গল্প : মাথাব্যথার প্রাচীন ইতিহাস : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

ব হুকাল আগে মাথাব্যথার জন্য যেতে হতো ডাক্তারের কাছে। চিকিৎসা নিতে হতো। একটা ড্রাগের নাম ছিল প্যারাসিটামল। প্যারাসিটামল খেলে ব্যথা সেরে যেত। আমি আর ট্রিনিমি সেদিন ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম। তবে সেটা মুহূর্তের জন্য। আমরা গবেষক। হাসলে আমাদের চলে না। পূর্বজ মানুষজন আগের ধাপগুলো পার করেছে দেখে তো আজ আমরা এখানে এসেছি।

আমরা দুজন যে দিন প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে গবেষণার কথা ভাবলাম সেদিন প্রচণ্ড মাথাব্যথার কারণে কাজটা পিছিয়ে গেল।

ট্রিনিমি বলল, আগের যুগে এই অসুখে কি করত মানুষ ? শুধুমাত্র একটা ড্রাগ দিয়ে এই তীব্র ব্যথা কী করে সেরে যেত ?

ট্রিনিমির সেই কথা দিয়েই শুরু। এরপর থেকে আমরা প্রাচীন ইতিহাস খুঁড়ে বের করছি। তার আগে অবশ্য অরিগোর কথা বলতে হবে।

মাথাব্যথার জন্য আমি যাই অরিগোর কাছে। অরিগো মাথাটা কেটে ফেলে নতুন একটা মাথা লাগিয়ে দেয়। চেহারাও হুবহু একরকম রাখতে পারে। মনে হবেই না : কেটে নতুন কিছু বসানো হয়েছে। কোথাও কোনও দাগ নেই, মসৃণ।

অরিগোর সঙ্গে অন্য কারিগরদের একটা তফাৎ আছে। অন্য কারিগররা নতুন চেহারা বসিয়ে দিত, আগের কোনও ছাপ সেখানে রাখত না। নিজের প্রতি বিরক্ত মানুষেরা এই ব্যাপারটাই চাইত। আর আগের যুগের মতো এই যুগেও নিজের প্রতি বিরক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।

ট্রিনিমি যেমন, দু’দিন পর চেহারা বদলে ফেলে। কপালের বামপাশে বসানো সংখ্যা দেখে তাদের চিনতে হয়। অথবা শরীরে বসানো স্ক্যানার দিয়ে বুঝে নিতে হয়।

আমাকে ট্রিনিমি বলে : আগের যুগের মানুষ। কেননা, আমি কখনও চেহারা বদলাতে চাইতাম না, এমন নয় নিজেকে ভালোবাসি ভীষণ, কিন্তু বদলাতে আমার মায়া লাগত।

আমরা শুনেছি : মায়া অনুভূতিটাও অনেক আগের।

যা হোক, প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কাজ শুরু করার আগে অরিগোর কাছে গিয়েছিলাম। গিয়ে বললাম, অরিগো আমরা এই বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। সবার জানা প্রয়োজন বলে মনে করি। তুমি কি কোনওভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারবে ?

অরিগো বলল, পারব কিন্তু করব না।

ট্রিনিমি শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বাজিতে জিতে গেলাম। 

ট্রিনিমি আসার সময় আমাকে বলেছিল ওর কাছে গিয়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করছি।

আমি হাল ছাড়লাম না। অরিগোর পেছনে লেগেই থাকলাম। যতবার যাই ততবার ব্যাটা আমার মুখের ওপরে দরজা লাগিয়ে দেয়।

এক সময় আমার উৎসাহ শেষ হলো। ট্রিনিমিরও তাই। আমরা এমন একটা গবেষণা করতে চেয়েছিলামÑএটাও যেন ভুলে গেলাম।

দুই.

বিষয়টা আবার মনে পড়ল অরিগোর মৃত্যুর দিনে। অরিগো সত্যি মারা গিয়েছে। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হলো। অরিগোর জন্য যতটা তার চেয়ে নিজের জন্য। এখন মাথাব্যথা হলে পুরোনো চেহারা আমি পাব কী করে ? তবে ট্রিনিমি আমাকে প্রায় বলে, আমার এক চেহারা তার আর সহ্য হচ্ছে না। খুব দ্রুতই আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। কে জানে, অরিগো হয়তো আমাদের সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য মরে গেল। ওদিকে মায়ের মৃত্যুর কথা মনে হচ্ছে খুব। আমি যে এমন, এটা তো মায়ের জন্য। মা সবসময় পুরোনোকে আঁকড়ে থাকতে চাইতেন। এত সুন্দর ছিলেন তিনি। বেশিদিন তাকে পাইনি। অনেক ছোটবেলার কথা। দশ-বারো বছর বয়স হয়তো। উল্কার বৃষ্টিতে আহত হয়ে ছেড়েই গেলেন সব।

তার শেষকৃত্যে গিয়ে উপস্থিত হলাম। উপাসনালয়ের পাশেই সমাধিস্থ করা হবে তাকে। খুব অল্প মানুষ এসেছে। তারাই এসেছে যারা আমার মতো। অর্থাৎ চেহারার মায়া ছাড়তে না পেরে দীর্ঘদিন ধরেই যারা অরিগোর কাস্টমার।

হ্যামকে দেখতে পেলাম। কাঁদছে। ও বরাবর একটু আবেগপ্রবণ। আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। বলল, এখন কি হবে রেনমার্ক ? আমাদের মাথাব্যথা হলে কী হবে ভেবে দেখেছ ?

আমি ভেবে দেখেছি, তবে হ্যামকে কিছু বলি না। মাথাব্যথা হলে এরপর চেহারাটা বদলাতে হবে। দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল।

খুব প্রাণহীনভাবেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমি ট্রিনিমির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। ওকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। বলল, তোমার মাথাব্যথার জন্য অপেক্ষা করছি।

তিন.

গ্রীষ্মের ছুটিটা অবশেষে পেলাম। ট্রিনিমি আসবে। আমরা দূরে কোথাও যাব, এমনটাই পরিকল্পনা। ঘুমিয়ে ছিলাম। বেল বাজল। দরজা খুলতে ইচ্ছে হলো না। ওর কাছে চাবি আছে। খুলে ঢুকতে পারবে। আমার একটা অভ্যাস আছে উপুড় হয়ে থাকার। ট্রিনিমি ঢুকল টের পেয়েছি, তবে তাকাইনি। যখন তাকালাম দেখতে পেলাম ট্রিনিমি ওর সমস্ত পোশাক খুলে ফেলেছে। আমি খানিকটা বিরক্তই হলাম। ওকে বহুবার বলেছি, এভাবে সব খুলে ফেললে আমার ভালো লাগে না।

আজ চমকে উঠলাম আর সঙ্গে সঙ্গে মাথা ধরে গেল। এক মুহূর্তের ভেতরেই বমি করতে শুরু করলাম। ট্রিনিমির হাততালি শব্দ শুনতে পেলাম। এতদিন পর আমার মাথাব্যথা দেখে ? প্যারাসিটামল হারিয়ে যাওয়ার দুঃখটা সঙ্গে সঙ্গে মনে বাজল। কেন গবেষণাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ট্রিনিমির দিকে আবার চোখ পড়ল। ও আমার একেবারে কাছে চলে এসেছে। ওকে দেখামাত্রই আমার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এল।

ট্রিনিমি চেহারা বদলেছে। অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares