এক গাঁয়ের মেয়ের রূপকথা : অহনা বিশ্বাস

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : ভারতের গল্প
এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় বরফঢাকা পাহাড়ের মাথায় বসে স্বয়ং নটরাজ তাঁর পার্বতীর বাম হাতটি নিয়ে খেলা করছিলেন।
হঠাৎই দেবীর হাত থেকে তাঁর রজত বালা ছিটকে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। আর তার থেকে যে হৃদযমুনা উপুড় করা মায়াবী রুপোলি জোছনা নির্গত হয়, তার ছোঁয়া পেয়ে পাহাড় তলার এক গরিব মেয়ে অপরূপ রূপবতী হয়ে ওঠে।
শুধু রূপবতী নয়, সেই বালায় নটরাজের স্পর্শ ছিল বলে মেয়ে অসামান্য নৃত্যপটিয়সী হয়ে ওঠে।
রূপগুণের সমস্যা হলো এই যে, সে ছোট একটা গ্রামের সীমানায় কোনওমতে আটক থাকতে পারে না। সে বাইরে বের হবার জন্য আকুলিবিকুলি করে।
তারপর এক বিশেষ রাতে, দেশের রাজা যখন রাজ্য জয় করে ফিরছিলেন, তখন এই সুন্দরী কন্যাটিকে তার চোখে পড়ে। অতএব রাজা তাকে বন্দি করে, নানা সুখের চাদরে মুড়ে তাঁর রাজধানীতে, তাঁর হারেমে এনে রাখেন।
রাজা তো শুধু গ্রামীণ মেয়েটির রূপমুগ্ধই নন, তার নৃত্যেও তিনি পাগল। সারা রাত মেয়েটির সামনে বসে একইযোগে তিনি তার নৃত্য ও রূপের মাধুর্য পান করেন। মেয়েটিও তাতে বিগলিত না হয়ে পারে না।
রাজা তাকে জগতের সবচেয়ে দামি শাড়ি পরান, সবচেয়ে দামি ধনরত্নের মালায় তার কণ্ঠ, বক্ষ, নীবি ঢেকে দেন। রাতের বেলায় সেই গাঁয়ের মেয়ের রূপের কথা আর কী বলব! তার মুখমণ্ডল তখন পোখরাজ পাথরের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সাপের মাথার মণির মতো হিলহিলে ঢং পায় তার নাভি। আর তার পা দুটি তো চুনির মতো আবছা রাতুল। পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্নার ছোঁয়া পেয়ে তা যেন অপ্সরার মতো চঞ্চল।
চোখে ঘন ঘুম নেমে এলেও রাজা তাকে ছেড়ে নড়তে পারেন না। মহাসম্মানিত রাজ নর্তকীর ভারী সোনার নূপুর একদিন রাজা নিজের হাতে তার পায়ে বেঁধে দেন। গাঁয়ের মেয়ের জন্য বহুদিনের বন্ধ করা নাটদরবারও খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু কী আশ্চর্য! দিনের আলোয় রাজা সেই গাঁয়ের মেয়ে, তাঁর প্রিয়তম নর্তকীকে চিনতে পারেন না। চিনবেনই বা কী করে! তখন তো তার ভুবনমোহিনী রূপ উধাও। রাতেই তো সে পার্বতীর রজতবালার স্পর্শ পেয়েছিল। তাই সে রাতেই কুমুদিনীর মতো ফুটে ওঠে। রাতেই তার শরীরে মাতালপনা জাগে। সামান্য হাওয়ার ভরেই সে মধুমালতীর মতো গন্ধ ছিটিয়ে ছিটিয়ে নাচতে থাকে।
দিনের আলোয় সেই গাঁয়ের মেয়েকে আর অভিন্ন করে চেনাই যায় না। যতই সে রাজপোশাক পরুক, দামি গয়নাগাটি পরুক, তা তাকে মোটেও মানায় না। রাজা তার দিকে একবার আড়চোখে চেয়েও দেখেন না। মেয়েটি কতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে, রাজা তার দিকে ফিরেও তাকান না। সারাদিন রাজার চোখে তার প্রতি কেবলই বিতৃষ্ণা ঝরে, অন্য সুন্দরীরা তখন রাজার চোখের মণি। পায়ের ঘুঙুর তখন কন্যার খুব ভারী মনে হয়। একা একা সে ওই ঘুঙুরে নাচতেও পারে না। আবার রাতে সেই রাজাই অন্যরকম, গাঁয়ের এই সুন্দরী কন্যাই তখন যেন তার একমাত্র হৃদয়েশ্বরী।
রাজার এই ব্যবহারে কন্যা হতাশ হয়, কন্যার রাগ হয়। রাগে কন্যা অবুঝ হয়। একদিন সকালে রাজার অমনোযোগ পেয়ে সে রেগে রাজার দেওয়া সোনার নূপুর আছড়ে ফ্যালে। আর তাতেই একটা নূপুরের ঘুঙুর ভেঙে যায়।
এই প্রথম রাজা তার দিকে চেয়ে অগ্নিবর্ষণ করেন। এই রাজনূপুরের মর্যাদা যে রক্ষা করতে পারেনি, তাকে হত্যার আদেশ দেওয়া হয়।
গাঁয়ের মেয়ে তখন গাঁয়ের মেয়ের মতো করেই কেঁদে আকুল হয়। যে রাজা রাতের অন্ধকারে তাকে মাথায় করে রাখে, দিনের বেলায় সামান্য বিচ্যুতিতে তাকে তাঁর খুন করতেও বাধে না!
হায় রে, হতভাগ্য গাঁয়ের মেয়ের রাজদুয়ারের মখমল-নরম জীবন! এর থেকে তাদের কুঁড়ে ঘরের পিছনের আলোছায়া মাখা পাহাড়টারও যে কত মায়া।
হায়, সেদিন রাজার সামান্য ইঙ্গিতে সে কেন যে তাঁর শিবিকায় উঠে গিয়েছিল। হায় হায়, কেন সে রাজার মিষ্টি কথায় ভুলেছিল!
গাঁয়ের মেয়ের কান্না দেখে রাজার মায়ের খুব দুঃখ হলো। গাঁয়ের মেয়ে বলে মেয়েটি তাঁর একটু যত্নআত্তি করে। সেই বেচারাকে কি না সোনার ঘুঙুর ভাঙার অপরাধে মরতে হবে।
রাজার মা বললেন, শোন বাছা, রাজার কাছে তুই তিন দিন সময় চা। বল, তিন দিনের মধ্যে যদি সোনার নূপুর গড়ে দিতে না পারি, তবে তুমি আমাকে তোমার পোষা সিংহ দিয়ে খাইয়ো। এই তিন দিন তুমি ঢালাইকরের কাছে যাও। যে করেই হোক তাকে এটা গড়ে দিতে রাজি করাও। তার বাপ বানিয়েছিল এমন ঘুঙুর। শুনেছি ব্যাটার খুব দেমাক। রাজা ছাড়া কারুর আদেশ সে মানে না। কিন্তু তুই যে করেই হোক, তাকে বশ কর।
সেইমতো কন্যা গেল ঢালাইকরের কাছে। অল্প বয়সি ঢালাইকর, কিন্তু মুনিঋষিদের মতো তার লম্বা চুল আর মুখভরা দাড়ি। ওর উঠোনে পা দিতেই সে অনেকক্ষণ ধরে কন্যাকে খুবই তীক্ষèভাবে নিরীক্ষণ করল।
কন্যা ভাবল, আমি আমার সৌন্দর্য দিয়ে একসময় রাজাকে বশ করতে পেরেছি, আর এ তো সামান্য একটা মজুর লোক।
যাই হোক, ঢালাইকর তার সব কথা শুনে এককথায় তাকে বাঁচাতে রাজি হয়ে যায়।
কিন্তু সে বলল, তোমাকে সোনার ঘুঙুর আমি বানিয়ে দেব। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। আগে আমি তোমার মতো দেখতে একটা পুতুল বানাবো। তারপর তোমার ঘুঙুর বানিয়ে দেব।
কন্যা বলল, আমার হাতে যে মাত্র তিন দিন সময়।
ঢালাইকর বলল, ওগো গাঁয়ের মেয়ে, তোমাকে আমি ঠিক বাঁচিয়ে দেব। কিন্তু তুমি চুপ করে খানিক বোস। তোমাকে দেখে, তোমার রাতের রূপ দেখে আমি কেমন ঠিক তোমার মতোই পুতুল তৈরি করি, তুমি রাত জেগে শুধু দেখে যাও।
অগত্যা কন্যা ঢালাইকরের সামনে মডেল হয়ে বসল। ঢালাইকর সেই মূর্তি বানাতে সময় নিল পাক্কা দুরাত। অধৈর্য হয়ে উঠছিল সেই মেয়ে, কিন্তু ঢালাইকরের আত্মনিমগ্নতার সীমা নেই। সে ভোরবেলায় কাজ সম্পূর্ণ শেষ করে তবে উঠল। কন্যা দেখল এ পুতুল ঠিক তার মতোই রাতের পরি, চাঁদের মতো রূপবতী। এর গায়ে যেন বরফ পাহাড়ের রজতআভা পিছলে যাচ্ছে।
গাঁয়ের মেয়ে জিজ্ঞাসা করল, একে নিয়ে তুমি কী করবে ? সে বলল, রাজাকে ঘুষ দেব। নইলে আমরা তো রাজার নির্দেশ ছাড়া যে কারও গয়না বানাতে পারি না। কন্যা বলল, রাজা তো সবসময় আমাকে পছন্দ করতেন না। একেও হয়তো তাই করবেন।
ঢালাইকর বলল, তুমি রাতের বেলার রানি, দেবীর মন্ত্রপূত শরীর তোমার শুধু রাতেই জাগে। এ আমার হাতে তৈরি পুতুল। এর বিকার নেই। এর দিবা নেই, রাত্রিও নেই। এর বয়সের বিবর্তনও নেই। এই বলে পুতুলটি প্রাণ দিয়ে তাকে রাজার কাছে ভেট দিতে নিয়ে গেল ঢালাইকর।
গাঁয়ের মেয়ের খুব মনখারাপ হলো। সে দেখল দিনের আলোতে সর্বসমক্ষে রাজা তাকে নিয়ে পাগল। নিজের পুতুলটিকে সে নিজেই ঈর্ষা করতে লাগল। কিন্তু তার তো মাথার ওপর মৃত্যুদণ্ড। হাজার কান্না, হাজার অভিমানও তাকে টলাবে না। সোনার ঘুঙুর তাকে অক্ষত ফেরত দিতেই হবে। ঢালাইকরকে সে তাড়া লাগাল।
ঘুঙুর গড়তে গড়তে হাসল সেই লোক। কন্যে বলল, তুমি কেন আমার মতো পুতুল গড়ে দিলে রাজাকে ? এরপর কি আর রাজার কোনও দিন আমাকে পছন্দ হবে ?
ঢালাইকর বলল, ধন্য তুমি গাঁয়ের মেয়ে! তুমি কি মানুষ হয়ে বাঁচতে চাও, না পুতুল হয়ে ? দেখ রাজা তোমার প্রাণ নেবেন বলেছেন বলে তুমি কেমন আকুল হয়ে আমার কাছে ছুটে এসেছ। আর ওই পুতুলকে রাজা আজ আদর করবেন, কাল শূলে দেবেন, ওর কিছুতেই কিছু এসে যাবে না। ও দম দেওয়া পুতুল হতে পারবে, কখনও নৃত্যশিল্পী হতে পারবে না। তুমি কোনটা চাও সত্যি বলো।
আমি তোমাকে ওই পুতুলের মতো করে দিতে পারি। তাতেও তোমার মৃত্যু আমি আটকাতে পারব না। কেননা যিনি পুতুল ভালোবাসেন, তাঁর তো একটা পুতুলে চলে না কন্যে। কদিন আর শখ থাকবে! দুদিন পর সেটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দেবে। তখন তাঁর আবার নতুন পুতুলের দরকার পড়বে। তবে তোমাকে গড়েপিটে আমি সত্যিই পুতুল করে দিতে পারি, তুমি কি তাই চাও মেয়ে ?
গাঁয়ের মেয়ে জলভরা চোখে ঘাড় নাড়ল। না গো আমি পুতুল হতে পারব না। এ কোন অভিশাপের মতো আলো লাগল আমার চোখে। আমি তো নিজের গাঁয়ে বেশ ছিলাম। রাজা, রাজবাড়ি, রাজমুকুট, সোনার ঘুঙুর কিছুই চিনতাম না, কিছুই জানতাম না। তুমি যদি পারো, আমাকে তুমি সেই দেশে ফিরিয়ে দাও।
ঢালাইকর বলল, মানুষ তুমি। মানুষেরই পরিবর্তন হয়। দেশ গাঁয়ে গিয়ে কি তুমি আগের মতো আর থাকতে পারবে ?
খুব পারব। তুমি আমাকে সেখানে পাঠিয়ে দাও। এই নিত্যদিনের অপমান আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
ঢালাইকর বলল, ঠিক আছে, আগে আমার তৈরি ঘুঙুর পরে নাচো। তারপর সে দেখা যাবে।
কন্যা বলল, নাচব না আর কোনও দিন।
ঢালাইকর জানাল, না নাচলে, নৃত্যরতার ঘুঙুরের আওয়াজ না শুনলে ঠিকঠাক তার রূপ ফুটবে না যে। এ যে প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রূপগঠন।
সীতার নাচ দেখে আমি মিতার নূপুর তৈরি করতে পারি না। মিতার নূপুর আমি গীতাকে পরাতে পারি না। তাহলেই গোলমাল হবে। রাজা বিচক্ষণ লোক। ঠিক ত্রুটি ধরে ফেলবেন।
মেয়ে বলল, তবে তোমার বাপ কি এভাবেই তৈরি করেছিল এই সহস্র ঘুঙুর দিয়ে তৈরি াাজনর্তকীর সোনার নূপুর।
ঢালাইকর মাথা নিচু করে বলল, সেই রাজনর্তকী যে আমারই মা ছিলেন।
সে কী কথা! গাঁয়ের মেয়ে অবাক হলো নতুন কথা শুনে।
ঢালাইকর বলল, তার নাচ দেখেই আমার বাবা তার ঘুঙুর বানিয়ে দেয় তার পায়ের মাপে। বানাতে বানাতেই তাদের প্রেম ঘন হয়। লুকিয়ে সে দেখা করতে আসত বাবার সঙ্গে। আমার জন্মসম্ভাবনা প্রকট হলে আগের রাজা তাকে শূলে চাপাতে বলেন। আমার বাবা মায়ের মতো একটা পুতুল তৈরি করে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে তাকে শূলে চাপিয়ে আসে। পুতুল মরে। আমার মা বাঁচে।
এরপর ঢালাইকর মা বলে ডাক দিলে এক জরতী এসে তার সামনে দাঁড়ায়। তাকে দেখে কে বলবে, সে একদিন রাজার চোখের মণি ছিল। ঢালাইকর বলে, আমার মা এখন বৃদ্ধ। বারো মাসের মতোই মানুষের শরীরেও বৈশাখও আসে, বসন্ত আসে, আবার পূর্ণ পৌষমাসও আসে। কিন্তু রাজারা চায় সারাজীবন একটা ঋতুকেই ভোগ করতে। তা কি সম্ভব!
আমার বাবা আমার মাকে মুক্ত করেছেন, এবার আমিও তোমাকে করব। তুমি নিজ কর্তব্য স্থির কর।
গাঁয়ের মেয়ে সোনার নূপুর যথাস্থানে জমা দিয়ে ঢালাইকরের সাহায্যে নিজের গাঁয়ে ফিরে গেল। ঢালাইকর খালি খুব নরম হাসি হাসল তার দিকে চেয়ে। কন্যা তা একবার চেয়েও দেখল না। তার মনজুড়ে থাকা রাজাকে বিদায় দেবার আয়োজনে সে তখন ব্যস্ত।
গাঁয়ের মেয়ে গাঁয়ে ফিরে কেবল একটা কথাই ভাবে, রাজা না হয় তাকে ভালোবাসেনি, সে কি সত্যিই রাজাকে বেসেছিল ?
কে জানে! হয়তো। হয়তো নয়।
এখন সে নাচতে নাচতে ভেড়া চড়ায়। ঝরনার হাসিতে হাসি মিলিয়ে নাচে। নাচতে নাচতে ফসল বোনে। এমনকি একটা নাচুনে পাহাড়ি পুরুষকে সে বিয়েও করে ফেলে।
শেষপর্যন্ত একদিন সেই গাঁয়ের মেয়ে রাজাকে ভুলতে পারে। কেবল পার্বতীর রজত বালার রূপ শরীর থেকে মুছে গিয়ে তার চুলে কোথাও কোথাও রুপোলি আলপনা আঁকে।
আর তাতে সেই গাঁয়ের মেয়েকে আরও সুন্দর দেখায়।
কলকাতা থেকে
সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক



