আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

বিশ্বাসের ভাইরাস : শিমুল মাহমুদ

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : বাংলাদেশের গল্প

ক. প্রাককথন

মুন্সি জয়েনুদ্দিন যখন তেলচিটচিটে পাতলা কাগজে তাবিজ লিখতে শুরু করবে তখন তার জন্য দরকার হয়ে পড়ল দ্বিমুখী কলমের অর্থাৎ ঝরনা কলমের।

জনমজুর আক্কাস আলি ঝরনা কলমের খোঁজে তালুকদারবাড়ি বরাবর হাঁটা ধরল। তার ছেলে বাসেদকে পরিতে আছর করেছে। ছেলের জন্য তাবিজ দরকার। অথচ মুন্সি জয়েনুদ্দিনের কলমে বিপত্তি। তালুকদার বাড়িতে কলম পাওয়া গেল। তবে তা ঝরনা কলম ছিল না। ছিল তিন টাকা দামের একটা বলপেন। কাজেই পেরেসানির অবসান হলো না।

খ. বাসেদ আলির গল্প

নিশি পাওয়া বাসেদালি অন্ধ প্যাঁচার ডাক শোনে। ভেজা শুকনো কাঁচা পাতায় ঘেরা রাত। জলের পথে পা ভেজায় বাসেদ আর দেখে তার সাথে ফকফকা চাঁদ লুকোচুরি খেলছে। চাঁদ তার এলানো আঁচল ছড়িয়ে জ্যোৎস্না-শাদা-ঘোড়া আর রাজকন্যার স্বপ্ন দেখাতে থাকে পরিতে পাওয়া বাসেদকে। নদীর ধার ধরে পরিতে পাওয়া রাজকুমার হেঁটে যায় দুলকি চালে।

রাজকুমার ঘোড়া ছোটায়। আর খুব ভোরে নদীগর্ভ থেকে সূর্য ওঠে। রাজকুমার মুগ্ধ চোখে দেখে। তারপর ছুটে চলার প্রহর সমাগত। বাসেদ ছুটতে থাকে। হেসে ওঠে সকালবেলার ঝাঁকঝাঁক পাখি। খুশিতে লুটোপুটি খায় অসংখ্য শামুক-ঝিনুক আর আত্মহারা হয়ে দৌড় দেয় ভোঁদর খ্যাঁকশেয়াল। তা দেখে গম্ভীর ভাবে হেসে ওঠে রাতের সেই অন্ধ ছাইরঙা লক্ষ্মীপেঁচা।

সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে মাটি, ফেরেশতাকে জ্যোতি আর জিন ও পরিকে অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর গাঁয়ের যত মুরুব্বি পরহেজগার ব্যক্তি আছেন সকলেই বলেছেন যে আক্কাসালির বেটা বাসেদালিকে সেই আগুনরূপি পরিতেই আছর করেছে। তাই তো বাসেদের ঘর নাই, স্কুল নাই, নাওয়া নাই, খাওয়া নাই, বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, সে শুধু ছুটতেই জানে।

ঘুম থেকে জেগে আক্কাসালি আশ্চর্য হয়। তেলের কুপি বাতিটা এখনও জ¦লছে। আগুনের এক চিলতে শিখা থেমে থেমে দপদপ করে উঠছে। শুনেছে এই আগুনের শিখা থেকেই নাকি পরি জাতির জন্ম। বাসেদ বিছানায় নাই। ঘরের পেছনে পেচ্ছাবের ছরছর শব্দে শুনশান ভাঙি যায়। হাজামাজা মরা পাতার উপরদি ইন্দুর চিকা দৌড়ায় বলি শুনশান পরিবেশের মধ্যে একটা বেদিশার ভাব জাগে। কেমন বা ছমছম করি ওঠে আক্কাসালির গাওখান। আক্কাসালি দরজায় এসে খাড়ায়।

মান্দারের বনত ঘুরপাক খায় আলো। ঝকঝকা হয়া ওঠে চিকন বাঁশের শরীর। আলোঘেরা এমন বাঁশঝাড় রাইতের আন্ধাইরে কেমন স্বপ্নপুরীর মতন দেখায়। কেমন বা শুন্যি হয়া যায় শরীরের ভিতরখান; হালকা হয়া আসে। ঘিরি ধরা আন্ধার জোর প্যাঁচ কসি যেন-বা পাকদি তুলি নিবার চায় আকাশত। ঘোর কেটে গেলে আলোর নিশান যেন-বা শূন্যে মিলায়। মায়া ধরা রাত। সবই মায়া। এই মুনিষ্যিজীবন মায়া। বড় অসহায় আর বড় নিথর হয়া যায় শরীর। তারপর ভোরের আলো ফুটে উঠলে চরকরমপুরের মানুষ কলমিপুকুরের কাদায় খুঁজে পায় আক্কাসালির বেটা বাসেদালির উলঙ্গ দেহ। জিনে ধরেছে বলে বদনাম রটি যায়।

আসগর মুন্সি মুখিয়ে ওঠে, কী হইছে তোমার বাহে ? আল্লার বান্দা, তোমার তানে তোমার পুব্বপুরুষ থুই গিছে কুন্ঠে বা নুকেয়া আছে মেলা মেলা চান্দির ট্যাকা, বাসনকোসন, সোনার গয়নাপাতিও থাকিবা পারে কিছু।

বাসেদালি ফ্যালফ্যাল করি তাকায়। তারপর ঘামদি ভারী হয়া যায় শরীর। হিড়হিড় করি থমকি যাবা চায়। পড়ি যাবা চায় গাবগাছের মগডাল ভাঙ্গি।

আনছারুদ্দিন হাঁক দিয়ে ওঠে, ছোওয়াখান তোর মানুষ না হয়; অয় শয়তান, শয়তান জিনে ধইরছে অক; কাটি ফ্যালা, নইলে নিষ্ফলা হোবে, সব্বনাশ হোবে, পুড়ি ছাই হয়া যাবে তোর ফসল-আবাদ। নদী শুকায়া যাবে, বেইট ছাওয়ালের বুক শুকাবে, মাটি বন্ধ্যা হোবে, ফসল দিবে নাই। কাটি ফ্যালা অক।

অথচ এই সপ্ত জগৎ অপেক্ষা অর্থাৎ আসমান ও দুনিয়া অপেক্ষা মৃত্যু অধিক শক্তিশালী। অতঃপর মৃত্যু তার অনল সদৃশ চক্ষু উন্মীলন করে পক্ষ বিস্তার পূর্বক উড্ডীয়মান হলে অজ্ঞান অবস্থায় এক হাজার বছর কেটে যায়। তৎপর চৈতন্য লাভ করে বললেন, এলাহি! মৃত্যু ছাড়া বলবান বিক্রমশালী আপনি আর কাউকে সৃষ্টি করেছেন কি ?

রাজকুমারের আদলে বাসেদ যাত্রা করে পাতালপুরীতে। অন্ধকার সয়ে আসে চোখে। ঘোড়ার খুড়ের আঘাতে পাতালপুরীর জল দুভাগ হয়ে সোনালি সিড়ি বের হয়ে আসে। যোজন যোজন লম্বা ঝলমলে সিড়ি নেমে গেছে পাতালে। অপরিচিত সুর কানে বাজে। আর চোখের সামনে একেক করে খুলে যায় লৌহদণ্ডে মোড়ান সব ভারি ভারি দরজা। উজির নাজির মন্ত্রি কোতওয়ালরা ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। তখন ক্ষীণ স্বরে শুনতে পায় বাসেদের মা অছিমন বিবি ওর নাম ধরে ডাকছে।

অথচ সেই অতি চেনা ডাকও যেন-বা অনেকগুলো কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর এক সময় গোয়ালে গরুর বিশাল হাম্বা ডাক শুনে বাসেদের ভীষণ হাসি পায়। জলের কুলকুল শব্দে বাসেদ চারদিকের অতিচেনা নিজের বাড়ির আঙিনার মানুষগুলোর কথা ঠিক মতো শুনতে পায় না অথবা পাতালপুরীর দৃশ্য ছাড়া অন্য কোন দুনিয়াবি দৃশ্য চোখে পড়ে না। মাথার ভেতরে পাতালপুরীর আজব বেচাইন পরিবেশের দমকে চোখে ঘোর লাগে। ঘোর স্বপ্নের মতো তলাতে তলাতে জলের একেবারে তলে মাটির স্পর্শে পাতালপুরী! নুড়ি আর বালু, বালু আর ছোপ ছোপ শ্যাওলা! শ্যাওলাজলের লতাপাতা আর রাশি রাশি রঙবেরঙের চোখ ধাঁধানো শামুক ঝিনুক প্রবাল।

গ. আক্কাস আলির গল্প

দুই পহরের আন্ধার-কালা শুনশান পাকদি ঝুপঝুপ করি নামে সন্ধ্যা। সেও কবরের ভিতরকার হসকি পড়া মাটির মতন। রাইত কুন পাখ থাকি নামে টের না পাওয়া যায়। যেমন টের না পাওয়া যায়, কবর খুড়ি মাটির তলা থাকি যেই পানি ভেইরায় তার ওইপাখে পাতালপুরী আছে কী নাই। কায়া নাই, ছায়াখান আছে। দৃষ্টি নাই, চোখ দুইডা আছে। না দেখা যায় কখন ঝুরঝুর মাটির শব্দ করি নামি যায় রাজকুমার সেই আন্ধাইর পাতালত। কায়া নাই বলি রাজকুমার যে নামি যায়, কায়ও না দেখা পায় অক। রাজকুমার টাট্টুঘোড়ায় চড়ি চলি যায় কোন বা সুদূর পাতালপুরীতে। যেইঠে সাত-সমুদ্দর তেরো-নদী পার হয়াও রাজকন্যাকে খুঁজি না পাওয়া যায়। বারো বছর ছদ্মবেশ পরি মিলি যায় সাত রাজার ধন মানিক রতন আদ্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা।

রাত তখন গভীর। রাজকুমার বাসেদালিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘরে ছিকল তুলে দেয় আক্কাসালি। তারপর রাত তখন ভাটার দিকে। আক্কাসালি বউয়ের ধারে শুয়ে ভাবতে থাকে একমাত্র পুত্র বাসেদের কথা। অতঃপর অতীতকথা। জমি, জমির ফসল; পুকুর, পুকুরের মাছ; গাছ, গাছের ফল। অতঃপর আধ-ন্যাংটা বুড়িয়ে যাওয়া বউয়ের গতরখান কাথা দিয়ে ঢেকে পাশ ফিরে শোয়। এবং তারও অনেক পর আক্কাসালির ঘুম ভাঙ্গে রাজকুমার বাসেদের ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজে।

খাঁচা থেকে মুরগি-হাঁস উড়ে পালায়। গোয়ালের গরু ডাক ছাড়ে। আক্কাসালির ভালো লাগে না এই ঘোর কেটে যাওয়া। অতঃপর দিনভর খেতে নিড়ানি দিতে দিতে ঘামে ধুয়ে যায় শরীরের যত ভালো লাগা আর রাজ্যির যত দুশ্চিন্তা। আক্কাসালির তেষ্টা লাগে প্রচণ্ড। দূরের ফাঁকা জমি-মাঠ এতটাই ঝলসে ওঠে রৌদ্রে যে বিরান মাঠ জুড়ে অট্টহাসি শোনা যায়। খোয়াব দেখে আক্কাস, সার সার ধানচারার কচি কচি শরীর সরাই হাঁটি আসে ফেরেস্তারা। অপরূপ দর্শন তেনাদের। দুই ডানায় নাগি থাকে ধানবীজের সবুজ অঙ আর সোনালি ধানফুলের মউল। চৌখত অপূর্ব এক ঐশ্বরিক ঝলকানি।

তাঁরা অস্তে অস্তে আইলের ধারে এসে দাঁড়ায়। তারপর বলতে থাকে কিবা হবে এই আবাদ রে! নিস্ফলা হোবে, পুড়ি ছাই হয়া যাবে মাইনসের দুনিয়া। এলাও সময় আছে খুঁজি দেখ আল্লাহ মাবুদরে। খালি খুঁজে দেখিবার আলস্য। তুই পাবু, তুই পাবু খোঁজ খোঁজ।

তাঁরা শুভ্র দাড়ি নাড়িয়ে মিলিয়ে যাবার আগে চোখ রাঙিয়ে বলতে থাকে, সবই মায়া! তোর ছোওয়াখান মায়া! ছোওয়াখান তোর মানুষ না হয়; অয় শয়তান, শয়তান জিনে ধইছে অক; কাটি ফেলা অক, কাটি ফেলা; নইলে সব্বনাশ হইবে, আল্লাহ নারাজ হইবেক, কাটি ফেল।

আর ঠিক তখনই পিছনে মুন্সি জয়েনুদ্দিনের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, কী বা ভাবেছিরে আক্কাস ? কার বা স্বপন দেখছ ?

আক্কাস হড়বড়িয়ে বলতে থাকে, স্বপন, কুন্ঠে স্বপন ? স্বপন কহেছি ক্যান, মুই যে দেখিনু পসটো করি; এইল্যা কী এই যে দিনের আলোত পসটো।

এলা আক্কাস কী দেখছো, হামাক সব ভাঙ্গি ক’।

আক্কাস আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে। তারপর মুন্সি জয়েনুদ্দিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে একটা লটকন গাছের তলাত গিয়া বসে। একে একে সব খুলে বলে। আল্লাক খুঁজি পাবার কথা। তারপর ফেরেশতারা তার ছোওয়া বাসেদ সম্পর্কে কী মতামত দিয়েছে তা বলতে গিয়ে হোঁচট খায়। আক্কাসালি চুপ মেরে যায়। জয়েনুদ্দিন উসখুস করে ওঠে, হামাক ক, সব ভাঙ্গি ক আক্কাস।

আক্কাস আস্তে আস্তে বলতে গিয়েও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কাটি ফেলার কথা বলার পর বাসেদকে জিনে ধরার পর থেকে এ যাবৎ বাসেদের কাণ্ডকারখানা একে একে বলে গেল আর চোখ দুটো পিটপিট করতে থাকল। মুন্সি জয়েনুদ্দিন সব শুনে মন্তব্য করল, গত দুবছরের মতো এবারে আর বন্যা হবে না। এবারে হবে খড়া। দাউদাউ আগুন জ¦লবি। সবই ঐ দুষ্ট জিনের কারসাজি। আর আক্কাসের ওই অপয়া শয়তানে ধরা ছোওয়া যতদিন জীবিত থাকিবে ততোদিন এই চরকরমপুরের বান্দারা এই আজাব ভোগ করিতে থাকিবে।

আক্কাস তুই আল্লার পথেত বাহির হয়া যা, সব মুশকিল আহসান হবেক।

মুন্সি জয়েনুদ্দিন চলে গেলে আক্কাসালি আকাশ পাতাল মাথামুণ্ডু ভাবতে থাকে। ভাবতে থাকে আর বিরান মাঠের দিকে অর্থহীন তাকায়। তাকায় আর ভাবে। ধল্লা নদীর তখন উথাল-পাথাল যৌবন। ধল্লা নদীখান দিয়া অছিমন বৌ সাজি আসিছিল পরথম। নৌকার ছইএ বান্ধা আছেলো নালরঙা কাপড়ার ঘের। তিনখানা ইস্কা ভাড়া করেছিনু। ইস্কাত নালরঙা কাপড়ার ঘের। সেই ঘেরের ফাঁক দি টুকরা সবুজ জমি, মাটির আল, কত নোকের মুখ নতুন বৌ দেখিবার তানে। ইস্কাত আক্কাসের বউ। আর নানি, ছোটো শালাশালি আর আক্কাসের বুড়হা বাপখান আরো কত মানুষ হাঁটি চলিছে আক্কাসের বাড়ির গোড়ত।

সইরসা ফুলের গন্ধ আর কাঁচা কাটারির সবুজ নিয়া অছিমন বৌ সাজি আসিছিল। তখন বর্গাচাষির সম্মানও আছিল। নিয়ামত তালুকদার দাওয়াত করি নতুন বৌকে মুরগি আর সোনামুগের ডাল দি ভাত খাওয়াইছিল। আর নতুন ধানের গন্ধের মতন একখানা তাঁতের নকসাশাড়ি কিনে দিছিল অছিমনকে। তখন একখান ছোটো মতন গোয়াল আছিল। এখন নাই।

নদীত মাছ আছিল। মাছ আছিল পুকুরগুলাত আর খালগুলাত। বৈরালি, কৈ, কানাকৈ, ঝাঁকিকৈ, পুটি, সিঙ্গি, পাবদা, চিতল, রাইখর, আইড়, টেংরা, মাগুর, বাইং, বাঁশপাতা, রাণী, সাতি, চ্যাঙ, দাইড়কা, পোয়া, কোইয়া, গোচি, মেনি, কালাবাইশ, কালারুই। এখন এইগুলান মাছ আল্লার দুনিয়াত মনে লয় নাই। কুচিয়া আর পুটি ছাড়া পাওয়া যায় না কিছু। কাঠারি, কালাজিরা, ভাদই কত কিবা হইত। এখন ইরি। ইরি আর ইলিভেন, আটাশ, সাতাশ।

বাসেদ হইল যেই বছর বান হইল সেই বছর। নদীর বুক শুকাই গিছে টের পাওয়া যায় নাই। বুকের দুধ না পাইলে হামার বাসেদ। বান যে আসছে টের পাওয়া যায় নাই। সেই বানের পানিত কিবা কিবা ভাসি আসিছে, মরা গরু, মরা কুকুর, মরা শিয়াল আর বুড়ি মাইনসের মাথার চুল। নদীর বুক শুকাইলে বান তো আসিবেই। কিন্তুক মাগির বুক শুকাইলে, শইল শুকাইলে ছাওয়া আসিবে কুস থাকি ? কিবা হয়া গেল। গেরস্থ ঘরের সবুজ ধান আর কী রকম এক ছটফটানি নদীর বানে কুঠে ভাসি গেইল কায় কহিবা পারে ? বান ডাকি আইনলো ওই ছোওয়া বাসেদ।

পরপর তিন বছরের বানে নদীর বুক শুকাইল। অছিমনের বুক শুকাইল। বরগা জমি আরো টুকরা টুকরা হয়া গেল। আর বরগাচাষি জনমজুর হই গেইল হে। আক্কাসালি বসে থাকে। শুনশান দুপুরের মাঠ। আর এমন সময় বাসেদ রাজকুমার যেন-বা তার পঙ্খিরাজ ঘোড়াসহ উড়াল দিয়া সামনে এসে দাঁড়ায়। রাজকুমার চেঁচিয়ে ওঠে, চাল নি বাড়িত যাইস, মাও ভাত আন্ধে নাই, জলদি যাইস মাও খেপি আছে।

ঘোর দুপুরে আক্কাসকে ভূতে পায়। কাদামাখা শইলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর মাঠচরের পানে তাকিয়ে চিৎকার করে। কাদা দিয়ে ঢেলা মারে।

এ এ আবাগির পুত, এ খানকির ছোওয়া কুঠে গেলু, মোক হুকুম করিছে ? চাউল কিনি নিয়া যাবা পারিন না। মোক কহেছি, তোর মাও খেপি গিছে ? তোর মাও খেপিলে মোর কিরে, চাউল কিনি নিয়া যাবা কহেছি, ধোন্দা ছাওয়া ঘরত বসি বসি খাছি, ইস্কুল নাই, মোক হুকুম করিছে। শোরের বাচ্চা, শয়তানের বাচ্চা।

রাত যখন গভীর হয়া আসে তখন শইলে এক রকম ঘাম হয় আক্কাসের। তারপর নির্লিপ্ত ভারি মাথায় অনুভূতি ভোতা। বেড়ার খোলা ফোঁকর দিয়া বাইরের আকাশটা আরো পরিষ্কার আরো জ¦লজ¦লা লাগে। আক্কাস ফিসফিসায়া ডাকে, অছিমন উইঠেক, ডাকিছে, উনি আইছে। উঠেক চুদির বেটি, গোঙ্গছি কেনে ?

অছিমন উঠে তার আধনেংটা শইল ঢাকতে থাকলে আক্কাস চেচিয়ে ওঠে, ওই ওই দেখ মাগি উনি আইছে; আমারে দ্বীনের কথা কহিছেন, এলেমের কথা কহিছেন।

অছিমন এই দৈব দর্শনের কিছুই বুঝপার পারে না। তারপর ওরা ঘুমায়। ঘুমের মদ্যি আক্কাস অছিমনকে ঠেঁসে ধরে বিড়বিড়িয়ে ওঠে, তোর বুকত মাংস নাই কেনে, ওই মাগি তোর দুধ টিপিয়া মুই মজা পাওনা কেনে ?

ঘামে ভেজা শইল নিয়া আক্কাস বিড়বিড় করতে থাকে, জমিজমা নিস্ফলা হইবেক, মাটির রস চুষি নিছে, মাটি আর বাচ্চা দিবেক নাই, নদীর জল চুষেছে কায় বা জানে। দুধত মাংস নাই, নদীত জল নাই, নিস্ফলা হইবে তামান আবাদ।

ঘ. ঘটনার শুরু

ওই রাতেই আক্কাস স্বপ্নে দেখে, সে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর বিশালকায় এক ফেরেশতা একটি বিশাল পাথর দিয়ে তার মাথা থেতলে দিচ্ছে। অথচ আক্কাসের মরণ হয় না। বরং মাথা আবার আগের মতন অক্ষত হয়ে ওঠে আর আবারো সেই বিশালকায় ফেরেশতা পাথর খণ্ড দিয়ে আক্কাসের মাথায় আঘাত করে আর আক্কাসের মাথা চুর্ণ বিচুর্ণ হয়ে চারপাশে ছিটিয়ে পড়ে।

অতঃপর আবারো আক্কাসের মাথা ঠিক হয়ে ওঠে আর আবারো আঘাত আবারো চুর্ণ বিচুর্ণ এবং অতঃপর অক্ষত এবং আঘাত এভাবে চলতেই থাকে এক অখণ্ড সময় যাবৎ বিরাম নাই বিশ্রাম নাই। পাথর খণ্ডের মতো ভারি দবদবে মাথা নিয়ে আক্কাসালি ঘুম থেকে বিকট চিৎকারে জেগে ওঠে। আর তখনই ফজরের আজান শোনা গেল। আক্কাস আজ অনেক দিন পর অতি প্রত্যুষেই গোসল করার পর ওজু বানায়। এরপর মসজিদের উদ্দেশে যাত্রা করে। নামাজ শেষে ইমাম জয়েনুদ্দিন মুন্সির কাছে তার স্বপ্নবৃত্তান্ত বয়ান করতে থাকে।

জয়েনুদ্দিন মুন্সি সব শোনার পর আলহাজ মৌলানা মোহাম্মদ রৌশন আলীর ইহকাল ও পরকাল নামে একখানি পুস্তক নিয়ে এসে পুস্তকের ২৭০ পৃষ্টা মেলে ধরলেন। তারপর পাঠ করতে থাকলেন, ‘ঐ ব্যক্তি, আল্লাহ যাকে কোরআনের এলেম দান করেছিলেন কিন্তু সে আলস্যবশত রাতে তেলওয়াত করেনি দিনেও আমল করেনি; তাকে মৃত্যুর পর এই আজাব কেয়ামতের দিন পর্যন্ত দেওয়া হতে থাকবে।’

আক্কাস আলির কপালে ভাঁজ পড়ে। চোখে ফুঠে ওঠে ভয়। আনমনে দাড়ি হাতাতে থাকে। অতঃপর জয়েনুদ্দিন মুন্সির কথায় সে আরো মনোযোগ দেয়। জয়েনুদ্দিন তাকে বোঝাতে থাকে যেহেতু আক্কাস আলি মাদরাসায় কোরআন শিক্ষা করে হাফেজ হয়েছিল এই শেষ বয়েসে তা কাজে লাগান জরুরি, নিজেকে কোরবানি করেক আক্কাস, সব মুশকিল আহসান হবেক।

আক্কাস আলি শোনে আর চোখ পিটপিট করে। তারপর দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বাড়ির পথে হাঁটা ধরে।

তারপর লোকটা মরা মানুষের মতো দিনে দিনে নির্জন হতে থাকে আর বাসেদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকায় আর ভাবে। ভাবে আর রাতে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে আগুন আর আগুন। বড় বড় অজগর সাপ। চোখ দিয়ে মুখ দিয়ে আগুন ছুটছে। ধেয়ে আসছে ওর দিকে। বড্ড তেষ্টা পায়। একজন বিকটকায় দানব, প্রতিটি আঙুলে সত্তুর হাজার বিষাক্ত বিচ্ছু; তাকে পানি খেতে দেয়। চুমুক দিতেই দুর্গন্ধ। রক্ত। পুঁজ। রক্ত-পুঁজের তরল গড়িয়ে পড়ে পায়ের ওপর।

আক্কাস আলি বেহুঁশ অবস্থাতেই খুব জোরে একটা চিৎকার দেয়। ঘুম থেকে জেগে ওঠে। এবং আবারও মসজিদে যায়। মনে মনে তওবা করে। পরকালের পথ নিশ্চিত করতে হবে। মনে মনে তওবা করে আর পরকালের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে আর ধানকাটা হাসুয়াটা ধার দেয়। ধার দেয় আর তওবা করে। পরকালের কথা ভাবে। ভাবে আর ধানকাটা হাসুয়াটা ধার দেয়।

অতঃপর ইদ-উল-আজহা। ফজরের আজানের আওয়াজে আক্কাস উঠে আসে বিছানা থেকে। বাসেদের ঘরের শেকল নামিয়ে ওকে বিছানা থেকে তুলে এনে গোসল করায়। ওজু করায়। ওজু করা অবস্থায় বাসেদ দেখতে পায় একটা উজ্জ্বল তারা আকাশের কোল হতে খসে পড়ছে আন্ধারে বাড়ির পেছনের মান্দার গাছের ভিড়ে। ঘনঘন ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজে খুঁজে পাওয়া যায় না সেই উজ্জ্বল তারকা। রাত শেষ হয়ে আসায় শেষ বারের মতো শেয়ালেরা ডেকে নেয়। তারপর হঠাৎই অন্ধ পেঁচা ডেকে ওঠে। হারিয়ে যাওয়া নীল আকাশের তারা, জোনাক পোকা আর আবছা আলোয় দেও-দৈত্যরা ভিড় জমায়। রাজকুমার বাসেদ টগবগিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দেও-দৈত্যদের কাছে গিয়ে হাঁক ছাড়ে, তোমরা কুন্ঠে যাবে বাহে ?

দেও-দৈত্যগুলো সব শাকচুন্নিতে বদলাতে থাকে আর বলতে থাকে, হাও মাও খাও মানুষের গন্ধ পাও।

বাবার হাত ধরে বাসেদ মান্দার গাছের দিকে এগুতে থাকে। তারপর কিছুক্ষণ আগে আকাশ থেকে ছিটকে পড়া তারাটা ঠিক যেখানটায় হারিয়ে গেছে সেখানে গিয়ে বাপ-বেটা দাঁড়ায়। রাজকুমার স্পষ্ট চোখে তাকাতে পারে না। গোসলের পরও চোখে ঘোর লেগে থাকে। চোখ যেন তার বাবাকে দেখতে পায় না বরং দেখতে পায় এক ছাগলদাড়িমুখো দৈত্যকে। দৈত্যকে ভয় করে না রাজকুমার। তার আছে পঙ্খীরাজ ঘোড়া।

তারপর আধো আধো অন্ধকারে ঘাসের ওপর বাপ-বেটা বেশ কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থাকে। আক্কাসালি কোন কথা বলে না। নিথর দুইটা মানুষ বসি থাকে যেন প্রাণ নাই শরিলেত। ব্যাঙের চোখের মতন তাকেয়া থাকে ওরা। কার বা অপেক্ষা। কীসের বা অপেক্ষা। জল না গড়ায় সেই চোখ থাকি। দৃষ্টি না ফুটে সেই চোখ থাকি। একসময় ছেলেকে আরো খানিকটা কাছে টানে আক্কাস। ছেলের চোখের দিকে তাকায় আর বলতে থাকে, এ’বা তুই এই রকম পাগেলা কেনে, দিন রাইত নিজের মনত বিড়বিড় করেছি, কিবা কী কহেছি আর দৌড়ি বেড়াছি সারা পাথারত।

বাসেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কথা খুঁজে পায় না, একদৃষ্টে বাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার এই বাপ কোন দিন এই বিহানে তার ঘরে আসে নাই। এমন আদর করে কথা বলে নাই। বসেদ জানতে চায়,

তোর কী হইছে বাপ, তুই অ্যাংকরি কথা কহেছি ক্যানে ?

আক্কাস বেচাইন হয়, কী খাবু ক, খিদা নাগিছে ?

রাজকুমার যেন-বা ভীত হয়। চারপাশে তাকায়। মাকে খোঁজে। আক্কাসের চোখ দুইটা রাইত জাগা টকটকা জবা ফুল। তফনের গিট থেকে তামাক বের করে হাতের তালুতে ডলতে থাকে। ডলার নেশা শেষ হলে জিহ্বার তলায় তর্জনি দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে বসে থাকে। একটু অস্থির অস্থির ঠেকে। আপন মনে বিড়বিড় করে, ছোওয়াখানা হামার বেহেশত নসিব হবেক।

তারপর ঘাড়ের গামছাখান হাতে নিয়ে বাসেদের কপালসহ চোখ দুখানা বাঁধতে থাকে আর অছিমনের জেগে ওঠার দুশ্চিন্তায় হাত দুখানা কেঁপে কেঁপে ওঠে। বাসেদ তখন পঙ্খীরাজে উঠে উড়াল দেবার আনন্দে মশগুল। রাজকুমার বেশামাল হয়। চোখে আন্ধার দেখে, চোখে খোয়াব দেখে। খোয়াব দেখে আর আন্ধার দেখে। কিছুক্ষণ আগে ঠিক যে জায়গায় আকাশ থেকে ছুটে আসা তারা হারিয়ে গেল ঠিক জায়গাটিতেই বাসেদ তারকাটিকে দেখতে পায়; আহ্লাদে চোখ বোজে।

মুন্সি জয়েনুদ্দিনের দেওয়া পবিত্র কেতাব মোতাবেক সাধু-বাংলায় আক্কাস আলি বলতে থাকে, হে আল্লাহ! আমরা তোমারই সৃষ্টি। তোমার দিকেই আমাদের শেষ গতি। সুতরাং আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার বেঁচে থাকা, মৃত্যুবরণÑসবকিছুই তুমি বিশ^পালক আল্লার জন্য। তুমি অদ্বিতীয়। যেহেতু আমি আত্মসমর্পণকারী মুসলমান, তাই এই কুরবানির জন্য আমি আদিষ্ট হইয়াছি। অতএব হে পরওয়ারদিগার, তুমি মালেক আলির পুত্র আক্কাস আলির এই কুরবানি কবুল কর। আমি তোমার নামে আমার পুত্র বাসেদালিকে কুরবানি করিতেছি, আল্লাহ আকবর।

অতঃপর বাঁ-হাতে বাসেদকে ঝাপটে ধরে শুইয়ে দিতেই ডান হাতের হাসুয়া রাজকুমারের কণ্ঠ বরাবর অনবরত চলাচল করতে থাকে; চলাচল করতে থাকে কণ্ঠের আরো গভীরে। আর ভেসে আসতে থাকে গরু জবাইয়ের মতো একটা অসম্ভব রকম কষ্টকাতর মায়াবী আর ভারী আওয়াজ। রক্তের ছুটে চলা গতি আক্কাস আলিকে আরো খানিকটা অস্থির করে তোলে। অবশেষে আক্কাস উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়ায় যখন মুসুল্লিরা নামাজ শেষে ঘরে ফিরছিল।

আক্কাস আলি সোজা ডোবা বরাবর হেঁটে গিয়ে পানিতে নেমে গতর ধুয়ে নেয়। তারপর ভেজা শরীরে হাঁটতে থাকে। আক্কাস আলি হাঁটতেই থাকে। অতঃপর আরো খানিকটা পথ হাঁটার পর কিছুটা দূরে দেখা গেল গৃহত্যাগী মানুষের দল। জোব্বা পাঞ্জাবি পরনে। হাতে মাথায় মাজায় বোচকা-বুচকি। মুখে দাড়ি। মাথায় টুপি। কারো বা পাগড়ি। গৃহত্যাগীগণ সার বেঁধে চলেছেন দ্বীনের পথে। অনেকটা পর, সূর্যের তাপ যখন আরো খানিকটা তাতিয়ে উঠল তখন আক্কাস আলি দলটার সাথে গিয়ে মিশে যায়।

ঢাকা থেকে

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button