আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনাসাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার :‘কবিতায় ব্যবহৃত সব চিত্রই চিত্রকল্প নয়’―আবিদ আনোয়ার

[আধুনিক বাংলাকাব্যের মনীষাদীপ্ত কবি আবিদ আনোয়ার (জন্ম ১৯৫০)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে লড়াকু বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কমান্ডো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুদ্ধকালীন সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে যুদ্ধের পর কিশোরগঞ্জ মহকুমা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের প্রথমে সহকারী ক্যাম্প কমানড্যান্ট এবং শেষ পর্যায়ে চীফ কমানড্যান্ট হিসেবে নিয়োজিত হন। সাহিত্য-চেতনায় কিংবা ছন্দ-আঙ্গিকের বিবেচনায় তরুণসমাজের নানামাত্রিক বিশৃঙ্খলা-বিভ্রমের ক্রান্তিকালেও তিনি অত্যন্ত সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজে শুদ্ধতার চর্চা করেছেন তাঁর কাব্যসৃজনে এবং এর প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচার করেছেন তাঁর কবিতাবিষয়ক গদ্যে। ‘চিত্রকল্পই কবিত্ব’ এটি একটি বৈশ্বিক স্লোগান। আবিদ আনোয়ারের কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্প ভাস্কর্যের মতো দৃশ্যমান―এমন কথা আামদের কট্টর সমালোচকেরাও লিখেছেন। সৈয়দ আলী আহসানের ভাষায় তাঁর চিত্রকল্প যেন ‘ক্যানভাসের আয়তনের মধ্যে সুসম্পন্ন কম্পোজিন’। বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতায় বিদগ্ধজনের স্বীকৃতিতে আমাদের সাহিত্য আবিদ আনোয়ারকে আজকের যুগন্ধর প্রতিনিধি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। শব্দঘর-এর এই বিশেষ সংখ্যার জন্য ২০ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর এই সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন গীতিকবি মহসিন আহমেদ।]

প্রশ্ন : প্রথমে জানতে চাই শব্দঘর পত্রিকা আপনার সাহিত্যকর্ম নিয়ে এই যে একটা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে যাচ্ছে এতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী ?

উত্তর : আপনিই বলুন এমন একটা আয়োজনে কোন লেখক খুশি হবেন না, আনন্দ পাবেন না! বিশেষ করে শব্দঘর একটা প্রতিষ্ঠিত নাম-করা পত্রিকা এবং কেবল সাহিত্য নিয়েই তার কারবার। মাসখানেক আগে বিজ্ঞ সম্পাদক মোহিত কামাল আমাকে যখন টেলিফোনে জানালেন তাঁকে আমার অনেক লেখা দিতে হবে, আমি ভাবলাম তিনি আমার কাছে গুচ্ছকবিতা  চেয়েছেন। কয়টা দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি বললেন : শব্দঘর-এর কো-অর্ডিনেটর সঞ্জয় গাইন আপনার সঙ্গে এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করবেন। দুই দিন পর তার কাছ থেকে এই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানলাম। একসময় একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়েছিল: ‘কেন লিখি’ শিরোনামে লেখকদের রেসপন্স নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশ করত কোনও কোনও পত্রিকা। ‘কেন লিখি’তে আমি যা লিখতাম তার সারমর্ম ছিল এরকম: প্রথমত আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবদের বাইরেও ব্যাপক পরিসরে পরিচিতি অর্জন করার জন্য লিখি। দ্বিতীয়ত এবং শেষত মরণের পরেও বেঁচে থাকার জন্য লিখি। ফর অ্যান এক্সটেন্ডেড ইফ নট অ্যান এটার্নেল লাইফ। ‘মরহুম’ হতে চাই না। ‘মরহুম রবীন্দ্রনাথ’, ‘মরহুম কাজী নজরুল ইসলাম’, ‘লেইট শেক্সপিয়র’ কেউ কি বলেছে বা বলবে কোনওদিন ? হা হা হা! আমি অতটা অর্জন করতে না-পারি শব্দঘর-এর এই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পর আমার লেখালেখির অন্তত প্রথম উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল হবে, এর মানে পরিচিতি বাড়বে। শব্দঘর সম্পাদকের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে ভালোবাসেন। কয়েকটা ঘটনা শুনলে বুঝবেন আমাদের নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠেছে:

তখনও তাঁর সাথে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি টেলিফোনেও আলাপ হয়নি। আমার ছন্দের সহজপাঠ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে বইটা নিয়ে তিনি তাঁর পত্রিকায় একটা এডিটরিয়েল নোট লিখলেন। নবীন কবিদের জানালেন তারা যেন আমার বইটি পড়েন। মনে হলো কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঈশ্বরকে উদ্দেশ-করে যা লিখেছেন লেখালেখির বেলায়ও তা প্রযোজ্য: ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাঁই/দূরকে করিলে নিকট-বন্ধু, পরকে করিলে ভাই।’ লেখালেখি নিজেও অজানাকে জানিয়ে দেয়, দূরকে নিকট-বন্ধু করে তোলে। শব্দঘর জুলাই ২০১৯ সংখ্যায় ড. তপন বাগচীকে দিয়ে তিনি আমার অই ছন্দের বইয়ের একটা লম্বা রিভিউ লেখালেন। একই সংখ্যায় আমাকে দিয়ে লেখালেন ছন্দবিষয়ে প্রচ্ছদ কাহিনি। সে-ই প্রথম তিনি আমার সাথে টেলিফোনে কথা বললেন। দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে এ পর্যন্ত মাত্র দুইবার, প্রথম আলো এবং সমকালের ইফতার পার্টিতে ঈদসংখ্যার কপি আনতে গিয়ে। তিনি ইমেইলের মাধ্যমে আমার কাছ থেকে নিয়মিত লেখা নেন তাঁর পত্রিকার জন্য। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ  পূর্তি উপলক্ষে শব্দঘর বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। আমাকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দ নিয়ে লিখতে বললেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রচারণায় রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল : বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলই প্রথম মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ব্যবহার করেছেন।

‘বিদ্রোহী’ নজরুলের সত্যিই এক অনন্য সৃষ্টি। কিন্তু এই কবিতার ছন্দ বিষয়ে মান্নান সৈয়দের তথ্যটি সঠিক নয় এবং ইতিহাস বিকৃতি। এ-বিষয়ে আমার একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা মুদ্রণের পর শব্দঘর সম্পাদক, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক মোহিত কামাল কয়েকবার ফেসবুকে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। এভাবেই আমাদের সম্পর্ক পৌঁছেছে একটা ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে। দেশের সকল সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গেই আমার উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবু তিনিই আমাকে দিলেন একটা সারপ্রাইজ-ভরা বড় উপহার! এমনই আরেকটা বড় উপহার পেয়েছিলাম আমার প্রায় প্র্রবেশলগ্নেই এ দেশের শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব-এর কাছ থেকে। তিনি তাঁর দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় ১৯৮১-৮২ সালে আমাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন ‘মধ্যদিনের জানালা’ নামের একটি নিয়মিত কলাম।

প্রশ্ন : আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দ বিষয়ে আপনার লেখায় কী ছিল ? আমি মিস করেছি। একটু যদি বুঝিয়ে দেন কী কারণে আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয় এবং ইতিহাসের বিকৃতি, তাহলে আমার সঙ্গে অন্যরাও এই সাক্ষাৎকার পড়ে বিষয়টা জানতে পারবেন যাঁরা আগে আমার মতই আপনার লেখাটা মিস করেছেন।

উত্তর : শব্দঘর-এ প্রকাশের পর লেখাটি বাংলা একাডেমির একটা বইতেও সংকলিত হয়েছে। আপনি নিজে অত্যন্ত ছন্দ-সচেতন কবি ও গীতিকার। জলের মতো বুঝবেন কেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দ নিয়ে মান্নান সৈয়দের দেওয়া তথ্যটি ভুল এবং এতে রয়েছে সাহিত্যের ইতিহাস-বিকৃতি। যে কোনও ছন্দেই কবিতার লাইনগুলোতে যখন ‘পর্ব’ এবং ‘মাত্রা’ সমান থাকে না তখন তাকে ‘মুক্তক’ বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় তাঁর বাল্যকালেই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি লিখেছেন মুক্তক মাত্রাবৃত্তে। কেবল মাঝখানের কয়েকটা লাইনে পর্ব সমান। কিন্তু লক্ষ্য করুন এই লাইনগুলো :

(আমি) ঢালিব করুণাধারা=১০ মাত্রা

(আমি) ভাঙিব পাষাণকারা=১০ মাত্রা

(আমি) জগত প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া=১৪ মাত্রা

আকুল পাগল-পারা=৮ মাত্রা

কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া=১২ মাত্রা

রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া=১২ মাত্রা

রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিবো রে পরান ঢালি=২০ মাত্রা

এই কবিতার সবগুলো মূলপর্ব মাত্রাবৃত্তীয় ৬-মাত্রার; ‘আমি’ অতিপর্ব ২-মাত্রার;  ‘ধারা’, ‘কারা’, ‘পারা’, ‘ঢালি’ এই চারটি অপূর্ণপর্বের প্রতিটি ২-মাত্রার। এতে দেখা যাচ্ছে লাইনগুলোতে মাত্রার সংখ্যা সমান নয়; অতিপর্ব এবং অপূর্ণপর্বসহ লাইনগুলোতে পর্বের সংখ্যা যথাক্রমে ৩, ৩, ৩, ২, ২, ২, ৪―এর মানে পর্বগুলোও সমান নয়। এটাই হতে বাধ্য কারণ মাত্রার সংখ্যা সমান না-হলে পর্বের সংখ্যাও সমান হতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, লক্ষ্য করুন: প্রথম তিন লাইন বাদে অন্য লাইনগুলোর একটিতেও অতিপর্ব নেই;  আবার, তৃতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ লাইনে কোনও অপূর্ণপর্ব নেই। অতএব, লাইনবিন্যাসে সমতা নেই। এটি বিশুদ্ধ মুক্তক মাত্রাবৃত্ত যা রচিত হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বহু বছর আগেই।

কাকতালীয়ভাবে কেবল ছন্দই নয়, অন্য কিছু দিক থেকেও এই দুই কবিতায় সাদৃশ্য বিদ্যমান। ‘বিদ্রোহী’র বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো অহং বা ‘আমি’ত্বের শক্তি প্রকাশের উচ্ছ্বাস ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’তেও রয়েছে, যেমন ‘আমি ভাঙিব পাষাণকারা’, ‘আকুল পাগল-পারা’, ‘জগত প্লাবিয়া বেড়াবো গাহিয়া’, ‘কেশ এলাইয়া’, ‘পাখা উড়াইয়া’, [এখানে উদ্ধৃত নয় এমন] ‘জাগিয়া উঠিলো প্রাণ’, ‘উথলি উঠেছে বারি’, ‘ওরে, প্রাণের বাসনা, প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’, ‘ভাঙ রে হৃদয়, ভাঙ রে বাঁধন’, ‘হেসে খলখল, গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি’, ‘আঘাতের পরে আঘাত কর’, ইত্যাদি। এর সবই সৃষ্টিশীল মানুষের প্রচণ্ড আত্মশক্তি ও আত্মমুক্তির উচ্ছ্বাস যা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্যতম বড় সম্পদ। কিন্তু নজরুল ব্যবহার করেছেন তাঁর অহং বা আমিত্বের শক্তি প্রকাশে সুপ্রচুর পৌরাণিক অনুষঙ্গসহ ভিন্ন উপাদান অধিকতর উচ্চকণ্ঠে আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বভাবসুলভ মৃদুভাষিতায়। এবং এই ‘কণ্ঠস্বর’ই একজন কবির মৌলিকত্বের সূচক। তাই, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ও তার আপন গৌরব নিয়ে চিরকাল নন্দিত হয়ে থাকবে। কবিতায় এমন একটু প্রাকৌশলিক উপকরণ ও ছন্দের পুনর্ব্যবহার দূষণীয় হলে কবিতাই লেখা যাবে না। এ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘কবিরা একজনের মনের সিগারেট থেকে আরেকজনের মনের সিগারেট ধরিয়ে নেন।’ ইংরেজিতে একেই বলা হয় ইন্টারটেক্সচুয়েলিটি। এর কারণেই কবিতার দেবীর নাম ‘শাশ্বতী’ বা ‘চিরন্তনী’! তাই, নজরুলের সৃষ্টিও তাঁর একান্তই নিজস্ব। আমি এই অধমও বহু গদ্যসহ হঠাৎ একটি কবিতায়ও কখন মনের অজান্তেই কবিদের ‘সিগারেট ধরানো’র এই কমন আগুন, মানে শিল্পসাহিত্যে এই ইন্টারটেক্সচুয়েলিটির কথা বলে ফেলেছি [কবি ও শিল্পীকে পাখির রূপকে প্রকাশ করে] :     

শাশ্বত খড়-কুটো দিয়ে গড়া নতুন পাখির নীড়―

চোখ নেই বলে দেখতে পারো না

চিত্রশালার ছবিগুলো যেন আঁকা একই শিল্পীর!

প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন কীভাবে হয়েছিল এবং বর্তমান অবস্থানে পৌঁছুতে কী কী বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে সে-বিষয়ে বলবেন ?

উত্তর : কবিতা কখন আমাকে ধরা দিয়েছিল সে-কথা মনে নেই। তাই, আপনার ‘কখন’ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারব না। তবে, শৈশবেই রবীন্দ্র-নজরুল-সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা পড়তে-পড়তে ছন্দটা এমনিতেই আয়ত্তে এসে গিয়েছিল [পরে প্রবোধচন্দ্র সেনের ছন্দের বই পড়ে কেবল নামগুলোই শিখেছি]। জগন্নাথ কলেজের ছাত্র আমার বড়ভাই সিরাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাহিত্যমোদী। তাঁর কাছে উল্লিখিত তিন কবিসহ অনেকের কবিতার বই-গল্প-উপন্যাস থাকত। একসময় মনে হলো: বড় কবিদের কবিতা পড়ে ভেতরে-ভেতরে আমি এই যে ছন্দের দোলায় দুলছি তাকে ব্যবহার করে আমি নিজেও একটা কিছু লিখে ফেলতে পারি। অনেক কাটাকুটি ও বর্জনের পর বেশ কয়েকটা মনে ধরল। সেগুলো ছড়া ছিল না। কবিতাই। ‘ধানক্ষেত’ নামের আমার প্রথম কবিতা নাম-ঠিকানাসহ ছাপা হলো ১৯৬২ সালে ঢাকার পল্টন থেকে প্রকাশিত পূর্ব পাকিস্তান স্কাউটস অ্যাসোসিয়েশন-এর অগ্রদূত পত্রিকায়। আমি তখন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র এবং একজন স্কাউট। ডাকযোগে সেই পত্রিকার কপি আসল আমাদের প্রধান শিক্ষক ইংরেজি সাহিত্যে এমএ-পাস জনাব মোজাফফর আহমেদ-এর প্রযত্নে। স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে দুষ্টুমি-করে সম্মানসূচক সম্বোধন পদ ব্যবহার ক’রে, পত্রিকার কপি আমার হাতে তুলে দিতে-দিতে বললেন : ‘কবিসাব, এই নেন! আপনার কবিতা ভালো হয়েছে, তবে আজকাল কবিতা লিখতে হলে ভাষাটা বদলে দিতে হবে। আপনার ভাষাটা একটু রাবীন্দ্রিক!’ তারপর সিরিয়াস কণ্ঠে বললেন : ‘শোন, আমি তোরে কয়েকটা বইয়ের নাম বলতে পারতাম কিন্তু সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, আমি চাই না কবিতা আর প্রবন্ধ-পড়ায় ব্যস্ত থাইকা জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ডাব্বা মার।’ আমি বৃত্তি পরীক্ষায় ‘ডাব্বা’ মারিনি কিন্তু ‘ডাব্বা’ মারলাম কবিতায়। কারণ স্যারের মতোই একই কথা বললেন আমার দাদির ছোটভাই ঢাকার ৬৬ নয়া পল্টনের বাসায়―বসে কেবিএমএ রশীদ আর তাঁর বড়ছেলে আমার চাচা বিখ্যাত ক্রিকেট-প্লেয়ার বজলুর রশীদ [একসময় জাতীয় কোচও ছিলেন]। জাতীয়-পর্যায়ের পত্রিকায় আমার প্রথম মুদ্রিত কবিতা ঘনিষ্ঠজনদের দেখানোর উৎসাহ চাপা-দেওয়ার ইচ্ছা এবং কারণ কোনওটাই আমার ছিল না [যদিও আগে লিখেছি গোপনে-গোপনে]। বজলুর চাচা বললেন: তোর কবিত্বশক্তি আছে! আধুনিক কবিতার ভাষা শিখতে হলে জীবনানন্দের কবিতা পড়, বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ পড়। কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে তখন থেকে ‘লেখাপড়া’র ফাঁকে-ফাঁকে কবিতা ও কবিতা বিষয়ে ‘পড়াশোনা’ও করি। ঢাকা কলেজে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম শওকত ওসমান ও আশরাফ সিদ্দিকী-কে। তাঁদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ১৯৬৮-এর কলেজ বার্ষিকীতে আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল। ইংরেজির একটি ক্লাস নিতেন আমাদের প্রিন্সিপাল স্বয়ং জালালউদ্দিন আহমেদ। এক ‘ইউলিসেস’ কবিতা পড়াতে গিয়ে সমগ্র ইলিয়াড-ওডিসির ইংরেজি ভার্সান দুই বছরে আমাদের পড়িয়ে ছাড়লেন। বই পাওয়া যেত ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ইউসিস লাইব্রেরিতে। একেই বলে শিক্ষক! তিনি আইভি রহমানের বাবা, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের শ্বশুর হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি ভালো কবিতা লেখা এত সহজ কাজ নয়। তবু এদিক-ওদিক কিছু লিটল ম্যাগাজিনেও ছাপাই আমার কবিতা। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কবিদের আড্ডায় যাই তখনকার ছাপড়া-ঘরের মধুর ক্যান্টিনে, রোকেয়া হলের বিপরীতে লাইব্রেরি চত্বরে, ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে পার্শ্ববর্তী সিএসপি রেস্টুরেন্টে। কবিতা লিখি। অনেককে পড়ে শোনাই। রসায়ন বিভাগে আমার এক বছরের সিনিয়র হুমায়ূন আহমেদ এবং আমাকে ডেকে নিয়ে আড্ডায় বসতেন আমাদের সাহিত্যামোদী শিক্ষক ড. আলী নওয়াব। হুমায়ূন ভাই দেখান ম্যাজিক, মজার-মজার কথা বলেন। আমি শোনাই সদ্যলেখা পদ্য। নওয়াব স্যার ও  হুমায়ুন ভাই আমার কবিতা পছন্দ করেন। কিন্তু আমার নিজের কাছে মনে হয় পানসে। কিচ্ছু হয়নি। কারণ ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছি আধুনিক কবিতার নির্মাণকলার ভিন্নতার কথা। মাঝে-মধ্যে কবিতা ছাপা হয় ম্যাগাজিনে। বড় পত্রিকায় তখনও নয়।

দেখতে-দেখতে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে যাই ভারতে। পলাশীর নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ১২ দিন পর অন্য অনেকের সঙ্গে ডুবসাঁতারে ব্যর্থ হই। পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিহারের চাকুলিয়া স্পেশাল ক্যাম্পে। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কমান্ডো হিসেবে ট্রেনিং সমাপ্ত করে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করি কিশোরগঞ্জ এলাকায়। কবিতার বিচি টুকে রাখি খাতায়। লেখা শেষ করতে পারি না। কিন্তু পলাশী ক্যাম্পে ডুবসাঁতারে ব্যর্থ হয়ে রাতের বেলা তাঁবুর নিচে শুয়ে-শুয়ে যে কবিতাটি লিখেছিলাম তাতে মনে হলো আমার কবিতায় আমি যা চাই তা পেয়ে গেছি। ছন্দ রক্ষা করেও আটপৌরে ভাষায় চিত্ররূপময় পঙ্ক্তি, কদমছাঁট আঙ্গিকের চেয়ে ছোটবড় পঙ্ক্তির সংমিশ্রণ―যাকে বলে মুক্তক―আধুনিক ধারায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য [অবশ্য কদমছাঁটেও ক্ষতি নাই, যদি থাকে আটপৌরে প্রকাশভঙ্গি]। এই সেই কবিতা ‘প্রতিরোধ: ১৯৭১’ যা আজও ভালো লাগে, যে-কবিতা আমার আগেকার সব কবিতাকে কবরে পাঠাল:

আমার নীলিমা ছিঁড়ে গেছে ক্রূর শকুনের চিৎকারে:

কবলিত চাঁদে বুটের প্রতাপ,

বেয়নেট-বেঁধা নিহত তারার শব পড়ে আছে বধ্যভূমিতে,

নীহারিকা নিজে রাহুর কবলে বন্দি―

এখন হবে না কারো সাথে কোনো সন্ধি!

ছায়াপথে দোলে প্রেয়সীর মুখ, দিগন্তে ওড়ে রঞ্জিত তার শাড়ি,

পেটিকোট চাটে শৃগাল-কুকুর শিবিরে-শিবিরে,

পিষ্ট কাঁচুলি দানবের করতলে―

শত্রুকে তবু ফিরতে দেয়া কি চলে!

বালকের ঢিল, গুলতিরা চেনে,

হেঁসেলের বঁটি, পাচনের পিন শত্রুকে চেনে―অভিন্ন টার্গেট!

নাবাল কিশোরী, চেলিপরা বউ সে-ও চেনে রণসজ্জা;

কাজের বুয়ারা হাতে তুলে নেয় নুড়ায়-শানানো খন্তার বেয়নেট!

বিলের কিনারে কিরিচের ঢঙে ঠোঁট ঘষে কানিবগা,

গোখরোর মতো ফণা তুলে আসে মনসার মেয়ে―লকলকে লাউডগা!

পলাশী ক্যাম্পে ডুবসাঁতারে ব্যর্থতার সাথে যুক্ত হয়েছিল দেশে ফেলে-যাওয়া আমার সুন্দরী প্রেমিকার স্মৃতি। আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতারে বিকেলে শুনেছি আমাদের মেয়েদের নিয়ে পাক-সেনাদের বর্বর উল্লাসের খবর। তাঁবুতে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখেছি আমার সুন্দরীও ধর্ষণের শিকার। কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে উঠে এসেছে সেই চিত্র: প্রেয়সীর মুখকে ছায়াপথে পাঠিয়ে, ধর্ষিতার রক্তাক্ত শাড়িকে সূর্যাস্তের রঙিন দিগন্ত বানিয়ে। প্রথম স্তবকে ব্যবহৃত হয়েছে যুগপৎ দৃশ্য ও ধ্বনিবাহী চিত্রকল্প―ছিঁড়ে-যাওয়া আকাশের সঙ্গে শকুনের চিৎকার। এর চেয়েও বেশি উঠে এসেছে শত্রুহননে বা অন্তত প্রতিরোধে সর্বস্তরের প্রস্তুতি: বর্বর পাক-সেনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বালক তার ঢিল ও গুলতি নিয়ে, চাষি তার পাচনের পিন নিয়ে, ঘরের বউঝি দাও-বঁটি নিয়ে, এমনকি কাজের বুুয়ারা শীল-পাটায় ঘষে-ঘষে খন্তাকে শানিয়েছে বেয়নেটের মতো-করে, বাঙালি কানিবগা কিরিচের মতো ধার দিচ্ছে তার ঠোঁট, এমনকি নিরীহ লাউয়ের ডগা ফুঁসে উঠছে গোখরোর মতো। মনে হলো এর সবই আধুনিক। উপমা-উৎপেক্ষা-প্রতীক-রূপক ও সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্পে রয়েছে কিছুটা পরাবাস্তবতাও। যুদ্ধের শেষে ফিরে এলে আবুল হাসনাত সম্পাদিত সন্ধানী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নামের সংকলনে মুদ্রিত হয়েছে এই কবিতা [বর্তমানে কেবল তৃতীয় স্তবকে সামান্য একটু পরিমার্জিত]। সবাই জানালেন তাঁদের মুগ্ধতার কথা। কবি বেলাল চৌধুরীর সম্পাদনায় সাপ্তহিক সন্ধানীতে শুরু হলো নিয়মিত আমার কবিতা প্রকাশ। কবি রফিক আজাদের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক রোববার ও বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকারও আমার ভাগ দিচ্ছে। বাকি ছিল কবি আহসান হাবীব-সম্পাদিত দৈনিক বাংলার ‘রবিবাসরীয় সাহিত্য’ পাতা। ভয়ে যাইনি বহুদিন। শুনেছি তিনি অনেককে কথা’র চাবুক-মেরে ভুলিয়ে দেন কবিতা লেখার সাধ! কিন্তু সাহস-করে একদিন যেতেই হলো। কারণ আহসান হাবীব কার কয়টা কবিতা ছাপলেন তা দিয়ে মাপা হয় নবীন কবিদের কাব্যকৃতি। গিয়ে দেখলাম আমার ভয় ছিল নিরর্থক। সেই গম্ভীর ও তিক্ত মুখের কঠোরতম সম্পাদক হয়ে উঠলেন আমার কবিতার প্রধানতম আশ্রয়। ফাঁকে-ফাঁকে আমাকে দিয়ে লেখান বই রিভিউ। বছর পাঁচেক পর তাঁর সাহিত্য পাতায় আমাকে দিয়ে লেখালেন ‘মধ্যদিনের জানালা’ নামের নিয়মিত কলাম। এতে পরিচিতি বেশ বেড়ে গেল। আপনি আরও জানতে চেয়েছেন সাহিত্যচর্চায় আমি কী কী বাধার সম্মুখীন হয়েছি। আমি নিজেই ছিলাম আমার সাহিত্য অভিযাত্রায় বড় বাধা। নিজেকে তৃপ্ত করতে পারেনি এমন বহু কবিতা আমি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠেছিল নব্বই-দশকের মধ্যভাগ থেকে সম্পাদক ও তথ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে আইসিডিডিআর,বি-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় আমার ২২ বছরের চাকরি। জার্নাল, বার্ষিক প্রতিবেদন, তিনটা নিউজলেটার এবং সেমিনার ও ওয়ার্কশপ-সংক্রান্ত প্রকাশনার সম্পাদনা ও মুদ্রণের কাজে কখনও কখনও গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। ফলে, অন্য অনেকের চেয়ে রচনাকর্ম কম। 

প্রশ্ন : আপনি আমার আগের এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন: আধুনিক কবিতার ভাষা ও অন্য কিছু উপাদানের কথা। আপনার বাঙলা কবিতার আধুুনিকায়ন, চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য, বরেণ্য কবিদের নির্মাণকলা বইগুলো আমার পড়া আছে, এসব আমার জানা হয়ে গেছে। কিন্তু শব্দঘর-এর পাঠকদের জন্য কবিতায় ‘আধুনিকতা’ বলতে কী বুঝায় তা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিন।

উত্তর : ঠিক আছে। আমি খুব সহজে ও সংক্ষেপে আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরছি। একটু লম্বা হবে, কিছু মনে করবেন না। আধুনিক কবিতার আঙ্গিক ও নির্মাণকলা বিষয়ে একটু পরে বলছি এবং তা কেবল বাংলা কবিতাকে কেন্দ্র করে। এর আগে একটু ভূমিকার মতো কিছু বলে নিই, যেখানে বৈশ্বিক চিত্রটাও ফুটে উঠবে: ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার-এর লেস ফ্লেউরস দু মাল নামে ১৮৫৭ সালে একটা কবিতার বই বেরোয়। বইটির শিরোনামের বাংলা অর্থ ‘অশুভের ফুল’। এর চেয়েও সুন্দর বাংলা নাম ‘ক্লেদজ কুসুম’। এই সুন্দর নামটি দিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ারের কাব্যগ্রন্থের বাংলা অনুবাদে। পূর্ববর্তী রোমান্টিক ও ভিক্টোরিয়ান যুগে রচিত কবিতার যে বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল তা থেকে বোদলেয়ারের কবিতায় কিছু বিষয়ে সুস্পষ্ট ভিন্নতা ছিল। অই ভিন্নতাকেই সারা বিশ্বের কবিরা ‘আধুনিকতা’ শব্দটি দিয়ে চিহ্নিত করলেন। এবার বলছি কী ছিল সেই ভিন্নতা। সেজন্য আমার বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন বইটির সামান্য অংশ তুলে ধরছি :

“বোদলেয়ারের পূর্ববর্তী রোমান্টিক কবিদের হাতে রচিত কবিতায় প্রকৃতি ও নারীর রূপায়ণে এমন একটি মনোরম ও মাঙ্গলিক বিশ্বের চিত্র ফুটে উঠতো যেন কবিদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রকৃতি কেবল ফুটিয়ে রাখে নানাবর্ণের ফুল: গোলাপ-চেরি-টগর-গন্ধরাজ-ড্যাফোডিল আর লাইলাক― জীবনচক্রের অমোঘ নিয়মেও যেন এসব ফুলে কখনও পচন ধরে না, কীটদষ্ট হয় না; প্রকৃতি যেন সাজিয়ে রাখে পত্রপল্লবে সুশোভিত নিকুঞ্জ―যাতে মধুর কণ্ঠে গান গায় কেবল দোয়েল-কোকিল-শ্যামা আর বড়জোর তৃষিত চাতকপক্ষী−যেন পৃথিবীতে কোনও শকুন কিংবা বাজপাখি নেই। রোমান্টিক যুগের কবিদের বর্ণিত প্রকৃতিকে বোদলেয়ার ব্যঙ্গ করেছেন ‘ভেজিটেবল ওয়ার্লড’ অর্থাৎ ‘সব্জিবাগান’ বলে।

“রোমান্টিক কবিদের নারীরা স্বর্গলোকের বাসিন্দা−যেন মাসিক স্রাব নামের একটি জৈবিক প্রক্রিয়াও তাদের কখনও ক্লেদাক্ত করে না; এরা সঙ্গম ও প্রজনন-প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না; ‘পরনে ঢাকাই শাড়ি’ আর ‘কপালে সিঁদুর’ মেখে কেবল সৌন্দর্যের বিভা জ্বেলে দেয় কবিপুরুষের চৈতন্যে।”

তাই, বলা চলে রোমান্টিক কবিদের জীবনদর্শন ছিল একচক্ষু দানবের মতো−জীবনের বীভৎস রূপটিকে তাঁরা দেখতেই পাননি; কেবল মনোরম ও মাঙ্গলিক বিশ্বের চিত্র রচনাই ছিল তাঁদের আরাধ্য।

“শার্ল বোদলেয়ারকে যে-কারণে নব্য আধুনিকেরা ‘কবিদের রাজা, প্রথম দ্রষ্টা, সত্য-দেবতা’ এসব বিশেষণগুলো দিয়েই চিহ্নিত করতে ভালোবাসলেন তার মূলে নিহিত ছিল এই সত্য যে, বোদলেয়ার জীবন ও প্রকৃতিকে দেখেছেন প্রকৃত বাস্তবতার নিরিখে; তাঁর কবিতায় চারপাশের জীবন চিত্রিত হয়েছে তার সমগ্রতা নিয়ে―শুভ ও অশুভের সংমিশ্রণে, মঙ্গলের সঙ্গে অমঙ্গলকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে। বোদলেয়ারের চোখে-দেখা প্রকৃতিতে কুসুমও ক্লেদাক্ত, নারীও রক্তমাংসের মানুষ যে প্রেমের ছলাকলার সঙ্গে কামকলায়ও পারঙ্গম। প্রকৃতিও কেবল গাছ-পাখি আর নীল-সবুজের মাখামাখিতে মনোমুগ্ধকর স্বর্গভূমি নয়, ফুলের দখল নিতে এমনকি প্রজাপতিও লিপ্ত হয় প্রাণঘাতী যুদ্ধে; পায়রার আনন্দঘন অবিশ্রান্ত ডিগবাজির পাশে প্রকৃতি উড়িয়ে দেয় বাজপাখি!”

সারা বিশ্বে এই ‘আধুনিকতা’ ছড়িয়ে পড়লেও আমাদের বাঙালি কবিরা কেবল ইংরজি ভাষার কবিদের কবিতা ও প্রবন্ধ পাঠ-করেই বিশ-শতকের তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সূচনা করেন। নেতৃত্ব দিলেন বুদ্ধদেব বসু। কারণ ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি পরিচিত হয়েছিলেন। আরেকজন ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন জীবনানন্দ দাশ যিনি ছিলেন খুবই নিভৃতচারী। নীরবে কেবল নিজের লেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তিরিশের অন্য তিনজন বড় আধুনিক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে ও অমিয় চক্রবর্তী। বাঙালি কবিদের সর্বাধিক পঠিত ইংরেজি ভাষার কবি টি এস এলিয়ট এবং ডব্লিউ বি ইয়েটস। ১৯৩০ সালে নোবেলজয়ী এলিয়ট ঘোষণা দেন: তিনি বোদলেয়ারের শিষ্য। কারণ তাঁর মতে পৃথিবীর যে কোনও ভাষার কবিদের আধুনিক হওয়ার জন্য বোদলেয়ারের রচনা হতে পারে শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন। 

এতক্ষণ বললাম কেবল আধুনিক কবিতার বিষয়বস্তুর কথা। বোদলেয়ার-উত্তর কবিতায় ভাষাভঙ্গি ও অন্যন্য নির্মাণকলার কথা এবার বলছি : পূর্ববর্তী কবিরা কেতাবি ভাষায় কবিতা লিখতেন। ‘ইউ আর’কে লিখতেন ‘দাও আর্ট’। পাশ্চাত্যের আধুনিকেরা সেই ভাষাকে বললেন ‘বাইবেলের ভাষা’! এর বদলে প্রচলিত ছন্দকে অক্ষুন্ন রেখেও তাঁরা কবিতায় ব্যবহার করতে শুরু করলেন দৈনন্দিন মুখের ভাষা, যাকে ইউরোপীয়রা বললেন ‘ল্যঙ্গোয়েজ অব এভরি ডে’, বাংলায় যাকে বলা হয় আটপৌরে ভাষা। প্রতিতুলনাজাত রূপকল্প নির্মাণে, অর্থাৎ উপমা-উৎপেক্ষা-রূপক তৈরিতে অভাবনীয় উপমান ব্যবহার করতে শুরু করলেন আধুনিকেরা। পূর্ববর্তী কবিরা কোনও সুন্দরীর মুখের উপমান হিসেবে ব্যবহার করতেন চাঁদকে কিন্তু আধুনিকেরা স্নিগ্ধতায় ভরা সুন্দর মুখের তুলনা দেন নতুন জেগে-ওঠা চরের মাটির সঙ্গে; চিৎ-হয়ে পড়ে-থাকা মৃত পশুর তুলনা দেন ফুটন্ত ফুলের সঙ্গে কিংবা সঙ্গম-মুদ্রায় শায়িত নারীর সঙ্গে; উপমেয়-উপমানের এই বৈসাদৃশ্য যত বাড়ে ততই পাঠকের বোধে ‘টেনশন’ বেড়ে যায় এবং তা আধুনিক হয়ে ওঠে। আধুনিক কবিগণ কেবল বস্তুবিশ্ব বা চেনাজানা পরিবেশ থেকেই নয়, অবচেতন থেকেও অনেক সময় উপমান আহরণ করেন। তখন সৃষ্টি হয় পরাবাস্তব চিত্রকল্প। তিরিশিরা আধুনিক কবিতায় রাজনীতি ও সমাজবিষয়ক ভাবনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলেও আমাদের আহসান হাবীব-এর হাত-হয়ে সামাজিক অঙ্গীকারের কবিতাও পাকাপোক্ত আসন করে নিয়েছে। আটপৌরে মুখের ভাষায় কবিতা লেখার ঘোষণা দিলেও তিরিশিদের নিজেদের রচনায় রাবীন্দ্রিক ভাষার কেতাবি গন্ধ, বিশেষ করে ক্রিয়াপদ ও সর্বনামে, বেশ ভালোই লেগে ছিল: ‘শেফালী অঙ্গুলি তব গণ্ডে মম বিচরে কৌতুকে’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত); ‘আমার মুখের পরে চুলগুলি আকুলিয়া দাও/সেই গন্ধে রোমাঞ্চিয়া ওঠে বসুন্ধরা/আরো কহিবো কি ?’ (বুদ্ধদেব বসু)। আহসান হাবীব-হয়ে শামসুর রাহমানের হাতেই সত্যিকারের আটপৌরে ভাষাভঙ্গি ব্যবহারের অঙ্গীকার পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

প্রশ্ন : আধুনিক কবিতায় ছন্দের গুরুত্ব কতটা ?

উত্তর : রোমান্টিক যুগের প্রচলিত ছন্দোরীতিকে অবলম্বন করেই তিরিশি ও তিরিশোত্তর আধুনিক কবিরা ‘আধুনিক’ হয়ে উঠেছেন কেবল আধুনিক জীবনবোধ ও আটপৌরে ভাষাভঙ্গিকে আলিঙ্গন করে এবং বিশেষ করে রূপকল্পের নির্মাণকলায় অধিকতর বিসদৃশ উপমান-উপমেয়র সঙ্গম ঘটিয়ে। আধুনিকতার আদিগুরু বোদলেয়ার তাঁর কবিতার নির্মাণকলায় কখনও ফরাসি কবিতার প্রচলিত ছন্দ-প্রকরণকে অমান্য করেননি; সপ্তদশ শতকে প্রবর্তিত ছন্দ-প্রকরণ থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি…এমনকি লক্ষণীয় যে, ১৮৬৬ সালের মার্চ মাসে, যখন তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং কিছু লিখতে অক্ষম, তখনও তাঁর ডিকটেশন-দেওয়া একটি পত্রে কবিবন্ধু প্র্যাঁর-এর একটি নতুন কাব্য-সংকলনের প্রশংসা করতে গিয়ে কোনও একটি কবিতার একটি পঙ্ক্তিতে সামান্য ছন্দ-পতনের প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ভোলেননি। আমাদের তিরিশি আধুনিকেরা মূলত ছন্দ মেনে কবিতা লিখেছেন। সুধীন্দ্রনাথ  লিখেছেন: ‘কবি-প্রতিভার নির্বিকল্প মানদণ্ড ছন্দোবিচার।’ আমাদের দেশের প্রথম আধুনিক কবি আহসান হাবীব ছিলেন আগাগোড়া ছন্দে নিবেদিত। আল মাহমুদ বলেছেন: ‘যে-কবি ছন্দ জানে না সে কবিতার কিছুই জানে না…’: (ইনকিলাব সাহিত্য, ৩ অক্টোবর ১৯৯৭)। একই অভিমত শামসুর রাহমানেরও। তিনি বলেছেন : ‘সনেটে প্রত্যাবর্তন ছন্দহীনতার বিরুদ্ধে আমার এক ধরনের প্রতিবাদ।’ (জনকণ্ঠ সাময়িকী, ২৩ অক্টোবর ১৯৯৬)। ড. হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন: বাঙলা কবিতায় ছন্দ যেন একটি−অক্ষরবৃত্ত; অপর দুটি−স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তÑশোভা: তবু ওই শোভা দুটির কাছে যেতে হবে ঘন ঘন; অক্ষরবৃত্তের ওপর চাপ বর্তমানে মারাত্মক হয়ে উঠেছে…অন্ত্যমিল সাম্প্রতিক কবিতার সর্বাধিক অবহেলিত ও অব্যবহৃত সোনা। তিরিশের কবিতায় অন্ত্যমিলের ব্যবহার হয়েছে প্রচুর কিন্তু তারপরে এলো দুর্দিন,… অন্ত্যমিলকে পুনর্বাসিত করতে হবে [আধার ও আধেয়, পৃ. ৩৬-৩৯]।

সাম্প্রতিক কালেরও যারা প্রকৃত কবি তাঁরা সবাই ছন্দ মেনেই কবিতা লেখেন। যারা বলেন ‘ছন্দ মানি না’ তারা আসলে ছন্দ ‘জানেন না’ কিংবা ছন্দ শেখার যোগ্যতাই তাদের নেই। এদেরকে কবি বলে গণ্য করার কোনও অর্থই নেই।

প্রশ্ন : বলেছেন পরাবাস্তবতা আধুনিক কবিতার একটা শিল্প-উপাদান। পরাবাস্তবতা বলতে আমরা কী বুঝব ?

উত্তর : পরাবাস্তবতা এক ধরনের চিত্রকল্প যাকে অনুভব করতে হয় মনের অবচেতন স্তরকে ব্যবহার করে কিংবা আরও সহজ কথায় এগুলো সেই চিত্রকল্প যাকে বস্তুবিশ্বের বাইরের স্বপ্নময় চিত্র বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তবতাকে শিল্পিতভাবে প্রকাশের জন্যই পরাবাস্তবতা ব্যবহার করা হয়। এভাবে বর্ণনাত্মক সংজ্ঞা যতই দিই না কেন, প্রায়োগিক সংজ্ঞা ছাড়া এই বিমূর্ত ভাবনাকে বুঝানো কঠিন হবে। আমি অনেক নিবন্ধে লিখেছি: বর্ণনাত্মক সংজ্ঞায় গাজর থেকে হলদে-রঙের মুলার পার্থক্যও ভালো-করে বোঝানো যায় না। আর শিল্পসাহিত্যের বিমূর্ত উপাদানকে বোঝানোর জন্য তো বর্ণনাত্মক সংজ্ঞা একবারেই ব্যর্থ। এর জন্য প্রয়োজন প্রায়োগিক সংজ্ঞা (অপারেশনাল ডেফিনিশন) যা উদাহরণ বিশ্লেষণ-করে কোনওকিছুকে চিনিয়ে দেয়। তাই, চলুন সে-পথেই পরাবাস্তবতাকে চেনার চেষ্টা করি। প্রথমে খুব সাধারণ একটা উদাহরণ থেকে জটিল পরাবাস্তবতার দিকে যাই। কবি শামসুুর রাহমানের পঙ্ক্তি ‘আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়’ পড়লেই চমকে উঠি: এই দৃশ্য তো স্বাভাবিক দৃশ্য বা চিত্র নয়! ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে শহিদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট বাতাসে উড়তে-উড়তে একেবারে নীলিমায়, মানে অসীম আকাশে উঠে গেছে! কিন্তু যখন ভাবি আসাদের আত্মত্যাগ আমাদের নিজেদের চেতনায় ব্যাপ্ত হয়ে গেছে। কারণ আসাদের স্বপ্ন তো আমাদেরও স্বপ্ন, তখন এই দৃশ্যকে আর অদ্ভুত মনে হয় না। তার এই রক্তমাখা শার্টই আমাদের প্রাণের পতাকা। সে তো নীলিমায় উড্ডীন হতেই পারে। এটি অদ্ভুত চিত্র হলেও অর্থপূর্ণ। তাই, এটি পরাবাস্তব চিত্রকল্প। এই কবির ‘জনৈক সহিসের ছেলে বলছে’ কবিতার একটা চিত্রকল্প থেকে চলুন পরাবাস্তবতাকে আরও ভালো-করে চিনে নিই: ‘কে এক কৃষ্ণাঙ্গ ঘোড়া উড়িয়ে কেশর/পেরিয়ে সুদূর আগুনরঙের মাঠ/তাকে নিতে আসে’তে আমরা দেখি রহস্যময় এক কালো ঘোড়া বহু দূরের আগুনরঙের মাঠ পেরিয়ে তার কেশর দুলিয়ে ‘তাকে’ মানে কাকে যেন নিতে আসে। এই চিত্রকে আমাদের দেখতে হয় মনের অবচেতন স্তরকে ব্যবহার ক’রে। কবিতার  প্রথমাংশ পাঠে আমরা জানতে পারি একজন সহিসের ছেলে তার বাবা’র অসুস্থতার কথা বলতে গিয়ে বলছে তিনি বেশ কয়েক বছর থেকে যেন ‘আঠা দিয়ে সাঁটা বিছানায়’ (মানে শয্যাশায়ী রোগী)। যখন পড়ি এই রহস্যসময় কালো ঘোড়া ‘তাকে নিতে আসে’ মানে ছেলের রোগাক্রান্ত বাবাকে নিতে আসে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝে ফেলি: এই রহস্যময় কালো ঘোড়া মৃত্যুর প্রতীক। মনের অবচেতন স্তরকে ব্যবহার করে আমরা এই অদ্ভুত ঘোড়ার চিত্রকে অনুভব করতে পেরেছি অথচ তা সুন্দর অর্থপূর্ণ। তাই, এটাও পরাবাস্তব চিত্রকল্প। আরও রহস্যময়, জটিল, সুবিশাল একটি চিত্রকল্প থেকে চলুন পরাবাস্তবতাকে আরও বুঝে নিই: আমার নিজের ‘কবন্ধকে মাল্যদান’ নামের একটা কবিতায় আছে: ‘অগ্নিসেনার পোশাক প’রে/সূর্য থেকে লাফিয়ে নামে কবন্ধরা/কোথাও কোনো নির্জনতায় দুরন্ত এক ডাইনিবুড়ি/ঠাণ্ডা মাথায় চরকা ঘোরায় আমার নামে/এবং তাদের শিল্পনিপুণ মাকড়শারা/কুটিল জালে দিচ্ছে ভরে/আমার তাবৎ গোলাপ বাগান।’

এই অদ্ভুত চিত্রে আমরা দেখি: কিছু মুণ্ডুহীন ব্যক্তি শক্তির উৎসস্থল ‘সূর্য’ থেকে ‘অগ্নিসেনার’ মতো লাফিয়ে-লাফিয়ে নামছে; কে এক ডাইনিবুড়ি তার গোপন আস্তানায় আমার নামে ঠাণ্ডা মাথায় তার চরকা ঘোরাচ্ছে (মানে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে)। ওরা তাদের কিছু নিপুণ মাকড়শা ছেড়ে দিয়েছে যারা খুব শিল্পদক্ষতায় জাল বুনে-বুনে আমার সব গোলাপ বাগান নষ্ট করে দিচ্ছে। ক্যামন যেন রহস্যময় এই চিত্র। কবিতার অন্যত্র বলা আছে এবং শিরোনামেও বুঝা যায় এই মুণ্ডুহীনদেরই আমরা মালা পরাচ্ছি [দৃশ্যটাও হাস্যকর!]। একটু মন-দিয়ে ভাবলেই বুঝতে কষ্ট হয় না এই চিত্রকল্প আমাদের কিছু মুণ্ডুহীন ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের অসহায় অবস্থাকে তুলে ধরছে। এই চাবিটা পেয়ে-গেলে প্রায় প্রতিটি শব্দই তখন প্রতীকী ব্যঞ্জনা দেয়। ‘আমার বাগান’ তখন আর একবচনে থাকে না। হয়ে ওঠে ‘আমাদের বাগান’―সমগ্র জনগোষ্ঠীর সুখ ও স্বপ্নের প্রতিরূপ। অবচেতনকে ব্যবহার করে এই অদ্ভুত চিত্র অনুভব করতে হয়েছে কিন্তু তা অর্থহীন নয়। তাই, এটিও পরাবাস্তব চিত্রকল্প। পরাবাস্তবতার নামে কিছু লোক তাদের রচনায় অর্থহীন চটকদার দৃশ্যকল্প তৈরি করেন। এসব পরাবাস্তবতা নয়। কারণ বাস্তবতাকে শিল্পিতভাবে পাঠকের বোধে তুলে ধরার জন্যই পরাবাস্তবতার জন্ম হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনার চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য বইতে পড়েছি ‘চিত্রকল্পই কবিত্ব’ এটি এখন বৈশ্বিক স্লোগান। পাঠক চিত্রকল্প চিনবে কী করে ?

উত্তর : শুধু এখনকার বৈশ্বিক স্লোগানই নয়, আমি মনে করি এই বিশ্বাস প্রচলিত থাকবে অনাগত কাল। কবিতায় ব্যবহৃত সব চিত্রই চিত্রকল্প নয়। যে চিত্র বর্ণিত দৃশ্যের বাইরে অন্য কিছু ভাবতে পাঠককে প্রলুব্ধ করে না তা কেবল চিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, চিত্রকল্প হয়ে ওঠে না। এসব বর্ণনায় নয়, চলুন প্রায়োগিক সংজ্ঞায়, মানে উদাহরণ থেকে, চিনে নিই চিত্রকল্প কী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’ পড়ে যে চিত্র পাই তা বর্ণিত দৃশ্যের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু বোঝায় না। তাই, এসব চিত্রকে কেবল  চিত্রই বলব। কবি আল মাহমুদ তাঁর একটি কবিতায় লিখেছেন: ‘গভীর অরণ্য থেকে উড়ে আসে বন-মোরগীরা,/বানরের চেঁচানিতে ভরে যায় সেগুনের শাখা,/ঝুরিতে সব্জি নিয়ে হেঁটে আসে চাকমা কিশোরী।’ চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়ে কবি যে দৃশ্য দেখেছেন তারই বিশ্বস্ত বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে লুকানো অন্য কোনও মানে নেই। তাই, এসব চিত্রের সবগুলো কেবল ‘চিত্রই’, চিত্রকল্প নয়।  জীবনানন্দ দাশ তাঁর একটি কবিতায় সুন্দর এক ভরবিকেলের দৃশ্য দেখে লিখেছেন: ‘হীরের প্রদীপ জে¦লে শেফালিকা বোস যেন হাসে/হিজল ডালের পিছে, অগণন বনের আকাশে।’ কবি দেখছেন, পাঠককেও দেখাচ্ছেন: আলো-আঁধারিতে কবির পরিচিত এক সুন্দরী (শেফালিকা বোস) হীরের প্রদীপ হাতে হিজল শাখার পিছনে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার দিগন্তবিস্তৃত অমলিন হাসি। পাঠককে ভাবতে হয়: এ তো শেফালিকা বোসের হাসি নয়! শেফালিকা বোস আকাশে এল কী করে ? এই ভাবনার সুতো-ধরে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না ভরবিকেলের দিগন্তে শান্ত-স্নিগ্ধ মনোরম দৃশ্য দেখে কবির মন এতটাই মুগ্ধতায় ভরে উঠেছে, যেমনটি ভরে উঠত সন্ধ্যার পরপর হীরের প্রদীপ হাতে শেফালিকা বোসকে হাসতে দেখলে। বর্ণিত দৃশ্যের বাইরে গিয়ে এই চিত্রের অন্যরকম মানে আবিষ্কার করতে হলো বলে এটি চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে, কেবল চিত্রেই তা সীমবদ্ধ নয়। শামসুর রাহমানের একটি কবিতায়: ‘বাড়ালো মদির চঞ্চু রাজহংসী/জড়ালো আমাকে গাউনের মতো তার প্রফুল্ল ডানায়।’ সরাসরি চিত্রে দেখা যায়: এক রাজহংসী তার ডানায় কবিকে আলিঙ্গন করে তার চঞ্চু (মানে ঠোঁট) বাড়িয়ে দিয়েছে। দৃশ্যের রাজহংসীকে চিনতে গিয়ে আমরা বুঝে ফেলি কবিকে আলিঙ্গন করে তাঁর প্রেয়সী নিজের ঠোঁট বাড়িয়ে দিয়েছে কবির ঠোঁটের দিকে। এটি কেবল একটি চিত্র নয়, চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে। কারণ রাজহংসীর জায়গায় পাঠককে ভাবতে হয়েছে এক মানবীর কথা। কোনও চিত্রের সঙ্গে ভাবনা যুুক্ত হলেই তা হয়ে ওঠে চিত্রকল্প। আর চিত্রের সঙ্গে ভাবনা যুক্ত না-হলে চিত্র কেবল চিত্রই থেকে যায়। একটি সহজ ফর্মুলা: কোনও চিত্ররূপময় কবিতার পঙ্ক্তিতে যখন প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার (উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-প্রতীক-সমাসোক্তি) প্রযুক্ত হয় তখন চিত্রকল্প জন্ম নেয়। জীবনানন্দের শেফালিকা বোস-সংক্রান্ত চিত্রকল্পটি উৎপ্রেক্ষাবাহী, শামসুর রাহমানের রাজহংসী রূপকাশ্রয়ী। এর আগে পরাবাস্তবতা-সংক্রান্ত আপনার প্রশ্নের উত্তরে কালো ঘোড়া ও কবন্ধ-সংক্রান্ত যে চিত্রকল্পগুলোর উদাহরণ দিয়েছি সেগুলো প্রতীকবাহী। অলঙ্কারহীন কবিতায় বর্ণিত বিশ্বস্ত চিত্র থেকে যায় কেবল চিত্রস্তরেই। 

প্রশ্ন : আপনার কাব্যচর্চারই একটি সম্প্রসারিত অঙ্গন গান রচনা। আপনার গানের কবিতা বিষয়ে লিখতে গিয়ে স্বাধীনতা পুরস্কারজয়ী গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান লিখেছেন আপনি ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন’। আপনার মরমী ঘরানার গানগুলোকে তিনি ‘অতলস্পর্শী’ আখ্যা দিয়েছেন। আপনি নিজে আপনার গান নিয়ে কতটা আশাবাদী ?

উত্তর : রফিক ভাইর মন্তব্যে আমি আপ্লুত। আমার সৌভাগ্য বলতে হয়। আপনার প্রশ্নে উল্লিখিত প্রথম মন্তব্যটি অবশ্য তিনি আমার গান নিয়ে করেননি, করেছেন সামগ্রিক কাব্যচর্চাকে নিয়েই। এর পর আমার গানের কথা বলেছেন। আমার কিছু কিছু গান বহু কণ্ঠে গীত হচ্ছে দেখে আমি আশাবাদী হয়ে উঠছি। গান রচয়িতা হিসেবে টিকে যাওয়ার জন্য খুব বেশি গানের দরকার নেই। রবীন্দ্র-নজরুলের এত-এত গানের মধ্যে প্রচার পায় খুবই স্বল্পসংখ্যক গান। এমনকি একটিমাত্র গান নিয়েও কালজয়ী হয়েছেন অখিল গোস্বামী ওরফে অখিল বৈরাগী তাঁর ‘(আমার) মন তো বসে না গৃহকাজে সজনী লো/অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’ কিংবা এইউএম ফখরুদ্দিন তাঁর ‘ও আমার  বাঙলা মা গো’ গানের জন্য। অনুপ ভট্টাচার্য্যের সুরে আমার ‘লালন তোমার আরশিনগর আর কতদূর আর কতদূর/অচেনা এক পড়শি খুঁজে কাটলো সকাল, কাটলো দুপুর’ গানটি প্রথমে বেতারে দিলরুবা খান ও পরে এনটিভিতে সালমা গাওয়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতের শিল্পী মিলিয়ে এ পর্যন্ত গোটা-ত্রিশেক কণ্ঠ পাওয়া যায়  ইউটিউবে। প্রতিবার লালনমেলায় তো বটেই, এমনিতেও তাঁর আখড়ায় গিয়ে কান পাতলেই শোনা যায় কোথাও-না-কোথাও গীত হচ্ছে এই গান। এই একটি সূত্রে আমি তো আশাবাদী এই গান লালনের কাঁখে-চড়ে (হাঃ হাঃ হাঃ) মহাকালের দিকে (!) তার যাত্রা অব্যাহত রাখবে। মরমী ও পল্লীগীতি ধারার গানের মধ্যে অনুপ ভট্টচার্য্য, বিপুল ভট্টাচার্য্য, সুবীর নন্দী, অণিমা মুক্তি গোমেজ, আবুু বকর সিদ্দিকের গাওয়া বহু গান একে একে কণ্ঠের সংখ্যা বাড়িয়ে চলছে। এমনকি আমার আধুনিক গানের মধ্যেও খন্দকার নূরুল আলমের সুরে সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে ‘আমি সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে অনেক করেছি ফন্দি/শেষে জানলাম মানুষ নিজেই ভাগ্যের জালে বন্দি’, সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘শুধু রৌদ্র কি পারে রাঙাতে রঙধনু’ কিংবা ‘আমি আরো বেশি জড়িয়ে পড়ি যদি এই বাঁধন তোমার খুলতে চাই’ এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। কিছু গানের  ক্ষেত্রে দেখা গেছে মূল শিল্পীর চেয়েও ভালো কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। উদাহরণ: অনুপ ভট্টাচার্য্যের সুরে ফাতেমা-তুজ-জোহরার কণ্ঠে আমার গান ‘কেউ মুছে দেয়নি, আমি নিজেরই অজান্তে চোখ মুছলাম/অশ্রু ঝরিয়ে কারো হয় না কিছুই বহুদিন কেঁদে-কেঁদে বুঝলাম’ যখন আমেরিকাপ্রবাসী শবনম আবেদী গাইলেন আরও বেশি মাধুর্য যুক্ত হলো। অনুপদা ও রফিকভাই এই কণ্ঠের তুলনা করলেন রুনা-সাবিনার কণ্ঠের সঙ্গে। আমার এই একই গান যখন ভারতীয় শিল্পী লাভলী মণ্ডল গাইলেন তখন তার চেয়েও ভালো লাগল। এভাবেই এগিয়ে চলে গান। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ কাজী নজরুল ইসলামের গানে নতুন-নতুন কণ্ঠে ক্রমবর্ধমান সৌন্দর্যের সংযোজন। আমার প্রায় আড়াইশত গানের মধ্যে যদি দু-চারটিও টিকে যায়, আমি তো ভাগ্যবান মনে করবো নিজেকে।

প্রশ্ন : আপনার ছড়া নিয়ে ড. তপন বাগচী লিখেছেন ‘সত্তরের দশকের অসাধারণ ছড়াকার বলতে আমরা যাদের বুঝি, নির্মাণকলার দিক থেকে তাদের চেয়েও শক্তিমান আবিদ আনোয়ার।’ আপনার ছড়া নিয়ে নিজের মতামত কী ?

উত্তর : ড. বাগচীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আমি কি নিজের সর্বনাশ ডেকে আনব ? তিনি আরও লিখেছেন: ছড়ায় বহুমাত্রিক মিল প্রয়োগে আমি সাত-মাত্রা অবধি গিয়েছি যা ‘অন্য কারো ছড়ায় নেই’! শব্দঘর জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় আমার একগুচ্ছ ছড়া মুদ্রিত হওয়ার কথা আছে। যদি হয়, তবে এগুলো পড়ে আপনার নিজের মতামত দিন। আমি কিছু বলতে চাই না।

প্রশ্ন : আপনার গল্পের বই মাত্র একটি। বেরিয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে সেই কবে ২০০৬ সালে। কথাসাহিত্যে আপনার বিচরণ এত কম কেন ? আমাদের তো মনে হয় আপনার আরও বেশি গল্প, এমনকি উপন্যাস লেখারও প্রয়োজন ছিল ?

উত্তর : আমি আগেই বলেছি আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিডিডিআর,বি-র সম্পাদক ও তথ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে আমার চাকুরিজীবনের ৩৩-এর মধ্যে ২২ বছরের ব্যস্ততার কথা। কবিতা, ছড়া ও গান লিখতে পারা যায় রাস্তাঘাটে চলতে-চলতেও কিন্তু গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটা লেখার পেছনে নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকতে হয়। সেই সময়টুকু আমি পাইনি। তবে, আপনার আকাক্সক্ষা কিছুটা হলেও পূরণ হবে। সম্প্রতি স্বপ্নকন্যার শেষ রজনী নামে একটা বড় উপন্যাস লিখে শেষ করেছি। বেরুবে এবারের একুশে বইমেলায়। আমাদের যেসব লেখক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লিখেছেন তাঁদের কেউ সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। ফলে মুক্তিযুুদ্ধের ভেতরকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের লেখায় প্রতিফলিত হয়নি সঙ্গত কারণেই। যেহেতু আমি সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আশা করি আমার এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সেসব অপ্রকাশিত বিষয়গুলো উঠে এসেছে বিভিন্ন চরিত্র-চিত্রণের মাধ্যমে। নায়ক রাজীব হাসান পাটোয়ারী বাঙালি তরুণ কবি ও মুক্তিযোদ্ধা, নায়িকা কিশোয়ার বিহারি সম্প্রদায়ের সুন্দরী তরুণী, যে একটি রূপকধর্মী চরিত্র। কাহিনিও আবর্তিত হয়েছে অনেক সমান্তরাল রূপকের আশ্রয়ে। একশ্রেণির তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর, সচেতন লোকজন যাদের ব্যঙ্গ-করে বলতেন ‘ষোড়শবাহিনীর যোদ্ধা’। এদের বৃহদাংশ ছিল সদ্য ভারত-প্রত্যাগত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী যারা যুদ্ধই দেখেননি। অথচ তারাই তখন ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই লাঞ্ছিত হয়েছেন তাদের হাতে। বিহারি ক্যাম্পে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেরই সেবা করেছেন বন্দি মেয়েদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ লুট-করে। আমার নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনিও জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে অনেকটা তাদের কারণেও। এছাড়াও, দুটি উপন্যাস এবং বেশকিছু গল্প অর্ধলিখিত অবস্থায় আছে। লেখা শেষ করতে পারলে কথাসাহিত্যে আমার অপ্রতুল বিচরণের জন্য আপনার-দেওয়া অপবাদ ঘুচে যাবে মনে করি। ভালো হোক, মন্দ হোক, বিচরণ তো বাড়বে।   

প্রশ্ন :  একাত্তরের সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই ?

উত্তর : আগেই এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পলাশীতে আংশিক ও চাকুলিয়া স্পেশাল ক্যাম্পে আমার প্রশিক্ষণের কথা বলেছি। বিহারের চাকুলিয়ায় স্থাপিত এই ক্যাম্পের নামের সাথে ‘স্পেশাল’ শব্দটি জুড়ে-দেওয়া হয়েছিল। কারণ সেখানে বিস্ফোরক বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলাম বলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কমান্ডো হিসেবে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে কিশোরগঞ্জ এলাকায় যুদ্ধ করেছি। ধুলদিয়া রেলসেতু অপারেশনে আমার সাফল্যের পর সমগ্র হাওর-এলাকার মুক্তিযোদ্ধা দলকে আমার অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছিল যেন বিধ্বস্ত সেতুর দখল ধরে রাখা যায়। স্বাধীনতার পর মহকুমা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের প্রথমে টু-আই-সি এবং শেষ পর্যায়ে চিফ কমানড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

প্রশ্ন : আপনার বইগুলো পড়ে আগেই অনেক কিছু শিখেছি/জেনেছি। এই সাক্ষাৎকার নিতে এসে আরও বেশি কিছু জানলাম। আশা করি নবীন কবিতাকর্মীগণ যারা শব্দঘর-এর এই সংখ্যাটি পড়বেন তারাও উপকৃত হবেন। আপনাকে ধন্যবাদ।

উত্তর : ধন্যবাদ আপনাকেও।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button