দুই গ্রন্থ: নানা চিন্তা : শওকত ওসমান
প্রচ্ছদ রচনা: চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার

অ প্রত্যাশিত আকস্মিকতাময় আনন্দের স্বাদ অবর্ণনীয়। আমার মনে হয়, যাদের পেশা শিক্ষকতা, তাদের মতো কারও অদৃষ্টে এমন উপভোগ আর জোটে না। সুদীর্ঘ তিরিশ বছর এক কলেজ থেকে আর এক কলেজে মাস্টারি করেছি। ফলে, কত তরুণের সান্নিধ্য-সামীপ্য পাওয়া! সব কিন্তু কনভেয়ার বেল্টের মতো। কিছু কাল-পরিসর মুখোমুখি। তারপর গায়েব।
ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক আমি পূর্বোক্ত উপমার কাছে সোপর্দ করে বসে থাকি। অধিকাংশ আদল যেন চিরতরে চলে যায়। যখন ফিরে আসে আমি আনন্দ-আপ্লুত হই। তখন মনে হয়, শিক্ষকতা অপেক্ষা আর কোনও মহতী পেশা পৃথিবীতে নেই। আরও আবহে বলে রাখা যায় ছাত্র-সৌভাগ্যে আমি প্রচণ্ড বিত্তবান। সামাজিক নানা প্রান্তর থেকে আমার ডাক আসে, ‘স্যার’। সাম্রাজ্যবাদী দাসত্বের নানা ছিটেফোঁটা ছড়ানো আমাদের সামাজিক শরীরে। ‘স্যার’ শব্দ সেখান থেকেই আগত। কিন্তু ভাষার নিজস্ব জাদু আছে। প্রচলনের ভেতর দিয়ে বড় নিকট-আত্মীয়ে পরিণত হয়। ‘স্যার’ শব্দ তেমনই প্রতিভাত। শিক্ষক জীবনে-আমার সকল ছাত্রই জানে-আমি তাদের নামের সঙ্গে ‘স্যার’-যোগ ছাড়া কখনও ডাক দিইনি। পারস্পরিক এই সম্পর্ক। আমার ছাত্ররা জানে, আমি তাদের কাছে স্বীকার করেছি: আমরা পরস্পরের শিক্ষক। এই দ্বৈত সম্পর্ক এককথায় অর্থহীন। ছাত্রদের নিকট একটি শুভেচ্ছাই জানাতাম, হয়তো তাদের মনে আছে ‘আজ আমি ফোকাসে আছি, তোমরা আউট-অফ-ফোকাস-আমার প্রার্থনা ভবিষ্যতে আমাদের অবস্থান যেন বিপরীত হয়ে যায়।’ প্রার্থনা বিফলে যায়নি। আমার জীবদ্দশায় অনেক ছাত্র স্নেহাশিসের আওতায় আবদ্ধ। বহু মুখ ভেসে আসে। দূর থেকে উচ্চারণ করি, ওদের মঙ্গল হোক।
অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের নাম অনেকে জানে না। অরুণ পরলোকে চলে গেছে। সেই নাম আর কতো জনের কাছে পরিচিত? কিন্তু উত্তমকুমার-মহানায়ক উত্তমকুমার বাংলা ফিল্ম-জগতে অবিস্মরণীয় নাম হয়েই থাকবে। চারের দশকে পেশার প্রথম অঙ্কে অরুণকে ছাত্ররূপে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার অকাল মৃত্যু পুত্র-শোকের মত আমাকে বহুদিন ঢেকে রেখেছিল অস্থির আচ্ছন্নতায়। দ্বিখণ্ডিত বঙ্গদেশে আমার অনেক ছাত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে কৃতী ফিগার হিসেবে অনেকের নাম-উচ্চারণের লোভ সম্বরণ দায়। এখানেও কি দুঃখ কম?
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মরে গেছে? এই প্রশ্ন-তাড়িত আমার বিশ্বাস হয় না সে লোকান্তরিত। বাংলা উপন্যাসে যে একটা genre সৃষ্টি করে চলে গেল, সে কি কোনও বাঙালিকে ছেড়ে চলে যেতে পারে? ঢাকা কলেজে তার একহারা তারুণ্য-দীপ্ত ঝাঁকড়া লহরীসঙ্কুল কেশ-সমন্বিত মুখাবয়ব এখনও ভেসে ওঠে। উত্তরকালে অবিশ্যি তার শারীরিক পরিবর্তন ঘটেছিল। ইলিয়াসের মৃত্যু-শোক আজও বহন করছি। হাজার কাজের ভিড়ে তার সহস্র সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ অবসান। মনের সঙ্গে মেলানো দায়। অনেক দিন বাঁচার খেসারত দিতে হয়-আশি পেরিয়ে এখন বেশ বুঝতে পারছি। এই দেশে আমার কৃতী ছাত্রদের বেশ দীর্ঘ তালিকা দিতে হয়, বিশেষত সাহিত্য-জগতে। কয়েকজনই একাডেমিসিয়ান, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শান্তনু কায়সার প্রমুখ জনের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ল। অনেকের নাম বাদ পড়ে গেল, ব্যস্ততা হেতু। এটুকু বলা যায়, তারা কেউ বিস্মৃত নয়, বরং নিকট প্রিয়জন।
অতি সাম্প্রতিক একটি আকস্মিকতা আমাকে বুঁদ করে রেখেছিল বেশ কিছুক্ষণ। স্নেহভাজন কবি শাকিল রিয়াজ আমার কাছে একটা প্রবন্ধ পুস্তক পাঠিয়েছিল। নাম বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন। গ্রন্থকার আবিদ আনোয়ার। তা বিস্ময়ের কিছু নয়। বইয়ের প্রথম পাতা উল্টাতেই দেখা গেল মুদ্রিত শিরোনামের নিচে কয়েকটি কথা হস্তাক্ষরে লেখা:
ঢাকা কলেজে (১৯৬৬-৬৮) আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক
শওকত ওসমান-কে
বইটি পড়ার
অনুরোধ জানিয়ে
আবিদ আনোয়ার
৫.৩.৯৭
লাইনগুলো পূর্বোক্ত আকারে সাজানো।
স্মৃতির গুহায় হাতড়-পাতড়! তিরিশ বছর বিগত। গত তিন দশক এত রকম রগড়ানির ভেতর দিয়ে আমার জীবন-রেখা প্রবাহিত যে, পিতৃদেবের নামও প্রায় ভুলে যাওয়ার পর্যায়ে উপনীত। আবিদ আনোয়ার-কে পেলাম না। তার মানস-প্রতিনিধি গ্রন্থ আমার এত নিকটে। ভূমিকা পড়েই আত্মিক পরিচয়ের সূত্র স্পষ্ট দেখা দিল। শনাক্ত করতে সক্ষম হলুম আমার ছাত্র-রূপে। নিজে কবি এবং কবিতা সম্পর্কে প্রচণ্ড উৎসাহী-যুগপৎ স্রষ্টা এবং নিজ সৃষ্টির সমালোচক-এমন সমান্তরাল মেহনতী জন আমার ছাত্র না-হয়ে যায় না। ‘বিশ্বাসে মিলায় হরি’র দেশ থেকে সে অনেক দূর অগ্রসর।
সাহিত্য সমালোচনা একটা স্বতন্ত্র শাস্ত্র এবং তারও জোয়ারভাটা আছে। আবিদ আনোয়ার সে-ব্যাপারে এত সচেতন যে, বড়ই উৎফুল্ল হয়ে উঠলুম। বারবার প্রাচীন ঋষিবাক্য মনের ভেতর গুঞ্জর তুললে, ‘জীবনে সর্বত্র জয় কামনা করিবে-দুই জায়গায় পরাজয়: ছাত্র এবং পুত্র।’ বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন গ্রন্থ লিখে আবিদ আনোয়ার শুধু আমার নয়, বহু সাহিত্যস্রষ্টা এবং অনুরাগীদের জন্যে মহতী উপকার সাধন করেছে। দেশে মননের অনুশীলন তো নেই বললেই চলে; বিশ্বাস যাচাই ধাতে নেই। সেখানে বুদ্ধিদীপ্ত এমন একটি গ্রন্থের আবির্ভাব (হ্যাঁ, আবির্ভাবই বলব) সত্যি অভাবনীয় বৈ কি! অবিশ্যি এই গ্রন্থে আবিদ আনোয়ারের সিদ্ধান্ত/মন্তব্য সবসময় যথাযথ সকলের মনঃপূত হবে, এমন বলা চলে না।
বুদ্ধদেব বসু সাহিত্য অনুরাগ বিস্তারের একজন দধীচি-তুল্য পুরুষ। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কি বিষ্ণু দে’র নিকটে তাঁকে নিরক্ষরই বলা চলে। তিনি সাহিত্য সমালোচনা করেছেন একদম ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইংরেজ সমালোচকদের অনুকরণে। সাহিত্য যে সমাজের নানা শাখার কলমকৃত গ্রাফটেড রস-ফল তা তিনি জানতেন না। তাই জীবনের শেষ পর্যায়ে বুদ্ধদেব লিখলেন যে, ধর্মের উৎস থেকে আবার কাব্যের গুঞ্জরণ শুরু হবে। মিল্টনের উদাহরণ তিনি দিয়েছেন সেই প্রবন্ধে। চল্লিশের দশকে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তখন বুদ্ধদেব বসু বলছেন যা পুরিয়া-আকারে বলা যায়: হিন্দু হও-ভালো কবিতা লিখতে পারবে। মার্কিন কবি টিএস এলিয়ট তখন ধর্মে ক্যাথলিক, রাষ্ট্রে রাজতন্ত্রী, সাহিত্যে ক্লাসিসিস্ট বা ধ্রুপদী হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন। বুদ্ধদেব বসুর দুই কর্ণপট খুব ভালই গ্রহণ করেছিল। অথচ বিষ্ণু দে এলিয়ট সম্পর্কে লিখেছেন যে, একজন মহৎ কবির কী করুণ রাজনীতি! একই সময়ে কবি ফররুখ আহমদ ‘হেরার রাজতোরণ’ দর্শন করছিলেন। তাঁরও কথা ছিল: ‘মুসলমান হও-ভালো কবিতা লিখতে পারবে।’ সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন কোনও সাহিত্যের পক্ষে এড়িয়ে-যাওয়া সম্ভবই নয়। ঠিক এই সময় সম্পদগৃগ্ধ কবি চার দরবেশের আদর্শ অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছিলেন। দেশবিভাগের পূর্বে কবি-মানসেরও বিভাজন ঘটেছিল। কবি মোহিতলাল মজুমদার শেষজীবনে ‘হিন্দু মহাসভা’র সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং আমরণ তা থেকে আর নড়াচড়া করেননি। স্নেহাস্পদ আবিদ আনোয়ার বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন লিখে এই মনন-অনুর্বর দেশে প্রভূত উপকার সাধন করেছে। একটি বিশদ আলোচনার জন্য আমাকে কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। কারণ একহাতে পাঁচটি চ্যাঙ মাছ ধরার মত ব্যস্ততায় আমি নিমগ্ন। পাড়াগাঁর ছেলেরা আমার উপমা-মাহাত্ম্য বুঝতে পারবেন।
জনকণ্ঠ সাময়িকী, ৪ এপ্রিল ১৯৯৭



