গল্প : অচেনা নদীতে ঢেউ : বুলবুল চৌধুরী

মাথার ওপর চাঁদ নিয়ে, বসেছিল তারা। জোছনা ছিল হাতের ভাঁজে এবং গাছগাছালি, মৃত্তিকা, নদীজুড়ে। তারা বসেছিল ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে। দিন পরিষ্কার বলে লোকালয়ের বাইরে এই কাঁচা পথেও উজানি কই মাছের মতো একজন দুজন লোক চলাফেরা করছিল। কিরমান হঠাৎ গা-হাত-পা ছড়িয়ে বসল। নড়ে উঠল ঘন ঝোপ-জঙ্গলের খানিকটা জায়গা! পাশে


মোন্তাজ অনেকক্ষণ থেকেই বসে বসে ঝিমুচ্ছে। লাশের মতো দিন দিন ফুলে উঠছে শালা। ফুলতে ফুলতে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, রামদা বসিয়ে চাপলে এই মাংস কাটবে মন্দ না। ভেতরে-বাইরে অস্থির হয়ে উঠছিল কিরমান। দু’হাত নিসপিস করছিল। মাঘের শীতে দুজনে মিলে আফসার কাজীকে ধরে এনেছিল। জীবন নেবার জন্য নয়, শরীর পাঁকিয়ে দেবার জন্য। মোন্তাজ লাঠি উঁচিয়ে দু’চার ঘা লাগিয়েছিল আফসার কাজীর পিঠে। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বসে পড়েছিল আলের ধারে। মুখের কাপড় হেঁচকা টানে সরিয়ে ফেলেছিল কিছুক্ষণের জন্য। দারোগার ঝামেলা হয়েছিল সেবারে। আফসার কাজী মোন্তাজকে চিনেছিল। বুড়ো জাত-বদমাশ, মার খেয়ে পড়ে থেকেও চোখ ঠিক রেখেছে। মুখের কাপড় না সরালে এই ঝামেলা হতো না, দণ্ডি দে। এইবার টাকা দে দারোগাকে।

কিন্তু কিরমান করবে কি ? সঙ্গে একজন না থাকলে কাজ হয় না। শক্ত সমর্থ একজন জোগানদার তো চাই। ডেঙ্গু ছিল। খাদেম ছিল। গত বছর কারারচরের মিয়াবাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে বিপদ হলো। পালাবার সময়ে পিঠে কোঁচ-গাঁথা হয়ে সেখানেই মারা গেল ডেঙ্গু। খাদেমও ধরা পড়ল। জেল হলো তার। চেষ্টা করলে খাদেমের জেলটা হতো না। সাহেব আলি গা করল না। টাকা ঢালবে না শালা। খাদেম, যুইতের কথাবার্তা বলত না সাহেব আলির সঙ্গে। চটাং চটাং জবাব দিত। পোষ না-মানা টিয়ার মতো হারামি ছিল সে।

কিরমানের চড়া কণ্ঠ শুনে  সাহেব আলি বিস্মিত হয়েছিল।

সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে অপেক্ষা করেছে। একবার বলতে যাচ্ছিল, কাজটা করতে পারবে না। কিন্তু চুপ মেরে রইল। টাকার দরকার। বউ ঘরে প্রসবের দিন গুনছে।

মোন্তাজ ফিসফিস করে, দে, দেশলাইডা দে।

ইতোমধ্যে বাতাস কমে এসেছে। তারা টের পাচ্ছিল। গরমও লাগছিল। তাদের ঠিক পেছনেই নদী। তবুও ঠাণ্ডার কোনও পরশ নেই।

কিরমান ভাবছিল, মিয়া কখন ফিরবে। রাতে যদি না ফেরে, তাহলে কাজ হবে না।

ঝোপের আড়ালে বসে দুজন অনর্গল ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। কিরমানের হাত খারাপ। মোন্তাজ অনুভব করে। মধ্যেমধ্যে রামদা নিজের চোখের সামনে তুলে নিয়ে দেখছিল কিরমান।

মোন্তাজের গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পিপাসা, পানির দরকার। খুঁটিয়ে দেখল, পানি চাই কি-না তার। কিন্তু না, আসলে এটা পিপাসা নয়। আফসার কাজীকে ধরে আনবার দিন, মাঘের শীতেও এমন হয়েছিল। কিরমানের চোখের দিকে তাকালেও এমন হয়। অন্ধকার থাকলে, হাতে ধারালো কিছু থাকলে, শিকার থাকলে জ্বলে ওঠে কিরমানের চোখ।

কিরমান অসহিষ্ণু হচ্ছিল। কখন থেকে সে উৎকর্ণ হয়ে আছে, দূরে একটা সাইকেলের ঘণ্টা বেজে উঠবে বলে। কিন্তু ভুল করেও তারা সাইকেলের চেনের শব্দ কি পথের উঁচু-নিচুতে থেঁতলে উঠবার শব্দ, কি ঘণ্টার শব্দ―কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না।

আস্তে আস্তে দুজনেই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লান্তির দিকে পৌঁছে যাচ্ছিল। মোন্তাজ প্রথম থেকেই ধীর, উৎসাহহীন। কিরমানের শরীরের গ্রন্থি শিথিল হচ্ছিল। মুখে ধোঁয়া আটকে যাচ্ছিল।

এ সময় কি হলো আকাশের, হালকা মেঘে ঢাকা হচ্ছিল চাঁদ, জোছনা যাচ্ছিল লুকিয়ে।

মেঘ আসবোনি ? কেমুন হাজ করতাছে দেখ।

মোন্তাজ কথাশেষে উঠি উঠি ভাব দেখায়। যেন কথা ভাঙল, এবার ওঠার পালা।

কিরমান চুপ। আকাশে আস্তে আস্তে মেঘের খেলাই বাড়ছিল। অন্ধকার নেমে আসছিল আলতো। চাঁদকেও গ্রাস করা হয়েছে ইতোমধ্যে। ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে, কাছাকাছি থেকেও একজন অন্যজনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না আর। কিরমান হঠাৎ শিউরে উঠল। কারণ কী ? কোনও কারণই তো খুঁজে পেল না সে। সব বেজায় আবছা হয়ে যায়। বৃষ্টি নিশ্চিত হয়ে আসছে। কিরমান বুঝতে পারে, বৃষ্টি নামবার আগে মাটি আড়মোড়া ভেঙে গরম ছড়ায়। সেদ্ধ ধানের ভাপের মতো ওপরে উঠছিল গরম।

মোন্তাজ রামদার ধার দেখতে থাকে। ধার আছে। মানুষের রক্তের ছোঁয়া পেলে ধারটা নষ্ট হয় না। বরঞ্চ আরও চকচকে হয়ে ওঠে দিন দিন। সময় হয় না, ইচ্ছে হয় না, তাই যত্ন করে মোছেও না কোনও দিন। অথচ, অনেকদিন পর বের করলে দেখা গেল, জং ধরেনি কোথাও।

ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসছিল, তখন বউ বারবার নিষেধের বেড়াজাল দিচ্ছিল। সে নির্বিকার শুনেছে।

যাইও না!

খাবি কি মাগী ? খাওনডা কি উইড়া আসব ?

অমনি সব চুপ। ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে মোন্তাজ। প্রায় সন্ধ্যা থেকে এখানে তারা অপেক্ষারত। অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ তারা বসে আছে। বউয়ের কথাই মনে হচ্ছিল মোন্তাজের। অস্বীকার করতে পারে না, বউয়ের শরীর কাঁঠালের কোয়ার মতো। সাহেব আলি সময় সময় মোন্তাজের দরোজায় গিয়ে দাঁড়ায়। কাজ ? কিচ্ছু না। খোঁজখবর নেওয়া। বউটা একরাতে ঘুমোবার কালে কাঁদল।

কান্দস ক্যান ?

জবাব নেই। জিজ্ঞেস করে করে, শেষে রেগে উঠল সে। বউয়ের চুলে জোর টান দিয়ে বলল, ফ্যাকরা পছন্দ হয় না।

জ্বিনে পাওয়া মানুষের মতো শরীর ঝাঁকাচ্ছিল তার বউ।

দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। ফিরে যাবে নাকি বাড়িতে ? কিন্তু কিরমান পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে আছে।

মোন্তাজের শরীরময় অস্বস্তি বেড়াতে থাকল। নিজের রক্ত পানি হয়ে যাচ্ছে। সে ডাকল, কিরমান।

কি ?

বাতাস ঝড়ো গন্ধ বয়ে নিয়ে এল। বাঁশঝাড় কেঁপে উঠছে। নদীতে ঢেউ গর্জাচ্ছে।

সাহেব আলি শুয়ারের ছাও, সাহেব আলি কুত্তা, আমার বউডারে…।

অবশিষ্ট কথা যেন বাতাস লুফে নিয়ে পালিয়ে গেল।

কিরমানের চোখে আগুন ধরল একবারের জন্য। নদী তীরে খানিক জমি ছিল তার। আলু বুনত প্রত্যেক বছর। হঠাৎ টাকার দরকার হয়েছিল কিরমানের। সাহেব আলির কাছে চাইল।

টেকা নাই।

বড় ঠেকায় আছি।

সাহেব আলি সহজে নড়ে না। শেষে ঠেকের মাথায় জমিটা নিয়ে টাকাটা দিল। সেই টাকাটা আর জোগানো গেল না।

বউডা বছর বছর বিয়ায়। জেডে দশ মাস পড়ব। এফি আত এক্কেরে খালি−বলতে বলতে কিরমান উঠে দাঁড়ায়। পায়ের তলার মাটি যেন টাল খায় কোনও দিকে। বলে, মিয়ার গলা কাডবি ? অল্প বয়সের মানুষ, দুইন্নাইডারে দেখেও নাই চোখ ভইরা।

মোন্তাজেরও কি ওই কথা, নির্দোষ লোককে খুন করা কেন ? মিয়ার গলা কেটে সাহেব আলি কেন নদীতে ভাসাতে বলেছে ? সে বলল, মাইনষে মিয়ারে ভালা জানে, বিচারে-আচারে ডাকে।

কিরমান রামদা দিয়ে ঝোপঝাড়ের আগা কাটে। আকাশে খণ্ড-খণ্ড কালো মেঘ একত্রিত হচ্ছে। বৃষ্টি জোর নেমেছে।

লোকটাকে মারবে কেন ? কয়টা টাকার জন্য ? টাকার জন্যে অনেকদিন অনেক কাজই করতে হয়েছে।

এমন চেনা-জানা ভালো মানুষটাকে সরিয়ে দেবে ? সাহেব আলির ক’টা টাকার এমনই জোর ?

সাহেব আলি খিঞ্জির, মোনে আছে খাদেমের ছাড়ানডা যে লয় নাই ? বেও পড়লে দেখিস আমগোও ফাঁসাইয়া দিব।

বিদ্যুৎ চমক খেলে গেল কয়েকবার। তারা সেই আলোতে দেখল পরস্পরকে, ভিজে সারা। ঠাণ্ডা উঠছে শরীরের ভেতর।

মোন্তাজ বলল, মানুষডা না পোথে ভিজে! মেঘ-তুফানের ভিত্তে কী সাইকেল চালান যায়।

টাকার দরকার। বউয়ের মুখটাও মনে পড়ছিল তার। কিরমান জিজ্ঞেস করল, কী রে, ফিরা যামু নাকি ?

যাওনডাই ভালা।

সাহেব আলিরে একডা জোয়াব দেওন লাগব।

মোন্তাজ ঘ্যান ঘ্যান করে কি বলে। বিদ্যুৎ চমকের আলোয় কিরমান রামদা দেখে।

বৃষ্টি ধরে এসেছিল। জোর উঠছিল বাতাসের। নদীর গর্জন উঠে আসছিল দূরের দিকে।

বাঁশঝাড়ের নিচে অন্ধকারের ছাউনি। পথ পিছল। ধীরে পায়ে পিছল কাটছিল তারা।

পায়ে পায়ে সাহেব আলির বাড়িতে যখন পৌঁছল তারা, তখন বাতাস নিম্নমুখি, বৃষ্টি শুরু হলো বেগে।

কিরমান দরোজার শিকল নাড়ে। ঘরের ভেতর কাঁদে কে ? কোনও মেয়েমানুষের কণ্ঠ। ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে কান্না। কিন্তু কে ? ছোট গিন্নি ? কিন্তু সাহেব আলির বউয়ের তো কাঁদবার কথা নয়। সে জোরে জোরে দরোজার শিকল নাড়ে।

কেডা ?

আমি কিরমাইন্না।

দরোজা খুলে কম্পিত স্বরে সাহেব আলি বলল, কিরু ? খবর কি ? কাবাইরা দিছস তো বেডারে?

কান্দে কেডা ?

সাহেব আলি কিরমানের কাঁধে হাত রাখে। ডাকে, আয়, ভিত্তে আয়। ভিজ্জা আইছস।

মাথা উঁচু করে ভেতরে ঢুকল কিরমান। মেয়েটা ঘরের কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এ যে যতীনের বউ, যতীনের খোঁজখবর নাই দেড় বছর।

যতীনের না জমিন আছিল ?

বছর হোমান যায় না কিরমান, জমিনের ফসল মাইর যায়। হেইটেই অভাব।

যাউক গিয়া, মিয়ারে বাইন্দা থুইছি গাঙ্গ পাড়ের একটা গাছের লগে।

সাহেব আলি গর্জে ওঠে, কি কইলি ?

কি জানি কইতে চায়, কামের কথা।

সাহেব আলি কথাহীন, স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যায়, রাগটা ফেটে পড়বার সময় এখন। মোন্তাজ রামদা হাতে এগিয়ে আসে। নিচু মাথায় বলে, শুইনা আসেন একবার। কি জানি কইবো−।

লোকটা কি সন্দেহ করছে ? কিরমান আরও সাবধান হয়ে কণ্ঠ পাল্টায়, ঘরডাত্ তালা দিয়া, ছাতিডা মাথায় দিয়া লন। আবার কামের কথাও হইতে পারে।

তখন লোকটা যেন একটু সহজ হয়। ছাতা বের করে নিয়ে শিকল তুলে দরোজায় তালা লাগায়। নদী খুব দূরে নয়। তারা চলছিল নিঃশব্দে। তবে পিছল পথে এগুতে দেরি হচ্ছিল। নদীর কাছাকাছি হতে বোঝা গেল পানিতে খুব বড় একটা তোলপাড় চলছে। সাহেব আলি টর্চ ফেলে খুঁজল গাছের সঙ্গে বাঁধা মানুষটাকে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। সঙ্গে সঙ্গে সাহেব আলি কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল, কির-মা-ইন্না-রে−।

কিরমান চট করে ধরে ফেলল সাহেব আলিকে। তার হাতটা আজ সন্ধ্যা থেকেই বড় অস্থির। রক্ত না দেখলে ঘুম আসবে না কিছুতেই।

তখন হঠাৎ করে ঝড় বেড়ে উঠল। আকাশ এক একবার ডেকে ডেকে ভেঙে পড়তে চাইছে। এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল নদী।

নদীকে আর চেনা যাচ্ছে না।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares