কবি আবিদ আনোয়ার-এর গানের কবিতা : মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
অভিনিবিষ্ট পাঠকের পক্ষে তার প্রিয় কবিকে নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করা হয়তো অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু একটি নিবন্ধের মধ্যে তাঁর পূর্ণ কর্মের একটা অবয়ব তুলে আনা আমার মতো লিখিয়ের পক্ষে অসম্ভব, বিশেষ করে সেই কবির নাম যদি হয় আবিদ আনোয়ার। কবি আবিদ আনোয়ারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এতই গভীর যে, তাঁর কোনও রচনাকর্মই হয়তো আমার অপঠিত নয়। এর মধ্যে ‘কবি আবিদ আনোয়ারকে’ই আমি নিবিড়ভাবে চিনতাম। কিন্তু তাঁর প্রবন্ধের বই বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন এবং চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য পড়ার পর কেবল চমকিতই নয়, অভিভূত হয়ে গেলাম। তাঁর বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন বইটি যাঁরা পড়েননি, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত আছেন। এটি এবং চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য পাঠ করার পর আমার ক্ষেত্রে প্রথম যেটা ঘটল তা হলো : তাঁর গ্রন্থবদ্ধ কবিতাগুলোকে তাঁরই জ্ঞানের আলোয় পুনর্বার খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়া। কবি আবিদ আনোয়ারের চোখ আমাকে তাঁর কাব্যচিন্তার যে অন্তর্গত জগৎ ও কাব্যশৈলির নির্মাণকলাকে চিনিয়ে দিল তা সমসাময়িক বিশেষ কারও কবিতাতে আমি দেখিনি। আমার এই উক্তিকে যদি কারও কাছে অতিশয়োক্তি বলে মনে হয়, তাহলে সবিনয়ে অনুরোধ করব, তাঁর সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমান, কবি ও পণ্ডিত সৈয়দ আলী আহসান, সাহিত্যিক শওকত ওসমান, কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, ড. হুমায়ুন আজাদ, ড. মাহবুব সাদিক প্রমুখ আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁদের নিবন্ধে যা লিখেছেন এবং ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মানবজমিন-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন তাতে চোখ বুলিয়ে নিতে।
কবি আবিদ আনোয়ারের এযাবৎ প্রকাশিত কাব্যসংকলনের সংখ্যা আট। অগ্রন্থিত কবিতা আছে আরও অন্তত একটি সংকলন করার মতো। এছাড়া, প্রবন্ধ সংকলন চারটি, সম্পাদিত কবিতাসংকলন দুটি এবং ছন্দবিষয়ক একটি গ্রন্থ ছন্দের সহজপাঠ। আরও রয়েছে মজার-মজার নামের ছড়ার বই তিনটি : মশার মেয়ে পুনপুনি, আগলভাঙা পাগল ছড়া, সৃষ্টিছাড়া ত্রিশটি ছড়া; গল্পসংকলন একটি তিন পাখনার প্রজাপতি। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সাড়া-জাগানো কলামও লিখেছেন একনাগাড়ে। সব ক্ষেত্রেই উচ্চমাত্রার দক্ষতার পরও, কবি হিসেবেই তিনি আমার কাছে প্রধান। আমার বিবেচনায়, কবি আবিদ আনোয়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।
আমি, কবিতার জগৎ থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়ে এখন মূলত গানের কবিতাই লিখি। এই গানের কবিতার দৈন্যদশা দেখে একসময় মনেপ্রাণে চাইতাম তথাকথিত ‘গীতিকার’ নয়, প্রকৃত কবিরাই গানের কবিতা লিখুন। আমার অজান্তেই আমার সেই আশা যাঁরা পূর্ণ করেছিলেন, কবি আবিদ আনোয়ার তাঁদের অন্যতম। এই কথা বলে, গানের প্রয়োজনে ছাড়া, কবিতা লেখেননি যাঁরা, তাদের প্রতিভাকে, বিন্দুমাত্র ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
কবি আবিদ আনোয়ার কয়েকটি গীতি-আলেখ্য যেমন লিখেছেন, তেমনি আধুনিক, মরমী এবং পল্লীগীতিও লিখেছেন শতাধিক। আমি তাঁর গানের কবিতা নিয়েই কিছু কথা বলব। গানের কবিতার জন্যে প্রাথমিক প্রয়োজন হলো ছন্দ এবং অন্ত্যমিল। এরপর, কাব্যের যত কলাকৌশল, তার যতখানি সুর বহন করতে পারে, সবই আসতে পারে গানের কবিতায়। একজন শ্রেষ্ঠ মানের কবির পক্ষে তার কোনওটাই অসাধ্য কিছু নয়। কবি আবিদ আনোয়ারের বিভিন্ন গানের কবিতার কিছু কিছু পঙ্ক্তি তুলে ধরলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে―
১. ‘(শুধু) রৌদ্র কি পারে রাঙাতে রঙধনু/বৃষ্টিতে ভেজা আকাশ যদি না থাকে?/ জীবনও রঙিন বর্ণালী হয়ে ফোটে/ কিছু হাসি কিছু কান্নার ফাঁকে ফাঁকে ॥’
এই লেখারই শেষাংশে পাই―
২. ‘বিকেলের আলো এত কি পেখম মেলতো/ যদি না আঁধার আলোকের সাথে খেলতো?/ ছলোছলো নদী উচ্ছল আরো বাধা পেয়ে বাঁকে-বাঁকে ॥’
আরেকটি গানে―
৩. ‘চাঁদ ডুবে গেলে তারার জোছনা আকাশের থাকে সাথী/ তুমি চলে গেলে আমার কিছুই থাকে না/ নিজেকেও লাগে অচেনা।’
এই গানের কবিতারই অন্তরায় এসে পাই―
৪. ‘আলাপের শেষে যখনই বললে: ‘উঠি’/ কাকলি থামিয়ে পাখিরাও চায় ছুটি/ (এত) গন্ধে মাতাল করে না তো আর নিবিড় হাস্নাহেনা ॥’
এরপর একটি গানের কবিতার সবটাই দেখি―
৫. ‘যত তুমি থাকো পাহারায়/ জীবনে যা হারাবার দিনে-দিনে সবই তো হারায়/ কাঁদলেও ঝরাপাতা ফিরে আর পাবে না লাবণ্য/ যে প্রেম হারিয়ে গেলো কেন মন কাঁদো তার জন্য?/ হাজার তো নদী আছে মরুতে শুকায়/ কেন মিছে থাকো পাহারায়?/ বৃন্ত যেমন ক’রে/ কিছুকাল ধরে রাখে ফুলকে/ হৃদয় বাঁচিয়ে রাখে স্বপ্ন নামের কিছু ভুলকে/ আহত আশার মতো শেষে ঝ’রে যায়/ কেন মিছে থাকো পাহারায়?’
আরেকটি গানের কবিতার অস্থায়ীতে, দুজনের মনের অনেক অমিলের প্রসঙ্গ এনে কবি অন্তরাতে দারুণ এক উপমায় লিখেছেন―
৬. ‘নদী থাকে পাহাড়-চূড়ায়, দূরে সমুদ্দুর/ পাগলপারা জলের ধারা যেতে পারে সব ডিঙিয়ে তাইতো এতদূর/ আকাশ নামে মাটির কাছে অনুরাগের একটু বৃষ্টিতেই ॥’
এগুলো তো বটেই, তবে কবি আবিদ আনোয়ারকে আরও বেশি অতল লাগে তাঁর মরমী ধরনের গানের কবিতাগুলোতে। তার সামান্য কয়েকটির কিছু কিছু অংশ তুলে ধরছি যা পাঠ করলেই আচ্ছন্ন হতে হয়:
৭. ‘লালন তোমার আরশি-নগর আর কতদূর আর কতদূর?/ অচেনা এক পড়শি খুঁজে কাটলো সকাল কাটলো দুপুর॥’
৮. ‘পারো যদি এই আমাকে ক্ষমা করো সাঁই/ ওর চোখে যেই চোখ পড়েছে মনে হলো ত্রিভুবনে অন্য কিছু নাই/ (আমি) ডুবে ছিলাম ভক্তিরসে/ ওকে দেখেই জপের মালা পড়লো খসে/ তাহলে কি সে নিজেও তোমারই রোশনাই ॥’ (অন্তরা পর্যন্ত)।
৯. ‘গেরুয়া পরি না আমি/ চুড়ো করে বাঁধি না তো চুল/ গৃহী আমি, ভেক ধরিনি, অন্তরে বাউল ॥/ হাতে আমার একতারা নেই/ বাজাই আমি নিজকে নিজেই/ জানি না এই মনের তারে কে রাখে আঙুল ॥’ (অন্তরা পর্যন্ত)।
এমন প্রচুর নমুনা দেয়া যায়।
কবি আবিদ আনোয়ারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিশাল শব্দভাণ্ডার। একেবারে গ্রামীণ কিন্তু সুপ্রচলিত শব্দ থেকে শুরু করে আধা-শহুরে, শহুরে, অতি-আধুনিক, এমন কি বিদেশি শব্দও তিনি অবলীলায় ব্যবহার করতে পারেন নিপুণ বুননশিল্পীর মতো দক্ষতায়। ‘তাহলে কি সে নিজেও তোমারই রোশনাই’―এখানে ‘রোশনাই’-এর বিকল্প কোনও শব্দই ভাবা যায় না। অথচ এভাবে ব্যবহার করার কথা কজন কবির কলমে আসত, তা বলা কঠিন। এমনকি, কিছু কিছু শব্দ আছে যা শুনতে আপাতঅশালীন মনে হলেও আবিদ আনোয়ারের কবিতায় প্রযুক্ত হবার পর মনে হয় ওই বাক্যে ওর চেয়ে বেশি দ্যোতনা আর কোনও শব্দ দিয়ে সৃষ্টি করা যেত না। তাঁর কবিতা থেকে একটি উদাহরণ দিই : ‘বিষ্টি শ্যাষ/ অহনও হাওয়ার তোড়ে দানবের তেজ/ য্যানো কোনো বেলেহাজ কামুক ইতর/ নারাজি ছেমড়ির মতো নাওডারে ঠেইল্লা নিবো জলিধান খেতের ভিতর।’ এই কবিতার যে প্রেক্ষাপট, সেখানে ঝড়ো-বাতাসকে গালি দিতে ক্ষিপ্ত গ্রাম্য মাঝির ভাষায় ‘কামুক ইতর’ এবং ‘নারাজি ছেমড়ি’ এই শব্দগুলো না-এলে চিত্রটাই তৈরি হতো না। তার ওপর ঝড়কে ‘কামুক ইতর’ এবং নৌকাকে ‘নারাজি ছেমড়ি’র উপমায় ব্যবহার করায় চিত্রকল্প হিসেবেও তা সার্থক হয়ে উঠেছে।
গানের কবিতার কথা বলতে-বলতে আবার তাঁর কবিতায় চলে এসেছি। প্রকৃত অর্থে আবিদ আনোয়ার কবি। তাই, গীত হবার জন্যে তাঁর যে লেখা সেটাও কবিতা হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। পার্থক্য শুধু এটুকুই, শব্দকে বাক্যে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যেন তা সুরারোপযোগ্যতা না-হারায়। আবিদ আনোয়ার সে-বিষয়েও অত্যন্ত সচেতন। তাই, আবিদ আনোয়ারের পর্যায়ের কবিবৃন্দ যত বেশি গানের কবিতা লিখবেন, আমাদের গান ততই ঐশ্বর্যশালী হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক



