

যা তুই ফিরে যা পাখি
আমার ডাকনাম-ধরে ডেকে ওঠে সুদূরের পাখি―
অমর্ত্য যমজ ভগ্নি সে আমার কালো সহোদরা
জন্মলগ্নে এই হাতে বেঁধে দিয়ে রাখী
অচেনা সুদূর কোন্ মায়ালোকে উড়ে গেছে অনঙ্গ অধরা!
আমি একা বেড়ে উঠি রূপে-রসে মত্ত যুবরাজ
পেরিয়ে মায়ের স্নেহ, লালচক্ষু পিতার শাসন
স্বরচিত সংবিধানে গড়ে-নিয়ে রঙিন স্বরাজ
একে-একে জয় করি যৌবনের গন্ধে-ভরা দারুচিনি বন।
খেয়েছি নারীর মধু, এর চেয়ে বেশি তার ছলনার বিষ;
মধ্যবিত্ত মনে গেঁথে স্বামীত্বের বিপুল ব্যর্থতা
সুখের বিবর্ণ মুখে সাধ্যমতো মেরেছি পালিশ,
দুঃখকে নিয়েছি মেনে অনিবার্য রূঢ় বাস্তবতা।
এর মানে বলতে হবে সুখে-দুখে জীবন সুন্দর:
কুষ্ঠরোগী হেসে ওঠে মিষ্টি কোনো স্মৃতির জোছনায়,
নুলো ও ঠুঁটোর নারী সন্ততিতে ভরে তোলে পল্লবের ঘর;
কামরুলের কিষানীরা অবসরে বিলি কাটে চুলের বন্যায়।
যা তুই ফিরে যা পাখি! কালো পাখি, এখন যাবো না―
আগে তো দু’হাত-ভরে জীবনের লুটে নিই সোনা!
…………………………………………………………..

প্রত্নরমণী
তোমাকে দেখেনি মধ্যযুগের নিপুণ পটুয়া,
অজন্তা কিবা ইলোরার ভাস্কর―
তাহলে দেখতে শত ক্যানভাসে,
ব্রোঞ্জে-পিতলে কষ্টিপাথরে,
টেরাকোটা-কাঠ-সোনার পুতুলে
তুমি সাজিয়েছো পুরাকীর্তির সবগুলো জাদুঘর!
কৃষ্ণের পাশে যে আছে দাঁড়িয়ে
যৌবনবতী পাথুরে-স্তনের নারী
লজ্জায় ভেঙে খান-খান হবে
তুমি যদি শুধু একটু সাহসে
জোড়ামূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে খুলে ফেলো এই শাড়ি!
তোমাকে মানাতো প্রত্নবেদিতে পঞ্চালিকায়
গোপীচন্দনে তিলক পরালে বৈষ্ণব কবি,
কোলাহলময় বিশ-শতকের শেষপাদে কেন এলে ?
নষ্ট কালের ভ্রষ্ট প্রেমিক
কী দিয়ে তোমার বন্দনা করি ?
নারী-কীর্তনে ব্যবহৃত সব উপমা দিয়েছি ফেলে!
তোমাকে দেখেনি চিতোরের রাজা,
রূপের পূজারী রসিক রত্নসেন―
তাহলে দেখতে নিদারুণ ক্ষোভে
মিথ্যুক সেই হীরামন পাখি,
এমনকি প্রিয় পদ্মাবতীকে এক-শূলে চড়াতেন!
নর্তকী নও, তোমার চলার পথ জুড়ে
প্রবাহিত তুমি নৃত্যের নানা মুদ্রায়:
দ্যভিঞ্চি আর হেনরী’র নারী
আমাদের প্রিয় রাজহংসীরা
তোমাকে দেখেই গ্রীবাভঙ্গির অসঙ্গতিকে শোধরায়।
তুমি চলে গেলে ঘর জুড়ে হাঁটে তোমার প্রতিমা,
সারাবাড়ি হয় পরাবাস্তব কোনারক ও খাজুরাহো:
সাজের টেবিলে-বিছানা-বালিশে,
ফাঁকা করিডোরে-বিরান হেঁসেলে
থেকে-থেকে জ্বলে ‘তুমি নেই’ এই সত্যের দাবদাহ।
………………………………………………………….

সমগ্র কোথায় তুমি ?
সমগ্র কোথায় তুমি ? আর্তস্বরে ডাকি যতবার
দূর থেকে সাড়া দেয় অতীন্দ্রিয় কে এক আঁধার!
খণ্ডের যোগফল থেকে বহুদূরে সমগ্রের বাড়ি
জেনেও খণ্ডাংশগুলো জোড়া দিই যতটুকু পারি।
প্রতিটি গন্তব্য তার কিছু চিহ্ন এঁকে রাখে পথের ওপর,
হিজিবিজি সেইসব জটিল জ্যামিতি থেকে সমগ্রের ঘর
খুঁজতে গিয়ে মনে হলো
আমি এক সদ্যোজাত শিশুর মতন
মা বলতে যে বোঝে শুধু উষ্ণ দুই গোলাকার স্তন।
কখনো-বা চোখে-মেখে বিপুল বিস্ময়
তাকায় মায়ের মুখে―সে-মুহূর্তে তাকে মনে হয়
প্রকৃত সন্তের মতো, ধ্যানমগ্ন গিলে খায় সোহাগের ধ্বনি,
প্রবল বিশ্বাসে তার ক্ষুদ্র চোখ বলে ওঠে: এই তো মা-মণি!
ক্রমে ক্রমে চেনে তাকে সান্নিধ্যের গাঢ় উষ্ণতায়,
অবশেষে উন্মোচিত নিজস্ব নারীর মতো বাবার শয্যায়:
মূলত রমণী তিনি: পরিমেয় ঊরু-বুক-জরায়ু-জঘনে
তবুও জননী থাকে চিরদিন দেবীতুল্য সন্তানের মনে।
সমগ্র কোথায় তুমি ? ডাকতে-ডাকতে বেলা চলে যায়,
এমনকি তত্ত্বযোগী সাধুবাবা ঘুরেফিরে হাজার দরগায়
কখনো পাননি কিছু, বললেন: আজীবন সমগ্রকে খুঁজে
আমিও করেছি জড়ো নানারঙা চতুর্ভুজ,
মিশিয়েছি গোলকে-ত্রিভুজে
(বলেই মেললেন তিনি বহুবর্ণ তালি-মারা গায়ের গিলাপ)
আমারও অন্বিষ্ট ছিলো ভবের দারুণ শীতে ভবানীর তাপ।
কিন্তু দ্যাখ্! এ-ও শুধু তালির যোগফল, স্বরচিত মলিন ময়ূর!
পেখম দেখতে হলে যেতে হবে আরো বহুদূর….
………………………………………………………………..

দেবী-না-মানবী কিছু নেই মনে
বশীকরণের মন্ত্র শিখিনি,
নীলখামে কোনো পত্র লিখিনি,
তবুও চেয়েছি মন বিকিকিনি
দীনহীন কিছু পদ্যে―
শব্দে-ছন্দে এই দূতিয়ালি
ব্যর্থ হয়েছে তবু খালি-খালি
এখনও বইছে ক্ষরণের কালি
ধমনি-শিরার মধ্যে।
উবে গেছে আশা হয়ে কর্পূর,
বাঁশি থেমে গেছে তবু বাজে সুর,
যত যায় দূরে ততই মধুর,
ঘোরে-পাওয়া এই সত্তা―
ঘুমের ভেতরে নিদ্রাবিহীন
শুনি সেই সুর সারা নিশিদিন;
দেহ ক্ষয়ে গেছে, আছে শুধু চিন,
তারও নেই নিরাপত্তা।
আমার পৃথিবী বর্তুলাকার:
যে-রেখায় আমি ঘুরি চারিধার
কেন্দ্রে রয়েছে সেই সে-রেখার
একটি নিছক বিন্দু―
বুকে তার বল সেন্ট্রিপেটাল
টান-খেয়ে যার হয়েছি নাকাল,
পেরিয়েছি খানাখন্দ ও খাল,
তেরো নদী-সাত সিন্ধু।
একদা কখন কবে কুক্ষণে
দেবী-না-মানবী কিছু নেই মনে
একা নদী-তীরে নাকি নীপবনে
দেখা দিয়েছিলো সত্যি―
নাকি আমি নিজে শুনে নিশিডাক
পথে নেমে এসে খাই ঘুরপাক;
এই গতিবিধি মিথ্যে বেবাক,
মানে নেই একরত্তি!
………………………………………………

শব্দ
এ কী!
শব্দ নিয়ে খেলতে এসে দেখি
শব্দ নিজে আমাকে নিয়ে খেলে:
বরং এরা সবাই পটু আমিই এলেবেলে!
যতই তুলি শুদ্ধ থাবা চতুর পুসি,
শব্দগুলো ত্যাঁদড় কিছু নেংটিছানা!
অমোঘ কোনো বিধানবলে যখন খুশি
কেবল যেন খেলতে পারি, ধরতে মানা।
কোনো শব্দ ফিঙের মতো, ইস্!
লেজ-দুলিয়ে চোখের কাছে নাড়ায় প্রলোভন;
টিয়ের মতো তীব্র বেগে পাখায় তুলে শিস
স্বরগ্রামে দেয় দুলিয়ে বোধের মায়াবন।
কোনো শব্দ মুখ-লুকানো কাঠখোড়লী
পুচ্ছ দেখে কেবল তাকে অর্ধ চিনি;
ঘুমের ঘোরে কাত্রে-মরে অর্থাবলি,
আধেক বাজে চাই বাজাতে যে-কিঙ্কিনী।
কোনো শব্দ অন্ধকারে বাদুড়-ঝোলে,
পষ্ট করে চোখ মেলে না আলোর ভয়ে;
বায়ুর দোলা দোলায় তাকে যে-হিল্লোলে
তাতেই দুলি, তৃপ্তি খুঁজি দূরান্বয়ে।
কবির তাজা রক্ত চোষে শব্দ-কৃকলাস;
ব্যর্থ কোনো দিনের শেষে রাত্রি হলে দেখি:
শব্দগুলো তারার মতো, এ কী!
মিটমিটিয়ে দুষ্টুচোখে করছে পরিহাস!
………………………………………………….

উত্তরাধুনিক বৃষ্টিপাত!
পরাবাস্তব বৃষ্টিতে ভেজে বগলের বর্ষাতি―
শুকনো আষাঢ়, মিছে গর্জায় আকাশের কালো হাতি;
কখনো ধূসর নীলিমায় শু’য়ে গর্ভিনী কোনো মোষ
হতাশার মতো প্রসব করছে সাদা-সাদা খরগোশ!
এ-আষাঢ় যাবে সাদাকালো আর নীলের কোলাজ দেখে ?
বর্ষাসংখ্যা সাময়িকী জুড়ে মেঘের পদ্য লে’খে ?
ঈশানের দিকে চেয়ে দেখি যেই জমছে সম্ভাবনা
‘বৃষ্টি হবে না’ ঘোষণায় বলে ঢাকা বেতারের খনা।
অবচেতনের কোথায় তবুও কদমের ঘ্রাণ পাই:
অলীক জলের শিহরণে কাঁপে করিডোরে বনসাই―
স্মৃতির ভেতরে পাঠশালা ভেজে, থকথকে বইখাতা;
আমি আর সাজু―মাথার উপরে যৌথ কলার পাতা।
ভেজা কিশোরীর শরীরের ঘ্রাণে সম্বিতে ফিরে দেখি
চৈত্রের মতো গদ্যরমণী চোখ ঠারে তার মেকি।
বৃথা শৃঙ্গারে শরীর কাঁপিয়ে শুয়ে পড়ি নিজ খাটে,
কামনার জলে “বঁধূয়া তিতিছে দেখিয়া পরান ফাটে…”
করাতকলের শব্দেরা বোনে বর্ষাধুমল রাত―
আগামী শাওন বৃথা যাবে না তো, হবে কি বৃষ্টিপাত ?
……………………………………………………………..

সুন্দরালি’র যৌথ অবচেতন
পউষের ঘাসে পরীর পেসাব!
বাতাস ধরেছে বরফের ভাব,
ফাটা-পায়ে হেঁটে হাল নিয়ে যায় ক্ষিপ্ত সুন্দরালি―
বিগত রাতের ব্যর্থতা ভাবে:
কী যেন কীসব দেখেছিলো খা’বে,
পাঁচন উঁচিয়ে বিড়বিড়-করে গাইটাকে দেয় গালি:
বাঁয়ে ক’লে দেহি ডানমুহি যাস,
মইত্যার মা’র দেমাগ দেহাস,
হেট হেট হট, সিধা অ’য়া চল্, ফাডায়া ফালামু বেডি;
মেয়া-মানুষের মন বোঝা ভার!
দরদ বোঝে না দিল-কলিজার,
পরান দিলেও ফুঁস মারে য্যান্ মনুমোড়লের জেডি!
হায়রে কপাল! দোষ ধরি কার!
একবেলা ভাত, দুইবেলা মাড়,
মইত্যার পেডে যাই কিছু ঢোহে কিরমিরা খা’য়া ফ্যালে―
জমিনে ঢোহে না লাঙলের ফাল,
মাডি য্যানো দেও-দানবের ছাল;
বানে-ডোবা জমি তা-ও ভাসি’ ওডে মরশুম চলি’ গ্যালে।
একাত্তরের যুদ্ধ করিছি,
দেশের জন্যি অস্ত্র ধরিছি,
কান ভরি’ হুনি হগলে আমারে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ডাহে!
চিল্লায় কারা ‘চেতনা-চেতনা’
নেতা’য়া পড়িছে গোখরোর ফণা―
চেতনা খা’য়া কি কারো কোনোদিন পেড ভরে কও বাহে ?
……………………………………………………………………

হরিপদ’র দিনরাত্রি
তরল হীরের নদী,
সোনারং নৌকো দোলে দূরে;
স্বেচ্ছায় লাফিয়ে পড়ে ঝাঁক-ঝাঁক রুপালি ইলিশ…
সহসা স্বপ্নের ঘোরে হেসে ওঠে হরিপদ জেলে:
দেখে সে গঞ্জের হাটে আজ বড়ো ক্রেতাদের ভিড়,
নিবিড় ছায়ার মতো মলিনার চোখ মনে পড়ে,
বলে: ও জাইল্লার মেয়া, আর ক’ডা দিন,
আগামী আশ্বিনে তোরে ঘরে তুলি নিমু….
অথচ কোথায় ঘর!
স্বপ্নফেরা হরিপদ নিয়তির ঘাটে
ফুটো নৌকো, ছেঁড়া জাল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কলসতাড়িত জলে নিত্যদিন কেঁপে ওঠে বিমূর্ত মলিনা:
স্নানার্থিনী ধীবরকন্যার গাঢ় সোমত্ত যৌবনে
আগতর লেপ্টে-থাকা লালপেড়ে শাড়ি
কে যেন হৃৎপিণ্ডে তার পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে
ব্যান্ডেজের মতো-করে বেঁধে রেখে যায়….
…………………………………………………..

কীর্তনের আসরে একদিন
আসর-ভরা নারী-পুরুষ,
গাইছে ভালো শিবু কীর্তনিয়া―
বাহুলগ্ন তুমি ও আমি আবেগে আপ্লুত
শিবু যখন বিস্তারিলো রাধার পরকীয়া
হঠাৎ দেখি তোমার হাত আমার মুঠোচ্যুত!
দূরের কোনো বাদাড় থেকে বুনোফুলের ঘ্রাণ
শুঁকতে গিয়ে চেনা-গোলাপ ঠেকছিলো কি বাসি ?
শিবুর সুরে শুনছিলে কি বেগানা আহ্বান ?
পাশের কোনো বাড়িতে বাজে ব্রজের পোড়া বাঁশি!
সেই যে কবে তোমার চোখে পদ্মদিঘি দেখে
ভেবেছিলাম এর গহিনে রত্ন আছে জমা―
ডুব-সাঁতারে অতল জলে তুলতে গিয়ে একে,
হাতড়ে-দেখি কিছু তো নেই, ক্লেদজ নর্দমা!
…………………………………………………………

প্রতিবিম্ব এবং আমি
অবুঝ শৈশবে
আয়নায় নিজেকে দেখে ধরতে গিয়েছি,
বয়স ও বুদ্ধির কাছে পাঠ নিতে-নিতে
অতঃপর জেনে গেছি:
কাচের ওপারে থাকে কায়াহীন ছায়ার মানুষ;
যে-আমি এপারে আছি
এটাই প্রকৃত আমি শরীরে-সত্তায়।
এখন শৈশব নেই
তবুও যুক্তির কথা মাথায় ঢোকে না,
বুদ্ধিনাম্নী শিক্ষয়িত্রী মারা গেলে পর
বোধি এসে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে;
একান্ত নিবিষ্টমনে আয়নায় নিজেকে দেখে
এখনও প্রায়শ আমি ভুল করে ফেলি:
কে আমি প্রকৃত আমি মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না….
তবে কি ওপারে যিনি তিনিই মালিক ?
আমি তার প্রতিবিম্ব
অথবা সুদূর ছায়াপথে আবর্তিত
কর্কট-নামীয় কোনো রাহু কিংবা নক্ষত্রের দাস ?
……………………………………………………….

বিচূর্ণ খুলির মাঠে
কী আশ্চর্য বেঁচে থাকি স্বাভাবিক বাঁচার নিয়মে,
লোকালয়ে বাস তবু সত্তাজুড়ে নরকের গান;
র্যাঁবোর প্রেতাত্মা যেন কালজয়ী জীবন-সংগমে
গতায়ু আমার দেহ জীবিতের মতই নাচান!
এখনও রক্তের ধ্বনি ধুকপুক ধমনিতে বাজে,
নারীর সৌন্দর্যে খুঁজি দেহাতীত অন্য কোনো মানে,
পড়শীকে শ্রদ্ধা করি, প্রয়োজনে নম্র হই লাজে,
কখনো প্রকাশ্যে ঢালি গূঢ় জল নিজের বাগানে।
বিচূর্ণ খুলির মাঠে চাষ করি মানবিকতার:
পরাজয়ে ক্লান্ত তবু ক’ষে ধরি নিবিড় লাঙল―
এখানে উৎসব শুধু ঘন ঘন কালো পতাকার,
সমূহ শস্যের গায়ে লেগে থাকে শকুনের মল।
কালের কাঁকরে খুঁজি সনাতন সান্দ্র ধূলিকণা,
প্রতিটি মৃত্যুর কাছে পেয়ে যাই বাঁচার প্রেরণা।
বসবাস
পশুর রাজত্বে আছি:
প্রতিদিন ভোরবেলা জগিংয়ের শেষে
শিঙের স্বাস্থ্য দেখে মহিষের দল;
প্রায়শ রাস্তার মোড়ে দেখা হলে জনৈক গন্ডার
“কেমন আছেন” ব’লে হাসিমুখে কুশল শুধায়!
……………………………………………………………

কোলাজ
নীলের ডোরাকাটা সবুজ মাছরাঙা
গেঁথেছে লাল ঠোঁটে রুপালি মৌরলা
বেরুবে ছাইরঙা গলিত বিষ্ঠায়
তবু সে নিয়তিকে লেজের চাঁটি মারে
অপার নিষ্ঠায়
জানালা খুলে-বসে প্রায়শ রাতে দেখি
আকাশে দল-বেঁধে মেঘেরা খেলা করে
হা-করা কালো তিমি চাঁদকে গিলে খায়
আঁধার পেট-ফুঁড়ে তবুও প্রাণপণে
জোছনা ঝলকায়
নিবিড় চাষি জানে মাটির কোপনতা
কতটা আড়চোখে তাকায় ব্যর্থতা
ফসল খেয়ে ফেলে খরা ও বন্যায়
খনাও বলেনি তো প্রকৃতি নিজে করে
এতটা অন্যায়
কিছুটা নিজে জানি বাকিটা মহাকাল
দেয়ালে নোনা ধরে, টেকে না জলরং
(অজর পদাবলি বলে তো কিছু নাই)
অন্ধ তুলি দিয়ে কালের ক্যানভাসে
তবুও আঁচড়াই
…………………………………………………

অন্যরকম রোদে
উষ্ণতম বাতাসের খাঁজে
লুকানো রোদের ঘ্রাণ উস্কে দিয়েছে কেউ
যেন অকস্মাৎ
মৃতকল্প পৃথিবীর গোলাকৃতি শবাধার-ঘিরে
প্রকৃতি জ¦ালিয়ে দিচ্ছে ভয়াল লুবান।
তদীয় কমলালেবু মরতে বসেছে দেখে
মানুষ ও সৌরবৃক্ষ শোকে মুহ্যমান।
ছুটছে পাখির দল,
মহিষেরা রুদ্ধশ্বাসে ছেড়েছে বাথান;
আজীবন সূর্যগ্রস্ত মরুর জাহাজ
ভেতরে-ভেতরে খোঁজে সুনিবিড় খেজুর বাগান।
………………………………………………..

অন্ধের তৃতীয় চোখ
পূর্ণ তুমি এলে আজ প্রায়ান্ধের কাছে―
তোমাকে দেখার লোভে যখন উদ্বেল
আমার সমগ্র সত্তা জেগেছিলো উন্মিলিত চোখের মতন
তখন তো তুমি ছিলে মায়াবনে সোনার হরিণ
অথবা সে-কাঠবিড়ালি তুষারের ঝড়ে
যে তার চাঞ্চল্য ভুলে মৃতবৎ পড়ে থাকে
গাছের কোটরে কিংবা পর্বতের গহিন গুহায়।
এখন দৃষ্টির পথে ছায়া আর আলোকের খেলা:
তোমারও অমল কান্তি ধূসরিত মলিন কোলাজে
যেন কোনো চিত্রকর আঁকতে গিয়ে সুন্দরের ছবি
সহসা ‘ধুত্তুরি’ বলে ক্ষোভে-দুঃখে লেপে দিলো রঙের কালিমা।
তবু আমি দেখে নেবো আঁতিপাঁতি তোমার সকল―
জানোই তো অন্ধের তৃতীয় চোখ দারুণ প্রখর।
……………………………………………………………

বাইশের লাল ঘোড়া
মানতের মতো রেখে যায় কারা যার-যার প্রিয় ফুল,
পাপড়ির সাথে মাধুরী মেশানো নানাবর্ণের তোড়া:
শহীদ মিনার নিমেষেই দেখে ফাঁকা তার বেদিমূল,
একুশের ফুল খেয়ে চলে যায় বাইশের লাল ঘোড়া!
হঠাৎ কখনো জাবরের পরে উৎকট ক্ষেপে ওঠে:
খুঁজে-ফেরে তার মৌসুমী মেনু রক্ত-মাখানো জল,
নগর দাপিয়ে পাগলের প্রায় উড়ুক্কু পায়ে ছোটে,
পিছে ফেলে আসে গণভবনের নিকানো আস্তাবল।
হায়েনার মতো হিংস্র দু’চোখ, কেশর ফুলানো ঘাড়,
গগনচুম্বী দালানের চেয়ে উঁচুতে নাড়ায় কান;
খুরের দাপটে রাজপথে ওঠে মিছিলের হাহাকার,
নড়ে ওঠে কাঁচা টিনশেড থেকে ইটের দরদালান।
যবনিকাহীন ধারাবাহিকের চরিত্রগুলো আজও
অসি-ঝলকিয়ে অভিষেক করে ক্ষুধিত সরফরাজ:
মারে কত রাজা, উজির-নাজির, মরে যায় মহারাজও;
বেঁচে থাকে শুধু রাজকুমারের সাধের পক্ষীরাজ!
………………………………………………………..

১৪০০ সাল
আজ কোনো সূর্য নয়,
দিগন্ত রাঙালো নিজে রবীন্দ্র ঠাকুর:
শ্মশ্রুময় দেবকান্তি, অমিতাভ চিবুকের নূর
ছড়ালো রৌদ্রের মতো
যেন এই অপ্রাকৃত আকাশের নীল
লক্ষকোটি জাগর জোনাকি নিয়ে
করে ঝিলমিল!
প্রশ্নচিহ্ন হয়ে জ্বলে চেতনার গভীর ভেতরে
“কে তুমি পড়িছ বসি’ আমার কবিতাখানি
কৌতূহল ভরে ?”
দিগন্তে তাকিয়ে দেখি
ফ্যালফ্যাল চেয়ে আছে মহান কাঙাল―
কেঁপে ওঠে ইতস্তত ভ্রষ্ট মহাকাল।
গীতাঞ্জলি হাতে নিই ঝেড়েমুছে ধুলা:
হঠাৎ পালাতে গিয়ে লজ্জা পেলো
গুটিকয় কালের আরশুলা!
………………………………………………

নারান্দির নূরী পাগলী
নারান্দির নূরী পাগলী রাতদিন চষে-ফেরে সমস্ত শহর,
পথের সম্রাজ্ঞী যেন, বহুকাল পথই তার ঘর।
এখন সে বৃন্তচ্যুত পাপড়ি-ছেঁড়া অবিন্যস্ত ফুল:
হেনরী’র ভাস্কর্যে কারা পরিয়েছে ছিঁড়া-তেনা, এলোমেলো চুল।
ক্লেদে ও চন্দনে-মাখা পুরুষ্ট ঊরুতে কিবা অবারিত পিঠে
নিশ্চিত দোররার ঘায়ে চিত্রাঙ্কিত কতক কালশিটে।
একদা রমণী ছিলো, হয়তো ছিলো স্বামী ও সন্তান,
‘ভাবি’ ডেকে তৃপ্তি পেতো মুদি ও বেপারী থেকে পাড়ার মস্তান;
অথবা হয়নি বিয়ে, ছিলো কোনো মা-বাবার উছল কুমারী,
নয়তো সে অন্ধকারে বেড়ে-ওঠা অন্য কোনো নারী!
কী হবে এসব জেনে, এখন অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মিছে―
প্রায়ই দেখি শূন্যমুঠো আগলে-রেখে নিতম্বের পিছে
কী এক সম্পদ যেন লুকোতে-লুকোতে বলে: দিমু না দিমু না!
চা’য়া কী দেহস বেডা, দোজহের লাকড়ি আমি, দেহা বড় গুনাহ্!
তোগোর মতলব জানি: হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হিঃ হিঃ…
আচ্ছা, তবে ক’ তো দেহি এই হাতে কী ?
কখনো উৎসুক হয়ে কেউ যদি বলে দেখি কী এমন ধন ?
মুঠি খুলে নূরী বলে: ক্যান্ তোর চক্ষু নাই ? এই দ্যাখ্, আমার যৈবন!
……………………………………………

বৃষ্টির গান শহুরে করাতকলে
কাঁটাবনে গিয়ে প্লাস্টিকে-গড়া কেয়া-কেতকীর ঘ্রাণ
পরাবাস্তবে শুঁকে-শুঁকে আমি হয়ে উঠি সপ্রাণ!
আমাকে শোনায় বৃষ্টির গান শহুরে করাতকল,
তবু বারবার অবচেতনেই স্মৃতি করে ঝলমল;
কাল-কবলিত হয়েও আমার ঘটেনি বিস্মরণ:
জলকে বলেছি ‘বারি’ আর সেই বৃষ্টিকে ‘বরিষণ’!
ভুলবো কী করে কদমতলার ভেজা সে-নীলাম্বরী,
ভুল হতো শুধু ভেতরে কে ছিলো―মানবী-না-মেঘপরী ?
শাড়ি টেনে-টুনে নিজেকে ঢাকার কত কী যে কৌশল!
দেখে-দেখে আমি ভেবেছি সেসব রমণীসুলভ ছল।
ভেজা-কেতকীর গন্ধে-মাতাল বাতাসের মতো আমি
নিজেও হয়েছি কতটা উতলা! জানে অন্তর্যামী।
রবি বলেছেন: এমন বাদলে সব ‘তারে বলা যায়’―
আমি কাপুরুষ বলতে পারিনি, মরে গেছি লজ্জায়।
নীপবনে ভেজা-নীলাম্বরীকে এখনো যাইনি ভুলে―
হলুদ বাতিরা চোখ-ঠারে তাই কদমের মতো ঝু’লে!
……………………………………………………………..

আনারকলির সঙ্গে একদিন
উবে গেছে প্রত্নমূল্য, আগ্রাফোর্টে প্রাণ পেলো বিরান নাচঘর:
আনারকলিকে কারা সাজিয়েছে বহু যত্নে এতদিন পর!
পর্যটক এই আমি সমাবিষ্ট শাহজাদা সেলিমের বেশে,
পাশে নেই আলম্পনা, অন্যরাও ব্যস্ত ঝুঝি কর্মব্যপদেশে।
অথবা আমিই নিজে ইচ্ছে-করে তাড়িয়েছি অন্য সব চোখ,
আজ তাকে একা চাই, তবে কি না থাক কিছু বাদনের লোক:
সারেঙ্গী-সেতারে-ঢোলে খোলে ভালো নূপুরের সুমিষ্ট ঝঙ্কার,
নিজ-নিজ বাদ্য নিয়ে মগ্ন তারা, নৃত্য দেখে সাধ্যি আছে কার ?
বার থেকে সদ্যফেরা রক্তে ছিলো তরলের অবশিষ্ট ঘোর,
আনারকলিও নিজে সাগ্রহে বাড়িয়ে দিলো নগ্ন বাহুডোর!
প্রেম নয় নিষ্কলুষ, মূলে আছে লিবিডো’র গূঢ় রসায়ন,
নৃত্যে দেখি ঊরু-নাভি, প্রস্ফুটিত নর্তকীর আধ-খোলা স্তন!
যে দেখে না মিথ্যে বলে, ধর্মের যাজক থেকে শ্বেতশুভ্র নান
প্রতিটি মানুষ কোনো অনিবার্য মিলনের প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
জ¦ী, আমি সেলিম বলছি বহুগামী পুরুষের যোগ্য বংশধর,
আমারও দেহের কোষে সগৌরবে বহমান আরেক আকবর;
গোস্তাকি করুন মাফ, জাঁহাúনা, মহামতি মুঘল-ই-আযম,
নন্দিত প্রেমিক হয়ে আপনিই কী করে হন প্রেমিকের যম ?
পত্নী-উপপত্নীভরা অবিভাজ্য হেরেমের ওয়ারিশান আমি,
কী এমন ক্ষতি হবে হই যদি আরো এক সুন্দরীর স্বামী ?
… … …
অথবা সেলিম নই, ধরো আমি মধ্যবিত্ত নব্য শাহজাদা,
তোমাকে ছুঁয়েছি আজ, ধন্যবাদ প্র্রিয়তমা, দাও নাই বাধা!
লোকে বলে বাউণ্ডুলে, ভ্রমণপিপাসু এক বাঙালি প্রেমিক
তোমাকে একান্তে চেয়ে পেয়ে গেছি, হোক ছোঁয়া পরাবাস্তবিক।
ফুটন্ত যৌবন যার টসটসে পারসিয়ান আনারের দানা
সেলিম ছাড়াও যারা আগেভাগে লুটে-খেলো তারা কি বেগানা ?
অবশ্য যুক্তির কথা তর্কের খাতিরে সে তো মানতেই হয়:
মন ছাড়া দেহ দিলে তাকে কেউ কোনোকালে ভালোবাসা কয় ?
নারীর মনের চেয়ে মাননীয় অন্য কোনো নীতিশাস্ত্র নাই:
আয়ান মন্ত্রের স্বামী, রাধিকার শুদ্ধ পতি ব্রজের কানাই!
সবাই নায়ক তবে খল-না-যথার্থ জানে কেবল নায়িকা;
হৃদয় মানে না কোনো লিখিত কাবিন-নামা, কেতাবের ফিকা।
… … …
পশ্চিমে তাকিয়ে দেখি বেলে-লাল পাথরের সূর্য হচ্ছে গাঢ়―
আনারকলিকে বলি: এবার কবরে যাও, কথা হবে আরো!
আবারও আসবো ’খন, হয়তো সহসা নয়, অন্য কোনোদিন,
কালের কামড়ে যদি না-হয় বিলীন এই হেরেমের চিন!
……………………………………………………………………….

কবিতাকে বিদায় জানাবার মুহূর্তে
চলে যাবে বলে কাঁদতে বসিনি, স’য়ে গেছে পেরেশানি,
আমি তো প্রতিটি ব্যর্থতাকেও শিক্ষক বলে মানি!
শুনেছি অমোঘ অমৃতের বাণী: আলোতে আলোক ম্লান,
আঁধার ছাড়া তো আলোর কণিকা হয় না দৃশ্যমান!
যে-দীপ জে¦লেছো অবচেতনের গহন অন্ধকারে,
তাকেই কখনো উসকিয়ে দেখি প্রয়োজনে বারেবারে।
চেতন-মনের প্রাচীর ডিঙিয়ে দেখেছি ওপারে গেলে
তোমার যোগ্য মণি ও মুক্তো, হীরে-জহরত মেলে।
বসত গড়িনি ‘সুতোর ওপারে’ ক’রে কোনো পাগলামি,
দু’পারের গাঢ় সেতু-বন্ধনে ছিলাম কি দূরগামী ?
এসেছো পয়ারে, মাত্রাবৃত্তে, স্বরমাত্রিকে সেজে,
ছুটেছো দীপ্ত হনুমান যেন আগুন লেগেছে লেজে।
কখনো গিয়েছো গাঢ় শীতঘুমে সরীসৃপের প্রায়,
তুষারে যেমন কাঠবিড়ালিও কোটরে লেজ লুকায়।
তখনও সুপ্ত আগুনের মতো ছাইচাপা লাল মুখ
দেখিয়েছো তুমি―আমার মতো কি তুমি ছিলে উৎসুক:
অবগুণ্ঠিত থাকার বেদনা তোমাকেও পুড়ে মারে ?
মনোমোহিনীরা নিজেরাও প্রীত জলসায়-দরবারে!
তোমার-আমার প্রীতি-বন্ধনে উভয়ের লাভ-ক্ষতি
ভেবে কি আবার ফিরে-ফিরে এসে আমাকে দিয়েছো গতি ?
চেতনা-প্রসারী চিত্রকল্পে, প্রতীকে ও উপমায়
তোমাকে দেখেছি পাষাণে খোদিত প্রত্ননারীর প্রায়।
হাতুড়ি-ছেনির যুগল প্রয়াসে পাথরেও জাগে প্রাণ,
শব্দে-ছন্দে তোমাকে জাগাতে আমিও ধরেছি গান।
একালের শত এলো-পদাবলি রচয়িতাদের ভিড়ে
ব্যাকুল কণ্ঠে কিছুটা ডেকেছি স্বনামে শাশ্বতীরে:
মহাজনদের সাজানো বাগানে ভেঙেছিও ডালপালা:
কেউ দেখে খুশি, কেউ-কেউ খুব করেছেও মুখ কালা।
সিন্ডিকেটেড কাকেদের ভিড়ে মুনিয়ারা আজও গায়,
কোমর বেঁধেই সৃজনের মাঠে আছি সেই ভরসায়।
‘কা কা’ তত্ত্বের ফাঁকাবুলি শুনে উড়িয়েছি ফুৎকারে,
বয়স বেড়েছে, পচন ধরেনি মেরুদণ্ডের হাড়ে।
তুমি চলে যাবে, আজ হোক কাল আমাকেও যেতে হবে,
জানি না আমার খেরোখাতাটার কতটুকু বেঁচে র’বে!
মহাকাল যিনি হা-করে আছেন খাবেন কি তার সব,
কনুই-খেলাতে এলো-পদাবলি করে যাবে কলরব ?
তোমার-আমার উড়াল-চিহ্ন যদি কিছু থেকে যায়
মেকিপণ্যের শ্রীতত্ত্ববিদ ম’রে যাবে লজ্জায়!
তোমার কাছেই রইলো এ-ভার: সবাইকে বলে দিও
কতটুকু এর ছিলো দরিদ্র, কতটুকু বরণীয়।
…………………………………………..
সচিত্রকরণ : রজত



