গল্প : সেই শূন্য ঘরটা : মুসা আলি

মর্ণিং-ওয়াকে বের হয়েই ঝাঁকুনি প্রশ্নের মুখোমুখি। আপনি কী এখানে ভাড়ায় এসেছেন ?

ঠিক ধরেছেন।

কোন্ বাড়িতে ?

সিংহবাড়ি।

মানে খগেন্দ্রনাথ সিংহ ? রেলে চাকরি করেন ?

মিত্তিরদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে।

মৃদু হেসে ভদ্রলোকের প্রশ্ন, আপনার প্রফেসন কী ?

শিক্ষকতা।

 কোন্ স্কুলে ?

বালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়।

 সে তো অনেকটা দূর।

রোজ বাইকে যাই, কোনও অসুবিধা হয় না।

কত সময় লাগে ?

চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ স্পিডে গেলে মাত্র মিনিট ত্রিশ।

আবার একটু হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। চাপা স্বরে সূক্ষ্ম মন্তব্য, সময়ের হিসেবটুকু বেশ তো মিলিয়ে দিতে পারলেন। কোন্ সাবজেক্ট-এ শিক্ষকতা ?

বাংলায়।

ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরে মৃদু খলখলে হাসি। মাথা নেড়ে বললেন, চুলের বাহার দেখে আমারও তাই মনে হয়েছে।

চুলের বাহারে বিষয়ের সাক্ষাৎ মেলে ?

তা ঠিক নয় কিন্তু বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হলেই চুলের ছাঁটে, পোষাকের সৌকুমার্যে কিংবা চলন-বলনের শিল্পে অন্য ধরনের মাধুর্য ধরা পড়ে। সেটুকু বোঝাতে চেয়েছি।

বেশ তো ব্যাখ্যা দিতে পারলেন।

তাহলে নিশ্চয় হাসান আজিজুল হকের নাম শুনেছেন।

বিখ্যাত ছোটগল্পকার, বাংলা ছোটগল্পের অর্ধেক আকাশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, অর্ধেক তাঁর।

আপনার মন্তব্যে গর্বিত হলাম।

বাংলা বিষয়ে মাস্টার্স করেছি, সেই সূত্রে হাসান আজিজুল হককে জানতে হয়েছে।

ভদ্রলোকের মুখে রহস্যময় হাসি। মাথা নাড়ছেন তালে তালে। পা চালিয়ে সামনে চলতে চলতে বললেন, মর্নিং-ওয়াকে বের হয়েছি। পাড়ায় এসেছেন যখন আবার দেখা-সাক্ষাৎ হবে। একদিন সময় করে আমার বাড়িতে চা খেতে আসুন। প্লিজ, ফোনে নির্ঘণ্ট আগেই জানাবেন। আমার বাড়িতেই তো হাসান আজিজুল হক থাকেন।

উনি বাংলাদেশের বাসিন্দা।

তাতে কী হলো ?

একই সঙ্গে দুদেশে থাকবেন কী করে ?

আমার বাড়িতে এলে সব বুঝতে পারবেন।

কী রহস্যময় মন্তব্য! কিন্তু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম না। ভদ্রলোক হন হন পায়ে এগিয়ে চললেন। দূরত্বের অনিবার্য ফলশ্রুতি।

আমি দাঁড়িয়ে থ হয়ে ভাবছি। কিছুতেই হিসেব মিলছে না। যিনি বাংলাদেশে থাকেন, তিনি একই সময়ে চাকদহে থাকবেন কী করে ? একেবারে অসম্ভব কথন। নাকি কথার ভিতরে অন্য রহস্য লুকিয়ে রাখলেন ? ইচ্ছা করেই কী তা ভাঙলেন না! প্রসঙ্গের ঝাঁকুনিতে সারা শরীরে অভিনব কম্পন। মর্ণিং-ওয়াক বন্ধ করে বাসায় ফিরে এলাম মানসিকভাবে ধস্ত হতে হতে। শেষে ভাবলুম, আবার দেখা হলে ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলেই সদুত্তর মিলবে।

সবেমাত্র গতকাল বালিয়া থেকে চাকদহে এসে ঘরভাড়া নিয়েছি। নতুন পরিবেশ, নতুন পরিস্থিতি, নতুন মানুষজন। দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার অনুষঙ্গ মাথার ভেতরে লাট খাচ্ছে। বালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র কলেজে পড়ার সূত্রে চাকদহে থাকে। তাদের কেউ কেউ এল দেখা করতে, স্বাগত জানাতে। পরিমল সূত্রধর, ডিগ্রি কোর্সে পড়ে, বলল, স্যার, সাহিত্য লেখার সঙ্গে যুক্ত আছেন তো ?

তাৎক্ষণিক তালে উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পরের দুদিন টানা অনুসন্ধানে জানতে পেরেছি, ওই ভদ্রলোকও আমার মতো শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। নাম সৌমজিৎ চ্যাটার্জি। খুব সাহিত্য অনুরাগী মানুষ। সামাজিক স্তরে বেশ উচ্চাঙ্গের, অতীব সংবেদনশীল।

নতুন মাসের পনেরো তারিখ। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে স্টেশনে যাব বলে ভাবছি। সন্ধ্যের পরে বুক স্টলের পাশে কয়েকজন শিক্ষক রোজ আসেন আড্ডা মারতে। বেশ কিছু সময় মসগুল হয়ে থাকার অপূর্ব ঠেক। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলেছি। এক মিনিট গেলেই স্টেশনে পৌঁছে যাব। পিছন থেকে কে একজন ডাকলেন, শুনছেন দাদা ?

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি, সেই ভদ্রলোক। বললাম, হ্যাঁ বলুন।

আমার বাড়িতে চা খাবার নেমন্তন্নটুকু গ্রহণ করতে পারলেন না ?

তাহলে সামনের সপ্তাহে।

কবে বলুন ?

বৃহস্পতিবার।

কখন ?

সন্ধ্যেয়।

অনেক অভিনন্দন। বলতে বলতে হাঁটার গতিতে দূরত্ব বাড়িয়ে তুললেন।  পেছন থেকে ঢিল ছোড়ার মতো করে বললাম, হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে এভাবে ভুল তথ্য দিতে পারলেন ?

চা খেতে এলে নিজের চোখে সব কিছু দেখতে পাবেন।

গম্ভীর হয়ে স্টেশনে ঢুকতে যাচ্ছি, ভদ্রলোকের বক্রোক্তি ভেসে এল কানে―আমার কথাটুকু পছন্দ হল না বুঝি ?

এত ভুল বলতে কাউকে দেখিনি। হাসান আজিজুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসাবে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁকে নিয়ে এতটাই মিথ্যাচার!

আসলে নিজের অভিজ্ঞতায় সবকিছু বুঝতে পারবেন।

পরের মাসে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা। দেদার কাজের চাপ। প্রশ্ন করা, প্রধানশিক্ষকের পক্ষে সেগুলো প্রেসে দিয়ে আসা, পরপর তিনবার প্রুফ সংশোধন, সবকিছু সম্পন্ন হলে প্রশ্নপত্রগুলো প্রধান শিক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, পরীক্ষার পরে ফল ঘোষণার জন্যে প্রস্তুতিপর্ব সেরে ফেলা।

এতসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে লোকটাকে যে এক দুবার মনে পরেনি―তা নয়, তখনও তাঁর কথার রহস্য ভেদ করতে পারিনি বলেই সমানতালে ঝুলে রয়েছি। মাসাধিক সময় মর্নিং-ওয়াকেও বের হওয়া সম্ভব হয়নি। কর্তব্যের কলকলানির কাছে কঠোর অভ্যাসের নির্মম পরাজয়।

খুব সম্ভব রবিবার, সকাল দশটা। উস্খুসে মন। ফোনে ধরলাম ভদ্রলোককে। সৌমজিৎ চ্যাটার্জি রানাঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। বললাম, হ্যালো শুনছেন ?

মাস্টারমশাই বলছেন ? এতদিন পরে মনে পড়ল ?

বছরের শেষে পরীক্ষার ফল প্রকাশ, সেই সঙ্গে একটু ঘোরাঘুরি। তাই কথা রাখতে পারিনি।

তা বেশ বেশ, নিশ্চয় সবগুলো বেশ উপভোগ করেছেন ?

আগামীকাল বৃহস্পতিবার, সন্ধেয় যাব কী ?

তাহলে আসুন। সন্ধের সময় আমাকেও অনেকটা সময় দিতে হয় হাসান আজিজুল হক-এর জন্যে।

এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন ?

এলেই বুঝতে পারবেন।

ফোন কেটে দিয়ে ভাবছি। একজন স্বনামধন্য যশস্বী লেখক, থাকেন বাংলাদেশে, আদিবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান যবগ্রামে। দেশভাগের পরে পরেই চলে গিয়েছেন ওপারে, তারপর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। তাতেও তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে এভাবে ব্লাকমেল করা চলে ?

অভিনব কৌতূহলে সারা দুপুর মজে রয়েছি। সন্ধ্যের পরে রোজ আমার প্রিয় কথাকারের জন্যে সময় দিতে হয়―রহস্যঘন প্রসঙ্গটা আমাকে বার বার ছুঁয়ে যাচ্ছে। দূরের দুশ্চিন্তায় দুপুরের ঘুম নষ্ট। পড়ন্ত বিকেলে মনের বিরাগ বাড়ছে তালে তালে। এভাবে দ্বিচারিতা করতে চাচ্ছেন কেন ? সৌম্যজিৎবাবুকে আর ভদ্রলোক বলতে ইচ্ছা করছে না, শুধু লোক বললেই বরং মানানসই হতে পারে।

চিন্তার ফাঁক গলে সময় গড়াতে গড়াতে সন্ধ্যের কোলে ঢলে পড়ল। আমি রহস্যভেদের উৎকণ্ঠায় উদ্বেলিত। মাত্র মিনিট পাঁচেকের পথ। একই পাড়ার এপ্রান্ত-সেপ্রান্ত। দেখতে পেয়েই ‘আসুন’ বলে যেভাবে আপ্যায়ণ করলেন, মনে হলো, আমার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন।

বললাম, চলুন, ড্রয়িংরুমে বসি; অনেকটা সময় হাতে নিয়ে এসেছি। কোনও কোনও দিন এমনি আড্ডাবাজি ভালো লাগে।

হাসান আজিজুল হক তো দোতলার পূব কোণের ঘরে থাকেন। এখনও আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না নাকি? শুধু শুধু এদেশ-ওদেশ নিয়ে ভাবছেন কেন ?

তাহলে চলুন, কিন্তু ওইসব অবাস্তব প্রসঙ্গ নিয়ে―।

ভদ্রলোক মুহূর্তে ক্ষেপে উঠলেন। শরীরমনে। তাঁর বিস্তারিত দুচোখ আমার দিকে।

বেফাঁস মন্তব্য করে যে বেশ ভুল করেছি, তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছি। কারুর বিরুদ্ধে এভাবে প্রত্যক্ষ আঘাত করা উচিত নয়। তার পরেও ভদ্রলোককে নিয়ে বিরক্তি বাড়ছে। কেন যে উনি বার বার একই অসম্ভব অবাস্তব প্রসঙ্গ টেনে আনছেন সামনে! সেটাও কী ঠিক ?

ঘরের ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে সৌমজিৎবাবু বললেন, প্লিজ, সামনের ওই চেয়ারটাতে বসবেন না। আমার প্রিয় কথাকার ওই চেয়ারে বসেন।

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে বললাম, দোতলার এত গুরুত্বপূর্ণ ঘরটা এভাবে ফেলে রেখেছেন কেন ?

বললাম তো আমার প্রিয় কথা-সাহিত্যিক এখানে থাকেন।

জ্বলজ্যান্ত মিথ্যে কথা।

প্লিজ শুনুন, বলেই মাথা গোঁজ মেরে বেশ কিছু সময় চুপ করে থাকলেন।

আমার মধ্যে তির্যক প্রসঙ্গ, আবার নতুন কিছু বানিয়ে বলার জন্যে সময় নিচ্ছেন না তো ?

ওই চেয়ারে কেন বসতে নিষেধ করলাম, তা তো জানতে চাইলেন না? সৌমজিৎ চ্যাটার্জীর চকিত প্রশ্ন।

যত সব ভুতুড়ে অবাস্তব ধ্যানধরণা।

প্লিজ, ধৈর্য ধরে শুনুন, তাহলে সবকিছু বুঝতে পারবেন, হিসেবও মিলে যাবে। ১৯৯২ সালে উনি এসেছিলেন চাকদহে। কী দরকারে জানি না। অন্য সূত্রে কথাকার জানতে পেরেছিলেন, আমিও রাজশাহীর লোক, কথাশিল্পীর বর্তমান নিবাস যে গ্রামে, সেখানেই আমাদের বসবাস ছিল। তাই এসেছিলেন গল্পে গল্পে স্মৃতি রোমন্থনের ঢেউ উপভোগ করতে। আমি অনুমতি সাপেক্ষে বললাম, আপনার প্রথম গল্প ‘শকুন’ নিয়ে একটা প্রশ্ন করব কী ?

উনি বললেন, হ্যাঁ বলুন।

বর্ধমান-যবগ্রামে থাকার সময় বিশেষ স্পর্শকাতর বাল্যস্মৃতিকে ‘শকুন’ গল্পে এভাবে প্রয়োগ করলেন কেন ? দেশটা তো আলাদা।

এভাবেই ভাবছেন? উপনিবেশবাদের চরিত্র সব দেশে সমান। তাহলে বাল্যস্মৃতির প্রয়োগ ‘শকুন’ গল্পে হতে বাধা কোথায় ? ভারতে ইংরেজ-উপনিবেশ আর বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানিদের উপনিবেশ আলাদা হল নাকি ? কিংবা একই আদলে বর্ণবিদ্বেষের কারণে আফ্রিকার নেলসন ম্যাণ্ডেলার দীর্ঘ কারাজীবনের কথা ভাবতেই পারেন। সব জায়গায় পেছনের প্রেক্ষাপট একই। সেই উপনিবেশের যন্ত্রণা আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষকে খুব বেশি করে ভোগ করতে হয়। আমি বর্ধমান ছেড়ে দিয়ে রাজশাহীতে গিয়ে আছি। আপনি রাজশাহী থেকে চাকদহে চলে এসেছেন। কিন্তু জন্মভূমির স্মৃতি আমরা কী কেউ ভুলতে পেরেছি ? সেসব অসংজ্ঞায়িত বোধ নির্মাণের  ভেতর দিয়ে মানুষের কান্নাহাসির যে শিল্প গড়ে ওঠে, যন্ত্রণা যে রক্তক্ষরণ বইয়ে দেয়, তার নাম তো আখ্যান। সেই তাড়না জীবনে প্রবাল প্রতাপ হয়ে উঠতে পেরেছে বলেই তো উপনিবেশবাদের কুফল তীব্রভাবে অনুভব করতে পেরেছি। আসলে জন্মভূমির বাল্যস্মৃতি কিছুতেই পিছু ছাড়তে চায় না। আমার অনেক ছোটগল্পে সেই বোধের জগৎকে ভীষণ জাগ্রত করে তোলা সম্ভব হয়েছে। পাঠক পড়ে গল্পের চেয়ে খুব বেশি করে সেই ধস্ত বোধের মুখোমুখি হতে চায়।

কথাকার একটু থেমে একঝলক কী ভেবে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরুন না। এ তো শুধু যুদ্ধ নয়, অন্তর্গত চাপ ও তাপের, ভেতরকার গভীর রক্তক্ষরণের। সেই সব বিপর্যস্ত জীবনের অনুধ্যান, প্রত্যয় আর প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমি যে বিশুদ্ধ শিল্পজগৎ তৈরি করেছি, সেগুলোর বিকাশ সম্ভব হয়ে উঠেছে আমার ছোটগল্পে। এসব কাহিনির ভেতরকার যন্ত্রণায় নির্দিষ্ট কোনও দেশ নেই। আপনি ফেলে আসা রাজশাহীর জন্য যে যাপিত ভাবনায় বার বার কম্পিত হয়ে ওঠেন, সেটাই দেশে দেশে, যুগে যুগে সময়োত্তীর্ণ কোটি কোটি মানুষের ভেতরকার রক্তক্ষরণ। সেই অর্থে আমার আবিষ্কৃত শকুন বা ছেলের দল কোনও নির্দিষ্ট দেশের নয়, সময়ের নয়, বরং অন্তহীন সময়ের বুক বেয়ে সারা দুনিয়ায় তাদের বিস্তার, অঘোষিত অবাধ বিচরণ। এ কঠোর বাস্তব সত্যের কথা ভেবে নানা দেশের মানুষ শকুনকে চিনতে চায়, উপলব্ধি করে, প্রতিরোধের পথ নিয়ে ভাবতে পারে, ভেতরকার রক্তক্ষরণের তাৎপর্য বুঝে নিতে সমর্থ হয়।

আরেকটা প্রসঙ্গ আপনাকে জানাতে খুব ইচ্ছা করছে।

বলুন বলুন।

পৃথিবীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শকুন ধরার ছেলের সংখ্যা কতটা বেড়েছে, সেই হিসেব আজও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু তা যে জীবনভাবনার গভীর খোরাক হয়ে মানুষের মধ্যে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায়, সেই সত্য মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছি। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর অনন্ত অভিযাত্রা।

বললাম, মানুষের জীবনে স্মৃতির তাৎপর্য নিয়ে আরও কিছু বলবেন নাকি ?

স্মৃতিকে নিশ্চয় চেতনার  পেছনে নেওয়া যায় না। আবার শুধুমাত্র চেতনাতেও স্মৃতি থাকে না, যদিও তা থাকে— আলো―অন্ধকারেই ডুবে থাকে। আসলে আত্মচেতনা থেকে স্মৃতির শুরু। জন্মের পর থেকে যে চেতনা থাকে তা গূঢ় রহস্যময় কিন্তু স্মৃতি থাকে না। চেতনা―আত্মচেতনার মাঝখানে যে সান্ধ্য জায়গাটায় অনেকবার ফিরে যেতে চেয়েছি, তা যেন শুধু চাঁদের আলোয় নয়, স্বপ্নের চাঁদের আলো। কথাকার হিসেবে তখন কোনও কিছুই ঠাহর করতে পারিনি। কেমন যেন গোলমেলে অবস্থান। বস্তু বস্তুর চেতনা ত্যাগ করে, ভয়মূর্ত চেহারায় সামনে এসে দাঁড়ায়। কল্পনা তখন বস্তু হয়ে ওঠে।

শুনতে শুনতে নিজের কিশোরস্মৃতিতে ভেসেছি। রাজশাহীর যে ফুলতলা গ্রাম ছেড়ে আমরা চলে এসেছি, সেই গ্রামে হাসান আজিজুল হক বসবাস করেন। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাড়ি থেকে দুমিনিট পুবে আমাদের চ্যাটার্জি-বিল্ডিং ছিল, তা কী এখন আছে ?

ওটা তো আপনারা বিক্রি করে এসেছেন। যাঁরা কিনেছেন, সংস্কার করে অন্য নাম দিয়েছেন।

পাশের দু’বিঘে পুকুর ?

আজও আসতে যেতে ওখানে থমকে দাঁড়াই। পুকুরের চারপাশ ঠিক আগের মতো সাজান  গোছান। কৃষ্ণচূড়া গাছটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। গ্রীষ্মের শুরুতে লাল ফুলের বাহারে ভীষণ মুগ্ধ হই।

আমার হাতেই পোতা ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটা। বড় করে তুলতে খুব যত্ন নিয়েছিলাম। সকালে-বিকালে গোড়াতে জল দিয়েছি। সপ্তাহে একদিন সার দিয়েছি, জৈব আর রাসায়নিক সার মিশিয়ে। মা বকে দিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ  রে, গাছটা নিয়ে এভাবে পড়ে থাকছিস কেন ?

প্রত্যুত্তর-হাসিতে গাছটার প্রতি আমার ভেতরের প্রকট ভালোবাসা দমকা হাওয়ার মতো প্রকাশ পেয়েছিল। যতদিন না মাধ্যমিক পাশ করেছি, রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পরে ছিপে মাছ ধরতে বসেছি পুকুর পাড়ে বসে। রহিমকাকু এসে চুপি চুপি আমার পাশে বসে পড়েছেন। উনি কী এখন বেঁচে আছেন ?

গতবছর আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

চলে গিয়েছেন ? থ হয়ে ভাবছি। পুরনো স্মৃতির ভেতরে ঢুকে আঁতিপাতি করে খুঁজছি রহিমকাকুকে। ছিপে মাছ ধরার সময় পাশে বসে একমনে ফাত্নার দিকে চোখ রেখে বলে যেতেন, তোর মাছ ধরা আর আমার মাছধরা দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে রে।

কী রকম ?

তুই মাছ ধরছিস নিজের রসনাতৃপ্তির জন্যে, আমি মাছ ধরা দেখছি ভিতরের শিল্পবোধের তেষ্টা মেটাতে। রাজশাহী কলেজে পড়াশোনা করেছি, কলেজ-বিল্ডিংটা কী এখন আগের মতোই আছে ?

তা থাকে নাকি ? ছাত্রছাত্রী বেড়েছে। তাদের জায়গা করে দিতে কলেজের কলেবর অনেকখানি বেড়ে গেছে। নতুন বিল্ডিংগুলোতে আধুনিক শিল্পের ছোঁয়ার ছড়াছড়ি। আসলে স্থাপত্য শিল্পের সমুন্নতি।

ভিতরে ভিতরে ভীষণ কম্পিত হচ্ছি। বছর পঁচিশ বয়সে রাজশাহীর ফুলতলা ছেড়ে চাকদহে চলে এসেছি। কিন্তু ফেলে আসা বাল্য-কৈশোরের স্মৃতিগুলো আজও ভুলতে পারিনি।

এই প্রসঙ্গে আপনাকে জীবনের দ্বিতীয় উপনিবেশের গুরুত্বকে মনে করিয়ে দিই। এসব কিছুতেই ভোলা যায় না, কিন্তু তা একান্তই ব্যক্তিগত। যতদিন বাঁচি, ততদিন তা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। আমি কী বর্ধমান-যবগ্রামের স্মৃতি আজও ভুলতে পেরেছি ? পারা কী সম্ভব ? একা থাকলে ভিতরে নানা প্রশ্ন জেগে ওঠে। কেন যে এভাবে দেশটা ভাগ হল ? আমরা এপারে-ওপারে ভাগ হয়ে গেলাম। একদিকে বৃহত্তম উপনিবেশের কুকার্যকারিতায় রোজ রোজ ধস্ত হচ্ছি, ব্যক্তিগত জীবনের উপনিবেশকেও কিছুতেই ভুলতে পারছিনে। এই তো আমাদের নিত্যকার মানস-প্রবাহ। দীর্ঘ পরিক্রমার এইসব ফলশ্রুতি নিয়েই আমার গল্প লেখা। চেষ্টা করেছি মানুষের বিড়ম্বিত জীবনচেতনাকে মূর্ত করে তুলতে। তাতেই দেশভাগের তীব্র যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের কথাটা একবার স্মরণ করুন। জীবনযন্ত্রণার সেই করুন চিত্রটুকু নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবুন। বুড়োবাবার আত্মগ্লানিকে বহন করে আত্মবলিদানকারী আত্মজার সেই হাহাকার আজও যেন দুদেশের কাঁটাতারের উপর আছড়ে পড়ছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে দেশভাগের যন্ত্রণা আর উন্মূল উদ্বাস্তুতার কদর্যতাকে। তারপরেও একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে, দেশভাগের পরে বাঙালিত্বের অখণ্ডতা অটুট থেকে গেছে।

কোনও বিশেষ গল্পে সেকথা কী প্রকাশ পেয়েছে ?

‘সারা দুপুর’ গল্পে সেকথাই বলতে চেয়েছি। হরীতকী গাছ একপাশে। শিরীষগাছ আর একপাশে। ঝমঝম করে আওয়াজ হচ্ছে। মনে হত যেন সবই আমার লেখার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে গেলেই দারিদ্র্য, দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা, লোকজনের বদমায়েশি, সাম্প্রদায়িকতা! মানবিক জগৎটা অসম্ভব বিচ্ছিরি, প্রকৃতি জগৎটা খুব সুন্দর। কিন্তু প্রকৃতি জগৎটা অচেতন আর এই মানবিক জগৎটা চেতন। সেজন্যে ওই বিচ্ছিরির মধ্যেও ওইটার মূল আকর্ষণের জায়গা। মানবিক জায়গাটাকে মূল আকর্ষণের জায়াগ করে তোলে। ভীষণ মিক্সড।

(খ)

সময়ের টানে পেশার প্রয়োজনে বালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ছেড়ে চলে এসেছি। তারপর প্রতিদিনকার জীবনে প্রধান শিক্ষকের কঠিন দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি। তাতেই চাকদহে থাকার স্মৃতি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

মানুষ বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে চায়। তাৎক্ষণিক ভালোবাসার চমক। তাতেই বাইশটা বছর সময়ের ক্ষতে শেষ হয়ে গেছে। ২০২১, নভেম্বর ১৫, টিভিতে হাসান আজিজুল হক-এর মৃত্যু সংবাদ শুনে ভীষণ কম্পিত না হয়ে পারিনি। তাতেই পুরনো স্মৃতির পসরা আবার আমার ভেতরকার সারা ইজেল জুড়ে। মনে পড়ছে সৌমজিৎবাবুর কথা। এখনও কী বেঁচে আছেন ভদ্রলোক ? আমার সমবয়সি। আমি এখন সাতষট্টি। বেশ তো সুস্থ আছি। ভদ্রলোকের পক্ষে তা সম্ভব নয় কেন ?

পরের দিন সকালে বের হয়ে পড়লাম চাকদহের উদ্দেশে। জয়নগর থেকে শিয়ালদহ, তারপর নর্থ সেকশনে ট্রেন ধরে চাকদহ। নেমেই পথ হাঁটছি। আমার পুলকিত দুচোখ চারদিকে পাল্টে যাওয়া পরিবেশের দিকে। কত সব চোখধাঁধানো বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। আশু প্রয়োজনের সঙ্গে মানুষের শিল্পসত্তার অপূর্ব মিলন। স্টেশন সংলগ্ন লালপুর গ্রামের শেষপ্রান্তে সৌমজিৎ চ্যাটার্জির বাড়ি। হেঁটে গেলে মাত্র মিনিট দশেকের রাস্তা।

হাতঘড়িতে নটা বেজে পনেরো মিনিট। দূর থেকে দেখলাম, সৌমজিৎবাবু সাদা চুল আর কুঁজো শরীর নিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই উৎফুল্ল হয়ে সেই পুরনো বুলি প্রকাশ করে বললেন, জানেন কী, সেই শূন্য ঘরটা এখন পূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমার স্তম্ভিত দুচোখ সৌমজিৎ চ্যাটার্জির দিকে। মনে মনে ভাবছি, ভধষংব ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু-র মাস্টার।

বড়ছেলেকে উদ্দেশ্য করে ডাকতে শুরু করলেন, অ্যাই ভোম্বল শুনছিস ? আমাকে ধরে দোতলার পুব কোণের ঘরটাতে একটু পৌঁছে দিবি ? ভদ্রলোক এসেছেন আমার প্রিয় কথাকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

ভোম্বল এসে ধরাধরি করে সৌমজিৎবাবুকে সিঁড়িপথে উপরে তুলতে লাগল। আমি সঙ্গে রয়েছি।

ঘরের ভিতরে ঢুকেই দেখলাম, সেই শূন্য চেয়ারে তখন হাসান আজিজুল হকের মস্ত বড়ো ছবি। প্রায় তিনফুট উচ্চতার। দক্ষিণের দেওয়াল ঘেঁষে নতুন আলমারি। ভিতরের তাকে কেবল হাসান আজিজুল হকের বই। তাঁকে নিয়ে যেসব গবেষণাগ্রন্থ বের হয়েছে, সেগুলোও সংগ্রহ করে রেখেছেন।

বললাম, তারপর কেমন আছেন বলুন ?

মুখ ঘুরিয়ে সৌমজিৎবাবুর প্রশ্ন, এখনও এই ঘরটাকে শূন্য বলে ভাবছেন নাকি ?

ভীষণ রসঘন রহস্যময় প্রসঙ্গ। আমার থমথমে দুচোখ বয়োবৃদ্ধ সৌমজিৎ চ্যাটার্জীর দিকে।

মনে রাখবেন, গতকাল থেকে হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎ নতুন অবস্থান শুরু হয়েছে আমার এই ঘরটাতে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ, আমি রাজশাহী থেকে চাকদহে, প্রিয় কথাকার বর্ধমান থেকে রাজশাহীতে কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি, উপনিবেশবাদের চিন্তা, সেসবের চিরন্তন ভাবদ্যোতনা।

স্তম্ভিত হয়ে ভাবছি কিন্তু দর্শনসূত্র মিলছে না।

ভদ্রলোক হঠাৎ চীৎকার করে উঠলেন, নিটোল বাঙালিত্ব রক্ষার্থে সীমান্তের ওই কাঁটাতারের বেড়া মানি না আমি। হাসান আজিজুল হক এ ঘরে ছিলেন, চিরকাল থাকবেন, এপার-ওপারের মননসিক্ত ঘরে ঘরে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares