প্রতিবিম্বের মমি : রফিকউল্লাহ খান

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
চেতনার সংরক্ত উজ্জীবন ও কিছুসংখ্যক সামরিক শব্দসহযোগে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কবিতার যে আবেগোচ্ছল জীবন-চঞ্চল অভিযাত্রা, যুদ্ধোত্তর সময়ের বহুমাত্রিক সংকট ও ভাঙ্গাগড়ায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তার গতি মন্থর হয়ে পড়ে। তরুণ কবিবর্গের কাছে বিষয়ের চেয়ে প্রকরণের সমস্যাই অধিকতর প্রকট হয়ে দেখা দেয়। আবিদ আনোয়ারের প্রতিবিম্বের মমি কাব্যগ্রন্থটির সামগ্রিক চরিত্র উপর্যুক্ত পর্যালোচনা সূত্রেই বিবেচ্য। একজন কবির সাধনা ও সিদ্ধির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে একটি কাব্যগ্রন্থই বোধ করি যথেষ্ট। কেননা, কবিতার ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।
গ্রন্থে বিন্যস্ত চুয়াল্লিশটি কবিতায় আবিদ আনোয়ার যে শব্দ-প্রতিবিম্ব নির্মাণ করেছেন, তা সমকালবিধৃত হলেও অঙ্গীকার ও নির্মিতির প্রশ্নে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ত্রিমাত্রিক ধারায় বিস্তৃত। কবির সমকাল-সচেতনতা জীবনের গভীর মূলস্পর্শী বলেই তা একাধারে দর্শন, মনস্তত্ত্ব, শিল্পকলা, নৃতত্ত্ব ও ঐতিহ্য-পরিস্রুত হয়েও সর্বাংশে কবিতা হয়ে উঠেছে। সমকালীন তরুণ কবিদের আবেগ-উত্তাল শব্দবিস্তারের ফেনায়িত লীলা-চাঞ্চল্য তাঁর আরাধ্য নয়। আবেগ ও মননের সমন্বিত পরিচর্যায় তিনি কবিতার শরীরকে পরিণত করেন ভাস্কর্যসুলভ নিপুণ শিল্পকর্মে। সে-কারণে আবিদ আনোয়ারের অধিকাংশ কবিতাই গভীর অভিনিবেশ-প্রত্যাশী। আবেগতাড়িত শব্দবিন্যাসের পরিবর্তে তিনি স্পর্শ করেন মননের গভীর প্রদেশ। জগৎ, জীবন ও শিল্পের বিচিত্র জটিল ঘূর্ণাবর্তে আন্দোলিত স্পন্দিত কবি-মন পরিণামে স্বীয় অভীপ্সা ও অন্বেষাকেই করে তোলে শব্দময়, ব্যঞ্জনাময়―যা তাঁর কবিতার চারিত্র্যকে সমকালীন তরুণ কবিদের কাব্যচর্চার ধারায় স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। কবিতায় বিধৃত সময় যে কেবল সমকাল-উৎসারিত নয়, আবিদ আনোয়ারের কবিতায় তার প্রচুর আন্তঃসাক্ষ্য বিদ্যমান। সময়-সংকটের বিশ্বব্যাপ্ত অভিঘাত তাঁর একাধিক কবিতাকে করেছে যন্ত্রণাকম্পিত ও উদ্বেগময়। কিন্তু এই সংকটাপন্ন সময়ের অনিবার্য আর্তি ও যন্ত্রণা থেকে আত্মমুক্তিই কবির অন্বিষ্ট। জীবন-সংক্রান্ত উপলব্ধির এই মীমাংসিত উন্মোচনই তাঁর কবিতার ইতিবাচক ও গৌরবোজ্জ্বল প্রান্ত, যেমন―
১.
আমিও তেমনি যেন কালের কয়েদী, গায়ে তবু জীবনের জামা,
স্বপ্নখেকো সময়ের বীভৎস থাবার পাশে
অবাক জ্বালিয়ে রাখি ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা।
২.
পার থেকে দূরে ছিটকে পড়েছি, প্রলয়-তাড়িত, তবু
নিমজ্জমান জাহাজের জেদী নাবিকের মতো আমি
কম্পাস হাতে ঝুলে আছি মাস্তুলে।
ইতিবাচক প্রত্যাশা ও আলোকিত উত্তরণ কবির আরাধ্য হলেও তিনি সমষ্টিগত জীবনের মধ্যে শৈল্পিক মুক্তি সন্ধান করেন না, যদিও সমকালীন ব্যক্তিচিত্তের সমগ্রতা সমষ্টির দর্পণেই প্রতিবিম্বিত। সময়বাহিত জরা, সংস্কার-কবলিত জীবন ও মানুষ, অহং-অন্তর্গত ক্ষত, দুঃসময় ও দুঃস্বপ্নজর্জরিত ব্যক্তি-অস্তিত্ব এবং সর্বোপরি উত্তরণের জন্য আকুলতা আবিদ আনোয়ারের মনোভঙ্গির বিশিষ্টতাসূচক প্রান্ত সত্যি, কিন্তু বিষয় আহরণের ক্ষেত্রে তাঁর অভিনিবেশ উল্লিখিত শব্দগুচ্ছেই সীমায়িত নয়। ‘অন্তর্গত বাঁচার আবেগে’ ‘দুর্ঘটনা-কবলিত পেশীর নিয়মে’ তিনি যেমন সুস্থতার দিগন্ত আবিষ্কার করেন বন্ধনমুক্ত প্রমিথিউসের আলোকদর্পণে (‘কবলিত মানচিত্রে’), তেমনি কবির অন্বেষা উত্তরাধিকারবোধের ঔজ্জ্বল্যে হয়ে ওঠে বিজ্ঞানমনস্ক ও জীবন-সন্ধানী (‘উত্তরপুরুষ’)। ঐতিহ্যিক সংস্কারকে জৈবনিক বিশ্বাসের মতো লালন করার ফলে আবিদ আনোয়ারের অন্তর্গত ‘কবি’ স্বতন্ত্র প্রান্তে উপনীত। কবিতা ও ফ্যান্টাসির আশ্চর্য সম্মিলন সত্ত্বেও তাঁর ‘কবি’ কবিতাটি নিজ আন্তঃস্বরূপ ও শিল্প-অন্বেষার বৈশিষ্ট্য নির্দেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

‘হরিপদ’র দিনরাত্রি’ জাগতিক নিয়তিতাড়িত মানুষের অস্তিত্ব সংকটের যথার্থ শব্দরূপ। ‘কানাবক উপাখ্যান’-এ নাগরিক জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা অধিবাস্তব চেতনায় রহস্যময় আলো-ছায়ায় যেমন স্পন্দিত হয়ে উঠেছে, তেমনি কবি আত্মবোধের একাকিত্বে ও সাহসিকতায় উপনীত হয়েছেন ‘দীপিত সূর্যের’ উদ্ভাসিত দিগন্তে―
৩.
ইদানীং মাঝেমাঝে আমার ভেতরে টের পাই
মুমূর্ষু মায়ের পাশে জেগে-থাকা ছেলেদের মতো
কে যেন প্রার্থনা করে: হে ঈশ্বর!
তুমি এই নির্বাপিত চোখের কোঠরে
দীপিত সূর্যের মতো মণি জ্বেলে দাও….
পরাবাস্তব শিল্পচেতনা কবিতার এক বহুচর্চিত প্রক্রিয়া হলেও আবিদ আনোয়ার তার মধ্যে নতুনত্ব সঞ্চারে সচেষ্ট, যেমন ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘তুমি’, ‘ঐশ্বরিক’ প্রভৃতি কবিতায়। ধর্মীয় বিশ্বাস বা সংস্কারের সাথে পরাবাস্তবতার সম্মিলনে তাঁর কবিতা একটা নিরীক্ষার প্রান্তকে স্পর্শ করে যায়। কয়েকটি দৃষ্টান্ত :
৪.
আমাদের রোঁয়া-ওঠা শতাব্দীর মতো
কে এক ক্ষয়রোগী সেই জোছনার ভেতরে হাঁটছেন
যেন ইচ্ছেমতো চাঁদের মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে
বোররাক নিয়ে নেমে এসেছেন তিনি….
৫.
এবং সে আয়নায় দেখে রুপোর হাতুড়ি,
সোনার পেরেক হাতে ছোটখাটো আরেক ঈশ্বর!
প্রকরণগত দিক থেকে আবিদ আনোয়ার বিষয়ের মতোই বৈচিত্র্য-সন্ধানী। ‘একটি হুঁকোর গল্প’ ও ‘ঠাকুরের বসুন্ধরা এখন’ কবিতায় সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতার প্রকরণের অনুস্মৃতি লক্ষণীয়। এই আঙ্গিক নিরীক্ষা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়নি আমার কাছে, যদিও ‘একটি হুঁকোর গল্প’ কবিতার প্রতীকী উচ্চারণ সময়তাড়িত জীবনের উত্তরাধিকার ও অবক্ষয়ের জীবাণুবাহিত চেতনার উদ্ঘাটনে বিশিষ্ট।
ছন্দবিন্যাসের ক্ষেত্রে অক্ষরবৃত্ত তাঁর মৌল অন্বিষ্ট হলেও স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবিতা রচনায়ও তাঁর সার্থকতা একাধিক কবিতায় সুস্পষ্ট। মূলত উপমা, রূপক বা চিত্রকল্প নির্মাণে তাঁর অভিনিবেশ একটা স্বতন্ত্র কাব্যবিন্যাস প্রক্রিয়ার দ্যোতক। কয়েকটি উদাহরণ―
৬.
স্বপ্নখেকো সময়ের বীভৎস থাবার পাশে
অবাক জ¦ালিয়ে রাখি ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা।
(কবলিত মানচিত্রে)
৭.
তরল হীরের নদী, সোনারঙ নৌকো দোলে দূরে
(হরিপদ’র দিনরাত্রি)
৮.
যখনই চৈতন্য ধরে নাড়া দাও তুমি
টুপটাপ ঝরে পড়ে সোনার বরই;
দরিদ্র বোধিবৃক্ষের কালো পাতার আড়ালে
খেলে ওঠে লক্ষ লক্ষ জাগর জোনাকি
(কল্লোলের দিকে)
৯.
জলজ শিল্পের মতো নাকে-জমা ঘামের মহিমা
(খণ্ডাংশের মালিকানা)
যদিও আবিদ আনোয়ারের কাব্যসাধনার এখন সূচনালগ্ন, তবু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিতার ধারায় তাঁর স্বাতন্ত্র্য সুচিহ্নিত এবং তাঁর আগামী সম্ভাবনার দিগন্তও ইঙ্গিতময় এবং আলোকোজ্জ্বল। যদিও কবি উপলব্ধি করেন সুন্দর নির্বাসিত জীবন থেকে (‘কল্লোলের দিকে’), তবু তিনি আকৃষ্ট সমগ্রের প্রতি (খণ্ডাংশের মালিকানা)―যে সমগ্রতা স্পর্শাতীত, অথচ তার আহরণ প্রয়াসই মানবীয় শিল্প-অন্বেষার আবহমান অনুষঙ্গ।
সাপ্তাহিক স্বদেশ, ১৬ মে ১৯৮৫



