আবিদ আনোয়ারের ধলপহরের পদাবলি : তারেক রেজা

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় আবিদ আনোয়ারের সক্রিয়তা সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। কবিতা, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ-গবেষণা, গল্প, গীতরচনা এবং সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখ করার মতো। সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তাঁর দীর্ঘ পদচারণায় সময় যে ফসল ফলিয়েছে, তার গতি ও গন্তব্য, মান ও মূল্য নিরূপণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের দাবি, সকল পরিচয়ের ওপর তাঁর কবিসত্তার কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিবিম্বের মমি (১৯৮৫), মরা জোছনায় মধুচন্দ্রিমা (১৯৯২), স্বৈরিণীর ঘরসংসার (১৯৯৭), খড়বিচালির বৃক্ষজীবন (২০০১), কাব্যসংসার (২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৫), আটকে আছি মধ্যনীলিমায় (২০০৯), ধলপহরের পদাবলি (২০১৯) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও গানের ভেতর দিয়ে ভুবন দেখার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁর কবিতার ভুবনেই আমরা সবচেয়ে বেশি আরাম ও আনন্দ বোধ করি। কবিতার মানুষ হিসেবে তিনি আমাদের আলোচনা ও সমালোচনায় বরাবরই সক্রিয় আছেন। বর্তমান নিবন্ধে আবিদ আনোয়ারের কবিসত্তার সমগ্রতায় দৃষ্টি নিক্ষেপের অবকাশ নেই, ধলপহরের পদাবলি অবলম্বনে তাঁর চিত্ত ও চিন্তার প্রতিনিধিত্বশীল কয়েকটি প্রবণতা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে।
আবিদ আনোয়ার বিশাল সমুদ্রের চেয়ে ছিপছিপে তন্বী নদী অধিক ভালোবাসেন কিন্তু তাঁর নদীর দিকে তাকিয়ে সমুদ্রের কথা ভাবতেও মন্দ লাগে না। বিন্দুর মধ্যে যাঁরা সিন্ধু দর্শনের আনন্দ পেতে চান, তাঁরা আবিদ আনোয়ারের ওপর ভরসা রাখতে পারেন। বিশাল গল্প বা ঘটনার সারবস্তুটি তিনি অল্প কথায় তাঁর কবিতার শরীরে গেঁথে দেন। কবির অভিজ্ঞতা যখন সংহত অবয়বে ধরা পড়তে চায়, তখন মিথ-পুরাণের বিস্তৃত অরণ্যে ঘুরে বেড়ানোর কোনও বিকল্প থাকে না। বিচিত্র সব সাহিত্যিক অনুষঙ্গ মিথিক আবহে উপস্থিত হয় তাঁর কবিতায়।
ধলপহরের পদাবলির প্রথম কবিতা ‘গুমোট হাওয়ায় বর্ষামঙ্গল’ কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের যক্ষ, যক্ষবধূ, রামগিরির সঙ্গে আমাদের নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। লোকসাহিত্যের খনার অনভিজ্ঞ বর্তমান সম্পর্কে তিনি ভিন্নতর বক্তব্য হাজির করেন। মেঘলা আকাশ মানেই যে রবীন্দ্রনাথের ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’ নয়, সে কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। সেকালের পরিপ্রেক্ষিতকে পুঁজি করে একালের বৈরী বাস্তবতার এই আঁটসাঁট উপস্থাপন পাঠককে মুগ্ধ করে। সেকাল-একালের সম্পর্কসূত্রটি কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তার কিছু নজির কবি হাজির করতে চেয়েছেন :
‘সে-কোন কালে বৃষ্টি ছিলো, জলের নামও বারি,
নীবিবন্ধ ভিজিয়ে-নামা নিঙারি’ নীল শাড়ি
এমন কোনো বধূয়া নেই দাঁড়িয়ে আঙিনায়―
কেউ জানে এমন দিনে কারে কী বলা যায়!’
[গুমোট হাওয়ায় বর্ষামঙ্গল]যক্ষপ্রিয়ার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলির রাধার গাঁটছড়া বেঁধে দিয়ে দিলেও একালের প্রণয়ঘটিত বিচিত্র সব দুর্ঘটনার আভাস দেন কবি। এ-কালে কেউ কারও অপেক্ষা করে নেই, মেঘের আঁচলে আর মুদ্রিত হয় না বিরহব্যাকুল দীর্ঘশ্বাসের দিনলিপি বরং গোপন বৃষ্টিপাতে ক্রমশ স্ফীত হয় ধনবান দুষ্টু পুরুষতন্ত্র। সম্পর্কের শিথিলায়ন ও আস্থাহীনতার দুর্মর দৃশ্যকল্প ধারণ করতে গিয়ে কবি অসাধারণ সংযম ও মিতব্যয়িতার পরিচয় দিয়েছেন।
ভালোবাসার গতিপথ চিহ্নিত করা হয়তো সম্ভব নয় কিন্তু প্রধান কিছু পথ বা প্রবণতা তো নির্দেশ করা যেতেই পারে। এ-জাতীয় কবিতায় অধিকাংশ সময়ই ভালোবাসার আড়ালে ধরা পড়ে শারীরিক সান্নিধ্যের নানা মাত্রা। কবির যাত্রা যে-পথেই হোক, সব পথ এসে অবশেষে এই পথেই মিলিত হয়। আবিদ আনোয়ার একটি কবিতায় একজোড়া নর-নারীর প্রথম শারীরিক সান্নিধ্যের অভিব্যক্তিকে শব্দবন্দি করেছেন। ঝোপের আড়ালে একটু ছুঁয়ে দেখার স্মৃতি, সম্মতিজড়িত মৃদু প্রত্যাখ্যান, লজ্জায় লাল হয়ে-ওঠা অনাস্বাদিত শিহরণ―এইসব দৃশ্যপট কবি ধারণ করেছেন, স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘ভালোবাসা ক্রমশই নিম্নগামী হয়।’ সমৃদ্ধ চাষির ঘরেই হানা দেয় ডাকাত, আপনজনকে দূরে নিয়ে যায়, সুখ, সম্পদ ও সমৃদ্ধিসহ যাবতীয় সঞ্চয় লুট করে নিয়ে যায় :
‘সে-ফসল নেই আজÑশূন্য ঘরদোর,
কবেই ডাকাতি-করে নিয়ে গেছে সময়ের চোর :
নিজেই জনক হয়ে যখন সে চুমু খায় আপন শিশুকে
ভাবে না এ-উষ্ণতায় সে-ও ছিলো অন্য কারো বুকে।
কখনো বিস্ময়ে যদি বলি উঠি : এ-আমার নিজের তনয়?
নিবিষ্ট গৃহিণী থেকে সহসাই দার্শনিক সেজে
ছুঁড়ে মারো বুমেরাং : ভালোবাসা ক্রমশই নিম্নগামী হয়?’
[ভালোবাসা ক্রমশই নিম্নগামী হয়]গতিশীল ধাবমান সময়ের যে রূপকল্প শিল্পসাহিত্যে নির্মিত হয়, তা তো গতিশীল জীবনবৃত্তেরই দ্যোতক। কণ্ঠস্বর যেমনই হোক, আমাদের গাইতে হয়: জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিজস্ব নিয়মে। কবিতাটি সেই জীবনের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শরীর-নির্ভরতা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত তা ব্যক্তি, সমাজ, সমস্যা, সম্ভাবনা ও সম্পর্কের নানা প্রান্তে আলো ফেলতে চায়। আধুনিক মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, বিবরবাসী। নিজের চারপাশে সে নিজেই নির্মাণ করে নেয় এক অনতিক্রম্য দেয়াল। সেই দেয়ালে কপাল-ঠুকে রক্তাক্ত হতে হয় নিজেকেই। এই রক্তাক্ত ও বিধ্বংসী বিচ্ছিন্নতার এক ভয়াল দৃশ্য ধরা পড়েছে ‘বেষ্টনী’ কবিতায়। কবি তাই তাঁর ব্যক্তিগত আঙিনায় কেবল ‘পৌরাণিক সরীসৃপে’র আনাগোনা দেখতে পান। চারপাশে অজস্র প্রেতিনী ও ডাকিনীর উত্তাল উদ্দাম নৃত্য। এই নৃত্যনাট্যের নায়ক হিসেবে কবি নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন এক আশ্চর্য দর্পণ, যার মধ্যে সময়, সমাজ ও মানুষের পতনদৃশ্য উন্মোচিত হতে থাকে। কবিতাটিতে সমকালীন জীবনবাস্তবতার নানা দিক ধরা পড়েছে। অন্ধ হয়ে প্রলয়কে উপেক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা এই কবিতায় একটি শ্বাসরুদ্ধতার অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কবি বলেন :
‘ইচ্ছে তবু বলে উঠি আকর্ণবিস্তৃত কোনো সুতীব্র চীৎকারে :
ওহে, তোমরা কে কোথায়!
আমাকে উদ্ধার করো ভেঙে এই ভীতিকর বীভৎস বেষ্টনী।’
[বেষ্টনী]‘প্রাগৈতিহাসিক’ কবিতায় আবিদ আনোয়ার কবিতার নামকরণের সার্থকতা প্রমাণে সক্রিয় থেকেছেন মনে হয়। আদিম মানুষের গুহাজীবনের গল্প আমরা জানি, বিলুপ্ত ডাইনোসরের স্মৃতিও আমাদের মন থেকে মুছে যায়নি কিন্তু কবি যখন বলেন, ‘ডায়ানোসোরের চেয়ে বীভৎস জন্তুর বাস নাগরিক বনে’, তখন পাঠকের সৃজনশীল সত্তা প্রচণ্ড এক হোঁচট খায়। তখন কল্পনা নয়, কবির বক্তব্যের অনুগামী হলেই পাঠকের দায়িত্ব শেষ। একালের ভোগবাদী মানুষের মধ্যে পাশবিক সত্তা, বিশেষ করে নারীলিপ্সু পুরুষপ্রজাতির আগ্রাসী আচরণ ও নির্লজ্জ সক্রিয়তায় বিক্ষুব্ধ কবি আমাদের মনে করিয়ে দেন, ‘বিবর্তনে শ্রেয়তর টুরিয়াসোরাস বসে বসের টেবিলে/ ইতিউতি চায়, শেষে স্থিত হয় সেক্রেটারি মোহিনীর তিলে।’ দৃশ্যটা খুবই পরিচিত। মেট্রোপলিটন সভ্যতার প্রাত্যহিক দিনলিপি হিসেবে এই দৃশ্যের গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে কিন্তু এর বাইরে পাঠকের কি আর কোনও প্রত্যাশা নেই ? কবি বলছেন :
‘চলো যাই, ফিরে যাই পর্বতের পুরানো গুহায়
আবারও চকমকি ঠুকে প্রকৃত আলোক দেখি সান্দ্র কর্নিয়ায়।
[প্রাগৈতিহাসিক]কবির অনুভব ও উপলব্ধি নিঃসন্দেহে উচ্চতর। মানবমুক্তির প্রত্যাশাও আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে। কিন্তু বক্তব্যের বাইরে ভিন্নতর কোনও দ্যুতি কিংবা দৃশ্যপট আমাদের চোখে ভেসে ওঠে না। তবে, অনাস্বাদিত আনন্দের ভোজে আবিদ আনোয়ার আমাদের আমন্ত্রণ জানাননি, এমন নয়। সহজ-সাধারণ-সাবলীল এক বাণীভঙ্গি তাঁর কবিতায় অসাধারণ দীপ্তি সঞ্চার করে। এ-প্রসঙ্গে আমি তাঁর ‘কীর্তনের আসরে একদিন’ কবিতার কথা বলতে চাই। এই কবিতায় আক্ষরিক অর্থেই এক কীর্তনের আসর উপস্থিত, শিবু কীর্তনিয়া যে আসরের গায়ক। এই আয়োজনে ‘আসর-ভরা নারী-পুরুষ’ দেখা যাচ্ছে। প্রাগতভাবে শিবু কীর্তনিয়া রাধার বিরহ, পরকীয়া, ইত্যাদি প্রসঙ্গই উল্লেখ করছেন। কিন্তু কবি যখন বলেন, ‘হঠাৎ দেখি তোমার হাত আমার মুঠোচ্যুত’, তখন কবিতার পাঠক হিসেবে আমাদের নড়েচড়ে বসতে হয়। ভাবতে বাধ্য হই, তারপর ? তারপর কী হলো ? এই প্রশ্নাকুল পাঠকচিত্তেরই ভালো নাম হয়তো ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ যার স্পর্শে আমাদের চিত্ত ঝলমল করে ওঠে। এই অসাধারণ কবিতাটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ অসম্ভব :
‘সেই যে কবে তোমার চোখে পদ্মদীঘি দেখে
ভেবেছিলাম এর গহীনে রত্ন আছে জমা―
ডুব-সাঁতারে অতল জলে তুলতে গিয়ে একে
হাতড়ে দেখি কিছু তো নেই, ক্লেদজ নর্দমা!’
[কীর্তনের আসরে একদিন]কবিতাটি এভাবেই শেষ করেছেন কবি। এই কবিতায় এমন কোনও অচেনা অনুষঙ্গ নেই যা পাঠকের অভিজ্ঞতার বাইরের কোনও বাস্তবতা হাজির করে। তবু মন্ত্রের মতো এই কবিতা যন্ত্রনির্ভর বর্তমান দিনযাপনের ক্লান্তিকর নর্দমা কিংবা কারাগার থেকে মুক্ত করে নিয়ে যায় অন্য দিগন্তে, যেখানে কিছুতেই হাতের মধ্যে হাত থাকে না, বিশ্বাসের ফুসফুস সংশয়াকুল পোকার দখলে। আবিদ আনোয়ার ‘কাব্যলক্ষ্মী মানবী আমার’ কবিতায় দেব-দেবীর আদেশ ও আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে কাব্যরচনায় অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যযুগীয় প্রবণতার সমান্তরালে হাজির করেছেন নিজেকে, যদিও দেবীর আসনে তিনি মানবী প্রিয়তমাকে বসিয়েছেন। হোমার, বাল্মিকীসহ সকল মহাকবির রচনাতেই দেবীর আসন সুচিহ্নিত। কাব্য রচনার এই ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতায় আধুনিকতার প্রধান পুরুষ মাইকেল মধুসূদনও স্মরণ করেছেন তাঁর দেবীকে। আবিদ আনোয়ার ভেনাস, বীণাপাণি বা কোনও কল্পিত মানসপ্রিয়ার পরিবর্তে সরাসরি বলছেন, ‘আমার রমণী তুমি, তোমাতেই খুঁজি তাই প্রেরণা ও বাণী।’ প্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চান তিনি, কোনও আড়াল রাখতে চান না। তিনি লেখেন―
‘অতএব দয়া করো, দূরে থেকে দেখিও না দেবিত্বের ভান―
শব্দে-ছন্দে এসো নারী, উপমেয় তুমি নিজে, তুমি উপমান।’
[কাব্যলক্ষ্মী মানবী আমার]প্রলয়ের বৈশিষ্ট্যই এই যে, অন্ধত্বের অজুহাতে এর অভিঘাত থেকে মুক্তি মেলে না। আবিদ আনোয়ার নারীর যৌবনকেও এইরূপ প্রলয়চিহ্ন হিসেবে একটি কবিতায় হাজির করেছেন। ‘নারান্দির নূরী পাগলি’র রূপ ও লাবণ্যের যে পরিচয় এই কবিতায় বিধৃত, তা নিশ্চয়ই তেমন চিত্তাবর্ষক নয়। কিন্তু একদা এই নারীর যা ছিল বলে কল্পনা করেছেন কবি, তা আক্ষরিক অর্থেই সুন্দর ও মনোহর। কবি ভেবেছেন, একদা এই নারীর হয়তো স্বামী-সন্তান-সংসার ছিল, গরিবের বউ সব মানুষের ‘ভাবি’―এই গ্রামীণ প্রবাদের মতো করেই হয়তো পাড়ার মুদি-দোকানি ও মাস্তানেরা তাকে ‘ভাবি’ সম্বোধন করে সান্নিধ্যলাভের চেষ্টা করেছে। হয়তো বিয়েও হয়নি তার, বাবা-মায়ের আদুরে সন্তান ছিল সে, ‘নয়তো সে অন্ধকারে বেড়ে-ওঠা অন্য কোনো নারী।’ এসবই কবিকল্পনামাত্র। কিন্তু পাগলির আচরণে প্রাণপণে যৌবনকে রক্ষা করার প্রয়াস থেকে আমরা ধরে নিতে পারি : লুট হয়ে-যাওয়া যৌবনের হাহাকারই তাকে পাগল করে দিয়েছে। এই অংশটুকু কবির ভাষায় পাঠ করা যাক :
‘কী হবে এসব জেনে, এখন অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মিছে―
প্রায়ই দেখি শূন্যমুঠো আগলে রেখে নিতম্বের পিছে
কী এক সম্পদ যেন লুকোতে-লুকোতে বলে : দিমু না দিমু না!
চা’য়া কী দেহস বেডা, দোজহের লাকড়ি আমি, দেহা বড় গুণাহ!
তোগোর মতলব জানি : হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হিঃ হিঃ
আচ্ছা তবে ক’ তো দেহি এই হাতে কী?
কখনো উৎসুক হয়ে কেউ যদি বলে দেখি কী এমন ধন!
মুঠি খু’লে নূরী বলে :
ক্যান তোর চক্ষু নাই? এই দ্যাখ্, আমার যৈবন…’
[নারান্দির নূরী পাগলি]চিত্ত ও চিন্তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া এ এক অনবদ্য কবিতা।
বর্তমান কালের বাস্তবতায় এই কবিতা আমাদেরকে আরও বেশি ক্লেদাক্ত করে। নারী ও শিশুদের ওপর যৌননিপীড়নের ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের ‘সভ্যতা’র মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছে। এই সভ্য ও ভদ্র সমাজের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ, ঘরহীন ‘পথের সম্রাজ্ঞী’ নূরী পাগলি আমাদের চপেটাঘাত করে।
এরকমই আরেকটি নির্মম দৃশ্য ধরা পড়েছে ‘পরিবানুর পরাবাস্তব পা’ কবিতায়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে অনেক পোশাকশ্রমিক নিহত হয় এবং আহত ও পঙ্গু হয় বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। আবিদ আনোয়ার এই ঘটনায় পা-হারানো এক পোশাকশ্রমিক পরিবানুর বরাত দিয়ে এই কবিতাটি লিখেছেন। ঘটনা হিসেবে তিনি জানাচ্ছেন, পরিবানুকে পা কেটে রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, পরিবানুর সমস্ত চেতনাজুড়ে আছে সেই হারানো পা। ফলে, যেদিকে তাকায় কেবল পা-ই দেখতে পায় সে। ‘পঙ্গু ও বস্ত্রমন্ত্রী’সহ তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ভিড় করেছে হাসপাতালে। সেই সঙ্গে মিডিয়াকর্মীদের প্রচণ্ড ভিড়। মন্ত্রী মহোদয় পরিবানুর মাথা ও চুলে হাত-রেখে এই বলে আশ্বস্ত করছে যে, ‘হাত-পা জোগাড় করা আজকাল খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়―/ তবে কি না চিঁড়ে ভিজতে দিতে হবে কিছুটা সময়’ কারণ টেন্ডারপ্রক্রিয়ার একটা ব্যাপার আছে, সরবরাহ যথেষ্ট আছে কি না তা-ও নিশ্চিত হতে হবে। এসব কথা পরিবানুর কানে যাচ্ছে কি না তা বোঝা মুশকিল। কারণ তার সমস্ত সত্তাজুড়ে কেবলই অদৃশ্য ও বিচ্ছিন্ন কিছু পায়ের দৃশ্য লেপ্টে আছে। এই দৃশ্যপট আবিদ আনোয়ারের ভাষায় :
‘কিন্তু একি! জানালা গলিয়ে এসে আচম্বিতে কথিত বেলুন
মন্ত্রীর মাথার কাছে দ্রুতলয়ে ওঠে-নামে, পরি হেসে খুন;
সে-হাসি কান্নার মতো; পরি ছাড়া শোনেনি তা কেউ―
এত যে মিডিয়াকর্মী, মন্ত্রীদের দেহরক্ষী কিংবা কোনো ফেউ।
পরিবানু জানতে চায়―প্রশ্ন শুনে সকলেই হত-বিহ্বল:
‘আচ্ছা স্যার, এ-পায়ে আগের মতো পরা যাবে মল?’
[পরিবানুর পরাবাস্তব পা]আহত পরিবানুর পা এভাবেই আমাদের ক্ষমতাকাঠামোর কপালে উঠে আসে, যদিও ঘামের মতোই একসময় মুছে যায় এইসব শ্রমজীবী মানুষের আত্মদানের সমস্ত স্মারক। কিন্তু গরু মেরে জুতা দান করার মতো এইসব মর্মঘাতী দৃশ্যপট আবিদ আনোয়ারের কবিতায় এবং সেই সূত্রে পাঠকের মগজে, মননে জ¦লজ¦ল করতে থাকে।
আবিদ আনোয়ার তিনটি অষ্টকের একটি সংক্ষিপ্ত সিরিজ ধলপহরের পদাবলিতে স্থান দিয়েছেন। প্রথম অষ্টকের শিরোভাগে তিনি শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটকের একটি সংলাপ জুড়ে দিয়েছেন : ‘দ্যায়ার ইজ সামথিং রটেন ইন দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক’। এই অষ্টকের নামকরণও অনেকটাই এই সংলাপের বঙ্গানুবাদ: ‘কোথাও পুড়ছে কিছু’। সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে এই কবিতায় মিথিক আবহে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডেনমার্কের সেই পোড়া বা পচা গন্ধের সঙ্গে কবির স্বকালের বিধ্বংসী প্রবণতার একটি সংযোগসূত্র বিনির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে :
‘কোথাও পুড়ছে কিছু অনির্বাণ অদৃশ্য আগুনে :
নিপুণ দহনশিল্প―নেই কোনো অবশিষ্ট ছাই।’
ছাই না-থাকলেও সেই পোড়াগন্ধ থেকে নাসিকার মুক্তি নেই। তাই :
‘কেবল পোড়ার গন্ধ নাসারন্ধ্রে এসে মারে ঘাই―
প্রশিক্ষিত সারমেয় হয়ে আছি ইন্দ্রিয়ের গুণে।’
শেক্সপিয়রের কাল থেকে কবির কালের দূরত্ব তো কম নয়। কিন্তু এই গন্ধের ঘাড়ে বসেই কবি দুই হাতে এই দুই কালকে স্পর্শ করেছেন―
‘আমার অগ্রজ বসে ছিমছাম কোপেনহেগেনে
সেই কবে পেয়েছিল অবাঞ্ছিত অশুভের ঘ্রাণ―
কটুগন্ধে বিষায়িত আমাদের সাজানো বাগান,
নিরীহ পায়রার শব পড়ে থাকে নাগরিক ড্র্রেনে।’
[অষ্টক ১ : কোথাও পুড়ছে কিছু]দ্বিতীয় অষ্টকের নাম ‘বিস্রস্ত মেঘদূত’। কবি এবার শেক্সপিয়র থেকে কালিদাসে ফিরে এসেছেন। কালিদাসের যক্ষ তার প্রিয়ার কাছে পত্র লিখে তার বাহক করেছিলেন মেঘকে, যদিও মেঘের সঙ্গে কথোপকথনে যক্ষের বিরহ-বেদনার চেয়ে যক্ষপ্রিয়ার বিধ্বস্ত অবয়বই অধিকতর উদ্ভাসিত হয়েছে। এই অষ্টকে কবি নিজেকে নির্বাসিত কল্পনা করেছেন। এই নির্বাসন সম্ভবত আমাদের সবারই নিয়তি। সভ্যতার অভিশাপপিষ্ট আমরা সবাই সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। অন্যের সঙ্গে তো নয়ই, নিজের সঙ্গে যোগাযোগের সেতুটিও আজ ভেঙে গেছে। এই ভাঙনের বেদনাই কবিতাটিতে ধরা পড়েছে। কালিদাসের যক্ষপ্রিয়া রাজগৃহে বন্দি থাকলেও তাতে তার সম্মতি ছিল না। কিন্তু এই কবি বলছেন: ‘আমার বধূয়া থাকে সম্মত রক্ষিতা হয়ে দূর অলকায়।’ তবু বিস্রস্ত মেঘের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন কবি, নিজের খবরটি যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার বিনীত অনুরোধ করেছেন। যদিও কালিদাসের মেঘের চেয়ে আবিদ আনোয়ারের মেঘকে অধিক উদার হতে হবে। কবি বলছেন : ‘অথবা তোমার কাছে আমি চাই আরও একটু বেশি উদারতা:/ পারো তো ঝড়ের তেজে উড়িয়ে বাড়িতে নাও অধমের লাশ।’ এ কোন বাড়ির কথা বলেছেন কবি ? এমন প্রশ্নও তো করা যায়, আধুনিক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধে উজ্জীবিত মানুষের কোনও বাড়ি থাকে কি না! আধ্যাত্মিক বিবেচনায় এই বাড়িকে অন্য বিশেষ অর্থে গ্রহণ করা যায় কিন্তু থাক সে-কথা।
তৃতীয় অষ্টকে আবিদ আনোয়ার কোনও ঐতিহ্য বা মিথের শরণ নেননি, বাংলাদেশের মানুষের গলার কাঁটা ফারাক্কার বাঁধ ও গঙ্গার পানির সঠিক হিস্যা আদায়ের জটিল সমস্যার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন মোদি ও মমতা। পানির অভাবে যখন ‘এ দেশের নদ-নদী ভরে গেছে মূত্র আর মলে’, তখন মমতার অসম্মতিতে মোদিজি বাংলাদেশকে জল দিতে পারছেন না। কবি বুঝেছেন, মমতা ও মোদির এই সম্মতি-অসম্মতি আসলে পরিকল্পিত ‘জলকেলি’। কবি ভাবছেন এ আমাদের পুরোনো পাপের শাস্তি। তাই আহ্বান করছেন :
‘উঠে এসো, চলো যাই সীমান্তের খুব কাছাকাছি,
আবারও নতুন করে দেশভাগ, বঙ্গভঙ্গ খেলি।’
বাঙালির লোকঐতিহ্য তথা লোকমিথে বেহুলার উপস্থিতি আমাদের প্রাণিত করে। জীবনানন্দের কবিতায় বেহুলা যে সজীবতা ও সঞ্জীবনী ছড়িয়েছে তা আমাদের স্মৃতি থেকে কিছুতেই লুপ্ত হয় না। আবিদ আনোয়ার মনসামঙ্গলের চাঁদ সদাগর, লখিন্দর ও বেহুলার উপস্থিতিতে নিজের ব্যর্থতার গল্প শুনিয়েছেন ‘মনসামঙ্গল ১’ শীর্ষক কবিতায়। মনসার অভিশাপে লখিন্দরের সর্পাঘাতে মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কবি নিজের অভিশপ্ত জীবনের কথা বলেছেন। লখিন্দর তিনি নন, চাঁদ সদাগরের পুত্রও নন কবি, কিন্তু সত্য এই যে, কবি তো এই চাঁদ সদাগরেরই উত্তরপুরুষ। তাই তাকে বলতে হয় :
‘তবুও জীবনভর দেখেছি তো সারাঘরে সাপের বসতি।
সুতানলী নয় ওরা―তারও চেয়ে ক্ষীণকায় অতি;
মূলত অদৃশ্য সুতো, মাঝে মাঝে মনে হয় বোধেরও অতীত!
যাদের উদ্বাস্তু করে আদিকালে গড়েছেন ভিত
ঘরমুখো পূর্ব-পুরুষেরা ওরা যেন সেইসব সাপেদের ভূত!
কী দারুণ ক্ষিপ্রগতি এবং অদ্ভুত।’
[মনসামঙ্গল ১]এই সাপ কেবল ঘরই দখল করে না, দেহ ও মনের ভাঁজেও তার অবাধ গতায়াত। এই সর্পাঘাতের যে যন্ত্রণা, কবির ভাষায় তা খণ্ডমৃত্যু, জীবনানন্দ যাকে বলেছিলেন ‘আজকের জীবনের টুকরো-টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার’ অর্থাৎ মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা, ‘টুকরো টুকরো মৃত্যু’।
‘মনসামঙ্গল ২’ কবিতায় আবিদ আনোয়ার পুরাণকথিত সুতানলী সাপ ও বেহুলার প্রান্ত বদল করে দিয়েছেন। সাপ নয়, বেহুলাই দংশন করে কবিকে। প্রেমের যন্ত্রণাকে নানা নামে সম্বোধনের রীতি বাংলা কবিতায় চোখে পড়ে কিন্তু প্রেয়সীর আঘাত কিংবা বিরহের যন্ত্রণাকে বেহুলার সঙ্গে তুলনা সত্যিই অসাধারণ। ছোট্ট, সংহত এই কবিতাটি পাঠককে অনেকক্ষণ ধরে আলোড়িত ও আন্দোলিত করতে থাকে। এই কবিতার কোনও দেশ নেই, শেষ নেই, সকল দেশের সকল কালের প্রেমিক-হৃদয়কেই তা ধারণ করতে চায়। পুরো কবিতাটিই এখানে উদ্ধৃত করছি :
‘আমার শবদেহ নিয়ে কোনো নারী ইন্দ্রলোকে কখনো যাবে না,
দেখাবে না পথ তাকে গাঙুরের ঢেউ কিবা শ্বেতশুভ্র ফেনা;
বাজাবে নূপুর-ধ্বনি দেবালয়ে, ব্যর্থ হবে মনসার রোষ,
বিশুষ্ক কঙ্কালে ফের দৈবক্রমে জন্ম নেবে জীবনের কোষ
এমন ভরসা নেই―প্রধান কারণ বলি, বাকি থাক অন্য সবগুলা:
আমাকে দংশন করে সুতানলী সর্প নয়, স্বয়ং বেহুলা!’
[মনসামঙ্গল ২]আবিদ আনোয়ারের কবিতায় গ্রিক পুরাণখ্যাত অন্ধ তিরন্দাজের [কিউপিডের] উপস্থিতি টের পেয়ে পাঠক হিসেবে একটু নড়েচড়ে বসতে ইচ্ছে করে। এই তিরন্দাজ কবিকে বিদ্ধ করেছে এবং শরবিদ্ধ হৃদয় নিয়ে তিনি ছুটে যাচ্ছেন প্রেমিকার দিকে। দৃশ্যকল্পটি অসাধারণ। এই অসাধারণত্ব আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে যখন দেখি তিরন্দাজের তীব্র তিরও প্রেয়সীর বর্মসম বল্কল ভেদ করতে ব্যর্থ হয়। এই আচ্ছাদন ‘এতই দুর্ভেদ্য যেন ব্যর্থ হবে মন্ত্রপুত শিবের ত্রিশূল।’ তিরন্দাজ ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে আসছে, তা-ও মেনে নিতে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু ‘সেই সুবিখ্যাত অন্ধ তিরন্দাজ’ যখন কবির কানে-কানে বলে―‘ভুলে যাও কবিবর, শি ইজ অ্যা স্টুপিড’, তখন মনটাই খারাপ হয়ে যায়। কিউপিডের সঙ্গে স্টুপিডের মিল অক্ষুণ্ন রাখার দায় স্বীকার করতে গিয়ে, কবি পাঠককে হতাশ করেছেন। গল্পটি আর এগুতে পারে না, হঠাৎ করেই যেন থেমে যায়। ছড়িয়ে পড়ে না। কবিতাপ্রেমিক পাঠককে এই কবিতা আর জড়িয়ে ধরতে পারে না।
মুখ ও মুখোশের সম্পর্কটা কোনওকালেই সরল কিংবা একরৈখিক ছিল না। শিল্প-সাহিত্যে মুখোশ চিত্র-রূপক-প্রতীকের সম্মোহন তৈরি করে, শোভন দৃশ্যময়তার আড়ালে অশোভন দৃশ্য ও রূপকল্পের জন্ম দেয়। ‘মুখ যা বলে তার চেয়ে অধিক বলে মুখোশ’―অস্কার ওয়াইল্ডের এই মন্তব্যের কথাও নিশ্চয়ই অনেকের মনে পড়বে। মনে পড়তে পারে জে. ফোরম্যানের বিবেচনাও―‘মুখোশ তার পরিধানকারীকে মুক্তি দেয় সকল ধরনের সঙ্কোচ, নিয়মকানুন ও প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় থেকে। তবে এটা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় বিশৃঙ্খলা, বিনাশ এবং পরিবর্তনশীলতা, যা আমাদের সঙ্গেই আছে।’ তাই, মুখোশ কেবল নিজেকে আড়াল করা বা উৎসবের আনন্দবর্ধক অনুষঙ্গ হিসেবে আজ আর সীমাবদ্ধ নয়, একালে মুখোশ একটি ভিন্নতর শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আবিদ আনোয়ারের একটি কবিতায় মুখোশের উপস্থিতি আমাদের চিন্তাকে কোনদিকে ঠেলে দিচ্ছে তা ভেবে দেখতে চাই।
‘করমালির বৈশাখ ও তার উত্তরপুরুষ’ কবিতায় ঋণগ্রস্ত করমালির দুর্দশার চিত্র আছে। মহাজনের হাতে নাজেহাল হওয়ার ঘটনাও অসংখ্য করমালির জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তাই, আসল না-চেয়ে সুদের টাকার জন্য মহাজন যখন চাপ দেয়, তখনও আমরা আশ্চর্য হই না। করমালি নিজের রোজগারে নয়, বউ নসিমনের পরিশ্রমের টাকায় মহাজনের ঋণশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কবিতার এই অংশ কবির ভাষা ছাড়া বুঝে নেওয়া অসম্ভব :
‘বলি আমি আগামী শুক্কুরে যদি আসেন হুজুর…
নসিমন পান্তা বেচতে গিয়েছে রমনায়―
তাতে যদি না-কুলায়
শখের বাউটিটা তার বেচে দেবো, দেখি আমি পারি কতদূর?
আগামী শুক্কুরবারে আসেন হুজুর…’
নসিমন ফিরে এল,
বিক্রিবাটা ভালো তবু মেজাজটা নয় তত খোশ―
ছেলেটার বায়নামত গাঁটের টাকায় :
চারুকলা থেকে তাকে কিনতে হলো রঙিন মুখোশ।’
[করমালির বৈশাখ ও তার উত্তরপুরুষ]এই কবিতাংশের ওপর যে কোনও রকম ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ-মন্তব্যই কবিতাটির তাৎপর্য ও সৌন্দর্যহানির কারণ হতে পারে। বরং কবিতার রঙিন মুখোশের আড়ালে যে কুৎসিত বাস্তবতা ঘর করছে, সেই দিকেই মগ্ন থাক পাঠকহৃদয়। কল্পনা করুন, ছেলেটা রঙিন মুখোশ পরে বৈশাখ যাপন করছে, আর নসিমন অপলক চেয়ে আছে তার দিকে। পেটে ভাত না-হয় না-ই থাক, মুখে হাসি ঝরুক আর প্রতিবেশী সমবয়সী ছেলেমেয়েরা তাকে ঘিরে অবাধ আনন্দে নাচতে থাক। সেই নাচের শব্দে করমালির সক্ষম ও সমর্থবান পূর্ব-পুরুষদের ঘুম ভাঙবে তো ?
আবিদ আনোয়ার বিজ্ঞানের ছাত্র। রসায়নশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রিধারী এই কবির রচনায় বিচিত্র সব বৈজ্ঞানিক অনুষঙ্গ জায়গা করে নিয়েছে। একটি কবিতার নামকরণে কবির এই বিজ্ঞান-দৃষ্টির পরিচয় মেলেÑ‘নিষ্ক্রিয় অনুঘটক’। কেবল নামকরণেই নয়, কবিতার শরীরেও স্থান পেয়েছে জন্মরহস্যের নানা নিগূঢ় তত্ত্ব―‘জানা নেই শুক্র কি না ডিম্বাণুর দোষে/ সন্তানসম্ভবা নারী কমোডে প্রসব করে সাধের ফসল’; ‘মেঘের মন্ত্রণাসভা’ কী কারণে পণ্ড হয়েছে তা কবি জানাননি কিন্তু বাতাসের আক্রাশে বৃষ্টিহীন আষাঢ়ের মতো বৈরী সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। কবির সময় ‘অঘটনে বড় বেশি পটিয়সী’ কিন্তু এই দুঃসময়ের জন্ম দিচ্ছেন যারা, যাদের সক্রিয় উপস্থিতি আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তাদের নিয়েই কবি ভাবিত। তাঁর বর্তমান ভয়াবহ, ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তাই ভয় হয়―‘অগ্রগতি দূরে থাক, পেছনেও যাবে নাকি ফেরা?’ এই অনুর্বর সময়ই কি তাঁর স্বকালের কবিদের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে? কবি বলছেন :
‘সমগ্রতা বিখণ্ডিত নিরঙ্কুশ ব্যর্থতার বায়োরসায়নে,
প্রাণান্ত চেষ্টার পরও কখনো দেখিনি কোনো চূড়ান্ত বিজয়―
শব্দ-ছন্দ-উপমার শত আয়োজনে
একালের সব কবি তাহলে কি থেকে যাবে ‘সম্ভাবনাময়?’
[নিষ্ক্রিয় অনুঘটক]কবির এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ভার হয়তো কালের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। শব্দ-ছন্দ-উপমার বিচিত্র আয়োজন মানেই যে সুস্থ-সংহত-সম্পন্ন কবিতা নয়, কবি নিশ্চয়ই তা জানেন। তবু লিখতে হয়। পুরাতন কবিদের সঙ্গে নিজেদের গাঁটছড়া অক্ষুণ্ন রাখার প্রত্যয়ে―নানা কথায় রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘যেদিন দেখব পৃথিবীতে নূতন কবি আর উঠছে না, সেদিন জানব পুরাতন কবিদের সম্পূর্ণ মৃত্যু হয়েছে।’ ‘নূহ নবীর কাছে একটি সওয়াল’ কবিতায় আবিদ আনোয়ার নূহ নবী ও তাঁর কিস্তি প্রসঙ্গে পরিচিত গল্প ও ঘটনায় নিবিড় আস্থা রেখেছেন। আমাদের শুনিয়েছেন, পরিচিত ও ধর্মগ্রন্থ-নিরূপিত ঘটনাবলির বিস্তারিত। নূহের আমলে পৃথিবীতে যে ‘গজব’ নেমে এসেছিল তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্রষ্টার নির্দেশেই নূহের তরীতে আশ্রয় নিয়েছিল নরনারী, পশুপাখি, বৃক্ষ ও ফসলের বীজসহ পৃথিবীতে জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় বিচিত্র উপাদান। প্লাবন শেষে আবার পৃথিবী হয়েছিল শস্যশ্যামলা―‘পবিত্র মাটিতে ফের জেগেছিলো অনাবিল জীবন-স্পন্দন,/ পুণ্যবান মানুষেরা চুষেছিলো সতীসাধ্বী পৃথিবীর স্তন।’ কিন্তু সেই সতিসাধ্বী পৃথিবী পুণ্যবান মানুষের উপস্থিতিতে আবার কীভাবে বিষাক্ত হলো, কীভাবে জালিম ও দুষ্টুচক্রের কবলে পতিত হলো পৃথিবী―এই রহস্য উন্মোচন করতে চান কবি। ‘এজতেহাদে সত্য মিলে বলেছেন স্বয়ং মাবুদ’―এই বাণীতে আস্থা রেখেই কবির রুহের কন্দরে অনবরত এই প্রশ্নের বুদবুদ জেগে ওঠে। কবিতার শেষে কবি যে আশঙ্কার কথা বলেছেন, তা কবির ভাষাতেই উদ্ধৃত করছি :
‘ভয় হয় ফের যদি অনুরূপ বান আসে এই পৃথিবীতে
পুণ্যাত্মাকে জলে ফেলে ওরা নিজে ঠাঁই নেবে কালের কিস্তিতে!’
[নূহ নবীর কাছে একটি সওয়াল]নীরবতা কখনও-কখনও সবাক ও সক্রিয় বাস্তবতার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। নীরবতাও এক ধরনের ভাষা যা বোঝার সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না কিন্তু ভুল-বুঝে বিপদকে ঘনীভূত করার মানুষের অভাব হয় না কখনও। কবির ভাষায় : ‘নীরবতা কথা বলে, অন্ধকারে ধ্যানগ্ন নিশিও সবাক। মধ্যরাতে বাদুড়ের চেঁচামেচি কিংবা তক্ষকের ডাক’ শুনে ঘুম ভেঙে-যাওয়া রমণী যখন রমণের তৃষ্ণা নিয়ে অতৃপ্ত অবস্থায় পুনরায় ঘুমাতে যায়, তার কাছে নীরবতার অর্থ অনুধাবনের প্রস্তাব করেছেন কবি। তাঁর মতে, মুখরিত দিন এই রমণীর কাছে কেবল প্রগলভ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। শব্দের আঘাতে শব্দেরও মৃত্যু হয় কখনও-কখনও, রাত্রির নীরবতাই তার ভাষায় শাণিত দীপ্তি সঞ্চার করে। সমুদ্রের ভাষা বোঝার জন্য এর গর্জনের চেয়ে নীরবতায় নিমগ্ন হওয়া জরুরি। প্রকৃতির এই সব আয়োজন থেকে কবি যখন ফিরে আসেন নিজের কাছে, তখনই তাঁর প্রেমিকার নীরবতা কবিতার ভাষায় অনূদিত হতে থাকে :
‘এখন যখন তুমি নারী নও, অর্থহীন মুখরা রমণী
বুঝি কেন ভাষাতত্ত্বে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত চিহ্ন আর ধ্বনি।
[শব্দাঘাতে শব্দ মরে যায়]নীরবতার কীর্তন-আশ্রয়ী এই কবিতা সম্পর্কে নীরব থাকাই ভালো কিন্তু আবিদ আনোয়ারের এই কবিতা সম্পর্কে তাঁর নারী পাঠকেরা চুপ থাকবে তো ? নারী পাঠকেরা ‘মুখরা রমণী’র মতো প্রাচীন অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে চাইবেন নিজেদের ? রসায়নের ছাত্র তিনি কিন্তু ভাষাতত্ত্বের কাঁধে বন্দুক রেখে দক্ষ শিকারির মতই লক্ষ্য ভেদ করেছেন। আবিদ আনোয়ারের কবিতার প্রাকরণিক সংহতি ও সমৃদ্ধির স্বতন্ত্র আলোচনা থেকে আমি বিরত থাকতে চাই। ভাব ও চিন্তার কবিতা হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্তসমূহ সম্পর্কে তিনি সচেতন অর্থাৎ ভাব ও রূপের শৈল্পিক পরিণতির জন্য প্রকরণ-পরিচর্যায় তিনি যথেষ্ট যত্নবান। তবে, আমার বিবেচনায় চিত্রকল্প বিষয়ে আগ্রহ ও আকর্ষণই আবিদ আনোয়ারের কবিতাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এই চিত্রকল্প নির্মাণের প্রয়োজনেই তিনি বিচিত্র সব প্রাকরণিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অলঙ্কারশাস্ত্রে চিত্রকল্পের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, চিত্রকল্পের কাঁধে হাত না-রেখে কবিতার জটিল-গভীর পথে খুব বেশি অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। চিত্রকল্পের ধারণা সকল কবির নিশ্চয়ই একরকম নয়। একইভাবে চিত্র ও চিত্রকল্পের ভেদরেখাটি অনেক কাব্যসমালোচকের কাছেও অস্পষ্ট থেকে যায়। কবি হিসেবে আবিদ আনোয়ার যেমন চিত্রকল্প-সচেতন, তেমনি সমালোচক হিসেবেও চিত্রকল্পের গতিবিধি চমৎকারভাবে নির্দেশ করতে সমর্থ হয়েছেন। তাঁর কবিতার দিকে তাকিয়েও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব। স্বতন্ত্র উদ্ধৃতি হাজির করছি না এই কারণে যে, চিত্রকল্প সমগ্র কবিতার সাপেক্ষেই উজ্জ্বল, প্রবল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সমগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে এর দীপ্তি ও দৃঢ়তার সামান্য অংশই মূর্ত হতে পারে। ধলপহরের পদাবলি পাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি : আবিদ আনোয়ারের এই বিশ্বস্ত উচ্চারণে ভরসা রাখা যায়।
আবিদ আনোয়ারের অধিকাংশ কবিতার মৌলসত্য বা মর্মবস্তুটি কবিতার শরীরেই মূর্ত থাকে, পরিশ্রমী পাঠকের কাছে তাঁর প্রত্যাশা অতি সীমিত। বিষয় বা বক্তব্যে তিনি একনিষ্ঠ থাকতে পছন্দ করেন। বস্তুনিষ্ঠ কবিতা যাঁদের কাক্সিক্ষত, তাদের জন্য এটা নিশ্চয়ই সুসংবাদ। তাঁর ‘শব্দাঘাতে শব্দ মরে যায়’ কবিতায় বিধৃত নীরবতার নান্দীপাঠ আমাদের মুগ্ধ করেছে। কবিতাটির শুরুতেই ‘নীরবতা কথা বলে’―এইরকম দাবি করেছেন তিনি। কবিতার পাঠক হিসেবে আমি আমার ভাবনাকে বিচিত্র পথে প্রসারিত করতে চাই, কবিতায় আমার সৃজনশীলতা ও কল্পনাপ্রতিভার অবাধ ও উন্মুক্ত বিকাশ-বিস্তৃতির ইঙ্গিত বা উসকানি প্রত্যাশা করি। তাঁর কবিতায় শব্দ ও ছন্দের নিপুণ গাঁথুনি, বিশেষ করে মিতব্যয়ী শব্দোচ্চারণে পাঠক শেষ পর্যন্ত কবিতায় নিবিষ্ট থাকতে পারেন। এ-কালের, এমনকি তাঁর কালের অনেক কবির রচনাতেও এই গুণটি সুলভ নয়। আবিদ আনোয়ার বিশ-শতকের সত্তরের দশকের সমাজ ও রাজনীতিসম্পৃক্ত কবিতার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। রাজনীতি-নির্ভর কবিতায় বক্তব্যসর্বস্বতা ও উচ্চকণ্ঠের উপস্থিতিকে যাঁরা ভালো চোখে দেখেন না, তাঁদের কাছেও আবিদ আনোয়ার শক্তিমান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। কারণ কবিতা তথা শিল্পের দায় স্বীকার করেই সমাজ ও মানুষের ক্ষতি ও ক্ষরণের নানা দিক উন্মোচন করেছেন তিনি। প্রত্যাশিত আগামীর জন্য তাঁর যে আশাবাদ, তা-ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিচিত্র অনুষঙ্গে কবিতার অনিবার্য উপাদান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। আবিদ আনোয়ারের কবিজীবনের পরিধি বিবেচনায় আনলে এ কথা বলাই যায় : পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই তিনি একেকটি কাব্যগ্রন্থ পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাই তাঁর কাব্যগ্রন্থ খুব বেশি না-হলেও, কবি হিসেবে তিনি সর্বদাই পাঠকের স্মৃতি ও সত্তায় জাগ্রত থেকেছেন। আবিদ আনোয়ার পাঠকের সৃজনশীলতার ওপর খুব বেশি নির্ভর করেন বলে মনে হয় না, বরং কল্পনার চেয়ে চিন্তার দিকেই তাঁর পক্ষপাত পরিস্ফুট। কবি হিসেবে তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি যত্নশীল থাকতে পছন্দ করেন। একইভাবে পাঠকের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়েও তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের কিছু চিহ্ন তিনি কবিতার শরীরে রেখে যান। আবিদ আনোয়ার কবিতার সঙ্গে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। এখনও তিনি সরব-সজাগ-সক্রিয়। তিনি ভাবতে ভালোবাসেন এবং সেই ভাবনাকে সংহত অবয়ব দেওয়ার কাজেও যথেষ্ট দক্ষ তিনি। কবিতা কী, কবিতার কাছে তাঁর প্রত্যাশার ভূগোলটি কীরূপ হবে, তা-ও কখনও-কখনও কবিতায় ব্যক্ত করেছেন তিনি। তাঁর কাব্যভাবনার গদ্যভাষ্যও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর কবিতায় স্বকালের অসুস্থতা নানা মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছে। কবিতার সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কহীনতার কারণসমূহ চিহ্নিত করেছেন তিনি এবং এই অনুভব ও উপলব্ধিতে আস্থা রেখে নিমগ্ন থেকেছেন কবিতায়। তাঁর কবিতায় যাপিত জীবনের প্রতিধ্বনি প্রবল, কাক্সিক্ষত বা প্রত্যাশিত আগামীর ছবিটিও অনুপস্থিত নয়। প্রেম ও যৌবনের ধর্মে কখনওই আস্থা হারাননি তিনি। তাঁর কবিতায় তাই ধরা পড়েছে প্রণয়ের বহুবর্ণিল অভিজ্ঞান, নারী-পুরুষ সম্পর্কের নানামাত্রিক উন্মোচন। স্বকালের সংঘাত-সংঘর্ষ তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না, কবিতায়ও তা অবলীলায় জায়গা করে নেয়। এ কারণেই ধলপহরের পদাবলি পাঠ এবং সেই সুবাদে আবিদ আনোয়ারের সান্নিধ্য আরামদায়ক।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক



