কবি আবিদ আনোয়ার : স্বজ্ঞা ও প্রজ্ঞা : তপন বাগচী

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
আজকাল নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে কত কবি-সাহিত্যিক কত কিছুই-না করে থাকেন কিন্তু আমরা দেখেছি আবিদ আনোয়ার নিজেকে প্রায় লুকিয়ে রেখে আপনমনে কেবল তাঁর সৃষ্টিকর্মেই নিমগ্ন থেকেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মোপলক্ষে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন ঢাকার বাইরে, আর উচ্চশিক্ষার জন্য কিছুকাল যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে, আত্মপ্রচারের কোনও চ্যানেলকেই তিনি ব্যবহার করতে পারেননি বা শেখেননি। কিন্তু তাতে কিছু যায়-আসেনি। আমাদের সাহিত্যজগতের ‘দিকপাল’ বলে পরিচিত নমস্য গুরুজন থেকে আজকের দিনের মেধাবী তরুণ কারও নজর এড়ায়নি আবিদ আনোয়ার-এর রচনাকর্মের উৎকর্ষ। তাঁরা যথাসময়েই আবিদ আনোয়ার-এর রচনাকর্মের মূল্যায়ন করেছেন।
যে হুমায়ুন আজাদকে সবাই জানেন একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে―যিনি কাউকেই তেমন গুরুত্ব দিতেন না―সেই তাঁকেই যখন দেখি আবিদ আনোয়ার-এর সাহিত্যকর্ম নিয়ে মিডিয়ায় সোচ্চার হতে (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২১ মার্চ ১৯৯৭; কালাকাল, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮) কিংবা ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রাজ্ঞজন তাঁর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে যখন বলেন, ‘কিছুদিন আগে সুনীলের টেবিলে আমি আবিদ আনোয়ার-এর একটি কবিতার বই পড়লাম; প’ড়ে খুবই মুগ্ধ হলাম’ (মানবজমিন, ২০ মার্চ, ১৯৯৮), তখন আবিদ আনোয়ার-এর রচনাকর্মের মান নিয়ে আমাদের আর দ্বিধা-সংশয় থাকার কারণ থাকে না। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার কর্ণধার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর একান্ত আগ্রহে ‘আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল, যেখানে আমি নিজেও ছিলাম একজন আলোচক। সেই সেমিনারে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সভাপতির ভাষণে বলেন: ‘বড় কবিদের কবিতা পড়লে আমরা তাঁদের একটা নিজস্ব জগতে প্রবেশ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা জীবনানন্দ দাশ প্রত্যেকের রয়েছে নিজ নিজ কাব্যজগৎ। আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা বিষয়ে সবচেয়ে বড় কথা: তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে আমাদেরকে একটা নতুন জগৎ উপহার দিতে পেরেছেন।’ আরও এক-ধাপ এগিয়ে-গিয়ে স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রবীণ সাহিত্যিক ও প্রখ্যাত গান রচয়িতা মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান লিখেছেন, ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন আবিদ আনোয়ার।’
পরবর্তী প্রজন্মের কবি-সমালোচকগণও আবিদ আনোয়ার-এর রচনাকর্মের উৎকর্ষকে চিনতে ভুল করেননি। আবিদ আনোয়ার-সম্পর্কিত আলোচনা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। কবিতাবিষয়ক এমন সব বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধও রয়েছে তাঁর যেগুলো প্রচলিত অধ্যাপকসুলভ আলোচনার বাইরে গিয়ে নতুন ভাবনার উদ্রেক করে। এই মৌলিকত্বের জন্য দুই বাংলার সাহিত্যের অধ্যাপক থেকে নবীন কবিতাকর্মী সবার কাছেই নন্দিত তাঁর বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন, চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য, বরেণ্য কবিদের নির্মাণকলা বইগুলো এবং অতি অবশ্যই তাঁর ছন্দের সহজপাঠ যাতে ব্যবহৃত হয়েছে সহজে ছন্দ শেখার জন্য ‘থুতনি পদ্ধতি’ নামের এক মজার কৌশল যা বাংলা ছন্দশাস্ত্রে এক নতুন সংযোজন। ছন্দ শিখতে প্রথমেই জানতে হয় কোনও শব্দে কয়টা সিলেবল আছে বাংলায় যাকে অক্ষর বা দল বলা হয়। তিনি তাঁর ‘থুতনি পদ্ধতি’তে দেখিয়েছেন: হাতের তালুতে থুতনি-রেখে একটা শব্দ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলে যতবার হাতের তালুতে চাপ-পড়ে শব্দটিতে ততটা সিলেবল আছে। এই পদ্ধতি বহুকাল-ধরে ‘চিন মেথড’ নামে ইংরেজি ছন্দশাস্ত্রে প্রচলিত কিন্ত আবিদ আনোয়ারের আগে আমাদের ছান্দসিকদের কেউ এ-বিষয়ে কিছুই লিখেননি। মনে পড়ে ছন্দশিক্ষার এই নতুন পদ্ধতির প্রবর্তনা ও বইটির প্রতি পাঠকসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মোহিত কামাল তাঁর শব্দঘর পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় নোট লিখেছিলেন। একেই সচেতন সাহিত্যসেবী সম্পাদকদের দায়িত্ব বলে মনে করি। এর পর শব্দঘর জুলাই ২০১৯ সংখ্যায় আমাকে দিয়ে বইটির একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখিয়েছেন। সে-সংখ্যায় কবি আবিদ আনোয়ারকে দিয়ে লিখিয়েছেন ছন্দবিষয়ক প্রচ্ছদ রচনা। মনে পড়ছে একই সংখ্যায় প্রকাশিত পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় আবদুল হালিম বাচ্চু লিখেছিলেন: ছন্দশিক্ষার জন্য এটি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বই। আরেকজন (নাম মনে নাই) লিখেছিলেন: অনেক বই প’ড়ে গত ২৫ বছরে যা শিখতে পারিনি, এই বইটি প’ড়ে তা শিখে ফেলেছি।
এসব সম্ভব হয়েছে একটি কারণে। আবিদ আনোয়ার অত্যন্ত সহজ ভাষায় অনেক কঠিন বিষয়কেও বুঝাতে পারেন। কারণ তিনি কবি হিসেবে যেমন, প্রাবন্ধিক হিসেবেও তেমনি সৃজনীচিন্তার অধিকারী। কোনও বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার সময় তাঁর কবিসত্তার সঙ্গে বিজ্ঞানীসত্তার সংযোগ ঘটে। একই সঙ্গে মননশীলতা ও সৃজনশীলতার চর্চা করেন বলেই তাঁর কবিতা বোদ্ধাজনের কাছে প্রিয় হয়, আবার তাঁর প্রবন্ধ সাধারণ পাঠকের কাছে গ্রাহ্য হয়। আমি লক্ষ করেছি, আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে যে যত বেশি ওয়াকিবহাল, তার প্রবন্ধ তত বেশি প্রাঞ্জল। আবিদ আনোয়ার নিজে প্রকৃত কবি বলেই কবিতার জটিল বিষয়গুলো নিয়ে এমন প্রাঞ্জল ভাষায় লিখতে পারেন। কবিতার আধুনিকায়ন নিয়ে এত বিশদ ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা তাঁর চেয়ে অন্য কেউ আর করেননি এ দেশে। অনেকের কবিতাবিষক আলোচনা পড়তে-গিয়ে মনে হয় কবিতার চেয়ে আলোচনাই কঠিন হয়ে পড়ে। সকল সীমাবদ্ধতা থেকে রেহাই পাওয়া যায় আবিদ আনোয়ারের আলোচনার মধ্যে ঢুকে পড়লে। আধুনিক কবিতার স্বরূপ চিহ্নিত করতে গিয়ে আমাদের প্রাবন্ধিকগণ বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কিছু বিষয়বস্তুগত সূচকের ওপর, যেমন বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের মূল্যবোধের অবক্ষয়, কলুষতা, বিনষ্টি ও বিমানবিকীকরণ। অথচ কবিতার মূল শক্তি নিহিত থাকে এর নির্মাণকলায়। তাই, আধুনিক কবিতায় নির্মাণকলার ক্ষেত্রে কী বিবর্তন ঘটেছে আবিদ আনোয়ার তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তাঁর বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন বইতে। এটি আমাদের সাহিত্যে তাঁর মৌলিক কাজের একটি। সাহিত্যিক শওকত ওসমান তাঁর পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, ‘অতি সাম্প্রতিক একটি আকস্মিকতা আমাকে বুঁদ করে রেখেছিল… [আবিদ আনোয়ার] নিজে কবি এবং কবিতা সম্পর্কে প্রচণ্ড উৎসাহী―যুগপৎ স্রষ্টা এবং নিজ সৃষ্টির সমালোচক…এমন একটি গ্রন্থের আবির্ভাব (হ্যাঁ, আবির্ভাবই বলব) সত্যিই অভাবনীয় বৈ কী!… বিশ্বাসে মিলায় হরি’র দেশ থেকে অনেক দূর অগ্রসর (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৪ এপ্রিল, ১৯৯৭)।’ প্রবীণ সাহিত্যিক ও গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান লিখেছেন : ‘তাঁর [আবিদ আনোয়ারের] বাঙলা কবিতার আধুুনিকায়ন বইটি যারা পড়েননি তারা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত আছেন।’ (বহুমুখী আবিদ আনোয়ার, সম্পাদক তপন বাগচী, আগামী প্রকাশনী, ২০২১)। হুমায়ুন আজাদের মতো কট্টর সমালোচক আবিদ আনোয়ারের এই কাজটি নিয়ে লিখেছেন : ‘আবিদ অত্যন্ত চমৎকারভাবে আমাদের কবিতার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২১ মার্চ, ১৯৯৭)। অথচ মজার বিষয়: অনেক আলোচনায় আবিদ আনোয়ার নিজে হুমায়ুন আজাদ-এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। হুমায়ুন আজাদ তাঁর অর্থবিজ্ঞান বইতে পাঠকের সঙ্গে লেখকের যে-প্রক্রিয়ায় মানস-যোগাযোগ ঘটে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একটি প্রাচীন মডেল ব্যবহার করেছেন; আবিদ আনোয়ার একটি আধুনিক মডেল উপস্থাপন করে এই প্রক্রিয়ার পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছেন। হুমায়ুন আজাদের জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে এমন কঠোর আলোচনার সাহস কারও ছিল না বলেই জানি। আবিদ আনোয়ার-এর বরেণ্য কবিদের নির্মাণকলা নামের আরেকটি বইয়ের শিরোনামই সাক্ষ্য দেয় তাঁর আলোচনা কতটা বিশ্লেষণাত্মক, কবিতার কতটা গভীরে প্রবেশ করেন তিনি।
বহুকাল ধরে বাংলা ভাষায় জাপানি ক্ষুদ্র কবিতা হাইকু রচনা করেছেন অনেকেই যে যার মতো করে; মূল জাপানি হাইকু-তে ৫-৭-৫ মাত্রার পঙ্ক্তিবিন্যাসের কথা সবাই মুখে-মুখে বললেও কেউ তাদের কোনও রচনায় এর প্রয়োগ দেখাতে পারেননি। আবিদ আনোয়ারই প্রথম এই প্রাকরণিক শুদ্ধতা রক্ষা-করে বাংলায় হাইকু লিখেছেন এবং ইংরেজি ও বাংলায় লেখা বহু নিবন্ধে ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ক’রে প্রথমবারের মতো অন্যদের শিখিয়েছেন যে, বাংলা ছন্দে ৫ ও ৭ মাত্রার পর্বের অস্তিত্ব আছে কেবল মাত্রাবৃত্ত ছন্দে; তাই, অন্য ছন্দে প্রকরণসিদ্ধ হাইকু লেখা সম্ভব নয়। এতে তিন-পঙ্ক্তির ধ্বনিমাধুর্য মার খায়। তাঁর প্রকরণসিদ্ধ বাংলা হাইকু: বিলম্বিত অভিযাত্রা নামের বইতে এবং চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য বইয়ের একটি ধ্বনিতাত্ত্বিক নিবন্ধে এ-বিষয়ে বিস্তারিত তত্ত্ব ও তথ্য রয়েছে।
এর সবকিছু সম্ভব হয়েছে তিনি একজন বড় মাপের কবি বলেই। তাই, তাঁর কবিতার আলোচনায় মন দিতে চাই: আবিদ আনোয়ার কবিতার ধ্রুপদী ভাস্কর। শব্দ-দিয়ে নির্মাণ করেন চেতনা-প্রসারী চিত্রকল্প যার অনেকগুলোকে মনে হয় স্পর্শযোগ্য ভাস্কর্য।
বিশ-শতকের সত্তর-দশকের প্রথম পাদেই তাঁর যাত্রা শুরু। আর শুরুতেই তিনি নজরে পড়েছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সম্পাদক এবং চল্লিশের প্রধান কবি আহসান হাবীবের। ভাগ্য তাঁর সুপ্রসন্ন। কিন্তু এই ভাগ্য তিনি অর্জন করেছিলেন যোগ্যতা দিয়ে, স্রেফ কবিতা ও কবিতাবিষয়ক আলোচনা দিয়েই। আহসান হাবীব তাঁর দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় তাঁকে দিয়ে ১৯৮১-৮২ সালে ‘মধ্যদিনের জানালা’ শীর্ষক একটি নিয়মিত সাহিত্য-কলামও লিখিয়েছেন। সত্তরের কবিকে আমরা গ্রন্থিত হতে দেখি মধ্য-আশিতে। তাতে পাঠক হিসেবে আমাদের লাভ এই যে, শীলিত এবং পরিণত কবিতা পাই প্রথম কাব্যগ্রন্থেই। প্রবেশলগ্নেই সৈয়দ আলী আহসান, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখ কবি-সমালোচক এই অনুজ কবিকে অভিনন্দন জানান প্রবন্ধ লিখে। রফিকউল্লাহ খান, শেখর ইমতিয়াজ প্রমুখ সমকালীন সমালোচকও তাঁর প্রথম গ্রন্থের সপ্রশংস আলোচনা লেখেন প্রথম সারির কাগজে। পরবর্র্তীকালে তাঁর কবিতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা লিখেছেন কবি শামসুর রাহমান, মুগ্ধতা প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ; অকুণ্ঠচিত্তে লিখেছেন কবি-সমালোচক মাহবুব সাদিক, কবি-সমালোচক অসীম সাহা, কবি-সাংবাদিক ও কথাশিল্পী আনিসুল হক এবং বর্তমান লেখক তপন বাগচী প্রমুখ।
নিজের কবিতা বিষয়ে আত্মসচেতন এই কবি নিজেই অনাগত কাল টিকে-থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তাঁর কবিতায় এভাবে―
‘কী হে, আমার জন্মসালের পরে আবার
প্রশ্নবোধক চিহ্ন কিসের ?
কালজ্ঞরা, ওসব দিয়ে বুঝাতে চাস কী ?
কবির শুধু জন্ম আছে, প্রজন্ম তো মর্ত্যকীটের;
ব্র্যাকেট দিয়ে আঁকবি তোরা আয়ুর পরিধি ?
… … …
চিহ্ন যদি দিবিই তবে শোন্:
ড্যাশের পরিবর্তে দিবি আগুনমুখো তীর,
(দেখেনি যা পাণ্ডবেরা কিংবা কোনো দ্রোণ)
তারপরে দে ইনফিনিটি… ইনফিনিটি… ∞
কাফন ফুঁ’ড়ে জন্ম নেবো বজ্র দধীচির!’
[আবিদ আনোয়ার (১৯৫০- ?), স্বৈরিণীর ঘরসংসার]‘আবিদ আনোয়ার (১৯৫০- ?)’ শিরোনামের এই একটিমাত্র কবিতা দিয়েও কবির ‘আয়ুর পরিধি’ মেপে নেয়া সম্ভবপর। এ তো তাঁর নিজের জন্মদিনের শুভেচ্ছাভাষণ নয়, যে কোনও কবির, ব্যাপক অর্থে শিল্পীর জন্মদিনের জন্য অতিপ্রযোজ্য বক্তব্য রয়েছে এখানে। শুধু কি জন্মের প্রসঙ্গ ? মৃত্যুর প্রসঙ্গও রয়েছে এ-কবিতায়। কবিরা অমৃতের সন্তান―এই প্রাচীন বাণীটিই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এই কবিতায়। কবি কি নিজের অজান্তেই তাঁর এপিটাফ লিখে গেলেন ? ‘কাফন’ শব্দে রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যবহার; পাণ্ডব, দ্রোণ ও দধীচি-তে হিন্দু পুরাণের প্রসঙ্গ। ঘটেছে দুই ঐতিহ্যের অপূর্ব সংশ্লেষণ। কালজ্ঞদের বিবেচনায় কবির জন্ম-মৃত্যুর হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ ক’রে এই কবি আসলে পুরাণবর্ণিত ত্রিকালজ্ঞ ঋষির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন! আবিদ আনোয়ার যে বড়মাপের কবি [এবং প্রকৃত অর্থেই আধুনিক ও নতুন কণ্ঠস্বরের কবি], এই একটি কবিতা পড়েও তা বুঝে নেওয়া যায়।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অকাল প্রয়াণের পর বাংলা একাডেমির আগ্রহে ও আনুকূল্যে রুদ্রকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তাঁর সময়ের অন্য কবিদের পাঠ করি। তা করতে গিয়ে দেখি আবিদ আনোয়ার ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। রুদ্র-গবেষণার জন্য লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরোনো সাময়িকী ও সাহিত্যপত্রের পৃষ্ঠা ঘাঁটতে গিয়ে দেখতে পাই চল্লিশের কবি-সমালোচক জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান আবিদ আনোয়ারের ‘প্রতিবিম্বের মমি’ সম্পর্কে লিখেছেন―
‘কবির কৌশল এখানেই সুস্পষ্ট যে, তিনি [আবিদ আনোয়ার] তাঁর বক্তব্যকে বিবিধ রূপকল্পের মাধ্যমে শাণিতভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন…যা পাঠকের চৈতন্যকে নাড়া দেয় এবং পাঠককে নতুনভাবে আকর্ষণ করে…অনেকগুলো কবিতা চিত্রকল্পের ব্যঞ্জনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে…যেন ক্যানভাসের আয়তনের মধ্যে সুসম্পন্ন কম্পোজিশন…’ [ইত্তেফাক সাময়িকী, ১০ মে, ১৯৮৫]।
কবিতা ও শিল্পবিচারে সৈয়দ আলী আহসান-এর দক্ষতাকে খাটো-করে দেখার উপায় নেই। তিনি যখন আবিদ আনোয়ারকে নিয়ে লিখেছেন, তখন এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। একজন পাঠক হিসেবে আবিদ আনোয়ারকে আমাদের পাঠ করার দায় তৈরি হয়। সেই দায়বোধ থেকেই দেখেছি, আবিদ আনোয়ারের কবিতা পড়লে সৈয়দ আলী আহসানের ভাষায় ‘সমগ্রতা’র স্বাদ পাওয়া যায়। বিচ্ছিন্ন দু-এক চরণে চটকদার চিত্র বা কল্পচিত্র বা কখনও চিত্রকল্পের দোলা দিয়ে তিনি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের অস্থায়ী চেষ্টা করেননি। তিনি স্বভাবতই পূর্ণাঙ্গ চিত্রকল্পের সন্ধান করেছেন। কবি-প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ারের রচনা পাঠ করে চিত্রকল্প চেনার কৌশল শিখেছি। সেই পথ-ধরে আমি প্রতিবিম্বের মমির পুনর্পাঠে কিছু পরাবাস্তব চিত্রকল্প আবিষ্কার করি, যা আবিদ আনোয়ারকে সত্তরের অন্য কবিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছে বলে অনুভব করি। দুটি চিত্রকল্পের উদাহরণ দেওয়া যায়―
‘সরসর গো-সাপের মতো স্বপ্নের কার্নিশ বেয়ে
নেমে-আসে হরর ফিল্মের কাটা হাত
এমনই বরাত
যদি গান ধরি গলা-খুলে
সে হাত আমার টুঁটি চেপে ধরে কঠিন আঙুলে।’
[হাত, প্রতিবিম্বের মমি]কিংবা কোনও এক জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে মৃদু তরঙ্গায়িত ঘিনঘিনে জলের এক এঁদোডোবার চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি লিখেছেন―
‘জ্বলজ্বলে এঁদোডোবা, কে ধোয় বিনষ্ট জলে চন্দ্রকান্ত মণি!
নাকি ভুল-যমুনার জলে সিনানে নেমেছে উলঙ্গ পরীর ঝাঁক
জরিদার ডানার ঝাপটে খিলখিল ভেঙে পড়ছিলো
বহুদিনকার স্পর্শরহিত জল…’
[নন্দনতত্ত্ব, প্রতিবিম্বের মমি]চাঁদের আলোয় এক এঁদোডোবা অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। বিপ্রতীপ উপাদানে সমৃদ্ধ পরাবাস্তব চিত্রবাহী এই পঙ্ক্তিগুচ্ছ জ্যোৎস্নার মতোই আমাদের বোধে সংক্রামিত হচ্ছে কবিতাশিল্পের এক অনিবার্য দ্যুতি ছড়িয়ে। পঞ্চাশের কবি-সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ এই কাব্য পাঠ করে কবি আবিদ আনোয়ারকে তাঁর ‘ভাষা ব্যবহার, উপমা-চিত্রকল্প রচনা, আঙ্গিক ও রূপরীতির বিন্যাসে স্বাতন্ত্র্যের সাধক’ মনে করেন [দৈনিক বাংলা, ১৭ মে, ১৯৮৫]। কবি-সমালোচক ড. হুমায়ন আজাদ আবিদ আনোয়ারের চিত্রকল্পময় কবিতাকে উচ্চমূল্য প্রদান ক’রে লিখেছেন―
‘আবিদ [আনোয়ার] কবিতার শুদ্ধতায় বিশ্বাসী, যেমন বিশ্বাসী প্রতীকী কবিরা…তাঁর কবিতার দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার জন্য দরকার অভিনিবেশী পাঠক সম্প্রদায় যারা চিন্তার সূত্র অনুসরণে সক্ষম, চিত্রকল্পের শোভা ও ব্যঞ্জনা অনুধাবনে সমর্থ….ব্যাপক জীবন এসেছে কিছু কবিতার আধেয় হিসেবে….এগুলো যে রচিত হতে পেরেছে লোক-কবিতার বর্তমান কালে সেজন্যই উল্লেখযোগ্য….’ [পুথি-পুস্তক, কালাকাল, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮; বহুমুখী আবিদ আনোয়ার, আগামী প্রকাশনী, ২০২১]
হুমায়ুন আজাদকে আমরা যারা চিনি, তারা ভালোভাবেই জানি যে, তিনি সহজে কারও সাহিত্যকীর্তিকে স্বীকার করতে চাইতেন না। শামসুর রাহমানকে নিয়ে তিনি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন। এটি তাঁর কৃতিত্ব ও ঔদার্যের পরিচয়। কিন্তু তিনি শামসুর রাহমানের সামাজিক অঙ্গীকারের কবিতাকে রাজনীতিস্পৃষ্ট মনে করে তাঁর শেষ-পর্যায়ের কবিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি। তবে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগের আলাপেও দেখেছি, হুমায়ুন আজাদ আমাদের আলোচ্য কবি আবিদ আনোয়ারের কবিতা এবং সমালোচনাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন। এমনকী তাঁর উপন্যাস পাক সার জমিন সাদ বাদ নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে সকল মহলে, যাঁর জন্যে তাঁর জীবন দিতে হলো, সেই উপন্যাস সম্পর্কেও তিনি আবিদ আনোয়ারের অভিমত জানতে চেয়েছেন। সত্তরের দশকের কবিদের মধ্যে তিনি আবিদ আনোয়ারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
আমরা দেখেছি যে, আবিদ আনোয়ার তাঁর প্রথম কাব্যে পরাবাস্তব চিত্রকল্পের চর্চা করেছেন বেশি পরিমাণে। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে এই প্রবণতা কম দেখা যায়। কিন্তু প্রথম কাব্যে তিনি যে-চিত্রকল্প উপহার দিয়েছেন তাতে বস্তুর তিনমাত্রার পাশাপাশি সময়-মাত্রা যুক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ভাস্কর্য নির্মিত হয়ে স্থায়ী আবেদন সৃষ্টি করে। এ-বিষয়ে সমালোচক রফিকউল্লাহ খানের বক্তব্যকেও এখানে উপস্থাপন করা যায়―
‘সমকালীন তরুণ কবিদের আবেগ-উত্তাল শব্দবিস্তারের ফেনায়িত লীলা-চাঞ্চল্য তাঁর [আবিদ আনোয়ার-এর] আরাধ্য নয়। আবেগ ও মননের সমন্বিত পরিচর্যায় তিনি কবিতার শরীরকে পরিণত করেন ভাস্কর্যসুলভ নিপুণ শিল্পকর্মে। সে-কারণে আবিদ আনোয়ারের অধিকাংশ কবিতাই গভীর অভিনিবেশ প্রত্যাশী…কবির সমকাল-সচেতনতা জীবনের গভীর মূলস্পর্শী…’ [সাপ্তাহিক স্বদেশ, ১৬ মে, ১৯৮৫]
তাঁর দ্বিতীয় কাব্য মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমায় (১৯৯২) আবিদ নিজেকে আরেকটু ঝালিয়ে নিয়েছেন। ‘একটি ঝরাপাতার দর্প’ নামের কবিতায় দুটি ভাস্কর্যধর্মী চিত্রকল্প দিয়ে এ-কাব্যের শুরু। পার্কে-বসা মগ্ন চখাচখির মতো প্রেমিক-যুগলের আলিঙ্গনে বাঁধা-পড়ার মুহূর্তে তাদের কোলের কাছে একটি পাতার ঝরে-পড়া এবং বাংলা একাডেমি চত্বরে এক পুরস্কৃত কবিকে মাল্যদানের মুহূর্তে কবি ও মাল্যদাতার মাঝখানে ঝরে-পড়া আরেকটি পাতার দর্প নিয়ে চমৎকার চিত্রকল্প তৈরি করেছেন আবিদ আনোয়ার, যা ভাস্কর্যের মতো দেখাও যায়, ছোঁয়াও যায় যেন। ঝরাপাতার প্রতীকে কবি মানুষের প্রেমসহ জীবনের নানা অর্জন তথা জীবনের নশ্বরতার কথা বলতে চেয়েছেন। আরও অনেক সার্থক চিত্রকল্প রয়েছে এ-কাব্যে। জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ‘উপমাই কবিত্ব’। আমাদের কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমান বলেছেন ‘প্রতীক-চিত্রকল্পই কবিত্ব’। আরেকটু ঝেড়েকেশে ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছেন ‘চিত্রকল্পই কবিত্ব’ [এখন এটিই বৈশ্বিক স্লোগান]। শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদের সংজ্ঞার্থ মোতাবেক আবিদ আনোয়ারকে চিত্রকল্প নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য আমরা প্রকৃত কবির শিরোপা দিতে পারি। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি যে, তাঁর কবিতায় কোনও শিথিল চরণ নেই। মূল কথা বলার আগেই বাগ্বিস্তারের জলো আয়োজন নেই। অত্যন্ত পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় প্রতিটি কবিতায়। কখনও-কখনও তাঁর কবিতা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের চেয়ে গোটা কবিতা পাঠ করলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এই কাব্য সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমানের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য―
‘আবিদ আনোয়ারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাব্যরসিকদের নজর কাড়ে…আবিদ আনোয়ার চিত্রকল্পকে প্রাধান্য দেন বলে তাঁর কবিতা মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে…একটি সার্থক চিত্রকল্প শতপৃষ্ঠার বর্ণনার চেয়ে বেশি বাক্সময় ও মূল্যবান…অনেকে যা দেখতে পান না, দেখেও দেখেন না, কবি তা দেখে নেন অবলোকনের গুণে; উদাসীন, অন্যমনস্ক দর্শককে দেখিয়ে দেন চিত্রকল্পের শোভা সৃষ্টি…যে-কবি লিখতে পারেন আমার চোখের মতো অন্য কোনও জাদুকর নেই তাঁর পক্ষেই লেখা সম্ভব মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমার মতো কবিতার বই’ [শামসুর রাহমানের কলাম ‘অন্যের মানসে বসবাস’, দৈনিক ভোরের কাগজ, ৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৩]।
তাঁর এই দ্বিতীয় কাব্য সম্পর্কে কবি-সমালোচক ড. মাহবুব সাদিকের মূল্যায়নের সঙ্গে আমার মতৈক্য পুরোপুরি। তিনি লিখেছেন―
‘আবিদের অনেক কবিতা সমকালীন বিপন্ন মানুষের বীভৎস রূপকল্প উপস্থাপন করে। আমরা সবিস্ময়ে উপস্থিত হই এমন এক রহস্যময় চিত্রবিশ্বে যেখানে ভাস্কর্যের মতো সংহত হয়ে থাকে অপূর্ব সব চিত্রকল্প। বস্তুত আবিদ আমাদের উপহার দেন এমনসব চিত্রসমবায়, যা তাঁর কবিতার শরীরে আশ্চর্য বিভা জ্বেলে দেয়… আবিদের কবি-চৈতন্যের শিকড় আবহমান বাংলা ও বাঙালির কাব্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েও নতুন, নিজস্ব ও আধুনিক। ঐতিহ্যকে তিনি ব্যবহার করেছেন কেবল শিল্প-উপকরণের ভান্ডার হিসেবে। কিন্তু যে-প্রক্রিয়ায় তাঁর কবিতাশিল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন তা তাঁর নিজস্ব। এই নিজস্বতা এসেছে তাঁর বাকপ্রতিমায় অসাধারণ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণের মৌলিকত্বে ও নিপুণতায়। তাঁর বক্তব্যই শুধু তীক্ষè ধীসম্পন্ন নয়―গূঢ় ভাবনাকে তিনি বিন্যস্ত করেছেন যথাযথ প্রকরণে।’ [সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৩০ এপ্রিল, ১৯৯৩]।
মাহবুব সাদিকের এই মন্তব্যের সঙ্গে সুর মেলাতে আমরা তাঁর উদ্ধার-করা চিত্রকল্পই আরেকবার পড়ে নিতে পারি―
‘মৃতকল্প পৃথিবীর গোলাকৃতি শবাধার ঘিরে
প্রকৃতি জ্বালিয়ে দিচ্ছে ভয়াল লোবান
… … …
ছুটছে পাখির দল,
মহিষেরা রুদ্ধশ্বাসে ছেড়েছে বাথান!’
[অন্যরকম রোদে, মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমা]এই কবিতাংশ কি ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে আর ? এর নিহিতার্থ খুঁজতে গেলে হয়তো ‘অন্যরকম রোদে’ আমাদেরও হাঁটতে হতে পারে। কিন্তু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতায় জেগে-থাকা যে ছবি ভেসে ওঠে, তা-ই যথেষ্ট একজন কবিকে শনাক্ত করার জন্য। এই গ্রন্থে কবি প্রকৃতির রাজ্যে যেমন বিচরণ করেছেন, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতাও তাঁর অনুভবে ধারণ করেছেন। রাজনীতির জীবন্ত ভাস্কর্য শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে তিনি যে-কবিতা লেখেন, তা রাজনীতির বাইরে চিরায়ত শিল্পের কাছে স্থান পায়। নূর হোসেনকে সম্বোধন করে কবি লিখেছেন―
‘পিকাসো কি ভ্যান গগের নাম
কোনওদিন শুনেছো কি, ছিলো কোনও ব্যক্তিগত ছবির অ্যালবাম ?
রঁদা ও হেনরী মূর
তোমার চৈতন্য থেকে আছেন সুদূর,
অথচ হে নূর হোসেন, তোমার তুলনা কোনও জাদুঘরে নেই!
তুমি বাঙালির অমর ভাস্কর নাকি ভাস্কর্য নিজেই!’
[নূর হোসেন : অমর ভাস্কর নাকি ভাস্কর্য নিজেই, মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমা]নূর হোসেনের গৌরবময় আত্মদান নিয়ে আমাদের কবিরা অনেক কবিতা লিখেছেন। এর মধ্যে শামসুর রাহমানের ‘বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়’ দারুণ প্রেরণাসঞ্চারী। রাজনৈতিক কবিতার ধারায় এটি স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। কিন্তু আবিদ আনোয়ারের এই কবিতা রাজনীতি-চেতনায় ভাস্বর হলেও সৃষ্টি হয়েছে অসাধারণ এক কল্পভাস্কর্য।
কবি রফিক আজাদ তাঁর ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতায় নিরীহ জনগোষ্ঠী-অধ্যূষিত ‘চুনিয়া’ নামের একটি গ্রামের শান্তস্নিগ্ধ পরিবেশকে আর্কেডিয়া বা স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবি আবিদ আনোয়ার কবি রফিক আজাদের কাছে ‘ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক’ রচিত তাঁর ‘চুনিয়া, এ কোন আর্কেডিয়া’ কবিতায় বিভিন্ন চিত্র ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতার প্রথমাংশে চিত্রিত হয়েছে মানুষের হিংস্রতার কথা। শেষাংশে তিনি এমন একটি চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন যাতে দেখিয়েছেন গ্রামীণ হিংস্রতা কেবল মানুষের আচরণেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রকৃতিতেও তা ব্যাপ্ত হয়েছে। এই চিত্রকল্পটি পাঠকের চৈতন্যকে দারুণভাবে নাড়া দেয়―
‘পালাতে পালাতে দেখি
তিলক্ষেতে ফুলের দখল নিয়ে যুদ্ধরত তুমুল মৌমাছি,
দাঙ্গাবাজ কৃষকের খাড়া বল্লমের মতো শূঁড় উঁচু-করে
তেড়ে গেলো নীল প্রজাপতি তারই কোনও স্বগোত্রের দিকে….’
[চুনিয়া এ কোন আর্কেডিয়া, মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমা]আবিদ আনোয়ারের তৃতীয় কাব্য স্বৈরিণীর ঘরসংসার (১৯৯৭) আরও বেশি পাঠকপ্রিয় গ্রন্থ। কবিতার বইয়ের পড়তিবাজারে কোনও কাব্যগ্রন্থের তিনটি সংস্করণ প্রকাশের ঘটনা নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ। এই কাব্যকে স্বাগত জানিয়ে আমি পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকায় লিখেছিলাম―
‘মাত্র ৩১টি কবিতা একজন কবির শক্তিমত্তাকে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট, যদি তাঁর প্রতিটি চরণ হয় সুরচিত আর প্রতিটি চিত্রকল্প হয় বোধের গভীরতাকে স্পর্শ করার মতো ক্ষমতাধর। ছন্দের খেলায় এবং শব্দের শক্তি অনুভবে কবি যে কতখানি পারঙ্গম এ-কাব্য তার প্রমাণবহ। আবিদ আনোয়ার কবি। আপাদমস্তক কবি। তিনি জানেন, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য অলঙ্কারে সাজিয়ে কথাকে কী করে কবিতা বানাতে হয়। যথাশব্দের যথাপ্রয়োগে যদি কবিতা হয়, তাহলে তাঁর ক্ষমতা ঈর্ষণীয়’ [পাক্ষিক অন্যদিন, ১-১৫ অক্টোবর, ১৯৯৮]
এই কাব্যে বোদলেয়ারের ‘শব’ কবিতাটির অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত-হওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই কবিতার বুদ্ধদেবকৃত অনুবাদ আমাদের আগে পড়া আছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আবিদের অনুবাদের কাছে বুদ্ধদেবের অনুবাদ যেন নি®প্রভ। বোদলেয়ারের বাংলা সংস্করণ মানেই বুদ্ধদেব বসু―দীর্ঘদিনের এই অনুজ্ঞা ভেঙ্গে দিলেন আবিদ আনোয়ার। ‘স্বৈরিণীর ঘরসংসার’ কাব্য পাঠ করে কবির স্বাতন্ত্র্য নিরূপণ করেছেন ষাট-দশকের শক্তিমান কবি অসীম সাহা এভাবে :
‘আবিদের কবিতার মধ্যে আমি এমন একজন কবিকে অবলোকন করেছি, যাঁর কাব্যনির্মাণ কৌশল তাঁর সমকালীন অন্যান্য কবির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা…সাহসী চিত্রকল্প রচনার মধ্য দিয়ে সমকালীন জীবনকে এমন গভীরতর পরিপ্রেক্ষিতে তুলে ধরার ক্ষমতা আমাদের কজন কবির আছে ?’
[দৈনিক মানবজমিন, ২২ মে, ১৯৯৯]তারপর একে-একে বেরিয়েছে আবিদ আনোয়ার-এর আরও বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ : খড়বিচালির বৃক্ষজীবন (২০০১), কাব্যসংসার (২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৫), কাব্যসংসারÑবর্ধিত সংস্করণ (২০০৫), আটকে আছি মধ্যনীলিমায় (২০০৯), ধলপহরের পদাবলি (২০১৯), এবং অন্য একটি বৃক্ষ বাঁচে মূলের রসে ত্রিপুরার স্রোত প্রকাশন থেকে। এসব কাব্যের প্রতিটি চরণে আবিদের স্বকীয় কাব্যচারিত্র্য ধরা পড়ে। সন্ন্যাসীরা গাজন থামা নামের আরেকটি কাব্যগ্রন্থ আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশের অপেক্ষায়।
কবিদের আত্মপ্রচারে নয় কিংবা মিডিয়ার ডামাডোলে নয়, তাঁদের কবিতা পাঠ করেই বুঝতে পেরেছি যে, আবিদ আনোয়ার স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার প্রেক্ষাপটে শ্রেষ্ঠতম নাম। যতই দিন যাচ্ছে, ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন তিনি। এই শক্তিবৃদ্ধি মাপার তো কোনও স্বতঃসিদ্ধ বাটখারা নেই কিন্তু আমার মতো আরও অনেকে যখন একই রকম উপলব্ধির কথা প্রকাশ করেন, তখন আমার মূল্যায়নের যাথার্থ্য অনুধাবন করতে পারি। আবিদ আনোয়ারের কবিতা নিয়ে বাংলাদেশের প্রবীণ ও প্রধান কয়েকজন কবির মন্তব্য আগে লিখেছি। আশির বিশিষ্ট কবি আনিসুল হকের মূল্যায়নে দেখতে পাই আরও সাহসী মন্তব্য। তিনি কবি আবিদ আনোয়ারকে সত্তর-দশকের শ্রেষ্ঠ কবি তো বটেই ‘তিরিশি ধারার শেষতম ও শ্রেষ্ঠ কবি’ অভিধা প্রদান করেন এরকম ভাষায়―
‘শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ, এ-দুজনকে যোগ দিয়ে দুই দিয়ে ভাগ করলে যা দাঁড়ায়, এদের দুজনের গড় সে-ধারার সফলতম কবির নাম আবিদ আনোয়ার। সফলতম এবং সুদক্ষতম। ছন্দ ও শব্দায়নে তাঁর নিপুণতা তুঙ্গস্পর্শী। আঙ্গিকের দিক থেকে তিনি ক্লাসিকতার চর্চাকারী এবং যেখানে তিনি পরিহাসময় সেখানে তাঁর সাফল্য বিশাল….আবিদ আনোয়ারকে তিরিশি ধারার শেষতম ও শ্রেষ্ঠ কবি মানতে আমার অসুবিধা নেই…’ [প্রথম আলো সাময়িকী, ১১ মে, ২০০১]।
কবি-কথাশিল্পী আনিসুল হকের এই বক্তব্যের সঙ্গে একটু যোগ-করে আমি বলতে চাই: সত্তরের কবি আবিদ আনোয়ারকে ‘তিরিশি ধারার শেষতম ও শ্রেষ্ঠ’ কবি না-বলে ‘তিরিশোত্তর কাব্যধারার প্রথমার্ধের শ্রেষ্ঠ কবি’ বললে সত্যের বেশি কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। কারণ তাঁর কবিতায় তিরিশি ধারার অনুরণনের চেয়ে তা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা প্রবলভাবেই লক্ষণীয়। এমনকী তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তিরিশি ধারার কবিতার প্রতি এক ধরনের দ্রোহ উচ্চারিত হয়েছে কবিতার ভাষায়। তিরিশিদের বেঁধে-দেওয়া কবিতার ছককে তিনি অস্বীকার করেছেন এবং একে ‘বালকপনা’ বলে অভিহিত করেছেন তাঁর প্রবেশলগ্নেই এভাবে―
‘বিশ-শতকী পাঁকের রঙে রাঙিয়ে ছেঁড়া-জামা
ঢুকবে একবিংশে নাকি অন্য কোনো ঝড়
বলবে ডেকে বালকপনা থামা এবার থামা,
সূর্য থেকে আসছে নেমে নতুন কারিগর’
(বোধন, প্রতিবিম্বের মমি)
আবিদ আনোয়ার কেবল চিত্রকল্পের জোরেই বড় কবি হয়ে উঠেছেন, তা নয়; বাংলা কবিতার সকল প্রকার অলঙ্কার সৃষ্টির প্রতিভা তাঁর করায়ত্ত। অক্ষম কবিদের ছন্দবর্জনের এই কালেও তিনি [প্রধানত] ছন্দকে আলিঙ্গন করেছেন সচেতনভাবে। উপরে উদ্ধৃত কবিতাংশে পরাবাস্তব প্রকৃতির একটি চিত্র যেমন রয়েছে, তেমনি পাঁচ-মাত্রার যে মাত্রাবৃত্তীয় দোলা অনুভব করি তা কঠিন অনুশাসনে সৃষ্ট হলেও স্বাভাবিক কথ্যভাষার মতো শোনায় [যা আধুনিকতার অন্যতম প্রমাণক]। এ-ছন্দের কবিতা আমাদের খুব বেশি নেই। তাঁর কবিতা আঁটসাট গাঁথুনির: একটি চরণেও তাই শব্দের অপচয় নেই।
আমাদের সাহিত্যজগতে দলবাজি ও একশ্রেণির কবিদের সিন্ডিকেট তৈরির প্রবণতাকে উপজীব্য করে আবিদ আনোয়ারের স্পষ্ট উচ্চারণ―
‘স্বরের সারাংশ ছেনে যেভাবেই জোড়া দিক গোত্রভুক্ত কাক
জন্ম দিতে পারে না হে, একাকী বিষণ্ন কোনো কোকিলের ডাক…’
[সিন্ডিকেট, ধলপহরের পদাবলি]কবি আবিদ আনোয়ার ছন্দসচেতন। ছন্দের প্রচলিত চাল ব্যবহার করেই তিনি গতিময়তা সৃষ্টি করেছেন আটপৌরে ভাষাভঙ্গির কারণে। তাঁর একটি বড় কৃতিত্ব এই যে, টানাগদ্যের আবহ বজায় রেখেও ছন্দ ও মিলের প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারেন। এর আগে ‘নন্দনতত্ত্ব’ কবিতার একাংশ উদ্ধৃত করে এ-বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছি মাত্র। অন্য একটা উদাহরণ দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি টানাগদ্যে লিখেছেন―
‘প্রিয় দেশবাসী,
আপনারা যারা লঙ্কার সাথে ক্রমাগত বাসি
আর পান্তা মাখতে-মাখতে খোদার বারোটা মাসই
নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দিচ্ছেন, আর কখনো হঠাৎ
অস্তিত্বের গভীরে শুধু টের পান কোনো এক স্বপ্নবিলাসী হাত
খামোখাই উঠে যাচ্ছে আমিষের দিকে, তাদেরই নেহাত
কপালের গুণে বলতে হয় এই খাকছার
এতদিনে বিজয়ী হয়েছি! অর্থনীতি তুলেমূলে ছারখার
হওয়ার আগে এটা খুব বড়রকমের রহম খোদার…
… … …
আয়াতের মতো গলগল উচ্চারণে এরকম গৎ
কিছুটা বজ্রের সাথে মিশিয়ে ঢালাই-করা আমাদের প্রতিটি শপথ
অথচ প্রশ্নের মতো বাতাসে আওয়াজ তোলে পতাকার পতপত!’
[প্রিয় দেশবাসী, স্বৈরিণীর ঘরসংসার]এই টানাগদ্যের মধ্যেও লুকিয়ে আছে পরপর তিন-পঙ্ক্তির অন্ত্যমিলের নিখুঁত প্রয়োগ। একটু কান খাড়া করলেই টের পাওয়া যায়। এ ধরনের অন্ত্যমিলের কবিতাও যে আধুনিকতাকে ক্ষুণ্ন করে না, আবিদ আনোয়ারের অনেক কবিতায় তার প্রমাণ রয়েছে। আধুনিক কবিতা বেশি লেখা হয় অক্ষরবৃত্তে। কিন্তু আবিদ আনোয়ার মাত্রাবৃত্তেও অনেক কবিতা লিখেছেন। এমনকী ছড়ার ছন্দ স্বরবৃত্তের চালের মধ্যেও তিনি বজায় রাখতে পেরেছেন কবিতার গাম্ভীর্য। কারণ স্বরবৃত্তে রচিত তাঁর অনেক কবিতাকে পাঁচ-মাত্রার মাত্রাবৃত্তেও বিন্যস্ত করা যায় যাতে পরিণামে ‘স্বরমাত্রিক’ লয় শ্রুত হয়। উদাহরণ নিচের কবিতাংশ―
‘জলেই থাকি কিন্তু তবু মাছের থেকে দূরে
ঘর বেঁধেছি স্বচ্ছ বালি, জলজ ক্যাকটাসে;
রুই-কাতল ও টাকির মেকি ফেনানো বুদ্বুদে
মন মজেনি ঘুচাতে চাই মীনের পরিচয়…’
[অ্যাক্যুরিয়াম, প্রতিবিম্বের মমি]আমাদের কবিদের মধ্যে ছন্দ, অলঙ্কার ও অন্ত্যমিল প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্যের অধিকারী কবি আবিদ আনোয়ার। মিডিয়া বলে দিলেই কেউ কবি হয়ে ওঠে না। কোনও-কোনও কবি নিজের কবিতাকেই স্বতন্ত্র এক মিডিয়া হিসেবে নির্মাণ করতে পারেন। ধ্রুপদী কবিতার ভাস্কর আবিদ আনোয়ারের কবিতা সেইধরনের মিডিয়া, যে নিজেই তার জয় ঘোষণা করতে পারে। ড. হুমায়ুন আজাদের ভাষায় ‘অভিনিবেশী পাঠক সম্প্রদায়’ যত বৃদ্ধি পাবে আবিদ আনোয়ারের কবিতা ততই নন্দিত হতে থাকবে।
** ** **
সত্তরের কবিদের মধ্যে অসাধারণ ছড়াকার বলতে আমরা যাদের বুঝি, নির্মাণকলার দিক থেকে তাদের চেয়েও শক্তিমান আবিদ আনোয়ার। আবিদ আনোয়ারের হাতে রচিত হয়েছে চার ধরনের ছড়া― (১) একান্তই শিশুতোষ ও কিশোরপাঠ্য ছড়া, (২) শিশুতোষ হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে-থাকা রূপকধর্মী ছড়া যার গভীরে রয়েছে নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অসঙ্গতির চিত্র কিন্তু শিশুরা এসব না-বুঝেও ছন্দ ও হাস্যরস থেকে পাওয়া তাদের নিজেদের মজাটুকু নিয়েই তৃপ্ত হতে পারে, (৩) একান্তই বড়দের ছড়া, (৪) কবিতাধর্মী ছড়া বা কিশোর-কবিতা।
আবিদ আনোয়ারের ছড়ার বইগুলোর নাম (১) আগলভাঙা পাগল ছড়া, (২) সৃষ্টিছাড়া ত্রিশটি ছড়া, (৩) মশার মেয়ে পুনপুনি, (৪) ভূতের পুতের জন্মদিন, (৫) পেটের ভিতর পরানপাখি।
আষাঢ় মাসের বাদলা-দুপুর,
মেঘ-পরীরা বাজায় নূপুর,
সুর তুলেছে টাপুর-টুপুর
ডুবলো উজান চর―
পুঁটির ঝিয়ের বিয়ে হবে
আসবে রাঙা বর।
ডানকিনারা খুশির চোটে
এদিক থেকে ওদিক ছোটে,
পাবদা-খালার রাঙা ঠোঁটে
হাসির কারুকাজ,
মস্ত বড় আয়োজনে
ব্যস্ত সবাই আজ।
চিংড়িদিদি হলদি বাটে,
বোয়াল গেছে চরের হাটে,
ভেটকিমাসি শোলক কাটে,
কাতলা সাজায় গেইট―
টেংরা চাচা খবর দিলে:
এলেম শুনে পাশের বিলে―
বরের বাপের দারুণ পিলে,
পাল্টে গেছে ডেইট!’
[পুঁটির ঝিয়ের বিয়ে, সৃষ্টিছাড়া ত্রিশটি ছড়া]এটি একান্তই শিশুতোষ ছড়া। আষাঢ় মাসে ছোট পুটিমাছের গায়ে লাল ডোরা দেখা দেয়। এটি তার বিয়ের পোশাক। আষাঢ়ে-বৃষ্টির দিনে মাছের জগতে যে-উল্লাস দেখা দেয় তা-ও মূর্ত হয়েছে এই ছড়ায়। বরের বাবার পিলের কারণে বিয়ের ডেইট পাল্টে গেছে―টেংরা চাচার-দেওয়া এই খবরটা অবশ্য হরিষে বিষাদ!
যে-ভূত নিজে গাপুস-গুপুস
সর্ষে-বাটা কাসন খায়
সে-ভূত কি আর যায় তাড়ানো ?
সবাই মরে আশঙ্কায়।
যে-ভূত থাকে সর্ষে গাছে,
এমনকি তার শিকড়ে,
সে-ভূত তবে কখন কবে
কে তাড়াবে কী করে ?
হাজার ওঝা নাচার হলো
যেমন তেমন ভূত তো নয়!
লম্বুভূতের নাতি-পুতি,
অলুম্ভূতের খোদ তনয়!
যারাই চেনে তারাই জানে
ভূতগুলো খুব শিক্ষিত,
ভেলকিবাজির নানান রকম
মন্ত্রে তারা দীক্ষিত।
কেউবা করে ব্যবসাপাতি,
কেউবা করে চাকুরি,
পদ্য লিখে কেউ হতে চায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ই।
আজব রকম ফন্দিফিকির,
যাও না তাদের দপ্তরে,
সুযোগ পেলেই ধরবে তোমার
ঘাড়টি চেপে খপ-করে।
সরিষাপুর ইস্কুলে যায়
ভূতের শত পুত্রবর,
পেত্নী বলে: সবার আগে
সর্ষে-ঝাড়াই সূত্র পড়!
বিদেশ যাবি ভয় দেখাবার
ডিগ্রি নিতে উচ্চতর,
মহাকাশে ঘুরতে হলে
ধূমকেতুদের পুচ্ছ র্ধ।
শুনলে তুমি অবাক হবে
তবুও বলা দরকারি:
এই ভূতেদের ডরায় স্বয়ং
বাংলাদেশের সরকারই!
[ভূতের বাড়ি সরিষাপুর, মশার মেয়ে পুনপুনি]একশ্রেণির মানুষের অনাচার-কবলিত বাংলাদেশের সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে ছড়াটিতে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের ভেতরমহলে যা ঘটছে তার অনবদ্য প্রকাশ ঘটেছে। ‘মহাকাশ’ অবৈধ উন্নতির শিখর এবং ‘ধূমকেতুরা’ সমাজের দুর্নীতিবাজ কেউকেটা বা অপকর্মের ‘গডফাদার’! ‘লম্বুভূতের নাতি-পুতি, অলুম্ভূতের খোদ তনয়’ দীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্যগত সামাজিক অনাচারের ইঙ্গিতবহ। কিন্তু শিশু-কিশোরগণ এসব না-বুঝলেও চলবে। ছন্দ এবং ভূতেদের কাণ্ড-কারখানা থেকে তারা তাদের মজা উপভোগ থেকে বঞ্চিত হবে না।
ইতিহাস বই খুলে মতিচাচা বরাবর
মাথা নেড়ে বলতেন: আমি না রে, তোরা পড়!
আজগুবি যতোসব গাঁজাখুরি গল্প:
সব যেন মহাবীর, কেউ নয় অল্প!
ইতিহাসে লিখেছে যা ভেবেছিস ঘটনা ?
কিছু তার ঘটেছিলো, বাকিটুকু রটনা!
আমি তাই নিজে-নিজে লিখেছি এ-অধ্যায়,
এত ভালো লেখে নাই কোনো মুখোপাধ্যায়:
হিটলারÑযার নামে আজো তোরা ত্রস্ত
সে আসলে ছিলো নাকি খুবই জরাগ্রস্ত!
আরো কই, তোদের অই মহাবীর তিতুমীর,
দুনিয়াতে তার মতো ছিলো নাকো ভীতু বীর!
লোকে জানে বীরনারী সুলতানা রাজিয়া,
তারও কত দিন গেছে আলুপুরি ভাজিয়া!
সিরাজের মাতামহ নওয়াব আলীবর্দ্দী,
বারো মাস ছিলো তার কফ-কাশি-সর্দি!
বেল দিয়ে নেলসন (বুদ্ধিটা সেয়ানের)
ভেঙেছিলো টেকো মাথা বীর নেপোলিয়ানের…
এইসব কথা শুনে লাগে যদি দ্বন্দ্ব,
ভালো-করে চেয়ে দ্যাখ্ চোখ-করে বন্ধ:
আমাদের কত নেতা―এর মাঝে বীর কই ?
ঘরে-বসে খায় তারা চিঁড়াভাজা, ক্ষীর-খই;
মাঝেমাঝে হাঁক-ছেড়ে বাহু ক’রে উড্ডীন
বড়জোর পেশী-নেড়ে বলে শুধু ‘ভুট দিন’!
ইতিহাসে এরা হবে মহীয়ান গরীয়ান,
লজ্জায় ম’রে যাই কলসী ও দড়ি আন!
[মতিচাচার ইতিহাস, মশার মেয়ে পুনপুনি]ছড়াটির প্রথমাংশে আছে ইতিহাস নিয়ে কেবলই হাস্যরস ও শিশু-কিশোরদের জন্য মজার বিষয় কিন্তু শেষাংশে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের যে নির্বাচন ও ভোটকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বর্ণিত হয়েছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক। ‘ভুট দিন’-এ ‘ভোট’-এর বানানে ইচ্ছাকৃতভাবে হ্রস্ব-উকার ব্যবহৃত হয়েছে কারণ অধিকাংশ লোক এভাবেই উচ্চারণ করে এবং এতে একই সঙ্গে ‘উড্ডীন’-এর সঙ্গে যথাযথ মিলও রক্ষিত হয়েছে।
সদানন্দের আনন্দ মাটি যখন গেলো সে বাজারে :
আগে যা কিনতো একশ’ টাকায় এখন মিলে না হাজারে!
মরাচোখে মাছ আড়ে-আড়ে চায়,
পিটপিট-চোখে মুরগি জিগায়:
এদিকে আবার ঘোরাঘুরি কেন! কোন্ গ্রেডে করো চাকুরি ?
বাড়ি গেলে আজ গিন্নি কী বলে সেটা জানে শুধু ঠাকুর-ই!
কিনতে গেলো সে খাসির কলিজা বুড়ো বাপটার বায়না―
আংটায়-গাঁথা জিনিসটা যেন নিজের বুকেরই আয়না!
আগুন লেগেছে চালে আর ডালে,
হাত পুড়ে গেছে লঙ্কার ঝালে,
হলুদ-রসুন-পেঁয়াজের দাম চড়েছে ক্ষিপ্র রকেটে;
বাজারের থলে ফাঁকা তবু তার টাকা নেই আর পকেটে!
সদানন্দের মাথা ঘুরে যায়, পড়ে যাবে বুঝি গরমে!
বাপের বায়না কেনাই হলো না মরে যেতে চায় শরমে:
দেশটা তাহলে আজব রাজার!
একেই কি বলে মুক্তবাজার!!
অর্থনীতিতে পাশ-করা ছেলে নন্দ হয়েছে কেরানী;
বাড়ি যেতে-যেতে সান্ত্বনা খোঁজে: বাজারে হলো তো বেড়ানি!
[সদানন্দের আনন্দ, মশার মেয়ে পুনপুনি]এটি বড়দের ছড়া। ছয়-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত এই ছড়ায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের যে ক্রমাগত নাভিশ্বাস উঠছে তার বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ক্রেতার দিকে মরা-মাছের আড়ে-আড়ে তাকানোয়, ক্রেতা কোন গ্রেডে চাকুরি করেন মুরগির এই জিজ্ঞাসায়, অর্থনীতিতে পাস-করা ছেলের কেরানী-হওয়া’ আর ‘বাজারে বেড়ানি’তে যে উপহাস প্রকাশিত হয়েছে তা খুবই উপভোগ্য। আংটায়-গাঁথা ‘খাসির কলিজা’র সঙ্গে দরিদ্র ক্রেতার নিজের বুকের প্রতিচ্ছবির যে কাব্যময় সমান্তরাল রূপক তৈরি হয়েছে তা অসাধারণ বললেও কম বলা হয়! এটাই ছিল তার ‘বাপের বায়না’! এমন ছড়া কেবল আবিদ আনোয়ারের মতো কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব।
ফাগুন এলেই আগুন জ্বালে
লাল পলাশের বন―
ফাগুন এলেই আগুন জ্বালে
দুঃখী মায়ের মন।
সেই যে কখন ‘আসছি’ ব’লে
দুষ্টু খোকা তার
বেরিয়ে গেলো নিশান হাতে
ফিরলো না সে আর।
ফাগুন এলে সেই মা ডাকে:
কই গেলি বাপধন ?
‘এই তো আমি’ ব’লে ওঠে
হাজার পলাশ বন!
শহীদ মিনার বলে: ‘মাগো,
দ্যাখ্ মেলে তোর আঁখি,
এই তো আমি তোর ছেলে মা,
চিনতে পারিস নাকি!
ফুল কুড়াতে গিয়েছিলাম
অন্য কোথাও না―
দৈত্য-দানোর চোখ এড়িয়ে
ফুল এনেছি মা’!
[আগুন-জ্বলা ফাগুনে, মশার মেয়ে পুনপুনি]একুশে ফেব্রুয়ারি-কে উপজীব্য করে রচিত এটি একটি অনবদ্য কিশোর-কবিতা। কবিতাটি এতই জনপ্রিয় যে গোটা-বিশেক আবৃত্তির লিঙ্ক রয়েছে ইউটিউবে। একুশ এলে মা যখন তার হারানো ছেলের খোঁজ করেন, তখন পলাশ বন এবং শহিদ মিনার নিজেই ‘এই তো আমি’ বলে উত্তম পুরুষে জানান দেয়! এই সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্প রোমহর্ষক অনুভূতির সৃষ্টি করে পাঠকের বোধে। অনুপ ভট্টচার্য্য কবিতাটিতে সুর-দিয়ে নিজেই বেতারে গেয়েছেন সামিনা চৌধুরীর সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে। বিটিভি-তে একক কণ্ঠে গেয়েছেন মোহাম্মদ রফিকুল আলম।
ছড়ায় বহুমাত্রিক অন্ত্যমিল প্রয়োগে যেÑপ্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে তারও অগ্রসারিতে ছিলেন এবং আছেন আবিদ আনোয়ার। প্রথম দফায় ‘বাদশা ভাই/হাত-সাফাই, চাটুকার/হাঁটু কার, ডিম পেড়েছে/ঝিঁম-মেরে সে, পত্রিকায়/কর্ত্রী খায়/বক্তৃতায়, চেঁচায় খুব/বেজায় চুপ, উচ্চতর/পুচ্ছ র্ধ, পুত্রবর/সূত্র পড়্, তিতুমীর/ভীতু বীর, গরীয়ান/দড়ি আন, যাই চটে/তাই রটে, জোরগলায়/তোর ছলায়, কাসন খায়/আশঙ্কায়, তোরা ত্রস্ত/জরাগ্রস্ত প্রভৃতি এবং দ্বিতীয় (সাম্প্রতিক) দফায় ৪-মাত্রার মাত্রাবৃত্তীয় ছড়ায় এই বহুমাত্রিক মিল ‘পাক-সেনাবাহিনী/থাক চেনা-কাহিনি, ভুল-ভোটাভুটিতে/ফুল-ফোটাফুটিতে, খিলমারা বরাতেই/মিলছাড়া ছড়াতেই, সাতখানা শাড়িতে/চাঁদখানা পাড়িতে, বিল তাড়াতাড়িতে/সিলমারা গাড়িতে, লাল-লাল দাড়িতে/দাজ্জাল নাড়িতে’, ইত্যাদিতে তিনি ৭-মাত্রার মিল অবধি গিয়েছেন যা অন্য কারও ছড়ায় নেই।
২০০৬ সালে ছড়াসাহিত্যে অবদানের জন্য সুকুমার রায় সাহিত্য পুরস্কাপ্রাপ্ত আবিদ আনোয়ার তাঁরই যোগ্যতম উত্তরসূরি।
… … ..
আবিদ আনোয়ারের কাব্যচর্চার একটি সম্প্রসারিত অধ্যায়ের নাম গান রচনা। বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভির তিনি বিশেষ (সর্বোচ্চ) শ্রেণির গীতিকবি। তাঁর গানের কথায় সুর দিয়েছেন খোন্দকার নূরুল আলম, অনুপ ভট্টাচার্য, অজিত রায়, শেখ সাদী খানের মতো প্রথিতযশা সুরকারগণ। কণ্ঠ দিয়েছেন খোন্দকার নূরুল আলম, অনুপ ভট্টাচার্য্য, সৈয়দ আবদুল হাদী, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, বশীর আহমেদ, নীলুফার ইয়াসমিন, সাবিনা ইয়াসমিন, রফিকুল আলম, খুরশিদ আলম, সুবীর নন্দী, বিপুল ভট্টাচার্য্য, কিরণচন্দ্র রায়, আবদুল খালেক, এন্ড্রু কিশোর, দিলরুবা খান, বেবী নাজনীন, মনির খান, উমা খান, আবিদা সুলতানা, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, আবু বকর সিদ্দিক, শাকিলা জাফর, শাম্মী আখতার, সামিনা চৌধুরী, মুশাররাত শবনম, শামীম আরা লুনা, রোকেয়া সিদ্দিকা, রিজিয়া পারভীন, জাহাঙ্গীর আলম, রোমানা ইসলাম, সুমনা বর্ধন, রুখসানা মুমতাজ, ফারজানা মিলি, প্রিয়াঙ্কা গোপ, অণিমা ডি কস্টা, অণিমা মুক্তি গমেজ, সুলতানা চৌধুরী, বিশ্বজিৎ রায়, শাহনাজ রহমান স্বীকৃতি, শবনম আবেদী, সুমন রাহাত, বশিরুজ্জামান সাব্বির, তানভীর আলম সজীব, মিজান মাহমুদ রাজীব, সালমা, ঐশী এবং আরও অনেকে।
আধুনিক, পল্লীগীতি, মরমী ও দেশাত্মবোধক সব ধরনের গানই লিখেছেন তিনি। প্রখ্যাত গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান-এর সঙ্গে আমি একমত যে, মরমী গান রচনায় আবিদ আনোয়ার-এর ভাবনা ‘অতলস্পর্শী’। আমাদের মরমী গানের অধিকাংশ রচিত হয়/হচ্ছে চারণ কবিদের হাতে যাঁদের নির্মাণকলায় স্বভাবতই কিছু স্খলন-পতন থেকে যায়। আবিদ আনোয়ার আধুনিক কবি এবং বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন নিয়ে এত বিশদ ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা তাঁর মতো আর কেউ করেননি এ দেশে। আমাদের বাউল আঙ্গিকের মরমী গান যে অতিপ্রচল উপাদান ও আঙ্গিককে ধারণ করে প্রায় স্থবিরতা-আক্রান্ত হয়ে আছে, সেখানে আধুনিক কবি ও কবিতার ভাষ্যকার আবিদ আনোয়ার তাতেও ‘আধুনিক’ উপাদান যুক্ত করে তাকে ‘পরিশীলিত’ করে তুলেছেন। একটি উদাহরণ: লোকসঙ্গীতে একালের সম্রাজ্ঞী বলে পরিচিত অণিমা মুক্তি গোমেজ-এর কণ্ঠে অনুপ ভট্টাচার্য্যরে সুরে আবিদ আনোয়ারের লেখা একটি মরমী গানের অর্ধাংশ এরকম―
ইচ্ছেমত ঘুরিয়ে চাবি
বন্ধ-করে ফের চালাবি!
জীবন কি তোর নিজের কেনা খেলনা গাড়ি ?
মরতে গেলেও যায় না মরা না-হলে তার হুকুম জারি ॥
জীবন কি তোর বানিয়ে-বলা গল্প নাকি ?
নিজেই জানিস কোনটুকু শেষ, কতটুকু রইলো বাকি―
ঘরের মানুষ পথে নামে, সন্ন্যাসী চায় দুনিয়াদারি ॥
আমাদের প্রচলিত মরমী গানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এই গানে ব্যবহৃত উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপকাশ্রিত উপাদানগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে একে ‘আধুনিক ও পরিশীলিত’ বলতে আমাদের বাধ্য করে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে প্রকৃত চারণ কবিদের মতই সারল্য। মরমী গানে আবিদ আনোয়ার-এর এই ‘অতলস্পর্শী’ ভাবনার আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ নিজের সুরে আবু বকর সিদ্দিক-এর গাওয়া একটি গান যার অর্ধাংশ এরকম―
(আমার) একতারাতেও তার ছিঁড়েছে,
লাউয়ে ছাউনি নাই!
আমারে তুই ক্যামনতরো
বাউল করলি সাঁই ॥
আরশি দেখি ভাঙা কাচে:
কায়া নাকি ছায়া নাচে!
পাখি আছে, খাঁচাও আছে
আমার আমিই নাই রে নাই ॥
আবিদ আনোয়ারেরই একটি বইতে পড়েছিলাম আধুনিকতা নিয়ে ইংরেজি ভাষার কবি টি এস এলিয়টের একটি কথা। ‘ট্র্যাডিশন আন্ড ইন্ডিভিজুয়্যালিজম’ নামের একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছেন : ‘শিল্পসাহিত্যে নতুনত্ব একটি জীবিত বৃক্ষের ডালপালা বিস্তারের মতো, মূলকে অবলম্বন করেই যার বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটে।’ এই গানে আমরা তা-ই দেখতে পাচ্ছি। প্রচলিত মরমী গানের অনেক উপাদান এতে রয়েছে কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অস্তিত্বের সংকট’ নামের এক অতি কঠিন আধুনিক অনুষঙ্গ। প্রকৃতপক্ষেই এতে ঘটেছে ‘জীবিত বৃক্ষের ডালাপালা বিস্তার’-এর মতো নতুনত্ব। ‘গেরুয়া পরি না আমি/ চুড়ো করে বাঁধি না তো চুল/ গৃহী আমি ভেক ধরিনি/ অন্তরে বাউল// হাতে আমার একতারা নেই/ বাজাই আমি নিজকে নিজেই/জানি না এই মনের তারে কে রাখে আঙুল’ গানটিতে আবিদ আনোয়ার নিজেই আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন তাঁর অন্তরে বসে এক বাউল একতারার বদলে তার মনকেই বাজিয়ে চলেছেন। একজন আধুনিক কবির সৃজনশালায় এই বাউলের বসতি আমাদের চমকিত করে। অনুপ ভট্টাচার্য্যের সুরে দিলরুবা খান ও সালমার কণ্ঠে ‘লালন তোমার আরশিনগর আর কতদূর আর কতদূর/অচেনা এক পড়শি খুঁজে কাটেেলা সকাল, কাটলো দুুপুর’ গানটির বাংলাদেশ ও ভারতের গোটা-বিশেক শিল্পীর লিঙ্ক পাওয়া যায় ইউটিউবে।
আধুনিক, পল্লীগীতি এবং দেশের গানেও আবিদ আনোয়ার-এর নতুনত্ব চোখে পড়ার মতো। একটি লক্ষণীয় বিষয় : আবিদ আনোয়ারের লেখা গান শুধু শুনে নয়, পাঠ করেও আনন্দ পাওয়া যায় এর কাব্যময়তার কারণে। নিচে কয়েকটি গানের শুরু কিংবা অর্ধাংশ পড়লেই আমার কথায় সায় দিবেন বিজ্ঞ পাঠক―
নিজের সুরে খোন্দকার নূরুল আলমের কণ্ঠে ‘(আমি) পরানমাঝির গান শুনেছি খোয়াই নদীর পাড়ে/নদীর পানি তেমনি আছে, পরানমাঝি নেই শুধু সংসারে//কলসী ভেঙে কুলের বধূ করতো পথের ভুল/ব্যাকুল নদী উথাল-পাথাল ভেঙেছে দুই কূল/গান শুনে তার চরের পাখি কাঁদতো হাহাকারে’; নিজের সুরে অনুপ ভট্টাচার্য্যরে কণ্ঠে ‘(আমার) স্বপ্নরঙিন কিশোরবেলা হারিয়ে ফেলেছি/সময় রে তুই আর কোনোদিন ফিরিয়ে দিবি কি ?’ কিংবা ‘(ওরা) ছবি আঁকার পাঠশালাতে যায়নি কোনোদিন/(ওরা কেউ) চায়নি হতে জয়নুল আবেদিন/বুকের তাজা রক্তে যখন রাজপথ রাঙালো/কালো পীচে লাল-কারুকাজ বিশ্বকে চমকালো’ কিংবা ‘পারো যদি এই আমাকে ক্ষমা করো সাঁই/ওর চোখে যেই চোখ পড়েছে/মনে হলো ত্রিভুবনে অন্য কিছু নাই’; নিজের সুরে অনুপ ভট্টাচার্য্যরে কণ্ঠে এবং পরে সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘চাঁদ ডুবে গেলে তারার জোছনা আকাশের থাকে সাথী/তুমি চলে গেলে আমার কিছুই থাকে না/নিজেকেও লাগে অচেনা’; খোন্দকার নূরুল আলমের সুরে সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে: (আমি) সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে অনেক করেছি ফন্দি/শেষে জানলাম মানুষ নিজেই ভাগ্যের জালে বন্দি’; অনুপ ভট্টাচার্য্যরে সুরে সৈয়দ হাদীর কণ্ঠে ‘হায় মালিনী, করলি এ কী বল!/ (ও তুই) পরের চারায় ফুল ফুটালি/নিজ বাগানে দিলি না তুই জল!’; খোন্দকার নূরুল আলমের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘শুধু রৌদ্র কি পারে রাঙাতে রঙধনু/বৃষ্টিতে ভেজা আকাশ যদি না থাকে’ কিংবা ‘(আমি) আরো বেশি জড়িয়ে পড়ি/(যদি এই) বাঁধন তোমার খুলতে চাই/(বেড়ে যায়)স্মৃতির জ¦ালা/(যখনি) এই তোমাকে ভুলতে যাই’; তিমির নন্দীর সুরে ও কণ্ঠে ‘কাচের স্বর্গ ভেঙে গেছে বলে কোনোই দুঃখ নেই/ গড়ে তো ছিলাম বহু সাধনায়/ আমি সুখী সেই গরবেই’।
এমন উদাহরণের শেষ নেই। দুই শতাধিক গানের প্রায় সবগুলোই এমন কাব্যগুণে ভরপুর। সব গানেই রয়েছে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপকবাহী চিত্র ও চিত্রকল্পের দক্ষ ব্যবহার। তাঁর গানে চিত্র ও চিত্রকল্পের সৌন্দর্য কতটা হৃদয়গ্রাহী তা বোঝানোর জন্য একটি দেশের গানের আশ্রয় নিচ্ছি। অনুপ ভট্টাচার্য্যরে সুরে রফিকুল আলম-এর গাওয়া একটি দেশের গানের অর্ধাংশ এরকম―
গাঁও-গেরামে আমায় দেখে
ডুমুর পাতার আড়াল থেকে
শুধালো টুনটুনি:
তুই এতদিন কোথায় ছিলি ? ক্যামন ছিলি শুনি…
(আমি) জানি না তার জবাব দেবো কী!
চিরচেনা বাঙলাকে আজ ফিরে পেয়েছি ॥
কাশের সাদা চুল-নাড়িয়ে বললো তেপান্তর:
ভরদুপুরে অলসবেলায় এই ছিলো তোর ঘর!
আজ কেন তুই নিজের ঘরে নিজেই অতিথি!
গ্রাম ছেড়ে শহরে-আসা এক বালক (এখন মাঝবয়সী) বহুদিন পর গ্রামে গিয়ে স্বদেশেই যেন পর্যটক হয়ে গেছে। টুনটুনি পাখি ডুমুর পাতার আড়াল থেকে তার কুশল শুধায়! এর সবই চিত্ররূপময় কিন্তু আমাদের মন কেড়ে নেয় অন্তরার যে-চিত্রটি তা সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্পের মর্যাদা পেয়েছে। তেপান্তর যেন এক বৃদ্ধ, কাশবন যার সাদা চুল!
প্রকৃত কবিদের হাতে রচিত গানগুলোই আমাদের আবহমান সম্পদ এবং আবিদ আনোয়ার-এর অনেক গানও আবহমান বাংলা গানের ভান্ডারে জমা হয়ে গেছে এবং হতে চলেছে।
… … …
ছোটগল্প রচনায়ও আবিদ আনোয়ার সিদ্ধহস্ত। মাওলা ব্রাদার্স থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত তাঁর তিন পাখনার প্রজাপতি নামের বইয়ের গল্পেও পাঠককে মুগ্ধ করার উপাদান রয়েছে। তা বোঝানোর জন্য প্রথমেই দুটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। এগুলো আবিদ আনোয়ার-এর মুখ থেকেই শোনা :
বহুদিন থেকে আবিদ আনোয়ার-এর বইপত্র প্রকাশ করে আসছে আগামী প্রকাশনী। কথাশিল্পী মশিউল আলম আবিদ আনোয়ার-এর কয়েকটি গল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পড়ে আগে থেকেই বইটি তাঁর প্রিয় প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স-কে দেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন। মাওলা ব্রাদার্স-এর স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক নিজেও বইটি পাওয়ার জন্য মশিউল আলমের মতোই অপেক্ষা করছিলেন। আবিদ আনোয়ার তাঁর সুহৃদ মশিউল আলমের কথা ফেলতে পারেননি। মশিউল আলম একজন জনপ্রিয় কথাশিল্পী। আবিদ আনোয়ার-এর গল্পের প্রতি তার আগ্রহ আমাদেরকে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়: তাঁর ছোটগল্প পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার যোগ্য।
আরও মজার একটি ঘটনা না-বললেই নয়। মাওলা ব্রাদার্স বইটির প্রচ্ছদ আঁকার জন্য প্রখ্যাত শিল্পী ও কথাসাহিত্যিক ধ্রুব এষ-কে পাণ্ডুলিপিটি পাঠায়। প্রচ্ছদ আঁকার পর পুরোনো ঢাকার বাংলাবাজারে মাওলা ব্রাদার্স-এর অফিস কক্ষে ধ্রুব এষ ও আবিদ আনোয়ারের মধ্যে ভাব বিনিময় হয়। ধ্রুব এষ প্রথমেই বললেন: ‘আবিদ ভাই, আপনি আমার অনেক ক্ষতি করলেন!’ আবিদ আনোয়ার হতভম্ব হয়ে জানতে চাইলেন তিনি তাঁর কী ক্ষতি করলেন! ধ্রুব এষ উত্তর দিলেন : ‘বইমেলা এলে আমি প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচটি প্রচ্ছদ করি। কেবল ‘টাইটেল পিস’ পড়ে আমি কাজগুলো সেরে ফেলি। গত রাতে আপনার ‘টাইটেল পিস’ পড়ার পর বাকিগুলোও না-পড়ে থাকতে পারিনি। সারা রাত বসে-বসে আপনার সবগুলো গল্প আমাকে পড়তে হয়েছে ভালো-লাগার টানে। তাই, অন্য কোনও কাজ করতে পারিনি!’
এই দুটি ঘটনা কেন উল্লেখ করলাম, পাঠক নিশ্চয়ই আঁচ-করতে পেরেছেন। আবিদ আনোয়ার-এর গল্পের প্রতি দুজন কথাশিল্পীর আকৃষ্ট হওয়াটা ইঙ্গিত দেয় আবিদ আনোয়ারের ছোটগল্পও পাঠককে আকৃষ্ট করে এবং এই আকর্ষণ সৃষ্টিই ছোটগল্পের মান নির্ধারণের অন্যতম নিরিখ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
শব্দঘর-এর এই বিশেষ সংখ্যায় বোধ করি আবিদ আনোয়ারের গল্প নিয়ে বাংলা ভাষায় মনি হায়দারের আলোচনা এবং ইংরেজি ভাষায় ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত জুনাইদুল হকের আলোচনা মুদ্র্রিত হবে। আমি তাই গল্পের মূল্যায়নে যাচ্ছি না। শুধু বলব: বহু বিচিত্র বিষয়ে গল্প লিখেছেন আবিদ আনোয়ার। বইটির ফ্ল্যাপে লেখা রয়েছে :
‘আমাদের সাম্প্রতিক ছোটগল্প সুস্পষ্ট তিনটি ধারায় বিভক্ত। এক ধারার ছোটগল্পে কেবল কাহিনির কাঠামো নির্মাণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। কবিতাশিল্পের মতো ছোটগল্পও পরিমিত মাত্রার রূপকল্প দাবি করে কিন্তু এই ধারার রচনাকর্মে তার চিহ্নমাত্র থাকে না। পাঠককে সরল-তরল ভাষায় কেবল কিছু কাহিনি শোনানোই এ-ধারার গল্পকারদের আরাধ্য। অন্য এক ধারার ছোটগল্পে রূপকল্পই প্রধান হয়ে ওঠে, কবিত্বের বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে গল্পকেই হত্যা করা হয়। উপরোক্ত দুই ধারার রসায়নে সৃষ্ট তৃতীয় ধারার ছোটগল্পই প্রকৃত অর্থে শিল্পসফল, যেখানে রূপকল্পের পরিমিত ব্যবহারের ফলে গল্প হারিয়ে যায় না। সাম্প্রতিক কালে এই শেষোক্ত ধারার ছোটগল্প আমাদের বাংলা সাহিত্যে বিরল। এই গ্রন্থের গল্পগুলো সেই বিরল নির্মাণকলায় সমৃদ্ধ। বিষয় নির্বাচনে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য এবং কল্পনার সঙ্গে মনন-মেধার সম্মিলন পাঠককে প্রকৃত ছোটগল্প পাঠের আনন্দ দেবে। একেকটি গল্পের নির্মিতি একেকরকম হলেও কোনও সৃজনশীল রচনাকর্মের ‘হয়ে-ওঠা’ বলতে যা বোঝায় তা অভিনিবেশী পাঠক এই গল্পগুলোতে অনুভব করবেন। বর্ণনাভঙ্গিতে পরিমিত মাত্রার সূক্ষ্ম হাস্যরস সবগুলো গল্পকেই সুখপাঠ্য করে তুলেছে।’
পাঠক এই দাবির যথার্থতা খুঁজে পাবেন প্রতিটি গল্পেই―এমন মনে হয়েছে আমার কাছেও।
লেখক : প্রাবন্ধিক



