ক্রোড়পত্র : করতলে ছিন্নমাথা : একাত্তরের রক্তাক্ত দলিল : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হাসান আজিজুল হক গত ১৫ নভেম্বর (২০২১) ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তিনি ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৮২ বছরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রাজশাহী শহরে ‘উজান’ নামক নিজ বাসভবনে দেহত্যাগ করেন। লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ গ্রামে, যবগ্রাম মহারানী কাশীশ^রী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, তারপর তিনি খুলনায় চলে আসেন এবং খুলনার দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শনে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি পিএইচডি করার জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়েও বিদেশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না-পেরে দেশে ফিরে আসেন। কলেজের অধ্যাপনা দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করে যথাক্রমে রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি ব্রজলাল কলেজে অধ্যাপনা শেষে ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। একত্রিশ বছর অধ্যাপনা শেষে ২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন।   

     হাসান আজিজুল হক গল্পকার হিসেবেই অধিক পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করলেও তাঁর প্রবন্ধ ও উপন্যাসও আলোচিত। ২০০৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আগুনপাখি উপন্যাসটি তাঁকে শুধু বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ আরও কিছু দেশে ভিন্ন মাত্রার উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ সমুদ্রের স্বপ্ন : শীতের অরণ্য ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়। ষাটের দশকেই প্রথম অসমাপ্ত ও ছোটো উপন্যাস শিউলী যেটি ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় উপন্যাস বৃত্তায়ন ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়। সাবিত্রী উপাখ্যান তাঁর মাঝারি পরিসরের আরেকটি আলোচিত উপন্যাস। সম্প্রতি নিখোঁজ নামে একটি উপন্যাস কালি ও কলম মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও (২০১৩) এটি এখনও গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়নি। আগুনপাখি ও সাবিত্রী উপাখ্যান পাঠকের কাছে যেভাবে সমাদৃত হয়েছে অন্য উপন্যাসগুলো সেভাবে সমাদৃত হয়নি কিংবা আলোচনায় আসেনি। যদ্দূর জানা যায়, তাঁর লেখা হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, রুশ ও চেক ভাষায় অনূদিত হয়ে বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও পৃথিবীর অনেক ভাষার মানুষের কাছে তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠকনন্দিত হয়েছে। তাঁর রচনার সংখ্যা খুব বেশি নয় কিন্তু অল্প বিস্তর লেখা দিয়েই যে খ্যাতি কুড়িয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লেখকেরই লেখার পরিমাণের দিক থেকে নয় বরং গুণগত মানের লেখা দিয়ে সাহিত্যে জায়গা দখল করেছেন তিনি তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর আত্মজীবনী ও স্মৃতিচারণমূলক রচনাও উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। শিশুসাহিত্যে তাঁর দুটি গল্প আমাদের গোচরে এসেছে যেগুলো আলোচিত এবং পাঠকনন্দিত। একটি গল্প প্রাথমিক স্তরের কোনও এক সময় পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে সেটি আছে কি না আমাদের জানা নেই।

     একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা গ্রন্থটি স্মৃতিকথামূলক। এই গ্রন্থে ১৯৭১ সালের তাঁর স্বচক্ষে দেখা, নিজের ও পারিবারিক জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুঃসময়ের ঘটনাবলি উল্লেখ করেছেন। মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে যেসব ঘটনা তিনি উল্লেখ করেছেন তা যেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সারা বাংলাদেশেরই রক্তাক্ত দলিল। এই গ্রন্থের ভাষা তাঁর অন্যান্য সাহিত্যের মতো জটিল ও কঠিন নয়। সরল বাক্যে ও সাধারণ ভাষার গ্রন্থটি সকল পাঠকের কাছেই অত্যন্ত সুখপাঠ্য বলে বিবেচিত।  

     মোট নয়টি যুদ্ধস্মৃতি এই গ্রন্থে মলাটাবদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি স্মৃতিকথার বর্ণনা এমনভাবে করা হয়েছে যেন গল্প অথবা যেন পর্দায় দৃশ্যমান কোনও ছবি। এগুলো যদি গল্প বলে কোথাও ছাপা হতো তা হলে তাকে গল্পই মনে করা হতো। তাঁর সাবলীল নিপাট মেদহীন লেখার বৈশিষ্ট্য এমনই যে পাঠক কাহিনির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। এই গ্রন্থের স্মৃতিকথার সঙ্গে পাঠক একাত্ম হয়, এবং একাত্তরে পাকসেনা ও রাজাকার-আলবদর-আল শামসের অগ্নিসংযোগ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ তখনকার নিষ্ঠুরতার বিষয়গুলো জেনে কষ্টে যেন বুকের পাঁজর ভেঙে যায়। এই বইয়ে খুলনা শহর ও আশপাশের মাত্র নয়টি ঘটনার স্থান দেওয়া হয়েছে যাকে আমরা একাত্তরের একটি খণ্ড চিত্র বলতে পারি। পুরো দেশের হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাবলি যে আরও কত করুণ ছিল তা কেবল তখনকার ভুক্তভোগী মানুষেরাই অনুধাবন করতে পেরেছে। স্বজন হারানোর কষ্ট, সম্পদহারা হওয়ার কষ্ট, কয়েক পুরুষের সাজানো সংসার-বাড়িঘর ভস্মীভূত হওয়ার কষ্ট ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা কীভাবে উপলব্ধি করবে ? এ গেল ব্যক্তি পর্যায়ের অন্তরের বধির আর্তনাদের কথা। তারপর এই দেশের অবকাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ এবং সম্পদ লুটপাট করে পাকিস্তানিরা এ দেশকে নিঃস্ব করে গেছে। কে রাখে এর হিসাব ?

     বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটির নয়টি স্মৃতিকথার মধ্যে প্রথমটি উনিশ শ একাত্তরের মার্চের উনত্রিশ-ত্রিশ তারিখে খুলনার কয়েকটি দানবীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। মার্চের পঁচিশ তারিখ রাতের অপারেশন সার্চ লাইটের ফলে ঢাকায় কী ঘটেছিল তখন খুলনার মানুষের পক্ষে জানা দূরের কথা, অনুমান করাও সম্ভব ছিল না। রেডিওর সংবাদে বলা হতো দেশ খুব ভালোভাবে চলছে। ওদিকে খুলনায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে আগুন, রাস্তাঘাটে মানুষের লাশ, রূপসা নদীতে ভেসে যাওয়া অসংখ্য লাশের করুণ দৃশ্যগুলো এই অধ্যায়ে সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখকের বর্ণনায় :

‘সন্ধের পর অত বড়ো শহর খুলনা দাউদাউ জ¦লা আগুনের ঘেরের মধ্যে পড়ে যেত। আগুনের একটা বিশাল বৃত্ত আকাশের নিচু ঝালর পোড়াতে পোড়াতে ঘেরটা ছোট করে আনছে। দিগন্ত ভয়াবহ আলোয় উজ্জ্বল, কিন্তু খানিকটা উপরে যেখানে আলো আর পৌঁছায় না, সেখানে কী ঝকঝকে শানানো অন্ধকার। সে অন্ধকার চিরে কান-ফাটানো আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজ। যেন অন্ধকারই নিজেকে কঠিন আক্রোশে বিদীর্ণ করছে। আর এসব শব্দের সঙ্গে ঠিক ঠিক সঙ্গত হয়ে ভেসে আসত কুকুর-শেয়ালের চিৎকার। সেই শব্দ ভীতির না উল্লাসের বলা কঠিন। শেয়াল আর কুকুরেরা এই সময়েই সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

ওপরের বর্ণনা থেকে কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় যে, কী ভয়াবহ ছিল খুলনার ধ্বংসযজ্ঞ! তিনি একদিন দিনের বেলায় বের হয়ে শহরে হাঁটতে থাকেন যুদ্ধের ভয়াবহতা স্বচক্ষে দেখার জন্য। কিন্তু তিনি কি জানতেন তাঁকে দেখতে হবে রাস্তায় পড়ে থাকা অতি পরিচিত জনৈক উকিলের আত্মজদের তিনটি লাশ। এই লাশ দেখে তিনি আত্মযন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন। এই দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী :

কেউ আমাকে কিছু বলে না, আমি ঠিক ঠিক সাউথ সেন্ট্রাল রোড আর হাজী মুহসীন রোডের মোড়ে এসে পৌঁছুই। পিচঢালা রাস্তার উপরে উকিলবাবুর তিন ছেলে শুয়ে আছে, সঙ্গে ধুতি-ফতুয়া গায়ে আর একজন মাঝবয়সি লোক। কী বিচিত্র শোয়ার ভঙ্গি তাদের ? মাটিকে ভূমিবাহু ধরলে একজনের পা ত্রিভুজের মতো ভাঁজ করা, অন্য পা মেলে দেওয়া। ছোট ছেলেটি রাজপুত্রের মতো চেহারা টকটকে ফর্সা রঙ, টিকোলো নাক, লাল গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, হাঁটু ভাঁজ করে তলপেটের কাছে গুটিয়ে নিয়ে যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মেজভাই দলামোচড়ানো, ডানবাহুর নিচে প্রায়-ছিন্ন মাথা, দুই চোখ চেয়ে রয়েছে বাঁ হাতটি বড়ো ভাইয়ের গলার ওপর মেলে দেওয়া কী নিশ্চিন্তে, আরামে শুয়ে থাকা, শুধু জীবিতরা এভাবে ঘুমোতে পারে না। আমি অনেকটা কাছে চলে যাই, যাওয়া উচিত নয় তবু যাই। রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, ফেনা তুলে মৃদু কলকল শব্দে গড়িয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়, এখন শুকিয়ে চটকা উঠে গেছে এখানে-সেখানে। 

লেখক পরের বর্ণনায় : উকিলবাবুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে আকাশের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার দৃশ্য যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তাতে পাষাণ হৃদয়ও বিদীর্ণ হতে বাধ্য। এই ঘটনায় পাঠকও বেদনাকাতর হয়ে পড়ে। যুদ্ধ মানেই সারি সারি লাশ, যুদ্ধ মানেই নারীর আর্তনাদ, ধ্বংসযজ্ঞ যার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। 

তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে যান রূপসা নদীর তীরে। সেখানে দেখতে পান সারি সারি লাশ। অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখে তিনি হতবাক হন। কোনও কোনও লাশ উপুড় এবং কোনও কোনও লাশ চিত হয়ে ভাসছে। যদিও তিনি পরে জানতে পারেন নারীদের লাশ উপুড় এবং পুরুষদের লাশ চিত হয়ে ভাসে। এই হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য পাঠককে অস্থির করে তোলে। কারণ, এমন লাশের দৃশ্য কতটা ভয়াবহ ও আতঙ্কের বিষয় তা ভাবতে গেলেই আঁতকে উঠতে হয়।

     দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘মানুষের রক্তের দাম সবচেয়ে সস্তা’ শিরোনামে লেখক একাত্তরের মে-জুন মাসের খুলনা অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির হাইলাইট করেছেন। তখন ওই অঞ্চল ছিল জনশূন্য হাহাকার করা প্রান্তর। মানুষের লাশ আর নারী নির্যাতনের কথা এখানে বিধৃত হয়েছে। এই অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাজারদর। কোনও দেশের সময়কে অনুধাবন করার জন্য বাজারের হালচাল একটা উল্লেখযোগ্য দিক। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখকের এই দিকটি এড়িয়ে যায় না। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের শানিত ও অন্তর্দৃৃষ্টিও এ ক্ষেত্রে এড়িয়ে যায়নি। তিনি জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে টাকার মূল্যমান এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তখনকার সময়ে লুটপাটের চিত্র এই অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। মার্চ মাসে গরুর মাংস ছিল দুই টাকা সের এবং মে-জুন মাসে তা হয়ে গেছে আট আনা সের। টাকায় এক সের গলদা চিংড়ি কেনার লোক পাওয়া যায় না। অনুরূপভাবে অন্যান্য শাকসবজি ও আরও কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের কথা উল্লেখ রয়েছে, যে বর্ণনা থেকে টাকার দাম বেড়ে যাওয়া নাকি জিনিসপত্রের দাম কমে গেছে—লেখক সংশয় প্রকাশ করেছেন। বস্তুত টাকার দাম বেড়ে যাওয়া বা জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়ার পেছনের কারণ ছিল খুলনা অঞ্চলের মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে। যারা সেখানে ছিলেন তারাও সহজে ঘর থেকে বের হতেন না। কোনওক্রমে খেয়েপরে বেঁচে থাকাই ছিল তখন মানুষের প্রধান লক্ষ্য। যখন মানুষের মনে মৃত্যু আতঙ্ক বিরাজ করে তখন কী করে বাজারে আসবে। লবণ ভাত খেয়েই জীবনযাপন করে কোনওক্রমে জীবনের পথ পাড়ি দেওয়াই ছিল তখন সারা দেশের মানুষের মোক্ষম চাওয়া।

     শিরোনামহীন তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক খালেদ রশীদের যে জীবনাখ্যান চিত্রিত করেছেন সেটি যেন মহাকাব্যিক উপন্যাসের আদর্শবান চরিত্রকেও ছাপিয়ে যায়। এমন চরিত্র সমাজে সচরাচর বিরল, অনেক সময় মানুষের মনোযোগেরও আড়ালে থেকে যায়। খালেদ রশীদ মানুষের কল্যাণার্থে যা করেছেন এবং একাত্তরে দেশের জন্য আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে মহান দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন তাতে তাঁকে মহামানব বললে অতিরঞ্জিত হবে না। আমরা সূর্যসেন, প্রীতিলতাসহ প্রমুখ বিপ্লবীদের কথা জানি কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, খালেদ রশীদের মতো একজন মহান আত্মত্যাগী বিপ্লবী ও মুক্তিযোদ্ধার কথা জানি না। একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য এমন অনেক আত্মত্যাগী বিপ্লবী ছিলেন যাঁদের নাম ইতিহাসে লেখা হয়নি, দেওয়া হয়নি সে-রকম কোনও খেতাবও। খালেদ রশীদ, লেখকের সহকর্মী, খুলনা গার্লস কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। অকৃতদার খালেদ রশীদের ব্যক্তিগত জীবনাচার অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। তিনি নিম্নবিত্ত মানুষের মতো অতি সাধারণভাবে জীবনযাপন করতেন। খিদে লাগলে পচাবাসি যে খাবারই পেয়েছেন তিনি পরমানন্দে খেয়েছেন। অত্যন্ত মেধাবী মানুষটি প্রথমে তেমনভাবে সক্রিয় রাজনীতি না-করলেও শেষে তিনি জনগণের মুক্তির জন্য সবকিছু ত্যাগ করেন। সরকারি চাকরি করবেন না বলে গার্লস কলেজ যখন সরকারি হলো তখন তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সুন্দরবন কলেজে যোগ দিলেন। লেখকের ভাষায় :

আমি নিজে কখনও ভাবিনি, খালেদ রশীদ খুব বেশি একটা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন। ছাত্র অবস্থায় ছাত্রলীগে কাজ করতেন এইমাত্র জানতাম। কিন্তু দেখা গেল সন্দীপন সংগঠনের ভেতর দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সংযোগগুলো আস্তে আস্তে—দেশের রাজনীত আর সেই সময়ে আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েই যেন—ছেঁটে ফেলতে শুরু করলেন। ভাবতে শুরু করেন গোটা দেশের মানুষের মুক্তির কথাটা আর একেবারে একা, পুরোপুরি নিজে নিজে বজ্রের মতো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে তাঁর এই ভাবনায় তাঁর নিজ জীবনের সাধ্যমতো সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করবেন।

     তিনি শুধু সিদ্ধান্তই নেননি। এজন্য যে তপস্যা করেছেন তা অভাবনীয়। লেখকের মাধ্যমে তাঁর খণ্ডিত জীবনের প্রতিফলনের মাধ্যমে আমরা বিস্মিত হই এই ভেবে যে, এত ত্যাগও মানুষ স্বীকার করতে পারে! তখন তিনি লীগের রাজনীতি ছেড়ে ঝুঁকে পড়েন বামপন্থি রাজনীতিতে এবং নকশাল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তাঁর অধ্যবসায়ের সামান্য কিছু বিষয় লেখক এই ক্ষুদ্র পরিসরের গ্রন্থনায় উন্মোচন করেছেন :

সমস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকে খালেদ রশীদ পরিত্যাগ করলেন। থাকতেন একটা অন্ধকার ছোটো ঘরে, দিনের আলোতেও সে ঘরের ভেতরটা আবছা। দিনের পর দিন বেরোতেন না ঘর থেকে। দুঃসহ তপস্যা শুরু করলেন তিনি। আমি নিজে দেখেছি টানা আঠারো ঘণ্টা তিনি পড়ছেন-মার্কস, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও-সে-তুং, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানের গাদা গাদা বই। তখন কথা বললেই বুঝতে পারি, এই খিদেটাই শুধু রাক্ষুসে নয়, এক অসাধারণ মেধাবলে জমিয়ে রাখছেন, বিশ্লেষণ করছেন, সংশ্লেষণ করছেন যা কিছু পড়ছেন তার সবই।

     স্বাধীনতার পূর্বের তাঁর সাধনা, সাংগঠনিক ও মানুষের উপকারের কথা সংক্ষেপে এই অধ্যায়ে দীপ্তি ছড়িয়েছে কিন্তু স্বাধিকার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সশস্ত্র যুদ্ধেও অবতীর্ণ হন। এবং একটি সম্মুখযুদ্ধে ভুলের কারণে অকুতোভয় এই মহামানব পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়েন। এরপর তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। কোথায় তাঁকে হত্যা করা হলো, কোথায় তাঁর মরদেহ ফেলে দেওয়া হলো কিংবা মাটিচাপা দেওয়া হলো তার কোনও হদিসই পাওয়া যায়নি। 

     একই অধ্যায়ে শিরোনামহীন আরেকজন মহান শ্রমিক নেতা মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক রফির করুণ মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ছিলেন নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। পেশায় ফল ব্যবসায়ী। সংসারে তাঁর মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। ফল ব্যবসা থেকে যা পেতেন তার সব টাকাই বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেয়ে-দেয়ে ও গরিব মানুষকে দিয়ে শেষ করতেন। বোহেমিনিয়াম এই মানুষটি নিজের ভবিষ্যতের কথা কখনও চিন্তা করতেন না। তাঁর ছিল নাটকের প্রতি ভীষণ ঝোঁক। তবে নাটকে অভিনয় করার সময় আদর্শবাদী চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তিনি চাইতেন। গণমানুষের মুক্তির জন্য তিনি তাঁর মতো করে ভাবতেন ও কাজ করতেন। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। লেখক রফির জীবনালেখ্যে খুলনার একটি বাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যে বাড়িটি ছিল ভয়াবহ নির্যাতনের ক্যাম্প। এই বাড়িতে এলাকা থেকে তরুণীদের ধরে এনে মাসের পর মাস নির্যাতন করা হতো। কাউকে কাউকে হত্যাও করা হতো। আর সন্দেহভাজন যুবকদেরও ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। মুক্তিযোদ্ধা রফিও একদিন ধরা পড়েন। তাঁর ওপর নির্যাতনের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তাতে গা শিউরে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। লেখকের বর্ণনায় :

রাজাকারদের মধ্যে ছিল একজন কসাই, সেই-ই নাকি কেটেছিল রফির মাথা। তারপর সেই কর্তিত মুণ্ডু ছাই ছাই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হাটের বিমূঢ় জনতাকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে আসা হলো বাজারের চৌরাস্তার মোড়ে। সেখানে খোলা চত্বরে পোঁতা ছিল একটি সুপারি গাছ। একুশে ফেব্রুয়ারিতে পতাকা তোলার উদ্দেশ্যেই গাছটা এভাবে পোঁতা হয়েছিল। এপ্রিলের প্রথম দিকেই শহিদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, ছিল শুধু গাছটা। দড়ি দিয়ে রফির মাথাটা বেঁধে ঐ গাছে পাকা রাস্তার দিকে মুখ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। রফির চোখ দুটি তখনও খোলা। এরপর কয়েকটি হ্যাজাক জ¦ালিয়ে আশপাশে টাঙিয়ে দেওয়া হলো। 

     যদি আমরা এই গ্রন্থের ক্লাইম্যাক্স বিবেচনা করি তা হলে এই অধ্যায়ের খালেদ রশীদ ও রফির চরিত্রের মর্মান্তিক মৃত্যুর ট্র্যাজেডিকে ধরে নিতে পারি। বাকি অধ্যায়গুলোর একটিতে লেখকের ভগ্নিপতি নড়াইল কলেজের প্রিন্সিপালকে পাকসেনারা ধরে যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখান তাঁকে উদ্ধার করার ভয়ার্ত কাহিনি ও তাঁদের পারিবারিক জীবনের বিষাদক্লিষ্ট পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখকের জনৈক বিহারি ছাত্র ও পাকসেনাদের মধ্যে একজন ডাক্তারের সৌজন্যমূলক আচরণ ও মানবতাও তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন। শেষ পর্যন্ত অনেক নির্যাতনের পর তিনি মুক্তি পেয়ে বাসায় যখন এসেছেন তখন একটি কঙ্কাল যেন বাসায় এসে হাজির হয়েছেন।

     পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে পাকিস্তানিদের যুদ্ধের বিবরণ, ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের বোমা হামলা এবং সর্বশেষ পাকসেনাদের যুদ্ধ গুটিয়ে খুলনা ফিরে যাওয়ার ঘটনাগুলো ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করেছেন। পাকসেনাদের খুলনা ফিরে যাওয়ার বর্ণনাও পাঠককে আকৃষ্ট করে। পরাজিত ক্লান্ত শ্রান্ত সৈনিকদের ভেঙে পড়া জীবন কীভাবে থেমে যায় তারই নিটোল বর্ণনা এখানে পাওয়া যায়।

     সর্বশেষ অধ্যায়টিতে খুলনার মানুষের বিজয়োল্লাসের বর্ণনা করা হয়েছে।

     খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি যা রেখে গেছেন তা অমর সাহিত্য হিসেবেই বেঁচে থাকবে। তাঁর আগুনপাখি আজীবন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াবে পাঠকের হৃদয়ে। ক্ষুরধার নিটোল ঋজু কথাসাহিত্য শুধু পাঠককে নয়, লেখককুলকে দেখাবে পথের দিশা। আত্মজা ও একটি করবী গাছ, পাতাল হাসপাতাল, মা মেয়ের সংসার, শকুন, জীবন ঘষে আগুন প্রভৃতি গল্পসম্ভার বিদগ্ধ জনের ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

     হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য বৈদগ্ধ ও লেখার নৈপুণ্যের জন্য সম্মানিতও হয়েছেন দেশ-বিদেশে। সাহিত্যের অবদানের জন্য এই মহান লেখক স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে একুশে পদক এবং ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়াও ২০১৮ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। দেশের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান ছাড়াও ২০০৮ সালে আগুনপাখি উপন্যাসের জন্য কলকাতার আনন্দ বাজার তাঁকে ‘আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করে।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares