গল্প : গল্পচতুষ্টয় : মাহবুবা হোসেইন

হাসি

একদঙ্গল হাস পালে বলে সবাই তাকে ব্যঙ্গ করে ডাকে ‘হাসি’―নামটা তার সঙ্গে যায় না, সে একদম হাসিখুশি না―কালোকুলো গম্ভীর, যা হাসে তা তার দাঁত আর নাকছাবিটা, বিধবা তবু সে সেটা সরায়নি, ঝুট পাথরের নাকছাবিটা স্বামীর রেখে যাওয়া একমাত্র সম্বল, তাই না বললে কেউ জানতে পারবে না তার বৈবাহিক অবস্থা। অবশ্যি প্রথম দেখাতেই সে বলে দেয়, ‘মাগো আমি রাঢ়ী―এই জগৎ সংসারে আমার কেউ নেই’―তার মুখটা হয়ে উঠে মায়াবি, চোখ দুটো করুণ। পরিচিত হবার কায়দাটাও তার দারুণ।

ঝুমুর আর তার বান্ধবীরা যখন আশ্রমে ঢোকে তখনও খেয়াল করেনি তাকে, ঘুরে ঘুরে শান্ত-সুশৃঙ্খল রীতি-পদ্ধতি দেখতে আচ্ছন্ন ছিল ওরা।

হাসি বলল―‘হ্যাঁ এখানেই মোম লাগাতি হয়।’

অগুন্তি মোমবাতির স্ট্যান্ডটা দেখিয়ে দিয়ে হাসল হাসি। দাঁতগুলো ঝকঝকে, কালো মুখে বিদ্যুৎ চমকের মতো।

প্রতিউত্তরে ঝুমুরও হাসল, বলল, ‘ও’।

হাসি তাদের ছেড়ে গেল না, পিছেপিছে হাঁটতে লাগল, বলতে ভুলল না সে রাঢ়ী―স্বামী নেই, এক ছেলে দুই মেয়ে, সে মোসলমান।

এক সময় সরে এসে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল, ‘আপনারা প্রসাদ নিবেন না’ ?

ঝুমুর দ্বিধান্বিত, তারপরও তাকে খুশি করতে মাথা ঝাঁকাল। হাসি দশ মিনিটে চালিয়ে নিয়ে গেল―কোথায় টিকিট কাটতে হবে, কোথা থেকে নিতে হবে প্রসাদ, সিকিউরিটির বিনিময়ে কোথায় পাওয়া যায় হাতা বালতি বাসন আর গ্লাস।

ঝুমুর তো অবাক মাত্র দু’শ টাকায় দশ জনের খাবার ? মাথাপিছু দশ টাকা মাত্র!!! আমেরিকায় কি ভাবা যায় এটা ?

হাসি তাদের জন্য নাটমন্দিরে মাদুর পেতে দিল। বলে গেল ‘আপনারা খান আমি ঘুরে আসি।’ পাঁচ বান্ধবীসহ ঝুমুর পেটপুরে খেয়ে উঠল তারপরও বেঁচে গেল অনেক। হাসি ফিরে এসে বলল, ‘উঠুন আমি ধুয়ে দিচ্ছি’।

‘বাকিটুকু তুমি খেয়ে নাও’।

হাসিমুখে বসে গেল হাসি। কোথা থেকে আরও দু-তিনজন এসে ভাত চাইল। কায়দা করে হাসি ভাতে হাত ডুবিয়ে দিল। শুরু হয়ে গেল চিল চিৎকার। রণরঙ্গিনী হয়ে মাসি বলল ‘তুই ভাতে হাত ঢুকালি ক্যান ? এই ভাত কি তোর’ ?

হাত না ঢুকালে ভাত নিব ক্যামনে ?

আয় দেখাই ভাত নিবি ক্যামনে।

দশ টাকার ভাত নিয়ে হাসিতে আর মাসিতে শুরু হয়ে গেল চুলোচুলি।

আমেরিকা প্রবাসী ঝুমুর তো অবাক―মাত্র দশ টাকার ভাতের জন্য এখনও কোনও দেশে মারামারি হয় ? হতে পারে ?

হাসি আর মাসির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই―দশ টাকার ভাত নিয়ে তখনও তারা চুলোচুলি করে মরে―উত্তর দিবার তাদের সময় কোথায় ? দায়ই বা কি ?

টেনিস বল

কয়েকদিন থেকেই করুণার শুকনা কাশি, গায়ে গায়ে জ্বর, হালকা মাথাব্যথা। খুব একটা পাত্তা দেয়নি। এই নিয়েই সারাদিন কাজ করেছে, পানি নড়াচাড়া করেছে, এক পর্যায়ে ঘরও মুছেছে, বিকালের দিকে জ্বরটা চাড়া দিয়ে উঠল। একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিয়ে করুণা ভাবল সেরে যাবে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে বাইরের ছোট্ট উঠানটায় বাচ্চারা খেলছে।

মনটা তার একদম ভালো নেই। চারদিকে যা ঘটছে, করোনাভাইরাস নাকি একটা এসেছে, মুরগির মতো মরছে মানুষ, উন্নত দেশের তাগড়াতাগড়া মানুষগুলোও মুড়িমুড়কির মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলোর নিশ্চিন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে করুণার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। বাচ্চাদের কাছে দুশ্চিন্তা-অনিশ্চয়তা কত দেরিতেই না পৌঁছোয়, ওরাই ভালো আছে, আহা সে যদি বাচ্চা হতো। জানালা থেকে সরে আসতে যাবে হঠাৎ দেখে ছোট্ট পিকলি মাঠ থেকে দৌড়ে আসছে। সাদা ফ্রক আর লাল বেন্ডে কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। খেলতে খেলতে ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। গালের দু’পাশ দিয়ে ঘাম ঝরছে তাতে কয়েকটা কোঁকড়া চুল লেপ্টে গেছে। গাল্লুগুল্লু মেয়েটাকে দেখলেই করুণার মেডোনার কথা মনে পড়ে।

দরজাটা খোলা ছিল। দৌড়ে এসে না থেমে একটা টেনিস বল তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘চাচি বলটা রাখ। আমি হিসু করে আসি।’ যেমনে এসে ছিল তেমনি দৌড়ে হিসু করতে বেরিয়ে গেল নিজেদের বাসার দিকে। বাচ্চাদের কাণ্ডকারখানাই আলাদা, ‘হিসু করতে যদি নিজের বাসায়ই যাবি, তবে বলটা আমার কাছে রেখে যাবার কি দরকার ?’ মর্জি। করুণা হাসে।

দুপুরে একটু শুয়েছিল করুণা। বিকালের দিকে আর মাথা তুলতে পারল না। মাগো কি মাথাব্যথা সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট। ঘুম ভাঙতেই দম নেওয়ার জন্য আকুপাকু করতে থাকে করুণা। ড্রয়িংরুমে শাকুর টিভি দেখছে, উঠে তাকে ডাকারও এনার্জি নেই। তারপরও উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল করুণা। কিছুদূর এসে অন্ধকার হয়ে গেল চোখ। দেখল শুধু একটা ড্রইংরুম, শাকুরের লুঙ্গিপড়া দুটো পা, আর কাটা গাছের মতো তার পড়ে যাওয়া। তারপর আধোঘুম আধোজাগরণ, শ্বাসকষ্ট অশ্বস্তি ডাক্তার নার্স সেলাইন ঔষধের গন্ধ জড়িয়ে মড়িয়ে দেখল মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কিম্ভুত কিমাকার এক মানুষ। করুণা ভয় পেয়ে গেল, তবুও সাহস করে জিজ্ঞেস করল ‘কে আপনি ?’

 কিম্ভুত মানুষটা গমগমে গলায় উত্তর দিল ‘আমি আজরাইল।’

এখানে কেন ? কি চান ?

আমি তোর জান কবজ করতে এসেছি।

করুণা ভীষণ ভয় পেল। অনুনয় করে বলল, ‘না না, আমাকে নিবেন না। পৃথিবীতে এখনও আমার অনেক কাজ বাকি। দুটো মেয়ে বড় হচ্ছে তাদের বিয়ে দিতে হবে, আমার ছেলেটি ইউনিভার্সিটি পড়ে এখনও তাকে খাইয়ে দিতে হয়, বোনটা আমার ইউকেতে থাকে, ভিসা লাগিয়েছি, ওর কাছে ক’দিন থেকে আসব বলে, আমার হজ করা হয়নি এখনও।’

আজরাইল মাথা নাড়ল, ‘না না, ওসব ওজর আপত্তি চলবে না। আজ পর্যন্ত, এমন কোনও মানুষের জান কবজ করতে পারিনি যার কিছু না কিছু কাজ পৃথিবীতে না থাকে। না, কোনও কথা শোনা হবে না। হুকুম ইজ হুকুম।’ হঠাৎ করুণার কি যেন মনে পড়ল, সে বলে উঠল, ‘ওওও, আমার কাছে একজনের একটা আমানত আছে।’ পিকলির দৌড়ে আসার দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠল। মেয়েটা ভুলে বলটা নেয়নি। ‘আমার আলমারির ড্রয়ারে রেখেছি ওটা, কেউ খুঁজে পাবে না আমি ছাড়া। বাচ্চা মেয়েটা খুঁজতে এসে কাঁদবে।’

এই কথায় আজরাইলের কেমন একটু ভাবান্তর হল। বিড়বিড় করল ‘বাচ্চা, বাচ্চা’ তারপর করুণার দিকে করুণ চোখে চেয়ে বলল, ‘বাচ্চা মেয়ে, না ? আহারে একটু আগেই একটা বাচ্চা মেয়ের জান কবজ করে রেখে এলাম, এই কাজটা আমার সব চেয়ে অপছন্দের, এখন আর কোন বাচ্চাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে না। আচ্ছা যা তোকে ছেড়ে দিলাম। তুই ফিরেই যা। তোর মনোবাসনাই পূরণ হোক।’ বলেই পিছন ফিরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আজরাইল।

করুণা ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখে তার কষ্টটা যেন আর আগের মতো নেই।

পেশার ঈর্ষা

পিচ্চিটাকে দেখলেই রাগে বিসমিল্লাহ খাঁর গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, দাঁত কিরমির করে, মনে মনে গালি পাড়ে, ‘শালা বাইনচ্যুৎ, উঁউঁউঁ, পুরান পাগলে ভাত পায় না, নুতন পাগলে ধরে বায়না, শালার শালা’, তারপর সমস্ত রাগ মতির বদলে গিয়ে পরে মোতাল্লেবের ওপর, ‘তুই হালায় গোয়াইনের মটরঘাট থন রাতারবন তক টলারে লোক পারাপার করস-কর-এই ফেওটারে আবার লগে লইছস কেরে ?’

আজও একদল ভ্রমণকারীর সঙ্গে মতিকে নিয়ে মোতালেবকে আসতে দেখে তার গা রিরি করে উঠল, মনে মনে সে খিস্তি শুরু করে, ‘দেখসৎনি কত্ত বড় সাহস, আজগাও আবার ঐটারে আনছে।’

পেশার খাতিরে বিসমিল্লাহ রাগটাকে ভিতরে ঠেলে দিয়ে দলটাকে ক্যাপচার করতে ব্যস্ত হয়ে পরে, তাদের একে একে নৌকায় তুলতে থাকে।

 সেই সুযোগে মোতালেব মতিকে কোসা নৌকায় তুলে দিতে গেলে সে রাগ আর পুষে রাখতে পারে না, খেক করে খেকিয়ে উঠে, ‘এই এই এইটারে তুলস কে’, আমার নৌকায় জাগা হইত না।’

মোতালেবের হাসি পায়, ঐটুক মানুষের আর কতটুকু জায়গা লাগে, এত বড় নৌকায় হের জায়গা হইত না ? বিসমিল্লার অন্তরের জ্বলুনিটা জানে বলে তার আরও মজা লাগে, শিশু গলায় গান গেয়ে মতি যত পর্যটকদের মাতিয়ে তোলে, বিসমিল্লাহ খাঁর জ্বলুনিটা মোতালেব ততই তাড়িয়ে উপভোগ করে।

সে হাসতে হাসতে বলে, চাচা এমন কর কে’, যাক না সাবগ লগে ছোট মানুষ।

বিসমিল্লাহ মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘হ ছোট মানুষ’―জ্বলুনির তুলনায় কথাটা ওজনদার না হওয়ায় রাগটা তার পড়ে না, তাই কিছুদূর ফিরে গিয়ে আবার এগিয়ে এসে মুখ ঝামটা দিয়ে হাত নেড়ে বলে, ‘না না জায়গা হইত না, তুই জানস না নৌকায় আটজনের বেশি নেওয়ার নিয়ম নাই, ওরে লইয়া আমি জরিমানা খাই আরকি।’

মোতালেব মনে মনে হাসে, কিছুক্ষণ আগেই তো দশজনের একটা ট্রিপ নিয়া ঘুরে আসলা, আমি দেখি নাই না ? কিন্তু মুখে কিছু বলে না বরং নরম হয়ে অনুরোধ করে, ‘লওনা চাচা কিছু হইত না’।

না কিছু হইত না ?

বিসমিল্লাহ রাগে কটমটিয়ে মুতালেবের দিকে তাকিয়ে থাকে, পর্যটকদের সামনে সৌজন্য বজায় রাখতে হয় নইলে কখন সে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, নিরুপায় শুধু মনে মনে গজরায় ‘এখানে তোর স্বার্থটা কি আমি বুঝি না ? আমার নাক দিয়া সিনকি পরে আরি―ভাবস কি তুই।’

পর্যটকদের একজন এগিয়ে এসে বিসমিল্লাহকে অনুরোধ করে, ‘ছেলেটাকে তুলে নিন না ওর গানের গলা এত সুন্দর, ট্রলারের শব্দে গানের বারটা বেজে গেছে, শুনতে পারিনি, এই শান্ত পরিবেশে ওর গান শুনতে শুনতে যাব খুব ভালো লাগবে।’

বিসমিল্লাহ রাগের খোলস থেকে জোর করে বেরিয়ে এসে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘না স্যার এই শান্ত পরিবেশের শান্তিটাই আসল। আপনি নিঝ্ঝুম বসে থাকবেন, সমস্ত অন্তর দিয়া নিস্তব্ধতাকে উপলব্ধি করবেন, গান শুনবেন পাতার মরমরের, নৌকা আর বৈঠার কিচির কিচির কিইইইর, দূরের পাখির কুটুস কুটু কুউউউউর, মানুষের গান এখানে কি শুনবেন ? শান্তি নষ্ট খালি।’

রাতারগুলের ভিতরে ট্রলার নিষেধ থাকায় কোসা নৌকায় পর্যটকদের ঘুরিয়ে এনে বিসমিল্লাহ ভাড়াসহ যে টিপস পেত মোতালেব ট্রলার চালিয়ে তার অর্ধেকও পেত না। ট্রলারের ভাড়া সরকার নির্দিষ্ট কিন্তু টিপসের তো কোনও সীমা নির্দিষ্ট নাই―খুশি হয়ে যে যা দেয়। মোতালেবের কাজে কোনও টিপস নাই, টিপসের সম্পর্ক তো বিনোদনের সঙ্গে, সে শুধু খেয়া পারাপার করে, সেই কাজে আর বিনোদন কি ? বিসমিল্লার আয়-ইনকাম তার চেয়ে ভালো কিন্তু তাতে তার কোনও ভাগ নাই―এই কারণে আগে মোতালেবের সূক্ষ্ম একটা জ্বলুনি ছিল, কিন্তু দাবার ঘুটি ইদানীং পাল্টে গেছে, এখন বরং বিসমিল্লাহই সেই জ্বালায় জ্বলে। বিসমিল্লাহর এখন নিজের হাত নিজেরই কামড়াতে ইচ্ছা করে, মানুষ  নিজের পায়ে এমন করেই নিজে কুড়াল মারে ?

রাতার পাড়ায় বিসমিল্লাহ আর মতিদের পাশাপাশি ঘর। মতির বিধবা মা হাসি বিসমিল্লাহকে বড় ভাইয়ের মতো মানে, তাদের সংসারে খেটেখুটে দেয়। বিসমিল্লাহ এবং তার বউ ফেলানিও তার প্রতিদান দিতে ভোলে না, মতিদের সুখ সুবিধায় দেখে-শুনে রাখে। মতির বয়স দশ হলেও তার গানের গলা খুব ভালো।

বিসমিল্লাহ এতদিন বনের ভিতরে হিজল আর কিরিচ গাছের সন্নিবিষ্ট ছায়ায় শান্ত নিঝ্ঝুম পানিতে নৌকা চালাতে চালাতে নৌকা আর বৈঠার কিরিচ কিরিচ শব্দের সঙ্গে ভ্রমণপিপাসুদের বাড়তি বিনোদন দিতে কিছু একটার খুব অভাব বোধ করছিল, মতির মিষ্টি গলা তার সেই অভাব দূর হয়ে গেল, সে মতিকে নৌকায় তুলে নিল।

কিছুদূর গিয়ে সে মতিকে বলত―ধর রে মতি একটা গান ধর, আর সাহেবদের বলত―স্যার এই নিঝ্ঝুম শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশে গান শুননের মত আনন্দ আর নেই।

মতি তখন গান ধরে দিয়েছে, ‘মাধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা … কোনও হারণে বালবাসায় দাম ন দিলা

তারপর, পুরোনো স্মৃতিগুলা, পুরোনো স্মৃতিগুলা, অতীতের কথাগুলা মনে মনে রাইখ … আমি তো বালা না বালা লইয়া থাইকো, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা, ভ্রমণকারীরা সত্যি খুশি হয়ে উঠত, নেমে যাবার আগে এক মুঠি টাকা মতির ছোট হাতে গুঁজে দিত, তার কতটুকু মতির মা পেত আর কতটুকু যেত বিসমিল্লাহর পকেটে তার হিসাব কি আর মতি রাখতে পারে ?

একদিন বিসমিল্লাহ অবাক হয়ে দেখে সেই হিসাব রাখতে শুরু করেছে গোয়ানের ট্রলার মাস্টার মোতালেব, ইদানীং সে মটর ঘাট থেকেই মতির কাস্টমার জোগাড় করে দেয়, সঙ্গে মতির আয় ইনকামের হিসাবও রাখে। আজও একটা দল পাকড়াও করে পিচ্চিটাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে,

কেমন রাগ লাগে ?

মতি এখনও ছোট তার টিপসের আধিকাংশ বখরা অনায়াসে মোতালেব হাতিয়ে নিতে পারে, বিসমিল্লাহ খাঁর পরাজয়টা শুধু এখানেই নয়, মতিকে নৌকায় নিলে তার আয় কমে যায়, মতির মিষ্টি গানের গলায় অভিভূত হয়ে নামবার সময় ভ্রমণকারীরা সব বকসিস তার হাতেই গুঁজে দিয়ে যায়, বিসমিল্লার হাতে পড়ে শূন্য। আজ সে অনড়, কিছুতেই মতিকে সেই সুযোগ দিবে না।

মোতালেবও দেখল এখানে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, সুবিধা হবে না। আরেকটা দলকে একটু দূরেই নৌকা ঠিক করতে দেখে সে সেদিকে দৌড়াল, এখনও দলটায় গানের ফেউ লাগেনি, মতিকে যদি সেই দলে ভিড়িয়ে দেওয়া যায়, অন্যরা কায়দা করার আগেই দলটাকে বাগিয়ে নিতে হবে। স্বার্থের দৌড় এমনি, কেউ বাগাবার আগেই কায়দা করে বাগিয়ে নিতে হয়। কায়দা কানুনের ঘোর-প্যাঁচ কিছু না বুঝেই মোতালেবের সঙ্গে মতিও দৌড় লাগাল। সে ছোট মানুষ কি করে বুঝবে যাহা বাহাত্তর আসলে তাহাই তিয়াত্তর ?

একদিন হয়তো তাও সে বুঝে যাবে তখন হিসাবের সমীকরণটা কি হবে কে জানে।

প্রায়শ্চিত্ত

বাইরে ঝাঁঝাঁ রোদ, ডাইনিংয়ে খেয়ে এসে রূপা ভাবল একটু গড়িয়ে নিবে, বিকেলে ডিসেক্শন ক্লাস, সেকেন্ড প্রুফ পরীক্ষা সামনে, সকালে গোসল সেরে গেছে, এখন আর ঐ ঝামেলা নেই। গাইনি বইটা নিয়ে বিছানায় শুয়েছে মাত্র, দারোয়ান এসে খবর দিল ‘আফা আপনের ভিজিটর’

অবাক হলো রূপা। এই সময় আবার কে ? এই দুপুরে ? আশ্চর্য তো ?

তাড়াতাড়ি আয়নায় মাথাটা আঁচড়ে নিয়ে শাড়িটার দিকে তাকাল, একবার ভাবল পাল্টে নিবে, তারপর ভাবল থাক্, ওটাকেই একটু গুছিয়ে নিয়ে সেন্ডেল পায়ে বেরিয়ে গেল।

গেটের কাছে ভিজিটর রুম, সেখানে কেউ নেই, গেটের বাইরে ডানে বামে তাকিয়েও কাউকে দেখা গেল না। বাইরে এত রোদ চোখে তাকানো যায় না, ঝাঁঝাঁ করে। দারোয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সামনের রাস্তার শেষ মাথায় কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে দেখিয়ে দিল। রূপা দেখল গাছটার নিচে আর্মির একটা জিপ, গাড়িতে হেলান দেওয়া একটা লোক। দূর থেকে তীক্ষè ফর্সা মুখের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না কে। চিনতে চেষ্টা করল রূপা, কিন্তু চিনতে পারল না।

কাছে গিয়ে চমকে উঠল রূপা, বিস্ময়ে মুখ দিয়ে চাপা একটা আওয়াজ বেরিয়ে গেল,

হারুন তুমি ?

সেই সঙ্গে ঘৃণা আর তীব্র অভিমানে কণ্ঠ রোধ হয়ে এল রূপার, সে আর কোনও কথা বলতে পারল না।

লোকটা কয়েক পা এগিয়ে এল, হ্যাঁ রূপা আমি। বিড়ম্বিত ভাগ্য আমাকে তোমার কাছে টেনে এনেছে।

মনে মনে হাসল রূপা, বিদ্রুপের হাসি। বহু বিড়ম্বিতই বটে, ‘মনে মনে বলল’ একটুও তো বদলাওনি, সামান্য মোটা হয়েছ এই যা। সেই চোখ, সেই চৌম্বক ব্যক্তিত্ব, যার আকর্ষণে মেয়েরা মুহূর্তে প্রেমে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর পুড়ে যেতেও সময় লাগে না।

কিন্তু এই মুহূর্তে হারুনের মুখে গভীর একটা বেদনার ছাপ, যেন নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত একজন মানুষ, যা ঘৃণার আগুনে অন্ধ রূপার চোখও এড়াল না।

এত দিনের তীব্র কষ্ট ও অপমানের কথা মুহূর্তে ভুলে গেল রূপা। সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, কি হয়েছে তোমার ? এমন দেখাচ্ছে কেন ?

বলব, তোমাকে সব বলব, তাই তো এত দূরে ছুটে এসেছি।

পারিপার্শ্বিকতা ভুলে এগিয়ে এসে রূপার হাত ধরল হারুন।

মেয়েটা ছোটখাটো হাসিখুশি, চোখ হাসছে সব সময়, নাম রূপা, এইচএসসি সেকেন্ড ইয়ারে পরে, ক্লাসটাকে মাতিয়ে রাখে একেবারে, যেখানেই সে সেখানেই হাহাহিহি। নাটক কবিতা খেলাধুলা সবই তার দখলে, পড়াশোনা তো আছেই আড্ডা থেকে কলেজ সংসদ কোনওটাই তাকে ছাড়া চলে না। ক্লাসের সব তার বন্ধু, ছেলে মেয়ে সব। মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে ঈর্ষা করে কিন্তু সমীহ না করেও পারে না, চেষ্টা করে যে রূপা হওয়া যায় না তা ওরা জানে, ওর গুণগুলো ঈশ্বর প্রদত্ত। ছেলেদের মধ্যে অনেকেই গভীরভাবে ভালোবাসে কিন্তু রূপা এত সহজে মিশে যে প্রেম নিবেদন করা কঠিন, অগত্যা কেউ কেউ ইদানীং কবিতা লিখতে শুরু করেছে।

শুধু বন্ধুরা নয়, বাইরের মানুষও মেয়েটার আকর্ষণ এড়াতে পারে না। হরগঙ্গা কলেজে একবার কবি সম্মেলন হলো, ঢাকার প্রথিতযশা চল্লিশ জন কবিকে নিমন্ত্রণ করল কলেজ সংসদ, রূপার বন্ধুরা মিলে আয়োজনটা করেছিল। মুন্সীগঞ্জ শহরে এত সুন্দর কবি সম্মেলন আগে কখনও হয়নি। রূপার উপস্থিতি, সঞ্চালনা, পরিশীলিত চাঞ্চল্য মুগ্ধ করল অতিথিদের। কবি আবুল হেসেন আকর্ষণীয় এই মেয়েটিকে দেখে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে বিদায়কালে ‘শুধু তোমাকেই রূপা’ কবিতাটি উপহার দিয়ে গেলেন। কিছুদিন পর কবির মৃত্যু হয়, হয়তো এটিই কবির অগ্রন্থিত শেষ কবিতা। রূপার কাছে কি আছে কবিতাটি এখনও ?

শুধু বাইরে নয় ঘরেও রূপা একই রকম জনপ্রিয়। বাবা মা তো আছেই, দশ ভাইবোন সবাই তার বন্ধু। বড়রা স্নেহ করে, ছোটরা করে অনুকরণ। ছোট মফস্সল শহরে তাকে সবাই চেনে, প্রতিবেশীরা সস্নেহে ডাকে ‘পাগলি’।

রূপার বাবা থানার সার্কেল অফিসার।

সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।

তত্ত্বাবধানকারী আর্মিদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সার্কেল অফিসার সাহেব তাদের থাকা খাওয়া, পানি-ল্যাট্রিন নিয়ে ছোটাছুটি করে অস্থির, নিজে তো অস্থিরই, অন্যদেরও অস্থির করে তুলছেন।

ন’টা-সাড়ে ন’টা নাগাদ এক বহর আর্মির গাড়ি এসে উপস্থিত। সামনের গাড়ি থেকে স্বভাব সুলভ ক্ষীপ্রতায় লাফ দিয়ে নামল চব্বিশ-পঁচিশ বৎসরের এক সুদর্শন যুবক। নামবার এবং অধঃস্তনদের নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গি থেকে বুঝা যায় সে-ই দলনেতা এবং সম্ভবত এবারই প্রথম গুরু দায়িত্বপ্রাপ্ত।

নেমেই শুরু পায়ে অফিটি ঘুরেঘুরে দেখতে লাগল, ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততায় ব্ধ হয়ে সার্কেল অফিসারকে লাগাল এক ধমক, সে অবশ্য তখনও জানত না তার জন্য পরে তাকে কতখানি অনুশোচনা পোহাতে হবে।

নিজের লোকদের মুটামুটি ভদ্রস্থ একটা ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়ে সে ঘুরে দোতলার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বারান্দার নিচেই চোখে পড়ল বৌছি খেলতে থাকা দুইবেণী করা একটি আঠারো-ঊনিশ বৎসরের  উজ্জ্বল মেয়েকে। মেয়েটি অনবরত ‘চি’ উচ্চারণ করতে করতে ছুটে গিয়ে নয়-দশ বৎসরের একটি মেয়ের বেণী টেনে দিয়ে খেলা ভঙ্গ করে পুকুরপাড়ে শামুক কুড়োতে থাকা মেয়েদেরকে শামুক কুড়িয়ে দিতে লাগল। মেয়েটির স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত চঞ্চলতার লাবণ্যে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। অফিসের পিয়নটিকে ডেকে তখনই জানতে পারল একটু আগে যে বুড়ো সার্কেল অফিসারকে ধমক দিয়েছে সে তারই মেয়ে, নাম রূপা, ঐ সামনের বাসায়ই থাকে। ধমক দেওয়ায় জন্য এখন তার খুব অনুশোচনা হতে লাগল। কেন যে ধমক দিতে গেল ? ভাবল ভদ্রলোকের কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে।

সেদিন, তারপর দিন, তারপর দিন এখানে সেখানে প্রায় সর্বত্র মেয়েটির চকিত উপস্থিতি ছেলেটির মুগ্ধতা বাড়িয়ে দিল, তার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য অস্থির হয়ে উঠল সে। সুযোগ খুঁজতে লাগল। কেমন করে মিলেও গেল হঠাৎ, অফিসের ফোনটা নষ্ট হয়ে গেল। আর্মি হেডকোয়ার্টারে জরুরি মেসেজ পাঠাতে হবে, অগত্যা অথবা ইচ্ছে করেই সিদ্ধান্ত নিল সার্কেল অফিসারের বাসায় গিয়ে ফোন করবে।

মধ্য দুপুর। গ্রীষ্মকাল। বাইরে ঝাঁঝাঁ রোদ। বাসার সবাই দিবানিদ্রায় আচ্ছন্ন, ঘুম নেই শুধু বাসার চঞ্চল মেয়েটির চোখে, বারান্দার চেয়ারে বসে কবিতার একটা বই হাতে মৃদুমৃদু পা দোলাচ্ছে, বইটা সে পড়তে চেষ্টা করছে কিন্তু মনোযোগ দিতে পরছে না, কি একটা অনুপস্থিতির শূন্যতা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, অনাস্বাদিত এই বোধটার অর্থ ধরতে পারছে না বলে তার অস্বস্তি হচ্ছে। অনুভূতিটা তার স্বভাব বিরুদ্ধ, এমন তো কখনও হয় না। এই সময় ‘টুকটুকটুক’ নিচের দরজায় তিনটি শব্দ। কানখাড়া করল রূপা ‘টুক’ একটা মাত্র শব্দ, দৌড়ে নিচে গিয়ে দরজা খুলতেই হঠাৎ থমকে গেল রূপা, সামনে অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক। লম্বা, সুঠাম স্বাস্থ্য, ঝকঝকে ফর্সা মুখ, ধূসর নীল চোখ, পিছনে ছোট করে ছাটা চুল, সামনের সামান্য বড় চুল কপালের মাঝ বরাবর পাঁক খেয়ে ওপরে উঠে গেছে। ক্ষণকাল মাত্র। তারপর একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিক হাসি ছড়িয়ে গেল রূপার মুখে যেন বলতে চাইল, ‘ও আপনি!’ দূর থেকে তাকে আগেও দেখেছে, আর্মির ইউনিফর্ম পরা, সাধারণ ড্রেসে তাকে এখন অন্য রকম লাগছে, আরও সুন্দর।

ছেলেটি ভরাট ভদ্র গলায় বলল, ‘আমি হারুন, আর্মির সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। আমি কি একটা ফোন করতে পারি ?’

‘অবশ্যই’―চটপট উত্তর দিল রূপা। ঘুরে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এল। হারুন পিছু পিছু দোতলায় এলে। ফোনটা দেখিয়ে দিল রূপা। অপরিচিত কণ্ঠ শুলে সিও সাহেব ঘুম থেকে উঠে এলেন, হারুনকে দেখে সন্ত্রস্ত হলেন একটু, রূপাকে বললেন, ‘একটা চেয়ার এনে দে মা।’ রূপা চেয়ার নিয়ে এলে হারুনকে ইশারায় বললেন, ‘বসে কথা বল বাবা।’

তারপর কয়েকদিনের মধ্যে হারুন রূপাদের পরিবারেই যেন একজন হয়ে গেল। যদিও রূপাদের মফস্সলের মধ্যবিত্ত আটপৌরে পরিবারে হারুন সত্যি অপ্রত্যাশিত, তার বাবা ঢাকার নবাব পরিবারের ছেলে, বর্তমানে হাইকোর্টের জাজ, একমাত্র ছেলেকে করাচির ক্যাডেট কলেজে রেখে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। সে অত্যন্ত মেধাবী, মিলিটারি একাডেমির ‘সোর্ড অব অনার’ পাওয়া, সম্ভ্রান্ত ঝকঝকে তকতকে। ভালো আবৃতি করে, গান গায়, ছবি আঁকে, যদিও চিত্তাকর্ষক তবুও চোখ ধাঁধানো, বিচ্ছুরিত, দুরতিক্রম্য, এক কথায় এলিগেন্ট। তবে তার মিশবার ক্ষমতা অসীম, ছোট বড় সবার সঙ্গে সুন্দর গল্প করতে পারে, স্মার্ট বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তরিক ব্যবহার। কিছুদিনের মধ্যেই তার উপস্থিতি রূপাদের পরিবারের ছোট বড় সবার কাছে আনন্দের কেন্দ্রে পরিণত হলো, তার সান্নিধ্য সবার কাম্য। রূপা, রূপার বড় ভাই আরিফ, ছোট ভাই কাজল, মামাত ভাই বাবু, চাচাত ভাই মঞ্জু ও হারুন মিলে ছোটখাটো একটা টিম হয়ে গেল। কাজের অবসরে ওরা ঘুরে বেড়ায়, ছাদে বসে আড্ডা দেয়, তাশ পিটায়, একে অপরের পিছু লাগে। বন্ধুত্ব হয় না শুধু রূপার চাচাত ভাই ফিরোজের সঙ্গে―সে রূপাকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়। রূপাও সেটা জানে।

হারুন রূপার কাছে এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’, বিপন্নই বটে―কি এক দুর্নিবার আকর্ষণ রূপাকে নিয়ে যাচ্ছে হারুনের দিকে, সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে বাঁচাতে কিন্তু পারছে না। হৃদয়ে শুধুই রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সে জানে না এর শেষ কোথায়, তবে তার মন বলছে-এ শুভ নয়, কিছুতেই শুভ নয়।

সোনা মাখা বিকেল, হারুনরা তাস নিয়ে বসেছে ছাদে। রূপা খেয়াল করল হারুন ভুল পাস দিতে যাচ্ছে, সে ঈশারা করতেই পারস্পরিক দৃষ্টি মুগ্ধতার লাবণ্যে ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে রইল, মুহূর্ত  মাত্র, তারপর চোখ সরিয়ে নিল দুজনেই কিন্তু দুজনেই জেনে গেল যা জানার, যা কথার অতীত, কোনও কথাই যাকে ধারণ করতে শেখেনি।

নির্বাচনের রাত, বারটা বেজে গেছে, এখনও হারুনরা ফেরেনি। দুটি চোখে ঘুম নেই, রূপা আর তার বাবার। কি এক কারণে ভদ্রলোক ছেলেটার প্রতি অপত্য স্নেহ বোধ করেন। কর্তব্যবোধ তো আছেই, তাদের কিছু হলে তাকেই তো জবাবদিহি করতে হবে তারপরও কি যেন একটা আছে।

রূপার হৃদয়ে একান্ত আপনজন হারানের বেদনা। গভীর রাতে তাদের ফিরবার আওয়াজেই কেবল দুটি হৃদয় স্বস্তি ফিরে পেল।

হারুনরা একদিন ফিরে গেল, রূপা হাফ ছেড়ে বাঁচল, যা হারাবার তাকে পাবার আশার কষ্টের তুলনা কি ? তারপরও তীব্র বেদনার সূক্ষ্ম একটা কাঁটা বিঁধে রইল রূপার মনে।

হারুন একদিন নিজ হাতে খরগোশ, কচি ঘাস, আর নীল আকাশ আঁকা প্যাডে চিঠি লিখল। দুই ছত্র মাত্র,

রূপা তোমার বিচ্ছেদ দুঃসহ। আবার দেখতে চাই। ভালোবাসার দাবিতেই―হারুন।

এই আহ্বান দুর্নিবার। এইচএসসি পরীক্ষার পর রূপা অস্থির হয়ে উঠল, ‘যেতে হবে, তাকে যেতেই হবে ঢাকায়, যে করেই হোক।’

ঢাকায় বড় বোন বোনের বাসা থেকে একদিন ফোন করল রূপা ‘কেমন আছ হারুন ?’

‘ওয়াও, তুমি ? ঠিকানা দাও।’

তারপর হারুন হুন্ডার পিছনে রূপাকে নিয়ে সাঁইসাঁই করে ঘুরে বেড়ালো কয়েকটা দিন। রমনা পার্ক, অফিসার্স মেস, এমন কি নিজেদের বাসা পর্যন্ত। দিনগুলো যেন উড়েই গেল। ফিরে যাবার দিন রূপার গভীর চোখে চুমু খেয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে চাই, শুধু তোমাকে, আমার জন্য অপেক্ষা করো সোনা।’

বিশ্বাস করেছিল রূপা, অপেক্ষা করেছিল স্বচ্ছ ছলনাহীন হৃদয়ে।

কিন্তু একদিন হারুনের অপ্রত্যাশিত চিঠি এল। বিস্মিত হৃদয়ে পড়তে লাগল রূপা,

জানি না ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যতা আমার আছে কি না, তবু তোমার মহৎ হৃদয়ের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, তোমাকে দেওয়া আমার কথা রাখতে পারছি না রূপা। লাবণ্যকে আমি বিয়ে করছি, বিয়ে করছি না বলে বলা ভালো বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছি। ওর বাবা আমার বস, আর আমার ভবিষ্যৎ তাঁর হাতে, আমার হৃদয় চিরদিন তোমার জন্য শূন্য হয়ে রইল―হারুন।

ঘৃণা, অপমান আর অব্যর্থ কান্নায় বাঁধ দিতে দিতে রূপা চিঠিটা কুটি কুটি করে ছিঁড়ল, তারপর শিশুসুলভ একটা প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত নিল―জীবনে  বিয়েই করবে না কখনও।

হারুনকে নিয়ে ক্যান্টিনে এল রূপা। এই দুপুরে ক্যান্টিন একদম ফাঁকা। কোনার দিকে একটা টেবিলে বসল ওরা। রূপা চুপ করে আছে, কোনও কথা বলছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হারুন আর্তঃস্বরে বলল, ‘রূপা আমার মেয়েটা কাল পানিতে ডুবে মারা গেছে।’

আমূল চমকে তাকাল রূপা, এমন পরিস্থিতির জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

‘তাকে কবর দিয়েই চিটাগাং থেকে তোমার কাছে ছুটে এসেছি শুধু ক্ষমা চাইবার জন্য।’

পারিপার্শ্বিকতা ভুলে রূপার সামনে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল হারুন। হাত দিয়ে মুখ ডেকে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘আমাকে ক্ষমা কর, ক্ষমা কর রূপা, যথেষ্ট প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে আমার, একবার শুধু বল আমাকে ক্ষমা করেছ ?’

অতি কষ্টে নিজেকে সামলে রাখল রূপা, সে শুধু বলতে পারল, ‘আমি সব ভুলে গেছি হারুন, কিছুই মনে রাখিনি।’

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না রূপা, ছুটে গিয়ে বিছানায় পড়ে কাঁদতে  লাগল। এক সময় উঠে চোখ মুছল, তারপর টেবিলে বসে চিঠি প্যাড টেনে নিয়ে লিখল, ‘ফিরোজ আমি ঠিক করেছি তোমাকেই বিয়ে করব।’

 লেখক : কথাশিল্পী

চিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares