আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা: পার্থিব বাস্তবতায় অপার্থিব সৌন্দর্য : মাসুদুল হক

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার

আবিদ আনোয়ার-এর কবিতায় অস্তিত্বচেতনার নান্দনিক প্রকাশ লক্ষণীয়। এছাড়া, সময়ের অস্থিরতা, মানবিক যন্ত্রণা, আত্মগত উপলব্ধি ও আর্তি তিনি তাঁর কবিতায় মননশীল চেতনায় তুলে ধরেন আত্যন্তিক বাণীবন্ধে―

‘সমগ্র কোথায় তুমি ? আর্তস্বরে ডাকি যতবার

দূর থেকে সাড়া দেয় অতীন্দ্রিয় কে এক আঁধার;

খণ্ডের যোগফল থেকে বহুদূরে সমগ্রের বাড়ি

জেনেও খণ্ডাংশগুলো জোড়া দিই যতটুকু পারি।’

(সমগ্র কোথায় তুমি)

এক অখণ্ডের মাধুর্যমণ্ডিত জীবনের ও শিল্পের প্রার্থনা করেন আবিদ আনোয়ার। সত্য ও সুন্দরের জন্য তিনি তাঁর কবিতায় নিজেকে ক্রমাগত ভেঙ্গে নিসর্গনির্ভর নির্জনতার মধ্য দিয়ে সুররিয়্যালিস্ট অ্যাবসার্ডিটির মধ্য দিয়ে, বিবমিষার মধ্য দিয়ে, এক অখণ্ড সঙ্গতিময় সৌন্দর্যসত্তার সন্ধানে যাত্রা করেন এভাবে :

‘আমার চোখের মতো অন্য কোনো যাদুকর নেই,

তাকালেই

অন্ধকারও মেলে ধরে অন্তর্গত মহিমার লাল,

নিমেষে ঘড়ির কাঁটা স্তব্ধ হয়, তখন ত্রিকাল

এসে অবলীলাক্রমে ঢুকে পড়ে কালের ভেতরে;

অবলুপ্ত হয়ে পড়ে

তাবৎ সনাক্তচিহ্ন প্রাণী ও জড়ের,

সুন্দরী নারীর সাথে মাদী-কুকুরের

বস্ততই আর কোনো পার্থক্য থাকে না;

শিবির দাপিয়ে-ফেরা কোনো কোনো জাঁহাবাজ সেনা

সহসা শুয়োর হয়ে নেমে-পড়ে ক্ষমতার সমূহ কাদায়;

ঊরুর বন্ধন ছিঁড়ে ঘরের গৃহিণী ডাইনী হয়ে উড়ে চলে যায়!

… … …

এমন যে অন্তর্ভেদী চোখের মালিক সে-ও দেখতে পারি না

আমার অক্ষরগুলো মহাকাল ঠিকমত জমা করে কি না!’

(অবলোকনের মাত্রা)

আবিদ আনোয়ারের কবিতায় আন্তরিক উপলব্ধির টেনশন, আন্তঃপ্রসারের প্রয়োজন নিয়ে রোমান্টিসিজমের বিবর্তিত উত্তরাধিকার সুররিয়্যালিজম থেকে উঠে আসে একটি নান্দনিক বীক্ষায়। তাঁর চিৎকৃত শব্দের প্রবাহ, শব্দস্রোত অনর্গল বয়ে চলে সুন্দরকে প্রতিবিম্বিত করতে। কিন্তু তিনি মনে করেন সে-সুন্দর কখনও ধরা দেয় না তাঁর কাছে। তিনি লেখেন :

‘হে সুন্দর, তবু কী নিষ্ঠুর তুমি বেদেনীর মতো

নির্বিকার ভেসে চলো সময়ের জলে,

কখনো দাও না ধরা কবিতার শিথিল অক্ষরে।’

(কল্লোলের দিকে)

আবিদ আনোয়ার তাঁর কবিতায় লিবিডো-চেতনা প্রসারণ করে সত্তরের দশকের কবিতায় সৃষ্টি করেছেন একটি স্বতন্ত্র ধারা। তা অশ্লীল নয়, তবে তা সুন্দর ও মার্জিত। কেননা তাঁর কবিতায় বাসনার রক্তিমতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে নেই কোনও অশ্লীল জৈবিকতার স্পন্দন; আছে একজাতীয় অবদমন ও স্মৃতিতাড়িত বিষাদ-বেদনা। দৃষ্টান্ত :

‘নারীর কটাক্ষে থাকে যে মহান শিল্পের সুষমা

তাকেও কস্মিনকালে সবটা বুঝি না

তবু-ও গর্বিত চোখে অবাক তাকিয়ে থাকি,

… … …

ছানিপড়া দৃষ্টিপথে আবছা-আবছা কেঁপে ওঠে চেনা নরলোক।

অথচ সত্তায় দোলে এলোমেলো সুন্দরের বিমূর্ত প্রতিমা

যেন কোনো বিকেলের প্রসন্ন পুকুরে

জলের আর্শিতে-ভাঙা সখিনার মুখ।’

(খণ্ডাংশের মালিকানা]

কিংবা

‘বিদেহী সত্তার কাছে সমর্পিত আমার অহং―

তবু-ও অস্পষ্ট চোখে দেখি আর ভাবি

আমার শরীর যেন

তোমার সুস্বাস্থ্য কবে ছুঁয়ে দেখেছিলো।’

(তুমি)

সাহিত্য ও শিল্পকর্মের সৃষ্টি কিংবা তার রসাস্বাদনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রতি মুহূর্তেই মানুষের একটি অনন্যসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। সে ক্ষমতা হলো তার সৌন্দর্যচেতনার, সৌন্দর্য উপভোগ করা ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করার অপরূপ বোধের সখ্যে। সৌন্দর্যচেতনা মানুষকে পশুপ্রবৃত্তি থেকে সম্পূণ পৃথক করে রেখেছে। ‘গগনবিহারী চিল’ সারা জীবন আকাশের বুকে ডানা মেলে দিয়েও গভীর নীলবর্ণের আভার কোনও বিশেষ ইঙ্গিত খুঁজে পায় না। অন্যদিকে, মানুষ পৃথিবীর বুকের ওপর দাঁড়িয়েও নীল চাঁদোয়ার মাঝে এক পবিত্র সৌন্দর্যের সন্ধান পায়, তার সঙ্গীত-কাব্য-চিত্রকলায় সেই সৌন্দর্যকে নতুন-নতুন করে আবিষ্কার করে। কবি আবিদ আনোয়ারও তাঁর ‘নন্দনতত্ত্ব’ নামের কবিতায় বস্তুজাগতিক পৃথিবী ও জীবনের গভীর থেকেই সৌন্দর্যের সন্ধান করেন, খুঁজে ফেরেন ‘জ্যোৎস্নার মতো কালোত্তীর্ণ রেণু’: ‘কী জানি হঠাৎ কেন ছুঁচোটাকে দেখে আমার কেবলই মনে পড়ছিল: কবিরও বোধের শুঁড়ে খেলা করে নয়-নয়টি সোনার পশম যেন  রাডারের ফিনিক অ্যান্টিনা! জাগতিক ময়লা ঘেঁটে কবিও ছুঁচোর মতো নিবিষ্ট নিয়মে খুঁজে ফেরে অন্যবিধ খাবারের কণা, মাঝে মাঝে জীবনের গভীর ভেতরে ডুব দিয়ে এলে এরকম জ্যোৎস্নার মতো কালোত্তীর্ণ রেণু নিয়ে ফেরে!’

(নন্দনতত্ত্ব)

কবি আবিদ আনোয়ার অতীন্দ্রিয় জগতের রোমান্টিকতা-অনুসন্ধানী কবি। তাঁর রোমান্টিক চেতনায় নিজের অস্তিত্ব আর প্রতিবিম্বের ক্ষণমিলনের প্রেক্ষাপটে তিনি বলতে চেয়েছেন :

‘কাচের ওপারে থাকে কায়াহীন ছায়ার মানুষ,

যে-আমি এপারে আছি

এটাই প্রকৃত আমি শরীরে-সত্তায়!’

আবার, দ্বিধান্বিত হয়ে একই কবিতায় এমনও বলেন:

‘আমি তার প্রতিবিম্ব অথবা সুদূর

ছায়াপথে আবর্তিত

কর্কট-নামীয় কোনো রাহু কিংবা নক্ষত্রের দাস ?’

(প্রতিবিম্ব এবং আমি)

অস্তিত্ব চেতনার গভীর মূল স্পর্শ করে তিনি যে অবচেতনার অতলে নেমে যেতে চান, তা-ও এক ধরনের সুন্দরের অন্বেষণ। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত কবিতা যেমন ভক্তহৃদয় থেকে ঈশ্বরের দিকে, পরম সত্তার দিকে গেছে, তেমনি আবিদ আনোয়ারের কবিতাও নারীর শরীর থেকে দেহাতীত এক অতীন্দ্রিয় চেতনায় যাত্রা করে। তাঁর কবিতা ‘লিবিডো-চেতনা’ থেকে সৃষ্টি হয়ে অপরূপ সৌন্দর্যের সন্ধানে, পরম-জগতে, পরিভ্রমণ করে। এখানেই তাঁর কবিতার শিল্পচেতনার নান্দনিক সাফল্য। তিনি লেখেন: ‘নারীর সৌন্দর্যে খুঁজি দেহাতীত অন্য কোনো মানে’ (চতুর্দশপদী ১)।

মূলত আবিদ আনোয়ারের কবিতায় অপার্থিব সৌন্দর্য পার্থিব বাস্তবতায় প্রতিবিম্বের মমি হয়ে প্রকাশ পায়।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button