প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : জীবনশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই : প্রকাশকের দৃষ্টিতে : ওসমান গনি

বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যে যে কজন লেখক তাঁদের মেধা-মনন যুক্ত করে, বাংলা সাহিত্যকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন হাসনাত আবদুল হাই তাঁদের অন্যতম। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হাসনাত আবদুল হাই কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং শিল্প-সমালোচক। শিল্পের জন্য তাঁর রয়েছে অপরিসীম ভালোবাসা। জীবন আর শিল্পকে তিনি সমদৃষ্টিতেই বিচার-বিশ্লেষণ করেন। অতিকথন হাসনাত আবদুল হাই সবসময়ই পরিহার করে চলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন মিতবাক ও সংযমী, শিল্পী হিসেবেও তিনি অসামান্য রূপদক্ষ ও ধৈর্যশীল। অপরিমেয় শ্রমের ফসল তার একেকটা গল্প-কবিতা, উপন্যাস। লেখালেখিকে যাঁরা সাধনার বস্তু মনে করেন হাসনাত আবদুল হাই সেই গোত্রভুক্ত লেখক। তার লেখা আপসহীন, নির্ভীক এবং সত্যসন্ধানী। কারও মন জুগিয়ে তিনি লেখনী ধারণ করেন না। জীবনের জন্য শিল্পের যে-অঙ্গীকারহাসনাত আবদুল হাই মূলত সেই দর্শনেরই সমর্থক। হাসনাত আবদুল হাই প্রকৃতপক্ষেই উঁচুদরের শিল্পী। তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করেন তখন তা  অন্তরের আদেশেই করেন, এ জন্য তাঁর শিল্পে কোথাও ফাঁক থাকে না, সবকিছুকেই তিনি ভরাট করে নেন আবেগ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে। বাংলাদেশের সাহিত্য-শিল্পে এ কারণেও হাসনাত আবদুল হাই স্মরণীয় নাম।

জীবনীভিত্তিক উপন্যাস রচনায় হাসনাত আবদুল হাই সিদ্ধহস্ত। এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় কিংবদন্তির ত্রয়ী: সুলতান-কামরুল-নভেরা গ্রন্থ। এই উপন্যাস তিনটি রচিত হয়েছে বাংলাদেশের তিন কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনধারাকে কেন্দ্র করে। জীবনভিত্তিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তিনি সমকালীন বাংলাদেশে অদ্বিতীয়। সুপরিকল্পিতভাবে, সময় নিয়ে জীবনীভিত্তিক উপন্যাস সাজিয়ে তুলতে হয়। এ ধারায় কাজ করা তাই অনেকটা দুঃসাধ্যও বটে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য যা দুঃসাধ্যপ্রতিভাবান মহান মানুষেরা সে-কাজই অনায়াসে সম্পন্ন করে থাকেন। এই গ্রন্থে পাঠক জীবনীভিত্তিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে হাসনাত আবদুল হাইয়ের শক্তির পরিচয় পাবেন বলেই বিশ্বাস করি।

এস এম সুলতান (১৯২৪-১৯৯৪খ্রি.) বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে যুগপ্রবর্তক নাম। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে, কীভাবে একজন নিচতলার মানুষ সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে অমরত্ব অর্জন করেছেনসুলতান তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে সুলতানের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নতুনত্বেরই দাবিদার নয়, চিত্রশিল্পে তিনি সেই স্বপ্ন ফুটিয়ে তুলেছিলেনযা তিনি বাস্তবে দেখতে চাইতেন। সুলতান উপন্যাসে ব্যক্তি  সুলতান ও শিল্পী সুলতানের নানা অনুসঙ্গ সত্য ও কল্পনা-রসে চিত্রিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দুঃশাসক ইয়াহিয়া খানের ‘দানবীয় মুখচ্ছবি’ এঁকে যিনি দেশ-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, তিনিই আমাদের শ্রেষ্ঠ পটুয়া কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮ খ্রি.)। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তিনি ‘ঢাকা আর্ট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে কামরুল হাসান এরশাদের ব্যঙ্গচিত্র এঁকে প্রতিবাদ করেন। ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ ক্যাপশন যুক্ত সেই ব্যঙ্গচিত্র এঁকেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী কামরুল হাসানকে নিয়ে লড়াকু পটুয়া শিরোনামে উপন্যাস লেখেন হাসনাত আবদুল হাই। লড়াকু পটুয়া পাঠকসমাজে ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত হয়।

ভাস্কর্য শিল্পে ‘নভেরা’ একটি সুপরিচিত নাম। উত্তরসূরিদের জন্য যারা প্রেরণার উৎস হতে পারেনতারাই যথার্থ শিল্পী। ভাস্কর নভেরা শুধু দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেই নন, জীবন-যাপনের ক্ষেত্রেও বিদ্রোহী ছিলেন। তাঁর ভাস্কর্যগুলো কর্মে এবং আঙ্গিকে অভূতপূর্ব। নভেরাকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন মননশীল লেখক হাসনাত আবদুল হাই। তাঁর নিবিড় অনুসন্ধানের ফসলই নভেরা উপন্যাস। প্রকাশ-মুহূর্তেই পাঠক সমাদৃত হয় নভেরা উপন্যাস। বৈচিত্র্যময় বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন গুণী এই লেখক। তিনি যখন নাটক রচনা করেন, তখন নাটকের সবসূত্র মেনেই তিনি নাটককে রূপদান করেন। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনকে উপজীব্য করে হ্যাম-বেথ নামে তিনি যে অসামান্য নাট্যকর্ম রচনা করেছেনসে সম্পর্কে আরও বেশি আলোচনা হওয়া দরকার। অনুবাদের ক্ষেত্রেও তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় পাওয়া যায়। শেক্সপিয়রের যেসব নাটক তিনি অনুবাদ করেছেন পূর্ববর্তী যেকোনো অনুবাদকের চেয়ে তাঁর অনুবাদ প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য। অনুবাদের ভাষা সবসময়ই তার আবেগ দ্বারা শাসিত হয়। তাঁর অনুবাদ শুধুই ভাষান্তর নয়; মেধা, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠাযুক্ত হয়ে অনুবাদকর্মও হাসনাত আবদুল হাইয়ের হাতে মৌলিক সৃষ্টি হয়ে ওঠে।

হাসনাত আবদুল হাই চিরনবীন লেখক। তাঁর দৈহিক বয়স সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেলেও মানসিক শক্তি এখনও যেকোনো শক্তিমান তরুণের মতোই। কাজের প্রতি তার যে আন্তরিকতাতা সত্যিকার অর্থেই বিস্ময়কর। বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য এলাকার নাম ভ্রমণসাহিত্য। ভ্রমণসাহিত্য যারা সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের সমপঙ্ক্তিতে বসিয়েই হাসনাত আবদুল হাইকে মূল্যায়ন করা সম্ভব। তাঁর ভ্রমণসাহিত্য পড়লে শুধু কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার বিবরণই পাওয়া যায় না, তিনি ভ্রমণ-কথার ফাঁকে ফাঁকে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংস্কৃতি, জীবন-যাপন ও শিল্প-সাহিত্যের খবরাখবরও পরিবেশন করেন। এর ফলে তার ভ্রমণ-কথা শুধু ভ্রমণ-কথার মধ্যেই আবদ্ধ থাকে না, হয়ে যায় ভ্রমণসাহিত্য। হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভ্রমণসাহিত্য নিঃসন্দেহ উচ্চমার্গীয় প্রয়াস।

শিল্পকলার নান্দনিকতা, চলচ্চিত্রের নান্দনিকতাসহ শিল্পবিষয়ক বেশ কিছু  উন্নতমানের গ্রন্থ আছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ঝুলিতে। বিশেষ করে শিল্পকলার নান্দনিকতা গ্রন্থটি তিনি যে বয়সে প্রণয়ন করেছেন ওই বয়সে বাংলাদেশের কোনো লেখক অমন বিরাট আকৃতির গ্রন্থ প্রণয়ন করার সাহস দেখাতেন কিনা সংশয়ের অবকাশ আছে। শিল্পকলার খুঁটিনাটি বিষয় থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক আলোচনাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উক্ত গ্রন্থে। এই গ্রন্থ শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সংক্ষেপে হাসনাত আবদুল হাইয়ের জীবন ও কর্ম আলোচনা কিছুটা দুরূহ ব্যাপারই বটে, তার মতো বৈচিত্র্যময় জীবন ও কর্মের অধিকারী যারা, তাঁদের সম্পর্কে কিছু লিখতে গেলে এমনিতেই কলম আড়ষ্ট হয়ে যায়। আমার মতো অলেখকের জন্য তার সম্পর্কে কিছু লেখা আরও কঠিন। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে যতটুকু জেনেছি, সেই জানাটুকু ভাষায় ফুটিয়ে তোলা আমার জন্য দুঃসাহসের বিষয়। তিনি এখন শতায়ুর পথে অগ্রসরমান। তার চলার গতি নির্বিঘ্ন হোক, তিনি আমৃত্যু সৃজনক্ষম থাকুন এটাই আমার আন্তরিক কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares