আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

আবিদ আনোয়ার : গল্পের মানচিত্রে আঁকেন বিমূর্ত সর্বনাশ : মনি হায়দার

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার

হাতের আঙ্গুলের ঘূর্ণিতে ঘুরতে-ঘুরতে মার্বেল যখন কোনও গর্তে হারিয়ে গিয়ে অন্ধকারেও অস্তিত্বের জানান দিতে থাকে, সেই মুহূর্তটাই গল্প। গল্প হতে পারে বিচিত্র ব্যাকরণে, ক্ষুধিত যৌবনে, স্পর্ধিত স্পর্শে, শোণিতরাঙা ফুলের নৃত্যে, বিলের বালিহাঁসের ডুবসাঁতারে, কৃষকের লাঙ্গলের ফলায় ধানের বাও-কামড়ে, জেলের জালে ধরা-পড়া মাছের শেষ নিঃশ্বাসে… ছোট ছোট চিত্র-অনুষঙ্গ একজন নিপুণ গল্পকারের হাতে হয়ে ওঠে মহত্তম গল্পের আখ্যান। সেই গল্পের ভূগোলজুড়ে কত ধরনের ধান-ভানা আর গীত-গাওয়া হয়, কত ধরনের নৃত্য-বাদ্য বাজে, মর্মমূলে থাকে ছিন্নছিন্ন চিত্র আর অভিন্ন সত্তার ভাঙ্গাগড়া; জলের বানে ছুটে যায় করতলে-রাখা নরমুণ্ডের মানচিত্র… সবই শিল্প-গল্পের নিজস্ব খতিয়ানে অধিভুক্ত।

সেই নিজস্ব খতিয়ানের অন্যতম গল্পকার আবিদ আনোয়ার। আবিদ আনোয়ার বিচিত্র পরিচয়ের সূত্রে বহুমাত্রিক আঙ্গিকের মননময় শিল্পী। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার এবং বৈজ্ঞানিক। বহুধা পরিচয়ের পালায় সর্বশেষ পালক, তিনি গল্পকারও। ২০০৬ সালে আবিদ আনোয়ারের একমাত্র গল্পের বই তিন পাখনার প্রজাপতি ও অন্যান্য গল্প প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। দশটি গল্প আছে এই বইতে। গল্প দশটির নাম: শরীফার জাদু-বাস্তবতা; সৃজনশীল বজ্রপাত; কোদালি বেগম; মুক্তির গোলাপী ফিতা ও আয়োডিন থেরাপি; একটি গাঁজাখুরি গল্প: খালেক মাস্টারের দোজখ-বেহেস্ত; দেবতার গ্রাস; কম্পুভূতের কাণ্ড; এবং তিন পাখনার প্রজাপতি। বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে গল্প সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা: “এই গ্রন্থের গল্পগুলো বিরল নির্মাণকলায় সমৃদ্ধ। বিষয় নির্বাচনে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য এবং কল্পনার সঙ্গে মনন-মেধার যথাযথ সম্মিলন পাঠককে প্রকৃত ছোটগল্প পাঠের আনন্দ দেবে। একেকটি গল্পের নির্মিতি একেক রকম হলেও কোনও সৃজনশীল রচনাকর্মের ‘হয়ে-ওঠা’ বলতে যা বোঝায় তা অভিনিবেশী পাঠক এই গল্পগুলোতে অনুভব করবেন। বর্ণনাভঙ্গিতে পরিমিত মাত্রার সূক্ষ্ম হাস্যরস সবগুলো গল্পকেই সুখপাঠ্য করে তুলেছে।”

আবিদ আনোয়ারের তিন পাখনার প্রজাপতি ও অন্যান্য গল্প বইয়ের গল্পগুলো সম্পর্কে যে-অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে ফ্ল্যাপে, তা সঠিক এবং যথাযথ। নাম-ভূমিকার গল্প ‘তিন পাখনার প্রজাপতি’ পড়ার সময়েই করোটি ছেদা হয়ে প্রশ্ন জেগে উঠবে: তিন পাখনার সত্যি কি কোনও আজিব প্রজাপতি আছে? প্রকৃতি বিচিত্র হাতে প্রাণিজগৎ সাজিয়েছে, সেই জগতে থাকলেও থাকতে পারে, আমরা আর কতটুকুর খবর রাখি। কিন্তু গল্পকার আবিদ আনোয়ার মানুষ-প্রাণিদের আন্তঃপ্রেমের খেলায় দড়ি টেনে দেখিয়েছেন, প্রজাপতি তিন পাখনারও হতে পারে যদি প্রকৃত গল্পকারের হাতে গল্পের আখ্যান গড়ে ওঠে।

‘তিন পাখনার প্রজাপতি’ গল্পে মূল চরিত্র অমল, লাবণী ও রমাকান্ত রাউত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যাবার প্রাক্কালে অমলের বিয়ে ঠিক হয়ে যায় লাবণীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অমল অদ্ভুত এক ব্যাখ্যা হাজির করে দিদির কাছে: “ওর চোখের দিকে তাকালে কেমন দুর্গা-দুর্গা লাগে। তোরা যখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কনে দেখছিলি, আমিও দেখছিলাম, তখন সে নিজেও আড়চোখে একবার আমার চোখে তাকিয়েছিলো। আমি খুবই ভয় পেয়েছি, দিদি। সবাইকে বলে দে ওকে আমি বিয়ে করতে পারবো না। ওর একটা চোরাকটাক্ষেই আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। বিয়ের পর যখন খালি ঘরে আমার চোখের দিকে ভালো করে তাকাবে তখন ভয়ে আমার ঘর ছেড়ে পালাতে হবে। এ বিয়ে হবে না দিদি।”

ভাইয়ের এমন কাতর অনুনয়-বিনয়ে এবং ভয়ের কারণে বিয়েটা ভেঙ্গেই যায় এবং অমল উড়াল দেয় মার্কিন দেশের পথে বিমানে। যেতে-যেতে বিমানে, বিমানবন্দরে ঘুমে-জাগরণে- স্বপ্নে লাবণীকে নানাভাবে প্রত্যক্ষ করতে-করতে ভুল্যাস ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে; স্বাগত জানায় মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে উকিকু নামের এক জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সুন্দরী। অন্য বিমানে এসেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক বাঙালি অধ্যাপক―কোলকাতার রমাকান্ত রাউত। উকিকু দুজনকেই তার গাড়িতে নিয়ে গন্তব্যে যায়। গাড়িতে অমল চক্রবর্তীর সঙ্গে তেমন কোনও কথাই বলল না অধ্যাপক রাউত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গালাহার তাঁর বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের ‘কালচারাল শক’ কাটানোর জন্য তাদেরকে কয়েকদিন নিজ নিজ দেশের কোনও পরিবারে (হোস্ট ফেমিলিতে) থাকার ব্যবস্থা করেন। সেই সূত্রে অমল জায়গা পায় বিনয়কুমার চক্রবর্তীর বাসায়। সেই বাসায় গিয়ে অমল তো অবাক! কারণ বাংলাদেশে দেখে বা রেখে-যাওয়া লাবণীর প্রতিকপি বিনয়কুমার চক্রবর্তীর স্ত্রী শ্রাবণী।

পরের ঘটনার গল্প সাজিয়েছেন গল্পকার আবিদ আনোয়ার প্রজ্ঞা আর বাস্তবতার কুশলী সৌন্দর্যে; ভাবলে অবাক হওয়া কেবল নয়, বিস্ময়ে অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঘটনার ঘনঘটা পরিষ্কার করার জন্য শ্রাবণীর ভাষ্যে অমল যা জানল: শ্রাবণীর বিয়ের পর মা-বাবা ও অন্য অনেক আপনজন কোনও এক দাঙ্গার সময় বাড়িঘর বিক্রি করে কোলকাতায় চলে এলেও বাংলাদেশে শ্রাবণীর এখনও অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে প্রথমেই যার নাম বলল তিনি শ্রাবণীর মেসোমশাই সুবিমল চক্রবর্তী। বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়ায়। তার একটি মাসতুতো বোন আছে যার নাম লাবণী। শ্রাবণীর বাল্যকাল ও কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশেই। বিয়ের পর কোলকাতায় চলে এসেছিল। সেখান থেকেই আমেরিকায়। শ্রাবণী হাসতে-হাসতে আরও জানায়: বাংলাদেশে থাকতে লাবণীকে নিয়ে একত্রে বেরোলে অপরিচিত লোকজন বলত, ছোটটা বেশ ছোট বটে, আসলে ওরা যমজ বোন।

অমল চক্রবর্তী বুঝে গেল: দুনিয়ার এই প্রান্ত আর ওই প্রান্ত কীভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যন্ত্রযুগে জীবনের বেগ যেমন এসেছে, তেমনি বিচিত্র গল্পের আখ্যানও ছড়িয়ে পড়ছে, যেমন আবিদ আনোয়ার আমেরিকায় থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবতার অনুষঙ্গ সাজিয়েছেন নিপুণ কৌশলে এবং স্বাভাবিক প্রকৌশলে। গল্পকার আবিদ আনোয়ার গল্পটার দারুণ একটা ঘূর্ণিপাক বইয়ে দিয়েছেন―যেই ঘূর্ণিপাকে পাঠক বিভ্রান্ত যেমন, তেমনি গল্প পাঠের সুখেও বিভোর।

‘তিন পাখনার প্রজাপতি’ গল্পের প্রধান চরিত্র অমল চক্রবর্তী সেই সূদুরে বসে চিঠি পায় লাবণীর। অমল ততদিনে শ্রাবণীর বাসা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছে। লাবণীর চিঠি পড়ে বুঝতে পারে সম্পর্কের রসায়ন কীভাবে ঘটে? এবং লাবণীর বিয়ে ঘিরে শ্রাবণীর পরিবারের সঙ্গে একটা বিশাল ঘটনার ঝড় বইছে। সেই ঝড়ের গল্পের উচাটনে অমল ছুটে যায় শ্রাবণীর বাসায়। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ লাবণীর সঙ্গে সেই অধ্যাপক রমাকান্ত রাউতের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এবং শ্রাবণী, শ্রাবণীর স্বামী বিনয়কুমার চক্রবর্তী সেই বিয়ের ঘটক। আরও বিস্ময়ের খবর হচ্ছে: শ্রাবণীরা বের হচ্ছে চাইনিজ খেতে (চাইনিজ খাবার আমেরিকাতেও জনপ্রিয়)। খাওয়াচ্ছে রমাকান্ত। আরও চমক, শ্রাবণী আমন্ত্রণ জানাচ্ছে অমলকে; সে-অনুষ্ঠানে অমলকেও যেতে বলছে শ্রাবণী।

শ্রাবণীর সান্নিধ্যে এক সপ্তাহ থেকেই অমল লাবণীর প্রেমে পড়ে যায়। লাবণীও অমলকে যে চিঠি লেখে তাকে প্রেমপত্রই বলা যায়। ‘তিন পাখনার প্রজাপতি’ গল্পে অনেক চরিত্র কিন্তু প্রধান পাখনা তিন: অমল, লাবণী, আর রমাকান্ত। দুই দু গুণে এই গল্পে চার না-হয়ে আবিদ আনোয়ার বানালেন তিন। প্রেম এবং মানবিক সম্পর্কের এমন আন্তঃমহাদেশীয় গল্প বাংলা ভাষায় খুব কমই লেখা হয়েছে। আঙ্গিকের দিক থেকে যাকে ‘বড় গল্প’ বলা হয় এই গল্পটি সেরকম, অনেকটা উপন্যাসের আবহ তৈরি হয়েছে।

‘শরীফার জাদু-বাস্তবতা’ এই বইয়ের প্রথম গল্প। গল্পটার আখ্যান এই দেশে, এই শহরে, অনেক ঘটা-ঘটনার আলোক থেকে তুলে এনেছেন গল্পকার। গল্পটা জানা, শোনা, এবং বোঝারও। কিন্তু গল্পটা কোনওদিন শেষ হবে না। যেসব বিবাহিত মেয়ে মা হতে পারছে না, তাদের জীবনের, সংসারের, বিষাক্ত অধ্যাদেশের গল্প এটি, অনেকটা সামরিক আইনের কাঠামোর গল্প। এই গল্প চিনে-জোঁকের মতো বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের অগণন নারী ও তাদের সংসার। আবিদ আনোয়ার সেই অগণন নারী ও সংসারের কাঠামো থেকে একজন শরীফাকে গল্প-আখ্যানে তুলে এনে সন্তানহীন নারীর দুর্ভোগ-দুর্দশা আর সংসার টিকিয়ে রাখার নৃশংস ভূগোল-মানচিত্র একেছেন অসীম দক্ষতায়।

শরীফা সুন্দরী। বিজ্ঞান পড়েছে। বিয়ের দশ বছর কিন্তু পেটে সন্তান আসে না। স্বামী আলী আসগর নিজেকে এবং স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করিয়েছেন। ডাক্তার বলেছেন: সন্তান হওয়ার মতো শারীরিক বিন্যাসে যা যা দরকার সবই ঠিক আছে কিন্তু সন্তান কেন আসছে না, ডাক্তারেরা বুঝতে পারছেন না। ডাক্তারের না-বুঝতে পারার সুবাদে শহরের কামেল পীর হযরত সাইফুল্লাহ মাহমুদ ফারায়েজীর সুযোগ আসে। শরীফাকে নিয়ে শাশুড়ি আর স্বামী ফারায়েজীর দরবারে যায়।

দরবারে হুজুর যা করেন, জেনে-শুনে-বুঝেই করেন। তিনি জানেন: সংসার এবং জীবন রক্ষা করতে এই সুন্দরী নারীকে যা বলা হবে, তাতেই রাজি হবে। সেই নারীও জানে: শরীর বিলিয়ে দিলে যদি সন্তান আসে আসুক না, সংসার টিকে যাক। আর আমি তো ইচ্ছে করে আসি নাই, নিয়ে এসেছে শাশুড়ি, স্বামী।

আবিদ আনোয়ার ‘শরীফার জাদু-বাস্তবতা’ গল্পে শরীফার পরিস্থিতি এঁকেছেন এইভাবে:

“হুজুরের কথা স্বামীকে বলে কী লাভ হবে? দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই হুজুরের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে কে জানে স্বামী কী কাণ্ড করে বসে! শত শত আলী আসগর ও শরীফা বেগমকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে হুজুরের মুরিদবাহিনী। সবচেয়ে বড় কথা শরীফা যা বুঝেছে তা-ই কি সত্যি? এমনও তো হতে পারে হুজুর তার বিশ্বাস পরীক্ষার জন্য হেঁয়ালিপূর্ণ এসব কথা বলেছেন। ‘দোয়া-ই-বাতেন’ কী তা জানার আগে শরীফার উচিত নয় কারো কাছে কিছু প্রকাশ করা। শরীফাকে জানতেই হবে দোয়া-ই-বাতেন কোন পদ্ধতিতে কাজ করে। বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হলেও হুজুরের দরবার এক দুর্বার আকষর্ণে টানছে শরীফাকে। দোয়া-ই-বাতেন কি তাহলে কাজ করতে শুরু করেছে শরীফার সত্তায়!”

শরীফা বিজ্ঞানের ছাত্রী কিন্তু নারী সংসারের, বিবাহিত। আবিদ আনোয়ার শরীফাকে খুব গভীর থেকে পরিবীক্ষণ করেই গল্পের কাঠামো নির্ণয় করেছেন, আবেগ নয়, বাস্তবতার দাঁত ও করাতে। শরীফাকে আসতে হয় হুজুরের দরবারে। এখন আর স্বামী আলী আসগর আসে না, সঙ্গে আসে শাশুড়ি।

হুজুর বলছে: “আবারও ভেবে দেখো। এই পদ্ধতিতে আমার পড়া-সরবত খেয়ে একা-ঘরে পড়ে থাকতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বপ্নের ঘোরে বিরক্ত করবে জিনেরা। জিনের চেয়ে মানুষ ভালো।”

শরীফা বেগমের সামনে কোনও পথ খোলা নেই। গল্পকার চাইলেও শরীফাদের সামনে-পিছনে উপরে-নিচে কোনও পথই খোলা রাখতে পারেননি। সন্তান জন্মদানের ব্যর্থতার সকল দায় ঘাড়ে ও গর্ভে নিয়ে ঢুকে যেতে হয় হুজুরের গভীর গোপন জিনের নিঃশব্দ কুঠুরিতে। আমরা বুঝতে পারি: শরীফাদের সংসারের অজস্র কোকিলের ছাও মানুষ হয়ে গোটা পৃথিবীকে ভরিয়ে তুলছে ঠিকানাহীন মানুষের সংসার। আবিদ আনোয়ার-এর এই গল্পের শেষ লাইনটা আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর লিখে দেয় রুদ্র ললাটে: “বায়োলজি-পড়া শরীফার কাছে এই প্রথমবারের মতো শিশুর ভ্রƒণকেও মনে হলো প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো।” প্রশ্নবোধক চিহ্নতাড়িত শরীফার মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েই গল্পটার শুরু হয়েছে এভাবে:

“শরীফার কাছে আজকাল প্রশ্নবোধক চিহ্নকে মনে হয় সাপের মতো। উত্তরের অপেক্ষায় ক্যামন যেন ফণা তুলে রাখে। কে এই চিহ্ন বানিয়েছিলো শরীফা জানে না….সাপের সাথে এর আকারগত সাদৃশ্যের চেয়েও স্বভাবগত সাদৃশ্য বেশি… সাপের স্বভাব ছোবল-মারা। প্রশ্নও ছোবল মারে, ঠোকরায়। ছোবলে-ঠোকরে জর্জরিত করে ফেলে চৈতন্যকে…।”

গল্পের শুরুটার সঙ্গে শেষ বাক্যের এই সংহতি গল্পটিকে করে তুলেছে সুবিশাল এক চিত্রকল্পের মতো। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: মনুষ্যপ্রাণির ভ্রƒণ আসলেই প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো।

আবিদ আনোয়ার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়েনা, বর্বর সৈন্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। ছিলেন বড় কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধাদের। রক্ত, বারুদ, গুলি আর মানুষের জীবনের দুর্দশাগ্রস্ত গতিবিধি দেখেছেন, দেখেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে বিচিত্র রাজনীতির উত্থান ও পতন। তারই আলোকে রচিত আবিদ আনোয়ারের গল্প ‘মুক্তির গোলাপী ফিতা ও আয়োডিন থেরাপি’।

বেসরকারি অফিসের কেরানি আফজালকে বহন-করা মিশুকটা চালকের অসাবধানতায় ঢুকে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে। সঙ্গে সঙ্গে অজানা ভয়ে আঁতকে ওঠেন আফজাল। এখনই নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারে। কিন্তু না, কোনও গুলি আসে না। তবে, আফজাল বুঝতে পারেন, গ্রেফতার হতে পারেন যে কোনও সময়ে। এবং গ্রেফতারের পর সরকার পক্ষের উকিল আর নিজের উকিল―দুই পক্ষের জেরা শুনছেন তিনি তাঁর অবচেতনে মিশুকে বসে-বসেই। তিনি কল্পনায় নিজের মামলার জামিনের শুনানি শুনছেন।

আফজালের আইনজীবী বলছেন: “আমার মক্কেল একজন নিরীহ ভদ্রলোক। অধিকন্তু একজন সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা। কিছু প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে সন্ত্রাসী বলার অধিকার আমার প্রতিপক্ষ বিজ্ঞ আইনজীবীর নেই। আমার আরগুমেন্ট যদি অনুমান হয়, তবে তার নিজেরটি অলীক কল্পনামাত্র। আমার মক্কেলের মিশুকে কোনও বোমা বা অস্ত্র পাওয়া যায়নি। কল্পিত ঘটনার দায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না, ইয়োর অনার….”।

সরকারপক্ষের আইনজীবী বলছেন: “আসামি মুক্তিযোদ্ধা হলে তো সোনায় সোহাগা―মানে, নাশকতামূলক কাজের জন্য তিনি বেশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। একে আটকে রেখে আরও জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা করা হোক, ইয়োর অনার”।

গল্প-আখ্যান আমাদের নিয়ে যাচ্ছে মটরদানার উপর দিয়ে, করাতের দিকে। ব্যাখ্যা প্রতিপক্ষের: আসামি মুক্তিযোদ্ধা হলে তো সোনায় সোহাগা; মানে, নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ আছে―কেবল মামলায় বিজয়ী হওয়ার জন্য একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সন্ত্রাসী বানাতে সরকারি কৌঁসুলির বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। মূলত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ আমরা অর্জন করেছি, সেই বাংলাদেশের রাজনীতির চালচিত্র এখন বইছে ভিন্ন স্রোতে, ভিন্ন ইতিহাসে। এই একটিমাত্র কৌশলী বাক্য দিয়ে গোটা মানচিত্র এঁকে দিলেন গল্পকার আবিদ আনোয়ার। এবং পাঠকমাত্রই বুঝে যান: আমরা দাঁড়িয়ে আছি গোলকধাঁধার অসীম চত্বরে। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের কেজি-দরে ক্রয় করে একাত্তরের পরাজিত হায়েনা রাজাকারেরা, এই বাংলায়, যে-বাংলার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা…।

আর গল্পের আফজাল? আবিদ আনোয়ার আফজালের বয়ানে শোনান আফজালের ইতিহাস: যুদ্ধের পর এমএ পড়া তাঁর হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে শুনতে পান যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কদিন আগে মা-বাবাকে মেরে ফেলেছে পাকিস্তানি সৈন্যেরা, স্ত্রী রেহানাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ক্যাম্পে, নয় মাসের মুক্তির কী হয়েছিলো কেউ বলতে পারেনি। মুক্তির মুখও আফজাল হোসেন দেখেননি―জন্ম নিয়েছিল যুদ্ধে যাবার পরের দিন। রেহানা মেয়ের নাম রেখেছিল মুক্তি। আফজাল হোসেন মা-বাবা স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে পেয়েছিলেন ছোট ভাইয়ের মেয়েকে। সেই মেয়েটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। আফজাল নিজের না-দেখা মেয়ের নামানুসারে তারও নাম রেখেছেন মুক্তি। মুক্তির গোলাপি ফিতা খুব পছন্দ কিন্তু আফজাল যত রঙের ফিতাই আনেন―মুক্তি বলে: “চাছু, এইডা তো লাল ফিতা, গোলাফি না।” আসছে ঈদে বাড়ি যাবার সময়ে মুক্তির জন্য আরও গোলাপী রঙের ফিতা নিয়ে যাবেন…. পরিকল্পনা আছে, মুক্তিকে নিয়ে ঢাকা আসবেন। দোকানে-দোকানে ঘুরিয়ে ফিতা দেখাবেন মুক্তিকে….।

গল্পকার আবিদ আনোয়ার পাঠকদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? সচেতন প্রকরণে আবিদ আনোয়ার পাঠকদের নিয়ে যাচ্ছেন বধ্যভূমিতে। কিন্তু বুঝতে দিচ্ছেন না। প্রকৃত গল্পকারের ধনুক-ছেঁড়া টান…. গল্পের শেষ তিরটা শেষ মুহূর্তে ছুঁড়বেন, যাতে গল্পের বুকের রক্তে পাঠক স্নান করতে পারেন। প্রতিবন্ধী মুক্তিকে অপরিপক্ক স্বাধীনতার সমান্তরাল রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন গল্পকার।

আফজাল কিংবা মিশুক চালক দুজনেই নিরাপদে, প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথ থেকে সরে যেতে পেরেছিল। পথে মিশুকঅলাকে নিয়ে চা খেয়েছিলেন। মিশুকঅলা আফজালকে নামিয়ে দিয়েছিল মেসের সামনে। আগামীকাল ছুটির দিন। রাতে জম্পেশ ঘুম দেবেন আফজাল হোসেন। সকালে পত্রিকায় দেখলেন একটা বড় হেডিং: প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা!

পত্রিকার লালরঙে ছাপা লাইনটার দিকে তাকিয়ে আছেন আফজাল। গল্পকার আবিদ আনোয়ার গল্পের শেষ তির ছুড়লেন। গল্পে শেষ তিনটি লাইনে লিখেছেন: “শুনলেন কে একজন খুব জোরে-জোরে দরজার কড়া নাড়ছে। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল একদল খাকি পোশাকের লোক। সঙ্গে হাতকড়া-লাগানো গতরাতের মিশুক-চালক। শুনতে পেলেন পরিচিত সেই ইংরেজি বজ্রধ্বনি: ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট মি. আফজাল।”

একটু আগেই লিখেছি, গল্পকার আবিদ আনোয়ার পাঠকদের বধ্যভূমিতে রাখতে খুব পছন্দ করেন। ‘মুক্তির গোলাপী ফিতা ও আয়োডিন থেরাপি’ গল্প প্রমাণ করল: আমরা এখনও গান পয়েন্টে আছি….।

আবিদ আনোয়ার গল্পের আখ্যানে দেশ, মাটি ও মানুষের ভেতরের রক্ত আর সৃজনের দুর্দান্ত বোলিং করতে পারেন। প্রতিটি বোলিং শব্দে তিনি বাংলার জমিন আর জল মিলেমিশে নতুন এক ধরনের আখ্যান তৈরি করেন, যে-আখ্যানের জন্য রেল লাইনের ধারে অপেক্ষায় থাকে ধীবরেরা, কৃষকেরা, শ্রমিকেরা। ‘খাঁচার মানুষ’ গল্পে আবিদ আনোয়ার এঁকেছেন চিড়িয়াখানার পশুপালক এক ব্যক্তির জীবনালেখ্য; ‘কোদালি বেগম’ গল্পে রয়েছে শ্রমজীবী এক নারীর প্রেম ও জীবনের করুণ পরিণতির আখ্যান।

এর সঙ্গে তাঁর কিছু গল্প আছে যা সাধারণের জন্য নয়; কেবল বিদগ্ধ পাঠকের চৈতন্যকে আলোড়িত করবে।

‘যা কিছু বিকৃত তা-ই শিল্পিত’ এমন এক শিল্পতত্ত্বের ভিত্তিতে চমৎকার এক গল্প ফেঁদেছেন গল্পকার তাঁর ‘সৃজনশীল বজ্রপাত’ গল্পে। এই শিল্পতত্ত্বে বিশ্বাস করেন চিত্রশিল্পী সজলের হবু-শ্বশুর বোরহান সাহেব যিনি চান না তার মেয়ে দরিদ্র সজলকে বিয়ে করুক। বজ্রপাতে আহত শিল্পী সজলের হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে দেখে সজল তার হবু-শ্বশুরকে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলছে: “এই দেখুন, আমি আর সেই দরিদ্র শিল্পী সজল নই; ধীরে ধীরে খুব দামি হয়ে উঠছি তো! এই দেখুন, নিজেই ক্যামন অমূল্য শিল্প হয়ে উঠছি।” একটি প্রেমের গল্পেও এই শিল্পতত্ত্বের ব্যবহার শিক্ষিত পাঠককে মুগ্ধ করবে।

নির্মাণ-কৌশলের দিক থেকে ‘একটি গাঁজাখুরি গল্প’ বিশিষ্টতার দাবিদার। সুনামিতে বিধ্বস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ফার্স্ট লেডি, রেড ইন্ডিয়ান এক লেখক, ইন্ডিয়ান বিউটিশিয়ান এবং প্রেসিডেন্টের কৃষ্ণাঙ্গ দেহরক্ষীকে একসঙ্গে বৈঠাচালিত এক নৌকায় তুলেছেন গল্পকার। ক্ষুধায় কাতর ফার্স্ট লেডির জন্য সুনামি-কবলিত পানিতে ভাসমান মাছ সিদ্ধ করছেন রেড ইন্ডিয়ান লেখক। সিগারেটখোর লেখকের ব্যাগে একটি লাইটার ছিল। আমেরিকান জাতির ইতিহাস লেখা এমন একটা বই-ও ছিল তার ব্যাগে। মাছ সিদ্ধ করার জন্য সেই বই থেকে তিনি একটা-একটা করে পাতা ছিঁড়ছেন আর পোড়াচ্ছেন। কী ইঙ্গিতাত্মক এই গল্প। এক-এক করে বর্ণিত হয়েছে কী প্রক্রিয়ায় ভূমিপুত্রদের দখল থেকে আমেরিকান ভূখণ্ডকে গ্রাস করেছে ইউরোপীয় লোকজন। ‘গাঁজাখুরি’ শব্দটি গল্পের নামের অংশ হলেও ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তে সমৃদ্ধ এই গল্পটি।

আবিদ আনোয়ার কবি হিসেবে যেমন প্রতীক-চিত্রকল্পের চর্চা করেন বেশি, ছোটগল্পেও তেমনটিই চোখে পড়ে। কিন্তু এই রূপকল্প ব্যবহারের কারণে কোথাও-কখনও তাঁর মূল গল্প হারিয়ে যায় না। এটাই তাঁর গল্পের গৌরবময় বৈশিষ্ট্য।

 লেখক : কথাশিল্পী

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button