ভ্রমণ : ইরিত্রিয়ার শরণার্থী ও ডালপালার মসজিদ : মঈনুস সুলতান

পাশের দেশ ইরিত্রিয়া থেকে সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে সীমান্ত অতিক্রম করে ইথিওপিয়ায় এসে, সাময়িকভাবে থিতু হওয়া আফার সম্প্রদায়ের একটি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছতে, সময় লাগে খুবই সামান্য। যাত্রাপথে আমাদের ল্যান্ডক্রুজারটি হাজার বছর ধরে জমে জমে পাথর হওয়া লাভাস্তরের দুটি টিলা আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করে। জারকিংয়ে আমরা―তথা সহযাত্রীরা পরস্পরের শরীরে ঠেকা দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করি। মরু-সড়কটি এতই নির্জন যে, গাড়ি-ঘোড়া দূরে থাক ভারবাহী উট কিংবা খচ্চরেরও দেখা মেলে না। কালচে শিলাপাথরে পূর্ণ বালুকায় নিরিখ করে দেখার মতো তেমন কিছু নেই। তবে দিগন্তে চিমনিওয়ালা অবিকল বিস্কুট ফ্যাক্টরির মতো দেখতে একটি শিলাপাহাড়ের রূপরেখা কিছুক্ষণ আমাদের মনোযোগকে ধরে রাখে।

   শরণার্থী শিবির থেকে সামান্য দূরে গাড়ি দুটো দাঁড় করিয়ে রেখে, গাইড নাগাসি হেঁটে যান, গোত্র-প্রধানের কাছ থেকে রিফিউজি গ্রামে ঢোকার পারমিশন নিতে। তার ফিরে আসতে সময় লাগে। আমার সহযাত্রী ক্যারোল অসহিষ্ণু হয়ে ওয়াকিটকির বোতাম টেপাটেপি করেন। তাতে কানের পাশে বিকল মাইক্রোফোনের মতো ধাতব আওয়াজ হতে থাকে। তার বয়োকনিষ্ঠ স্বামী জিম―যিনি পেশায় মিউজিশিয়ান, বেজায় খোনা গলায় গুনগুনিয়ে গান ধরেন, ‘ব্ল্যাক হর্স স্ট্যান্ডিং বাই দ্য চেরি ট্রি.. অহ, লর্ড..।’ গাইতে গাইতে গীতিকার এ ভদ্রসন্তান নোট নিচ্ছেন, মনে হয়, সংগীতটি সবেমাত্র মুখে মুখে রচনা করেছেন। পেছনের সিটে বসে নিরাসক্ত মুখে এনথ্রোপলজিস্ট নারী ডারোথি স্কেচখাতায় আঁকিবুকি করছেন। আমারও অধৈর্য লাগে। গাড়ির জানালা দিয়ে ফের শরণার্থীদের গ্রামটিকে নিরিখ করে দেখি। বিস্তীর্ণ একটি প্রান্তরে―মধ্যে বিস্তর জায়গা খালি রেখে―দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে শনের মতো দীর্ঘ ঘাসে ছাওয়া রন্ডাবেল বা বৃত্তাকার কুটিরগুলো। স্পষ্টত এ শরণার্থী শিবিরের অর্থনৈতিক হাল-হকিকত খানিকক্ষণ আগে দেখা বাস্তুহারা মানুষদের বস্তি থেকে পজিটিভভাবে ভিন্ন। আন্দাজ করি, এ শিবিরের মানুষজন গৃহচ্যুত হয়ে ইরিত্রিয়া থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইথিওপিয়ায় এসে ছাউনি গড়েছেন। এরা আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থার দেয়া ত্রাণসামগ্রীর লেজিটিমেট দাবিদার, সম্ভবত পাচ্ছেনও, তাই এদের কুটিরগুলোর কাঠামো তুলনামূলকভাবে উন্নত।

বিব্রত মুখে ফিরে আসেন গাইড নাগাসি। জানতে পারি, আমরা শিবিরের মানুষজনদের জন্য যে দু’বস্তা শস্যবীজ টেফ নিয়ে এসেছি, এতে গোত্র-প্রধান আলহজ আলী আহমদ অবশ্যই খুশি হয়েছেন, তবে কিনা―গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি উন্নয়ন ফান্ড, এতে পর্যটকেরা ডোনেশন দিলে তাঁর পারমিশন দিতে কোনও দেরি হবে না। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে আমি নাগাসির কাছে ডোনেশনের পরিমাণ জানতে চাই। না, আলহজ সাহেব খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করছেন না, ইথিওপিয়ার করেন্সি বিরে গোটা বিশেক ডলার দিলেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন। আমি সময় নষ্ট না করে গ্রুপের হয়ে ওয়ালেট থেকে টাকা বের করি। বাধ সাধেন ক্যারোল, তার বক্তব্য হচ্ছে, ‘আবাউট টুয়েন্টি ডলার, দিস ফিগার ইজ টু লিটিল.. যুক্তরাষ্ট্রে ব্রডওয়ের থিয়েটার দেখতে তার চেয়ে বেশি পয়সা খরচ করতে হয়।’ মহিলা সস্বামী জিন্দেগিতে সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এসেছেন, স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে তার ধারণা কম, তবে পর্যটনের সর্ববিষয়ে তার জোরালো মতামত আছে। আমি মহিলার সঙ্গে পারতপক্ষে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার পক্ষপাতি, তাই মুখ কাচুমাচু করে জানতে চাই, ‘ক্যারোল, হাউ মাচ ডোনেশন উড বি অ্যাপ্রপিয়েট, হোয়াট ইজ ইয়োর অপিনিওন ?’ তিনি কিছু না বলে আমার হাত থেকে টাকাগুলো নিয়ে কালকুলেটারে হিসাব কিতাব করে তাতে আরও গোটা তিরিশেক ডলারের সমপরিমাণ বির যুক্ত করেন। টাকাটা যেহেতু তার গাঁট থেকে বেরুচ্ছে, আমি তাই প্রতিবাদ করার প্রয়োজন বোধ করি না। পেছনের সিট থেকে আমাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ডারোথি মৃদু মৃদু হাসেন। মিউজিশিয়ান জিম খামোকা কোন্ পুলকে উদ্দীপ্ত হয়ে কণ্ঠস্বরকে বেজায় হেড়ে করে তুলে গেয়ে ওঠেন..‘ওহ লর্ড.. ব্ল্যাক হর্স ইজ গ্যালাপিং থ্রু দ্য ডেজার্ট।’ স্ত্রী ক্যারোল মাস্টারনীর মতো কটমট করে তার দিকে তাকান। তাতে ব্যাটারি ফুরিয়ে আসা ট্রানজিস্টারের মতো তার সুরেলা আওয়াজ মিইয়ে আসে।

    গাইড নাগাসির ইশারা পেয়ে গাড়ি দুটি খানিকটা আগ বেড়ে শরণার্থী শিবিরের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। কপালে হাত দিয়ে তাবৎ কিছু খুঁটিয়ে নিরিখ করতে করতে গোলটুপি মাথায় গোত্র-প্রধান আলহজ আলী আহমদ এগিয়ে আসেন। আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। গাইড পরিচয় করিয়ে দেয়। আলহজ ক্রমাগত তাঁর মেহদিরঞ্জিত দাড়ি চুলকান।  অভিব্যক্তি দেখে অপ্রত্যাশিত অঙ্কের ডোনেশনে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন কি না ঠিক বোঝা যায় না। তবে হাত ইশারায় আমাদের শিবিরের ভেতর দিকে যাওয়ার অনুমতি দেন। ডারোথির সঙ্গে ক্যারোল ও জিম এগিয়ে যান। দুই নিরাপত্তা সৈনিক কলাশনিকভ কাঁধে তাদের অনুসরণ করেন।

আমার সহযাত্রীরা খানিক এগিয়ে যাওয়ার পর, আমি আলহজ সাহেবকে চাট বা চিবালে মৃদু নেশা হয় এ ধরনের পাতার বান্ডিলের সঙ্গে সম্মানীস্বরূপ সামান্য টাকা অফার করি। তিনি চাটের তাজা পাতা শুঁকে, টাকাগুলো ফতুয়ার জেবে ঢুকিয়ে গাঢ় নজরে আমার দিকে তাকান। বুঝতে পারি গোত্র-প্রধান বিষয়ী লোক। উনার সঙ্গে দগলফজল করা সহজ হবে না। তিনি গাইডের মারফত জানতে চান, আমার স্বদেশ কোথায় ? ব্রিটিশ ও আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ তিন সহযাত্রীর তুলনায় আমার গাত্রবর্ণ ভিন্ন, তাই তাঁর কৌতূহলে অবাক হই না একবিন্দু। জবাব দিই, বাংলাদেশ, সঙ্গে সঙ্গে যোগ করি―দেশটি চীন ও ভারতের প্রতিবেশী। আলহজ সাহেবের ঠোঁটে সামান্য হাসির রেখা দেখা যায়। বেশ সময় নিয়ে তিনি নাগাসিকে কিছু বুঝিয়ে বলেন। তর্জমায় জানতে পারি, চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে তাঁর হজ করার নসিব হয়েছিল, তখন মক্কা শরিফে এক মোয়াল্লিমের ছাউনিতে কয়েকজন বাংলাদেশি হাজি সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হয়।

  কথা বলতে বলতে আমি ও নাগাসি তাঁর সঙ্গে পল্লির ভেতর দিকে হাঁটতে শুরু করি। নিরাপত্তা সৈনিক দুজন আমার কাঁধের দুপাশে বন্দুক বাগিয়ে নেকির মনকির ফেরেশতার মতো পথ চলেন। সামান্য আতান্তরে পড়ি, একটু আগে আমরা যখন ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরে বাস্তুহারা মানুষদের বস্তিতে ঘুরপাক করছিলাম, তখন সৈনিকরা কাছাকাছি ছিলেন বটে, তবে এ রকম সতর্কভাবে আমাদের সার্বক্ষণিক গার্ড দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। এ রেফিউজি পল্লির শরণার্থীরাও গোত্র পরিচয়ে আফার, কিন্তু এরা পাশের দেশ ইরিত্রিয়া থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে ইথিওপিয়াতে এসে শিবির গড়ে বসবাস করার চেষ্টা করছেন, এ কারণে কী এদের সঙ্গে সহবতে সিপাইরা প্রহরা জোরদার করেছেন ? ভাবি―পরে এক সময় গাইড নাগাসির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টা খোলাসা করে নিতে হবে।

আলহজ সাহেবের ঠোঁটে হাসির বিরল রেখাটি ফের দৃশ্যমান হয়। বাংলাদেশি হাজি সাহেবদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ফের মন্তব্য করেন। তাঁর দৃষ্টিতে বাঙালি হাজিগণ খুবই সাহসী মানুষ। এরা খাবারের সঙ্গে চার-পাঁচটি সবুজ মরিচ কাঁচা কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে স্রেফ হজম করতে পারেন।  আমার স্বদেশিদের মরিচ-মসলা বিষয়ক বীরত্বে আমি যারপরনাই প্রীত হই, তবে এ বাবদে কথাবার্তা আর বিশেষ আগায় না। শিবিরের এ দিকে কিছু গাছপালায় বিশুষ্ক মরুতে ছড়াচ্ছে শ্যামলিম আভা। তার কাছাকাছি বসে দুই মহিলা শুকনা ঘাসে বুনছেন ঝুড়ি। আলহজ সাহেব জানান, একটি সাহায্যকারী সংস্থা এ শিবিরে দিচ্ছেন ত্রাণ-সহায়তা। তাদের স্টাফরা ভিজিটে এলে খুব ভালো মূল্যে কিনে নেন এসব ঝুড়ি। মহিলা শ্রমিকেরা বিক্রয়মূল্যের আশি শতাংশ নিজের কাছে রেখে বিশ শতাংশ দান করে দেন শিবিরের উন্নয়ন ফান্ডে।

আমরা চলে আসি গোত্র-প্রধানের গোলাকার কুটিরে। তার চিলতে বারান্দায় পাতা প্রকাণ্ড রেহালের মতো দেখতে দুখানা চেয়ার। দেয়ালে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় হরফে ইংরেজিতে লেখা ‘নো নো―পিকচার, অফকোর্স নট, ভেরি ভেরি থ্যাংক, ফটো―নট নট।’ আলহজ হাতে তালি বাজান। লাজুক মতো এক তরুণী আরেকটি রেহাল শেইপের কুরছি এনে পেতে দেয়। বসে পড়তে পড়তে মেয়েটির কপালে ছুরি দিয়ে কেটে কুঁদে ক্রুশ চিহ্ন আঁকা দেখে আমি অবাক হই! ইথিওপিয়া অথবা ইরিত্রিয়ার বেশ কিছু গোত্রের নারী-পুরুষের মুখমণ্ডলে কাটাকুটির নকশা এঁকে সম্প্রদায়ের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়কে স্পষ্ট করে তোলা হয়। আন্দাজ করি এ নারী ধর্মে মুসলমান, তাই তার কপালে ক্রুশ চিহ্নের মর্মার্থ ঠিক ধরতে পারি না। মেয়েটি আলহজের হাতে একটি পাথরের হামানদিস্তা ধরিয়ে দেয়। তিনি চাটের বান্ডিল থেকে বেশ কতগুলো তাজা পাতা ছিঁড়ে তাতে কুটে নিজে কিছু মণ্ড মুখে দিয়ে বাকিটুকু আমাকে ও গাইড নাগাসিকে অফার করেন। আমরা চুপচাপ চাট পাতা চিবাই। একটু আমেজ হতে থাকে।

গাইডের মারফত অতঃপর আলহজ আমার প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হন, আমি জানতে চাই তাঁদের শরণার্থী হওয়ার প্রেক্ষাপট, কেন তাঁরা ইরিত্রিয়ায় নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ইথিওপিয়ায় এসে শরণার্থী হয়েছেন ? বেশ সময় নিয়ে আলহজ গুছিয়ে জবাব দেন। আমি নোটবুক বের করি, তিনি ইশারায় আমাকে নোট না নেওয়ার অনুরোধ করেন। নাগাসির তর্জমায় বুঝতে পারি, ইরিত্রিয়ার খ্রিস্টান একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ গোত্রের সঙ্গে তাদের অনেক বছর ধরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছিল, তারা নাকি তাদের উট-ভেড়া-ছাগল ইত্যাদি হামেশা ছিনতাই করত। অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে তারা অই গোত্রকে আক্রমণ করেছিলেন। রাতের বেলা প্রতি-আক্রমণে খ্রিস্টান ট্রাইভটি ছিনতাই করে নেয় আলহজের গোত্রের তিনটি যুবতী নারী। ফলস্বরূপ আক্রমণ পাল্টা-আক্রমণ চলতে থাকে কিছু দিন। এক পর্যায়ে তাঁর গোত্রের ছেলেরা ঝটিকা হামলা চালিয়ে উদ্ধার করে আনে একটি মেয়েকে। ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, মেয়েটির শরীর অপবিত্র করে তারা তার কপালে বিজয়ের চিহ্নস্বরূপ ক্রুশের দাগ দিয়েছে। এদিকে ভিন্ন এক হামলায় মৃত্যু হয়েছে মেয়েটির পিতা ও মাতার। তারপর এক রাতে বেশ কয়েকটি হোস্টাইল গোত্র একত্রিত হয়ে তাদের গ্রাম আক্রমণ করে ঘরদুয়ারে আগুন দিল। এ পরিস্থিতিতে আলহজ প্রথমে সম্প্রদায়ের ‘মোয়াম বিয়াই ওয়া বাহাতি’ বা ভাগ্যগনকের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন। অতঃপর ভাগ্যগনকের নির্দেশে চন্দ্র সূর্য ও হরেক রকমের নক্ষত্র বিচরিয়ে রাতের বেলা পুরো কৌম নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী হন ইথিওপিয়ায়।

ফরচুন টেলার অর্থে ‘মোয়াম বিয়াই ওয়া বাহাতি’ এ শব্দবন্ধটি আমি কেনিয়া ও তানজানিয়ায় বাসরত যে সব সম্প্রদায়ের মানুষজন সোয়াহিলি ভাষায় বাতচিত করে, তাদের মুখে শুনেছি। আফার কৌমের মানুষেরাও যে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল―তা জানতে পেরে আমি তেমন একটা অবাক হই না। হরেক কিসিমের দুর্ভাগ্য হামেশা আমাকে দক্ষ গোয়েন্দার মতো অনুসরণ করছে, সুতরাং জানতে চাই, মোয়াম বিয়াই ওয়া বাহাতি সাহেবের সাক্ষাৎ লাভ সম্ভব কি না ? আলহজ ভরসা দিয়ে বলেন, তাঁর গোত্র খুবই ভাগ্যবান যে―ওয়া বাহাতি এখনও বেঁচে আছেন, চোখে তেমন দেখেন না তিনি, তবে কোরআনে হাফিজ মানুষটি শিবিরের মসজিদে ইমামতি করেন। গোত্রভিত্তিক সংঘাতে তাঁর দুটি ছেলের মৃত্যু হয়েছে, দুজন পত্নীও পরলোকগত, তাই ওয়া বাহাতি নামাজ-কালামের পর বাকি সময় মসজিদে এতেকাফ করেই কাটান। যেহেতু আমি ধর্মে মুসলমান, তাই আমাকে মসজিদে ঢুকতে দিতে আলহজের আপত্তি কিছু নেই। চাইলে আমি এ সুযোগে ভাগ্যও গণনা করে নিতে পারি। এর জন্য হাদিয়ার যৎসামান্য টাকা গোত্র-প্রধানের হাতে তুলে দিলেই হবে। প্রস্তাবটি আমি তৎক্ষণাত কবুল করে নাগাসির মাধ্যমে আলগোছে লেনদেন সারি।

আলহজ সাহেব ফের তালি বাজান। কপালে কেটে ক্রুশ আকা তরুণীটি ফিরে এসে গোত্র-প্রধানের হাতে তুলে দেয় ছোট্ট মশকের মতো চামড়ার থলে। নাগাসির ব্যাখ্যায় বুঝতে পারি, ওতে আছে দুম্বার অন্ত্রতন্ত্র শুকিয়ে ইরিত্রিয়ান মরিচে জারিত খাবার। এ ঝাল এ অন্ত্র-আচার বিবেচিত হয় ডেলিকেসি হিসেবে, কেবল মাত্র ঈদে-চান্দে এ ধরনের খাদ্য ভক্ষণের রেওয়াজ আছে। শিবিরে ত্রাণ সহায়তা দিতে আসে যে সব শ্বেতাঙ্গ স্টাফ, তাদের আলহজ সাহেব কস্মিনকালেও এ ধরনের ডেলিকেসি অফার করেননি। তবে আমি যেহেতু মরিচখেকো বাঙালি মুসলমান, সুতরাং আলহজ মেহেরবানি করে আমাকে তা দিয়ে আপ্যায়ন করছেন। খানিক খিদাও পেয়েছে, তাই আমি বুকের বাপাশে ডান হাতে চাপড় মেরে তাঁকে আফার কায়দায় ধন্যবাদ জানাই। তিনি থলে মেলে ধরেন। তুমুল গন্ধে মনে হয়, মরুভূমির তাবৎ শকুনকুল সীমান্ত অতিক্রম করে আজ ভিন্ন দেশের বাসিন্দা হতে বদ্ধপরিকর হবে। আলহজ এবার থলেটি এগিয়ে দেন, আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে নাগাসি ইংরেজিতে বলে―এ খাবার রিফিউজ করলে গোত্র-প্রধান বিষয়টিকে ইনসাল্ট হিসেবে নেবেন। কি আর করা―আমি বিসমিল্লাহ বলে হাতে নিই এক টুকরা অন্ত্র-আচার। দম বন্ধের অনুভূতি হয়, কিন্তু মুখে ফেলে চিবানোর চেষ্টা করি। ভেতরে যেন দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়। আমি তীব্র প্রচেষ্টায় মুখের ভাব অবিকৃত রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু আমার স্বদেশি হাজি সাহেবেরা মক্কা-মাজোমাতে যে বিক্রমের পরিচয় দিয়েছেন, সে ধরনের সহনশক্তির নজির রাখতে ব্যর্থ হই। চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। কাশতে শুরু করলে নাগাসি মাথায় চাটি মেরে আমাকে শান্ত করতে চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কাশি থামে বটে, তবে রক্তস্রোতে যেন প্রবাহিত হতে শুরু করে তপ্ত লাভা, মনে হয় কুংফুতে সুদক্ষ কোনও পালোয়ানকে হাতের কাছে পেলে তাকে এ মুহূর্তে পরাস্ত করতে কোনও সমস্যা হবে না।

তরুণীটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার নাজেহাল হালত পর্যবেক্ষণ করছিল, ঠোঁটে ফিচেল হাসি ফুটিয়ে দু-পা এগিয়ে এসে সে হাতে তুলে নেয় তার কোমরে গোঁজা চামড়ার ছোট্ট বটুয়াটি। উল্টে তা চিপে সরাসরি আমার ঠোঁটমুখে ফেলে কয়েক ফোঁটা মধু। কাছে আসাতে আমি যেন তার টলমলে তারুণ্যের খানিকটা উত্তাপও পাই। কিন্তু ভাটিবয়সে এ নিয়ে উদ্দীপ্ত হতে বিরত থাকি। আলহজ তার সম্পর্কে রূপকথার মতো বিরল একটি কাহিনি বলে আমার মতো মরিচদগ্ধ বাঙালিকে আপ্যায়ন করেন। অন্য সম্প্রদায়ের পুরুষ দ্বারা অশুদ্ধ হলে মেয়েদের সচরাচর আফার সম্প্রদায়ে ফিরিয়ে নেয়ার কোনও চল নেই। তবে নারীটিকে যে দিন গোত্রের দুই যুবক জান কোরবানি দিয়ে উদ্ধার করল, ঠিক অই দিন তাহাজ্জুদের সময় গোত্র-প্রধান স্বয়ং মসজিদের উঠানে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেন ঝরে পড়া একটি নক্ষত্র। খসা তারকাটি সরাসরি রুশনি ছড়িয়ে তাঁর চোখের সামনে ছিটকে পড়ে ডুবে যায় পাথর কুঁদে তৈরি জলের চৌবাচ্চায়। মহাজাগতিক জ্যোতিষ্কটি গলে গলে পরদিন চৌবাচ্চার জল হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ সবুজ। বিষয় জানতে পেরে ওয়া বাহাতি গ্রহনক্ষত্র বিচরিয়ে বিধান দেয়―গোত্র-প্রধানের সঙ্গে মেয়েটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে আছে। একটি সমস্যা দেখা দেয়―অশুদ্ধ নারীকে বিবাহ করার কোনও প্রথা না থাকলে। ওয়া বাহাতি অনেক ভেবেচিন্তে ফতোয়া দেন, মেয়েটি কখনও আফার সম্প্রদায়ের কারও পত্নী হতে পারবে না বটে, তবে তার ‘কেয়ানা’ বা  সেবাদাসী হওয়াতে মাজহাবে কোনও নিষেধ নেই। সে থেকে নারীটি তাঁর সংসারে বাস করছে কেয়ানা হিসেবে, আফার গোত্রের আচার অনুষ্ঠানে শামিল হওয়ার অধিকার কপালদোষে সে হারিয়েছে বটে, কিন্তু গোত্র-প্রধানের খেদমত করে দিন গোজরানে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।

অন্ত্র-আচার খেয়ে আমার আঙ্গুল চটচটে হয়ে আছে, আফার সংস্কৃতিতে ক্লিনেক্স ব্যবহারের কোনও চল নেই, বিরক্ত হয়ে আমি ব্লুজিন্সে হাত ঘষাঘষি করি। মেয়েটি কুটিরের ভেতর থেকে নিয়ে আসে ঘাসে বোনা চারটি ঝুড়ি। জানতে পারি, আমরা চারজন পর্যটকের সবাই জনপ্রতি একটি করে ঝুড়ি কিনে নিলে গোত্র-প্রধান খুশি হবেন। এগুলোর মূল্য বাঁধা আছে, সুতরাং দামদর মুলামুলি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। আমি পুরো গ্রুপের হয়ে ঝুড়িগুলো খরিদ করি। গাইড নাগাসি জানান, এগুলো ক্যারি করার আপাতত কোনও জরুরত নেই। কেয়ানা নারী তা গাড়িতে তুলে দেবে। মেয়েটি এবার কোমরের অন্য পাশে গোঁজা ছাগলের লোমশ লেঙ্গুড় দিয়ে তৈরি একটি ঝাড়ন বের করে এনে তা দিয়ে মুছিয়ে দেয় গোত্র-প্রধানের পদযুগল। অতঃপর তিনি ফতুয়ার জেব থেকে তসবি  বের করে তা টিপতে টিপতে চটিতে পা গলিয়ে ফটফটিয়ে সামনে বাড়েন। পেছন পেছন আমি ও নাগাসি রওনা হই মসজিদের দিকে।

শিবিরের মাঝামাঝি এসে ডারোথির তালাশ মেলে। তিনি পাঁচ আফার নারীকে দাঁড় করিয়ে ক্যামেরার শাটার টিপতে টিপতে টুকটাক কথা বলছেন। এনথ্রোপলজিস্ট এ  মহিলা আফার ভাষায় বেশ কয়েকটি শব্দের মর্মার্থ ও ছোটখাটো কিছু বাক্য বলতে পারেন। আন্দাজ করি,  তার টোটাফাটা ভাষাজ্ঞান সহায়ক হচ্ছে আফার মহিলাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়। আলহজ দাঁড়িয়ে পড়ে কপাল কুঁচকে নাগাসিকে কিছু বলেন। সে তৎক্ষণাৎ ডারোথিকে ইংরেজিতে কমিউনিকেট করে। এদের ছবি তুলতে হলে উন্নয়ন ফান্ডে কনট্রিবিউশন করার নিয়ম আছে, রেটও বাঁধা আছে। ডারোথি পাল্টি দেন―তিনি মেয়েদের সরাসরি পেমেন্ট করেছেন। গোত্র-প্রধান তাতে সন্তুষ্ট হন না। আমি নীরব ইশারায় ডারোথিকে ছবি তোলার পয়সা ফান্ডে পে করতে বলি। তিনি আমসি মুখে এগিয়ে এসে নাগাসির হাতে তুলে দেন কয়েকটি ইথিওপিয়ান টাকা ‘বির’।

  আমরা ফের আস্তে-ধীরে আগাই। চলে আসি সিজিলমিছিল করে রাখা আগ্নেয়শিলার ভারী স্তূপের কাছে। আলহজ তা দেখিয়ে জানান, সাহায্যকারী সংস্থা মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ছেনি দিয়ে পাথর কুঁদে বাজারজাত করা যায়―এ ধরনের কোনও পণ্য বানাতে। সংস্থা পয়লা এদের দিয়ে মূর্তি তৈরি করাতে চেয়েছিল। কিন্তু ধর্মে জানদার কিছুর প্রতিমা গড়ার বিধান না থাকাতে গোত্রপ্রধান জোরদার আপত্তি তোলেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত হয়, আফার নারীরা পাথর কেটে-কুঁদে তৈরি করবে বাসন-বর্তন ও কুপি লণ্ঠন। কিন্তু প্রকল্পের এখনও শুরুয়াত হয়নি। আমি পাথরের সামানাদি কেনা থেকে বেঁচে যাওয়াতে মনে মনে স্রষ্টাকে শুকরিয়া জানাই। এ দেশে এসে হরেক লোকেশনে নানা রকমের ছাতমাথা ও ইথিওপিয়ান মোটিফ আঁকা নকশিকাঁথা ইত্যাদি কিনছি ব্যাপকভাবে। এ যাত্রায় পাথর কিনতে হলে স্যুটকেসে চাকা খুলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বেলা পড়ে আসছে, তবে রোদ মরেনি, প্রচণ্ড গরমে রীতিমতো নাভিশ্বাস ওঠে। আলহজ আশ্বাস দিয়ে বলেন, আরেক বার আমি যদি রিফিউজি ক্যাম্পে আসি, পাথরের বাসন-বর্তন ও কট্টা-বাদিয়া কেনার ফের সুযোগ আসবে। গরমে ক্রমশ লবেজান হচ্ছি, ভাবি, আরেক দফা সফরের এরাদা হলে মরুভূমি নয়, সরাসরি চলে যাব তুষাররাজ্য তিব্বতে।

যেতে যেতে দুটি গোলাকার কুটিরের মাঝামাঝি প্রশস্ত আঙিনায় এক পাল সুদর্শন ছাগলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাই। দুটি প্রকাণ্ড পাঠা কোঁকড়ানো শিংয়ে ভারী কসরতে গুঁতোগুঁতি করছে। বাকিরা যেন স্টেডিয়ামে দর্শকদের শিষ্টাচার বজায় রেখে চুপচাপ দেখছে। এদের শিংগুলো বেজায় রকমের তেড়াবেকা, সম্ভবত বইপুস্তকে এদের দাগমুণ্ডি ছাগল বলা হয়। অনেকগুলো শিংয়ের সমবেত আকার-আকৃতিকে বিমূর্ত ঘরানার চিত্রকলার মতো আকর্ষণীয় দেখায়। তাদের ভালো করে অবলোকন করার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ি। পাঁঠা দুটি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিবাদ মুলতবি রেখে, সামনের জোড়া পা শূন্যে তুলে, আমার দিকে তেড়ে আসে। ঠিক বুঝতে পারি না, আমি এদের কী ক্ষতি করলাম? এরা বিপজ্জনকভাবে আমাকে বিক্ষত করার চেষ্টা করলে আতঙ্কে আমি নাগাসির গা ঘেঁষে আত্মরক্ষা করি। গোত্র-প্রধান তসবি ঘুরিয়ে চেরা গলায় চুচুত-চু আওয়াজ দেন। তারা আর চু-চেরা না করে ফিরে যায় নিজস্ব রণক্ষেত্রে। আলহজ হাসি মুখে বলেন, চাইলে আমি এদের ছবি তুলতে পারি, পুরো পেমেন্ট করতে হবে না, ফিফটি পার্সেন্ট দিলেই কাজ চলবে। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে অসম্মতি জানাই। যেহেতু আলোকচিত্রী হিসেবে আমার প্রসিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর ছাগল দুটি আমার সঙ্গে যে ছলুক করেছে, এ দুশমনদের ছবি আমি কিছুতেই তুলতে চাই না।

মসজিদের সামনে এসে আমি চমকে উঠি। গাছের শুকনা ডালাপালা দিয়ে তৈরি ঘর ও মিনারকে চেনা মনে হয়। বুঝতে পারি, পবিত্র এ ঘরটির সাদামাটা অবয়ব ও স্থাপত্যরীতি বুনিয়াদি ধারার মসজিদ থেকে এত ভিন্ন যে―সম্ভবত সাহায্যকারী সংস্থার লোকজন এর একাধিক ছবি তুলে কোনও ওয়েবসাইটে আপলোড করেছেন, আমি ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময় এ ধরনের ছবি দেখে থাকব, তাই ডালপালার স্থাপনাটিকে― কোথায় যেন দেখেছি―মনে হচ্ছে। ওজু করার জন্য পানির কোনও বন্দোবস্ত নেই, তবে তায়ুমুমের শিলাপাথর দেখিয়ে দিতে দিতে আলহজ মসজিদটির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। ইরিত্রিয়া ছেড়ে দেশান্তরী হওয়ার সময় তাঁর গোত্র সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তেমন একটা ক্যারি করে আনতে পারেনি, কারণ তাদের গ্রামটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। গ্রাম থেকে খানিক দূরে ছিল মসজিদটি, যেখানে আগুন পৌঁছতে পারেনি। তো ওয়া বাহাতির নির্দেশে গ্রামের ছেলেপিলেরা মসজিদের কাঠামো থেকে ডালপালা খুলে তা বান্ডিল বেঁধে উটের পিটে চাপিয়ে নিয়ে আসে সীমান্তের এপারে। শরণার্থী হিসেবে এ গ্রামে থিতু হওয়ার পর আলহজ দাঁড়িয়ে থেকে মসজিদটি পুনরায় নির্মাণ করান।

কেয়ানা নারী ধুলো উড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে গোত্র-প্রধানকে কিছু বলে। আলহজ জরুরি কাজের অজুহাতে ওয়া বাহাতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নাগাসির ওপর ছেড়ে দিয়ে চটি ফটফটিয়ে ফিরে যান। নাগাসি ওজুর জায়গা থেকে খানিক দূরে ঘাসপাতার বেড়ার আড়ালে বাথরুম দেখিয়ে দেন। পাশে ইসতেনজার পর ঢিলাকুলুপ হিসাবে ব্যবহারের জন্য জড়ো করে রাখা ছোট ছোট কিছু খটখটে পাথরের স্তূপ। এগুলো ইস্তেমালে প্রয়োজনীয় প্রত্যঙ্গের জখম হওয়ার সম্ভাবনা সমধিক। তাই ওদিকে না গিয়ে চুপচাপ পাথরে হাত দিয়ে তায়ুমুম সারি।

তাঁবুর ত্রিপল কেটে তা দিয়ে মাদুর বানিয়ে মসজিদের মেঝেটি ঢাকা। মিম্বরের কাছে পাতা ঘাসে বোনা চাটাইতে ওয়া বাহাতি শুয়ে ছিলেন। আমাদের পদশব্দে ধড়মড় করে জেগে ওঠেন। সারা মুখে তাঁর ক্যালিওগ্রাফের বাঁকানো রেখার মতো বয়স ও অভিজ্ঞতার ছাপচিহ্ন আঁকা। চোখ দুটিতে মারাত্মকভাবে ছানি পড়ে তা থেকে ছড়াচ্ছে মুনস্টোন পাথরের ধূসরিম আভা। ভুরু কুঁচকে তিনি আমার আগমনের কারণ শোনেন। তাঁর অভিব্যক্তিতে কোনও ভাবান্তর হয় না, তবে কী যেন ভাবতে ভাবতে নাগাসিকে এক কোণে রাখা চামড়ার স্যান্ডেল ব্যাগটি আনতে বলেন। নাগাসি কুঁচকানো থলে থেকে বের করে মসলা পেষা শিলপাটার মতো দেখতে একখণ্ড পাথর। তাতে ছেনি দিয়ে কেটে-কুঁদে আঁকা ইনট্রিকেট নকশাদি। এসবের অভ্যন্তরে আমি আরবি ক্যালিওগ্রাফের মতো কিছু হরফ দেখতে পাই।

ওয়া বাহাতি কোনও ভূমিকায় না গিয়ে আমাকে চোখ বন্ধ করতে বলেন। আমি সুরেলা গলায় তাঁকে তেলায়ত করতে শুনি। তারপর নাগাসিকে তিনি কী যেন বলেন, তার তর্জমায় বুঝতে পারি তিনি জানতে চাচ্ছেন, পবিত্র কালামে-পাকে মানুষের অদৃষ্ট যে তার জন্মের অনেক পূর্বে নির্ধারিত হয়ে থাকে, এ ব্যাপারে আমি সচেতন কি না ? একটু ভাবি, পূর্ব নির্ধারিত না হলে ইথিওপিয়ায় এত দর্শনীয় স্থান থাকতে আমি ইরিত্রিয়ার শরণার্থীদের শিবির দেখতে আসব কেন? তাই সম্মতি সূচকভাবে মাথা নাড়ি। ওয়া বাহাতি বিড়-বিড় করে দোয়া পড়তে পড়তে আমাকে নকশিপাথর আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করতে বলেন। বেশ কিছু সময় নীরবে কেটে যায়, অতঃপর তিনি আমাকে চোখ খুলতে নির্দেশ দেন।

  ওয়া বাহাতি আফসোস করে বছর কয়েক আগে আর্থিক সঞ্চয় হারানো সম্পর্কে মৃদু মন্তব্য করে আমাকে আশ্চর্য করে দেন! যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি দেশে কনসালট্যান্সি করে ডেঞ্জার পে হিসেবে আমার হাতে জড়ো হয়েছিলে বেশ বড় অঙ্কের টাকা। শেয়ার বাজারে ধস নামলে তা সম্পূর্ণ খোয়া যায়। আমি যে মারাত্মকভাবে নিঃসঙ্গ এবং কপালদোষে কোনও দেশেই ঠিকমতো থিতু হতে পারছি না, আরও বছর দুয়েক এভাবেই কাটবে―বলে তিনি চোখের ঘষা পাথর উজ্জ্বল করে আমার দিকে গাঢ় চোখে তাকান। তাঁর সঠিক গণনায় ফের চমৎকৃত হই। মোসাফা করে বিদায় নেয়ার সময় তিনি আশ্বাস দিয়ে জানান, কোনও কোশেশ করতে হবে না, ঘোরাফেরার সময় একটু চোখ খুলে রাখবে, আপ্সেই জুটে যাবে নারী-সঙ্গী। বেরিয়ে আসি ডালপালার ব্যতিক্রমি মসজিদ থেকে। মরুভূমির প্রচণ্ড গরম হাওয়া এসে চোখমুখে ঝাপট্ লাগায়। বিরক্ত হয়ে এ ঊষর মরুতে দোসর খোঁজার প্রত্যাশা ত্যাগ করি।

পা কয়েক সামনে যেতেই চোখে পড়ে লালচে কাদামাটির দেয়ালঅলা একটি দোকান ঘর। নাগাসি ‘মি এসকিউজ ’ বলে কিছু কিনতে জোড় কদমে ওদিকে চলে যান। আমি চার পাশে চোখ রেখে আস্তে-ধীরে আগ বাড়ি। একটি ঝুপড়ি মতো ঘরের সামনে শুকনা ঘাস-লতায় বোনা বেড়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন―গলায় বিডের জোড়া হার পরা এক মহিলা। দারুণ ব্যক্তিত্বভরা দৃষ্টিতে আমাকে নজর করে ডানহাতে পেট ছুঁয়ে তা মুখে তুলে যেন ইঙ্গিতে জানান, তিনি ক্ষুধার্ত। আমি লকেল কারেন্সি দুটি বির মাটিতে রেখে সামনে বাড়ি। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, দরিদ্র এ নারী পর্যটক বা এইড ওয়ার্কারদের কাছে এভাবে সাহায্য চেয়ে অভ্যস্ত।

নাগাসি ঢুকে পড়েছেন দোকান-ঘরে। তাই তার সামনে একটু থামি। কোথা থেকে ছুটে এসে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ায় খুব কিউট দেখতে একটি ছেলে। ঝকঝকে চোখে কৌতুক ফুটিয়ে সে বলে, ‘গিভ মানি ইউ টুরিস্ট.. ইউ.. ক্যামেরা.. মাই ফটো।’ বুঝতে পারি, এ শিবির দেখতে পর্যটক বা এইড ওয়ার্কাররা হামেশা আসছেন, শিশুরাও কীভাবে ছবি তুলতে দেয়ার বিনিময়ে দু-পয়সা কামিয়ে নেয়া যায়, তার  হেকমত শিখে ফেলেছে।

দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে নাগাসির বিস্তর দেরি হচ্ছে। বিরক্ত হয়ে একা একা সামনে বাড়ি। এসে পড়ি―যেখানে খানিক আগে চলছিল পাঠার দ্বন্দ্বযুদ্ধ, অই জায়গায়। ছাগলের পাল বোধ করি শোডাউন শেষে অন্য কোথাও চরতে গেছে, তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের সহযাত্রী মিউজিশিয়ান জিম। প্রচণ্ড গরমে নাজেহাল হয়ে তিনি খুলে ফেলেছেন অভারঅলের উর্ধ্বাঙ্গ। যত্রতত্র ধারাল নখে খামচানোর ফলে তার বুকে-পিটে চাকা চাকা লালচে জখম। তিনি আকুল হয়ে আড়বাঁশি বাজাচ্ছেন। টিউনটি পরিচিত, কথাও ধরতে কোনও অসুবিধা হয় না, ঊষর মরুতে ছড়িয়ে যাচ্ছে ‘বেট.. ইউ ডিডিন্ট থিং আই নো হাউ টু রক অ্যান্ড রোল..’ এর বাঁশরী-সঞ্জাত ধ্বনি। তাকে ঘিরে জড়ো হয়েছে শিবিরের ছেলেপিলেরা। আমি তাদের দিকে তাকাই, মনে হয়, বাচ্চারা অপেক্ষা করছে পারফরম্যান্স শেষ হওয়ার, তারপর তারা একে একে তার দিকে ছুড়বে উট পাখির ভুলা-আন্ডা। ঠিক বুঝতে পারি না, বিচিত্র এ বিদেশ বিভূঁইতে রক অ্যান্ড রোলের রেওয়াজ করার দায়িত্ব জিমকে কে দিল ?

নাগাসি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জোর তাড়া লাগান। গোত্র-প্রধান আলহজ কী একটা কাজে জড়িয়ে পড়েছেন, আমাদের বিদায় জানাতে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এদিকে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। ফেরার জন্য এখনই আমাদের গাড়িতে ওঠা দরকার। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। সৈনিকরা রাতের আঁধার গাঢ় হওয়ার আগে ফিরতে চায় তাদের ছাউনিতে। তার তুলতবিলে রক অ্যান্ড রোলের আসর ভেঙে যায়। জিম খাজুল মুখে আমাদের সঙ্গে রওনা হন গাড়ির দিকে। শিশুরাও হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তাকে ফলো করছে। জোর হাওয়া বয়। স্বদেশে পিনিপিনি বৃষ্টি পড়লে বাচ্চারা যে রকম ছোটাছুটি করে গায়ে মাখে জলকণা, ঠিক এমনি শিবিরের শিশুরা মচ্ছব করে গতরে মাখে লু-হাওয়া বাহিত ধূলিকণা। তাতে হই হই করে শামিল হন জিম। বিরক্ত হয়ে তার বয়োজ্যেষ্ঠ স্ত্রী ক্যারোল হেডমিসট্রেসের মতো কটমট করে তাকিয়ে তারস্বরে তাকে ধাতানি দেন। এতে কাজ হয়, জিম ধূলিমাখা বাদ দিয়ে ছুটে এসে চুটপাট উঠে পড়েন ল্যান্ড ক্রুজারে।

লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক ও কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares