বইকথা : মায়াবী দৌলত: দুঃসময়ের প্রতিচিত্র : পারভেজ আহসান

মোজাম্মেল হক নিয়োগীর প্রাতিস্বিকতা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেণের ক্ষমতা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি, সূক্ষ্ম জীবনবোধ, প্রগাঢ় চিন্তন শক্তি এবং  শব্দের শৈল্পিক বুননের মাধ্যমে উনিশশ পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেওয়ার দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা, মত প্রকাশের  স্বাধীনতাকে বাক্সবন্দীকরণ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে বিস্মৃত করার অপপ্রয়াস, স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালন, স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মানুষদের  খোলস ও রূপ বদলানোর মতো বাস্তবতাকে  মায়াবী দৌলত উপন্যাসে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

              শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসির মতো  মায়াবী দৌলত  মূলত একটি প্রতীকাশ্রয়ী উপন্যাস। ক্রীতদাসের হাসি উপন্যাসে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসকের দুঃশাসনকে পাঠকের অনুভূতিকে জাগরিত করতে ক্রীতদাস ‘তাতারি’কে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অত্যাচারিত ও নিপীড়িত বাঙালি এবং বাদশা হারুনকে অত্যাচারী সামরিক শাসকের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক তেমনি মায়াবী দৌলত উপন্যাসে মুজিব কোটকে আবর্তন করেই ঘটনা প্রবাহে দ্বান্দ্বিকতার সূত্রপাত। মোজাম্মেল হক নিয়োগী  মুজিব কোটকে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ, স্পষ্টবাদিতা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ একজন বাঙালির চৈতন্যে কী অসাধারণ ন্যায়বোধের সঞ্চার করতে পারে তা এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটির নাম দেলুর মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়েছে। চৌর্যবৃত্তিই হচ্ছে দেলুর একমাত্র পেশা। কালিন্দা বিলের উত্তর পাড়ে ফুলঝুড়ি গ্রামে তার বসবাস। একদিন সিলেট অঞ্চলের এক গ্রাম থেকে সোনাদানা, কাপড়চোপড় চুরি করে বাড়িতে আনার পর কাপড়ের সঙ্গে একটি কুঁচকানো মুজিব কোট দেখতে পায় সে। এ কোটটিই তার বোধে, উপলব্ধিতে ও চৈতন্যে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটায়। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। তার স্বগোক্তিতে এই উপলব্ধিগুলো হয়েছে প্রতিভাত, ‘কী কঠিন আর ধারালো তাঁর কথা! সাদা পাজামা পাঞ্জাবির উপর এ-রকম একটা কোট তিনি পরেছিলেন। তাঁর কথায় এ দেশের মানুষ এক হলো। যুদ্ধ হলো। দেশ স্বাধীন হলো। এই নেতার বুকে কী করে গুলি করতে পারল ?’ এ বোধ তাকে নাড়িয়ে দেয়। দ্রোহের আগুনে জ্বলতে থাকে সে। ক্রমশ তার মধ্যে সৃষ্টি হয় চুরির প্রতি অনীহা এবং ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করে কথা বলার সাহসিকতা। এখানে তাকে দেখা যায় অন্ধকার ভেদ করে সে কেবলি হাঁটছে আলোর পথে।

              ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সমাজের লোভী, স্বার্থপর ও বিবেকহীন মানুষ এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের চরিত্রের কদর্য রূপকে ফুটিয়ে তুলছে এই কোট। এ উপন্যাসে মোতালেব মেম্বার, আক্তার হোসেন চেয়ারম্যানের চরিত্রের মধ্য দিয়ে মুখোশ পাল্টানো সুবিধাবাদী মানুষের কদর্য ও পুঁতিগন্ধময় রূপ চিত্রিত হয়েছে। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের পূর্বে মোতালেব মেম্বার ছিল আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য। সে সময়ে নিজের স্বার্থে নিজেকে মুজিব আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করত। কিন্তু ১৫ আগস্টের পরেই মোতালেব মেম্বার হয়ে যায় এক ভিন্ন মানুষ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ভুলে গিয়ে সে অমানুষে পরিণত হয়। আর তাই এক পর্যায়ে দেলুকে বলে, ‘মুজিব কোটের কোনো দাম নাই। কেউ কি অহন শইলে লাগায়? অহন দেহোস কারও শইলে ?… আর কোনোকালেও দেখবি না। নেতা মইর‌্যা গেলে, তার সবকিছুই শেষ অয়া যায়।’  অথচ মোতালেব একসময় বলেছিল বঙ্গবন্ধু ডাক দিলে সে কামানের সামনে দাঁড়াতে পারে। এ উপন্যাসে এ-ধরনের আরও একটি চরিত্রের নাম পাঁচলাইশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন। সে ছিল আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সেও তার মুখোশ পাল্টে ফেলে অল্প কয় দিনের ব্যবধানে। নিজেকে প্রকাশ করতেই চায় না সে কোন দলের লোক। তার কাছে দেলু মুজিব কোটটি নিয়ে গেল সে বলে ওঠে, ‘শেখের দল ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আম গাছে কাঁঠাল হতে পারে , কাঁঠাল গাছে আম হতে পারে কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আর ক্ষমতায় আসতে না পারলে মুজিবও চিরদিনের জন্যে হারায়া গেল। এখন চলছে মিলিটারি শাসন। কে এই কোট নিয়া বিপদে পড়ব ?’ মায়াবী দৌলত উপন্যাসে মুজিব কোটকে একটি পরশ পাথর হিসেবে দেখিয়েছেন লেখক। এ কোটের কাছে আসলেই মানুষের ভেতরের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। মোতালেব মেম্বার ও আক্তার চেয়ারম্যান ছিল ’৭৫ পূর্ববর্তী সময়ে সুবিধাভোগকারী মানুষ। যে সকল খাদ্যসামগ্রী বঙ্গবন্ধু দুঃখী অসহায় অভুক্ত মানুষের জন্যে পাঠিয়েছেন এগুলোই তারা লুট করেছে। অথচ সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই তারাই হয়ে গেছে সামরিক সরকারের লোক।

              সুবিধাবাদীলোক ব্যতীত এদেশের সমাজের সাধারণ মানুুষের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে তা দেলু, হাছুন আলী, বাসেত বাঙালির চরিত্রের মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে দেলু জীবন ধারণ করলেও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর অসীম ত্যাগের বিষয়টি কখনও ভুলে যায় না সে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা উপন্যাসের শুরু থেকেই চক্ষুষ্মান হয়েছে। মুজিব কোটকে ভালো সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে ইস্ত্রি করে সুগন্ধি মেখে বাক্সে সযত্নে রেখে দেওয়া, একজন যোগ্য ব্যক্তিকে কোটটি উপহার দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ, উপন্যাসের দুই খল চরিত্র হারিছ ও মজনু জোরপূর্বক দেলুর বাড়ি দখলের সময় মুজিব কোট সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্যের জবাবে তার অগ্নিমূর্তি ধারণের মধ্য দিয়ে এ মহান নেতার প্রতি তার প্রগাঢ় ভালোবাসা বিম্বিত হয় স্পষ্টভাবে। অন্যদিকে বাসেত বাঙালি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও কাপড় ইস্ত্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে অপেক্ষা করছে মুজিবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করার জন্য। দেলুর কাছে কোটটি দেখে বাসেত বাঙালির মুখে বিদ্যুতের ঝলক দিয়ে ওঠে। দীপ্তময় চোখে তাকিয়ে থাকে এ কোটটির দিকে। আবেগে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে কোটটি বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রাখে কিছুক্ষণ।     

              পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে এ দেশ নিমজ্জিত হয়েছিল দুঃসময় ও অন্ধকারের গভীরে। আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের শাসনের পুনরাবৃত্তি হয়েছিল এই জনপদে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে উজ্জীবিতকরণ, বাকস্বাধীনতা হরণ, মতামতের স্বাধীনতাকে রুদ্ধকরণের ফলে দেশের মানুষ পিষ্ট হচ্ছিল দুঃশাসনের জাঁতাকলে। এ উপন্যাসে সামরিক শাসনের দুঃশাসনের চিত্র বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। দেখা যায় যে ফুলঝুড়ি ও সন্নিহিত গ্রামগুলোতে আর্মির সদস্যরা এসে মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যায়। দু-এক মাস পর লোকগুলো ফিরে আসে ঠিকই। শারীরিক নির্যাতনের কারণে তারা পঙ্গু হয়ে পড়ে। তারা আর কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারে না। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকারের ভিত সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে স্বাধীনতা বিরোধীদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি লেখকের হালিম নামের রাজাকারপুত্রের বর্ণনায় চিত্রিত হয়েছে। হালিম একজন বড় নেতা হিসেবে সমাজে আবির্ভূত হয়েছে। তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে এখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে। এমনকি মিলিটারির সদস্যরা গ্রামে এলে প্রথমে তাকে খোঁজ করে। থানার ওসিও তার পরামর্শে চলে।

              লেখক অত্যন্ত সুকৌশলে বনগাঁও ও ফুলঝুড়ি গ্রামের মধ্যকার হাডুডু খেলার কথা বলতে গিয়ে তুলে ধরেছেন বাকস্বাধীনতা হরণের বিষয়টি। ফুলঝুড়ি গ্রামের হার যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই দেলু দম ধরার প্রচলিত ‘চি’ হাডুডু-ডুডুডু, টিক-টিক-টিক-টিক ইত্যাদি ধ্বনি বাদ দিয়ে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা’ বলে উঠলে খেলার মাঠ তপ্ত কড়াইয়ের রূপ ধারণ করে এবং স্বাধীনতাবিরোধী লোকেরা এবং পুলিশ কনস্টেবলরা দেলুকে ধরার জন্যে তৎপর হয়। এই বর্ণনার ভেতর দিয়ে একটি বিষয় প্রতিভাত হয়েছে যে, সে সময়ে বাকস্বাধীনতার লেশমাত্র ছিল না এই জনপদে। এই হাডুডু খেলা উপন্যাসের ক্লাইমেক্স এবং এখান থেকেই কাহিনি মোড় নেয় ভিন্ন দিকে যা পাঠকের কল্পনার বাইরে এবং সৃষ্টি হয় নতুন জগৎ। হাডুডু খেলা ও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনির মাধ্যমে দম ধরার কৌশলকে লেখক যেভাবে কাহিনির নাভিমূলে গেঁথে দিয়েছেন তাতে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। কারণ, এই ধরনের দম ধরে খেলার নজির বাংলাদেশে কোথাও আজ অব্দি ঘটেছে কিনা সন্দেহ থেকে যায়। লেখকের কল্পনায় খেলায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জুড়ে দিয়ে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। বস্তুত সে সময়ে দেশে যে ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছিল চতুর্দিক, মানুষেরা যে ছিল বাকরুদ্ধ তা মুক্তিযোদ্ধা আজিজের সংলাপের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। যে মুক্তিযোদ্ধা আজিজ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ শুনে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সেই মুক্তিযোদ্ধা এখন প্রতিবাদহীন, ভাষাহীন এক অক্ষম মানুষ। সে কেবলি দেখছে  ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা এখন দেশের নিয়ন্ত্রক। শাসক। হন্তারক। অবিমৃষ্যকারী।’ সামরিক শাসনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে মুক্তিযোদ্ধা আজিজও মুজিব কোট নিতে গিয়ে ভয় পেয়ে দেলুকে বলছে, ‘আমিও পারব না এই কোটের মর্যাদা দিতে। এই ভার বওয়া অনেক কঠিন। আমার সাধ্যের বাইরে। আমিও আজ অক্ষমদের দলে ভিড়ে গেছি। আজ প্রতিবাদহীন, অথর্ব, ঘাড় নোয়ানো এক মানুষ, আমিও পারব না এর ইজ্জত দিতে। মর্জাদা দিতে। আমার নামেও যেকোনো সময়ে মৃত্যুর পরোয়ানা জারি হতে পারে।’ এ সংলাপের ভেতর দিয়ে মূর্ত হয়েছে এক বিভীষিকাময় চিত্র।

              সমাজে অনেক বড় বড় অপরাধী আছে যাদের প্রকৃত চেহারা সবসময়ই আবৃত থাকে। ভেতরের ও বাইরের রূপের মধ্যে থাকে বিস্তর ব্যবধান। ভালো মানুষের মুখোশ পরেই সমাজে তাদের অবাধ বিচরণ। ঔপন্যাসিক তাঁর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকেই এ ধরনের মানুষের কদর্য রূপকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন এ উপন্যাসে। মোতালেব মেম্বার, আক্তার চেয়ারম্যান, হারিস গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ কিন্তু এরা সকলেই দুষ্কর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। দেলুর স্বগোক্তিতে ব্যক্ত হয়েছে মোতালেবের কুকর্মের বৃত্তান্ত। মেম্বার থাকা অবস্থায় গম ও লঙ্গরখানার মাল পর্যন্ত চুরি করেছে। দেলুর চুরির মূল্যবান জিনিসপত্রাদির অন্যতম গ্রাহক ছিল এই মোতালেব। অন্যদিকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় প্রদত্ত টিন দিয়ে নিজের বাড়ি করেছিল আকতার চেয়ারম্যান। অন্যদিকে দেলুর জমি দখল করা থেকে শুরু করে সকল মন্দ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত গ্রামের উঠতি মাতব্বর হারিছ। কিন্তু কোনো রকমে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্যে চৌর্যবৃত্তি গ্রহণ করায় দেলুই গ্রামের মানুষের কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য। দেশের বড় বড় অপরাধী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে তা লেখক বোঝাতে চেয়েছেন এ চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে।

              শব্দের শৈল্পিক বুনন ও বাক্যবিন্যাস, প্রকৃতির অসাধারণ বর্ণনা ও ইঙ্গিতময়তায় কথাশিল্পী-হিসেবে লেখকের শক্তি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ধরনের শিল্পসচেতনতা উপন্যাসটির মান এবং আঙ্গিকে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

‘নীড় ছেড়ে বাইরে আসার পাখপাখালিদের প্রস্তুতি চলছে। রাতজাগা শেয়ালেরা বিচরণ শেষ করে গভীর জঙ্গলের গর্তে গা-ঢাকা দেওয়ার জন্যে ছুটছে। পাখিদের পাখা ঝাপটানি আর ঘুম ভাঙানোর কিচিরমিচির শব্দ শুরু হয়েছে, এসব কিচিরমিচির শব্দ শুনতে ভালো লাগে দেলুর। পাশের গ্রাম থেকে মোরগের বাঁক ভেসে আসছে। মানুষের ঘুম ভাঙার কী অপূর্ব এক সৃষ্টি! সকাল হলে মোরগগুলো বাঁক দিয়ে মানুষের কানে বার্তা দেয়। কী বার্তা দেয় ?’

              প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনায় ও চিত্রকল্প নির্মাণে লেখকের পারঙ্গমতাই প্রকাশ পেয়েছে উপরের এ উদ্ধৃতাংশে। একই সঙ্গে উদ্ধৃতির শেষ বাক্যে প্রশ্ন রেখে পাঠককে নিমজ্জিত করছেন ভাবনার জলে।

ইতিহাসের সত্যতাকে ধারণ, বৃহত্তর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষাকে ব্যবহার, মুজিব কোটকে প্রতীকী ব্যঞ্জনা হিসেবে ব্যবহার এবং  মানোজগতের বাস্তবতাকে নিরীক্ষণ করে এক শিল্পোত্তীর্ণ উপন্যাস রচনা করেছেন মোজাম্মেল হক নিয়োগী। মায়াবী দৌলত উপন্যাসটি পাঠ করলে পাঠকের মধ্যে জাগ্রত হয় দেশাত্মবোধ এবং জাতির জনকের আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares