নষ্ট জমি : টি. এস. এলিয়ট (রচনা ১৯২২) : অনুবাদ : মুহম্মদ নূরুল হুদা

প্রচ্ছদ রচনা : শতবর্ষে অন্য আলোয় বিদ্রোহী কবিতা

১. মুর্দার দাফন

এপ্রিল নির্মমতম মাস, জন্ম দিয়ে

লাইলাক মৃত জমি থেকে, মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে

স্মৃতি ও বাসনা, নাড়া দিয়ে

বাসন্তী বৃষ্টির সঙ্গে বিশুষ্ক শেকড়।

শীত উষ্ণ রেখেছিল আমাদের,  ঢেকে দিয়ে

এ পৃথিবী বিস্মরণপ্রবণ তুষারে, মুখে দিয়ে

শুকনো কন্দের সঙ্গে সামান্য জীবন।

গ্রীষ্ম তো চমকে দিলো আমাদের, এক পশলা বর্ষণ নিয়ে

সে এলো স্টার্নবার্গারসিতে; আমরা গিয়েছি থেমে থামের আড়ালে,

আর রোদ্দুরে গিয়েছি হেঁটে হফটগার্টেনে, দিয়েছি চুমুক

কফি পেয়ালায়, অতঃপর টানা এক ঘণ্টা ধরে করেছি আলাপ।

রুশ নই, ফিরেছি লিথুয়ানিয়া থেকে, আমি এক নিখাদ জার্মান।

শৈশবে যখন থাকতাম আমি আমাদের মামাত দাদার রাজবাড়ি,

স্লেডে করে দাদা আমাকে বেড়াতে নিত যখন কোথাও,

পেতাম ভীষণ ভয়। বলতো সে, হাত ধরো মারি,

আমার হাতটা ধরো খুব শক্ত করে, মারি।

তারপর নিচে নেমে গেছি আমরা দুজন।

পর্বতে চড়েই মনে হলো, কী ভীষণ প্রমুক্ত স্বাধীন আমি!

রাতের বেশির ভাগ শুধু পড়ি, আর শীত এলে চলে যাই দক্ষিণের দিকে।

কেমন শেকড় ওরা ফুঁড়ে ওঠে মাটি, কী এমন শাখা ওরা

পাথুরে জঞ্জাল থেকে জন্ম নেয় শুধু ? হে মানবপুত্র শোনো,

তোমার বলার নাই, অথবা আন্দাজ নাই, তুমিতো চিনেছো শুধু

স্তূপাকার ভগ্নচিত্র, যেখানে দাপায় সূর্য,

আর মৃত তরু দেয় না আশ্রয়, ঝিঁঝিরাও দেয় না বিরাম,

আর বিশুষ্ক পাথরেরও নেই জলস্বর। এখানে রয়েছে শুধু

লাল পাথরের নিচে সুশীতল ছায়া

(এসো এই লাল পাথরের নিচে, শীতল ছায়ায়),

অতঃপর তোমাকে দেখাবো আমি ভিন্ন কিছু, এ তো নয় শুধু

সেই ছায়া যা তোমার পিছু হাঁটে খুব ভোর থেকে, কিংবা নয়

বিকেলের সেই ছায়া, যেই ছায়া মিশে যায় তোমার শরীরে;

তোমাকে দেখাবো আমি ভয়-ভীতি একমুঠো ধুলোর ভিতরে। 

পবন বইছে তাজা

খুঁজে নিজ দেশমাটি,

বিদেশি পরাণ ওগো

কোথায় রয়েছো খাঁটি ?

‘তুমি দিয়েছিলে কুবলয় একটি বছর আগে;

আমাকে ডাকতো তারা কুবলয়বালা।’

তবু যখন এলাম ফিরে কুবলয় বাগান থেকে, যদিও বিলম্বে,

তোমার সুডৌল বাহু, সিক্ত চুল, আমার মুখেও কোনো কথা নেই,

দৃষ্টিব্যর্থ আমার দুচোখ, যেন আমি মৃত নই জীবিতও নই,

যেন আমি জানিনি কিছুই, যদিও দেখেছি আমি

আলো আর নৈশব্দ্যের গভীর অন্তরে।

ইতস্ততভ্রষ্টত্রস্তবিনষ্টপাথার

মাদাম সসোসত্রিস খ্যাতনাম্নী গণনাকারিনী,

সর্দিতে ভীষণ কাবু, তবু

খ্যাতি তার সবচেয়ে বিদগ্ধ রমণী রূপে ইউরোপ-জোড়া,

হাতে তার যদিও রয়েছে ধরা অশুভ তাসের তোড়া।

বলল সে, এই তাস তোমার তাস, তুমি ফিনিশীয় ডুবন্ত নাবিক,

(দেখ, তার সব চোখ এ-মুহূর্তে মুক্তো হয়ে গেছে)।

আর এখানে রয়েছে বেলেডোনা, পাথররমণী,

সব পরিস্থিতি সামলাতে পারঙ্গম যিনি।

আর এখানে রয়েছে সেই ত্রিভঙ্গ মানুষ, এইখানে চাকা,

আর এখানে রয়েছে সেই একচোখা ব্যবসায়ী, তাস তার ফাঁকা,

পিঠে তার কি-কি বোঝা, হায়, আমার দেখতে মানা।

আমি তো পাই না খুঁজে ফাঁসিতে ঝুলন্ত সেই লোকটাকে।

জলে তার মৃত্যুভয়, দেখি তবু মানুষের ঢল,

বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আসে যায় মানবসকল।

শুকরিয়া, ধন্যবাদ। যদি তুমি দেখে থাকো মিসেস ইকুইটোন,

তাকে বলো নিজেই আনব আমি ঠিকুজিটা :

হুঁশিয়ার, আজকাল সকলেরই হুঁশিয়ার থাকার দরকার।

শীতসকালের বাদামি কুয়াশামোড়া

অলীক নগর,

লন্ডন ব্রিজের বুকে বয়ে চলে অগণন জনতার ত্রাস,

কখনও ভাবিনি আমি মৃত্যু এসে করে গেছে এত সর্বনাশ।

থেমে থেমে পড়ে শুধু ক্ষুদে ক্ষুদে শ্বাস,

আর প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টি বিদ্ধ করে তার পদযুগ।

পাহাড়ে চড়লো স্রোত, তারপর নেমে এলো কিং উইলিয়াম স্ট্রিটে,

যেথা সাধ্বী মেরী উলনথ সময় রেখেছে ধরে

ন’টার চূড়ান্ত শব্দে, মৃত এক ঘন্টার ধ্বনিতে।

সেখানে পেলাম যাকে, তাকে থামালাম এক ডাকে, ‘স্টেটসন!

‘তুমি তো আমার সঙ্গে ছিলে মিলায়, জাহাজে!

‘যে মুর্দা রুয়েছো তুমি গেল-বর্ষে তোমার বাগানে,

‘আবার উঠছে সেকি ফুলে-ফেঁপে ? এ-বছর মঞ্জরিত হচ্ছে কি সে?

‘নাকি হঠাৎ তুষার-ঘায়ে তছনছ তার শয্যা-সুখ ?

‘ওহে, খেদাও কুত্তাকে,  যদিও সে মানুষের পরম সুহৃদ,

‘তা নাহলে ধারালো নখের ঘায়ে পুনর্বার খুঁড়ে ফেলবে গোর!

‘কপট পাঠক তুমি! —আমার দোসর তুমি, —আমার যমজ!’

২. দাবার চাল

ঝলমলে যে সিংহাসনে বসে আছে নারী, মর্মর মেঝের ’পরে,

যেখানে রয়েছে ধরা শোভন দর্পণ,

যাতে রাখা দ্রাক্ষাফলমূল, যার মধ্য থেকে

উঁকি দিচ্ছে কিউপিড-সম এক সোনালি বালক

(অন্যজন ডানার আড়ালে তার লুকিয়েছে চোখ),

দর্পণে দ্বিগুণ হয়ে ঝ’লে উঠে সপ্তশাখাময় ঝাড়বাতি শিখা

টেবিলে বিম্বিত হয়ে যেন মিশে যায়

তার সব গহনার উজ্জ্বল দ্যুতিতে

সাটিনের কেস থেকে ঝরে পড়ে সুপ্রচুর ঐশ^র্যসম্ভার।

হাতির দাঁতের শিশি নানারঙা, ছিপিখোলা সব,

অচেনা অবাক-করা সুগন্ধিরা আছে ওঁৎ পেতে;

মলম, তরলমিশ্র, চূর্ণীকৃত—চেতনায় সুবাসিত,

ক্রমান্বয়ে উঠে গেছে ঊর্ধলোকে; বায়ু সঞ্চরণে

সতেজ হয়েছে তারা জানালায়, প্রলম্বিত মোমশিখা

সেঁটে গেছে ্উঠে যেতে যেতে,

ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে ল্যাকুয়ারিয়ায়,

কারুকার্যময় সিলিঙকে নাড়া দিয়ে যায়।

তামায় শোভিত বিশাল সমুদ্র-কাঠ

ধরেছে সবুজ কমলার আভা পাথুরে রঙিন ফ্রেমে,

বিষণ্ন আলোতে যার সাঁতরায় খোদিত শুশুক।

পুরনো ধাঁচের এক ম্যান্টেলের পরে প্রদর্শিত

যেন এক অবাক জানালা, যাতে যায় দেখা

আরণ্যক দৃশ্যাবলি, ফিলোমের বিবর্তিত বর্বর রাজার

ক্ষমতা প্রয়োগে; তবু বুলবুলি ভরেছে সেখানে

মরুভূমি জুড়ে তার স্বরে-সুরে কলকাকলিতে,

আর ক্রন্দনে ক্রন্দনে, তবু তার পিছে পিছে যায়

এখনও পৃথিবী,  কলকণ্ঠ ধ্বনি তুলে কর্ণের কুহরে।

আর কালের ক্ষয়িত মুড়া হতশ্রী স্বভাবে

পড়ে আছে দেয়ালের গায়ে; আকৃতিরা পলকবিহীন

ঝুঁকেছে হেলান দিয়ে, স্তব্ধতায়  রুদ্ধ কক্ষ সব।

পদধ্বনি শোনা যায় সিঁড়িতে, সোপানে।

অগ্নির প্রভার নিচে, চিরুনির তলে

রমণী কুন্তলগুলো আলুথালু উজ্জ্বল দ্যুতিতে

আর শব্দের বিভায়, অনন্তর স্তব্ধ হয় বর্বরতায়।

‘আজ রাতে স্নায়ুরা দুর্বল খুব। ভীষণ দুর্বল। আমার সাথেই থাকো।

‘কথা বলো। কখনও বলো না কেন কথা। কথা বলো।

‘এত সব কি ভাবছো তুমি?  ভাবছো কী সব ?

বলো ?’ ‘আমি তো জানি না তুমি ভাবছো কী সব ? ভাবো।’

মনে হয় আমরা সবাই আছি ইঁদুর-গলিতে

যেখানে মৃতেরা আজ হারিয়েছে হাড়গোড় সব।

‘কিসের গোলমাল ওটা ?’

‘দরোজার নিচে বাতাস বা ঝড়।

‘কিসের গোলমাল এখন ? কি করছে বাতাস বা ঝড় ?’

না, কিছু না, আসলে কিছুই না।

‘তুমি কি জানো না কিছু ? তুমি কি দেখো না কিছু ? তুমি কি

স্মরণ করো না তবে কোনো কিছু ?’

মনে পড়ে, আমার তো মনে পড়ে,

তার চোখগুলো সব মুক্তো হয়ে গেছে।

‘তুমি কি জীবিত, নাকি মৃত ? তোমার মাথায় তবে কোনো কিছু নাই ?’

বটে

ও ও ও ও ওটা বটে শেক্সপিরিয় এক রঙ্গের তামাসা

কী যে অপূর্ব ওটা, কী যে খাসা

“এখন কী করবো আমি ? এখন কী করবো, বলো ?”

“আমি তো আমার মতো ছুটে যাবো, হেঁটে যাবো রাস্তায় রাস্তায়

খোলা চুল দুলে উঠবে ওপরে বা নিচে। আমরা কী করবো কাল ?

অতঃপর কী কী সব আমরা করবো তাহলে ?”

দশটায় গরম জল।

যদি বৃষ্টি হয়, তবে চারটায় রুদ্ধ গাড়ি এক।

তারপর আমরা খেলবো এসে দাবা একদান;

পলকবিহীন চোখে আমরা অপেক্ষারত, দরোজায় টোকা।

যখন লিলের বর চাকুরি চুকিয়ে এলো, আমি বললাম,

বললাম রাখঢাক কিছু না করেই,—ওকেই বলেছি সোজা, শোন,

জলদি করো জলদি করো, এই তো সময়

আবার আসছে ফিরে অ্যালবার্ট, নিজেকে গুছিয়ে নাও, চৌকশ হও।

সে কিন্তু জানতে চাইবে কি করেছো তুমি সেই অর্থ দিয়ে যা সে তোমাকে দিয়েছে

তোমার দাঁতের জন্যে। আমার সামনেই তো দিয়েছিলো সেই টাকা।

বলল, সেই টাকা গুনে গুনে বের করো, কিনে নাও একটা নতুন সেট।

তাইতো সে বলেছিলো, দিব্যি বলছি,  তোমার মুখের দিকে যায় না তাকানো।

তাকাতে পারি না আর আমিও; বলি, বেচারা অ্যালবার্টের কথা ভাবো একবার,

চার বছরের মতো ছিল সামরিক বাহিনীতে;  এখন তো চায় কিছু আরাম-আয়েশ;

তুমি যদি না দিতে পারো, অন্য কেউ অবশ্যই দেবে; বলে রাখছি আমিও স্বয়ং।

তা বলেছো বটে, বললো সে। আমি বললাম, তা নয় তো আর কি!

আমার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, দেখবে ধন্যবাদ কাকে জানাতে হবে।

বললাম, কেমন বুড়িয়ে গেছো—তোমার তো লজ্জিত হতে হয়

(অথচ বয়স তার মাত্র একত্রিশ!)

মুখ বাঁকাতে বাঁকাতে বললো সে, কী আর করার আছে আমার!

গর্ভপাতে যে বড়ি নিয়েছি, সেগুলোই তো এর জন্যে দায়ী!

(এ পর্যন্ত পাঁচ-পাঁচবার—জর্জ হতে গিয়ে তো প্রায় মরতেই বসেছিল।)

কেমিস্ট বলেছিল, সব ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু আমি তো ফিরে পেলাম না আমাকে।

তুমি একটা আস্ত বোকা—আমি বললাম।

অবশ্য অ্যালবার্ট যদি রেহাই না দেয়, তোমারই বা কী করার আছে!

ছেলেমেয়েই যদি না চাইবে, তাহলে বিয়েতে বসা কেন ?

জলদি করো জলদি করো, এই তো সময়

সেই রোববার ঘরে ছিল অ্যালবার্ট, নিয়েছিল গরম গ্যামন,

আমাকেও ডেকেছিল নৈশভোজে, তার উষ্ণ স্বাদ নিতে—

জলদি করো জলদি করো, এই তো সময়

শুভরাত বিল। শুভরাত লু। শুভরাত মে। শুভরাত।

বিদায়, বিদায়। শুভরাত, শুভরাত।

বিদায়  ভদ্রমহিলাগণ, বিদায় হে মিষ্টি মেয়েরা, শুভরাত, শুভরাত।

৩. অগ্নিকথন

ভেঙে গেছে নদীর শিবির; পাতাদের শেষ আঙুলেরা

আকড়ে থেকে ডুবে যায় ভেজা নদীপাড়ে;  সমীরণ

বয়ে যায় বাদামি জমির পরে, সহজে যায় না শোনা; অপ্সরীরা চলে গেছে সব।

ধীরে বয়ে যাও রূপসী টেমস নদী, যতক্ষণ থামে না আমার গান।

নদীতে ভাসে না কোনো খালি শূন্য শিশি, স্যান্ডউইচ পেপার, 

রেশমি রুমাল, কার্ডবোর্ড বাক্স, সিগ্রেটের পোড়া টুকরা, অথবা

গ্রীষ্মের রাত্রির অন্য সব সাক্ষী ও প্রমাণ। অপ্সরীরা চলে গেছে সব।

চলে গেছে তাদের বন্ধুরা সব, নগরীর নেতাদের ভাসমান

উত্তরাধিকারীগণ, ঠিকানাবিহীন তারা, অন্তর্হিত দেখি সকলেই।

বসে আছি লেমানের জলধারে, অবিরত অশ্রুপাত করি… 

ধীরে বয়ে যাও রূপসী টেমস নদী, যতক্ষণ থামে না আমার গান

ধীরে বয়ে যাও রূপসী টেমস নদী, জোরে জোরে দীর্ঘক্ষণ বলি না তো কথা।

অথচ আমার পিঠে ঠাণ্ডার ঝাপট আমি শুনি, অসহায়

হাড়ের গোঙানি শুনি, চাপাহাসি কানাকানি কেবল ছড়ায়।

একটি ইঁদুর দৌড়ে যায় বুকে ছেঁচড়ে গাছগাছালির ভেতর,

তার নধর উদর টেনে টেনে নদীতীরে ঘাটে,

যখন ধরছি মাছ আমি এক নোংরা খালের ভেতর,

তখন শীতের সন্ধ্যা গ্যাসহাউসের পেছনটায়,

রাজার ওপর নিয়ে একহাত আমার ভায়ের ভরাডুবির কারণে,

আর তারও আগে পিতার মৃত্যুর জন্য সেই রাজাকেই।

স্যাঁতসেতে নিচু মাটির ওপর সারি সরি শাদা উলঙ্গ শরীর

আর নিচের শুকনো চিলেকোঠায় হাড়গোড় রাখা,

তাদের ওপর দিয়ে শুধু ইঁদুরের পায়ের ঘসটানি, বছর বছর।

কিন্তু মাঝে মাঝে আমার পেছনে আমি শুনি স্বর

ভেঁপু আর মটরের, যেই ধ্বনিগুলো বসন্ত এলেই সুইনিকে

আনবে ডেকে মিসেস পোর্টারের কাছে, ঠিক মধুমাসে।

মিসেস পোর্টার আর তার কন্যার চাঁদ এসে জোছনা ঝরালো

যখন দুজনে ওরা তাদের পাগুলো ধুয়ে নিলো সোডা জলে

আহা! গম্বুজের ওপর তখন সুরেলা গলার গান ওই বাচ্চাদের!

টুইট টুইট টুইট

জাগ জাগ জাগ জাগ জাগ জাগ

এমন কর্কশভাবে বশীভূত!

তেরিউ

অলীক নগর

বাদামি কুয়াশায় ঢাকা শীতের দুপুর

মি. ইউগেনিডিস, স্মাার্নার বণিক,

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পকেটে রসালো ফল,

সি.আই.এফ লন্ডন: গুছিয়ে তাবৎ দলিলাদি

আমাকে দিলেন নিমন্ত্রণ গেঁয়ো ফরাসিতে

ক্যানন স্ট্রিট হোটেলে মধ্যাহ্নভোজের জন্য;

তৎসহ সপ্তাহশেষের ছুটি মেট্রোপেলে।

এই বেগুনি প্রহরে যবে চোখ আর পিঠ

টেনে তুলে নিতে হয় ডেস্ক থেকে, যখন মনুষ্য-ইঞ্জিনগুলো

কম্পমান ট্যাক্সি হয়ে বেজায় অপেক্ষমাণ,

আমি টাইরেসিয়াস, যদিও অন্ধ, ঝুলে আছি দুই জীবনের মধ্যে,

নারীর কুঞ্চিত স্তনধারী এক বুড়ো, আমিও দেখতে পাই

এই বেগুনি প্রহরে, সেই গৃহমুখী সান্ধ্যক্ষণ, আর

সাগরের বুক থেকে টেনে আনে নাবিককে গৃহে

চায়ের প্রহরে, যখন বাসায় থাকে মেয়েটি মুদ্রাক্ষরিক;

প্রাতঃরাশ সেরে সে তো চুল্লিটা জ¦ালায়,

তারপর টিনভর্তি খাদ্যগুলো খুলে বের করে।

অস্তায়মান সূর্যেও শেষরশ্মির পরশ মেখে

জানালার বাইরে ঝুলছে তার শুষ্কপ্রায় অন্তর্বাস,

ডিভানের (নিশি-শয্যা তার) উপর জমে আছে

মোজা, চটি, কাঁচুলি, শেমিজ।

কোচকানো স্তনধারী বৃদ্ধ আমি, টাইরেসিয়াস,

ভয়ে সসঙ্কোচে দেখেছি দৃশ্যটি, বাকিটা আন্দাজ করি,—

অতিথির জন্য আজ আমিও অপেক্ষারত।

এলো সেই ঈপ্সিত তরুণ, মুখে ক্ষত আর দাগ,

ছোট এক বাড়িদালালের কেরাণী সে, কেমন তীর্যক

দৃষ্টি তার; যেন সেই অভাজনদের একজন সে, যারা 

বাডফোর্ড কোটিপতিদের আস্থার প্রতীক হয়ে

মাথায় রয়েছে বসে রেশমের টুপির মতন।

এখন সময়টাও বেশ ভালো বলে মনে হলো তার;

খাবার তো শেষ, মেয়েটিও ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত,

শরীরী আদরে তবে বাগাতে চাইলো সে মেয়েটিকে;

যদিওবা অযাচিত, তবু তিরস্কার করলো না মেয়েটিও।

মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলো উত্তেজিত, মুহূর্তেই পড়লো লাফিয়ে;

বাধাও পেলো না কোনো অভিযাত্রী তার হাতগুলো;

আপন দেমাগ তার আর কারও পরোয়া করে না, বরং

উদাসীনতাকেই তো সে আরও বেশি স্বাগত জানায়।

(আর আমি টাইরেসিয়াস, এইসব দেখে-দেখে ভুগেছি

আগেই কত, এই একই ডিভানে বা শয্যায় যা ঘটে বারংবার;

আমি কিন্তু সেই লোক, বসেছিলো যে থিবিসে দেয়ালের নিচে,

আর হেঁটে গেছি নিম্নতন তলদেশে মৃতদের মাঝে।)

চূড়ান্ত চুম্বন এঁকে পৃষ্ঠপোষক স্বভাবে অনন্তর সে তরুণ

চলে গেলো অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে।

ঘুরিয়ে নিজের দেহ আয়নায় দেখে যেন হেলায় ফেলায়

আপনার মুখ, বিদায়ী প্রেমিকটাকেও বিস্মৃতপ্রায়;

মাথার ভিতরে তার ততক্ষণে আধ-ফোটা ভাবনা আবার:

“বাহ! ওটাও তো শেষ হলো; বেশ বাপু লাগছে আমার।”

সুন্দরী নারীরা যদি ঘরে এসে বোকা হয়ে যায়

একা একা পায়চারি করে নিজেকে সাজাতে চায়,

স¦য়ংক্রিয় হাত মেলে আঁচড়ায় চুল; আর ঠিক

 গ্রামোফোনে রেকর্ড চড়িয়ে দেয়  মর্জিমাফিক।

‘আমার পাশেই ভেসে এসেছিল জলের ওপরে এ সঙ্গীত’

আর স্ট্রান্ড ধরে সোজাসুজি রাণী ভিক্টোরিয়া স্ট্রিট।

নগর হে, হে নগর, মাঝে মাঝে আমিও তো শুনতে পাই

লোয়ার টেমস স্ট্রিটে পাবলিক পানশালা যদি পার হয়ে যাই,

মেন্ডোলিন থেকে ভেসে আসা সকরুণ সুমধুর সুর.

আর বুকের ভেতরে বাজে ধুকপুক সুরের নূপুর,

যেখানে জেলেরা এসে দ্বিপ্রহরে হাই তোলে আলস্যের ভারে

ম্যাগনাস মার্টারের দেয়ালের ধারে

আয়োনীয় সোনা রূপা যেখানে বর্ণনাতীত ঐশ^র্যে ঝঙ্কারে।

এ নদীর ঘাম

তেল আর আলকাতরার দাম

বজরারা ধায়

স্রোতে বেঁকে যায়

লাল পাল ত্রস্ত

সুপ্রশস্ত

বাতাসের অনুকূলে দুলন্ত মাস্তুল।

বজরারা ধুয়ে যায়

গুঁড়িগুলি ভেসে যায়

গ্রিনিচের দিকে ধায়

আইল অব ডগ্স পার হয়ে যায়

    ওয়েইলালা লেইয়া

    ওয়েইলালা লেইয়া

এলিজাবেথ ও লেইসেস্টার

টানছে দাঁড় টানছে দাঁড়

তৈরি হলো নৌ-পাছিল

গিল্টিকৃত নৌকা-খোল

লালিম সোনালি

ফোঁসে মীড়ে মীড়ে

তরঙ্গিত তীরে

দখিনাপশ্চিমা বায়ু

ভাটির টানে যাও হেইও

ঘন্টার টঙ্কার

শাদারং টাওয়ার

    ওয়েইলালা লেইয়া

    ওয়েইলালা লেইয়া

“ট্রাম আর মলিনবরন গাছ।

         আমার জন্মেও হেতু হাইবেরি।

         আমাকে করেছে নষ্ট রিচমণ্ড আর কিউ।

         রিচমণ্ড কর্তৃক উত্থিত আমার হাঁটু

         মেঝে থেকে এক নৌকার পাটাতনে।”

         “মোরগেটে আমার পা, আর আমার হৃদয়

         আমার পায়ের নিচে। ঘটনার পরে-পরেই

        কাঁদলো সে। প্রতিজ্ঞা তার, ‘নতুন শুরু সে করবেই’।

     আমি কোনো মন্তব্য করিনি। আমার উষ্মাও নেই।”

     মারগেট পড়ে আছে বালুকাবেলায়।

     আমি তো মেলাতে পারি

     না-কিছুর সঙ্গে না-কিছু।

     নোংরা হাতের আঙুলের ভাঙ্গা নখরাজি।

     আমার হে জনগণ সোজা ও সরল জনগণ

     প্রত্যাশা করে না ওরা কোনোকিছু।

           লা লা

     তবে আমি এসে পড়লাম কারথেজে

     জ¦লে যাচ্ছি জ¦লে যাচ্ছি জ¦লে যাচ্ছি

     হে প্রভু আমায় উপড়ে নাও

     প্রভু হে উপড়ে নাও

     জ¦লে যাচ্ছি

৪. জলে মৃত্যু

ফ্লেবাস যে ফিনিশীয়, পক্ষকাল আগে মৃত্যু তার,

ভুলে গেছে গাঙচিলের চিৎকার, গহীন সমুদ্র বিস্তার

আর যত লাভ ক্ষতি এই দুনিয়ার

                সমুদ্রের নিচে এক তরঙ্গ-সাঁতার

ফিসফিসানির মধ্যেই কুড়িয়েছে হাড়গোড়। উঠতে নামতে

অতিক্রম করে গেছে তার বয়স আর যৌবনের স্তরপরম্পরা

এভাবেই প্রবেশ করেছে ঘূর্ণাবর্তে।

            না-ইহুদি বা ইহুদি

যে তুমি ঘোরাও চাকা আর চোখ রাখো বায়ুর প্রবাহে,

মনে করো ফ্লেবাসকে, একদা যে ছিল তোমার মতন ঋজু দীর্ঘ সুদর্শন

৫. বজ্র  যা বলেছিল

স্বেদসিক্ত মুখে টর্চলাইটের আলো পড়বার পরে

বাগানে বাগানে তুষারশীতল স্তব্ধতা নামার পরে

পাথরকঠিন অবস্থানে মর্মসন্তাপের পরে

দূরান্তের পর্বতমালায় বসন্তের ব্রজ্রপতনের পরে

অবিরাম কান্না আর চিৎকার

কারাগার আর প্রাসাদ আর গগনবিদারী হাহাকার

ইত্যাকার ঘটনার ফলে যে জীবিত ছিল সে-ও আজ মৃত

আমরা জীবিত যারা তারাও সবাই আজ মৃত্যুপথযাত্রী

আমাদের অবলম্বন কেবল সামান্যটুকু ধৈর্যের ধারণ

এইখানে জল নেই কেবল পাথর

কেবল পাথর আর জল আর বালুকাসড়ক

পর্বতমালার মধ্যে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পথ

জলহীন কেবল পাথুরে এই পাহাড়পর্বত

জল থাকলেই আমরাও থেমে থেমে জল করতাম পান

যেখানে পাথর শুধু সেখানে তো থামা নেই, নেই জলপান

সেখানে শুকায় ঘাম, সকল পায়েরা এসে বালিতেই ডোবে

পাথরের মধ্যে যদি জল পাওয়া যেত, যদি পাওয়া যেত তবে

মৃত পর্বতের ক্ষয়ে-যাওয়া দাঁত মুখ পারে না ফেলতে থুথুও কোথাও

পারে না এখানে কেউ সুঠাম দাঁড়াতে আর শুতে অথবা বসতে কোথাও

এমনকি কোনো নিস্তব্ধতাও নেই এইসব পর্বতের ভিতরে কোথাও

আছে শুধু শুষ্ক বন্ধ্যা বজ্রঅগ্নি, তাতে জল নেই জল নেই

এইসব পর্বতের মাঝে এমনকি কোথাও এখন কোনো নির্জনতা নেই

কেবল রয়েছে চাপারাগী মুখ বিদ্রƒপের হাসি আর ক্রোধান্ধ গর্জন

দেখা যায় দরোজায় সে বাড়ির, চৌচির হয়েছে দেয়াল ও ভিটেমাটি

                            যদি জল থাকতো কোথাও

     যদি থাকতো না কোথাও পাথর

     যদি তাতে থাকতো পাথর

     উপরন্তু কিছু জল

     আর জল শুধু জল

     আর এক জলের নির্ঝর

     পাথরের মধ্যে এক স্নিগ্ধ সরোবর

থাকতো সেখানে যদি শুধু জল, জলের সুস্বর

      গ্রীষ্মের পতঙ্গ নয়

     ঘাসেদের বিশু®ক সঙ্গীত নয়

     কেবল জলের গান নয় আর শিলার ওপর

     যেখানে সন্ন্যাসী পাখি গান হায় পাইনের বনের ভিতর

     টুপটুাপ টুপটুাপ টুপটাপ টুপ

     অথচ সেখানে কোনো জল নেই

কে সেই তৃতীয় জন যে হাঁটে তোমার পাশে সকল সময়?

গুণে দেখি, কেবল তুমি ও আমি হাঁটি পাশাপাশি, আর কেউ নয়

অথচ যখন আমি চোখ মেলি একটু সামনে গিয়ে শাদা পথ ধরে

সর্বদা তোমার পাশে আরেকজনও পায়ে পায়ে চলাফেরা করে

ধীর পায়ে হেঁটে যায়, গায়ে তার বাদামি রঙের জামা, শিরোবস্ত্রধারী,

আমি তো চিনি না তাকে সুনিশ্চিত, সে কি নর, নাকি কোনো নারী

—তবে কে সেই অচেনা জন, হেঁটে যায় ওপাশে তোমারি ?

বাতাসে কিসের এত জোর কোলাহল

সেকি মায়েদের বিলাপ-মর্মর

ওরা কারা মুখঢাকা যাত্রীদল

অন্তহীন প্রান্তরের চৌচির মাটিতে হাঁটে হোঁচটে হোঁচটে

তাদের রেখেছে ঘিরে শুধু চ্যাপ্টা এক দিগন্তদেয়াল 

পর্বতের শীর্ষদেশে এ কেমন অদ্ভুত নগর

বেগুনি বতাসে তার শুধু ফাটাফাটি আর জোড়াতালি

পড়োপড়ো  ভঙ্গুর মিনার

জেরুজালেম অ্যাথেন্স আলেকজান্দ্রিয়া

ভিয়েনা লন্ডন

অলীকঅলীক

জনৈকা রমণী এসে দীর্ঘ চুল মেলে দিয়ে বাঁধলো টাইট করে

আর বেহালার সুরে সুরে ফিসফিস গেয়ে ওঠে তারের আলাপে

আর বাদুরেরা বেগুনি আলোয় শিস দিলো বাচ্চাদের মুখে

শিস দিলো আর ডানা ঝাপটালো,

আর ধূসরাভ পাঁচিলের তলে হামা দিলো নোয়ানো মস্তক,

আর হাওয়ায় পড়েছে উল্টে কতো যে মিনার

ঘণ্টাধ্বনি তোলে তারা স্মৃতির জাবর কেটে, তারা সময়ধারক

তাদের সুরেলা স্বর শোনা যায় শূন্য চৌবাচ্চায় আর কুয়ায় কুয়ায়

পর্বতের মধ্যে এইসব ক্ষয়প্রাপ্ত গর্তের ভিতরে

পাণ্ডুর জোছনালোকে, ঘাসেরাও গান গেয়ে যায়

উল্টে-পড়া কবরের পরে, চ্যাপেলের চারপাশে

চ্যাপেলটা শূন্য-রিক্ত, হাওয়াদের বাসাবাড়ি আজ।

তার নেই জানালাকবাট, দুলে ওঠে কেবল দরোজা।

শুকনো হাড়েরা কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

ছাদের উপরে গাছ, তাতে বসে ডাকে এক সবল মোরগ।

কুক্কুরু-কু কুক্কুরু-কু কুক্কুরু-কু

মুহর্তেই বজ্রপাত। অকস্মাৎ ভেজা দমকা হাওয়া

আনে বৃষ্টিপাত

গঙ্গাও স্বয়ং গিয়েছিলো ডুবে, আর নমিত পাতারা সব

অপেক্ষায় ছিল বর্ষণের, যখন কাজল মেঘদল

জড়ো হলো দূরের সুদূরে, হিমবন্তের মাথার ওপরে।

বনজঙ্গলও মটিতে আসন পাতে, নৈশব্দ্যে নিহিত তার স্বর,

বজ্র শুধু কথা বলে অনন্তর

দত্ত : আমরাই কি দিয়েছি?

হে বন্ধু আমার, আমার হৃদয়কে আন্দোলিত করছে যে

মুহূর্তের দুঃসাহসিক আত্মসমর্পণ, যাকে প্রত্যাহার

পারে না করতে কখনোই পচনপ্রবণ কাল, তারই

কারণে শুধু, শুধু তার কারণেই আমাদের অস্তিত্ব এখনো,

যা যাবে না পাওয়া আমাদের শোকবর্ণনায়, কিংবা

মাঙ্গলিক মাকড়শার স্মৃতির বুননে, কিংবা

কৃশকায় আইনজ্ঞের ভাঙা মোহরের তলে

আমাদের শূন্য ঘরে ঘরে

দয়ধ্বম : শুনেছি ঘুরেছে চাবি একবার

দরোজায় আর শুধু একবার ঘুরছে সে

আমরা চাবিটা নিয়ে ভাবি, প্রত্যেকে নিজের কারাগারে  

ভাবি চাবিটাকে নিয়ে, প্রত্যেকেই সত্যায়ন করে কারাগার

যখন রজনী নামে, ঈথারের কানাঘুঁষা ফিরে ফিরে আসে

মুহূর্তের জন্যে পুনরুজ্জীবিত করে ভগ্নহৃদয়ের ক্যরিওলেনাসে

দাম্যত :  সাড়া দিয়েছিলো নৌকাটা

সানন্দে, দাড়ে আর পালে যে সুদক্ষ তারই হাতে,

সমুদ্র প্রশান্ত ছিল,  তোমার হৃদয়টাও সাড়া দিত বটে

আনন্দেই,  যখন সে নিমন্ত্রিত হতো, অনুগত

হয়ে নিয়ন্ত্রণকারীর হাতে

                        আমি বসেছিলাম তটে

মাছ ধরতে ধরতে, আমার পেছনে শুষ্ক সমতলভূমি

আমার জমি কি আমি শেষমেশ নেবো না গুছিয়ে ?

লন্ডন সেতুটাও ভেঙে ভেঙে পড়ে ভেঙে ভেঙে পড়ে ভেঙে ভেঙে পড়ে

দয়া করো ভেবে দেখো বেদনা আমার,  আগুনে পুড়েই পাবো  শুদ্ধতা আমার

কখন যে হবো আমি দোয়েলের মতো—ও দোয়েল ও দোয়েল আমার

বিধ্বস্ত মিনারে দেখি আকিতেইনের রাজার কুমার

এইসব খণ্ডগুলো বাঁচিয়ে রেখেছি আমি ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে এবার

যেভাবে মেলাতে চাও, মেলাবে সেভাবে। হিয়েরোনিমো আবার উন্মাদপ্রায়।

দত্ত। দয়ধ্বম। দাম্যত।

শান্তি!          শান্তি!          শান্তি!

[খসড়া সম্পন্ন : ২০১৮-০৩.০৫.২০২১]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares