আর্কাইভগল্প

সৃজনশীল বজ্রপাত : আবিদ আনোয়ার

আবার পড়ি : তাঁর গল্প

হিমিদের বাসায় গিয়ে সজল বুঝতে পারে আঁকিয়ে বা ভাস্কর না-হয়েও শিল্পী হওয়া যায়! হিমির বাবা বোরহান সাহেব কিছু আঁকতে পারেন না। বানাতে পারেন না কোনও ভাস্কর্য। কিন্তু সজলের কাছে তাঁকেও মনে হলো একজন বড় মাপের শিল্পী! তার বাড়িটাই একটা শিল্পশালা! কিন্তু না, ঘরের দেয়ালে জলরং-তেলরং কিংবা মিক্সড মিডিয়ার পেইন্টিং নাই! নাই কোনও মানুষের-গড়া ভাস্কর্য! লনে ও বারান্দায় নানা জাতের বনসাই, বিভিন্ন সাইজের রঙিন পাথর, দেয়ালে-দেয়ালে ফ্রেম-করা খড়বিচালি ও লতাপাতা! এগুলো আঠা-দিয়ে ক্যানভাসের সঙ্গে সেঁটে প্লাস্টিকের স্বচ্ছ শিট-লাগিয়ে ফ্রেম-করা হয়েছে। এখানে-ওখানে পড়ে-আছে বিচিত্র কিছু হাড়গোড়, গাছের কাণ্ড-মূল, শাখা ও প্রশাখা। সবকিছুই ভাস্কর্যের মতো!

অনেকে হয়তো বলবেন বোরহান সাহেব শিল্পী নন―শিল্পের সমজদার। তাঁর সংগ্রহে যা আছে তা কোনও শিল্পীর সৃষ্টি নয়। সবই প্রকৃতি থেকে-নেওয়া। সংগ্রহ করেছেন নিজের পছন্দে এবং চেষ্টায়। অধিকাংশই উদ্ভিদজগতের। সাধারণ আম-জাম গাছের বিদঘুটে অংশও কী করে শিল্প হয়ে উঠতে পারে বোরহান সাহেবের বাড়িতে না-এলে কেউ বুঝতেই পারবে না। বিন্যাস করেছেন বোরহান সাহেব নিজেই। সব দেখে সজলের মনে হলো মিথ্যে এই সব রংতুলি, ইজেল-ক্যানভাস, হাতুড়ি-ছেনি, কষ্টিপাথর, টেরাকোটা আর প্লাস্টার অফ প্যারিস! সব শিল্প তৈরি-হয়ে আছে আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতেই! দেখে কেবল ঘরে-তোলাই আমাদের কাজ!

সজল বিস্মিত চোখে ঘুরে-ঘুরে দেখছে। দেখাচ্ছেন বোরহান সাহেব নিজেই। কোনটা কবে কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন তা বলে চলেছেন। দেখা শেষ-হলে বোরহান সাহেব সজলকে নিয়ে বসলেন তাঁর ড্রয়িংরুমে। বোরহান সাহেবের একটি মন্তব্যে সজল চমকে ওঠে। লোকটি শুধু শিল্পী নন! শিল্পের একজন তুখোড় ব্যাখ্যাদাতাও!

বোরহান সাহেব বলে চলেছেন : ‘বুঝলেন সজল সাহেব, এসব সংগ্রহ করতে-করতে আমি একটি সহজ সত্যকে উপলব্ধি করেছি। শিল্পের সঙ্গে আছে একটি অসুস্থতার স¤পর্ক। যা কিছু অসুস্থ, বিকৃত, তাই শিল্পিত! এই যে আমার ঘরের কোনায় বাঁশটাকে দেখুন। গিঁটের সংখ্যা গুনে দেখুন। সুস্থভাবে বেড়ে উঠলে এটি লম্বা হয়ে যেত। আমার ড্রয়িংরুমে ঢোকাতেই পারতাম না। ঢোকানোর প্রয়োজনও দেখা দিত না। অসুস্থতার কারণে চার-ফুটের বেশি বাড়তে পারেনি। অথচ গিঁট আছে ষোলোটা! দেখতেও ক্যামন ইকড়ি-মিকড়ি! এর মানে কত শিল্পিত তার চেহারা! নিচে পিয়ানোর পাশে দেখে এসেছেন যে একটা ভাস্কর্য ওটা এক সাধারণ জামগাছের রোগাক্রান্ত ডাল। এই অংশটি ছিল অসুস্থ। গিট্টু-লেগে বিকৃত ও শিল্পিত হয়ে উঠেছে। নইলে কি আর আমার ঘরে ঠাঁই পেত! বেশ কিছুদিন সিজন করেছি। এরপর চুবিয়ে রেখেছি ফরমালডিহাইডে। নানা জাতের প্রিজার্ভেটিভ মেখে এখানে এনেছি। অই যে নারীমূর্তির মতো একটি ভাস্কর্য দেখছেন, এটি আসলে একটি অসুস্থ মুলা! বাড়তে-বাড়তে মাঝপথে এসে দু ভাগ হয়েছে। একটা নারীর কটিদেশ ও নিতম্বের রূপ নিয়েছে! ফরমালডিহাইড ট্রিটমেন্ট পেয়েছে বলে দীর্ঘদিন টিকে আছে।’  

সজল মুগ্ধ হয়ে শুনছে। হঠাৎ মনে হলো বোরহান সাহেবের কথাটা সর্বাংশে সত্য নয়! আলোচনায় অংশ নিয়ে তাকে ঘায়েল করার মতো পয়েন্ট পেল। বলল : ‘অসুস্থতা কিংবা বিকৃতির চেয়েও মনে হয় জটিলতাই শিল্পের মৌলিক উপাদান। অই যে চা-গাছের মূল দেখুন! আপনাদের টেলিভিশন স্ট্যান্ড। সব চা-গাছের মূলই তো ইকড়ি-মিকড়ি! তাই আপনার মতে শিল্পিত। সব চা-গাছ কি অসুস্থ ?’

সজল বুঝতে পারেনি তার এই আপাত যুক্তিপূর্ণ কথাকেও উড়িয়ে-দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন বোরহান সাহেব। যদিও সজল বুঝতে পেরেছিল শিল্পবিষয়ে লোকটার পাণ্ডিত্যের কমতি নেই।

সজলকে অবাক-করে দিয়ে বোরহান সাহেব বললেন : ‘হ্যাঁ সজল সাহেব, সব চা-গাছই অসুস্থ! মানুষই তাকে অসুস্থ-করে রেখেছে। কদিন পর পর কচি পাতাগুলো ছিঁড়ে-নেওয়ার কারণে উপরের দিকে বাড়তে পারে না। অহরহ ভোগে অস্তিত্বের সংকটে! মূলত পাতাই হলো সব গাছের খাদ্যের প্রধান জোগানদার। পাতা না-থাকলে মূল নিজেও বাঁচে না! ব্যবহৃত চা-গাছ মাটির নিচে চালায় তার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়া। তাই, চা-গাছের মূলের এই জটিলতাও অসুস্থতা এবং বিকৃতির ফসল। যেসব চা-গাছ থেকে পাতা তোলা হয় না তার মূল পরীক্ষা করে দেখুন। আমার কথার অর্থ বুঝতে পারবেন। অব্যবহৃত চা-গাছ লম্বা হয়ে যায়। এর মূল এত কুঁকড়ে যায় না। কারণ সে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে গড়ার সুযোগ পায়। অই যে অনেকগুলো বনসাই দেখলেন এগুলোও শিল্পিত হয়ে উঠেছে অসুস্থতা থেকে। স্বাভাবিকভাবে বৃক্ষের নিয়মে ওদের বাড়তে দেওয়া হয়নি বলে।’  

তাদের আলাপের ফাঁকেই সজল দেখল চা-নাস্তা নিয়ে আসছে আরেক প্রাকৃতিক শিল্পকর্ম। বোরহান সাহেবের মেয়ে হিমি যার নিমন্ত্রণে আজ সে এ-বাড়িতে এসেছে। সে-ও চারুকলার ছাত্রী। সজলের ক্লাসমেট। সজলের খুব ইচ্ছে হয় বোরহান সাহেবকে বলে : এই যে দেখুন, আপনার মেয়েটি! কী অপূর্ব সৃষ্টি বিধাতার! এ কি কোনও অসুস্থতা থেকে তৈরি ? নাকি আছে এর কোনও জটিলতা বা বিকৃতি ? আপনার যুক্তিতে তো সে কোনও শিল্প নয়। কিন্তু এমন কারুকাজ-করা চোখমুখ, সঙ্গীতময় দেহবল্লরীর অধিকারিণীকে আমি তো শিল্প না-বলে পারি না। এসব বলতে না-পারার দুঃখের সঙ্গে চায়ে চুমুক-দিয়ে সজল তার ভাবনাটিকেও গিলে ফেলল!  

হিমিও তার বাবার পাশে বসে যায়। তার কাঁধে হাত-রেখে সে বলতে থাকে : ‘জানো বাবা, সজল খুব ভালো আঁকে। আমার কিছু ছবি এঁকেছে। আমি ভয়ে তোমাকে দেখাইনি। তোমার তো এক গোঁ আছে। মানুষের-আঁকা শিল্পকর্ম মানেই নিম্নমানের। পিকাসো-মাতিস-ভ্যান গগের আঁকা ছবিও তোমার কাছে কিচ্ছু নয়। আমাদের বাঙালি সজল হোসেন তো কোন ছাড়!’  

সজল লজ্জা পায়। এর চেয়েও বেশি পায় ভয়। সজল ¯পষ্ট বুঝতে পারে হিমি তার বাবাকে এসব কথা বলছে একটি উদ্দেশ্য মনে-নিয়ে। আকারে-ইঙ্গিতে হিমি তার বাবাকে বলতে চায়: সজলকে আমি ভালোবাসি। সজলের ধারণা আরও ¯পষ্ট হয় যখন হিমি তার বাবাকে বলে : “আচ্ছা বাবা, আমি লক্ষ করেছি সজল আসার পর থেকে তাকে ‘সজল সাহেব’ ‘সজল সাহেব’ করছ। আমি নিজেই তো ওকে ‘তুমি’ বলি!”

বোরহান সাহেব একটু অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন : চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পাস-করে বেরুচ্ছেন। এখন তো আর বালক নন তিনি, রীতিমতো অ্যাডাল্ট। নামকরা শিল্পীও বটেন! উনাকে ‘তুমি’ বলি কী করে ?

হিমির চপল স্বভাবের কারণে কখনও বোঝা যায় না পরিস্থিতির সঙ্গে তার কোনও মানসিক পরিবর্তন ঘটে কী ঘটে না। অন্তত সজল এখনও ঘটতে দেখেনি। বাবার কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা না-করে সে উচ্চস্বরে হেসে তাঁর গায়ে লুটিয়ে-পড়ে বলল : “সজলকে তুমি আবারও ‘তিনি-উনি’ বলছ বাবা!”

সজল অন্যরকম অর্থ আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে বোরহান সাহেবের আচরণের। হিমির সাথে সজলের স¤পর্ক কী তা বুঝতে বাকি-থাকার কথা নয় তাঁর। হয়তো খেয়ালি মেয়ের পছন্দকে মেনে নিতে পারছেন না বলেই ছেলেরবয়েসী সজলকে ‘আপনি-আপনি’ করছেন। বোরহান সাহেব তাকে হবু-জামাতা ভাবতে পারলে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্নও : বাবা কী করেন, মা আছেন নাকি বেঁচে নাই! ভাইবোন কয়জন ? কে কোথায় আছে, কী করছে ? ঢাকায় নিজেদের বাড়ি আছে নাকি ভাড়াটে বাসা!  সজল ভাবে: এসব জিজ্ঞেস না-করে ভালোই করেছেন তিনি। মা-বাবা-ভাইবোন-বাড়িঘর স¤পর্কে এমন কী বলার আছে তার ? তার তো কেউ নেই, কিছু নেই। এইচএসসি-তে বৃত্তি না-পেলে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি-হওয়াই সম্ভব হতো না!

বিষণ্ন মন-নিয়ে সজল ফিরে এল তার হোস্টেলে। এত আগেই চলে-আসায় তার রুমমেট কামাল জিজ্ঞেস করল : ‘কী সজল ভাই! হিমিদের বাসায় আজ না দাওয়াত ছিল আপনার ? এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে ? ওরা কি বিদেশিদের মতো বেলা-থাকতেই রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে ফেলে নাকি ?’ কামাল সজলের তিন বছরের জুনিয়র। সবে ফার্স্ট ইয়ার শেষ করেছে। তবু মন-খুলে সজল তাকে অনেক কথাই বলে। হিমির সঙ্গে সজলের স¤পর্কের কথাও কামালের অজানা নেই। সজল বলল : ‘ভালো লাগছিল না তাই চলে এলাম।’ সজলের মন ভালো নেই এ-কথা কামালের বুঝতে বাকি নেই। এত ঘটা-করে হিমিদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে এমন চট-করে চলে আসার নিশ্চয়ই কোনও কারণ ঘটেছে। সজল যখন খুব গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়, কামাল লক্ষ করেছে সে ঘন ঘন তার পা-নাড়তে থাকে। আজ এমনভাবে পা নাড়াচ্ছে যেন এটি তার পা নয়, একটা দ্রুত চলমান কারখানার যন্ত্রাংশ। হোস্টেলের চৌকির ওপর শুয়ে-পড়ার পরও একইভাবে তার পা নাড়াচ্ছে। কামাল ভাবে হিমিবিষয়ক কোনও জটিলতা তার ভেতরে কাজ করছে। কামাল বড় ভাইয়ের মতোই ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, সমীহ করে সজলকে। তাকে আর কোনও প্রশ্ন না-করে বাইরে চলে যায়।

সজল ভাবছে। হিমিকে পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে নয়। ফর্মুলা মার্কা বাংলা সিনেমার নায়কের মতো সজল ভাবতে পারত হিমির বাবা বোরহান সাহেবের ঠান্ডা আচরণের কথা। তার বাবাকে খুশি-করে কী করে হিমিকে নিয়ে ঘর বাঁধতে পারে সে-কথা। ভাবতে পারত : তিনি রাজি না-থাকলে হিমি তার বাবাকে ছেড়ে সজলের সঙ্গে পালিয়ে এসে ঘর বাঁধবে কি না  সে-কথা। কিন্তু না, সজল আপাতত এসব ভাবছে না। সজল আমাদের উপহার দিতে যাচ্ছে এমন এক গল্প যেখানে হিমি কোনও বিষয় নয়। পার্শ্বচরিত্র মাত্র! সজলের সমস্ত শিল্পীসত্তা আজ বিপন্ন। শিল্পবিষয়ে তার নতুন এক বোধ জাগ্রত-করে দিয়েছে হিমির বাবা। তর্কের খাতিরে হিমির বাবার সঙ্গে দু-একবার দ্বিমত পোষণ করার চেষ্টা করেছে বটে! আসলে বোরহান সাহেব যা বলেছেন তা তার বোধের গভীরে যতই কাজ করে চলছে, ততই বিপন্ন বোধ করছে নিজেকে। কারণ বোরহান সাহেবের কথাগুলো সম্ভবত অক্ষরে-অক্ষরে সত্য ‘যা কিছু অসুস্থ ও বিকৃত তাই শিল্পিত।’ সজলের চিন্তা এতক্ষণে আরেক দফা এগিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হলো : শিল্প যারা ভালোবাসে তারাও অসুস্থ। সমাজের প্রতিষ্ঠিত কেউকেটারা শিল্প ভালোবাসে না। এরাই সমাজে সুস্থ মানুষ বলে পরিচিত। সম্ভবত এরা সত্যি সত্যি সুস্থ মানুষ। সজলের ভাবনা আরও এগোয়: হিমির বাবার সংগ্রহে যা আছে তা কোনও শিল্পীর সৃষ্টি নয়, প্রকৃতি থেকে আহরণ-করা। কিন্তু এমন শিল্পসংগ্রহ এর আগে দেখেনি সজল। সজলের মনে পড়ল আল মাহমুদের একটি কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি :

মানুষের শিল্প সে তো নির্বোধের নিত্য কারিগরি,

রুমালের আঁকা দাগে রঙিন সুতোয় ফুল তোলা;

সাপের অলীক চিত্রে নির্বিষ সাজানো কালো দড়ি,

কাদার মূর্তিতে কারো সাধ্যমতো আঁটা পরচুলা।

সজল ভাবে : আল মাহমুদ সত্যি কথা লিখেছেন। হিমির বাবা কি আল মাহমুদের এই কবিতা পড়েছেন ? পড়ুক-না-পড়ুক তাঁর বিশ্বাসও তো একই। এই-মুহূর্তে সজলের মনে পড়ল তাঁর এক কবি-বন্ধু আবিদ আনোয়ারের লেখা একটি কবিতার কথাও। কবিতার শিরোনাম ‘এক উলুঝুলু চিত্রকরকে দেখে’। কবিতাটি তাকে নিয়েই লেখা। লম্বা চুলদাড়ি, খদ্দরের পাঞ্জাবি, আর কাঁধে ঝোলা-নিয়ে সজল রাস্তায় বেরোতো। ইয়ার্কি-করে সজলের কবিবন্ধু আবিদ একদিন বলেছিল: এসব ছেড়ে দে দোস্ত! চুলদাড়ি আর খদ্দরের সঙ্গে শিল্পের কোনও স¤পর্ক নাই! এছাড়া, আঁকিয়েরা সবাই শিল্পী নয়! কবিরাই প্রকৃত শিল্পী। সজল শিল্পীদের পক্ষ নিয়ে কবিতা কত নিম্নমানের শিল্প এ-বিষয়ে কথা বলেছিল। শাহবাগের এক আড্ডায় তার সেই কবি-বন্ধুকে আঘাত করেছিল। এই নিয়েই শুরু হয়েছিল তর্ক! পরের সপ্তাহেই একটি নাম-করা কাগজের সাহিত্য পাতায় বেরোল সজলকে উৎসর্গ-করা আবিদের এই কবিতা :

কখনো নিবিষ্টমনে নোনাধরা দেয়ালে তাকালে

অথবা যখন দেখি

শকুনেরা ডানা ঝাড়ে রক্তবর্ণ শিমুলের ডালে

তোমার চিত্রের চেয়ে আরো দামী শিল্প চোখে পড়ে―

ছাঁটো এ রবীন্দ্র-দাড়ি,

অযথা ভড়ং কেন ঝোলা আর মলিন খদ্দরে ?

আসলে তোমার চেয়ে প্রকৃত বাউন্ডুলে এই শরতের মেঘ!

ভেতরে কান্নায় ভেজা, চেপে-রেখে তবু তার সমূহ আবেগ

বাউল-স্বভাবে ঘোরে―এবং এই ঔদাসীন্য তাকে শোভা পায়:

নীলের ক্যানভাসে দেখি নিজেই চিত্রিত-হয়ে

কী সহজে শিল্প হয়ে যায়!

তোমার ইজেলে কত রং ধরে জানি সে-ও হাঁড়ির খবর!

প্রকৃত জলের ছবি জলরঙে এঁকেছে কি কোনো চিত্রকর ?

দেখেছি রোদের দিনে মাঝেমাঝে গূঢ় কার তুলি

অনায়াসে এঁকে ফেলে অস্তরাগে বেজে-ওঠা রঙিন গোধূলি।

সোহেলীর ঠোঁট দেখে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও হারাবেন দিশা,

হাসির বিশুদ্ধ কলা শিখে নেয় ওকে দেখে ব্যর্থ মোনালিসা!

খুঁটিতে ছাগল বেঁধে এইসব আঁকিবুকি ছাড়ো!

সাগ্রহে জীবন প’ড়ে আমি আঁকি শব্দচিত্র, তুমি কি তা পারো ?

এ-কবিতায় প্রকাশিত বক্তব্যকে সজল গুরুত্ব দেয়নি তখন। বন্ধুর প্রতি বন্ধুর মস্করা মনে-করে উড়িয়ে দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে এর চেয়ে সত্য আর কোনও কিছুই নয়। প্রকৃতিতে, আমাদের চারপাশে সর্বত্র তৈরি হয়ে আছে সব ধরনের শিল্পই। যারা প্রকৃত শিল্পভোক্তা তারা তা ভোগ করতে পারে। ভেবে সজলের হাসি পাচ্ছে : হাজার হাজার টাকা খরচ করে কত লোক ফ্রেম-করা রং-মাখানো এক টুকরো কাগজ কিনে ঘরে নিয়ে যায়! হিমিদের বাসায় গেলে ওরা এসব ছুড়ে-ফেলে-দিয়ে বোরহান সাহেবের পথ ধরবে।

২.

আজকাল কিছু আঁকতে গেলেই ইজেলে তুলি-রেখে স্থির হয়ে থাকে সজলের হাত। কী আঁকবে তা আগেভাগে ভেবে রাখলেও কী করে আঁকবে তা সে বুঝতে পারে না। ঘরের চেয়ে বাইরে গিয়ে খোলা-আকাশের নিচে-বসে আঁকাবুঁকি করতেই ভালোবাসে সজল। অন্য অনেক শিল্পীর মতো কোনও ব্যক্তি বা প্রাকৃতিক মডেল সামনে-নিয়ে বসে না। অবশ্য অনেক দিন এমন হয়েছে : সামনের ল্যান্ডস্কেপ বা বৃক্ষপুঞ্জ মডেলের মতো কাজ করেছে তার কাজে। কেবল হিমির কিছু স্কেচ ও ছবি আঁকার জন্য তাকে সামনে বসিয়েছে। হিমির মতো চঞ্চল মেয়েও শান্তশিষ্ট বালিকার মতো সজলের নির্দেশিত ভঙ্গিমায় বসে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হিমিকে সে বহুদিন বলেছে : তুমি এক জীবন্ত শিল্প! কোনও শিল্পীর সাধ্য নাই তোমাকে তোমার মতো করে আঁকে! শিল্পীর সীমাবদ্ধতার কথা তার জানা থাকলেও আজ এ-মুহূর্তে কথাটা মনে পড়তেই অন্যরকম গুরুত্ব পায়। আবারও মনে পড়ে আল মাহমুদের কবিতার পঙ্ক্তি: মানুষের শিল্প সে তো নির্বোধের নিত্য কারিগরি! মনে পড়ে তার কবি-বন্ধু আবিদ আনোয়ারের পঙ্ক্তি : প্রকৃত জলের ছবি জলরঙে এঁকেছে কি কোনও চিত্রকর ? 

৩.

রমনা পার্কের নিরিবিলি এক জায়গায় সামনে ক্যানভাস-নিয়ে ইজেলে তুলি-ডুবিয়ে বসে আছে সজল। হাত কিছু আঁকতে সায় দিচ্ছে না। যেন সে নিজেই এক স্থির চিত্র, স্টিল লাইফ! ঈশান কোণের একটুকরো কালো মেঘ হঠাৎ গর্জে উঠল। ফুলে-ফেঁপে দিগন্ত ছেয়ে ফেলেছে কয়েক মুহূর্তে। বৈশাখের এমন হঠাৎ ক্ষেপে-ওঠা খামখেয়ালি রূপ বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও আছে কি না সজলের জানা নাই। মুহূর্তে কালো হয়ে-যাওয়া আকাশটাকে সজলের কাছে স্বপ্ন বলে মনে হলো। এমন পরিষ্কার আকাশ হঠাৎ-করে কীভাবে এমন রুদ্র রূপ ধারণ করতে পারে সজল তা বুঝতে পারেনি। বিদ্যুতের চমকের সঙ্গে একটা কান-ফাটানো প্রচণ্ড শব্দ কেবল এক-মুহূর্তের জন্য শুনতে পেয়েছিল সজল। তারপর আর কিছু মনে নেই তার। হিমির ডাকে চোখ-খুলে সজল দেখতে পায় কোনও এক হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সে। ডিডিটি-ডেটলের গন্ধ আর ডাক্তার-নার্সদের উপস্থিতিও টের পায়। যেন খুব দীর্ঘ এক ঘুমের পর জেগে উঠেছে! কতদিন-ধরে এই হাসপাতালে আছে তা-ও জানা নেই তার। এই সময় সম্পর্কে শুধু একটা ধারণা তৈরি হয় কারও একজনের কথায় : ‘মা হিমি! সজলের তো জ্ঞান ফিরেছে। আজ তুই একটু বিশ্রামে যা। তার বন্ধু-বান্ধব আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে। প্রায় এক মাস হয়ে গেল তুই নিজেও যেন সজলের সঙ্গে হাসপাতালের রোগী-হয়ে আছিস! আজ বিশ্রামে চল।’ সজল বুঝতে পারে এটি হিমির বাবা বোরহান সাহেবের কণ্ঠস্বর।

কোমায় থাকা অচেতন সজলের শয্যার পাশে তার মেয়ের এই প্রায় মাসব্যাপী বিরতিহীন অবস্থানকে হিমির বাবা সহজভাবে মেনে নিয়েছেন। কারণ ডাক্তারদের কাছে শুনেছেন, এমন একটা বজ্রপাতে আহত মানুষের বাঁচার কোনও আশাই নেই। ডাক্তার হিসেবে ওরা দায়িত্ব পালন করছে মাত্র। দীর্ঘ কোমার পর আজ সজলের জ্ঞান ফিরলেও মৃত্যুই তার একমাত্র পরিণাম। বোরহান সাহেব ধৈর্যশীল, ঠান্ডা মাথার লোক। তার মেয়ে হিমি সজলকে ভালোবাসে। তার এই পাগলামোকে মানতে পারেননি। কিন্তু মেয়েকে বাধা-দিয়ে এই পাগলামোকে আরও উসকে দিতে চাননি তিনি। শৈশবে মা-হারা হিমিকে তিনি একাই বাবা ও মায়ের আদরে মানুষ করেছেন। মেয়েকে ভালো-করেই চিনেন তিনি। সজলের মৃত্যুর পর মেয়েটা অনেক কষ্ট পাবে এ-কথা সত্য! কিন্তু সময়ে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে এ-কথাও বিশ্বাস করেন। অতএব, এখন যতদিন পারে থাক-না হাসপাতালে! দুয়েকটা ছোট গ্যাপ-দিয়ে বলতে গেলে সে-ও এই হাসপাতালেই প্রায় এক মাস কাটিয়ে দিয়েছে। সজলকে সেবা করেছে। ডাক্তার যখন যা বলেছে তা-ই করেছে। ওষুধ কিনেছে, সে-ও নিজের টাকায়। সজল তো কোমায় অচেতন। ওর টাকা-পয়সা আছে কী নাই, থাকলেও কোথায় আছে হিমি কী করে জানবে। অতএব, তার চিকিৎসা-ব্যয় হিমিই বহন করছে। তার তো টাকার অভাব নাই। দাদা ছিলেন জমিদার। বাবা এক অদ্ভুতগোছের শিল্পপাগল লোক। নিজের কোনও ইনকাম নাই। তাঁর জমিদার বাবার রেখে-যাওয়া ধন-সম্পদ খরচ-করে সারা জীবনেও শেষ করতে পারবেন না। হিমি তার বাবার একমাত্র সন্তান। সজলের তো কয়েকজন বন্ধু ছাড়া বাড়ি থেকে কেউ আসার মতোই নাই। অতএব, সে-ই একমাত্র ভরসা, এ-কথা বুঝে নিয়েছে হিমি। 

হাসপাতাল থেকে বিশ্রামে যাবার জন্য বাবার-দেওয়া প্রস্তাবে অনেকটা ফুঁসে উঠল হিমি : ‘এমন কথা তুমি বলতে পারলে বাবা! যার একটি কথা শোনার জন্য এই এক মাস-ধরে অপেক্ষায় আছি আজ তার জ্ঞান ফিরেছে। তাকে এখানে একা-রেখে বাড়ি-গিয়ে ঘুমাব ?’

৪.

দুই মাস হাসপাতালে থাকার পর সজল একদিন টের পায় তার ডান হাত বামটির চেয়ে সরু দেখাচ্ছে। কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত অংশ বাঁকা হয়ে আছে। নিজের চেহারা-দেখার খুব ইচ্ছে হলো তার। কথাটা জানালে হিমি তাকে একটা আয়না এনে দেয়। সে দেখতে পায় তার কপালের বামপাশে এক প্রকাণ্ড টিউমার। কিছুটা-সচল ডানহাতে সেখানে ¯পর্শ-করে বুঝতে পারে সেটি খুব শক্ত-হয়ে আছে। কোনও ব্যথা-বেদনাও নাই। হঠাৎ মনে পড়ল কদিন আগে ঘোরের মধ্যে থেকেও এক বিদেশি ডাক্তারের কথা শুনেছিল সে। মনে হচ্ছিল কথাটা খুব দূর থেকে আসছে। এই হাসপাতালেরই কোনও ডাক্তারের উদ্দেশে কথা বলছিলেন সেই বিদেশি ডাক্তার। ইংরেজি উচ্চারণ শুনেই সজল বুঝতে পেরেছিল তিনি একজন বিদেশি। বলছিলেন : ‘ইয়েস, ইভেন ইফ হি সারভাইবস, পার্মানেন্ট ডিফরমিটি অ্যান্ড এবনর্মাল গ্রউথ ইন এনি পার্ট অফ দ্য বডি আর নট আনলাইকলি ইন দিস কেইস’ অর্থাৎ বেঁচে-থাকলেও যে কোনও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থায়ী বিকৃতি এবং অস্বাভাবিকতা এর দেখা দিতে পারে…! 

সজলের বুঝতে বাকি নেই তাকে পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। কতদিন, কত বছর, কত যুগ কে জানে! কে বইবে তার এই দুঃসহ পঙ্গু জীবনের ভার ? মা-বাবা-ভাইবোন বলতে কেউ নেই তার। সজল জানে হিমি সব জেনেশুনেই তাকে ভালোবাসে। এই কদিনেই টের পেয়েছে হিমির সাথে তার বাবা প্রকাশ্যে কিছু না-বললেও মেয়ের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে আছেন তিনি। হিমির ধৈর্যও আর কতদিন! ভাবতে-ভাবতে সজল দেখতে পায় হিমির বাবা বোরহান সাহেব আসছেন। হয়তো অন্যদিনের মতো আজও মেয়েকে বলবেন নিজের শরীরের দিকে একটু নজর দিতে। তিনি আসলে হাসপাতালে আসেন কেবল তার মেয়েকে দেখতেই। সজল অনেক কষ্টে উঠে বসল তার বিছানায়। বোরহান সাহেব তার খুব কাছে-বসে জিজ্ঞেস করলেন : ‘আজ কেমন আছেন, সজল সাহেব ?’

সজলের ভেতরটা হঠাৎ মোচড়-দিয়ে ওঠে। হিমিকে অবাক-করে দিয়ে এই প্রথমবারের মতো বোরহান সাহেবের নাম-ধরে বলে ওঠে : ‘খুব ভালো আছি বোরহান সাহেব! ধীরে ধীরে খুব দামী হয়ে উঠছি তো! আমি আর হতদরিদ্র শিল্পী সজল হোসেন নই! এই যে দেখুন না, নিজেই কেমন মহামূল্যবান শিল্প হয়ে উঠছি!’ অনেক কষ্টে চাদরের ভেতর থেকে সজল তার বেঁকে-যাওয়া বাম হাত বের-করে সামনে মেলে-ধরে এবং কিছুটা সচল ডান হাতে কপালের টিউমার দেখিয়ে বলতে থাকে: এই যে দেখুন না বোরহান সাহেব! এখন আর অন্য কোনও সম্পর্কের কারণে নয়, আমাকে আপনার বাড়িতে নিয়ে যান আপনার পছন্দের এক প্রাকৃতিক শিল্পের নিদর্শন হিসেবে! অসুস্থতা আর বিকৃতিই আপনার কাছে শিল্পের মূল উপাদান! তাই, আমিও আপনার শিল্পশালার সংগ্রহে যাবার মতো যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছি! হা… হা… হা… হো… হো…, হো… হি…হি… হি…! যতদিন বেঁচে থাকি আমাকে দেখবেন স্বয়ং ঈশ্বরের-গড়া জীবন্ত এক শিল্প হিসেবে; পাশে থাকবে আপনার অনিন্দ্য সুন্দর মেয়ে হিমি! কী এক বিপ্রতীপ চিত্র! শিল্প তার সমগ্রতা-নিয়ে, চূড়ান্ত রূপ-নিয়ে আপনার চোখের সামনে মেলে ধরবে তার অপার সৌন্দর্যের ডালপালা! যখন মরে যাব ফরমালডিহাইডে চুবিয়ে-নিয়ে, কিছু প্রিজারভেটিভ মেখে মমির মতো করে নেবেন… বলেই বিকট এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সজল : হা… হা… হা… হো… হো…, হো… হি… হি… হি…! 

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button