখনও সেরকম মনে হয়নি। আরও একটি ব্যাপার ঘটেছিল, এরপর থেকে একবারও আমার অনুপস্থিতিতে তিথির চশমা ভাঙেনি। চশমা ভেঙে যাওয়ার আগে-পরে তিথির চেহারা যে কেমন দাঁড়াত, এতদিনে তা আর ঠিকঠাক মনে নেই। তবে এইবারই খেয়াল করলাম, কেমন যেন বিষণ্ন, কেমন যেন বিপন্ন, কেমন যেন নিরুপায় আর পুরোই অসহিষ্ণু তিথি… অস্থির ভঙ্গিতে বলল, ‘… ফাক দিস স্যাম্পল জেনারেশন’ আর তারপরই তার চশমাটা পড়ে ভেঙে গেল।
তিন
স্যাম্পল জেনারেশন… আহা, স্যাম্পল জেনারেশন…
মনে হয়, আধো ঘুমের মধ্যে একটা কপাট খুলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি। আর নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছি ভালো করে, ‘আমি―আমিই তো স্যাম্পল জেনারেশনের।’
‘কী ? স্যাম্পল জেনারেশনের কী ?’
‘মানুষ… মানুষ ছাড়া আর কী!’
কিন্তু স্যাম্পল জেনারেশনের কেউ কি কোনও মানুষ হতে পারে ?
স্যাম্পল জেনারেশনের হয়ে নিজেকে মানুষ ভাবা বোধহয় আমার ঠিক হচ্ছে না। তাহলে কি শুধু এটুকুই ভাবব যে, স্যাম্পল জেনারেশনের সন্তান ? মানে একটা ‘স্যাম্পল চিলড্রেন’ ? তাহলে কি অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায় না ? ভেজালও মিটে যায় না ? আমি আর আমার মতো আরও যত ‘স্যাম্পল চিলড্রেন’, সবকিছু মিলিয়ে একটা ‘স্যাম্পল জেনারেশন’ আরকি… যাদের কথা আসলে কেউই বোঝে না। বোঝার চেষ্টাও করে না। আর আমরাও বোঝানোর চেষ্টা করি না। আমরা যেসবকিছু নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছি, সেরকম অবশ্য বলা যায় না। আবার আমরা যে নিজেদের নিয়তি নিজেরাই গড়তে চাইছি, সেটা বলাও বোধহয় ঠিক হবে না। আমরা শুধু এটুকু জানি, কেউ আমাদের বুঝবার দায় নিয়ে বসে নেই, আমরাও কাউকে কোনও কিছু বোঝানোর দায় নিয়ে বসে নেই। কিন্তু তারপরও বোধহয় খানিকটা দায় থেকে যায়। বোধহয় সেজন্যেই দেখি, মা-বাবার কপালে মাঝেমধ্যেই ভাঁজ জন্মে আমার প্রসঙ্গে, তারা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলাবলি করে, যা শোনা না গেলেও চোখের তারা থেকেই জেনে যাই আমি, আমাকে নিয়েই কথা হচ্ছে। লুকানো গলায় তারা বলছে, উচ্ছন্নে গেছি, একেবারে উচ্ছন্নে গেছি আমি। মনে হয়, আমার তরফ থেকেও এখনও খানিকটা দায় আছে। সে কারণেই প্রায়শই অনুকম্পা নিয়ে তাদের প্রতি উগড়ে ওঠা বিরক্তি আর ক্রোধ সামলাই, ঝগড়া বাঁধিয়ে তিক্ত সব কথা বলার যাবতীয় লোভ সামলানোর উদারতা দেখাই।
এত উদারতা আর অনুকম্পার চেষ্টাচরিত্র চলে, তারপরও মাঝেমধ্যে এসব সমীকরণ উল্টেপাল্টে যায়, সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তখন আমাদের ক্রোধোমত্ত স্বরে পৃথিবীটা যেন কাঁপতে থাকে। নড়তে থাকে। যেমন এখন, কেঁপে কেঁপে উঠছে। হোয়াটস অ্যাপে কী সব জরুরি নোটিফিকেশন আসবার টুংটাং সব আমাকে অস্থির করে তুলছে, আমি এই ক্রোধোমত্ত পরিস্থিতিতে ঠিক লাগসই কথাবার্তা বলতে পারছি না, সত্যি কথা বলতে গেলে মনযোগও দিতে পারছি না। মনে হচ্ছে, কোথাও একটা টিকটিকি টিকটিক করে ডেকে উঠছে, কোথাও কোনও কাগজপত্র কিংবা তোষকের ভাঁজে দুটো ডিম পেড়ে সেগুলোর দিকে আর ফিরেও চাইছে না। কিন্তু আমি কী করতে পারি! আমি কী করতে পারি! আমি কী কিছুই করতে পারি না!
মাঝেমধ্যে আমাদের ডিজিটাল অ্যালবামটা আমার হাতের নাগালে এসে যায়। সেটায় স্ক্রল করতে করতে আমি বুঝতে পারি, মা-বাবার কী সুতীব্র আকাক্সক্ষার সন্তান এই আমি! এই তো নট-নড়নচড়ন ক্ষমতার আমি, বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছি, মা আমার পাশে বসে চেষ্টা করছে আমাকে শান্ত করার। নিশ্চয়ই তিথিও এমনই প্রার্থিত তার বাবা-মায়ের, হয়তো আমাদের বন্ধুবান্ধবরাও তাই। ভীষণ, ভীষণ প্রার্থিত আমরা তাদের কাছে―এতই অপ্রতিদ্বন্দ্বিতাময় প্রার্থিত যে, আমাদের কারও কারও কোনও ভাইবোন নেই। যেমন আমার কিংবা তিথির। অবশ্য কারও কারও শুধু একটা কেন, তিন-চারটা ভাইবোনও আছে। হয় না, হয় না বলে ডাক্তারের দরবারে আনাগোনা করতে করতে এত বেশি ফার্টিলাইজড কাণ্ডকারখানা ঘটেছে যে, একদফাতেই তিন-চারজন হাজির হয়েছে সংসারে। সবাই―আমরা সবাই তাদের প্রার্থিত, আকাক্সিক্ষত সন্তান। আবার এই ডিজিটাল অ্যালবাম থেকে চোখ সরিয়ে দেয়ালের দিকে রাখি, তখন মনে হতে থাকে, তারা আসলে ভেতর থেকে কোনওদিনই চাননি আমাকে। এই যে ডিজিটাল ছবিটায় মা আমাকে শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তা নিতান্তই ছবি তোলার জন্যে, আসলে তার কপালে ফুটে উঠেছে সুস্পষ্ট বিরক্তির ভাঁজ। জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে চাননি মা আর বাবা, জীবনের সুখও চান নি, চেয়েছেন ক্যারিয়ারে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে, ক্যারিয়ারে সফল হতে। ছেলেমেয়ে মানুষ করা,―কী যে ঝামেলার কাজ, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা এই কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি আমি; তাদের শান্ত, নিরুপদ্রব ক্যারিয়ারময়, বন্ধুবান্ধবময়, ঘুরন্তি-ফিরন্তিময়, যৌন উত্তেজনাময় জীবনে আমি এসেছিলাম ভয়ানক এক ঝামেলা হয়ে। কিছুই যখন বুঝতাম না, তখন কী করেছি তা আজ আর জানি না; যেমন জানি না, তারা কীভাবে দেখেছিলেন আমাদের। কিন্তু জ্ঞান যখন হতে শুরু করল, তখন বুঝেছি, শরীরের কিংবা মনের আর দশটা সমস্যার মতো একটি সমস্যা বলেও তারা মনে করে না আমাকে। সারাদিন মায়ের ওপর জমে ওঠা অভিমান আমি দূর করতে চাইতাম অফিসফেরতা বাবাকে বিরক্তির পর বিরক্তি করে। কিন্তু তিনি যেন প্রস্তুত হয়েই থাকতেন, আমি ছুটে গিয়ে কোলে ঝাপিয়ে পড়ার আগেই শুনতে পেতাম জলদগম্ভীর এক স্বর, ‘তোমার না শুয়ে পড়ার কথা ? শোওনি কেন ?’ বয়স যত বাড়তে লাগল, এসব কথার সঙ্গে ততই আরও কথা যুক্ত হতে শুরু করল, যেমন, ‘থাপড়ায়ে লাল করে দেব, বেয়াদপ।’ যেমন, ‘বেজন্মা কোথাকার’। এই কথাটা অবশ্য বেশ সেনসেটিভই ছিল, কেননা সঙ্গে সঙ্গে মা আর বাবা দুজনের মধ্যে তীব্র ঝগড়া লেগে যেত।
সত্যি কথা হলো, তাদের দুজনের কেউই আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। আমাকে ‘মানুষ’ করে তুলতে গিয়ে মাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফলাইনে থাকতে হতো, মেসেঞ্জার-হোয়াটসঅ্যাপ থেকে দূরে থাকতে হতো আর বাবাকেও ফোনে কথা বলা সংক্ষিপ্ত করতে হতো। রাগে কিড়মিড় করতেন তারা। কিন্তু কীই-বা করার আছে, একটা সন্তান-টন্তান না থাকলে মানুষজনের কাছে তো আবার মুখ দেখানোর উপায় থাকে না। বন্ধুদের নির্দোষ কৌতূকময় হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়েও নিজেকে তখন অদ্ভুত এক অক্ষম প্রাণী মনে হয়। অনেকে সন্দেহও করে, আড়ালেআবডালে কথাবার্তা বলতে শুরু করে এইসব অক্ষমতা নিয়ে। দুঃসাহসী বন্ধুদের কেউ ফিসফিসিয়ে গ্যারান্টিসহকারে সেক্সের প্রস্তাবও দিয়ে বসে। কোনও বন্ধু হয়তো আড্ডা দিতে দিতে পরিকল্পিতভাবেই মুখ ফসকে গান গাইতে থাকে, ‘শুয়ে শুয়ে গেলাম শুধু, তবু কিছু হলো না/আশায় আশায় দিন তো গেল/আশাপূরণ হলো না।’ এরকম রকমারি কারবার আর রকমারি গানের মধ্যে দিয়ে দম্পত্তিরা অনুভব করতে থাকেন, অন্তত একটা চিহ্ন তো রেখে যেতে হবে। অতএব চিহ্ন রেখে যাওয়ার, স্যাম্পল রেখে যাওয়ার মহান সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা।
আমার মা-বাবাকে আমি এসবের চেয়ে ব্যতিক্রম কোনও কিছু ভাবি না।
চার
তাহলে মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা দাঁড়াচ্ছে এইরকম, তাঁরা আমাকে ভালোই বাসেন তবে ততটুকুই ভালোবাসেন, একটি স্যাম্পলকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে যতটুকু ভালোবাসতে হয় আরকি। একদিন তারা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন, হয়তো আমার আগেই যাবেন, অতএব ভালোবাসা দেয়াটা জরুরি কিছু নয়―জরুরি হলো আমাকে বাঁচিয়ে রাখা, যাতে সবাইকে এইটা জানানো যায়, হ্যাঁ, আমরাও আমাদের একটা চিহ্ন রেখে যাচ্ছি। ব্যস, এটুকুই আর কিছু নয়। এটা জানার পরও কখনও কখনও আমি তাদের প্রতি খুব মনোযোগী হয়ে উঠি। তারা যে আমার প্রতি তেমন মনোযোগী নয়, সেটা জানার পরও তাদের সঙ্গে যাকে বলে একেবারে এঁটেসেঁটে যাই। আমি জানি, তাদের মনযোগের দৌড় কতটুকু। জানি, ইউরোপ, কানাডা কিংবা আমেরিকা না হোক, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া গিয়ে দু-একবেলা ঘুরে বেড়ানোর মতো ধুনফুন লেখাপড়া করতে পারলেই আজকালকার মা-বাবা আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায়। গেলবার আমাদের ওসব কফিশপে খুব হইহই উঠল, আলাউদ্দিন মৃধা চাচার মেয়ে নাজলা নাকি স্কলারশিপ নিয়ে মালদ্বীপ যাচ্ছে! আরে বাপ রে, মালদ্বীপ একটা দেশ, তার আবার স্টুডেন্ট স্কলারশিপ! তা যাই হোক, বিদেশ তো! স্কলারশিপ তো! কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, নাজলা মালদ্বীপ গিয়ে পৌঁছানোর আগেই জানা গেল, স্কলারশিপ না, নিজের খরচেই পড়তে যাচ্ছে ও!
নাজলার এই কীর্তি নিয়ে আমার বন্ধুরাও খুব হাসাহাসি করেছে। যদিও নাজলার আগেও অনেকে এইভাবে পড়তে গেছে, বিদেশি সরকারের বৃত্তি পাওয়ার কেচ্ছা শুনিয়েছে। আর আমার বন্ধুরাও বর্তে যাবে, কোনওমতে টেনেটুনে এইভাবে চলে যেতে পারলে। কিন্তু তারপরও তারা খুব হাসাহাসি করে। নাজলা বিদেশ গিয়ে কীভাবে আয়-ইনকাম করার পথ তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও তারা ব্যাপক গবেষণা করেছে। অবশ্য আমি করিনি। আমি চুপচাপ বসে বসে হাসাহাসি করতে দেখেছি ওদের। তাই বলে এটা ভাবারও কারণও নেই, আমি বেশ ভদ্র, ভালো মানুষ কিংবা অবুঝ, নাদান ছেলে। আমি আসলে খুব মনোযোগ দিয়ে ওদের হাসাহাসি করতে দেখেছি; বুঝবার চেষ্টা করেছি, ‘স্যাম্পল জেনারেশনের’ সন্তানেরা আসলে কেমন।
তিথি ওই শব্দগুলো মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার পর থেকে বলতে গেলে আমি বেশ চামে-চামেই আছি। কোনও কিছু করার না থাকলে ভাবাভাবি করা যায় ওটা নিয়ে।
পাঁচ
আজকাল অবশ্য মা-বাবা আমাকে বেশি কিছু বলে না। হয়তো তাদের আদৌ আর কোনও কিছু বলতে ইচ্ছেই করে না, হয়তো তীব্র বিরক্তি জন্মেছে তাদের আমার ওপর। হয়তো কোনও কারণে তাদের মধ্যে খুব ভয় জমেছে, বেশি কিছু বললেই আত্মহত্যা করে ফেলতে পারি। ঘটনা হলো, তারা যে আমার মৃত্যু চায় না, এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। আত্মহত্যা আজকাল বেড়ে গেছে খুব, কিছু হলেই আমার মতো পোলাপান একটা কিছু করে বসছে, হয়তো শাড়ি কিংবা ওড়নায় ফাঁস নিচ্ছে―মা-বাবার কথা বলব কী, আমার নিজেরই তো অবাক লাগে। আর মা-বাবার কথা তো একদমই আলাদা―কেইবা চায়, এত সাধের সন্তানকে এভাবে মরে যেতে দেখতে! অবশ্য আমার মা-বাবার ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত, আমার মৃত্যু তারা না চাইলেও তেমন কিছু ঘটলে দুঃখ পাবে না। কষ্ট আর যন্ত্রণা ঝেঁপে নামবে, এমন কোনও সম্ভাবনা এখানে খুঁজে ফেরা একেবারেই হাস্যকর। শুধু আমি কেন, কোনও ‘স্যাম্পল চিলড্রেনের’ মা-বাবাই সন্তানের মৃত্যুশোক অনুভব করতে পারে না, তাদের বড় জোর এতটুকু মনে হয়, ‘এহ্, এত কিছু করলাম! এত কিছু করছি!! তারপরও ছেলেটা বা মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেল!’
বাবা-মা আমার জন্যে কী করেছেন, আমি তার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিতে পারি। একটু থেমে থেমে দিতে হবে, এই আরকি। কারণ তাদের প্রতি আমার এত মায়া-মহব্বত নেই যে, সবকিছু সুরসুরিয়ে আমার জিহ্বার ডগায় এসে দাঁড়াবে। অবশ্য এমন কোনও ঘেন্নাও নেই যে, গলার কাছে সব কথা এসে দলা পাকিয়ে উঠবে, কোনও কিছু বলতে পারব না। কিন্তু ব্যাপারটা আপাতত থাক। দিব্যি দেখতে পাচ্ছি, আকাশটা কেমন পাণ্ডুর হয়ে উঠছে। কিন্তু আকাশ পাণ্ডুর হলে আমার কীই-বা আসে যায়! তাছাড়া পাণ্ডুর ব্যাপারটা আমি ভালো করে বোধহয় বুঝতেও পারি না। হয়তো কোনওখানে পড়েছিলাম, হয়তো উচ্চারণ করতে ভালো লেগেছিল, হয়তো শব্দটার অর্থ জানার আগ্রহে সেটাকে বেশ ভালোভাবে মাথার মধ্যে গেঁথে নিয়েছিলাম কিংবা এরকমও হতে পারে, অন্য কেউ আমার সামনে শব্দটা উচ্চারণ করেছিল, আর আমি সেটা বুঝতে পারিনি বলেই এখনও মাঝেমধ্যে মনে পড়ে যায়।
এইসব মনে করতে আমার একদমই ভালো লাগে না―বলতে তো আরও না। আর ঠিকমতো কিছু মনেও পড়ে না। শৈশব-কৈশোরের সব ঘটনা যেন বিস্মৃত হয়েছি আমি। যদিও তা রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে, ডিএনএর অংশ হয়ে উঠেছে।
কখনও কখনও অস্পষ্টভাবে শুধু এটুকুই মনে পড়ে, একটা ডে-কেয়ার সেন্টারের খোঁজে বাবা আর মা দুজনেই ভয়ানক অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। কার্তিক মাসের কুকুর হয়ে উঠেছিলেন তারা―কথাটুকু কি খুব বেশি কড়া হয়ে গেল ? শেষ পর্যন্ত আমাকে কোনও ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখা হয়েছিল কি না, সেটা অবশ্য ঠিক মনে পড়ে না। অস্পষ্টভাবে শুধু এরকম মনে পড়ে, মা চিৎকার চেঁচামেচি করছে, আমার দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে কী সব কথা বলছে, ‘সব সময় আঠার মতো লেগে থাকিস ? চুপচাপ বসে থাকতে পারিস না ? আমার আর কোনও কাজ নেই ? যা, ভাগ এখান থেকে।’
আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না, কথাগুলো কেন বলা হচ্ছে! মায়ের কাছেই তো আমার থাকা উচিত! বাবার কাছে যে থাকা যায় না, তা নয় কিন্তু বাবার বুকে তো কোনও দুধ নেই। অথচ আমার ঘন ঘন দুধ খেতে ইচ্ছে করে!
তা যাই হোক, মা যে রেগে আছে, সেটা অবশ্য ঠিকই বুঝতে পারতাম। তাই মায়ের কাছ থেকে সরে যেতাম আর বাবার কাছে গিয়ে ঘুরঘুর করতাম।
বাবা হয়তো তখন প্যান্ট পরা শেষ করে জামা পরছে। ভালো করে তাকিয়েও দেখত না। সুশীল সমাজের নেতা, মানে বিশিষ্ট নাগরিক তো! চুলটা ভালোভাবে আঁচড়ানোর পর আমার দিকে মিষ্টি করে তাকিয়ে গালটাকে একটু টিপে দিতো। কিন্তু কোনও কথাই বলত না। একটা কথা বলত কেবল মায়ের উদ্দেশে, ‘আমি বাইরে গেলাম’।
‘রাক্ষসটারে সঙ্গে নিয়ে যাও না। জীবনটা আমার শেষ করে দিলো! আমাকে এক সেকেন্ডের জন্যে চোখ বুজতে দেয় না, ওয়াশরুমে যেতে দেয় না, আমার কোনও নাওয়া নাই, খাওয়া নাই…’
মায়ের কণ্ঠ বুজে আসত। আর বাবা তার লাগসই তির ছুঁড়ত, ‘ঠিক আছে, তুমি আমার মতো আটানব্বই হাজার টাকার একটা চাকরি কর, আমি ঘরে বসে থেকে ছানাপোনা পালি।’
আরও অনেক পরে একদিন আমি বাসার কাগজপত্রের মধ্যে একটা খামে বেশ কয়েকটা আর্টিকেল আবিষ্কার করি। তার কোনওটা পেপার কাটিং, কোনওটা ফটোকপি, কোনওটা আবার কম্পিউটার প্রিন্ট। কিন্তু সেগুলোর বিষয়বস্তু মোটামুটি একই : মা-বাবা হওয়ার সঠিক সময়।
মানুষ নাকি হড়হড়িয়ে বমি করে, কিন্তু আমি হড়হড়িয়ে হাসতে থাকি, আহ্ রে, এত প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেও তোমরা আমাকে সঠিক সময়ে আনতে পারলে না!
ছয়
মাঝখানে বাসায় থাকার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অর্থহীন চেষ্টা। আবারও হলে ফিরে এসেছি। মানুষ এত শঠতা, শত্রুতা আর বিরক্তি নিয়ে কেন যে সংসার টিকিয়ে রাখে, আমি বুঝি না। এই দুজনে, মানে আমার বাবা আর মায়ে, ভাব ধরে আছে, আমার জন্যে তারা কী না কী ত্যাগ স্বীকার করে একসঙ্গে সংসার করছে। বাস্তবে সংসার ভাঙলে তারা যা করত, সারা দিনরাত তাই করছে। কখনও গোপনে, কখনও প্রকাশ্যে। আর শালার দুনিয়ার মানুষজনও আছে ভালোমানুষীর বস্তা ঘাড়ে নিয়ে, ‘একটু চেষ্টা কর―একটু চেষ্টা কর―ছেলেটার মুখের দিকে তাকায়ে অন্তত সংসারটা টিকিয়ে রাখ’। আর আমি দেখছি, স্কচটেপ দিয়ে কী করে আমার বাবা-মায়ে তাদের ভাঙাভাঙি জোড়া দিয়ে রেখেছে। তা যাক গে, এসব কথাবার্তা বেশি বলা ভালো না। লোকজনে আবার বলবে, ছেলেটা কেমন বেয়াদপ হইছে। আরে, অন্তত বাপ-মায়েক তো একটু শ্রদ্ধাভক্তি করবে। একেবারেই উচ্ছন্নে গেছে।
আমার মনে হয়, আমার তারচেয়ে তিথির সঙ্গেই একটু সময় কাটানো ভালো। যদিও তেমনটা আমার খুব-একটা হয়ে ওঠে না। কী একটা ঘ্রাণ আছে তিথির শরীরটাতে, বেশিক্ষণ ওর কাছে থাকতে পারি না। তাছাড়া তিথিরও বোধহয় ইদানীং আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ভালো লাগে না। কিন্তু ওর রিমলেস চশমা না হলে চলে না, আবার সে চশমা তাড়াতাড়িই ভেঙে যায়, ঘন ঘন চশমা বানাতে হয়, আমার সঙ্গে একটু-আধটু যোগাযোগ বাধ্য হয়েই রাখতে হয়। আর আজিজ দেখা করতে এসেছে জেনে মেজাজ খারাপ হলেও আমাকে দেখে তিথি বোধহয় একটু-আধটু খুশিই হয়। একটু-একটু করে আমার মনে হতে থাকে, তিথির সঙ্গে মেশার মধ্যে দিয়ে আমি বোধহয় আসলে নিজের পুরোনো পরিচয় থেকে মুক্তি খুঁজি। অথবা এরকমও হতে পারে, আমি আমার নিজের পুরানো পরিচয়কেই নতুন করে খুঁজে নিতে চাই ওর সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে দিয়ে।
কিন্তু এইসবের আমি সমাপ্তি চাই। স্যাম্পল চাইল্ড আমি, যেমন তিথিও; আমাদের কি আর এইসবে পোষায় ? আজকাল আমার প্রায়ই মনে হয়, এমন একটা কিছু ঘটাতে হবে, যাতে সবাই দিব্যি বুঝতে পারি, নেহাৎই একটা স্যাম্পল চাইল্ড আমি, নেহাৎই একটা স্যাম্পল চাইল্ড এই আমাদের সব্বাই, আমরা কেউই জানি না পিঠাপিঠি ভাইবোন কতরকমের হতে পারে, চাচা-মামা-ফুপি-খালা কতরকমের হতে পারে। আমাদের বাবা-মায়েরা আমাদের সামনে যৌথ সংসারের আহাজারি একেবারে কম করে না, কিন্তু আমরা জানি ওইসব আহাজারিতেও কপটতা আছে, না থাকলে সবাই মিলে মহানন্দে এইরকম একটা স্যাম্পল জেনারেশন তৈরি করতে পারে! আমি ভাবি, প্রতিদিনই ভাবি, এমন কিছু ঘটাতে হবে যাতে মা-বাবা ভীষণ মুষড়ে পড়েন; এমন একটা কিছু করে বসতে হবে, যাতে তিথি একেবারে আমার উল্টোপথে হাঁটতে থাকে।
একদিন, প্রতিদিন… একদিন, প্রতিদিন… একদিন ঠিক-ঠিকই ঘটনাটা ঘটে। একদিন আমি তিথির দরজাভেজানো ঘরেই অকস্মাৎ তিথিকে হেঁচকা টানে কাছে টেনে নিই। আমি জানতাম, বাসায় তিথির মা-বাবা দুজনেই আছেন। তবু টেনে নিই আর তিথির ঠোঁটে চেপে ধরতে ধরতে প্রত্যাশা করি, এখনই সে মুখ ঘুরিয়ে চিৎকার করে উঠবে। কিন্তু সে প্রতিরোধের মতো শক্ত হয়ে উঠলেও নিজেকে ঠিক সরিয়ে নেয় না, চিৎকারও করে ওঠে না। তবে তার চোখ থেকে রিমলেস চশমাটা খসে পড়ে টাইলস করা মেঝের ওপর। আমি শঙ্কিত হই, আবারও আমাকে চশমার দোকানে যেতে হবে! তবে তিথিকে তেমন মনে হয় না, নরম ঘুমঘুম চোখে সে শুধু বলে, ‘চশমাটা ভেঙে গেল, না ?’
আমি মেঝের দিকে তাকাই… তাকিয়েই থাকি… দেখি, রিমলেস চশমাটা স্থির হয়ে পড়ে আছে, ভাঙেনি, একটুও ভাঙেনি।
ঢাকা থেকে
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



