প্রতিবিম্বের মমি : হুমায়ুন আজাদ

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
একটি ভুল ধারণা খুব জনপ্রিয় এখন যে, বাঙলাদেশে কবি ও কবিতার অবাঞ্ছিত প্রাচুর্য ঘটে গেছে, যেন রাস্তায় যতজন পা-পিছলে পড়ে তাদের দশজনের ন-জনই কবি। দৈনিকগুচ্ছের সাপ্তাহিক ও বিশেষ সংখ্যায়, বিভিন্ন সাপ্তাহিকে, অজস্র এলোমেলো অনিয়মিত ম্যাগাজিনে, ছোটবড় পঙ্ক্তিতে মুদ্রিত রচনারাশি ও সেগুলোর রচয়িতাদের নানারকম সক্রিয় ক্রিয়াকলাপ এমন একটি ধারণা তৈরিতে চমৎকারভাবে সফল হয়েছে। কিন্তু যে-দেশ জীবনের সমস্ত এলাকায় গরিব, সে-দেশ কবিতার মতো সৃষ্টিশীলতার এলাকায় এমন ধনী হয়ে উঠবে, তা খুবই বিস্ময়কর ও সন্দেহজনক। একটু ভালোভাবে ওই কবিতারূপী রচনাসমূহ বিচার করলে বোঝা যায় ওগুলোর অধিকাংশই কবিতার অনুকরণ মাত্র। ওগুলোর অধিকাংশ কবিতা তো নয়ই, এমনকি গদ্য হিসেবেও নিকৃষ্ট। বাঙলাদেশে প্রকৃত কবির সংখ্যা খুবই কম; এবং এ-স্বল্পতা আমাদের ব্যাপক দারিদ্র্য ও সৃষ্টিশক্তিশূন্যতারই নিদর্শন। স্বাধীনতার দেড়-দশকে ঘটেছে আরও একটি ভয়াবহ ঘটনা―বহু তরুণ এখন কবিতারূপী রচনা লেখায় ব্যস্ত থাকলেও কেউই পরিপূর্ণভাবে কবি হয়ে উঠতে পারেননি। দেড়-দশকে যে-অঞ্চল একজনও পরিপূর্ণ নতুন কবি জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়, তার সৃষ্টিশীলতাশূন্যতার কথা ভেবে শিউরে ওঠার কথা। তাই এখনও প্রাধান্য ছড়িয়ে আছেন পঞ্চাশ ও ষাটের কবিরা এবং তাঁদেরও অনেকের ঘটেছে নানা রকমের পতন। কবিতার আগের উচ্চত্ব আর নেই। কবিতা হয়ে উঠেছে স্বভাবের অপরিশীলিত প্রকাশ। তরুণেরা, যারা বন্দি হয়ে আছেন ক্ষুদ্র বাঙলাদেশে, নেমে যাচ্ছেন ক্রমশ লোককবিতার দিকে। সময়ের অপচয়ও ঘটে গেছে তাঁদের জীবনে: আয়ুর তৃতীয় দশকের শুরুতেই যতটুকু সাফল্য আয় করার কথা, তারা তা আয়ত্ত করতে পারছেন না জীবনের তিন দশক সম্পূর্ণরূপে ব্যয় হয়ে যাওয়ার পরও।
ওই তরুণদের থেকে স্বতন্ত্র একজন আবিদ আনোয়ার। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবিম্বের মমি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, যাতে সংকলিত হয়েছে চুয়াল্লিশটি কবিতা। তাঁর কবিতা প’ড়ে বোঝা যায় তিনি সত্তর-আশির দশকের সহযাত্রীদের স্বভাবকবিত্ব, প্রাকৃত আবেগ-অনুভূতি ও সামাজিক উপাদানের অতি-ব্যবহারের ঝোঁক থেকে মুক্ত রাখতে চান নিজেকে এবং আশ্রয় খোঁজেন মননশীলতায় ও কল্পনায়। উদ্ঘাটন করতে চান নানা সত্যের আন্তরসূত্র, পরিহার করেন ভাবাবেগ। তাঁর কবিতার দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার জন্যে দরকার অভিনিবেশী পাঠকসম্প্রদায়, যারা চিন্তার সূত্র অনুসরণে সক্ষম, চিত্রকল্পের শোভা ও ব্যঞ্জনা অনুধাবনে সমর্থ।
প্রধানত চার ধরনের বিষয়কে আবিদ আনোয়ার পরিণত করতে চেয়েছেন কবিতায়: ‘সময়-সমকাল’, ‘প্রজন্ম-উত্তরাধিকার’, ‘শিল্পকলার সূত্র’, ও ‘জীবন’―এ-চারগুচ্ছে বিন্যস্ত হ’তে পারে তাঁর কবিতাগুলো। একগুচ্ছ কবিতায় আবিদ বিশশতকের চরিত্র ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন, এগুলোকে বলতে পারি ‘সময়-সমকালের কবিতা’। আরেকগুচ্ছ কবিতায় পুরুষপরম্পরায় উত্তরাধিকারীর নিঃস্বতার কথা বলেছেন, ওগুলোকে চিহ্নিত করতে পারি ‘প্রজন্ম-উত্তরাধিকারের কবিতা’ হিসেবে। প্রচুর কবিতায় আবিদ উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করেছেন শিল্প ও সৌন্দর্যের সূত্রÑএগুলোকে বলা যায় ‘শিল্পকলার সূত্রবিষয়ক কবিতা’।
ব্যাপক জীবন এসেছে কিছু কবিতার আধেয় হিসেবে, ওইগুলোই ‘জীবনবিষয়ক কবিতা’। এসবের মধ্যে শিল্পকলার সূত্র উদ্ঘাটনের দিকেই আবিদের ঝোঁক প্রবল। এ-বিষয়ক কবিতার প্রাচুর্য জানিয়ে দেয় যে, আবিদ আনোয়ার কবিতার শুদ্ধতায় বিশ্বাসী, যেমন বিশ্বাসী প্রতীকী কবিরা। তাঁর বিভিন্ন শ্রেণীর কবিতায় এমন কিছু স্তবক ও পঙ্ক্তিগুচ্ছ রচিত হয়েছে যেগুলো গত দেড়-দশকে রচিত শ্রেষ্ঠ স্তবক ও পঙ্ক্তিগুচ্ছের শ্রেণিভুক্ত―
‘স্বপ্নখেকো সময়ের বীভৎস থাবার পাশে
অবাক জ্বালিয়ে রাখি ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা’
বা
‘যে তিনি পাতালগামী হবেন জেনেও
জীবনের পক্ষ নিয়ে এমন গোঙান
যেন সম্মিলিত ধ্বনি আসে চর দখলের’
বা
‘নিমজ্জমান জাহাজের জেদী নাবিকের মতো আমি
কম্পাস হাতে ঝুলে আছি মাস্তুলে’
বা
‘স্নানার্থিনী ধীবর-কন্যার গাঢ় সোমত্ত যৌবনে
আগতর লেপ্টে-থাকা লালপেড়ে শাড়ি
কে যেন হৃৎপিণ্ডে তার পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে
ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধে রেখে যায়…’
প্রভৃতি চিত্রকল্প আবিদের কবিত্বের নিঃসংশয় প্রমাণ।
আবিদের সময়-সমকালবিষয়ক কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘কবলিত মানচিত্রে’, ‘কানাবক উপাখ্যান’, ‘হলুদ বাড়ি’, ‘ক্রৌঞ্চবধ’, ‘সন্ধিক্ষণ’, ‘জলবায়ু’ প্রভৃতি। এগুলোতে মোটামুটি আঁকা হয়েছে বিশশতকের নষ্ট চরিত্র। ‘প্রজন্ম-উত্তরাধিকার’মূলক কবিতারাশিতে আছে ‘উত্তরপুরুষ’, ‘একটি হুঁকোর গল্প’ ‘বিবর্তিত প্রজাতি’ প্রভৃতি। এগুলোতে পাওয়া যায় নিঃস্ব উত্তরাধিকারীর ট্র্যাজিক অবস্থার পরিচয়। শিল্পকলার সূত্রবিষয়ক কবিতাই আবিদের বেশি―‘কবি’, ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘ডারউইনীয় রক্তের ভেতরে’, ‘কল্লোলের দিকে’, ‘অবলোকনের মাত্রা’, ‘কে এক শুদ্ধাচারী’, ‘খণ্ডাংশের মালিকানা’, ‘অ্যাক্যুরিয়াম’, ‘ঐশ্বরিক’, ‘অলীক কিছু খোঁজো’, ‘অসেতুসম্ভব’ প্রভৃতি। এগুলোতে আবিদ উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন নন্দনতাত্ত্বিক বিভিন্ন সূত্র। তাঁর ‘কবি’ ‘ঝিনুকের ঢঙে পরানটা খুলে সোনার পেরেকে’ নিজেকে আহত করে, ‘নরকের ফেরেস্তার মতো গনগনে বয়লার ঘেঁটে/ তুলে আনে আগুনের ফুল’; আবার কখনও তাঁর ‘কবি’ হয়ে ওঠে ‘ঘিনঘিনে ময়লার স্তূপে জীবনের দুর্লভ সামগ্রী’ হারিয়ে-ফেলা ছুঁচো, আর ‘জাগতিক ময়লা ঘেঁটে কবিও ছুঁচোর মতো নিবিষ্ট নিয়মে/ খুঁজে ফেরে অন্যবিধ খাবারের কণা’। আবিদের কল্পনায় ‘কবিরও বোধের শুঁড়ে খেলা করে নয়-নয়টি সোনার পশম’। আবিদ কল্পনা করেছেন তাঁর ছুঁচোর যেমন রয়েছে ‘স্বর্ণশলাকার মতো জ্যোৎস্নামাখা নাকের পশম’ অনুপ্রাণিত কবিরও তেমন কিছু রয়েছে। পশমের প্রতীকটি তৃপ্তিকর মনে হয়নি আমার, যেমন তৃপ্তিকর মনে হয়নি প্রতীকরূপে ব্যবহৃত কয়েকটি ফল―‘সোনার সফেদা’ বা ‘বাস্তবের কুল’। বাঙলা কবিতায় ‘আমলকি’ যেমন গৃহীত হয়ে গেছে প্রতীকী ফলরূপে, সফেদা বা কুলের তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। ‘কে এক শুদ্ধাচারী’ কবিতায়―প্রতীকী কবিদের মতো―আবিদ শিল্পের সারবত্তা ধরতে চেয়েছেন। তাঁর এ-জাতীয় কবিতাবলির সাফল্য বা অসাফল্য বড় কথা নয়; এগুলো যে রচিত হতে পেরেছে―লোককবিতার বর্তমান কালে―সে-জন্যেই উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলো।
আবিদের যে-কবিতাটিকে আমি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে মনে করি, সেটি ‘জীবন’পর্যায়ভুক্ত―নাম ‘মেটাডর’। কবিতাটিতে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে এক বিশাল অ্যারেনা, তাতে ‘শিং নেড়ে তেড়ে এলো জীবন নামের ষাঁড়’, যার সঙ্গে আমৃত্যু দ্বন্দ্বে লিপ্ত কবি-মেটাডর। কবিতাটি দ্বারা আলোড়িত হওয়ার জন্যে রোমানজীবনের এক জঘন্য ক্রীড়ার সঙ্গে পরিচিত থাকা দরকার। আর, ওই পরিচয় যার আছে, তাঁকে কবিতাটি শিউরে দেবে স্নায়ুতে-স্নায়ুতে। কবিতাটিকে একটি বিশাল চিত্রকল্পের মতো মনে হয়, যাতে ক্রীতদাস জীবনের ট্র্যাজিক ফোঁপানি শোনা যায়―
‘আজন্ম লড়াইলিপ্ত এই আমি কখনো ষাঁড়ের
দর্পিত ঘাড়ের রগে খুব ক’ষে মোচড় লাগাই,
হাততালি দিয়ে ওঠে বিমুগ্ধ জনতা,
উড়ন্ত বর্শার মতো কখনো কখনো
ছুটে আসে একজোড়া দয়াহীন শিং,
গেঁথে ফেলে নির্দ্বিধায় কখনো এ বুকের পাঁজর
অ্যারেনা কাঁপিয়ে তোলে বুনো এক ফোঁপানির ঝড়।’
এ-কবিতাটি, এবং ‘জীবন’পর্যায়ভুক্ত আরেকটি কবিতা, যার নাম ‘ভ্রমণ-বৃত্তান্ত’, যাতে কবি ‘গলাকাটা লাল মোরগের জেদে/ রক্ত-স্বপ্ন একাকার’ করে দেন ‘চূড়ান্ত পাখসাটে’―প’ড়ে আমার মনে হয় আবিদকে শরণ নিতে হবে জীবনেরই―সময়ের নয়, শিল্পের নয়, প্রজন্মের নয়, ট্র্যাজিক ক্রীতদাস জীবনের।
পুথি-পুস্তক, কালাকাল, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮



