আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রতিবিম্বের মমি : সৈয়দ আলী আহসান

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার

কবিতায় ‘সমগ্রতা’ বলে একটা কথা আছে―অর্থাৎ একটি কবিতা তার প্রথম শব্দ থেকে শেষ শব্দ পর্যন্ত আক্ষরিক এবং ধ্বনিগতভাবে একটি বৃত্ত রচনা করে কি না এটা পরীক্ষা করে একটি কবিতার সমগ্রতা নির্ণয় করা যায়। যখন কবি কবিতাটি রচনা করেন তখন রচনার সূত্রপাতে একটি সুসংহত সিদ্ধির কথা যে ভাবেন তা নয়, কিন্তু শব্দের সাহায্যে কবিতাটি ক্রমশ যখন নির্মিত হতে থাকে তখন সে একটি অবয়ব ধারণ করে। এই অবয়বটি যেমন ধ্বনিকে অবলম্বন ক’রে, তেমনি ভাব-প্রকল্পকে অবলম্বন ক’রেও গড়ে ওঠে। সুতরাং, কবিতার সার্থকতা ও অসার্থকতা কবিতার সামগ্রিক আকৃতিকে নিয়েই।

আধুনিক কালে কবিতা সময়ের শাসন এবং প্রজ্ঞাকে মান্য করছে বলে কবিতার মধ্যে বিশৃঙ্খল নীতিবন্ধনহীন বর্তমান সময়টি প্রতিবিম্বিত হতে গিয়ে কবিতাকেই অনেকটা বিশৃঙ্খল করেছে। এ-সময়ে যুক্তিগ্রাহ্য কাব্য-প্রতিমা লক্ষ করলে আনন্দ লাগে। আবিদ আনোয়ার-এর প্রতিবিম্বের মমি বইটি এ-কারণে আমার ভালো লেগেছে। একটি যুক্তিবাদী অগ্রসরমানতায় কবি তাঁর বক্তব্যকে বিন্যস্ত করেছেন যা পাঠকের চৈতন্যকে নাড়া দেয় এবং পাঠককে নতুনভাবে আকর্ষণ করে। এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটিতে গুণগত রূপক এবং আগ্রহ ইতস্তত সম্প্রসারিত রয়েছে, কিন্তু তা একটি ‘লজিক’ বা যুক্তিধারার মধ্যে অভিনিবিষ্ট হয়েছে। কবি সময়ের দুর্ঘটনার মধ্যে যেহেতু বাস করছেন, সেহেতু দুর্ঘটনা-কবলিত মানুষের মতো তাঁকে দুর্যোগের মধ্যেই বাঁচতে হচ্ছে; অন্ততপক্ষে বাঁচবার সাধনা করতে হচ্ছে। তাই তিনি সময়ের অনুশাসনে আবদ্ধ হয়েও জীবনকে গ্রহণ করবার জন্যে ব্যাকুল হয়েছেন; অন্ততপক্ষে হৃদয়ের মধ্যে ‘ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা’ জ্বালিয়ে রাখতে চেয়েছেন। কবি যে জীবনের মধ্যে বাস করছেন, সে-জীবনে প্রকৃতির দাক্ষিণ্য আছে, সংহারও আছে, আবার পুরোনো ইতিহাসের সমৃদ্ধির খবরও আছে; আরও আছে গ্রামীণ জীবনের চিন্তা এবং রসাস্বাদ। এর সমস্ত কিছু আবিদ আনোয়ার-এর কবিতায় রূপকল্প গঠনে সাহায্য করেছে।

আমি কবিকে তাঁর নির্মাণ-কৌশলের জন্য প্রশংসা করব। প্রতিটি কবিতাই চরণে-চরণে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নিয়মবন্ধন তৈরি করে অগ্রসর হয়েছে; সে-কারণে কোথাও আতিশয্য সৃষ্টি হয়নি এবং কবির কৌশল এখানেই সুস্পষ্ট যে, তিনি তাঁর বক্তব্যকে বিবিধ রূপকল্পের মাধ্যমে শাণিতভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন, যেমন নিচের স্তবকটি―

“…‘গোলাপ গোলাপ’ ব’লে

বাগানে ঢুকেই দেখি শুধু কিছু পাপড়ি ছেঁড়া আমাদের কাজ।

সমগ্রকে কোনোদিন ছুঁতেও পারি না,

খণ্ডিতের মালিকানা নিয়ে শুধু-শুধু হীন চতুরালি,

কোনোমতে ছলায়-কলায় দীনতার লজ্জা ঢাকা শুধু”

(খণ্ডাংশের মালিকানা)

কবির ক্রিয়া ব্যবহারের কৌশলটিও আমাকে আনন্দ দিয়েছে। একটি কৃত্য হিসেবে ক্রিয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেননি। তাঁর কবিতায় ক্রিয়াগুলো লক্ষ্যবস্তু নয়, বরঞ্চ ভাবের অন্তর্গত সীমানাকে চিহ্নিতকরণের জন্য ব্যবহৃত। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের কবিতায় ক্রিয়া ব্যবহারের যে নির্লজ্জ শিথিলতা আমি লক্ষ করছি, সেখানে আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা আমাকে আশান্বিত করেছে। একটি উদাহরণ দিলে কথাটি স্পষ্ট হবে―

‘এ-কালে বৈরাগ্য নেই, তবে কিছু ধূসর বৈরাগী

বিষয়ী কীর্তন ভজে আমাদের ভুবন-ডাঙায়:

বিপন্ন গৃহীর জায়া এতদিনে টের পেয়ে গেছে

সুদূর স্বপ্নের মতো সুর নেই বোষ্টমীর গানে,

কথা যেন সুরসিক ননদীর বুলি;

স্টেরিও ক্যাসেট ক’রে ফাটকা বাজারে ছাড়ে স্বয়ং ভৈরবী’

(রাগ)

আবিদ আনোয়ার অত্যন্ত সুন্দর কতগুলো চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন। তাঁর অনেকগুলো কবিতা শুধু চিত্রকল্পের ব্যঞ্জনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষেত্রে ‘হলুদ বাড়ি’ কবিতাটির উল্লেখ আমি করতে পারি। এ কবিতাটি পুরোপুরি চিত্রকল্পময়, যেন ক্যানভাসের আয়তনের মধ্যে একটা সুসম্পন্ন কম্পোজিশন। ‘ভ্রমণ বৃত্তান্ত’ কবিতাটিও এরকমই। তিনি ‘নিমজ্জমান জাহাজের জেদী নাবিকের’ একটি চিত্রকল্প সার্থকভাবে এ কবিতাটিতে নির্মাণ করেছেন। কবি এক্ষেত্রে আরও অনুশীলন করবেন এবং আশা করি আমাদের কবিতায় নতুন কিছু উপহার দিতে পারবেন। আমি কবিকে আধুনিক বাংলা কবিতার বিচরণ-ক্ষেত্রে সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

ইত্তেফাক সাময়িকী, ১০ মে ১৯৮৫

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button