আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

আজ, কাল এবং পরশুর জন্যে বার্তা : কৌশিক গুড়িয়া

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার

হোয়াটসঅ্যাপে বর্ষীয়ান কবি আবিদ আনোয়ারের কাব্য ও তথ্য পেয়ে যখন পড়তে বসলাম, বিশ্বাস করুন তখন আমার লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা ছিল না… ভাবলাম, [ভারতে বসেও] কেন এতদিন আবিদ আনোয়ারের রচনা পড়া হয়নি আমার ? ভাবলাম, আজকের হাজারো অকবিতার ছদ্ম-সমাহারে এই কবি আমাকে যেন অকৃত্রিম এক সুবাসে জড়ালেন।

হ্যাঁ, সত্যি তাই। সম্পাদকের পাঠানো অল্পকিছু রচনা পড়েই তাঁকে আমার আপাদমস্তক কবিতার ঘোরে ডুবে-থাকা এক মানুষ বলে মনে হয়েছে। আনোয়ার সাহেবের সেই মৌন-মুখর কবিতাযাপনের কাছে শহুরে বাগাড়ম্বর কিংবা মেকি দেখনদারির সৌকর্য নিশ্চিতভাবেই ম্লান দেখায়। চাতুর্য কিংবা ছলনাকে পেছনে ফেলে মৃদুপায়ে এগিয়ে যায় তাঁর এক-একটি পঙ্ক্তি।

[সম্পাদকের প্রেরিত ৪০টি কবিতায়] আবিদ আনোয়ারের যে সমস্ত পঙ্ক্তি আমার ভাবনা-তরঙ্গকে উসকে দিল সেগুলো―

১.

এ কী!

শব্দ নিয়ে খেলতে এসে দেখি

শব্দ নিজে আমাকে নিয়ে খেলে;

বরং এরা সবাই পটু, আমিই এলেবেলে!

২. শুধুই যারার আগে বলে যাবো: ঝুট সবই ঝুট…

ধিকৃতেরা খাবে কেন স্বীকৃতির মোহন বিস্কুট ?

৩. নিরিবিলি পড়ে আছো খ্যাতিহীন শব্দ-কারিগর―

অদৃশ্য বাবুই তুমি অলীক টার্সেলে বোনো অন্তহীন ঘর।

৪. ভেতরে-ভেতরে ভাঙে ব্যক্তিগত তারও রাজ্যপাট

অথচ লিঙ্কন থেকে ব্রুনাইয়ের সামন্ত সম্রাট

একেই ফলাও করে নির্দ্বিধায় স্বাধীনতা বলে

জীবনের বিষবৃক্ষ ঢেকে রেখে মোহন বল্কলে

৫. সাগ্রহে জীবন প’ড়ে আমি আঁকি শব্দচিত্র, তুমি কি তা পারো ?

৬. আমি শুধু জেনে গেছি: পোকার রাজত্বে আমি অসহায় ফল,

জানি না কে বেঁচে আছি―এটাই কি আমি নাকি আমার বাকল!

৭. খয়েরি শালিক পাখি কলস্বরা পঙ্ক্তিভোজে খাদ্য খুঁটে খায়:

ফসলের ন্যায্য হিস্যা, স্বাদেগন্ধে লেদাপোকা-ফড়িংয়ের মিল,

ইত্যাকার বিষয় ছাড়াও তুমি থাকো আলাপের মুখ্য এজেন্ডায়;

তোমার ছন্দের মতো এলায়িত ভঙ্গিমায় ওড়ে শঙ্খচিল।

৮. এসব বুজরুকি ছাড়ো, ছাড়ো মেকী পাণ্ডিত্যের ধানাই-পানাই…

বৃক্ষ মানে মাটিতে প্রোথিত মূল, শক্ত-খাড়া শিড়দাঁড়া চাই

৯. আয়না কখনো মিথ্যা বলে না, ভড়ংয়ের জানে অর্থ:

যে-নারীকে দেখে আসার মাতাল

বাড়ি ফিরে সেও ধুয়ে ফেলে গাল―

বানানো তিলের নিচে ভেসে ওঠে নষ্ট ব্রণের গর্ত!

১০. জীবনবিরোধী এই পৌর জল, ওষুধের শিশি,

স্কচের লেবেল-আঁটা বোতলেও পুরোটাই দিশি!

১১. আমি কবি, নবী নইÑনিজেরই বয়ান লিখি, দূর হ দেবদূত,

জেনে নে আমার কাছে: কবিতাও সৃষ্টিকর্ম, স্বতঃস্ফূর্ত কেবল গু-মুত!

১২. শীতের পোশাক নিতে ফিবছর ডিসেম্বর মাসে

উড়ন্ত গাড়িতে চড়ে সান্তা ক্লজ বাংলাদেশে আসে।

পথ-চেয়ে বসে আছে পশ্চিমের রাজা থেকে মালী,

উৎপাদনে ব্যতিব্যস্ত ভেড়া ও বাঙালি।

১৩. জীবের সুখাদ্য জীবÑএই মর্মে বোঝা যায় ঈগলের খাঁই,

তিনি কেন সর্বভুক যার কোনো ক্ষুধা-তৃষ্ণা নাই ?

কিছু সাধারণ কথা

সাধারণভাবে একজন লেখকের, বিশেষত কবির, রচনাশৈলি কিংবা কাব্য-আভা এযাবৎ কালে বিশ্লেষিত হয়েছে ব্যাকরণ ধারাকে আষ্টেপৃষ্ঠে অনুসরণ করেই। কেননা আমরা ধরেই নিয়েছি, ব্যাকরণই হলো শুদ্ধি-বিচারের একমাত্র প্রচলিত হাতিয়ার। ফলত শিল্পের পাঁচ-ফোঁড়নে শুদ্ধির স্বাদ-গন্ধই বিচার্য হয়ে ওঠে। তবে, আলোচক বা ভাষ্যকারদের ধারণার পশ্চাতেই লুকিয়ে থাকে এক অপ্রিয় সত্য: তা হলো ব্যাকরণের কপিবুক প্রবলতা শিল্পের খোলা মনকে অনেকাংশে গলা টিপে হত্যা করে। ব্যাকরণগত শিল্প বা সাহিত্য গঠন-কাঠামোর চ্যুতি না-থাকলেও সে-নির্মাণে বাংলা কবিতা ফুল্ল কুসুমিত গলা ছেড়ে গাইতে পারে না। সে-রচনা যেন হয়ে ওঠে বেড়ি-বদ্ধ নাইটিঙ্গেলের প্ররোচিত সুরমাত্র…কিন্তু সুখের কথা হলো: আবিদ আনোয়ারের কবিতা তেমনটা নয়। ব্যাকরণগত সীমানায় তাঁকে আবদ্ধ করা যাবে না। এই কবি মুক্ত ও স্বাধীন; তাই তিনি এতদিন পাঠক-আনুকূল্যের নিরিখে পরাধীন ছিলেন।

বেশ কটা দশক আগেই অনেকের সুখ্যাতি গড়ে ওঠার পূর্বেই তাঁর আরও বড় স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল; কিন্তু পঙ্কজের বীজ যেমন বহুকাল পরে হলেও অঙ্কুরে জেগে ওঠে, জলতলে সুবাস বিলিয়ে দেয়, এই কবিও তেমন। বাংলা পাঠক এঁকে হয়তো খানিক দেরি-করে বুঝে উঠতে পারলেন। এ-অক্ষমতা তাদের নিজের। পক্ষান্তরে, কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য এ গ্রন্থ-সম্পাদকের।

সম্পাদক এবং আমাদের আলোচ্য কবি উভয়েই জানেন সেভাবে উপযুক্ততা পাননি তাঁরা। কবির শব্দ-শস্যে সে-স্বাদ স্পষ্টত লেগে আছে। অন্তর থেকে প্রতিবাদ করেছেন তিনি। সে-প্রতিবাদ প্রায় প্রতিটি পঙ্ক্তিতে বুনে দিয়েছে বিপুল বার্তা। মানবিক ও মানসিক ক্ষোভকে দলা-পাকিয়ে অবলীলায় তিনি ছুড়ে দিয়েছেন শিল্প-নিয়ামকদের প্রতি। আবার যেন মনে হয়, সমূহ ক্ষোভ ও বার্তা আত্মস্থ করেই কাঠকয়লার পীড়ন দিয়েছেন নিজেকেই। আর, সে-ধোঁয়ার অঙ্গার আজ, কাল ও পরশুর জন্যে দাস্য-স্ফুলিঙ্গের রূপ পেয়েছে সাহিত্য-পাড়ায়।

এ-কথা ঠিক যে, তিনি তাঁর মতো লেখেন, এবং তা ধ্রুপদ ঘরানার। কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক ভুবনায়নের যুগে তিনিও কি তাঁর কাব্য-গঠন পাল্টাবেন ? দেখতে ইচ্ছে করে, যদি তেমনটাই হয় কোনওদিন। কেননা, তাঁরই একটি কবিতার নাম ‘মিউটেশন’।

কিছু আধুনিক নির্ণয়-প্রণালী

এ পর্যন্ত পঠিত তাঁর কাব্যসম্ভারের [সম্পাদকের প্রেরিত ৪০টি কবিতার] সংখ্যা-গুণগত বিশ্লেষণ করে পাই, তাঁর রচনায় ছন্দ-অন্ত্যমিল-মাত্রার কবিতা ৯১% আর অবশিষ্ট ৯% কবিতায় সেসব রাখেননি তিনি। [আমার পঠিত] তাঁর রচনায় বাংলা শব্দ আছে ৮৬%, অবাংলা শব্দ ৪% এবং দেশজ প্রান্তিক শব্দ রয়েছে ১০%। কবিতার ৩৪ শতাংশে শিরোনাম একটি শব্দে আবদ্ধ; বাকি ৬৬ শতাংশ শিরোনাম দুই বা তিনটি শব্দে লেখা। কবির ৬৮% কবিতা কুড়ি লাইনের মধ্যে এবং বাকি ৫৩% কবিতায় কুড়ি লাইনের বেশি পাওয়া যায়। যদি বলি একজন কবি কি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ? তারও উত্তর আছে আবিদ আনোয়ারের কবিতায়। তাঁর ৬১% রচনাই সমাজ-পরিসরকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে।

…            …            …

অবশিষ্ট ৩৯ শতাংশ কবিতা খানিক আত্ম-পরিসরে রচিত হলেও বার্তা থাকে জাতি ও গোষ্ঠীর প্রতি। সেসব কবিতায় প্রসঙ্গ আসে রাষ্ট্র, পৃথিবী কিংবা নিজস্ব কথার এবং যথাক্রমে তেমন কবিতা তাঁর রচনায় ৪৩%, ১৩% এবং ৪৪%। যদি চিত্রকল্পের আবহ নিয়ে নিরীক্ষা করি তো দেখা যায়, কবির শব্দ-বুননে পল্লিকথা জায়গা করে নেয় ৮২ ভাগ ক্ষেত্রে আর নগরকথা সেখানে কেবল ১৮ ভাগ। সামগ্রিকভাবে সেসব কবিতার স্রোত বয়ে চলে আপামরের দিকে। আত্ম-উপলব্ধির কৃতি ও দর্শন হয়তো কবিকে কিছুটা হলেও অন্যমনস্ক করে তোলে, করে তোলে প্রক্ষুব্ধ সময়ের ডামাডোলকে দূর অথবা নিকট থেকে দেখে ফেলার স্বভাবী দার্শনিক। তাই, তাঁর কবিতায় ক্ষোভ পাওয়া যায় ৩০% ক্ষেত্রে, আত্মদহন ১২% এবং শব্দের ছোট ছোট রূপায়ণ বার্তা হয়ে ছড়িয়ে যায় [আমার পঠিত] ৫৮% কাব্যে। তাঁর কবিতা ধ্রুপদ শিল্পবিশেষ। তাঁর ৮৬% কবিতা তার প্রমাণ দেয়, বাকি ১৪ % সমকাল ঘরানার আদল পায়। একটি কথা না-বললেই নয় যে, আবিদ আনোয়ার প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের একজন ধ্রুপদী কবি। সমকালীন বাংলা কবিতার অযথা-চকচকে প্রকরণ তাঁর রচনায় নেই, ঠিক যেমন করে তাঁর রচনায় নেই অজস্র অকাব্যের খই। তাহলে কী আছে আবিদ আনোয়ারের কবিতায় ? তাঁর আছে অনাবিল এক কবিতা যাপন। চটুলতার বিপ্রতীপে আছে সততার অজস্র শব্দভার। আছে ছন্দ-প্রবণতা। আছে সমাজ, রাষ্ট্র, বিভুঁই এবং নিজেকে নিয়ে বিশ্লেষণী বার্তা। তাঁর কাব্য পড়ে বল্কল, শব্দ, পাখি, যৌবন, জল ইত্যাদি কিছু বাংলা কথা কবির অত্যন্ত প্রিয় বলে আমার মনে হয়েছে; তিনি নিজস্ব এক শিল্প-তাপস।

পুনশ্চ, পুনরায়

আজকের দিনের কবিতা-বাজারে চাতুর্য’র মাধুরী অনেকখানি স্থান দখল করে রাখে। কবিতা অন্যান্য সাহিত্যধারার মধ্যে স্বল্প-সময়-সম্ভব একটি প্রক্রিয়া; তাই, তাৎক্ষণিক সাফল্যের ছোঁয়া পেতে কবিতাকেই আশ্রয় করেন নব্য লেখক। বিদেশি কবিতার অন্ধ অনুকরণ যে সর্বদাই সাফল্যের সীমারেখা নয় তা অনেকেই বুঝতে চান না। সেই সব নতুন কবিদের আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা অথবা সমসাময়িক ধ্রুপদী কবিতার পাঠ অনেকাংশে জরুরি হয়ে পড়ে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button