রফিকুন নবীর সঙ্গে আলাপচারিতা : ‘যা কিছু দেখা সবই মনের মাঝে ছবি হয়ে বসা’

শিল্পী রফিকুন নবী রনবী-র সঙ্গে সংলাপ

[শিল্পজগতে বাংলাদেশ ও বিশ্বে জনশ্রুত নাম রনবী। চিত্রশিল্পী, কার্টুনিস্ট, লেখক রফিকুন নবী (রনবী)-র জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তাঁর পিতা রশীদুন নবী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। জীবনসঙ্গী হলেন নাজমা বেগম। তাঁর পিতা রশীদুন নবী ও পিতামহ মহিউদ্দীন আহমেদ, দু-জনই ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। রশীদুন নবীরও ইচ্ছে ছিল শিল্পী হওয়ার। কিন্তু পিতা মহিউদ্দীনের অনুমতি মেলেনি। সে সময় ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর সাথে মাদ্রজে দেখা করেছিলেন। কোলকাতা সরকারী আর্ট কলেজে ভর্তিপরীক্ষায় পাশও করেছিলেন। অবশেষে হলেন পুলিশ কর্মকর্তা, কিন্তু স্বপ্ন ধরে রেখেছিলেন মনের গহীনে। মাঝে মধ্যে ছবি আঁকতেন। রশীদুন নবী নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে পুত্র রফিকুন নবীকে শিল্পী হতে প্রণোদিত করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তা পিতার বদলির কারণে রফিকুন নবীর শৈশব ও কৈশোরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল দেখার সুযোগ হয়েছে। অনিবার্যভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি লেখাপড়া করেছেন। এ-ভ্রমণের এক পর্বে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ১৯৫২ সালে পুরনো ঢাকায় স্থিত হন। পুরনো ঢাকায় কাটিয়েছেন কৈশোর ও যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল ও অবশেষে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে সম্পন্ন হয় প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানসহ খ্যাতিমান শিল্পীদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আর্ট কলেজেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। উল্লেখযোগ্য যে, তরুণ বয়স থেকেই নাটক, চলচ্চিত্র, চিত্রকলার প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। এ আগ্রহ থেকে জীবনের নানা কর্মের সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চাকে করেছেন নিত্যসঙ্গী।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর ছিলো সক্রিয় অংশগ্রহণ। এখনও তিনি শামিল হন শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনে। রাজপথের সংগ্রামে সঙ্গী হয়েছেন কখনও-কখনও প্রয়োজনে রঙ-তুলি নিয়ে, কালি ও ক্যানভাসে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত উচ্চতর শিক্ষার জন্য অবস্থান করেন এথেন্সে। দেশে ফিরে স্থিত হন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ)। এখানে শিক্ষকতা করেছেন ২০১০ সাল পর্যন্ত। এখনও সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, তিনি এদেশের অন্যতম এক চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট। রনবী নামে সবাই তাঁকে জানে। তাঁর অসামান্য সৃষ্টি ‘টোকাই’ কার্টুন। এ ছাড়াও তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কার্টুন ও চিত্রকলা। কার্টুন এমনভাবে জনশ্রুতি অর্জন করে যে, রনবী ও টোকাই হয়ে ওঠে সমার্থক এবং অবিচ্ছেদ্য দু-টি বিষয়। ১৯৯৩ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য অর্জন করেন একুশে পদক। এছাড়া তিনি লাভ করেন শিল্পকলা একাডেমির চিত্রকলায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু-সাহিত্য পুরস্কার, বহুবার প্রচ্ছদ আঁকার ন্যাশনাল বুক সেনটার পুরস্কার, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদীন সম্মাননা, শিল্পী এস এম সুলতান পদক, শিল্পী হামিদুর রহমান স্মৃতি পদক, শেলটেক পদকসহ অনেক আজীবন সম্মাননা। চিত্রকর্ম, কার্টুন, প্রচ্ছদ ছাড়া কৈশোর থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তাঁর রচিত অন্যতম গ্রন্থগুলো হলো : স্মৃতির পথরেখায়, দেশসেরা জগৎসেরা শিল্পীকথা, ছেঁড়া মানচিত্র এবং টোরাটেপের গুহা, রনবীর ছড়া, আমার স্কুল, রনবী’র ছড়া, নোটন নোটন ছোটন পাখি, সবখানেই যুদ্ধ, গপ্পিবুড়ো এবং অদ্ভুতুড়ে রেলগাড়ি, রনবীর বিশ্বদর্শন ও রম্যকথন ইত্যাদি মোট ১৬াট বই। বস্তুত, তিনি বিচিত্র ব্যক্তি ও ঘটনার সঙ্গে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন। হেঁটেছেন লোকবাংলার নিসর্গে, আনন্দে, সৃষ্টি ও নির্মাণে। তবে তিনি শিল্পীসত্তায় হয়ে উঠেছেন একা। স্বতন্ত্র সত্তা রনবী। সংক্ষেপে বলতে গেলে রনবী-র জীবন এক শৈল্পিক ভ্রমণ, সাংস্কৃতিক নির্মাণ। অসামান্য ব্যক্তি রফিকুন নবী-রনবীর সঙ্গে আলাপচারিতায় আমরা জেনে নেব তাঁর ইতিহাস যাপন ও শিল্পী জীবনের গল্প। শব্দঘর-এর পক্ষে রফিকুন নবীর সঙ্গে আলাপচারিতা গ্রহণ করেছেন―স্বপন রুদ্র]

শব্দঘর : স্যার, আপনাকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এ দুঃসময়ে ভালো আছেন ও কথা বলতে পারছি, এটা অনেক আনন্দের।

করোনা সংক্রমণের কারণে সারাবিশ্ব অচল-প্রায়। যেক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব অনিবার্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে প্রতিদিন কোনও না কোনও আপনজনকে হারাচ্ছি। এ অবস্থায় দিনগুলো কেমন কাটছে আপনার ?

রনবী : এ তো বলার অপেক্ষা রাখে না। জীবন একটা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে চলেছে। এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটে। এই প্রশ্নের যখন উত্তর দিচ্ছি, তখন আমাদের দেশের সংক্রমণের সময় প্রায় দেড় বছর হতে চলেছে। মাসদুয়েক আগেও স্বস্তি পাবার মতো কমতির দিকে ছিল। এখন আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা হঠাৎ করেই লাগামহীন হয়ে রেকর্ড ভাঙা ঊর্ধ্বমুখী। টিকা নেওয়া চলছে। কিন্তু কমছে না কিছুতেই। বরং আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন। বলছেন যে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই ভাইরাস নিজের ধরন পাল্টে ফেলার ক্ষমতা রাখে। তবে সাবধানতাই না কি বাঁচার একমাত্র পথ, বলছেন তাঁরা। অর্থাৎ, বলে দেওয়া নিয়মগুলোকে মেনে চলাটা অভ্যাসে রূপ দিতে হবে।

এই উপদেশ প্রথম দিকে যেমন ছিল, তেমনই আছে। মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, অন্যদের সঙ্গে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা, কোলাকুলি, হ্যান্ডশেক না করে কনুইতে কনুই ঠেকিয়ে অভিবাদন, হাঁচি দিলেও নিজ কনুইতে মুখ ঢেকে দেওয়া, ইত্যাদি।

আমার ধারণা শুরু থেকে বেশ কিছুদিন মানুষ ভীত ছিল। ধীরে ধীরে নিয়মাবলি না মানার ব্যাপারে সাহসী হয়ে উঠছে। সবারই হয়তো ধারণা যে ‘ভাইরাস আর যাকেই ধরুক আমাকে ধরবে না’।

তারপর তো না মানাটা ব্যাপক হয়ে গেছে। বিশেষ করে শহরগুলোতে। ‘লকডাউন’ অথবা সাধারণ ছুটি ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এবার নরমাল হই একটু―এই ধরনের ইচ্ছায় পেয়ে বসাদের ভিড় ভাড় বেড়েছে যত্রতত্র। অদ্ভূত সব বিলাসী ইচ্ছায় পেয়ে বসেছে। কারও ইচ্ছে হয়েছে সমুদ্র দেখার, কেউ পাহাড়-পর্বতের দিকে ছুটেছে প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে, কারও আবার বড় সমাবেশ করে বিয়েটা সারার ইচ্ছে হয়েছে। সরকারকে না-পছন্দ দলগুলো ভাবতে শুরু করেছে যে এই দুর্যোগকে হাতিয়ার করে রাজনীতির মাঠটা গরম করা যাক। প্রথমে পথসভা, মানববন্ধন ইত্যাদি দিয়ে সাহস সঞ্চার করে বৃহৎ সমাবেশের আয়োজনে নেমেছে। ধর্মীও সংস্থাগুলিও তা থেকে বাদ নেই। হঠাৎ রাজনীতিতে পেয়ে বসেছে তাদের। তো এই রোগে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ভেঙে সমর্থকের দূরত্বকে কমানোর চেষ্টা চলছে। করোনা সংশ্লিষ্ট চিন্তাবিদরা বলছেন এইসব কারণে তো বটেই বিদেশ থেকে আসা প্রবাসী এবং বিদেশি যাত্রীদের দ্বারাও সমস্যাটি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুটাও তো নাকি সেরকমই ছিল।

আসলে কীভাবে যে কী ঘটছে তা হয়তো হলফ করে বলা কঠিন। আমি তো রীতিমতো বিভ্রান্ত এবং ভীত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে ভাইরাস নিয়ে তেমন কোনও হেলদোল চোখে পড়ে না। এক রিকশা চালককে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। ‘কি মিয়া, হাত-টাত ধোও ? প্যাসেঞ্জারগো টাকা-পয়সা হাতে ধরো যে, স্যানিটাইজার লাগাও না?’ উত্তরে বলেছিল, ‘কী যে কন, হাত ধুইতে ধুইতে হাতে ঘা বানাইয়া ফালাইছি। আর ওই যে পয়লা-ওষুধের কথা কইলেন, প্যাসেঞ্জাররা তো এইটা হাতে লাগায়ই। টাকা-পয়সাও তাই ভালাই থাকে। আমাগো কিছু হইবো না। আল্লহ্ বাঁচাইলে ভাইরাসে কিচ্ছু করতে পারব না।’

বাসায় ইনটারনেটের লাইন সারাই করতে আসা ছেলেটাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাস্ক পরো নাই কেন ?’ সে বলল―‘পয়লা পয়লা পরছিলাম। কেমুন চোর-ডাকাইতের মতো লাগে চেহারাটা। তয় স্যার পুলিশ আসতাছে দেখলে পরি।’

যাই হোক এটা যে একটা বিপজ্জনক ভাইরাস সেটা জানলেও কে যে কখন ক্যারিয়ার হয়ে অন্যকে বিপদে ফেলতে পারে, সেই বোধটার খামতি রয়েছে। সবাই নিয়ম না মানার ব্যাপারে নিজ নিজ ধারণা তৈরি করে নিয়েছে। তবে এও ঠিক যে সরকারি ঘোষণা-মাফিক সব কিছু মেনে চলেও ভাইরাস থেকে রেহাই না পাবার ঘটনাও ঘটছে। আমি সেই কারণেই ভীত থাকি।

বলতে কী এই কোভিড-১৯ ভাইরাসটি আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সচরাচর মৃত্যুচিন্তাকে প্রাধান্য দিইনি। ‘জন্মিলে মরিতে হবে। এ জগতে কেবা রবে’―কবিতার লাইনটি মনে পড়লে কখনও কখনও মনে হয়েছে―নিজের বয়সের কথা। জানি যে জীবনের প্রায় শেষ ধাপে পৌঁছে গেছি। সহসা মরার ব্যাপারটা স্মরণ করতে টাই না। কিন্তু এখন ‘মৃত্যু’ কথাটা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষণা টিভিসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রচার হতে থাকায় তা ভোলার উপায় নেই। এই তো―এই মুহূর্তে দেখলাম ১১২ জনের মৃত্যুসংবাদ। তা―অমোঘ নিয়মে মরতে তো হবেই একদিন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এভাবে মরতে চাই না। কেউ দেখতে আসবে না। কাছে আসবে না। এমন মৃত্যু কারইবা কাম্য হতে পারে! প্রথম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে দেশের শ্রদ্ধাস্পদ বরেণ্য জ্ঞানী-গুণী ঘনিষ্ঠজন বন্ধু-বান্ধব, নিকট পরিজন কতজনের প্রাণ যে এই ভয়ংকর কোভিড-১৯ কেড়ে নিল, আচমকা সেই বিষণ্নতা কখনও কাটবে না মন থেকে। তবে কষ্ট হয় ভেবে যে তাঁদের মৃত্যুতে শোক জানাতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে কোনও সমাবেশ হয়নি। যেন অচ্ছুত হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। দূর থেকে শ্রদ্ধা, দোয়া, সম্মান জানাতে হয়েছে।

আমার মনে হয়েছে মানুষ কেমন যেন অমানবিক হয়ে যাচ্ছে বাঁচার জন্য সবাই আমরা স্বার্থপরতায় ভুগছি। এই ভাইরাস সবাইকে স্বার্থপর হতে বাধ্য করেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, কে যে পকিস্তানিদের পক্ষের লোক সেই সন্দেহে দূরত্ব বজায় রেখে চলার অভ্যেস রপ্ত করতে হয়েছিল। এখন সামাজিক দূরত্বটাও যেন তেমনি। কে যে ভাইরাসের ক্যারিয়ার, কার দ্বারা সংক্রমিত হয়ে যাবে কেউ, এই সন্দেহবাতিক সঞ্চারিত হয়েছে অনেকটাই।

নিজ দেশের অর্থনীতি তো বটেই, বিশ্বের আর সব দেশেরটা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এই ব্যাপারটা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। অনেকের ধারণা এমনটা চলতে থাকলে অনেক কিছুই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।

শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ব্যবসা বানিজ্য সবই বিড়ম্বনায় রয়েছে। স্বাভাবিক হবার পন্থাও খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আমার বিশ্বাস। মানুষও কেমন রিস্ক নিয়ে হলেও স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

তো―দীর্ঘ ঘরবন্দিত্বে, সাধারণ ছুটি পেয়েও চারদিকের দূরবস্থা নিয়ে ভাবনা, সংক্রমণের, কাছের-দূরের, পরিচিত- অপরিচিতদের প্রতিদিনের মৃত্যু সংবাদ শুনতে-শুনতে বিষণ্নতায় ছেয়ে থাকা মনটা ছবি আঁকায় বসাতে পারি না। যেমনটা হয়েছিল যুদ্ধের নয় মাস ধরে। শিল্পীর পক্ষে আঁকায় মন বসাতে না পারা বড়ই কষ্টের, শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন ‘অন্তর বাজে তো যন্তর বাজে।’ এই সময়ে মনে হচ্ছে আজস্র মৃত্যু সংবাদে আমারও অন্তরের তারটাই ছিঁড়ে গেছে। জোড়া লাগলেও তা আগের মতো হবে কি না কে জানে! রোগটা নিয়ে নিজের কথাও ভাবি। এ কথাও মনে আসে যে এই মুহূর্তে মরলে দশাটা একই হবে। কেউ আসবে না। বলা হবে রনবীও করোনায় গত হয়েছেন।

শব্দঘর : স্যার, আপনার জন্ম ১৯৪৩ সালে। তখন অবিভক্ত ভারতবর্ষ। উন্মাতাল সময় বলা যায়। একদিকে উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম, অন্যদিকে খাদ্যাভাব, মারি, অসহায়ত্ব সবই ছিলো। সেই সময় সম্পর্কে আপনি সাক্ষী হিসেবে কিছু বলতে না পারাটাই স্বাভাবিক। তবে স্বজন, বাবা, মায়ের মুখে শোনা বিবরণ থেকে সেই সময় সম্পর্কে আপনার ধারণা জানতে চাই। 

রনবী : ঠিকই ধরেছেন। তখনকার অনেক কিছুই স্মৃতিতে নেই। অতো শিশু বয়সের কোন কিছু মনে না থাকারই কথা। এমনিতেও আমার স্মৃতিশক্তি চিরকালই কম। পুস্তক প্রকাশকের অনুরোধে স্মৃতি কথা লিখতে গিয়ে সেটা টের পেয়েছিলাম।

আরও একটা কথা ঠিক বলেছেন আপনি, শিশু বয়সের কিছু মনে না থাকলেও বাবা-মা বা স্বজনদের মুখে শোনা বিবরণ থেকে কিছু যদি জানা থাকে, তা বলতে। কিন্তু সেসবও তো অনেক আগের কথা। সেই স্মৃতিও তো ফিকে হতে বসেছে। বাবা-মাসহ সংসারে আমার যাঁরা সিনিয়র ছিলেন, তাঁরা সবাই গত হয়েছেন বহু বছর আগেই। পুরো পরিবারে আমিই এখন বয়ঃজ্যেষ্ঠ-পোস্টটিতে অধিষ্ঠিত আছি। সবচাইতে প্রবীণ সদস্য এখন। কোভিড-১৯-এর টিকা নিতে গিয়ে জেনে গেলাম ক’দিন আগে, এখন যে বয়সে আছি তা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ পর্বের। খুব যত্ন-আত্তি করে সুঁই ফুটিয়ে দিল উপস্থিত সবার আগে। সেদিন মনে হয়েছিল আহারে! সব ক্ষেত্রে যদি এমন ভাবা হতো তো আর ভাবতে হতো না এটা-ওটা বিড়ম্বনা নিয়ে। সবার আগে সমাধা হয়ে যেত সবকিছু। যাই হোক, এটা ঠিক যে ইংরেজ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমল তিনটি আমলই দেখার সৌভাগ্য হলো। শিশু থাকায় ব্রিটিশ আমলটা তেমন মনে নেই। প্রায় অবুঝ সাড়ে তিন বছরের মতো সময় ইংরেজ রাজের ব্যাপারটিতে ছিলাম। তবে পাকিস্তান আমলটা অবশ্য পুরোই মনে আছে কারণ শিক্ষা-দীক্ষা, বোধ-বুদ্ধি জ্ঞান-গম্যিসহ শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের পাশাপাশি শাসকগোষ্ঠীর চক্র-কুচক্র অবলোকন এবং বাঙালি-অবাঙালি, ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে লড়াই-আন্দোলন, রাজনৈতিক আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ-জয় ইত্যাদি সবই দেখেছি। ষাট দশক থেকে সবকিছুতে প্রথমে ছাত্র এবং পরে শিল্পী হিসেবে যুক্ত থাকায় অভিজ্ঞতাও অর্জিত হয়েছে এই আমলে।

১৯৪৭-এর কিছুটা আগের কয়েকটা ঘটনা একটু-একটু মনে আছে। এমনও হতে পারে যে মা-বাবার কাছে শোনা থেকে মনে বসা। তবে টুকরো-টুকরো হলেও চোখে ভাসে। তখন রাজশাহীতে থাকতাম। মাঝে মাঝেই ছোট-ছোট মিছিল যেত বাসার সামনে দিয়ে। জানালায় দাঁড়িয়ে দেখতাম। মা বাইরে যেতে দিতেন না। মিছিলের স্লোগানটি এখনও মনে আছে। কারণ আশপাশের বাসাগুলোর সমবয়সী ছেলেমেয়েদের দেখতাম শোনা স্লোগানগুলো খেলার ছলে নকল মিছিল মতো বানিয়ে চিৎকার করে বলত। সেটি ছিল―‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।’ পরিবারে তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডায়ালেক্টে বাংলা বলা হতো। অতএব স্লোগানটার ভাষা বুঝতে পারতাম না। আর একটু বড় হলে জেনেছিলাম ওই স্লোগান ছিল উর্দুতে।

আর একটা ঘটনা ছিল এই রকম,―প্রতিদিন একজন লোক এবং কোলে বাচ্চাসহ তার স্ত্রী বাসার সামনে এসে দাঁড়াত ভিক্ষা চাইতে। হাড় জিরজিরে শরীর ছিল তাদের। লোকটি চিৎকার করে বলত ‘চাইরটা ভাত দে গো, মা, ভাত দে!’

তখন মাত্রই গুনতে শেখার দিন চলছিল আমার। স্লেট-পেন্সিলে অ-আ-ক-খ-এর সঙ্গে ১-২-৩-৪ ইত্যাদি নিয়ে তালগোল পাকানো লেখাপড়া শুরু হয়েছে মাত্র, তাও খেলা খেলা মতোন। তবে চার (৪) সংখ্যাটা জানতাম। তো মাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ওরা মোটে চাইরটা ভাত খায়? মা ব্যাপারটা খোলাসা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, ওটা কথার কথা। ভাতের ব্যাপারেই শুধু ওরকমটা বলি। অর্থাৎ চাইরটা ডাল দেও বা চাইরটা মাছ দেও বলি না।

সেসবের কিছু বুঝেছিলাম, কিছু বুঝিনি। সেই সময়ই দুর্ভিক্ষের কথাটা শুনেছিলাম মার মুখেই। ব্যাখ্যাসহ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষের চূড়ান্তপর্ব ছিল আমার জন্মের বছরটিতে। সেই প্রকোপ কিছুটা কমে এলেও ভিক্ষুকটি আসার সময়ও ছিল। আর একটু বড় হয়ে শুনেছিলাম (ঢাকার স্কুলে পড়ার সময়) যে ইংরেজরা ভারত ছাড়ার আগ মুহূর্তে তাদের যোগসাজশে দেশের অবস্থা বুঝে বেনিয়া বা ব্যবসায়ীকুল খাদ্যবস্তু, কাঁচামালের স্টক করে, বেনিয়া মানে ব্যবসায়ীরা আকাল সৃষ্টি করেছিল। তাতে খাদ্যাভাবে বহু মানুষ মরে গিয়েছিল। আরও কয়েক বছর পর স্কুলে ওপরক্লাসে পড়ার সময় জেনেছিলাম যে, সেই দুর্ভিক্ষের দুর্গতি এবং দুর্গত অসহায় মানুষদের ছবি এঁকে বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন জয়নুল নামের তখনকার একজন তরুণ শিল্পী। তিনি সেসবের কারণে খ্যাতি পেয়েছিলেন বিশ্বজোড়া। পরে তো আমিও তাঁর ছাত্র হই। তিনি শিল্পাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন। বলাবাহুল্য তিনি শুধু সেইসব ছবির জন্যই যে শুধু নামি শিল্পী হতে পেরেছিলেন তা নয়। পরবর্তীকালে সৃষ্ট তাঁর চিত্রকলার একান্ত, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য বহির্বিশ্বেও খ্যাতি অর্জন করেন। শিল্পী হিসেবে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ-ভারতে। আমি তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম ষাট দশক থেকে। অর্থাৎ, ১৯৫৯-এ তাঁর সৃষ্ট আর্ট কলেজে ভর্তির পর থেকে। তাঁর এবং কলকাতা থেকে আসা অন্যান্য শিল্পী যাঁরা এসে আমাদের শিক্ষক হয়েছিলেন, যেমন শিল্পী আনোয়ারুল হক, শিল্পী সফিকুল আমিন, শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী খাজা শফিক আহমেদ, শিল্পী হবিবুর রহমান, আলী প্রমুখদের কাছ থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা, দুর্ভিক্ষজনিত ক্ষুধার্ত মানুষদের হাহাকার, কাতারে-কাতারে মৃত্যু মহামারির মতো বিভিন্ন রোগে (কলেরা, বসন্ত, অপুষ্টি, কালাজ্বর. আক্রান্ত মানুষদের অসহায়ত্ব ইত্যাদির কথা বিশদভাবে জানতে পেরেছিলাম) তাঁরা প্রায়ই এসব নিয়ে স্মৃতিচারণ করতেন।

কিন্তু সবচাইতে ভয়াবহ বর্ণনা শুনতাম কলকাতার ভয়ংকর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার মর্মন্তুদ ঘটনাবলি নিয়ে। ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে এই দুষ্কর্ম করেছিল যে সেটা তো অবশ্য ইতিহাসেই পড়েছিলাম।

যাই হোক, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুইটি দেশ হলো। ভারত এবং পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তান হলো দুই টুকরো নিয়ে। আমাদের অংশটি হলো পূর্ব পাকিস্তান। দুটি অংশ ভারতের দুই দিকে। অর্থাৎ, মধ্যিখানে ভারত। ১৯৫০-এর দিকে মা-বাবার সঙ্গে দেশের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে বড়দের আলোচনা করতে শুনতাম নতুন দেশের উদ্ভূত হরেক ব্যাপার নিয়ে। এরকমের একদিনের কথাবার্তা ছিল দেশ ভাগ হয়ে দুটি দেশ যে পরস্পরের কাছে বিদেশ হয়ে গেল, তার লাভ-লোকশান নিয়ে। সেই আসরে তখনও ভারতে চলে যাননি এমন হিন্দু বন্ধুরাও ছিলেন তাঁদের। এই অদ্ভুত ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে পরিবারে আমার মামা এবং বাবা তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে যে গল্প তা থেকে কাঁচা মাথায়ও একটা কথা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। আর তা হলো যে শুধু ব্রিটিশদেরই দোষারোপ করা যায় না। হিন্দু-মুসলমান সব দুঁদে রাজনীতিবিদরা স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে ব্রিটিশদের কথায় কান দিয়ে কাণ্ডটা ঘটিয়েছে ধর্মকে টেনে এনে। মামার হিন্দু বন্ধুটি বলেছিলেন হঠাৎ করে ধর্ম এসে গেল সবকিছুর সামনে। দাঙ্গা লাগল। কই আগে তো কোনোদিন বৈরিতা ছিল না। ঠাট্টা করে বলেছিলেন―, নিজ মাটি ছেড়ে আমরা যাব না। তোমরা তাড়িয়ে দিবে নাকি ? বলাবাহুল্য কয়েক বছর পর তাঁরা মালদায় চলেই গিয়েছিলেন। শুনেছিলাম হিন্দু-মুসলিম বিভেদটা কয়েক বছর আগে থেকেই বড় আকার ধারণ করতে শুরু হয়েছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তাই। বিশেষ করে সঙ্গীতে। হিন্দুরা কীর্তন, শ্যামা সঙ্গীতসহ হরেক রকম দিকে চর্চা বাড়িয়েছিল। আর মুসলমান অংশে নাত, হামদ, মর্সিয়াসহ লোকগীতিতেও ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপর জুড়ে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী আধুনিকমনস্ক। তিনি দুদিক নিয়েই কাজ করেছিলেন। এসব বাবা-মামার কথা থেকে জেনেছিলাম।

তাঁদের আড্ডা থেকেই স্বদেশিদের কথা জেনেছিলাম প্রথম। কথাটা ছিল অনেকটা এই রকম যে, স্বদেশী আন্দোলনে প্রাণপাত করে সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, বাঘা যতীন, আসফাকউল্লাহদের মতো অনেকে স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন করে মাটি নরম করে রাখল, আর পরবর্তী রাজনীতিবিদরা ভাগ করে দিল দেশকে তো বটেই; মানুষের সুসম্পর্কটিকেও সাম্প্রদায়িক ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল ইংরেজরা। ভাবটা এই যে, ‘আমরা তো যাচ্ছি, তোরা চিরকাল মার-পিট, খুন-খারাপি নিয়ে থাক।’ তো উপরের কথাগুলোর বিশদ ব্যাপার-স্যাপার তো আরও কয়েক বছর পর ইতিহাস পাঠেই জেনেছিলাম।

কিছু বাল্যস্মৃতি, কিছুটা পাঠ-পঠন আর পরবর্তীকালে পাকিস্তানের বিড়ম্বিত অধিবাসী হওয়ার বাস্তবতা দেখে  জেনেছিলাম যে, সবাই শুরু থেকেই বুঝে গিয়েছিল ভুয়া স্বাধীনতার খপ্পরে পড়া গেছে। আসলে আমাদের ভূখণ্ড পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ বৈ তো আর কিছু না।

এসব তো ফন্দি-ফিকির বোঝার, উপলব্ধি হওয়ার সময়ের কথা। তবে প্রথম থেকেই আন্দোলনে যেতে দেখেছি। কী কী  নিয়ে আন্দোলন তা মনে নেই, তবে জিন্নাহ সাহেবের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা বানাবার ঘোষণার পর থেকে বাংলাভাষার জন্যে আন্দোলনের কথা মনে আছে। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির কথা মনে আছে। তখন ঢাকার অদূরে কালীগঞ্জে বাবার চাকরির সুবাদে থাকতাম। তখন কালীগঞ্জ হাইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম।

ওই দিন হঠাৎ টিফিনের আগেই স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ। কারণটি ছিল ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের ছাত্র-মিছিলে গুলি। অনেকের মৃত্যু হয়েছে, এবং আহতও অসংখ্য। স্কুলের মাঠে ছাত্র শিক্ষকদের প্রতিবাদ-সভা হয়েছিল। স্লোগান দেওয়া হয়েছিল ‘নুরুল আমিনের শাস্তি চাই, ‘শহিদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। নিচের ক্লাসে পড়ুয়া ছাত্র হলেও ব্যাপারটা মনে গেঁথে  গিয়েছিল। ওই বছরের (১৯৫২) মাঝামাঝিতে ঢাকায় চলে আসি। সেই আসাই ফাইনাল। পুরান ঢাকার তখনকার বিখ্যাত স্কুল পগোজে ভর্তির সুযোগ পাই ক্লাস ফোরেই। এসে দেখি স্কুল এবং পাশের জগন্নাথ কলেজের দেয়ালে দেয়ালে ভাষা আন্দোলনের হাতে লেখা পোস্টার সাঁটা। আর প্রায় প্রতিদিন জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের সভা। আর পাড়ায় পাড়ায় মাঝেমধ্যেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। তাতে গণগঙ্গীতের আসর, ছায়ানাট্য নাটিকা ইত্যাদি থাকত। এসবেও ছিল সরকারের নির্যাতন নিপীড়ন এবং বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে প্রতীকী বিষয়াদি।

পরবর্তীকালে আর্ট কলেজে ভর্তির পর জেনেছিলাম আর্ট কলেজের ছাত্ররাও ঢাকার সেই মিছিলে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন। সেই ছাত্ররা দেশের খ্যাতনামা শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসের বিশেষ অংশ হয়েছেন। শিল্পী মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী, মোস্তফা মনোয়ার প্রমুখ তাঁদের অন্যতম।

প্রাইমারি স্কুল, অথবা খোলা মাঠে স্টেজ বানিয়ে হ্যাজাক বা পেট্রোম্যাকস বাতি জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানগুলো হতো। স্টেজ বানিয়ে এভাবে অনুষ্ঠান যে হয়, তা আমার কাছে নতুন দেখা কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না।

এরকমটা প্রথম দেখেছিলাম ১৯৪৭-এ ফতুল্লায় থাকাকালীন। যতদূর মনে পড়ছে ১৪ আগস্টের মাসদুয়েক আগে বাবা তাঁর চাকরির ‘প্রবেশন’ পর্ব শেষে রাজশাহী থেকে সরাসরি ফতুল্লা থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন। উত্তরবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে আমাদের সেই আসাটাই চিরকালের হয়ে গেছে। তাঁর যত বদলির ব্যাপার সবই ঢাকার কাছাকাছিতে। আমার এখন মনে হয় যেন ঢাকা শহরে থিতু হওয়ার আগে আশপাশের ওইসব স্থানে রেখে রেখে রিহার্সেল দেওয়া হয়েছিল। ওরিয়েন্টেশনও বলা যায়। কারণ ওই বছরে এদিককার ভাষার ডায়ালেক্টটা ধীরে ধীরে রপ্ত হতে শুরু হয়েছিল। পরে তো শহর ঢাকার অধিবাসী হয়ে গিয়ে খাস ঢাকাইয়া বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা করে তেমনটাই হয়ে গিয়েছিলাম। সেইভাবে জীবনের উঠতি-পড়তি, শিক্ষাদীক্ষা ভালো-মন্দ সবই ঢাকাকেন্দ্রিকই হয়ে গিয়েছে। ঢাকায় বসবাসের আগে প্রথমে তো ফতুল্লায় আসা। তারপর বিক্রমপুরের লৌহজঙে কিছুকাল থাকা (১৯৫০)। সেখান থেকে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে,  শিবালয় থেকে আবার লৌহজঙে, লৌহজঙ থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জে, তারপর ঢাকা শহরে।

পাকিস্তান হাওয়ার অব্যবহিত পরে বাবার এই যে স্থান বদলে ছোটাছুটি, তা ছিল রীতিমতো ঘূর্ণি চক্করে পড়ে যাওয়া মতোন। ব্যাপারটি যে শুধু তাঁর বেলাতেই ঘটেছিল তা নয়। পুলিশ বিভাগের থানা পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকেই এই কাণ্ডটিতে পড়তে হয়েছিল।

আসলে বাবার কাছেই শুনেছি যে, সদ্য একটি নতুন দেশ হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলার দিকটি মহা গোলমেলে হয়ে পড়েছিল। হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট, দাঙ্গা লাগবার উপক্রম, ধনী পরিবারগুলোতে (মুসলমান-হিন্দু) ডাকাতি, খুনোখুনি এইসব খুব অপ্রতিরোধ্য রূপ ধারণ করতে শুরু হয়েছিল। অতএব পুলিশের খাটাখাটনি বেড়ে গিয়েছিল। সবটা সামাল দিতে নতুন অফিসারদেরকে আজ এ থানায়, তো কিছুকাল পরে অন্যত্র, এই কাণ্ডটি ঘটানো হতো বদলি করে করে। বলতে দ্বিধা নেই যে, ওই বিভিন্ন জায়গায় থাকার ব্যাপারটিতে আমি খুব এক্সাইটেড  থাকতাম। নতুন প্রাকৃতিক দৃশ্য, নতুন স্কুল, নতুন খেলার সাথী মতোন অনেক নতুন-নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন। কোথাও থাকতে থাকতে সাঁতার শিখে ফেলেছি, কোথাও শেখা হয়েছে সাইকেল চালানো, কোথাও ঘোড়ায় চড়া, ঘোড়ার গাড়িতে ভ্রমণ, আর সব জায়গাই নদীমাতৃক বলে নৌকায় চলাফেরা, ইত্যাদি কত কিছুই ঘটেছে। এসব প্রকারান্তরে আমার শিল্পকলাচর্চায় হয়তো সহায়ক হয়েছে অনেক দিক দিয়ে। এমনটা আগে ভেবে দেখিনি। এখন আমার আঁকার বিষয়াদি দেখে অনেকেই তেমন ধারণার কথা বলেন। তা শুনে আমারও মনে হয় যে হয়তোবা তাঁদের কথাই ঠিক।

যা-হোক, ঢাকায় এসে অনুষ্ঠান মঞ্চ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অন্যদিকে চলে এসেছি। আসলে স্মৃতির কপাট একবার খুলে গেলে হুড়মুড় করে অনেক কিছু ভিড় করে। একটার সূত্র ধরে অন্যটা লেজ ধরে ফেলে। আগের কথাই তখন পিছিয়ে যায়। এমনটা আর কারও হয় কি না জানি না। আমার বেলায় হয়। গল্প করতে গেলে অন্যেরা খেই হারিয়ে ফেলে। ঝিমিয়ে পড়ে অথবা অন্য কথায় যায়।

তো, ১৯৪৭-এ প্রথম নাটকের মঞ্চ দেখেছিলাম ফতুল্লায়। যতদূর মনে পড়ছে তখনও ১৪ আগস্টের ঘটনা ঘটেনি। থানার কাছেই বিরাট মাঠ ছিল। সেই মাঠে উঁচু করে মঞ্চ বানিয়ে শচীন গুপ্তের সিরাজদ্দৌলা নাটক অভিনীত হয়েছিল, মহাউদ্দীপনায় অনেকগুলো হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে। মাইক ছিল না। উচ্চস্বরে অভিনেতারা ডায়ালগ বলেছিল। হিন্দু-মুসলমান অভিনেতারা একত্রেই অভিনয় করেছিলেন। বাবার সঙ্গে গিয়ে রিহার্সেলের সময় তাঁদের দেখেছিলাম একরকম, মঞ্চে অভিনয়ের সময় মেকআপ আর সাজ পোশাকের কারণে কাউকেও চিনতে পারিনি। হিন্দু এক লোক আলেয়া এবং আর একজন লুৎফা হয়েছিলেন। তাঁদেরকে চিনতাম। মাঝে মাঝে মাঠে বল খেলতে আসতেন বলে। কিন্তু মঞ্চে মহিলা সাজায় আর চিনতে পারিনি, কণ্ঠস্বর বদলে ফেলেছিলেন। নাটক শেষে বাবার কাছে এসে ‘কেমন হয়েছে’ ইত্যাদি বলার সময় অরিজিনাল পুরুষ কণ্ঠ শুনেছিলাম। খুবই অবাক কাণ্ড বলে, মনে হয়েছিল তখন। বলাবাহুল্য ইংরেজ-বিরোদী নাটক বলেই সেটি মঞ্চস্থ হয়েছিল যে তা বড় হয়ে বুঝেছিলাম।

ফতুল্লা তখন অনেকটাই হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। অদূরে হরিহর পাড়াও ছিল তেমনই। ওই এলাকায় হিন্দু-মুসলিম গোলমাল হয়নি। ১৪ আগস্টের পরও বেশকয়েক মাস সন্ধ্যায় কাঁসর ঘণ্টা, শাঁখের শব্দ শুনতে পেতাম। পরে একসময় তা কমে আসতে শুরু করে। শুনেছিলাম অনেকেই একে একে ভারতে চলে গেছে। অনেককে দেখেছি বাবার কাছে বিদায় নিতে আসতে। তাঁদের অনেককে (মহিলা-পুরুষ) কাঁদতেও দেখেছি।

আর একটি ঘটনায় ওই ছোট্ট বয়সেও খুব মন খারাপ হয়েছিল। পাশের বাসাটি ছিল থানার সেকেন্ড অফিসারের। সবাই বলত মেজো দারোগা, যেমন বাবাকে বলতো বড় দরোগা। তো তিনি ছিলেন হিন্দু। তা অবশ্য তখন জানা ছিল না। তাঁর দুই ছেলেমেয়েই আমার খেলার সাথী ছিল। হঠাৎ একদিন শুনলাম তাঁরা কলতাকায় চলে যাচ্ছেন। তারপর সত্যি সত্যিই একদিন সপরিবারে প্রথমে দেশের বাড়ি ফরিদপুরে এবং সেখান থেকে ভারতবাসী হতে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। এই চলে যাওয়া-যাওয়ির ব্যাপারটি কী বা কেন সেসব বুঝতাম না অবশ্য। তো ওই ফতুল্লার স্মৃতিগুলো আমি কখনওই ভুলি না। ওখানে গাড়ি চাপায় মরণদশা হওয়া, আহত হওয়া, ডাকাতির কারণে সিজ করা, ডাঙায় উপুড় করে ফেলে রাখা নৌকায় চড়ে খেলতে গিয়ে হাত ভাঙা, এ ধরনের বেশকিছু অঘটনের কথা স্মৃতিতে গেঁথে আছে।

তবে সব কিছু ছাড়িয়ে যে ঘটনাটি শরীরে যুক্ত হয়ে আছে, চিরকাল তা তো ভোলার উপায়ই নেই। ব্যাপারটি আর কিছু নয়, মুসলমান হয়ে জন্মাবার কারণে, বিশেষ চিহ্নটি রাখতে গ্রামীণ ওঝার শল্য প্রাকটিস। সেটা একটা কাণ্ডই ছিল বটে। পান দিয়ে চোখ দুটো ঢেকে রেখে কাটাকুটির ব্যাপারটি ঘটাত তখন। তখন ছোট লুঙ্গি পাওয়া যেত না। ছোট ধুতি পরেই কাটিয়ে ছিলাম বেশ কিছুদিন। এমনিতেও ধুতি পরার চল ছিল হিন্দু-মুসলিম সবার মধ্যে। বিশেষ করে উৎসব থাকলে।

১৯৪৯-এর প্রথম দিকে বাবা বদলি হলেন লৌহজঙে। পরিবারকে পাঠিয়ে দিলেন দেশের বাড়িতে। ফতুল্লা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাবার রুটটি ছিল―প্রথমে নারায়ণগঞ্জে তারপর সারারাত স্টিমারে চেপে গোয়ালন্দ ঘাটে যাওয়া। সেখান থেকে ব্রডগেজ ট্রেনে চেপে রাজশাহী পার হয়ে সন্ধ্যায় আমনুরা জংশনে নামা। তারপর পুরো পথ বরেন্দ্র অঞ্চল দিয়ে গরু বা মোষের গাড়িতে মাইল বিশেক পাড়ি দেওয়া। ফিরতি পথটা অতএব উল্টোটা। সবটাই কষ্টের ব্যাপার হলেও ভ্রমণে আমার ভালোই লাগত। দীর্ঘ ভ্রমণ ছিল সেটা সময়ের দিক দিয়ে, দূরত্ব যেমনই হোক পুরো একরাত-একদিনের জার্নি ছিল।

সেবার যাওয়া-আসা দু’পথেই ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। যাবার সময় স্টিমার আর ট্রেনে ছিল হিন্দু পরিবার, ভারতে চলে যাবার জন্যে দর্শনা বর্ডারের যাত্রী। আসার সময় ছিল ভারত থেকে এদিকে আসা অসংখ্য মুসলিম পরিবারের ভিড়। উভয় ক্ষেত্রেই দেখেছি সবার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত উদভ্রান্ত চেহারা, বড় মামা বলেছিলেন নিজ দেশ ছেড়ে কেউ যাচ্ছে ইন্ডিয়ায়, একই কারণে দলে দলে নিজ দেশ ছেড়ে এ দেশে চলে আসছে। উভয়পক্ষেরই অনিশ্চিত যাত্রা। কিন্তু যারা আসতেন, কোনও একটি জংশনে হুলস্থ’ূল করে উঠতেন বাক্স-প্যাঁটরা, পুটলা-পুঁটলি নিয়ে। বেশির ভাগই উর্দুভাষী, কথার কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু তারা খুব মারদাঙ্গা টাইপের ছিল। নতুন দেশে আসছে কিন্তু, সেই দেশের যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। ট্রেনের কামরায় এত ভিড় ছিল যে, খুবই ছোট বলে ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। মামা এ কারণে একজনকে একটু সরে দাঁড়াতে বলামাত্রই উর্দুতে ঝগড়া শুরু করে। মামা তখন রেলওয়েতেই চাকরি করতেন। আমাদের কারণে ছুটি নিয়েছিলেন। তো সে কথা বলে তাকে নিরস্ত করতে গেলে তাদের একজন বলেছিলেন যে তারা পাকিস্তানে এসেছে। এটা তাদেরও দেশ। অতএব সেই জন্যে যেন হুঁশ করে কথা বলেন মামা। আমি খুবই ছোট বলে অতো কিছু বুঝিনি তখন। তবে এখন বুঝি যে, এরকম লোকরাই, অনেকে বাঙালি নিধনে পাকবাহিনীর সঙ্গে ছিল নিশ্চয়ই। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এমন একটা স্বভাব ছিল তাদের। ভুলে গিয়েছিল যে এ দেশটার আসল মালিক যে বাঙালিরাই।

শব্দঘর : আপনি নিজে নানাভাবে আনন্দময় শৈশবের কথা বলেছেন। সেই শৈশবের কথা বলুন।

রনবী : ছেলেবেলাটা তো এমনিতেই আনন্দের। স্কুল আর পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলায় দিন কাটতো। ব্যাপারটাই সব চাইতে আনন্দের, যেদিন লেখাপড়ার চাপ কম থাকতো সেদিন তো কথাই নেই, খেলার জন্যে কাউকে না পেলে রাফ খাতায় আঁকাআঁকি দাগাদাগি নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। নইলে গল্পের বই পড়তাম। সঙ্গীদের পেলে স্কুলের মাঠে খেলাধুলায় মাততাম। এটা অবশ্য ঢাকায় আসার পরের রুটিন।

আগেই বলেছি যে, আমি বাবার চাকরির সুবাদে দেশের নানা জায়গায় থেকেছি (প্রত্যেকটি স্থানেই আমার ছেলেবেলাটা চমৎকার কেটেছে। বসবাস করেছি বিভিন্ন নদীর ধারে। অর্থাৎ সর্বত্রই নদ-নদীর কিনারে বসবাস করেছি। আত্রাই, যমুনা, পদ্মা, শীতলক্ষা মনে রাখার মতো। এ ছাড়া দেশের বাড়ির কাছাকাছি মহানন্দা তো আছেই।

মনে আছে লৌহজঙ থানার প্রায় কাছেই ছিল পদ্মা। দিন-রাত মিলিয়ে তিনবার স্টিমার আসত। ভিড়ত গিয়ে অদূরে দিঘলী নামের বাজার-ঘাটে। স্টিমারের ভোঁ করা তীব্র হুইসেলের শব্দ শুনলেই বাসা থেকে দৌড়ে বের হতাম দেখতে। চাকাওয়ালা স্টিমারগুলো দেখলেই দেশের বাড়ির কথা মনে হতো। তবে বাড়িতে যাবার জন্যে যে স্টিমারেই যাওয়া হতো, ভ্রমণের সব চাইতে আনন্দিত সময় কাটত স্টিমারে, সেই সবই মনে আসত বেশি। মাঝে মাঝে ইলিশ ধরা নৌকাগুলোর কাছে যেতাম থানার বড় নৌকা করে। অবাক হতাম বিশাল-বিশাল ঢেউয়ে নৌকায় বসা নির্ভয় জেলেদের সাথে আমার বয়সী ছোট্ট ছেলেদের সাথে নেওয়া দেখে। নৌকাগুলি কি চলত নাকি স্থির দাঁড়িয়ে থাকত তাই নিয়ে তর্ক হতো সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে। ভালো লাগত অসংখ্য নানা রঙের পাল তোলা নৌকা দেখতে।

পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান কাউন্সিল আয়োজিত চিত্রকলা প্রদর্শনী যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বর্ধমান হাউসে, বলা হতো মুখ্যমন্ত্রী নরুল আমিনের বাড়ী। সেখানে গিয়েছি বাবার সঙ্গে। অবাক হয়েছিলাম শিল্পীদের আঁকা পালতোলা নৌকার ছবি দেখে। মুগ্ধ হয়েছিলাম, তবে তখনও ছবি আঁকার ব্যাপারটি পেশা হয়ে যাবে জীবনে, এমনটা মাথায় ছিল না। এমনি পেন্সিলে আঁকাআঁকি করতাম বাবাকে দেখে। শিল্পীরা কেমন হন, কি করে আঁকেন কিছুই জানতাম না।  যেটুকু জানতাম তা বাবাকে ঘিরেই। সেই চিত্র প্রদর্শনটিই আমার জীবনের প্রথম দেখা প্রদর্শনী এবং বড় বড় শিল্পীদের, শিল্পকলার ছাত্রদের আঁকা অনেক-অনেক ছবি একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা। অতো ছবি দেখার পরও অবশ্য শিল্পী হবার কোনও ভাবনা মনে আসেনি। শিল্পী কেমন করে হয় তাইই জানতাম না।

কিন্তু স্কুলে পড়াকালীন ফাইভ-সিক্স ক্লাসের সময় থেকেই সিনেমা দেখার নেশায় পেয়ে গিয়েছিল। ছোটদের দেখার মতো ইংরেজি সিনেমা আসলে মেজো মামার সঙ্গে দেখতে যেতাম, বাবাই সুযোগটা করে দিতেন। টারজান ছিল প্রিয় ছবি। প্রথম দিকে সাদা-কালোতে ওয়েজ মুলার অভিনীত টারজান দিয়ে শুরু। পরে গর্ডন স্কট, স্টিভ রিভসদের রঙিন টারজান দেখে অভিভূত হতাম। আর দেখতাম ওয়েস্টার্ন বা কাউবয় সিনেমাগুলো। এসব সিনেমায় বাড়তি লাভ ছিল একটা ছবি শুরুর আগে প্রায়ই ডিজনির কার্টুন এনিমেশন অথবা থ্রি-স্টুজেস দেখাত। সেগুলো খুব বড় হতো না, কিন্তু মজার হতো।

একটু উঁচু ক্লাসে উঠতেই এবং বাড়িতে বাবা-মার কাছ থেকে একা একা বহির্মুখী হবার একটু একটু ছাড় পেতেই সিনেমা পছন্দের লোভটা অন্যদিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। পঞ্চাশ দশকেও ভারতের বাংলা এবং হিন্দি ছায়াছবি হলে হলে―চলতো খুব। দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, দেবানন্দ, আশোককুমারসহ অনেকের ছবি আসলেই দেখে ফেলতাম হিন্দি ছবি। তাদের নায়িকারা বিশেষ করে নার্গিস, মধুবালা, মিনা কুমারী, কামিনী কৌশল, নলিনী জয়ন্ত, গীতাবালি, প্রমুখ থাকলে ছবিগুলোর প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম।

তবে সবচাইতে আকর্ষণ বোধ করতাম বাংলা ছবি দেখায়। তার কারণটি ছিল হয়তো এই যে, শিশুতোষ বয়সে মা আর মামির সঙ্গে গিয়ে কাননদেবী, যমুনা, সন্ধ্যা রায়, মলিনা দেবী। প্রমথেশ বড়ুয়া, পাহাড়ি সান্যাল, রবীন মজুমদার, ছবি বিশ্বাস, বিকাশ রায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, অসিতবরণ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়,  তুলশী চক্রবর্তী আরও অনেকের সামাজিক গল্পের ছবি দেখতাম। সে সব লেখাপড়া শুরুর আগের ঘটনা। বুঝতাম না কিছুই। তবে তিন ঘণ্টা  ছবি চলার মধ্যে মাঝে মাঝেই এটা সেটা খাবার খেতে দিতেন মা, সেটাই ছিল আকর্ষণ।

একটু ওপরের ক্লাসে উঠেই পেয়ে গিয়েছিলাম রোম্যান্টিক সিনেমার স্বাদ। প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপার তখনও মাথার বাইরেই ছিল। ভাবতাম ওসব বড়োদের ব্যাপার। তো তেমন সব ছবির নায়ক নায়িকাদের মধ্যে উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চ্যাটার্জিদের ভালো লাগত। তারপর তো ১৯৫৬তে ঢাকায় মুখ ও মুখোশ দিয়ে নিজেদের কলাকুশলীদের নিয়ে ছবি শুরু হয়। সে সব দেখে খুব মজা পেতাম। ঢাকার ছবি মুক্তি পেলে টিকিট পাওয়া কঠিন হতো। ভালো লাগত ঢাকার পরিচিত রাস্তা, গাড়িঘোড়া, দালান-কোঠার ছবিসহ কোনও কোনও চেনা মানুষদের পর্দায় দেখে। সিনেমা দেখতে যাবার আর একটি মজার দিক ছিল যে, হলে চুপচাপ কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা। নিজে একটু হাবলু-গবলু টাইপের ছিলাম বলে বেশি দৌড়ঝাঁপে যেতাম না। তাই ফুটবল খেলায় সহসা নামতাম না। একবার কিক মারতে গিয়ে বলের ফিতায় লেগে বুড়ো আঙ্গুল ভেঙে গিয়েছিল। ক্রিকেট খেলতাম। খেলতে গিয়ে কলার বোন ভেঙেছিল। মা বলেছিল  ‘যা পারিস না, করতে যাস কেন? দুনিয়ার সব ছেলেরা খেলছে তাদের তো কিছু হয় না! অকর্মার ধাড়ি একটা তবে হ্যাঁ মারবেল আর লাট্টুতে এক্সপার্ট ছিলাম, ভালোও লাগত, কারণ দৌড়ঝাঁপ ছিল না এসবে। ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম না। একটু উপরে উঠলেই গোত্তা খেয়ে পড়ে যেত।

তাই এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে গল্পের বই, কলের গানে গান শোনা, আর রাফ খাতায় ড্রইং করতে মন দিতাম। এইট-নাইনে পড়ার সময় সহপাঠীদের অনুরোধে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি এঁকে দিতাম। এই অনুরোধের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকাটি থাকত আমার চাইতেও বেশি সিনেমার পোকা হওয়া এটি এম শামসুজ্জামানের। তা এতটাই যে, সে সিনেমার অভিনেতাই হয়ে গিয়েছিল এবং দারুণ জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে গিয়েছিল। শক্তিধর অভিনেতা হয়েছে আরও একজন সহপাঠী―প্রবীর মিত্র।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় নতুন এক ছাত্র ভর্তি হলো। শুনলাম নামকরা এক জজ সাহেবের ছেলে। বয়সটা অবশ্য আমাদের চাইতে বেশি ছিল। সেটা নিজেই বলে দিয়েছিল এই বলে ‘দেখ আমি কিন্তু বয়সে সিনিয়র। মান্যি-গন্যি করবি।’ বয়সের ব্যাপারটা বোঝাই যেত। কারণ শেভ করত। আমাদের দাড়ি-মোচ তখন উঠি-উঠি করছে মাত্র। দেখা যায়―যায় না অবস্থা কিন্তু সে ছিল হ্যান্ডসাম। স্বল্পভাষী এবং দারুণ ভদ্র। কয়েকদিনেই অবশ্য বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। একদিন হেডমাস্টার মনীন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য ইংরেজি ক্লাসে এসে তাকে বললেন যে, সিনেমা-নাটকে গেলে তাকে মানাবে খুব। কী আশ্চর্য সেটাই তার জীবনে ঘটেছিল। এবং সিনেমার খ্যাতিমান নায়ক হয়েছিল। সিনেমার মানুষরা এখনও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। এই বন্ধু-নায়কটির নাম আজিম।

তো, আমি বাল্যকালে সব ব্যাপারে নেহায়েতই দর্শকের ভূমিকায় ছিলাম। অতো সিনেমা দেখেছি কিন্তু অভিনেতা হবার ইচ্ছে হয়নি কখনও। সেটার জন্যে যে প্রতিভা প্রয়োজন তা অন্যদের মধ্যে দেখলে অবাক হতাম। কলেজে ভর্তির পর ষাট দশকে সিনেমা দেখার রুচি পাল্টায়। বিশেষ করে সত্যজিত রায়, মৃনাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, ডি সিকা, ফেলিনি, গদার, রোমান পোলনস্কি, ডেভিড লিন, হিচ কক প্রমুখদের ছবি দেখার মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। সেই সাথে রাশিয়ান কিছু ছবিও ছিল। সুযোগ পেলে এখনও দেখি। গানের গুণমুগ্ধ শ্রোতা ছিলাম, কিন্তু গায়ক হবার বা যন্ত্রী হবার ইচ্ছে হয়নি। মনে হতো অতি কঠিন ব্যাপার তা ছাড়া অনেক মানুষের সামনে গাওয়ার ব্যাপার! অতো সাহস ছিল না। ক্লাসের বাধ্য-বাধকতার পড়ালেখার চাইতে অন্য বই পড়তে ভালো লাগত। কিন্তু লেখক হবার কথা ভাবিনি। তেমনি স্কুল জীবনে ছবি আঁকতাম ঠিকই কিন্তু শিল্পী হবার কথাও ভাবিনি কখনও। স্কাউটিং করতাম। স্কুলের গ্রুপ লিডারও ছিলাম। খাকি পোশাক পরা হতো। প্যারেডে নেতৃত্ব দিতাম। কিন্তু বাবার মতো পুলিশ হবো কিংবা মিলিটারি হবার বাসনা জন্মেনি। স্কুলে পড়ার সময় ঢাকায় প্রায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক কুস্তির আসর বসত। বিশ্বের বড় বড় কুস্তিগিরেরা আসত। কিছু কিছু নাম এখনও মনে আছে। যেমন পাকিস্তানের ভুলু পালোয়ান, আসলাম, আক্রাম, ভারতের গামা, অস্ট্রেলিয়ার জর্জ জাবিস্কো, চায়নার ওং বার্কলি প্রমুখ।

মহা উৎসাহে কুস্তি দেখতাম, ভালো লাগত কুস্তিগিরদের প্যাঁচ-গোচ ফ্লাইং কিক দেখে আর সব দর্শকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উত্তেজনায় আমিও চিৎকার করতাম; নিজের আলস্যে চুপচাপ থাকা স্বভাবটিকে বেমালুম ভুলে গিয়ে। আমাদের বেশ কয়েকজন সহপাঠী সে সব দেখে সদরঘাটে কায়দে আযম শরীরচর্চা কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে কুস্তিগির হবার চেষ্টায় নেমেছিল। কিছুদিনের মধ্যেই শরীরের নানা দিকে মাসল বানিয়ে ফেলে আমাদের দেখাত। কার বাইসেপ ট্রাইসেপ, বুকের ছাতি কত শক্ত হয়েছে ক্লাসে এসে দেখাত গর্ব করে। ভালো লাগত দেখে। কিন্তু শরীর জোড়া ওইরকম গুটলি-মুটলি মতোন শক্ত মাসল বানাবার ইচ্ছে কখনও হয়নি।

ক্রিকেটে খুব মজা পেতাম। বিদেশি সব টিমই তখন টেস্ট খেলতে আসত। পল্টনে কাঠের গ্যালারিওয়ালা  স্টেডিয়ামে প্রত্যেকটি খেলাই দেখতাম। বিশ্বের নামি দামি প্রায় সব খেলোয়াড়দের খেলাই দেখেছি, খেলা দেখার সময় মনে হতো তাঁদের মতো ক্রিকেটার হতে পারলে দারুণ হতো। কিন্তু ভাবনাটুকু পর্যন্তই। বন্ধুদের সঙ্গে এপাড়া সে পাড়ার বিরুদ্ধে খেলেছিও অনেক; কিন্তু তাতেও শেষমেশ মন বসেনি। মনে হতো অতো কষ্টের দিক নিয়ে ভেবে লাভ কী! বসে থেকে আরামে খেলা যায় এমনটাই ভালো। তার মানে লুডু, ক্যারম,  দাবা এসব। কিন্তু লুডুতে চোরামি প্রয়োজন যাতে মেয়েরা এক্সপার্ট। ক্যারমে দক্ষতা, আর দাবায় অসীম ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন। এসব কোনোটাই আমার ব্যাপারে খাটত না। তবে ধৈর্যের ব্যাপার একেবারে ছিল না, তা নয়। আঁকতে বসলে বেশ ধৈর্য নিয়ে তা করতাম তবে অন্য সব দিক নিয়ে মনে হতো এসবে ধৈর্য রাখা অহেতুক সময় নষ্টের ব্যাপার। অতএব সেসব দিকেও যাইনি। তাই গুরুজনরা যা বলার তাই বলতেন,  ‘তোর দ্বারা কিছুই  হবে না।’

তবে কিছু না করতে পারা আর না-ভাবতে পারায়ও এক ধরনের আনন্দ পেতাম। ‘এই বেশ ভালো আছি’ ভাবতে পারার আনন্দ। তবে আনন্দ পেতাম স্কুলের স্কাউটিংয়ের সময়ে ‘দেয়াল পত্রিকা’-বের করে। কারণ তাতে পুরোটায় সবার গল্প-কবিতা প্রবন্ধ নিজের হাতে লিখতে হতো। সবগুলোর ইলাস্ট্রেশন করতে হতো এবং সুন্দর করার চেষ্টা করতাম। আর একটা কাণ্ড করতাম,―নিজেই সম্পাদক ছিলাম বলে নিজের লেখা গল্প, ছড়া রাখার সুযোগটা নিয়ে নিতাম নির্বিঘ্নে, ওই দেয়াল পত্রিকাটিতে কিন্তু অসীম ধৈর্য আর অধ্যবসায় থাকতেই হতো। মহা আনন্দের ছিল যে, বলাই বাহুল্য।

আনন্দ হতো সাইকেল চেপে ঢাকার সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে। অবশ্য ঢাকা তখন তো নিতান্তই ছোট শহর ছিল। দশ মিনিটে সদরঘাট থেকে রওনা দিয়ে মতিঝিল, চল্লিশ মিনিটে পোস্তাগোলা থেকে নওয়াবগঞ্জ পৌঁছে যাওয়া যেত। বাবার এই র‌্যালি সাইকেল যন্ত্রটি ছিল আমার ছেলেবেলার সঙ্গী। তবে কখনোই সাইকেলে স্কুলে যাইনি। কোনও ছাত্রই তা করত না। শুধু আমাদের এক সহপাঠী মরিস মাইনর গাড়িতে আসত। আর বইপত্র নিয়ে আসত ছোট একটি চামড়ার বাক্সে। বাকিরা ছিলাম পায়দল পার্টি। আসলে হেঁটে দলবলে নানা বিষয়ে বালখিল্য আনতাবাড়ি গল্প করতে করতে স্কুলে যাবার ব্যাপারটা ছিল খুবই আনন্দের, বন্ধুত্বটা খুব গাঢ় হয়ে যেত। সেই সাথীদের অনেকেই এখনও বন্ধু।

যা-হোক, বাল্যকালটা নানা দিক দিয়ে আনন্দের ছিল তো বটেই, ঢাকার অবস্থাটিও চমৎকার ছিল। তখন ঢাকায় এলাকা ভিত্তিক সর্দার প্রথা চালু ছিল। সবাই মান্যি-গুন্যি করতো। ভয়ও পেতো। কাদের সর্দার, মতি সর্দার, রশীদ সর্দার, মজ্জু সর্দার, পিয়ারু সর্দার, প্রমুখ খুব বিখ্যাত ছিলেন। তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় সবকিছুর দিকে নজর রাখতেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজ যাতে উচ্ছন্নে না যায় সে দিকেও বেশ কড়া নজর রাখতেন। সাংস্কৃতিক বিষয়েও উৎসাহ দিতেন। তাতে পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠানাদি হতো। কাদের সর্দারের এক ছেলে দেশের বিখ্যাত চিত্রকর হামিদুর রহমান আর এক ছেলে খ্যাতিমান নাট্যকার সাঈদ আহমেদ। পিয়ারু সর্দার বায়ান্নোর ভাষা শহিদদের স্মরণে প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণে সব মাল-মসলা দিয়েছিলেন। আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। সাহসী ভূমিকার জন্যে এখনো সবাই তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। আমরা যে পাড়ায় থাকতাম সেখানে পড়শি ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সমর দাশ, নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল, রওশন জামিলসহ আরও অনেকেই। সেই পাড়ায় (রোকনপুর-কলতাবাজার-পাঁচভাই-ঘাট লেন) প্রায়ই অনুষ্ঠান হতো প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। যতদূর মনে পড়ছে স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন সমর দাশের মা। আমার ছোটবোন সেই স্কুলের ছাত্রী থাকায় এঁদের বাসায় যাবার সুযোগ ছিল। সমর দাশকে দেখতাম পিয়ানো বাজাতে। তা শুনে এত ভালো লাগত যে, মনে হতো জীবনে ওই যন্ত্রটি বাজানো না শিখলে সবই বৃথা। তো তাঁর বাসায় সঙ্গীতের অনেককে আসতে দেখতাম। সবাই সঙ্গীত নিয়ে আলাপ করতেন। আসতেন আনোয়রুল্লাহ খান, আবু বকর সিদ্দিকসহ অনেকে। আমাদের অর্থাৎ ছোটদের উপস্থিতিতে কখনওই বিরক্ত হতেন না। তাঁদেরকে আরও বড় আকারে আড্ডা দিতে দেখতাম নৃত্য ও অভিনয়শিল্পী রওশন জামিলদের বিশাল বাড়িটিতে। তিনি ছিলেন তখনকার অর্থাৎ পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকের জনপ্রিয় পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন মনুভাইয়ের খালা। ওই আসরে আসতেন বিখ্যাত গিটার বাদক ওয়ারেশ সাহেব, পান্না আহমেদ প্রমুখ। পড়শি হিসেবে তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ছোট বলে খুব আসকারা পেতাম যে তা নয়; কিন্তু তাঁদের সঙ্গে সেই পরিচয় সূত্রে পরবর্তীকালে বেশ ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম। ছেলেবেলায় দেখা যে ঢাকা তা আর এখন নেই। বৃদ্ধি হতে হতে, বিস্তৃত হতে হতে এখন আমার সেই চেনা ঢাকা, যেখানে আমি নিজেকে তৈরি করেছি, তার নাম মুখে মুখে সবাই বলে―‘পুরোনো ঢাকা’, সেটাও অনেক দিক দিয়েই বদলে গেছে। সেই মজার ঢাকা, রসের ঢাকা, রসিক মানুষের ঢাকা, আর তেমন নেই। কোনও কারণে ওদিকে গেলে মন খারাপ হয়। বাঁধ দেওয়া সদরঘাটটি খোলামেলা চেহারা হারিয়েছে। সেখানে হাওয়া খেতে যাওয়ার আর উপায় নেই। খাট-পালঙ্ক ড্রেসিং টেবিলে সুসজ্জিত পিনিশ নাওয়ের সরি আর ভিড়ে থাকে না। ভাসমান নৌকায় মুসলিম হোটেল, হিন্দু হোটেল নামের কিছু নেই। এসবের সুস্বাদু খাবারও হারিয়ে গেছে।

অথচ ওসবে স্কুলের ওপর ক্লাশের পড়ুয়া থেকে শুরু করে কলেজ জীবনেও প্লান করে ইলিশ ভাজি দিয়ে ভাত খেতে যেতাম। রূপমহল সিনেমা হল, যেটি শুধুই বাংলা ছবি দেখাত, সেটা বিলুপ্ত হয়েছে। মনে আছে এটিকে ঘিরে কী দারুণ সব আনন্দিত সময় কাটিয়েছি স্কুলে পড়ার সময়। আনন্দের মূলে ছিল ‘সিনেমা-কেবিন’ নামের কাঠ আর টিনের দোতলা রেস্তোরাঁ। সেই ছিল সিনেমা হলের গা ঘেঁষে। হলটির সামনের দিকে টিনের চাল কিছুটা ভাঙা ছিল। রেস্তোরাঁর দোতলায় কোণের টেবিলে বসলে হলের কিছুটা স্ক্রিন দেখা যেত।

আমরা বন্ধুরা মিলে সুচিত্রা-উত্তমের সিনেমা চললে মাঝে মাঝে গান শোনা এবং গানের দৃশ্যগুলো ম্যাটিনি শোর সময়ে ওই কোণে গিয়ে ভাঙা ফাঁক দিয়ে দেখতে বসতাম; কড়কড়া স্পেশাল পরোটা আর ভাজির অর্ডার দিয়ে। যথারীতি স্কুলের শেষ দিকের দু-একটা ক্লাসে ফাঁকি দিয়ে কাণ্ডটি ঘটাতাম।

অসংখ্য ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ, ফুলবাড়ির স্টেশনে রেল গাড়ির হুইসেল, ইসলামপুরের কালাচাঁদ গন্ধবণিক, সীতারাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিষ্টি, পাহলোয়ানের মোরগ পোলাও, পাটুয়াটুলিতে ‘ডস’ অ্যান্ড কোং নামের রেকর্ডের দোকান থেকে ১০টাকা দিয়ে রেকর্ড কেনা। পাটুয়াটুলির চৌরাস্তার মোড়ে অবস্থিত বিদেশি ব্যাংকের লিফটে (তখনকার ঢাকায় একমাত্র লিফট) চড়ে ওপর-নিচ করা (লিফটম্যানকে এক আনা বকশিশ দিয়ে)―এসব নিয়ে ঢাকায় বাল্যকালের আনন্দ উপভোগের স্মৃতি, কথা এখন ভাবলে নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। ভাবনায় আসে কী চমৎকার বাল্যকালটাই না কাটিয়েছি। এ তো গেল ঢাকার কথা। দেশের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জেও ছেলেবেলায় দিনকাল কেটেছে, সেই আনন্দও কম ছিল না। প্রতিবছর আমের মৌসুমে যাওয়া হতো। থাকা হতো বেশির ভাগ সময় নানা-মামাদের বাড়িতে। গাছপাকা আম খাওয়ার স্বাদ এখনও জিবে লেগে আছে যেন। গেলেই ঝড়-বৃষ্টিও পেতাম। সেই তুমুল ঝড়ে ধুপধাপ করে পড়া আম কুড়ানোর  প্রতিযোগিতা যে কী আনন্দের ছিল, তা বলার নয়। আর থাকত আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ায় ধুম। প্রতি সকালে ওই অঞ্চলের বিশেষ খাবার কালাইরুটি খাওয়ার লোভ সামলানো যেত না। সেই লোভটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের সময়ে এক রকম আনন্দ আর শীতের সময় অন্য রকমের। পিঠা আর খেজুরের রস থাকত বাড়িতেই। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই বিভিন্ন গ্রামে আম বাগানের নিচে বসত আলকাপ, গম্ভীরা ইত্যাদি লোকসঙ্গীতের আসর। মহা ধুমধামে হতো সেসব। গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই মহানন্দে তা দেখত প্রায় সরারাত ধরে। আমি সমবয়সি বন্ধু এবং মামাদের সঙ্গে যেতাম এবং সারারাত ধরে শুনতাম। সকালে ফিরলে মা এবং নানার প্রচণ্ড বকা হজম করতে হতো। এসব ছাড়াও আনন্দের দিক ছিল পরিবারের সঙ্গে গরুর গাড়িতে করে দূরবর্তী গ্রামে কোনও আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার ব্যাপার। এসব নিয়ে দারুণ আনন্দে দিন কাটত। স্কুল যাওয়া নেই, পড়া নেই, না-পড়ার জন্য শাস্তি নেই, এমন মুহূর্তগুলোর আনন্দ ছিল অপরিসীম।

শব্দঘর : আপনি বড় হয়ে শিল্পী হবেন। এমন স্বপ্ন কি শৈশবে দেখেছেন ?

রনবী : এ প্রশ্নটা আমাকে সবাই করে থাকে। প্রত্যেকবারই উত্তর দিতে গিয়ে ভেবেছি যে আসলেই কি শিল্পী হবার স্বপ্ন দেখতাম ছেলেবেলায়। সত্যি বলছি ক্লাস নাইন-টেনের আগে পর্যন্ত এসব নিয়ে কোনও ভাবনাই ছিল না। স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা। বাবাকে দেখে আঁকিবুকি করতাম আপন-মনে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা খুব কাছে চলে আসছিল ক্রমশ। তাই সেটার প্রস্তুতি লেখাপড়া নিয়ে পাগল অবস্থা। অন্য কিছু ভাবার সুযোগই ছিল না। আর তারও আগে তো বহু মাস পর্যন্ত জানতামই না যে ছবি আঁকা বা শিল্পকলারও শিক্ষা-দীক্ষা প্রয়োজন। শিল্পী বানাবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। ছবি আঁকার বড় বড় নামিদামি সব বিখ্যাত শিল্পী রয়েছে বিশ্বজুড়ে, এসব একটু একটু জানতাম কিন্তু তারা কি বিষয়ে লেখাপড়া করে শিল্পী হয়েছিলেন, তা জানতাম না।

বরং অন্যান্য অনেক দিক নিয়ে ভাবতাম। যেমন ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় প্রথম প্রথম ইচ্ছা হতো যে সিনেমা হলের গেটম্যান হব। তা হতে পারলে আরামসে সব সিনেমা দেখা যাবে রোজ-রোজ। ইচ্ছা হতো রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হব। তাতে হেব্বি পোলাও গোশত খাওয়া যাবে প্রতিদিন।

ফতুল্লায় থাকার সময় বাবার বন্ধু এক হিন্দু ভদ্রলোক আমাদের পুরো পরিবার এবং তার পরিবারসহ ঢাকার বিমানবন্দরে অ্যারোপ্লেন দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি সেখানকার কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে থাকা একটি ডাকোটা প্লেনে উঠে ককপিটসহ পুরোটা দেখিয়েছিলেন। তখন ককপিটে দুজন পাইলটও ছিলেন।

বাসায় ফিরে মনে হয়েছিল যে পাইলট না হলে জীবন বৃথা। আকাশে উড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা তবে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় বাজে দুইটা ইচ্ছা মনে ভর করেছিল। এই সময় কোনও একটা বাংলা সিনেমায় দেখেছিলাম যে নায়ক এক বাড়িতে লজিং মাস্টার ছিল এবং বাড়ির ছাত্রীর সঙ্গে প্রেম করে। ওই সময়টায় প্রেম শব্দটা একটু-একটু বোঝার মতো ব্যাপার ঘটতে শুরু করেছিল মাত্র। তো এটা দেখে মনে হয়েছিল লজিং মাস্টার হব বড় হয়ে। আর একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হতো ওই সময়েই। তখন প্রায়ই দেখতাম যে বড়সড় গোঁফের দুদিকে সরু করা এবং খুব মোটাসোটা এক লোক তখনকার খুব ভারী একটা বিএসএ মোটরসাইকেল চালান। আর মোটরসাইকেলটির বাঁ পাশে চাকা লাগানো একটা প্র্যাম গাড়ী থাকতো। তাতে একটাই আসন। সেই আসনে খুব পাতলা শাতলা তার স্ত্রী আর একটা পিচ্চিকে কোলে বসিয়ে খুব নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ান। ভদ্রলোক কি করতেন জানি না। কিন্তু আমি বড় হয়ে যা-ই করি না কেন ওই রকম মোটরসাইকেলে বউ নিয়ে ঘুরে বেড়াব চিন্তাটা হতো খুব। তো এটা কোন পেশার চিন্তা ছিল না। ছিল স্বাদ-আহ্লাদ মিটাবার ভাবনা।

তো এই রকমের সব অদ্ভুত ভাবনা বা ইচ্ছা হতো। কিন্তু শিল্পী হবার স্বপ্ন বা বাসনা তখনও মনে আসেনি। তবে নাইন টেনে পড়ার সময় থেকে পরিবারে, স্কুলে, পাড়ায় অনেককে বলতে শুনতাম যে ছেলেটার আঁকার হাত ভালো। ওই লাইনের লেখাপড়ায় গেলে ভালো করবে। সেসব শুনতে শুনতে মাঝেমাঝে ভাবনায় আসত যে সত্যি সত্যি তেমনটায় গেলে কেমন হবে। কিন্তু সে সবের লেখাপড়া কেমন তাও জানা ছিল না। অতএব ভাবনাটাকে খুব বেশি এগোতে দিতাম না। শুনেছিলাম ওখানে গেলেও ম্যাট্রিকটা পাস করতেই হবে। এবং এও শুনেছিলাম যে শুধু এই পাসই নয়, ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলে তবেই পড়া হবে, নচেৎ নয়।  অতীত নিয়ে স্বপ্ন নয় পুরো, ভাঙা ভাঙা আধো-আধো স্বপ্নের ব্যাপার ঘটত। ভাবনা হতো এই রকমের যে, বাবা-মা যা চাইবে তাই করব, তবে ম্যাট্রিকের পর্যায়ে ভালোয় ভালোয় শেষ হোক।

শব্দঘর : আপনি স্মৃতিকথায় লিখেছেন―শৈশব কৈশোরে প্রকৃতি আপনাকে খুব আকৃষ্ট করত। ওই প্রকৃতির সুন্দরে আপনি বড় হয়েছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য শিল্পী হতে আপনার সহায়ক হয়েছে কি ? না কি মূল প্রেরণা ? 

রনবী : আসলে আমাদের দেশটা অপূর্ব সুন্দর। এই কথা যখন বলি তখন প্রকৃতি, মানুষ, জীবজন্তু, পাখ-পাখালিসহ অনেক কিছুই ভাবনায় আসে। আগেই কোনও একটা উত্তরে এই প্রশ্নের কথাগুলো বলা হয়েছে। তবু আবার বলছি যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকেছি বলে হরেক গ্রাম, অনেক শহর দেখা হয়েছে। আসলে সেসবকে ঘিরে সেসবের মধ্যে বসবাস করেই বড় হয়েছি। উত্তরের মালভূমির গা ঘেঁষে নিজের গ্রাম। সেইখানে থেকেছি, বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালদের জীবনাচার দেখেছি। উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো সেখানকার অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য কাছ থেকে দেখেছি, দেখি।

নদীমাতৃক সমতলে থেকেছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি। এতে ফসলের ক্ষেতে খেটে খাওয়া চাষিদের জীবনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সময় পেলেই সমুদ্রের ধারে গিয়েছি। মিনিটে মিনিটে পানির রং বদলাতে দেখেছি। বিশাল ঢেউয়ের গর্জন করে সৈকতে আছড়ে পড়া দেখেছি। এখানো সুযোগ পেলে দেখতে যাই সাম্পান নিয়ে ছেলেদের ঢেউ পেরিয়ে দিগন্তের দিকে যেতে দেখেছি। পাহাড় দেখতে গিয়েছি। পাহাড়িদের কষ্টের জীবন দেখেছি। সবটাই শিল্পী বনে যাবার আগে থেকেই দেখা।

এই দেখা মনে গেঁথে আছে। সেটাই স্বাভাবিক। যখন দেখেছিলাম বাল্যকালে, তখন হাতে তো ক্যামেরা ছিল না। যা কিছু দেখা সবই মনের মাঝে ছবি হয়ে বসা।

নদীর কূল, তাতে গাঁয়ের বধূ-কন্যাদের কলসি কাঁখে ঘাটে আসা, অবারিত ফসলের মাঠে চাষিদের লাঙ্গল কাঁধে গরু নিয়ে যাওয়া, সওয়ারি টাপর দেওয়া গরুর গাড়ি করে চলাফেরা। মোষের গাড়িতে ফসল বোঝাই করে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে কৃষকের ঘরে ফেরা, নদীতে জাল ফেলে জেলেদের সারা দিন, সারারাত মাছ ধরা, এরকম কতকিছু যে দৃশ্য হয়ে মনে ধরা পড়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই।

কিন্তু সেসব থেকে যে প্রেরণা পাই তা হয়তো নয়। এইসব দেখে, স্টাডি করে মনের বোধ তৈরি হয়েছে নির্ঘাত যা রং-রস-রেখা-গঠন-আকার-আকৃতি, পরিপ্রেক্ষিত ইত্যাদি যা কিছু নান্দনিক ব্যাপার স্যাপার আছে, সবই শিল্পীদের সৃষ্টি―ভাবনার সহায়ক। আর সবার মতো আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে হয়তো।

শব্দঘর : আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর্ট কলেজে। শিল্পকলা বিষয়ে পড়তে কেউ প্রণোদিত করেছেন কি না ?

রনবী : কেউ জোর করেনি। আমিও জেদ ধরিনি। বাবা-মা আত্মীয়―স্বজনকে শুধু কানাঘুষা করতে শুনেছিলাম। আঁকার হাত ভালো। ছেলের ইচ্ছার উপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। স্কুলের কোনও কোনও শিক্ষকও বলেছিলেন। সহপাঠীরা নটরডেম, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ভর্তি হওয়ায় আমি দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু বাবাই ঠিক করে দিয়েছিলেন সিদ্ধান্তটা। বলেছিলেন ‘ভর্তি পরীক্ষায় উতরে গেলে আর্ট ইনস্টিটিউটেই যা। দেখ কিছুদিন কেমন লাগে।’

আসলে আমার বাবার কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। ভর্তি পরীক্ষায় অ্যালাউ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে তা আর হয়ে ওঠেনি। তারপর তো একমাত্র ছেলে বলে আমার দাদি তাকে দাদার মতো পুলিশের চাকরিটা নিতে বলেছিলেন। এবং সংসারী করে দিয়েছিলেন অবস্থার চাপে।

শিল্পী হবার বাসনা চরিতার্থ না হওয়ায় তিনি বড় ছেলেকে চারুকলায় দিতে মনস্থ করেছিলেন। শিল্পকলায় শিক্ষার পর যে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রটা অন্ধকার, সেসব অনিশ্চয়তার কথা জেনেও রিস্কটা নিয়েছিলেন। তাঁর বন্ধু-বান্ধব সহকর্মীদের অনেকেই বাবাকে অপরিণামদর্শী বলে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কান দেননি।

ব্যাপারটা ওই সময়ের দুর্লভ একটা ঘটনাই ছিল বলা যায়। কারণ কোনও পরিবারই স্বেচ্ছায় ছেলেমেয়েদের এদিকটায় দিতে চাইতেন না। অনেককে তো রিভোল্ট করে আসতে হয়েছিল। ত্যাজ্যপুত্র করার ঘটনাও ঘটে ছিল বেশ কয়েকজনের ক্ষেত্রে।

আমি সেই অর্থে মহাভাগ্যবান। আমার চাইতে বাবার ইচ্ছা এবং আদেশই প্রধান ছিল। আমি ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় দারুণ খুশি হয়েছিলেন। শুধু বলেছিলেন, ‘সবার মতের বিরুদ্ধে তোকে এই দিকটায় দিলাম। ডুবাস না। ভালো করার চেষ্টা করিস যেন আমার ডিসিশন ভুল ছিল না, প্রমাণিত হয়। সত্যি বলতে কি আমি সে কথা কৃতজ্ঞচিত্তে পালন করার চেষ্টা করেছি সারা জীবন।’

শব্দঘর : আপনার বলা ও লেখা থেকে জানি, পিতা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। বাবার চাকরিসূত্রে বারবার স্থানচ্যুত ও স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। এসব কথা বলেছেন। জানবার ইচ্ছে―জীবনের অর্জন আর বিসর্জন সম্পর্কে।

রনবী : এটা নিয়ে ইতোমধ্যে বলেছি। তবে এটুকু যোগ করতে পারি যে বাবা চাকরির কারণে অনেকবার বদলি হয়েছিলেন। তাতে আমার স্কুল পরিবর্তনের ব্যাপার ঘটেছিল। কিন্তু কখনও ক্লাসের দিকটাতে বছরের ক্ষতি হয়নি।

বিভিন্ন জায়গায় থাকার কারণে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি নামি স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়েছিল। নানা ধরনের শিক্ষকদের পেয়েছিলাম। নানান জ্ঞানপ্রাপ্তি ঘটেছিল।

বিসর্জনের কথা বলায় মনে পড়ল যে একেক স্কুলে নতুন নতুন বন্ধু হতো, ঘনিষ্ঠতা হতো। অনেক পরিবারে আদর পেয়ে আপন হয়ে যেতাম। তাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হয়নি। এখন ভাবলে মন খারাপ হয়। ভাবি তারা কি মনে রেখেছিলেন ? এখন যে আমার নামটি দেশজুড়ে অনেকে জানেন, তাদের কাছে ঠিক তেমন করে পৌঁছেছে।  হয়তো নাম শুনলেও এতদিনে আর মনে নেই যে এই শিল্পীটি তার ছেলেবেলায় তাদের সান্নিধ্য পেয়েছিল। কিন্তু মন খারাপ হয় এই ভেবে যে, বর্ষীয়ানরা তো এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু আমার বয়সী বন্ধুরা হয়তো আমার মতোই এখনও কেউ কেউ বেঁচে আছেন। কেউ হয়তো দেশের বড় কিছু হয়েছেন। মান্যগণ্য মানুষ হয়েছেন সমাজে। স্কুলের এক বন্ধুকে খুব মনে পড়ে। জীবনে প্রথম এবং সেই শেষ জবরদস্ত মারামরি করেছিলাম তুচ্ছ কোন ঘটনা নিয়ে। তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলাম। তাকে আজকের বয়সে খুব দেখার ইচ্ছা হয়। যা-হোক বিসর্জনের কথা যদি বলা হয় তবে এইসব সম্পর্কগুলোতে তা হয়েছে। বাকি সবই অর্জন।

শব্দঘর : স্কুলে পড়ার সময় লাইব্রেরি থেকে বই উত্তোলন ও পড়তেন। যেগুলোকে আমরা বলি আউটবই। বোঝা যায় পাঠাভ্যাস তৈরি হয়েছে সেই কিশোর বয়সে। এসব বই পাঠ কি আপনার প্রথাগত ফলাফলে ক্ষতির কারণ হয়েছে ? বই পড়ার আনন্দ সম্পর্কে বলুন। 

রনবী : আউট বই পড়ার অভ্যাসটি কোনও ক্ষতি করেনি। বরং নানা দিক আলোকিত করেছে বলে বিশ্বাস করি। শুধু স্কুলের পাঠাগার থেকে তেমন সব বই পেতাম তা নয়। বাড়িতে বড়দের, ছোটদের উপযোগী বইপত্র পত্র-পত্রিকা থাকত। অঢেল বইপত্র আনা হতো। আর মামাবাড়িতে তো বড় মামির বইয়ের বিশেষ করে সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার ছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্ত ছিলেন। অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল তাঁর। আবৃত্তি করে শোনাতেন। তো দেশে মামার বাড়িতে গেলে কি বাল্যকালে, কিংবা কলেজে পড়ার বছরগুলোতে সময় কাটাতেও বই পড়তাম, তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বুড়ো আংলা পড়তে দিয়েছিলেন। আর তার সংগ্রহে ছিল পুরোনো অনেক প্রবাসী, ভারতবষর্, বসুমতী ইত্যাদি পত্রিকা। সেসব পড়তাম। আর ঢাকার নিজেদের বাসায় তো নতুন নতুন বই কেনা হতো, পত্রিকাও। কলকাতা থেকে নতুন বই এলে বাবা কিনে আনতেন। কখনও কখনও মার কাছে থেকে টাকা নিয়ে আমিও কিনতাম। কলকাতার দেব সাহিত্যকুটির নামের  প্রকাশনীর পূজা উপলক্ষে প্রকাশিত শিশুতোষ সংকলনগুলো বেশি কেনা হতো। বই পড়াটা আমার সিনেমা দেখার মতোই নেশা হয়ে গিয়েছিল। প্রথমদিকে শিশুতোষ, পরে তো বড়দের উপযোগী উপন্যাসও ধরে ফেলেছিলাম। কিছুদিন তো রূপকথার বই প্রিয় ছিল। পরে একসময় ডিটেকটিভ বই ভালোলাগা শুরু হয়েছিল।

এই পছন্দটা এখনও রয়েছে। নীহাররঞ্জন গুপ্তের কালোভ্রমর শশধর দত্তের দস্যু মোহন সিরিজ, শরদিন্দুর ব্যোমকেশ ছিল প্রিয়। উভয় বাংলার লেখকদের প্রায় সবার বই-ই পড়া হতো। ক্লাসে তো শেক্সপিয়ার পড়ানোই হতো। হ্যামলেট, কিংলিয়ার, মার্চেন্ট অব ভেনিস। ম্যাকবেথ সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা বইটি পাঠ্য ছিল। আমাদের ইংরেজির শিক্ষক রহমান স্যার চমৎকার পড়াতেন সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ এবং যুগান্তকারী এই সব নাটক।

হোমারের গ্রিক উপাখ্যান ইলিয়ড, ওডেসির অনুবাদ গ্রন্থ ভাল লাগতো। ছিল চার্লস ডিকেন্স, ভিক্টর হুগো, জুল ভার্ন, জনাথন সুইফট মার্ক টোয়েন, অসকার ওয়াইল্ড, হ্যানস এন্ডারসন, গ্র্রিমস লুন্ট ক্যারলসহ বহু গ্রন্থের বাংলায় অনুবাদ হওয়া বই তো বটেই। কোনও কোনোটা ইংরেজিতেও পড়েছিলাম। আনন্দ পেতাম আরব্যরজনী পড়ে। সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, পরশুরাম, শিবরাম চক্রবর্তীর ছোটদের জন্য লেখা বিশেষ বইগুলোর ভক্ত ছিলাম খুব। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি, কাবুলিওয়ালা এবং গল্পগুলো পড়ে খুব মন খারাপ হয়েছিল। গল্প হিসেবে এইগুলোকে আমি চিরকালের শ্রেষ্ঠ বলে ভাবি। ছেলেবেলায় ‘ট্রেজার আইল্যান্ড কিং সুলোমনস মাইনস থ্রি মাসকোটিয়ার গালিভার, টেল অব টু সিটিজ ইত্যাদি পড়ে মহা আনন্দ পেতাম।

আসলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার আনন্দ পেতাম বেশি। বাড়িতে কেউ কিছু বলতেন না। বরং পছন্দের বই কিনে দিতেন। সেই সুযোগে নানা ধরনের বই পড়ার অভ্যাসটি মাত্রাতিরিক্তই ছিল। এ ব্যাপারটি অন্য যেসব বন্ধুদের স্বভাবে ছিল তাদের সঙ্গে বইয়ের লেনদেনও হতো।

শব্দঘর : পগোজ স্কুলের কৃতী প্রধানশিক্ষক ছিলেন মনীন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য। ‘আমার স্কুল’ বইয়ে যে নামটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতো এমন শিক্ষকের উদাহরণ এখন শুনি না। এর মূলে কি কারণ বলে আপনার মনে হয় ?

রনবী : আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম প্রধান শিক্ষক মনীন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য মহোদয়ের মতো নামি একজন ব্যক্তিত্বকে পেয়ে। হালকা-পাতলা বর্ষীয়ান মানুষটি খুব গম্ভীর প্রকৃতির হলেও স্নেহশীল ছিলেন। কখনও ক্লাসে কোনও ছাত্রকে শাস্তি দিতে দেখিনি। তবে ক্লাস টেনে ওঠার পর প্রথম দিনের ক্লাসে তিনি কেন জানি না ফার্স্ট পিরিয়ডেই এসেছিলেন। সেদিন পড়াননি। শুধু কিছু উপদেশ আর স্কুলের শেষ ক্লাসে বা স্কুলের লেখাপড়ার সমাপ্তি বছরটিতে কী কী করণীয়, সেসব স্মরণ রাখার মতো কথা গল্পাকারে বলেছিলেন। কিন্তু মজা করতে এবং চিরকাল যেন মনে রাখি সেই কথা, এজন্য সবাইকে পুরো পিরিয়ডটিতে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, মিটিমিটি হেসে। সেদিন যা করেছিলেন, আজও তা আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

তিনি ছিলেন ইংরেজি এবং বাংলায় এম এ, অর্থাৎ ডবল এম এ। তার একটা জনপ্রিয় ইংরেজি গ্রামার বই দেশের বহু স্কুলের পাঠ্য ছিল। নাম ছিল ‘গাইড টু ইংলিশ’। তিনি ওপরের ক্লাস নিতেন বেশি। পড়াতেন পাঠ্যবইয়ের ইংরেজি ও বাংলা কবিতাংশ, এবং গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ।

তিনি ইচ্ছা করলে কোনও বড় কলেজের অধ্যাপনার কাজটি করতে পারতেন। কিন্তু জীবনে স্কুলের ছাত্র পড়াবার দিকটি বেছে নিয়েছিলেন আদর্শ হিসেবে। ছাত্রদের যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি শিক্ষকবৃন্দকেও। আর স্কুলটিকে তো বটেই। আসলে আষ্টেপৃষ্ঠে একজন আদর্শশিক্ষক ছিলেন। এ ব্যাপারটি ভাবলে এখনও আমার মনে হয় যে, গর্ব করার মতো নামি শিক্ষক হিসেবে তিনি যথার্থই একজন উদাহরণ বলে মান্যতা পেয়েছেন। অবশ্য এখনও যে তেমন নিবেদিতপ্রাণ আদর্শ শিক্ষক দেশে নেই, তা নয়। নিশ্চয়ই রয়েছে। সবটাই অবশ্য ছাত্রদের মান্য-গণ্যতা, শ্রদ্ধা-ভক্তি থেকে আবিষ্কার করা যায়। শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, পড়ানোর দক্ষতা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা ইত্যাদি প্রধান দিক বলে মনে করি। এসব স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজ্য।

শব্দঘর : স্কুল, কলেজে পড়ার সময় নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রথমত, নাটকে অভিনয়ের ও দ্বিতীয়ত হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

রনবী : আগের কোনও একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছি যে নাটকে কোনওদিন অভিনয় করিনি। আসলে অভিনয়ের মতো কঠিন কাজটি আমার দ্বারা হবে না যে, তা বুঝতাম। আসলে নওয়াবপুর রেলগেটের কাছে ছিল মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট নামের একটি হল। সেখানে নিয়মিত পেশাদার নাটক হতো। কিন্তু সিনেমার নেশায় বুঁদ থাকায় বা বলা যায় সিনেমা দেখেই কূল পাই না, নাটক দেখব কখন, তেমন কারণে দেখি না কখনও। তবে আমাদের নারিন্দা পাড়ার অভিযাত্রিক ক্লাবের আয়োজনে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। একবার যতদূর মনে পড়ছে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন খ্যাতিমান সংগীত শিল্পী বুলবুল মহলানবিশ ও বাবা অরুণ মহলানবিশ এবং নির্মল গুপ্ত। নির্মল বাবু পরবতীর্তে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরের কর্মকর্তা ছিলেন। আমি তাঁদের স্নেহভাজন ছিলাম। তো নাটকটি ছিল বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘ভাড়াটে চাই’। খান জয়নুল, রবিউল, ব্ল্যাক আনোয়ারসহ অনেকে অভিনয় করেছেলেন। সবার নাম মনে আসছে না। এরা আমাদের পাড়াতুতো বন্ধু ছিল।

শব্দঘর : কিশোর বা তরুণ বয়সে আপনার প্রেমভাবনা কেমন ছিল ? কারও প্রতি কি ওই সময় প্রেমবাসনা জেগেছিল ?

রনবী : …কোনও ভাবনা ছিল না। যা জানতাম বা ভাবতাম তা ছিল ব্যাপারটা একান্তই বড়দের কাণ্ড। প্রেম বাসনা জাগার জন্য যে মন লাগে তা তো কৈশোরিক ওই সময়টিতে নিতান্তই নাজুক ছিল। তাছাড়া তখন তো সমবয়সী মেয়েদের নিতান্তই ছোট মনে হতো। সিনেমা দেখে দেখে তো ডেঁপো ভাবনায় মধুবালা, সুচিত্রা, নার্গিসদের চেহারা ঘোরাঘুরি করত। রুপালি পর্দার বাইরের মেয়েদেরকে চোখেই ধরত না। তবে শিল্পীরা রঙ-তুলি নিয়ে রঙীন জগতে থাকে, রোমান্টিক ভাবনার মানুষ এসব ভেবে  মেয়েরা আকর্ষণ বোধ করে বলে শুনেছি। তেমন কেউ কেউ প্রেমপত্র পাঠায়নি যে তা নয়। এর বেশী আর কিছু না বলাই ভাল!

শব্দঘর : শিল্পের প্রতি প্রেম তো আছেই। ব্যক্তির প্রতি প্রেম আপনি কখন অনুভব করেছেন ?

রনবী : ব্যক্তি নয়, মহিলা বলাই শ্রেয়। এবং তিনি আমার সহধর্মিণী। বিয়ের পর থেকে তিনি আছেন জীবনের সবটা জুড়ে। উঠতি-পড়তি, বিপদ-আপদেও সরে যাননি।

শব্দঘর : আমরা কি জানতে পারি সেই প্রেম ভালোবাসার কোনও কথা ?

রনবী : এটা তো অন্যের জীবনে উঁকি মারার মতো প্রশ্ন হলো। আসলে স্ট্রেইট বিবাহিত জীবন, কোনও ভিন্ন মোড়ে যাওয়ার ঘটনা নেই। বিবাহ সূত্রে জুটি বাঁধা জীবনে যা যা থাকার কথা সে সবকে নিয়ে সুখে আছি।

শব্দঘর : এ ব্যক্তিপ্রেম কখনও কি আপনাকে আন্দোলিত করেছে― ইতিবাচক বা নেতিবাচক ? 

রনবী : এরকম কোনও ঘটনা নেই। আন্দোলিত হবারও তাই ব্যাপার হয়নি কখনও। বড়ই নির্ভেজাল চলা জীবন যাপন।

শব্দঘর : আপনার জন্ম সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ওই বিবেচনায় শিল্প-সাহিত্যচর্চায় আপনি মনোজগতে কি কোনো বিরোধ অনুভব করেছেন ? যে বিষয়ে আমরা অনেক প্রথাগত কথা শুনতে পাই।

রনবী : আমাদের পরিবারটি চিরকালই অত্যন্ত আধুনিক মনস্ক। অতএব কোনোকিছুতেই কোনও বিরোধ হয়নি। তেমন না হলে আমার শিল্পী হবার ক্ষেত্রে প্রথমেই বাধা আসত। বরং সবাই আমাকে নিজস্ব কাজ-কর্ম ভাবনা –চিন্তার ব্যাপরে স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছে।

শব্দঘর : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আপনার বয়স প্রায় ৫বছর। দেশভাগের করুণ ঘটনাবলি  সম্পর্কে আপনি কি কিছু ভেবেছেন ? এর ফলে কার কি লাভ হলো বা কাদের ক্ষতি হলো ? আপনার কি কোনো স্মৃতি মনে পড়ে।

রনবী : ওই বয়সে অন্যসব ভাবার বা জানার কথা নয়। মনেও নেই। অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরে সে সময়ের কিছু মন খারাপের কথা বলেছি। অনেক কিছু বোঝার মতো পর্বে আসার পর যেটুকু বুঝেছি বা এখনও বুঝি সেটা এই রকমের, এত বড় একটা উপমহাদেশ টুকরা টুকরা হওয়ায় ভেঙে-টেঙে তিনটা দেশ হয়েছে।

অন্নদাশঙ্করের অসাধারণ ছড়া- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর উপর রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো! তার বেলা ?’ তাতে পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েছে। ইংরেজ খেদাও ব্যাপারটা নিয়েই শুধু আন্দোলন লড়াই হতো। তখন সব ধর্মের বর্ণের মানুষ একাট্টা ছিল, ঐক্যবদ্ধ ছিল একটি ব্যাপারে যে বৃটিশরা যাক। কিন্তু পরবর্তীকালে ধর্মকে সামনে টেনে এনে বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার কুকর্মটি সুচারুভাবে সমাধা করেছিল। আর তা ছিল ভারতবর্ষে রাজত্ব টিকিয়ে রাখার সর্বশেষ প্রচেষ্টা। সব ধর্মের মানুষের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, তা বিনষ্ট হওয়ায় যে দূরত্ব বেড়েছিল সেটাকে সামনে রেখেই ভাগ করাকরি হয়েছিল।

তাতে আসলে তখনকার রাজনীতিবিদদের লাভ হয়েছিল। দেশগুলো (ভারত-পাকিস্তান) চালানোর সর্বময় নেতা-কর্তা হতে পেরেছিল। শুনেছি ১৯৩০-৪০ সন পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমান- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই একত্রে মিছিল করে স্লোগান দিত স্বাধীনতার জন্য। সেসব সাতচল্লিশের ১৪ আগস্টের কয়েক বছর আগে পাল্টে গিয়ে একত্রিত মিছিলও দু-ভাগ হয়েছিল। স্লোগানও তাই। তো এ সবই অনেক পরে আর সবার মতো আমারও জানা হয়েছিল, শুনে শুনে, ইতিহাস পড়ে। সব বুঝে মন খারাপের বয়স তো এই সময় আমার ছিল না, শুধু সমবয়সী বন্ধুদের অনুপস্থিতি নিয়ে দুঃখ পেতাম। তো, সে সব অতীত।

এখন তো যুদ্ধ করে পাওয়া নিজ দেশ, নিজ ভাষা, নিজ সংস্কৃতি অর্থাৎ নিজস্ব সবকিছু নিয়ে জীবন যাপন করছি। ভালো-মন্দ যা কিছু তাও আমাদেরই। কিন্তু ব্রিটিশ আমলের, পাকিস্তান আমলের কিছু বিষয় এখনও মাঝে মাঝে শিশি থেকে ছিটকে বের হয়ে অশান্তি ছড়ায় না, তা তো হলফ করে বলা যাবে না। এমনও আছে অনেকে যে বিদেশি উপনিবেশ-সৃষ্ট ভাব-গতিককে যেন এখনও আপনভাবে। এইসব দেখলে দুঃখ হয় বৈকি।

শব্দঘর : যে কারণে দেশ ভাগ হলো, অর্থাৎ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। আপনি নিজে এসব নিয়ে ভাবেন না। ধারণ করেন না জানি। এ প্রশ্নটি এখানে উত্থাপন করার যুক্তি হলো―আপনি ব্রিটিশ উপনিবেশ, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। এ অর্থে ইতিহাসের নির্মিতি আজকের ‘রনবী’। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমণে আপনার কি মনে হয় সামাজিক অসুস্থতার উপসর্গগুলো অপসারিত হয়েছে ? যদি না হয়, কেন হলো না ?

রনবী : অন্য প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া হয়েছে, বলে মনে হয়। তবুও আবার কিছুটা যোগ করছি। আসলে সামাজিক অসুখ-বিসুখ যেগুলো রয়েছে তা বর্তমান কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের চাইতেও ভয়াবহ। অপরাজনীতির কারণে পঁচাত্তরের পর থেকে সমাজব্যবস্থার কোনও কোনও অংশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার বিস্তার লাভ ঘটেছে। তা এতটাই শক্তিধর হয়ে বাসা বেঁধেছে যে, নির্মূল করার ওষুধ এখনও কারও জানা নেই বলে আমার ধারনা। আমাদের সংবিধানের যে চারটি স্তম্ভ ছিল গর্ব করার মতো। সেসবের মান্যি করার ব্যাপারটি কথায় রয়েছে প্রাকটিসে নেই। বরং চলাটা উল্টো পথে ধাবমান। সাম্প্রদায়িকতা প্রিয়তা পাচ্ছে, আর্থিক বৈষম্য আকাশচুম্বী হয়েছে। যারা এসব নিয়ে ভাবেন, তাদের ভাবনা করাই সার। অসুখটা সারাবার ডাক্তার তো তারা নন, প্যাথলজিস্টদের মতো শুধু রোগটার উপসর্গগুলো কোথায় তা ধরিয়ে দেন। কিন্তু তাতে কি বা আসছে-যাচ্ছে। কেউবা সিরিয়াসলি কান দেয়, কেউ দেয় না। অতএব ব্যাধিটা দেশে গেঁথেই রয়েছে।

শব্দঘর : চারুকলার বাইরে আপনি একজন লেখক। প্রথম লেখা কখন প্রকাশিত হয়। এরপর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো ?

রনবী : ভাগ্যিস সাহিত্যিক বলেননি। দলিল লেখকও তো লেখক। কতকিছু প্রতিদিন লিখতে হয় তাদের। সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেকে লেখক ভাবি না। সে সঙ্গে একজন লেখককে যে সব কারণে মূল্যায়ন করা হয় লেখক হিসেবে, সেসব আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে আমি মনে করি। নেহায়েতই পার্টটাইমার। মাঝে মাঝে এমন হয় যে হয়তো ছবি আঁকায় মন লাগছে না। তখন লিখতে চেষ্টা করি। আসলে ইলস্ট্রেশন করতে গিয়ে জীবনে প্রবীন তরুণ বড়-ছোট লেখক-কবিদের পন্ড্রুলিপি পড়া হয়েছে যে তাতে লেখার প্রতি ঝোঁকে পেয়ে বসে উদ্বুদ্ধ বোধ করে। দারুণ কিছু করার জন্যে নয়।

অবসর পেলে হঠাৎ হঠাৎ কিছু লিখে ফেলি। সেটাকে হবিও বলা যাবে না। আন্তাবড়ি কাণ্ড বলা যায় ভাবনায় পেয়ে বসা বলঅ যেতে পারে হয়তো। তবে কোনও সম্পাদক বা প্রকাশক হয়তো বলল যে ছোটদের জন্য একটা উপন্যাস দেন না, তা অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে কয়েকদিন প্লট-চরিত্র ইত্যাদি সম্বন্ধে ভেবে বসে যাই লিখতে। আবার কেউ হয়তো অন্য কিছুর বায়না ধরল তো তাকে নিষেধ করতে পারি না।

আমি একটা দিক নিয়ে ছেলেবেলা থেকেই লিখি তা হলো ‘ছড়া’। স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় থাকত সেইসব। ভালো হয়নি ভেবে ছাপাতে পত্রিকার দিকে যাইনি কখনও। ব্যাপারটা ছিল খেলা খেলা মতোন। তবে প্রথম লেখা ছাপা হয় ইত্তেফাকে ১৯৫৮ সালে। সেটা ছোট একটি প্রবন্ধ ছিল। বিষয় ছিল মহাকাশে রাশিয়ার প্রথম ‘স্পুটনিক’ পাঠানোকে নিয়ে। তখনও ম্যাট্রিক পর্যন্ত পৌঁছাইনি। শিল্পকলার ছাত্রও হইনি। তা-ই ছবি আঁকাআঁকির ব্যাপারও তেমন পোক্ত ছিল না। শিল্পী হবার ইচ্ছাও মনে বাসা বাঁধেনি তখনও।

তো লেখাটি ছাপার অক্ষরে দেখে মনে সাহিত্যিক সাহিত্যিক ভাব এসে গিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। বাবা-মা পড়েছিলেন। কোনও কোনও বন্ধু পড়ে ভালো বলছিল; তবে সবচাইতে প্রশংসা পেয়েছিলাম রোকনুজ্জামান খান―দাদাভাইয়ের কাছে। তারপর কত যে লেখা পাঠিয়েছিলাম তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু ছাপা হয়নি। পরে আর্ট কলেজে ভর্তির পর আওয়ামী লীগ নেতা, বন্ধু মোজাফফর হোসেন পল্টুর ম্যাগাজিন বর্ণালিতে রম্য রচনা ছাপা হয়েছিল। যা-হোক লেখালেখি আমার ছবি আঁকাকেও প্রানিত করে বলে মনে করি।

শব্দঘর : ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেছেন। নিশ্চয়ই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলেন।

রনবী : চারুকলায় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, অর্জন নিয়ে এভাবে কখনও ভাবিনি। ফাইন আর্টস ইনস্টিটিউট দিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির ক্রমাগত শ্রীবৃদ্ধি ঘটার ব্যাপারটি খুবই আনন্দের। আর প্রত্যেকটি ধাপকে দেখার, সেসবের মধ্যে জড়িত থাকার সংশ্লিষ্ট হতে পারার কঠিন সব দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আমার শিল্পী জীবনের পথচলায় সহায়ক হতে পেরেছে বলে মনে করি।

১৯৬৪ থেকে শিক্ষকতায় রয়েছি। বলতে কি, শিল্পী হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রদ্ধা সম্মান প্রাপ্তিতে উজ্জীবিত থাকার ব্যাপারটি ঘটেছে চিরকাল। অঢেল ছাত্র-ছাত্রী শিল্পী হয়েছে, দেশের শিল্পকলার জাগতকে সমৃদ্ধ করেছে, এবং করছে ভাবলে দারুণ ভালো লাগে। অনেকে বিদেশে খ্যাতি অর্জন করে দেশের সুনাম বয়ে এনেছে।

কিন্তু সব চাইতে যা আমাকে শিল্পকলা চর্চা ছাড়াও বোধের দিকটাকে আলোকিত করেছে তা হলো রাজনীতি সচেতনতা, সুস্থ সাংস্কৃতিক চিন্তার শিক্ষা, দেশাত্মবোধ আর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ-প্রবীণ সকল শিল্পীদের স্নেহ প্রাপ্তি। এবং দেশের শিল্পকলা অঙ্গনটির উন্নতি নিয়ে তাদের যে ভাবনা-চিন্তা ছিল, সেসবে সম্পৃক্ত থাকতে পারা, সহকর্মী হিসেবে তাদের সান্নিধ্যে থাকার অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে নিজেকে শিল্পী হিসেবে ঋদ্ধ করতে পেরেছিলাম। আর সবচাইতে বড় যে দিকটিকে বিবেচনা করি, তা হলো চারুকলা শিক্ষাপীঠটি আমাকে শিক্ষকতা শিখিয়েছে।

শব্দঘর : আপনার দীর্ঘ শিক্ষকজীবন। আর্ট কলেজ থেকে চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুক্তি; ইনস্টিটিউট থেকে অনুষদে রূপান্তর, এইসব গড়ে তুলতে আপনি অনেক শ্রম দিয়েছেন; দ্রোহ করেছেন। এ শিক্ষকতাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন ?  

রনবী : ১৯৬১ সালে শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে যখন ভর্তি হই তখন প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ইনস্টিটিউট ছিল। যখন ১৯৬৪ সালে পড়া শেষ করে বের হই এবং শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই, ততদিনে ১৯৬৩ সালে সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয়েছিল। অতএব ছাত্রত্ব নিয়ে বলি যে, আমি এক দালানেই দুরকমের ব্যবস্থাপনায় লেখাপড়া করেছি। বলি যে, প্রথমে ছিল বড় নৌকা, সেটাকেই পরে লঞ্চ বানানো হলো এবং তারপর শেষটায় সেই লঞ্চটিকে জাহাজে রূপ দেওয়া হলো।

স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হয় সার্বিক ভাবে। এই ঘটনাটি ঘটাতে বেশ কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল। সব শিক্ষকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা সম্ভব হয়েছিল। আসলে ব্যাপারটা ঘটার কথা ছিল ভাইস চ্যান্সেলর মতিন চৌধুরী সাহেবের সময়ই। কিন্তু নানা কারণে বিলম্বিত হচ্ছিল। তার পরে তো ১৯৭৫এ বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহতের মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে, এবং রাজনৈতিক পটেরই পরিবর্তন ঘটে যায়। তারপর আর্ট কলেজের ফাইল লালফিতার কবলে পড়ে যায়।

অনেক বছর পর শিক্ষকবৃন্দের পক্ষ থেকে আবার চেষ্টা শুরু করা হয়। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্য আব্দুল হালিম চৌধুরী সেটা বাতিল করে দেন। কলেজটিকে অদ্ভুত ধরনের প্রতিষ্ঠান আখ্যা দিয়ে। তো আবার চাপা পড়ে যায়।

তখন ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছিল যে একেকজন নতুন ভিসি আসেন আর আমরা আবার অনুরোধের ফাইল নিয়ে হাজির হই। এর মধ্যে ১৯৮১-৮২ সালের দিকে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে। যারা এই কর্মটিকে নিয়ে দেন-দরবারে ছিলাম, তাদের কয়েকজনকে বদলি করে বিভিন্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যোগ দেওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়। আমাকেও যশোরে যাবার কাগজ পাঠায়। আমি তখন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চিঠিও রেডি করি। কিন্তু সবাই ডিপিআইতে সেসব না পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে ভিসি শামসুল হক সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিই। আসলে এ ব্যাপারে আমি একা ছিলাম, তা ঠিক নয়। শিক্ষকমণ্ডলীর পক্ষ থেকে ভার দেওয়া হয়েছিল কয়েকজনকে, তার মধ্যে আমি ছিলাম একজন। অধ্যাপক আবদুল মতিন সরকার, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, বুলবন ওসমান, হাশেম খান এবং আমি ছিলাম সেই তালিকায়। আমাদের কাজ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, সিনেটসহ সবকয়টা কমিটিকে বোঝানো, রাজী করানো। কর্মী বাহিনী হিসেবে। কনভিন্স করানো। তারপর তো বেশ ঝটিতেই গিয়েছিল।

যা-হোক শিল্পকলার শিক্ষককতা ব্যাপারটি সহজ মনে হয়নি কখনওই। আসলে একবার ব্যাকরণ শিখাতে হয় আবার সঙ্গে প্রকাশে-হাতে-বোধে রস অর্জনের খুঁটিনাটি তো আছেই। পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত ভারী, জটিল তবু দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছি। আমার ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তীকালে দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান হয়েছে এটা ভাবলে গর্ব হয়। যাই হোক পরবতীর্তে বিভাগীয় প্রধান, ইনস্টিউট থাকা কালীন পরিচালকের দায়িত্ব, অনুষদ হবার পর ডিনের দায়িত্ব ও পালন করতে হয়েছিল। শিল্পীর জন্য এসব প্রশাসনিক দিক মোটেও সুখকর ছিল না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির জন্যে তা করতে হয়েছে।

শব্দঘর : শিল্পচর্চায় আপনার ওপর কারও প্রভাব রয়েছে কি না ? অথবা কোনও শিল্পীকে অনুসরণ করেছেন কি না ? যদি হয়, তা কেন করেছেন ? 

রনবী : আমি মনে করি সে রকম ঘটনা ঘটেনি। শিল্পীদের ক্ষেত্রে অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হবার ঘটনা ভিন্নতর। অনেক সময় বড় মাপের শিল্পীদের ভাব-ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হলেও হতে পারে। কিন্তু নিজের কাজ ঘুরেফিরে নিজস্ব ধাঁচেরই হয়। স্টাইল তৈরি হয়ে যায়। লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চির কাজে অনুরাগ ছিল রাফায়েলের। অনুসরণ করতে গিয়ে অজান্তেই নিজের ধরনই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে,‌ আজকাল ‘ইজম’ ধরে দলগতভাবে কাজ হয় না সর্বত্র, এবং সব শিল্পী ‘ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্ট’ এক অর্থে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্যাপারটা প্রকট ছিল। ইজমের অন্তর্গত থাকতে একই ধরনে আঁকার চেষ্টা করতেন অনেক শিল্পী। পাবলো পিকাসো এবং জর্জের ব্রাক যেমন। কিউবিস্ট হতে গিয়ে একই ইজমে একই বিষয়ে একই রকমের আঁকার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তারপরও ধরন যার যার, তার তারই হয়ে গিয়েছে। এ ব্যাপারে আমার ধারণা ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তির ভাবনা রস সৃষ্টি আর দক্ষতা সবসময়ই ভিন্ন হয়। সেসব অনুকরণীয় হতে পারে না। তবে ভাব অনুসরণ করা সম্ভব হলেও হতে পারে।

যেমন যামিনী রায় লোকশিল্প থেকে ধরন নিয়ে কাজ করার ভাব ধারণ করেছিলেন। সেই ভাবটি অনুসরণ করেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী। কিন্তু, প্রকারান্তরে নিজেদের একান্ত নিজস্ব স্টাইলই হয়েছে প্রত্যেকের। তারা সবাই আসলে কেউই লোকশিল্পী শিল্পী বলে আখ্যায়িত হবার মতো চিত্র-রচনা করেননি। উপাদানগুলোকে প্রতীকী করে আধুনিক স্টাইলে রূপ দিয়েছেন।

এবার আমার কথাটি বলি। যেহেতু আমি মানুষ পশু-পাখি প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে ছবি আঁকি, অতএব বিষয়-পছন্দের ব্যাপারটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ অনেকের সঙ্গে মিল আছে। সেটাকে অনুসরণ বলা যায় হয়তো। কিন্তু শৈলী, করণকৌশলে দক্ষতার তফাৎ রয়েছে। আমি বলি প্রত্যেকের এক্সিকিউটের ধরন আলাদা, নিজস্ব। আসলে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্যের মতো হওয়া যায় না। নিজের স্বভাব বদলে দেওয়া যায় না কলা-কৈবল্যের ব্যাপার স্যাপারে।

শব্দঘর : আবার ফিরে এলাম ঢাকা প্রসঙ্গে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় যাপন করেছেন পুরোনো ঢাকায়। ঢাকা ঘিরে আপনার স্মৃতির ভাণ্ডার বিশাল। বিস্তৃতভাবে বলেছেনও। তবু নির্দিষ্ট করে সেকালের ঢাকা (নিজের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, খেলাধুলা, খাবার, উৎসব ইত্যাদি) সম্পর্কে জানতে চাই।

রনবী : ঢাকায় বসবাসের সময় নিয়ে ইতোপূর্বে বলেছি। সেই আমলের পুরান ঢাকা আসলে এখনও আমার অতি আপন মনে হয়। হয়তোবা নিজেকে তৈরির ব্যাপারটি ঘটেছিল সেটিই কারণ, কিংবা ছেলেবেলায় বুড়িগঙ্গা থেকে নয়াপল্টন আর গেন্ডারিয়া থেকে লালবাগ পর্যন্ত চষে বেড়ানো, হয়তো তা করতে গিয়ে অঢেল বন্ধু পেয়ে যাওয়া, কিংবা যৌবনে আর্ট কলেজে ছাত্র হয়ে শহরের অলিগলি প্রাচীন দালান-কোঠা এবং বুড়িগঙ্গার এপার ওপার, স্টিমারঘাট, গুদারাঘাট, গয়না নাও, বেদে নৌকার বহর, বেদেদের জীবন, রায়েরবাজার গ্রামের কুমোর বাড়িগুলো স্টাডি অথবা পথশিশুদের নিয়ে আঁকা থেকে টোকাই আঁকার ইচ্ছা তৈরি, এ ধরনের কত কিছু থেকেই না নিজেকে সাজিয়েছি। সেসব এখনও ভাবনায়, কাজে সহায়ক হয়ে আছে।

এদিকে ভিক্টোরিয়া পার্ক, বা বাহাদুর শাহ পার্ককে ঘিরে কোর্ট-কাচারি, ব্যাঙ্ক, স্কুল কলেজ, অন্যদিকে চকবাজার- লালবাগকে ঘিরে ব্যবসায়িক ব্যস্ততা দেখা, পল্টন ময়দানে হাওয়া খেতে গিয়ে রাজনৈতিক সভায় হঠাৎ হঠাৎ দেশের চাওয়া পাওয়া নিয়ে কিছু কথা শুনে ফেলা, কিংবা কোনও দিন ক্লাবগুলোর বড় বড় খেলোয়াড়দের প্র্যাকটিস দেখা, এইসব নিয়েই ছিল জীবন।

বড় হয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ায় দুপুর কাটাতে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম সিনেমা হল গুলিস্তানে টিকিট কেটে তিন ঘণ্টা বসে থাকা, হলে ছবি দেখা, এসব ছিল ঢাকার অন্যতম আকর্ষণ। ঢাকা তো চিরকালই রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার। মিটিং-মিছিল লেগেই থাকত। একদিন যদি বঙ্গবন্ধুর সভা অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সভা তো আর একদিন মণি সিং-এর, কোনোদিন মওলানা ভাসানীর সভা তো, কোনোদিন মোজাফফর আহমেদের ন্যাপের সমাবেশ। বিশেষ করে ষাট দশকে এসব আয়োজন প্রায় প্রতি সপ্তাহের ব্যাপার ছিল। সবই ছিল সরকারবিরোধী বা সামরিক শাসনবিরোধী। পরে তো ঢাকা বড় হতে থাকলে রেসকোর্স ময়দানে যেতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা শুনতে যাওয়া, লাখ লাখ বাঁধভাঙা মানুষকে জায়গা দিতে।

ভাষা আন্দোলনের জন্ম ঢাকাতেই। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ঢাকাতেই। যুদ্ধের শুরু একাত্তরের ২৫মার্চ ঢাকা দিয়েই। প্রাদেশিক রাজধানী শহর বলে রাজনৈতিক চর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চা সবই ছিল প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক। সেইসব থেকে নির্যাস নিয়ে দেশাত্মবোধের মন, মানসিক চেতনা অর্জিত হয়েছিল ঢাকাবাসীর। আমাদেরও তাই।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংগীতানুষ্ঠান হতো পাড়ায় পাড়ায়, চিত্রকলা প্রদর্শনী হতো আর্ট কলেজে, কাউন্সিল গ্যালারিতে ষাটদশকে পুরোটাজুড়ে, ছায়ানটের বৈশাখ উদযাপন চলত রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখে, এবং ঈদে মেলা বসতো লোহারপুলে।

সাহিত্যের দিকটি তো মূলত ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে; পঞ্চাশদশক থেকে রেনেসাঁ মতোন হয়ে গিয়েছিল। একাধারে দেশ এবং বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্রোহী ভাবনার কথা সাহিত্যিক, কবিদের লেখনী চর্চায়, অন্য দিকে ছবি আঁকিয়ে এবং সঙ্গীতের মানুষদের নিজ নিজ ক্ষেত্রের চর্চাকে বেগমান করা বাঙালিত্বকে পাথোয় করে, এইসব নিয়ে অন্য রকম দিনকালের সূচনা ঘটেছিল। তাতে আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে অসাধারণ উচ্চতা অর্জিত হয়েছিল। আমরা পেয়েছিলাম অনেক সৃষ্টিশীল তরুণ কবি, সাহিত্যিকদের। সঙ্গে প্রবীণরা তো ছিলেনই। শওকত ওসমান, সরদার জয়েনউদ্দীন, আহসান হাবীব, রশিদ করিম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, আবু ইসহাক প্রমুখ এবং আরও অনেক সমসাময়িক তো ছিলেনই, পঞ্চাশদশকে এই অঙ্গনে যুক্ত হয়েছিলেন কবি শামসুর রহমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান, লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি শহীদ কাদরী, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, কবি-গবেষক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি ওমর আলী, কথাসাহিত্যিক শওকত আলী, লেখক ছড়াকার ফয়েজ আহমেদ, কথাসাহিত্যিক রাহাত খানসহ আরও অনেকে। এঁদের মধ্যে শুধু অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছাড়া প্রায় সবার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। কারও কারও সঙ্গে তো খুব ঘনিষ্ঠও ছিলাম। প্রায় সবার বইয়ের প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশন করেছি। এঁরা প্রত্যেকেই সৃষ্টিশীলতায় নতুনত্ব এনে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমি তাদের মুগ্ধ পাঠক। ষাটদশক কবি আবুল হাসান, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, কবি দাউদ হায়দার, লেখক রশীদ হায়দার, কবি―লেখক হুমায়ুন আজাদ, মাহমুদুল হক প্রমুখসহ অনেকের উত্তরণ এবং প্রতিষ্ঠার যুগ। এদের সঙ্গে আমার পরিচয় পাঠক হিসেবে, কারও কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতায়। সবই একাত্তরের আগের কথা বললাম। স্বাধীনতার পরের সবাইকে তো সবার জানাই।  হুমায়ূন আহমেদের দুর্দান্ত অবদানের কথা কে না জানি।

সঙ্গীতের দিকটাতেও শ্রোতা-দর্শক সৃষ্টিতে অসাধারণ ছিল। পঞ্চাশদশকে বেতারে শুধু শিল্পীদের বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন মুষ্টিমেয়। ভক্তিময় দাশগুপ্ত, আব্দুল আহাদ, মালেকা আজিম প্রমুখদের নাম মনে করতে পারি। অনেকের নাম মনে নেই।

রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গীত এবং সাহিত্য অঙ্গন থেকে বাতিল করার পশ্চিম পাকিস্তানী প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে অনেক শিল্পী এগিয়ে আসেন। সানজিদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, জাহিদুর রহিম, আবদুর রহিম, আতিকুল ইসলামসহ অনেকেই তখন সাহসী ভূমিকা নিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হতো বেশ কয়েকটির সাথে আমি জড়িতও ছিলাম। মঞ্চ সজ্জা করেছি। বৌদ্ধ সংস্কৃতি সংঘ আয়োজিত এবং শীলব্রত চৌধুরী পরিচালিত রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকেরও মঞ্চ এবং কসটিউম নকশা করেছিলাম। এ ছাড়াও সিকা-দার আবু জাফর রচিত সিরাজদ্দৌলঅ নাটকের মঞ্চ নকশাও করেছিলাম। এ সবই ছিল প্রতিবাদী আয়োজন। যতদূর মনে পড়ছে পরবর্তীকালে কাদেরী কিবরিয়া, ইফফাত আরা, পাপিয়া সারওয়ার প্রমুখ শিল্পীরা জনপ্রিয় হয়েছিলেন। ১৯৬৪ তে পাইলট টিভি শুরু হলে এঁরা গাইতেন নিয়মিত। আধুনিক সঙ্গীতে আঞ্জুমান আরা ফেরদোসী রহমান এবং পল্লীগীতিতে আব্দুল আলিম, মমতাজ উদ্দিন. মোস্তফাজামান আব্বাসী তখন বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ছিলেন।

পঞ্চাশ ও ষাটদশকে গণসঙ্গীত খুব জনপ্রিয় ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সেসবের অনুষ্ঠান হতো। শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল লতিফ খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁদের গান শুনে শ্রোতারা উদ্দীপ্ত হতেন। ‌সেই সময় ফুটবল ছিল জনপ্রিয় খেলা। বিদেশি অনেক টিম আসত। ক্রিকেট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিদেশি টিমের সঙ্গে প্রায় প্রতিবছর টেস্ট খেলার জন্য। সব স্কুল ক্লাব এবং কোনও পাড়ার মাঠ, মতিঝিলের খেলার জায়গায় খেলার ধুম পড়ে যেত। তবে পাকিস্তানের জাতীয় দলে বাঙালি খেলোয়াড়রা সুযোগ পেত না বলে সবার মনে উষ্মার ব্যাপারটি ছিল খুব। তবে ক্রিকেটার হিসেবে নাম ছিল শামীম, মইনু, রকিবুল, বকুল, সোহরাব, জুয়েল প্রমুখদের। তাদের খেলা দেখেছি।

উৎসব বলতে ঈদ, পহেলা বৈশাখই ছিল প্রধান। তবে মহররমে ঐতিহাসিক তাজিয়া মিছিল ছিল আকর্ষণীয়। আর দুর্গাপূজায় মণ্ডপগুলো উৎসবে মেতে থাকত। সংক্ষেপে এই ছিল ঢাকায় বসবাসের অভিজ্ঞতা।

শব্দঘর : অসহযোগ আন্দোলন ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছেন। আপনার সংশ্লিষ্টতা ও দিনগুলোর কথা বলুন।

রনবী : সেই সব দিনগুলো ছিল জাতিগতভাবে স্বাধীনতাকামী বাঙালির স্বাধীন চেতনা এবং শক্তি দেখাবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। গণজাগরণের চেহারাটি পাকিস্তানের সামরিক সরকার তথা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে চিনিয়ে দেওয়ার। ছয় দফা আর ১১ দফা দাবি নিয়ে সেই জাগরণ গণঅভ্যুত্থানের রূপ ধারণ করে সফল হয়েছিল। স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাবার সেটি ছিল চূড়ান্ত প্রস্তুতির ঘটনা। অন্তত, আমার তাই বিশ্বাস, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল সরকার। উনসত্তরের ওই মহাআন্দোলনে চারুশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিক মজুর-কিষাণ সবাই ওই কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আমাদেরও তাই। ব্যানার, চিত্রকলা, কার্টুন, পোস্টার-ফেস্টুন ইত্যাদি নিয়ে সরকারবিরোধী দুঃসাহসী আর জনগণকে উজ্জীবিত করার মতো বক্তব্য প্রকাশের ব্যাপারটি ঘটাতে হয়েছিল। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, রশীদ চৌধুরী, ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন অন্যতম। তারা কেউ অপূর্ব সব বিশাল বিশাল ছবি এঁকেছিলেন। কেউ পরামর্শক ছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ছোট ছোট লে-আউট করে দিলে ছাত্ররা তা বড় করে আঁকতেন। তা ছাড়া পরামর্শক ও ছিলেন।

আমিও অনেকগুলো কার্টুনধর্মী বিশাল ছবি এঁকেছিলাম। সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের পাশে খোলা জায়গায় আঁকা এবং জনসাধারণের জন্য টাঙ্গানো হয়েছিল প্রদর্শনীর মতো করে।

কিন্তু সবচাইতে আলোচিত কাজটি করেছিলাম শাহাদত চৌধুরী, আমি ও হাশেম খান। সঙ্গে সক্রিয় ছিল বেশ কয়েকজন ছাত্র। আবুল বারক আলভী, মনজুরুল হাই, বীরেন সোম, শহীদ কবির, বিজয় সেন ছিল অন্যতম কর্মী। ব্যাপারটি ছিল প্রতিবাদী। ছড়ার বই ছাপানো। নাম দিয়েছিলাম ঊনসত্তরের ছড়া। নামটি ঠিক করেছি শাহাদত। প্রতিবাদী ছড়া লেখার জন্য প্রবীণ কথাসাহিত্যিক থেকে শুরু করে খ্যাতিমান কবি তরুণ ছড়াকারসহ সবাইকে অনুরোধ করলে সবাই ছড়া লিখে দিয়েছিলেন, তাতে আমিও ছড়া লিখেছিলাম।

শব্দঘর : সে সময় আন্দোলন ও শিল্পচর্চা ছিলো একইসূত্রে গাথা। পাকিস্তানি শাসনামলে সরকারবিরোধী চিত্র ও কার্টুন এঁকেছেন। তখন কি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বা মামলা হয়েছে কি না ?

রনবী : না, তেমন কিছু ঘটেনি। তাতে আমরা অবাকই হয়েছিলাম। হয়তো ওই গণজাগরণে সরকার এসব ঘাঁটাতে চায়নি। কিংবা গদি বাঁচানোর উপায় না দেখে এসবকে নিয়ে ভাবার সময় পায়নি। হয়তো গুরুত্বই বোঝেনি এমনও হতে পারে।

শব্দঘর :  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পল্টনের ঐতিহাসিক জনসভায় অনেকের সঙ্গে আপনিও উপস্থিত ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সে দিনের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া বলুন।

রনবী : ঐতিহাসিক ঘটনাটি তো চারুকলার কাছেই ঘটেছিল। অতএব মাঠে মঞ্চের মোটামুটি কাছাকাছি ছিলাম আমরা, ছাত্র-শিক্ষকরা। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল মাঠ উপচে চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিল। অসাধারণ দীপ্তকণ্ঠের ভাষণ শুনে মনে হয়েছিল উজ্জীবিত মানুষ তখনই যুদ্ধে যাবে। স্বাধীনতার ঘোষনায় উজ্জীবীত মানুষ আড়াই সপ্তাহ পরই যুদ্ধে নেমেছিল। আর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল।

শব্দঘর : শিল্পচর্চা, লেখালেখি সবকিছুকে ছাপিয়ে একসময় পরিচিতি লাভ করেন কার্টুনিস্ট রনবী হিসেবে। এর পেছনের ঘটনা বলবেন কি ?

রনবী : তেমন কোনও বড় পরিকল্পনা করে শুরু করিনি। বহুদিনের ইচ্ছা ছিল ছোট একটি ছেলের (পথশিশু) চরিত্র সৃষ্টি করে একটি স্ট্রিপ কার্টুন করার। যে ছোট মুখে বড় কথা বলবে। টোকাই নাম দিয়ে শুরু করতে চাই শুনে বিচিত্রা সম্পাদক তাতে আনন্দিত হয়ে কাগজে স্পেস দেয়। সেইভাবে শুরু হয়ে যায়।

শব্দঘর : টোকাই শিরোনামের কার্টুন নিগূঢ় কথাগুলো প্রকাশ করেছেন। বিশেষত প্রকাশ পেয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজের অসঙ্গতি। এ টোকাই কীভাবে আপনার ভাবনায় স্থান করে নিল ? সে তো অন্য কিছু হতে পারত। আবার রফিকুন নবীর রূপান্তর হলো রনবীতে। এই বিষয়ে বি¯ৃÍত বলতে অনুরোধ করি।

রনবী : এমনি এমনি হাস্যরসাত্মক বিষয় গ্রাহ্য না করে সমাজ, সংসারের নানাদিকের অসঙ্গতি নিয়ে সমালোচনাধর্মী করে দেখার ইচ্ছা থেকেই টোকাই করেছিলাম। পাঠক পছন্দ করেছিল। তখন সময়টাও মানুষকে নানা কারণে ভাবিয়ে তুলেছিল সামাজিকভাবে। সেটির প্রকটতা সম্বন্ধে কে না জানতো। রনবী নামটা অবশ্য অনেক আগে জনপ্রিয় ছিল। নতুন কিছু নয়। আর ওটা ছদ্মনামও নয়। সংক্ষিপ্ত নাম।

শব্দঘর : বিচিত্রা কাগজে প্রকাশিত কার্টুনের বাইরে ‘টোকাই’ শাব্দিক সীমা অতিক্রম করে ধারণা (ঈড়হপবঢ়ঃ)য় উপনীত হলো। সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। এ এক বিশাল অর্জন। অভিধানেও যুক্ত হলো। এ ছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ওরা টোকাই কেন’ (১৯৮৯) শিরোনামে বই লিখেছেন। এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি বলুন।

রনবী : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টোকাই নিয়ে লিখেছেন বহু আগে; প্রায় ছাপা শুরুর কিছুকাল পরই। অনুরোধে প্রচ্ছদও আমিই এঁকেছিলাম। সেই সঙ্গে টোকাইকে নিয়ে যা কিছুই করা হয় তাতে আমি আনন্দিতই হই। ভাবি যে অন্তত দেশের সব ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভালোবাসাটুকু অটুট আছে। টোকাই এর প্রতি সবার ভালোবাসার কিছুটা ভাগ আমার দিকেও ঝোঁকে। খুশি হই; কিন্তু দুঃখ লাগে যে, আমাদের সমাজব্যবস্থার সার্বিক অবস্থার কারণে গরিবি হালটা তো কমেনি। সেই পথশিশুরা তো রয়েই গেছে। তখন ভাবনায় আসে যে, আবার শুরু করলে কেমন হয়, আজকের টোকাই কেমন আছে, তাকে ঘিরে।

শব্দঘর : টোকাই কার্টুনে যে কথাগুলো প্রকাশ করতেন, তা ছিলো খুব সহজ, সাবলীল। আমাদের কাছে সমাজ-রাজনীতির প্রতীকী চরিত্র বলেই মনে হতো। আপনার মন্তব্য ?

রনবী : পাঠকের বোধগম্যতার কথা ভেবে বিষয় সহজ হোক বা কঠিন কথা খুব সহজ করে বলার চেষ্টা করতাম। ভেবেছিলাম দেশের মানুষের নিত্যদিনের ভাবনাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব। সে সব ভাবনা তো দেশের সমাজ, রাজনীতি, আর্থিক সমস্যাকে নিয়েই হতো বেশি। তাই ভেবেছিলাম সোশ্যাল-পলিটিক্যাল বিষয়াদি টোকাইতে ভালো মানাবে। যদিও শুরু করার আগে অনেক ভেবেছিলাম যে, ছোট্ট একটি ছেলের মুখের বড় বড় কথার ব্যাপারটি মানাবে কি না। কিন্তু আনন্দিত হয়ে লক্ষ করলাম যে পাঠক ব্যাপারটা গ্রহণ করেছে, প্রশংসা করেছে, এবং কখনও কখনও নানা ধরনের পরামর্শ দিয়েছে। অতএব উৎসাহিত হয়ে বহুকাল ধরে এঁকে গেছি। ভালো লাগত আঁকতে, তা নিয়ে ভাবতে।

শব্দঘর : অনেক কার্টুন এঁকেছেন, একসময় টোকাই বন্ধ হয়ে গেলো। বন্ধ হওয়ার পেছনে কোনো কারণ ছিলো ?

রনবী : প্রথম তো নিজেই টের পেয়েছিলাম যে টোকাই একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। তার কারণও ছিল। আসলে দেশের সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক পারিপার্শিক সবকিছুতেই একঘেয়েমি ভাব এসে গিয়েছিল। তারপর আমার ছেলেবেলার বন্ধু এবং পরম শুভাকাক্সক্ষী মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত চৌধুরীর আকস্মিক মৃত্যুতে পত্রিকাটি সবদিক দিয়ে নড়বড়ে হয়ে যায়। তখন প্রথমেই টোকাইকে বাদ দেওয়া হয়। অথচ পত্রিকাটি তখনও টোকাই নির্ভর ছিল অনেকাংশে। এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং ঘনিষ্ঠজনরাই বিনা নোটিশে তা বাদ দিয়ে দেয়। ব্যাপারটি আমার জন্য খারাপ কিছু হয়নি। কারণ ইচ্ছা করলেই অন্য কোনও পত্রিকায় দিতে পারতাম। তেমন অনুরোধ পেয়েছিলাম অনেকের কাছ থেকে। তবে খারাপ লেগেছিল পাঠকদের। বহুদিন ধরে তাদের অসংখ্য চিঠিও পেয়েছিলাম আবার শুরু করার।

যাইহোক, নিয়মিত না হলেও এখনও মাঝে মাঝে যে টোকাই আঁকি না তা নয়। সেই সঙ্গে আরেকটা কাণ্ড করেছি। আর তা হলো আমার চিত্রকলায় টোকাইকে বিষয়ে করেছি। সে ভাবেও টোকাই জনপ্রিয়। উল্লেখ্য যে বাজারে টোকাইয়ের অনেক নকল বেরিয়েছে। সইও তাই। কপিরাইটও মানা হচ্ছে না। গ্রাহ্য করছে না।

শব্দঘর : টোকাই শিরোনামের কার্টুনের সংখ্যা কত হতে পারে ?

রনবী : মনে নেই। গুণেও দেখিনি। তবে ১৯৭৭ সালের মে মাসের প্রথম সংখ্যা থেকে প্রতি সপ্তাহে বিচিত্রা বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এবং বছর খানেক পরে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় ২০১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ছাপা হয়েছে। এই সময়গুলোর সপ্তাহগুলো গুণলে টোকাইয়ের সংখ্যা আংশিক পাওয়া যাবে। আংশিক বলেছি, কারণ এছাড়া ছুটছাট আরও কিছু টোকাই ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকায়।

শব্দঘর : বিশ্বব্যাপী কার্টুনের গুরুত্ব রয়েছে বোঝা যায়। আমাদের দেশে কার্টুনকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে কার্টুনকে ভীষণ ভয় পান। আপনার বিবেচনা কি ?

রনবী : কার্টুন আসলে একটা আলাদা ফর্ম, ভিন্ন ক্ষেত্র। এতে শিল্পিত রসের অবতারণাই মুখ্য। কিন্তু এটাতে খারাপ কিছু থাকলে রসটা হারায়। তা হাস্যরসের মধ্য দিয়ে অনেক সমালোচনাধর্মী করারও একটা ধরন আছে। আসলে তো ছবি দিয়ে জোক বলার ব্যাপার। এমনিতে যেমন আড্ডায় কেউ কেউ জোক বলে সবাইকে আনন্দ দেয়। কার্টুন ব্যাপারটা প্রায় সেরকমই। তবে আড্ডার জোক কেউ বানিয়ে বলে না। শোনা কথা থেকে আহরণ করে পুনর্ব্যক্ত করার ব্যাপার। কিন্তু কার্টুনের সবটাই অর্থাৎ জোক বা বক্তব্য পুরোটাই শিল্পীকে সৃষ্টি করতে হয়। ব্যাপারটা জটিল, কিন্তু মজার। নিজ সৃষ্ট মজাটা শিল্পী নিজে অনুধাবন করে প্রথম। তারপর ভাবতে হয় যে, তা সবার কাছে রসোত্তীর্ণ হবে কি না, সে দিকটি। একইসঙ্গে শোভন-অশোভন, পাঠকের রুচি বিঘ্নিত না হয়, তেমনটাও মাথায় রাখতে হয় বলে আমার বিশ্বাস।

উরৎঃু লড়শবং আড্ডার কিছু কিছু সদস্য পছন্দ হয়তো করে, কিন্তু সবাই নয়। শৈল্পিক এবং মার্জিত কার্টুন কয়েক জনকে খুশি করার জন্য নয়। সবার জন্য। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে যে রুচির ব্যাপারে এবং বক্তব্য উপস্থাপনে এক ধরনের সেলফ সেন্সরশিপের দিক থাকতে হয়। পত্রিকাগুলো কার্টুনের গুরুত্ব বুঝে। কার্টুনের জন্য কিছুটা হলেও সার্কুলেশন বাড়ে, তাও তাদের জানা, কিন্তু ব্যবহারের রিস্ক সবাই নিতে চায় না। কোন্ কার্টুনের প্রকাশে কে কখন আঘাত পেয়ে যায় তার তো কোনও ঠিক নেই। সহনশীলতার ব্যাপারটা সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। যেমন ঠাট্টা সবাই হজম করতে পারে না। কিন্তু অনেকে হেসে উড়িয়ে দেয়। কার্টুনের ব্যাপারটা তেমন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

তবে আমি মনে করি যে, এটা সিনেমার মতো আমজনতার কাছে যায় না। যায় শুধু পাঠকের কাছে। পাঠক সংখ্যা তো গুণতিতে ধরা মুষ্টিমেয়। অবশ্য এটা পত্রিকার ব্যাপারে ঘটে, কার্টুন পোস্টার হলে ভিন্ন কথা। দেশজুড়ে দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো সবার চোখে পড়ে। যেমন কামরুল হাসানের একাত্তরের পোস্টার। ‘এই জানোয়ারটাকে হত্যা করতে হবে’ এটি হাস্যরসাত্মক ছিল না। উজ্জীবিত উদ্দীপ্ত করার ব্যাপর ছিল। পাকিস্তানের পক্ষে সবাইকে বিপদে ফেলেছিল আর বাঙালিদের ইয়াহিয়ার প্রতি ঘৃণা পোষণকারী ছিল।

আসলে কার্টুনে দু’রকমের প্রকাশভঙ্গি রয়েছে। একটি রহঃবহঃরড়হধষু ঢ়ৎড়াড়পধঃরাব অন্যটি রহহড়পবহঃ ভাব রেখে করা; কিন্তু সবাইকে ভঁহ ভড়ৎ ভঁহ ংধশব বলে যদি গণ্য করা যায়, তবে সমস্যা হবার কথা নয়। ছোট্ট একটা কার্টুন সমাজ-সংসার কিংবা ব্যক্তি বিশেষের সবকিছুকে ভাসিয়ে দিতে পারে? এমন ভাবার কারণ নেই বলেই আমার বিশ্বাস। রঙ্গরসিকতা ভেবে নিলে ভয়েরও ব্যাপার থাকার কথা নয়। রমহড়ৎব করলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়। আমাকে নিয়েও অনেকে কাটুন রঙ্গ-রসিকতা করেছে। তাতে ভাল-মন্দ দুইই ছিল। মজাই পেয়েছি। তো কার্টুন ব্যবহার না হলে মাধ্যমটির চর্চা বেমালুম বন্ধ হয়ে যাবে। সেটা ভালো দিক নয়।

শব্দঘর : অসাধারণ রস, শ্লেষ, ব্যঙ্গ, কৌতুক মিশ্রিত জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ ‘টোকাই’। তা ছাড়াও ড্রয়িং, ছাপচিত্র, জল রং, তেল রং, অ্যাক্রিলিকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন। বইয়ের প্রচ্ছদও এঁকেছেন।  নৈর্ব্যক্তিকভাবে কিভাবে দেখেন একজন শিল্পী রনবীকে ?

রনবী : সত্যি কথা বলতে কি, আমি আসলে খুব বড় শিল্পী নই। কোনও একটা মাধ্যম বা ধরনকে আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যাপারটি ধাতস্থও করতে পারিনি। নানাভাবে কাজ করাটা হাতড়ে বেড়ানোর মতোন। সবকিছুতে হাত লাগিয়ে নিজের অবস্থানটি বোঝার চেষ্টা করি। এই রকমের ব্যাপার হওয়ায় বিশেষ কোনও একটি দিকের জন্য একরোখা বা জেদ ধরে থাকতে পারি না, সবটাতেই মন দেই। মাধ্যমগুলোর মহিমাগুলো খুঁজি। এটা শিল্পী হিসেবে খুব ভালো স্বভাবের কি না, তা যাচাই করে দেখিনি। তবে মনে করি শিল্পকলা চর্চার যে অফুরন্ত দিক রয়েছে, সে সবের অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্র ছুঁয়ে দেখলে ক্ষতি কি। যুগে যুগে বিশ্বের বহু শিল্পী এরকমটা করেছেন। এক জায়গায় পিড়ি পেতে বসে থাকেনি। দা ভিঞ্চিকে তো এখনও এ ব্যাপারে চ্যাম্পিয়ন ধরা হয়। কত কি-ই না করতেন। পাবলো পিকাসো, রেমঝ্রান্ড, গোইয়া, পল ক্লি, ডেভিড হকনির স্বভাবেও এমনটা ছিল। আসলে একটা দিকে লেগে থাকা আমার কেন যেন হয়ে ওঠে না। তবে ব্যাপারটা ভালো লাগে বৈকি।

শব্দঘর : এর মধ্যে কোন মাধ্যমে আপনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন ?

রনবী : আসলে আঁকাআঁকির ব্যাপারে আমার মনে হয় স্বাচ্ছন্দ্য বলে কিছু নেই। আপসে কিছু হয় না। খাটাখাটনি করে আঁকা বা নির্মাণ করার দক্ষতা অর্জিত হলেও হয়তো রসপ্রাপ্তি ঘটে না। শিল্পকলা বড়োই গোলমেলে ব্যাপার। আবার আঁকতে পারাটা যথাযথ শুদ্ধ হলেও তাতে রসসৃষ্টি হলো কি না, তা নিজেকেই বুঝতে হয়, জানতে হয়। প্রত্যেকটি মাধ্যমেই ভিন্ন ভিন্ন মহিমা রয়েছে। সে সবের প্রতিটিতে নাক গলানো এবং সফল হওয়া দুরূহ ব্যাপার। তবু ছুঁয়ে দেখা থেকে সরতে পারি না। অবশ্য নিজের আঁকায় নিজেই মহা তৃপ্ত হয়ে ‘দারুণ হয়েছে, ফাটাফঅটি এঁকেছি, ভাবলে বিপদ। বিচারের ভার অন্যদের থাকলেই ভাল। আর প্রশংসা পেতে ‘কী ‘কী হনু  রে’ ভাবটা এলেই সর্বনাশ।

শব্দঘর : আপনার ভেতর একটা দ্রোহীসত্তা আছে। এ সত্তা নির্মাণের প্রেরণা কোথা হতে পেলেন ?

রনবী : ভেবে দেখিনি। ‘দ্রোহ দিকটা তো অনেক বড় ব্যাপার। ছেলেবেলায় অহেতুক কেউ ধমক দিলে বা গালাগাল দিলে যে, রুখে দাঁড়াবার ব্যাপার অনেকের মধ্যে দেখতাম। তা আমার মধ্যে কোনোদিন ছিল না। সবটা হজম করাই ছিল স্বভাব। কিন্তু বড় হয়ে দেশের হালচাল নিয়ে সবার মধ্যে যে দ্রোহী ভাব দেখেছি ,মন্দ দিকগুলোকে নিয়ে প্রতিবাদী হতে দেখেছি, সে সবের অনেক কিছুতে অনেক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলাম, তাগিদ অনুভব করে। সেটা হয়তো স্বভাব। আর তা ঘটনা এবং অবস্থার কারণে সৃষ্টি হয়।

শব্দঘর : ১৯৭৩-এ গ্রিক সরকারের বৃত্তি নিয়ে এথেন্সে চলে গেলেন। সেখানে কাঠ-খোদাই-এর কাজ করেছেন। ওখানে শিল্পকলার পরিস্থিতি এবং আপনার অবস্থান কেমন ছিলো বা কি অর্জন করেন সেখানে ?

রনবী : গ্রিক সরকারের বৃত্তি পেয়ে সেখানে যাওয়ার আমার সুখস্মৃতি যেমন আছে, তেমনি প্রচণ্ড বেদনাদায়ক স্মৃতিও রয়েছে। আনন্দের দিক ছিল স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরপর যে ক-জন ভাগ্যবান বিদেশে পড়তে যাবার সুযোগ পেয়েছিল, আমি তাদের একজন। আরেকটি হলো বাংলাদেশের প্রথম পাসপোর্টধারীদের একজন এবং সেই সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ১৯৭৫ সালের আগস্টের আগে অন্য যে দেশেই গিয়েছি ইমিগ্রেশনগুলোতে খুব সম্মান পেয়েছি। সব মুশকিল আসান হয়ে যেত সবখানেই, নতুন স্বাধীন দেশের একজনকে পেয়ে সবাই মনে করতো বীরের দেশের মানুষ। বলতো শেখ মুজিবের দেশের লোক। যুদ্ধের কথা, দেশের কথা এবং বিশাল বড় নেতাকে কাছে থেকে দেখেছি কি না, সেসব গল্প শুনতে চাইত সবাই। এই সবই ছিল দারুণ আনন্দের দিক। প্রথম ইউরোপে যাওয়ার যে আনন্দ তার চাইতেও বড় আনন্দ ছিল ওইসব ভক্তি-সম্মান। ইউনিভার্সিটিতেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বসবাসটাও খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহতের মর্মান্তিক ঘটনার পর সবকিছু নিমিষেই বদলে গিয়েছিল। সব আদর আহ্লাদ হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। নৃশংস জাতি বলে ভর্ৎসনা করত সবাই। আমার অধ্যাপকসহ অনেকেই বলতেন―‘অমন দেশে ফিরে না যাওয়াই ভাল। থেকে যাও এখানে।’ সত্যি বলতে কী, একটা কলেজে চাকরিও পেয়ে গিয়েছিলাম। মাস দুয়েক করেও ছিলাম। কিন্তু মন টেকেনি। দেশের অবস্থাও ওই ঘটনার পর কোন দিকে যাচ্ছে, কোন পর্যায়ে রয়েছে সেসব দূর থেকে জানতে না পেরে শঙ্কিত থাকতে হতো। সবাই জিজ্ঞেস করত আবার পাকিস্তান হয়ে যাচ্ছে কি না। তো তখন দেশ থেকে কোনও চিঠি গ্রিসে পৌঁছাতে কমপক্ষে ২৫ দিন লাগত। সেটাও পরিবার অথবা বন্ধুদের কাছ থেকে এলে তাতে ভয়ে তারা দেশের অবস্থা, রাজনীতি, শাসক ইত্যাদি নিয়ে কেউ কিছু লিখতো না।

তো এইসব বেদনাময় ঘটনার পরপরই ১৯৭৬-এ আমাদের গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যারের মৃত্যুর খবরটা ছিল আরেকটি দুঃখের ঘটনা। সেটাও জানতে সময় লেগেছিল কয়েক সপ্তাই অতএব সব মিলিয়ে বিদেশে থাকার ব্যাপারটি মানসিক দিক দিয়ে ভালো কাটেনি। যা-হোক গ্রিসে যখন গেলাম, তখন তো ঢাকায় শিক্ষকতায় অভিজ্ঞ একজন শিল্পী। অতএব নতুন কিছু পাবার চাইতে গ্রিসের প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেখতে পাওয়ার লোভটাই ছিল বেশি। তো সেই দিকটি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি। তা ছাড়া গ্রিকরা খুব আমুদে জাতি। বিদেশিদের সঙ্গেও মিশতে পারে খুব। আপামর জনসাধারণ সবাই গানপাগল। কয়েকজন একসঙ্গে হলেই কোরাসে জনপ্রিয় লোকগীতি কিংবা গণসঙ্গীত গায় জোর গলায়। এবং তা নারী-পুরুষ সবাই। তাদের প্রাচীন সভ্যতা, বীরত্বগাথা ইত্যাদি নিয়ে খুবই গর্বিত জাতি। কিন্তু ৭০ দশকের ওই সময় খুবই আর্থিক দিক দিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু শিল্পকলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদিতে খুবই ভালো ছিল। সঙ্গীতে কস্তা গাভরাস, ইয়নিস, লেখক নিকস কাজানজাকিসসহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। হলিউডেও অভিনয় করেছেন এমন কয়েকজন অভিনেত্রী ছিলেন। যেমন―মেলিনা মেরকুরি, ইরিনা পাপ্পাস প্রমুখ। চিত্রকলায় মাভ্রোইদিস, স্তাভ্রুলাকিস এবং আমার অধ্যাপক ছাপচিত্রের ক্ষেত্রে ইউরোপের শিল্পকলা অঙ্গনে বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আর স্থপতি দক্সিয়াদিস তো বিশ্বের সেরাদের একজন ছিলেন, তাঁর নকশার দালান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, হোম ইকোনমিক্স কলেজ এবং কুমিল্লা ‘বার্ড’। তিনি আধুনিক এথেন্স এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদ টাউনের প্লান করেছিলেন। তো সেখানে ছাপচিত্রে কাজ করেছিলাম কাছ খোদাই চিত্র নিয়ে। মাধ্যমটিতে বেশ কিছু নতুনত্ব অর্জন আমার চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে নানানভাবে।

শব্দঘর : বিশ্বের অপরাপর দেশের তুলনায় আমাদের শিল্পচর্চার অবস্থান এ মুহূর্তে কিভাবে, কেন উল্লেখযোগ্য ?  না কি আমরা পিছিয়ে আছি? যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে কিভাবে উত্তরণ হতে পারে ?

রনবী : শিল্পকলার ব্যাপারটি বিশ্বের কোনও দেশে এখন গণ্ডিবদ্ধ নয়। এক ধরনের আন্তর্জাতিকতাবোধ রয়েছে সবার। সেই অ্যারেনায় আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা নানান নিরীক্ষাধর্মী চর্চা দিয়ে দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করছে ক্রমাগত। চমৎকার অবস্থানে পৌঁছেছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও চর্চায় নিবেদিত শিল্পীরা। সমস্যা রয়েছে প্রচুর। সেসব দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট শুভানুধ্যায়ীদের। এই অত্যাধুনিক গ্লোবাল যোগাযোগের যুগে পিছিয়ে পড়ার উপায় নেই। আমারও তাই দূরে সরে নেই। আর সবার উত্তরণের সাথে আমরাও সামিল আছি। তা ছাড়া ঐতিহাসিক দিক দিয়ে তো আমরা পিছিয়ে নেই। আদিকাল থেকেই সমৃদ্ধ।

শব্দঘর : আপনার বই (স্মৃতির পথরেখায়) থেকে প্রথমে উদ্ধৃত করি- ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার নির্মম ঘটনার পর দেশে অন্য রকম রাজনৈতিক হাওয়া-আবহাওয়া চলছে তখন। দেখলাম পরিচিত অনেকেই বেমালুম বদলে ফেলেছে নিজেদের ভাবনাচিন্তা। কেমন যেন পাকিস্তানি পাকিস্তানি ভাবও। পঁচাত্তরের ঘটনাবলি নিয়ে কারওরই মুখে কথা নেই। এড়িয়ে যাওয়াটা অভ্যাস করে ফেলেছে। মুখে কুলুপ আঁটা।’―খোলস পালটানোর বিষয় এখন আরও বেশি বিস্তৃত হয়েছে। জানতে চাই―এত দ্রুত পাকিস্তানি ভাবধারায় প্রতিস্থাপনের কারণ কি ?

রনবী : সে সময় বিদেশে তিনবছর কাটিয়ে দেশে ফিরে চিন্তিত হবার মতো বদলে যাওয়া কিছু ব্যাপার দেখেছিলাম। একাত্তরের যুদ্ধের সময় যেমন কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। সন্দেহকে মাথায় নিয়ে চলতে হতো, সেই রকমটাই পেয়ে বসেছিল আমাকে। এমনও মনে হতো যে, পাকিস্তানে বিশ্বাসী যারা ঘাপটি মেরে ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে, তাদের জন্য সময় এসেছে। দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম নামি মুক্তিযোদ্ধাদেরও অনেকে পরিবর্তনটায় জড়িত। বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সব অর্জনকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যেন।

পাকিস্তানি ভাবধারা প্রতিস্থাপনের ব্যাপারটিতো এমন সব ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের অংশ হতে পারার কারণে। সেটা পরবর্তী ইতিহাসেও বর্ণিত হয়েছে। তা তো সবারই জানা। যা-ই হোক তেমন ভাবনাধারীরা যে এখন আর নেই, তা নয়। নানাদিকে যেমন―মানুষদের কর্মকাণ্ড, রাজনীতি পরখ করলেই বোঝা যায়।

শব্দঘর : আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করছি। আপনি বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখেছেন। মহান স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে আপনার দৃষ্টিতে কিভাবে মূল্যায়ন করেন ?

রনবী : বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ আর স্বাধীনতার ৫০বছর অদ্ভুতভাবে একই বছরে থাকায় উদ্যাপনের মাত্রাটায় উচ্চতা পেয়েছে বেশি। উদ্যাপনে বাস্তবায়ন কমিটির একজন সদস্য হওয়ায় করোনার কারণে উদ্যাপন অনেকটাই খর্ব হয়েছে, বাধাগ্রস্ত হয়েছে দেখে মন খারাপ হয়েছে অনেক আয়োজনই সংক্ষেপ করতে হয়েছে, যা কাম্য ছিল না। তবে আনুষ্ঠানিকতা যেমন হোক, মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসার চিরকালীন দিকটি যে বিশাল হয়ে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত রয়েছে সেটা বোঝা গেছে। বিশ্বজুড়েই সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছে বর্তমানের নেতারা, রাজনীতিবিদরা। আসলে আমার ভাবনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বিশ্বের মানচিত্রে একটি দেশ জুড়ে দিয়ে গেছেন। যে কারণে সারাবিশ্বে বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিতি ঘটেছে। তাকে নিয়ে শুধু উৎসব নয়, আরও অনেক স্থায়ী দিক নিয়ে ভাবা উচিত। আর এখনই সেই সময়।

শব্দঘর : মুক্তিযুদ্ধে আপনার অংশগ্রহণ ছিলো। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু ছিলেন বা এখনও জীবিত আছেন, যাঁরা সরাসরি বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। সে দিনগুলোর কথা আপনার কাছে জানতে চাই।

রনবী : প্রথমেই বলে নিই আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম না। হতে পারিনি। প্রচলিত নিয়ম-কানুন অনুযায়ী যে অর্থে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া যায়, দুর্ভাগ্য যে, সেটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়। ক্রাইটেরিয়াতে পড়ি না! একাত্তরে ঢাকাতেই থাকতে হয়েছিল। এবং তা আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শ অনুযায়ী। ঢাকায় কিছু কিছু মানুষের যোদ্ধাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন ছিল, সহায়ক হিসেবে। আমি ছিলাম তেমন একজন। যেমন ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। তাকে তো সে কারণে শহিদ-ই হতে হয়েছিল। সেক্টর প্রধান কর্নেল খালেদ মোশাররফের বাহিনীর অনেকে আসতেন গা-ঢাকা দিয়ে। তারা অনেক রিস্কি কাজের ভার দিয়ে যেতেন। আরও কয়েকজন শিল্পীও এ কাজে ছিলেন। শিল্পী আমিনুল ইসলাম, হাশেম খান তো ছিলেনই। আর ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, জাহানারা ইমামও। পরস্পরকে যোগাযোগ রাখতে হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের খুবই প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস জোগাড় করে রাখতে হতো। ওষুধ, কাপড়, জামা, জুতা এবং টাকা-পয়সাই ছিল সেসবের মধ্যে প্রধান। খুবই বিপজ্জনক ছিল কাজটা।

অপারেশনে এলেও আমার বাসায় সারাদিন থাকতেন। সময় হলে আবার অপারেশনে চলে যেতেন। ভয়ে ভয়ে দিন কাটত যে, বলাই বাহুল্য।

শব্দঘর : ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন কি না ? এখনও কোনো আদর্শ লালন করেন কি না? শিক্ষক বা শিল্পী না হলে কোন্ ঘরানার রাজনীতি আপনি করতেন ?

রনবী : ছাত্রজীবনের পুরোটাই কেটেছে রাজনৈতিক উত্থান-পতন সময়ের মধ্য দিয়ে। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা বলতে তো কোনও-না-কোনও দলের সদস্য হওয়া। আমি তা ছিলাম না। কিন্তু প্রয়োজনে প্রগতিশীল রাজনীতি এবং বাঙালি দেশাত্মবোধের ব্যাপারে অন্য যেসব দল ছিল, তাদেরকে সহায়তা দিতাম আঁকাআঁকির প্রয়োজন হলে। আসলে শিক্ষক এবং শিল্পী না হলে আমার দ্বারা কোনও কাজই হতো না হয়তো, রাজনীতি তো দূরের কথা।

শব্দঘর : শিল্প সাহিত্যকে কি রাজনীতি থেকে আলাদাভাবে দেখা সম্ভব ? আপনার বিবেচনা কি ?

রনবী : আমাদের সমস্যাসংকুল দেশের জন্য তা খাটে না। রাজনীতিবিদ হবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবার ব্যাপারটি শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক সঙ্গীতজ্ঞ সবার চেতনাতে থাকে। তা করলে রাজনীতি মাথায় থাকে না, তা নয়। পাকিস্তান আমলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাদের কর্মে যেসব কথা আঁকতেন এবং লিখতেন তাতে রাজনৈতিক বিষয় থাকত বেশি। সেসব রাজনীতির উদ্ভাবনী শক্তি ছিল আমাদের দেশ বলে নয়, সব দেশেই এমনটা রয়েছে। এবং সব যুগেই এমন ছিল। প্রথম এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তো শিল্পী-সাহিত্যিকরা অসাধারণ সব শিল্প-সাহিত্য রচনা করেছিলেন রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। আসলে জনসাধারণও তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

চিত্রকলা পাবলো পিকাসোর গোয়ার্নিকা তো পুরোপুরি রাজনীতির বক্তব্য নিয়ে সৃষ্ট। তার শান্তি কপোত ড্রয়িংও তাই। অনেক আগে ফ্রান্সিস্কো গইয়া তার ছবিতে রাজনীতির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। চিলির কবি পাবলো নেরুদাকে স্মরণ করা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে। ব্রিটিশ আমলে কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা পঞ্চাশ-ষাট দশকের শিল্পী কবি-সাহিত্যিকরা রাজনীতি সচেতন লেখা লিখেছিলেন প্রতিবাদী জনগণের সহায়ক শক্তি হিসেবে। শিল্পী কামরুল হাসান একাত্তরে তাই করেছিলেন, আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রধান ড্রয়িং করেছিলেন।

ব্রিটিশ আমলের প্রায় শেষ দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যে দুর্ভিক্ষের ড্রয়িংগুলো এঁকেছিলেন সেসবে তো রাজনীতি প্রচ্ছন্নে প্রধান ছিল। আসলে রাজনীতির ব্যাপারে শিল্প-সাহিত্যের নিজস্ব অবস্থান আছে, গতি আছে। নান্দনিক আর সৃষ্টিশীল ব্যাপার-স্যাপার আপন মহিমা ধারণ করে চলে। রাজনীতির মতো ‘ক্রুড’ দিকে বলতে গেলে শিল্প-সাহিত্যে সব সময় যে মিশিয়ে রাখতে হবেই তেমন নয়। ব্যাপারটা প্রয়োজনে যুক্ত হয়। ভাবনা-চিন্তায় উপস্থিত হয়। দুটি কর্মকাণ্ড দু’রকম কিন্তু কখনও কখনও এক চিন্তার হয়ে যায়, মিশে যায়।

শব্দঘর : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে শিল্প, সাহিত্য, সমাজজীবনে আমাদের কি কি অর্জন হলো? এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি বলুন।

রনবী : ‘অর্জন’ ব্যাপারটা খুবই আপেক্ষিক। কতোটুকু হলে স্বস্তি যাওয়া যায় তার কোন মাপকাঠি তো নেই। শেষ বলেও কিছু নেই। তবু বলি যে-ব্যাপারটা অতো তলিয়ে দেখিনি। তবে অর্জন যে খুব মাত্রা ছাড়িয়ে দারুণ একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে তা হয়তো নয়। আমি যেহেতু শিল্পকলা অঙ্গনের একজন তাই সেটা নিয়েই ওপরের কথাটা বললাম। তবে যা হয়েছে তাও কম নয়। বিশাল একটি জাতীয় চিত্রশালা হয়েছে। দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক শিল্পকলার বড় একটি আয়োজন হয়।

কিন্তু সব চাইতে ভালো বলে মনে হয় যে, শিল্পকলা চর্চার প্রসার বেড়েছে। সবক’টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা শিক্ষার জন্য অনুষদ, ইনস্টিটিউট রয়েছে। কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনটা রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি কলেজও। প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী শিল্পী হচ্ছে। নানাভাবে কাজ করছে। অহরহ প্রদর্শনী হয়। এসব থেকে শিল্পকলার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে শুভানুধ্যায়ী। ঘরে ঘরে ছবি টাঙাবার, সংগ্রহ করবার রুচি বেড়েছে। শিল্পীদের সম্মান করা এখন যথেষ্ট ভালো। ক্ষেত্রটিতে লেখাপড়া করতে চাওয়ার ছাত্রসংখ্যা এখন আকাশচুম্বী। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেয় প্রায় কুড়ি হাজার। ষাট দশকের শুরুতে যখন ৫০জন আসা শুরু হয়েছিল, তখন তাতেই  মহা আনন্দিত হতেন শিক্ষকমণ্ডলীরা।

তো এইসবকে যদি অর্জন বলা যায়, তবে তা ঘটেছে তা বলাই যায়। আর সাহিত্যের ব্যাপারটা তো অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে শুনি। ব্যাপারটি সাহিত্যিকরা ভালো বলতে পারবেন। সারাবছর সব ধরণের প্রচুর বইপত্র প্রকাশিত হয়। পাঠক বেড়েছে অনেক। আমাদের বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা লেখক-লেখিকার গল্প-উপন্যাস-কবিতা, এমনকি গবেষণাগ্রন্থ অনূদিত হয়েছে এবং হচ্ছে নানানভাষায়, নানা দেশে। এসব অর্জনের পাশাপাশি ছাপার দিকটি চমৎকার ঝকঝকে মাত্রা যোগ হয়েছে অত্যাধুনিক সব মুদ্রণযন্ত্র আসায়। লেখকরা বিদেশেও বড় মাপের পুরস্কার পাচ্ছেন। এসব দেখে বুঝতে পারি যে, আমাদের সাহিত্যের একটা ভালো পরিচিতি ঘটেছে সর্বত্র।

অর্জনের এইটুকুই আমি জানি। বাকিটা সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা ডিটেইল বলতে পারবেন। আর এসব নিয়ে অনুভূতির কথা জিজ্ঞেস করলে বলতে ইচ্ছে হবে যে, ৫০টি বছর তো কম নয়। বছরগুলো পার করতে করতে অনেকেই বর্ষীয়ান হয়েছি। প্রবীণত্ব প্রাপ্তি ঘটেছে। তাই মনে হয় যে, আরও অনেক অনেক অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারটি বোধহয় ঘটেনি। আসলে চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারটির তো আর শেষ নেই। একটা সমাধা হলে আরেকটা মনে টোকা দেয়।

শব্দঘর : বিশ্বসেরা শিল্পকর্ম ও শিল্পী প্রসঙ্গে আপনার আছে জ্ঞান ও জানাশোনা। বিশ্ব শিল্পকলা সম্পর্কে রেখাপাত করবেন। বিশেষত―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও এস এম সুলতান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

রনবী : আসলে বিশ্বের শিল্পকলা চর্চার নিত্যনতুন পর্যায় এমন বিস্তৃত আর নিরীক্ষাধর্মীতার দিকে ধাবমান যে, সবটা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। বলতে কি, আমি সেই কারণে পিছিয়ে পড়া একজন। এবং অনেকটাই পুরোনোপন্থিদের দলভুক্ত হয়ে পড়েছি। সেই কারণে এই মুহূর্তের ব্যাপারগুলো নিয়ে কিছু বলা কঠিন। তবে বলতে পারি যে, এই অত্যাধুনিক যান্ত্রিক উৎকর্ষ সাধনের যুগে পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। তাতে চর্চার ধরন ধারণ সবই প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে এসে যাচ্ছে, জানাজানির কারণে। এক ধরনের আন্তর্জাতিকতা ভর করছে সবকিছুতে। ধরন-ধারণ আর নাম, স্বনামে একক হয়ে পরিচিত হওয়ার ঘটনা এখন আর ঘটে না।

অতএব আমি এখনও সেই পিকাসোদের কথাই ভাবি। সালভাদর দালি, কিংবা পল ক্লি, বা মীরোদের কথাই ভাবি। আর ভাবনায় তাদেরও আগের পোস্টইম্প্রেশনিস্ট বা ইমপ্রেশনিস্টদের ব্যাপার-স্যাপার ভাবনায় আসে। খুব জোর ‘তাপিস’ পর্যন্ত যেতে পারি। কিন্তু বর্তমানের কেউ তো এককভাবে কোনও ট্রেন্ড তৈরি করে বিশ্বের শিল্পকলাকে নাড়া দেওয়ার মতো হয় না। কেউ গ্রাফিতি আধুনিক কলারস দিয়ে কাজ করছে, কেউ কম্পিউটারকে কাজে লাগিয়ে কাজ করছে, কেউবা ইনস্টলেশনের তাৎক্ষণিকতা নিয়ে কাজ করছে। ব্যাপারগুলো ঘটছে সারাবিশ্বে সমানতালে। এসবে কারা যে নামিদামি হচ্ছে তা সবার কানে হয়তো আসে না। আমার তো নয়ই। তবে তরুণ শিল্পীরা নিজেদের তাগিদে খোঁজ খবর রাখে। ব্যাপারগুলোতে যে চটক আছে, তা ভালো মন্দ মিশানো। আসলে এসব দিকে আমি খুব মনোযোগী চোখ রাখি না।

যাইহোক, প্রশ্নের বাকিটা নিয়ে বলি। যাদের নাম বলা হয়েছে তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলা সহজ নয়। তাদের কাজের ব্যাপ্তি; ধ্যান-ধারণা, ধরন-ধারণ এবং দর্শন নিয়ে বড় আলোচনাতেই কিছুটা বলা হয়তো সম্ভব।

যা হোক, যাঁদের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা সবাই অবাক করা প্রতিভাধর শিল্পী। কিংবদন্তীতুল্য আমি তাঁদের গুণমুগ্ধ ভক্ত। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সৃজনশীল মনন আর মেজাজে ছবি এঁকেছিলেন। ভারী কোনও মাধ্যমেও  হাত দেননি। কালি, কলম আর জলরঙে কাজ করেছেন ছোট পরিসরের কাগজেই বেশি। দেশের প্রচলিত কোনও ধরন বা কোনও ইউরোপীয় ইজম বা রীতিনীতির দিকেও মন দেননি। তারপরও তার সহজিয়া বিষয়-বিন্যাস, আঁকাআঁকির ধরন, বড় কিছু কথার অবতারণায় না যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে নিজস্ব যে স্টাইল তৈরি করেছিলেন তাতে ইউরোপীয় সমালোচকরা তাঁকে ভারতের প্রথম আধুনিক শিল্পীর আখ্যা দিয়েছেন বইপত্রে। তাঁর স্টাইলটিকে তো এখন রাবিন্দ্রিকও বলা হয়। সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রচিত্রকলা হিসেবেও আখ্যায়িত। বড় কথা এই যে, ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে তিনি অন্যতম প্রধান চিত্রকরের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত আছেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং কামরুল হাসান তো আমার শিক্ষকই ছিলেন। আবেদিন স্যার যে শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে আমাদের দেশকে গর্বিত করে গেছেন তা-ই নয়, তিনি তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছেন দেশাত্মবোধ, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং চারিত্রিকভাবে মানবিক হবার চেতনা আর রসবোধ। তাঁর সৃষ্টির নান্দনিক দিকগুলোর চর্চার পাশাপশি দেশে দক্ষ শিল্পী বানাবার প্রচেষ্টাও ছিল, যাতে তারা দেশের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করে আর্থিক ভাবেও সচ্ছল থাকতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের সব ক্ষেত্রের মানুষকে রুচিবান করে তোলার কথা তো বলতেনই।

এসবের জন্য ১৯৪৭-এর পরে ঢাকায় এসেই চারুকলা শিক্ষার বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবৈরিতার সম্মুখীন হয়েও। সেই বিদ্যাপীঠ এখন বিশাল কলেবরের হয়েছে। প্রচুর শিল্পী তৈরি হয়েছে। এটাকে ঘিরে রুচির দিকটাও এখন সারাদেশে ভালো পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার এইসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন খ্যাতিমান আরও কয়েকজন শিল্পী কামরুল হাসান ও অন্যরা। ছিলেন আনোয়ারুল হক, সফিউদ্দিন আহমেদ, খাজা শফিক আহমেদ এবং হবিবুর রহমান।

শিল্পী কামরুল হাসান, আবেদিন স্যারের মতো পূর্ববঙ্গের ছিলেন না। ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের। কিন্তু এখানে এসে লোকশিল্পের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আবেদিন স্যারও তাই ছিলেন। সেভাবে দুজনই কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কামরুল হাসান লোকশিল্প থেকে ধরন এবং উপাদান নিয়ে আধুনিকতার সঙ্গে মিশিয়ে নিজের একটি ধরন তৈরি করেছেন। সেই ধরনের ড্রইং এর ব্যবহার এতটাই আধুনিক ছিল যে অপূর্ব মাত্রা তৈরি হয়েছিল। আবেদিন স্যারের ক্ষেত্রেও তাই ছিল। কিন্তু তিনি এক সময় সেখান থেকে সরে এসেছিলেন।

কামরুল হাসান তার ধরনটিতে ভিন্ন মাত্রা দিয়ে চর্চায় রেখেছিলেন। আমি সব সময়ই বলি এরা ইউরোপে জন্মালে সেখানকার বড় শিল্পীদের কাতারভুক্ত হতেন।

আমাদের আর এক মহান শিল্পী এস এম সুলতান গ্রাম-বাংলার জীবনকে তিনি নিজের শৈলীতে সাজিয়ে চিত্রচর্চা করেছেন। তাঁর জীবনাচারও ছিল আকর্ষণীয়, চিরকুমার ছিলেন। নিজ এলাকার সব শ্রেণির মানুষের ভালোবাসাকে পাথেয় করে নড়াইলেই বসবাস করতেন। এবং সেখানকার চিত্রা নদী, ফসলের মাঠ, নারী-পুরুষ ছিল তার প্রধান বিষয়। অনেকেই তাঁকে সুফি মতবাদের শিল্পী হিসেবেও জ্ঞান করত।

কলকাতার চারুকলা কলেজে লেখাপড়া শুরু করেও স্বভাবে বোহেমিয়ানতার কারণে তা শেষ করেননি। ইউরোপসহ বহু দেশ ঘুরে শিল্পকলার অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁর পুনরায় আঁকার দিকে ঝুঁকতে সহায়ক হয়েছিল। এ কথা তিনি নিজে আমাকে বলেছিলেন। কিন্তু অত দেশ ঘুরেও তিনি নিজের দেশ, মানুষ আর মাটিকেই স্থান দিয়েছিলেন ক্যানভাসে। আমি তার স্নেহ এবং সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। তিনি এতটাই পছন্দ করতেন যে, তার একটা প্রদর্শনীর ক্যাটালগের প্রচ্ছদ আমাকে দিয়ে আঁকিয়েছিলেন।

শব্দঘর : সংলাপের জন্য আপনি সময় দিয়েছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম ব্রিটিশ, পাকিস্তানের উপনিবেশপর্ব এবং বাংলাদেশের সমাজেতিহাস। একইসাথে শিল্প, সংস্কৃতির নানা বিবর্তন ও এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আপনার সঙ্গে কথা বলে একজন রফিকুন নবী-রনবীকে শুধু জানা হয়নি। জানা গেলো সেকালের ঢাকা, পারিপাশির্^ক অবস্থা, মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আপনাকে অশেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares