আবিদ আনোয়ার : তাঁর কবিতা : শামসুর রাহমান

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
যতদূর মনে পড়ে, আবিদ আনোয়ার-এর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় আমার কর্মস্থলে। সম্ভবত আশির দশকের গোড়ার দিকে। তখন তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না আমার। এখানকার একটা বহুল প্রচলিত দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর ‘কবি’ নামের কবিতাটি পড়েছিলাম। তাঁর অন্য কোনও লেখাই পড়িনি তখনও। ‘কবি’ আমার ভালো লেগেছিল। এ-কথা তাঁকে জানাই প্রথম আলাপেই। ‘কবি’ একটা ভালো কবিতা, আবিদ আনোয়ার জানতেন। সেই কবিতায় গ্রামীণ সংস্কারের কথা ছিল, কবির ভেতর-মহলের কথা ছিল, একজন মায়ের ব্যাকুলতা ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল একজন যুবকের কবিত্বশক্তি। ‘কবি’র কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করি―
“এদিকে, দরগার চেয়ে আরো বেশি রহস্যখচিত পরীর কাঁকালে
ছেলে তার ঘোরে-ফেরে: ঘুমে নয়, স্বপ্নে নয়, নেহাত সকালে
দেখে সূর্য ভেঙে খান খান―কেঁপে ওঠে গোপন সন্ত্রাসে,
কখনো নিজেরই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসে।
নরকের ফেরেস্তার মতো গনগনে বয়লার ঘেঁটে
তুলে আনে আগুনের ফুল, নাকি তারই আত্মাটা কেটে
মুক্তোর দানার মতো উলুবনে ছড়াবার দায়িত্ব নিয়েছে সে!
এ তার কাণ্ড দেখে বড়জোর হে হে
ক’রে হাসে কিছু বুদ্ধিমান প্রাণী, ভণ্ড আলোচক
টীকা ও টিপ্পনি কাটে: ‘এ যে দেখি হংসপালে বক
যথা গুণবান কবি,
চাঁড়ালের বাচ্চা হয়ে এ-ও দেখি হতে চায় শাশ্বতের নবী….’
কখনো ঘুণের মতো কাটে তার শব্দাবলি নিজেরই অহং;
প্রায়শ আকাশ ফুঁ’ড়ে দাঁতহীন ভেংচি কাটে ময়াজ স্বয়ং!”
আবিদ আনোয়ার শুধু একজন কবি নন। জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও তিনি এক কৃতী পুরুষ। রসায়নশাস্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি হাসিল করেছেন। মৃত্তিকা গবেষণার ক্ষেত্রে মাটি চেনার সহজ উপায় উদ্ভাবনের জন্যে রাষ্ট্রপতির পদক পেয়েছেন। তিনি শুধু মাটি ভালো চেনেনই না, দেশের মাটি ও মানুষকে খুব ভালোও বাসেন। সাংবাদিকতাবিষয়ক গবেষণা ও একাডেমিক কৃতিত্বের জন্যে যুক্তরােেষ্ট্রর জাতীয় সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞ সমিতির সম্মানসূচক সদস্যপদও পেয়েছেন তিনি। আবিদ আনোয়ার সম্পর্কে মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মন্টেগোমারি লিখেছেন: ‘উন্নয়নবিষয়ক সাংবাদিকতায় তাঁর দক্ষতা এমন এক পর্যায়ের…যার জুড়ি ইউরোপ-আমেরিকায়ও মেলা ভার।’ এ বড় কম প্রশংসা নয়।
সর্বোপরি, আবিদ আনোয়ার একজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি একাত্তরে বিহারের চাকুলিয়াস্থ বিশেষ কমান্ডো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে পর্যায়ক্রমে প্লাটুন কমান্ডার, কোম্পানি কমান্ডার ও ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের এককালীন অধিনায়ক ছিলেন; নেতৃত্ব দেন ধুলদিয়া রেলসেতু অপারেশনে।
বিনয়ী, নিষ্ঠাবান এই মেধাবী শিল্পী মানুষটি নিজের বিষয়ে খুব কম কথা খরচ করেন। বেশি বলেন কবিতা সম্পর্কে, বিভিন্ন কবির সাফল্য এবং বৈফল্য বিষয়ে। তাঁর কথায় কোনও ফাঁকি নেই, ভান নেই। স্পষ্ট তাঁর উচ্চারণ, অথচ ধৃষ্ট নয়। যা বলেন তাতে রুচি এবং মাত্রাজ্ঞান থাকে। অশালীন কোনও বাক্য তাঁকে উচ্চারণ করতে শুনিনি কখনও। শিল্পীর অহঙ্কার তাঁর আছে বটে, তবে অহমিকার ভার বইতে তিনি নারাজ।
সাহিত্যবহির্ভূত ক্ষেত্রে আবিদ আনোয়ার-এর কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়া, তিনি গীতরচনা এবং ছড়া লেখায় খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু, তিনি আমার কাছে একজন কবি হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ। কাব্যক্ষেত্রে সত্তরের দশকে আবিদ আনোয়ার-এর পদার্পণ। ইতিমধ্যে তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রতিবিম্বের মমি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কবিতার বই মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমা মুদ্রিত হয়েছে ১৯৯২ সালে। কবিতা লেখা ছাড়া কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধও লেখেন তিনি। তাঁর প্রকাশিতব্য প্রবন্ধের বইয়ের নাম বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন: বিবর্তনের ধারা। এ-কথা এখানে উল্লেখ করলাম এজন্য যে, আবিদ আনোয়ার-এর সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ আমার ভালো লাগে।
যা হোক, আবিদ আনোয়ার-এর প্রথম কাব্যগন্থ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলা যায়, কাব্যরসিকদের নজর কাড়ে। তাই আমরা দেখি হুমায়ুন আজাদ-এর মতো মেধাবী কবি-সমালোচক এই কবি বিষয়ে বলছেন :
‘আবিদ [আনোয়ার] কবিতার শুদ্ধতায় বিশ্বাসী, যেমন বিশ্বাসী প্রতীকী কবিরা….তাঁর কবিতা দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার জন্যে দরকার অভিনিবেশী পাঠক সম্প্রদায় যারা চিন্তার সূত্র অনুসরণে সক্ষম, চিত্রকল্পের শোভা ও ব্যঞ্জনা অনুধাবনে সমর্থ….ব্যাপক জীবন এসেছে কিছু কবিতার আধেয় হিসেবে….এগুলো যে রচিত হতে পেরেছে….লোককবিতার বর্তমান কালে….সে-জন্যই উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলো।’
কেউ-কেউ তাঁর কবিতায় ভাস্কর্যধর্মী চিত্রকল্পও শনাক্ত করেছেন। হ্যাঁ, আবিদ আনোয়ার চিত্রকল্প সৃষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে তাঁকে এজরা পাউন্ড-এর অনুসারী বলে মনে হয়। কারণ পাউন্ড-ই তো বলেছেন, একটি সার্থক চিত্রকল্প শত পৃষ্ঠার বর্ণনার চেয়ে বেশি বাক্সময় এবং মূল্যবান। আবিদ আনোয়ার চিত্রকল্পকে প্রাধান্য দেন বলে তাঁর কবিতা মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। এটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। অনেকে যা দেখতে পারে না, দেখেও দেখে না, তা কবি দেখে নেন অবলোকনের গুণে; উদাসীন, অন্যমনস্ক দর্শককে দেখিয়ে দেন চিত্রকল্পের শোভা সৃষ্টি। কবির ‘দেখা’ বিষয়ে আবিদ আনোয়ার অবলোকনের মাত্রা কবিতায় লিখেছেন―
আমার চোখের মতো অন্য কোনো যাদুকর নেই,
তাকালেই
অন্ধকারও মেলে ধরে অন্তর্গত মহিমার লাল,
নিমেষে ঘড়ির কাঁটা স্তব্ধ হয়, তখন ত্রিকাল
এসে অবলীলাক্রমে ঢুকে পড়ে কালের ভেতরে;
অবলুপ্ত হয়ে পড়ে
তাবৎ সনাক্তচিহ্ন প্রাণী ও জড়ের,
সুন্দরী নারীর সাথে মাদী কুকুরের
বস্তুতই আর কোনো পার্থক্য থাকে না;
শিবির দাপিয়ে-ফেরা কোনো কোনো জাঁহাবাজ সেনা
সহসা শুয়োর হয়ে নেমে-পড়ে ক্ষমতার সমূহ কাদায়,
ঊরুর বন্ধন ছিঁড়ে ঘরের গৃহিনী ডাইনী হয়ে উড়ে চলে যায়!
একবার ভালো করে তাকালেই হলো:
ইমনকল্যাণ গেয়ে শুদ্ধপায়ে হেঁটে যায় নুলো;
অনায়াসে দেখে ফেলি রহস্যের ভেতরমহল,
পথের কংক্রিট ফুঁড়ে মাঝেমাঝে ছলকে ওঠে অলৌকিক জল…
এমন যে অন্তর্ভেদী চোখের মালিক সে-ও দেখতে পারি না
আমার অক্ষরগুলো মহাকাল ঠিকমত জমা করে কি না!
যে-কবি লিখতে পারেন ‘আমার চোখের মতো অন্য কোনো যাদুকর নেই’, তাঁর পক্ষেই লেখা সহজ মরা জোছনায় মধুন্দ্রিমার মতো কবিতার বই। এই কাব্যগ্রন্থের কোনও কোনও কবিতায় আবিদ আনোয়ার-এর প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার কিছু ছবি ফুটে উঠেছে; এর সমান্তরালে কবি ‘অজবাঙলার সুপুরিবাগান’, ‘পলাশডাঙার মানিকের ছোটবোন’, ‘জগমোহনের পুকুরের ঘাট’-এর কথা বলেছেন উল্লেখযোগ্যভাবে। জীবনের কাছে হেরে-যাওয়া, বহুকাল ধরে উদ্বাস্তু-উন্মূল ‘ফেলু মিয়ার পরাবাস্তব’ সম্পর্কে যেমন লিখেছেন তিনি, তেমনি লিখেছেন বীর শহীদ নূর হোসেনের ভাস্কর্য বিষয়ে, যা রচিত কবিমনে। শহিদ নূর হোসেন আবিদ আনোয়ার-এর কাছে হয়ে ওঠেন যুগপৎ ভাস্কর এবং ভাস্কর্য। কবি উচ্চারণ করেন : ‘তোমার তুলনা কোনো যাদুঘরে নেই/ তুমি বাঙালির অমর ভাস্কর নাকি ভাস্কর্য নিজেই!’ মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমার অধিকাংশ কবিতাই ভালো। তবু বিশেষ উল্লেখযোগ্য মনে করি: একটি ঝরাপাতার দর্প; বসবাস; মরা জোছনায় স্বপ্নপুরাণ; ঘুঘু; জনৈক মাকড়ের কাছে প্রার্থনা; কবির প্রতিকৃতি; এবং কিশোরী, তোমার ভালোবাসা। বিজ্ঞানমনস্ক, স্বপ্নময় কবির নতুন কবিতার বই কবে প্রকাশিত হবে ?
ভোরের কাগজ, ৩ ডিসেম্বর ১৯৯৩



