
আবার পড়ি : তাঁর গল্প
বুকের কাছে দলামোচা কাপড়। এর ভিতর থেকে প্রায় ম্যাজিসিয়ানের মতো দুই কী দেড়-মাসের এক মানবশিশুকে বের করে আনল সাবানী। দুই হাতে যতটা সম্ভব তার গর্বের বস্তুটিকে উঁচিয়ে-ধরে বাজখাঁই গলায় বলল : ‘অই শুক্কুইরা, চায়া দ্যাখ রে, সাবানী বাচ্চা বিয়াইতে জানে!’ শুক্কুর আলী তখন অন্যান্যের সঙ্গে রোস্তম বেপারীর ক্ষেতে ধানের চারা-রোয়ার কাজ করছিল।
সাবানীর হাতে উঁচিয়ে-ধরা বস্তুটি ‘ওঁয়াও’ করে কেঁদে উঠলে শুক্কুরালি ও অন্য কামলাদের আর সন্দেহ থাকে না ওটা মানুষের বাচ্চাই বটে! তবে, শুক্কুরালির ঘর-ছাড়ার পর সাবানীর আবার কোথায় কবে কার সাথে বিয়ে হয়েছে সে-কথা এদের কারও জানা নাই। সাবানীর কথা শুনে হাসতে-হাসতে অনেকের হাত থেকে ধানের চারার গুছি পড়ে যাচ্ছিল! হাসির হররা কিছুটা থেমে গেলে শুক্কুরালির এককালের ইয়ার মবারক বলল : ‘ও সাবানী ভাবি! তুমি অত তাড়াতাড়ি বাচ্চা পাইলা কই ? কিন্যা আনছো নাকি কুড়া’য়া পাইছো ?’
আগের চেয়েও গলা-চড়িয়ে সাবানী বলল : ‘আর ভাবি মারাইছ না হারামজাদা! ইয়ার্কি মারোছ ক্যান রে মবারক-না-মরাবক! হুইত্যা জন্ম দিছি, হুইত্যা!’ গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ নিতে-গিয়ে মবারক নাম-সই করতে র-এর ফোঁটা ব-এর নিচে মেরে দিয়েছিলো। অন্য অনেকের সামনে এই নিয়ে ঋণদাতা লোকজন হাসাহাসি করেছিল। সেই থেকে তাকে অনেকেই ‘মরাবক’ বলেও ডাকত।
মবারক সাবানীর কথায় এক ধরনের পুলক অনুভব করছিল। মবারক ভাবল: সাবানী যদি মেয়েমানুষ হয়ে এমন ভাষায় কথা বলতে পারে, তবে পুরুষ হয়ে সে পারবে না কেন ? মবারক রসিয়ে-রসিয়ে বলল : ‘বাচ্চা তো মেয়া-মাইনষে হুইত্যাই জন্ম দেয়, গাইয়ের মতো দাঁড়া’য়া-দাঁড়া’য়া বিয়াইতে তো হুনি নাই! হুনতে চাই অত তাড়াতাড়ি অইলো ক্যামতে!’
সাবানী এবার আরও জোরগলায় চেঁচিয়ে বলল : ‘বাচ্চা ক্যামতে অয় জানোছ না ? আমার কি পেট নাই ?’
মবারক বলল : ‘হুদা পেট থাকলেই অয় না, আরও একটা জিনিস লাগে! অত তাড়াতাড়ি হেই জিনিসটা পাইলা কই ?’
সবাই যখন সাবানী আর মবারকের কথা শুনে হাসাহাসি করছিল, তখন শুক্কুরালি আপন মনে, কোনও এক যন্ত্র যেন, ধানের চারা-রোয়ার কাজটি আরও মনোযোগের সঙ্গে করে যাচ্ছিল। কোলের বাচ্চা-দেখিয়ে সাবানীর প্রথম কথাটি উচ্চারিত হয়েছিল শুক্কুরালির উদ্দেশে। তাই, সে সাবানী ও তার হাতে উঁচিয়ে-ধরা বস্তুটিকে এক-পলক চেয়ে দেখেছিল মাত্র। অন্যদের হাসি-মস্করায় যোগ দিতে পারে নাই। ধানের গুছি গুঁজে-দেওয়ার ছল-করে কাদার ভিতর থেকে সে যেন অতীতের শরীর-হাতড়ে একটার পর একটা তুলে আনছে স্মৃতির টুকরো। তুলে আনছে সাবানীর সঙ্গে কাটানো তার বহুদিনের আনন্দঘন মুহূর্তের ছবিগুলো! একটা মানুষের বাচ্চা-দেখিয়ে শুক্কুরালির উদ্দেশে সাবানী এই যে খিস্তি আওড়াল, তাতেই শুক্কুরালির মনে হলো সাবানী এখনও তার কথা ভুলতে পারে নাই! তার সংসার ছেড়ে সে যেতে চায় নাই! গিয়েও হয়তো কষ্টে আছে! মনের টান না-থাকলে জমির আলপথে তার এত কাছে এসে এখনও ঝাল দেখাবে কেন ?
‘…হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়, ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না…’
২.
সাবানীর মুখ খারাপ হলেও রূপ খারাপ নয়। কবি কালিদাস তাকে দেখলে হয়তো বলতেন : সুপুষ্ট শ্যামাঙ্গী চাঁদ, কলঙ্কবিহীনা/ক্ষীণ কটি অনুযায়ী গুরু নিতম্বিনী, সুডৌল কপোল, শিরে বঙ্কিম কুন্তলা… ইত্যাদি, ইত্যদি কিংবা শুক্কুরালির তোতলা মুখের ভাষায় : ‘ও-ও সা সাবানী, তর নাম কেডায় রা রাখছিলো রে, এক্কেরে সা সাবানের মত পিছলা তর চামড়া…’। কিশোরী বয়সে এক শুভ মুহূর্তে, কোনও এক বৃষ্টির দিনে একলা-ঘরে পেয়ে, সাহস-করে এই সব কথা-শুনিয়েই সাবানীকে পটিয়েছিল শুক্কুরালির মতো তোতলা দিনমজুর।
এই ‘সুপুষ্ট শ্যামাঙ্গী চাঁদ’কে পাওয়ার জন্য পাগল ছিল পাড়ার উঠতি-যুবক থেকে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পক্ষসন্ধানী মোড়লশ্রেণির কিছু লোকও। কিন্তু কেবল দূর থেকে এই শ্যামাঙ্গী চাঁদের জোছনা দেখার চেয়ে তেমন বেশি কিছু তারা পায়নি, সাবানীর এই লাগামহীন মুখের কারণেই। সবাই ভয়ে তটস্থ ছিল―কাকে কখন কী বলে দেয় কিংবা চিল্লাপাল্লা-করে মানুষ জড়ো-করে! মেয়েলি লজ্জা জিনিসটা যেসব মেয়ের মধ্যে আছে তারা যদি জানত সাবানীর মতো মুখ-চটা হলে অনেক বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়, তবে তারাও সাবানীর মতো মুখ-চটা হতো। গরিবের ঘরের মেয়েদের মধ্যে অনেকেরই এই অস্ত্রটা থাকে। যাদের থাকে না, তারা লজ্জা নামের দুর্বলতার কারণে খুইয়ে বসে অনেক কিছুই।
শৈশব থেকেই সাবানীর নিজের তিন-কুলে কেউ নাই। কলেরা মহামারিতে দুই দিনেই গোষ্ঠী সাফ! বাড়ি ছিল শুক্কুরের বাড়ি থেকে তিন-গাঁও দূরে নেকাব্বর মোল্লার বাড়ির কাছে। কিন্তু ভাগ্যচক্রে শুক্কুরালির চাচি মরিয়ম বেওয়ার আশ্রয়ে চলে আসে সাবানী ১৩ বছর বয়সে। তিন বছরের মাথায় শুক্কুরালির সাথে তার বিয়ে দিয়ে মরিয়ম বেওয়া চোখ বোঁজে।
সাবানীকে শুক্কুরালি ঘর ছাড়তে বলে নাই। শুক্কুরালি যে-কাজটি করেছিল তাতেই সে তার সংসার ছেড়ে চলে যাবে তা-ও ভাবতে পারে নাই। কারণ সাবানী তাতে সায় দিয়েছিল এমনটি ভেবে নিয়েছিল সে। কিন্তু সেটা যে তার মনের কথা ছিল না তা শুক্কুরালি বুঝতে পারে নাই। মেয়েমানুষের হ্যাঁ-নার অর্থ বোঝার ক্ষমতা শুধু শুক্কুরের কেন, অন্য কোন পুরুষ মানুষটারই আছে ?
এই তো তিন-চার মাস আগের কথা। মরুঝড়-কবলিত উটপাখির মতো সাবানীর বুকে মুখ-গুঁজে পড়ে ছিল শুক্কুরালি। কেউ কারও চোখের দিকে তাকায় নাই কিন্তু নিম্নরূপ কথাবার্তা হয়েছিল তাদের মধ্যে:
কয়দিন থা… থাই্ক্কা মায় একটা ক কতা কইতাছে, সাবানী।
কী কইতাছে ? ক’য়া ফালাও।
সংসারে বা বাচ্চাকাচ্চা না-থাকলে খা খালি-খালি লাগে।
সংসার ভইরা ফালাও ?
ভ… ভরি ক্যামতে ? তর তো কিছু অ-অইতাছে না! মায় কয় পে পেট ভালা না!
যার পেট ভালা এমন কাউরে ল’য়া আহো। অইতে কয়দিন ?
হাঁ… হাঁছা কইতাছোস ? হে হেষে আমারে ছাইড়া যাবি না তো ?
ছ্ইাড়া যামু কই ? দুনিয়াতে গরিবের কি জা’গা আছে ? তোমার নতুন বউয়ের ঠ্যাং টিইপ্পা দিমু নে তোমার মা’রে, তোমারে যেমুন দিই! বাচ্চা অইলে নিজের দুধ না-খাওয়াইতে পারি আদর-যত্ন তো করতে পারুম!
সাবানী ভালো-করেই জানে বিয়ের পর চার বছরেও কোনও ঘরের বউ বাচ্চা দিতে না-পারলে জোয়ানমর্দ ছেলের মায়েরা আবার বিয়ে-করার জন্য ছেলেকে তো বলতেই পারে! নাতি-নাতকরের মুখ না-দেখে কোনও বুড়ি কি সহজে মরতে চায় ? সাবানী এ-ও জানে সে বেঁচে-থাকতে তাকে ছেড়ে শুক্কুরালি অন্য কাউকে ঘরে তুলবে না, তার মা যতই পীড়াপীড়ি করুক না কেন! তাই, এমন সম্মতিসূচক কথাবার্তা বলে শুক্করালিকে পরখ করছিল সাবানী।
সাবানী লোকমুখে আগেই কিছুটা শুনেছিল দুদু করাতির যুবতী বিধবা মেয়ে সালমার সঙ্গে শুক্কুরালির বিয়ের কথাবার্তা চলছে। সালমা মেয়েটার পেট ভালো, একেবারে পরীক্ষিত। আগের স্বামীর ঘরে দুইবছরে দুইটা বাচ্চা দিয়েছে, কিন্তু কপাল মন্দ! একটা মরেছে নিউমোনিয়ায়, আরেকটা ডায়রিয়ায়। স্বামী ছিল দুদু করাতির অ্যাসিস্ট্যান্ট। গাছ-ফাড়ার চাঙের নিচে দাঁড়িয়ে করাতের বাঁট টানত। শ্বশুর দুদু করাতি টানত উপর থেকে। আচমকা একদিন চাঙ থেকে বিশালকায় এক গাছ-পড়ে সালমার স্বামী মারা গেছে এক বছর হয়-হয়। দুদু করাতির মাথায় হাত। পাড়ায়-পাড়ায় রটে গেল : ‘এই বাচ্চা আর ভাতার-খাকিরে আর বিয়া করব কেডা!’ শুক্কুরালির মার প্রস্তাবে তাই সহজেই রাজি হয়ে গেল দুদু করাতি। মেয়েকে ডেকে বলল, ‘হুন কী কইতাছি, শুক্কুরালি ভালা মানুষ, একটু-একটু তোতলায়, খুব একটা বেশি না। তোতলা মানুষ ভালা অয়। শুক্কুরের মায় কইলো সাবানীও তরে বইনের মত দেখব। বাচ্চা অয় না তয় করবোডা কী ? হে নিজেই নাহি কইছে তরে বিয়া করতে। তোর বাচ্চা অইলে সাবানীও নিজের বাচ্চার মত দেখশুন করব।’ সালমার বলার মতো কিছু থাকলে তো বলবে! বাপের কথা শুনে শুধু নীরবে তৈরি হয়ে বসেছিল শুক্কুরালির ঘরে আসার। একলা তো আর মেয়েমানুষের জীবন চলে না। কিন্তু বিয়ের পর শুক্কুরের সাথে তার বাড়িতে গিয়েই সাবানীর যে তেজ দেখল তাতেই বুঝে নিল তার কপালে দুঃখ আছে!
৩.
শুক্কুরালি তার নতুন বউ নিয়ে বাড়ির উঠানে এসেই সাবানীকে ডাক দিল, তোতলামির মাত্রা আজ বেশ বেড়ে গেছে মনে হলো : ‘ও সা সা সাবানী, দে দেইখ্যা যা, তর লাগি একটা স সই আনছি।’
উঠানের এক কোণে মাটির চুলায় রান্নার আয়োজন করছিল সাবানী। শুক্কুরালির ডাকে এক-পলক তাকিয়েই লাল শাড়ি-পরা সালমাকে দেখে তার জন্য ‘সই আনা’র অর্থ বুঝে ফেলল সে। গোখরোর ফণার মতো ফোঁস-করে দাঁড়িয়েই বলে উঠল: ‘আমার সোহাগের সইরে ল’য়া তুই থাক, হারামজাদা তোতলার ঘরের তোতলা!’…ব’লেই এক-কাপড়ে সেই যে শুক্কুরালির বাড়ি ছাড়ল সাবানী, তার পর থেকে তার আর দেখা নাই। আজ প্রায় এক বছর পর একটা বাচ্চা কোলে-নিয়ে শুক্কুরালিদের গাঁয়ে এসে অনেক ঘুরেফিরে স্বয়ং শুক্কুরালিকে খুঁজে বের করল সাবানী। শুনেছে রোস্তম বেপারীর তালতলার জমিনে ধান-রোয়ার কাজ করছে শুক্কুরালি। আর এই এখানে এসেই তার উদ্দেশে ছুড়ে দিল এই সুতীক্ষè বাক্যবাণ : ‘অই শুক্কুইরা, চায়া দ্যাখ রে, সাবানী বাচ্চা বিয়াইতে জানে!’
কোনও একটা সংলাপ ভালোমত থ্রো করার জন্য নাটক-সিনেমার লোকেরা যেমন সশব্দ রিহার্সাল দেয় কিংবা মনে-মনে বহুবার আউড়িয়ে নেয়, শুক্কুরালির উদ্দেশে ছুঁড়ে-দেওয়া এই কথাটাও সাবানী কয়েক দিন মনে-মনে আউড়িয়েছে। শুক্কুরালির সঙ্গে তার মাকেও শোনানোর জন্য এই সংলাপটি সে তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু বহুদিন পর আজ এই গাঁয়ে এসে শুনল বুড়ি কিছুদিন আগে লিভারের দোষে মারা গেছে।
৪.
শুক্কুরালির ঘর ছাড়ার পর ঘর খুঁজে পেতে সাবানীর সময় লাগেনি। সাবানীর মতো মেয়ের ঘর পেতে সময় লাগার কথা নয়। শুক্কুরালি’র বাড়ি থেকে তিন-গাঁও দূরে নেকাব্বর মোল্লার বাড়ি। একসময় সাবানীদেরও বাড়ি ছিল এর খুব কাছেই। নেকাব্বরের তিন বউ। সবারই পেট ভালো। সংসারভর্তি ছেলেমেয়ে। শুক্কুরের সাথে বিয়ের আগে সাবানী বহুদিন ঝিয়ের কাজ করেছে নেকাব্বর মোল্লার বাড়িতে। সাবানীর খুব অল্পবয়সেই তাকে চার নম্বর বউ করার চেষ্টায় মোল্লা সাহেব অনেক লোভ দেখিয়েছেন। দক্ষিণপাড়ায় আলগা জায়গায় বাড়ি বানিয়ে দিবেন, তার পছন্দমতো জমিজমা তার নামে লিখে দিবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সাবানীর মন গলাতে পারেন নাই। সাবানী বেছে নিয়েছিল অবিবাহিত নবীন যুবা তোতলা দিনমজুর শুক্কুরালিকেই।
শুক্কুরালি’র নতুন বউকে দেখে সাবানী ঘর ছেড়েছিল এক-কাপড়ে। একটুও দেরি করে নাই। তখন কোথায় যাবে ভেবে উঠতে পারে নাই। হনহনিয়ে উদ্দেশ্যহীন শুধু হেঁটেইছিল দেড়-দুই ঘণ্টা। কখনও এদিক, কখনও ওদিক। হঠাৎ দেখল সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এবং যেখানে বাঘের ভয় সন্ধ্যাটা সেখানেই হয়েছে। নেকাব্বরের বাড়ির লোকজন সবাই তাকে চেনে। সে-ও এ-বাড়ির সবাইকে হাড্ডিসুদ্ধ চিনে। অজানা-অচেনা জায়গায় গিয়ে লাভ তো নাই, ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। এ-বাড়িতে কাজ করার সময় নেকাব্বর মোল্লা তাকে বিয়ে করতে চাইলেও ফ্যালফ্যাল চোখে কেবল তাকিয়েই থাকতেন তার দিকে। কিন্তু খারাপ কিছু করেন নাই।
মোল্লা সাহেব সাবানীকে দেখে আগের মতোই লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। কাছে এসে বললেন, ‘আরে, এদ্দিন পরে আবার দেহি চান উঠছে আমার বাড়িতে! কী মনে-কইরা আইলি ?’ সাবানী সরাসরি বলল : ‘ভাই, আমি আপনের বাড়িতে আবার কাজ করুম যদি জা’গা দেন। শুক্কুইরারে ছাইড়া আইছি। আমার বাচ্চা অয় না দেইখ্যা বিয়া করছে আরেকটা। কী-কইরা অরে তালাক দিতে অইব তার ব্যবস্থা করেন!’
নেকাব্বর মোল্লা কিছুক্ষণ কী-একটা ভেবে নিয়ে বললেন : ‘তালাক আবার কীসের ? তরে কি কাবিন-কইরা বিয়া করছিল যে তালাক দিতে অইব ? আমার মনে আছে বিয়া পড়াইছিল এক ছেঁড়া-বয়সের মৌলভি। আমাগো পাশের বাড়িতে জায়গির থাকত। হে চইলা গেছে। তুই ঘর ছাইড়া চইলা আইছোস, এইতেই তালাক অইয়া গেছে। কাবিন নাই, তো তালাকেরও দরকার নাই। অহন তুই যারে ইচ্ছা তারে বিয়া করতে পারোস। ফিকাহ-হাদিস সব আমার মুখস্থ। আমি যে মোল্লা মানুষ এই কথাডা ভুইল্লা গেছোস ? আরও একটা কথা হুন। তালাকের পর নব্বই দিন অপেক্ষা করুন লাগে পেটে বাচ্চা আছে কি না হেইডা দেখার লাগি। পেডে বাচ্চা থাকলে ঝামেলা আছে। তর লাইগা তো নব্বই দিনের ব্যাপার-স্যাপারও নাই। পেট এক্কেরে খালি! এইবার বিয়া করলে এমন কাউরে করবি যে বাচ্চা না-অইলেও ঘ্যাঁচড়-ম্যাচড় করব না।’ ছোট্ট একটা কাশি-দিয়ে নেকাব্বর মোল্লা বলে চললেন : ‘তয় অল্প-বয়স্যা পোলাপাইনের কাছে বিয়া-বইলে বাচ্চা চাইতেও পারে…আবার শুক্কুরালি’র মতো অন্য কারও পাল্লøায় পড়িস না! বুইঝ্যা-শুইন্ন্যা কাজ করবি…একলা তো আর জীবন যাইব না…।’
সাবানীর ভবিষ্যতের যোগ্যতম বর হিসেবে নেকাব্বর মোল্লা যে নিজেকেই বুঝাতে চাইছেন সে-কথা বুঝতে সাবানীর একটুও কষ্ট হয় নাই। বউ তার তিনটা, ঘরভর্তি পোলা-মাইয়া। চার- নম্বরের ঘরে বাচ্চা না-হলে অসুবিধা কী! নেকাব্বরের বউ-পোলাপানের সাধ্যি নাই তার সিদ্ধান্তের ওপর কোনও কথা বলে! সাবানীকে দূরের কথা, আরও দশটা বিয়ে-করলেও বাড়ির লোকজন, পাড়া-পড়শি কেউ কিছু বলার সাহস পাবে না। এতই তার দাপট। শরীয়তমতো চারজন বউ রাখার ধন-দৌলত আর তাকতও আছে তার!
নেকাব্বর মোল্লা দেখলেন সাবানী আগে তার সাথে যেমন জড়তা নিয়ে কথা বলত, এখন আর তা করছে না। সুযোগটা খুব তাড়াতাড়ি কাজে লাগানো দরকার। তিনি তার তিন বউকেই ডেকে আনলেন; বললেন : ‘এই যে কামালের মা, জামালের মা, নূরের মা, হুইন্যা রাহো! এই যে দেখো সাবানী আইছে! আবার আমাগো বাড়িতে কাজ করব! এই বাড়িতেই থাকব! অরে কাজে লাগাও! ঘর-ভাইঙা চইলা আইছে। চাইর-বছরেই বিয়ার শখ মিইট্টা গেছে। এমন একটা মেয়ের কপালে এই আছিল!’
সাবানীর কপাল শুধরাতে নেকাব্বর মোল্লা বেশিদিন সময় নেন নাই। তার দক্ষিণপাড়ার জমির কাছেই খালি একটা ভিটাবাড়িও ছিল। রাতারাতি সেখানে পায়খানা-গোসলখানাসহ ছোট্ট একটা ঘর-বানানোর কাজ শেষ করেই একদিন সাবানীকে নিয়ে গিয়ে সরাসরি বললেন : ‘এইডা একলা তোর বাড়ি, পুরান বাড়ির গেঞ্জামের মধ্যে তরে আমি রাহুম না। ছৈরতের মা তর সবকিছু কইরা দিব। তুই ঠ্যাঙের উপরে ঠ্যাঙ তুইল্লা সারা জীবন কাটায়া দিবি। আমার কামলারা আছে পাহারাদার। তর কুনু ভয় নাই।’ ছৈরতের মার উদ্দেশে বললেন : ‘এই যে ছৈরতের মা, সাবানী অহন আর কামের লোক না, আইজ রাইতেই অরে আমি বিয়া করুম। বিয়া এইখানেই হইব। আমি বাজার-কইরা একটা মৌলভি নিয়া আইতাছি, খাওন-দাওন আহুঞ্জির হোটেল থাইক্কা প্যাকেটে কইরা আনতাছি। বাড়ির লোকজনরে খবর দ্যাও! আইলে আইব না-আইলে নাই। এইখানে আমার লোকজন কম নাই। অরা থাকলেই চলব। বিবিসাবদের কইয়া দিও আমি অহন কয়েক রাইতে শুধু সাবানীর লগেই থাকব।’
নেকাব্বর মোল্লার এসব কথা শুনে সাবানী অবাক হয়! মোল্লা সাহেব একবার তাকে জিজ্ঞেসও করেন নাই এই বিয়েতে সাবানী রাজি আছে কি না! কিন্তু মোল্লা সায়েব তো ঘটনা ঘটিয়েই ছাড়বেন! এই কয়দিনের টুকরো-টাকরা কথায় মোল্লা তাকে এমনটাই বুঝিয়েছেন! অন্য আশ্রয়ের সন্ধান করবে, সাবানীর সে-ইচ্ছাও নাই। অতএব, যা হবার হোক! মোল্লার দোষ কী ? সাবানী ভাবে: শুক্কুইরা কি হুদাহুদি বাচ্চার লোভেই সালমারে বিয়া করছে। অন্য লোভ কাজ করে নাই!
৫.
শুক্কুরালি সাবানীর খোঁজ করে কোথাও না-পেয়ে ভেবে নিয়েছে হয়তো গার্মেন্টস-এ চাকরি নিয়েছে! খোঁজ নেওয়া হয়নি শুধু নেকাব্বর মোল্লার বাড়িতে। সেখানে সে যেতে পারে এটা ছিল শুক্কুরালির কল্পনারও অতীত। সাবানীর পাড়া-বেড়ানির স্বভাব ছিল এমন যে তাকে ‘পাড়া-বেড়ানি’ বললে ভুল হবে, ‘গাঁও-বেড়ানি’ বললে কিছুটা মানে দাঁড়ায়। তাবিজ-কবজ-পানি-পড়া থেকে শুরু করে নানা টোটকা চিকিৎসার খোঁজে সাবানী চষে বেড়িয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। উদ্দেশ্য একটাই: কোনও উছিলায় যদি পেটে বাচ্চা আসে! সেই মেয়েমানুষের যখন এক সপ্তাহেও কেউ খোঁজ দিতে পারে নাই তখন খুঁজে আর কী হবে ? নিশ্চয়ই টঙ্গী বা জয়দেবপুরের কোনও গার্মেন্টস-এ কাজের খোঁজে চলে গেছে। এত খোঁজাখুঁজি করে লাভ কী! এর চেয়ে সালমাকে নিয়ে শান্তিতে ঘর-করাই ভালো―এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুক্কুরালি সাবানীর চিন্তা মন থেকে বাদ দিয়েছে, যদিও মাঝে মাঝে মনের কোণে ঝলকে ওঠে তার সুন্দর মুখখানা!
নেকাব্বর মোল্লার বউ হিসেবে সাবানীও তখন অন্তঃপুরবাসিনী। দক্ষিণপাড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে কখনও নেকাব্বরের মূল বাড়ি সতীনদের পাড়ায় যেতে হলেও বোরকা-পরে যেতে হয়―নেকাব্বরের কড়া নির্দেশ। মোল্লাবাড়ির বউ বলে কথা! তাই, শুক্কুরালির মত আধা-আগ্রহী গোয়েন্দার পক্ষে সাবানীর খোঁজ পাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না!
এই বিয়ের পর নেকাব্বর মোল্লা সাবানী ছাড়া অন্য বিবিদের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে খুবই কম। সাবানীর শরীরে এক ধরনের বাড়তি জৌলুস দেখা দিয়েছে! নেকাব্বর মোল্লা ভাবে সাবানী খুব সুখেই আছে। ভালো খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে মোল্লার প্রেম-ভালোবাসার আরক যুক্ত হয়ে সাবানীর এই জেল্লা বেড়ে চলেছে। এসব ভেবে মোল্লা সাহেব যখন তৃপ্ত, তখন সাবানী নিজে তার এই বাড়তি লাবণ্যের অন্যরকম কারণ খুঁজে পেয়েছে। খাবার দেখলেই বমি আসে; তেঁতুল খেতে ইচ্ছে করে! মাঝেমধ্যে মাথাও পাক মারে! এর সঙ্গে আরও একটা বিষয় যুক্ত হয়ে সাবানী নিশ্চিত যে তার বহুদিনের আশা পূরণ হতে যাচ্ছে! সে মা হতে চলেছে! শুক্কুরালির বাড়ি ছাড়ার পর একবারও তার মাসিক হয় নাই। বিষয়টি নেকাব্বর মোল্লার জানার কথা কিন্তু কী কারণে তার জানা হয় নাই তার একাধিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। হয়তো নেকাব্বর মোল্লা ভেবেছেন বাঁজা-মেয়েদের মাসিক হয়তো এরকমই হয়―মাঝেমধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে; যখন হয়, তখন হয়তো মাসে দুই-তিনবারও হয়! আবার এমনও হতে পারে বিষয়টি তার মাথাতেই আসে নাই। এ-বিষয়ে তিনি সাবানীকেও কিছু জিজ্ঞেস করেন নাই। সাবানীও আগ-বাড়িয়ে তাকে কিছু জানায় নাই। কিন্তু এখন আর না-জানিয়ে পারবে না! সাবানী শুনেছে কীসব টিকা যেন নিতে হয় বাচ্চা পেটে আসার পরপরই!
রাতের বেলা মোল্লা সাহেব বিছানায় এলে সাবানী আজ একটু বাড়তি সোহাগ দেখাল। নিজেই মোল্লার বুকের উপর থুতনি রেখে আড়-চোখে তার চোখের দিকে তাকাল। সাবানীকে এতটা উৎফুল্ল দেখে মোল্লা সাহেব যে আনন্দটুকু পেতে শুরু করেছিলেন, সাবানীর একটিমাত্র কথায় তা উবে গেল। ‘চলেন একদিন সদর হাসপাতালে যাই! আমার জানি ক্যামুন-ক্যামুন লাগে! তিন মাস-ধইরা হায়েজ বন্ধ! খাইতে গেলে বমি আহে’…এটুকু শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক-ঝটকায় মোল্লা সাহেব তাকে তার বুকের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন। দ্রুত উঠে-বসে সাবানীর মাথায় জোরে একটা ঠেলা দিয়ে বলেন: ‘এইসব কী কইতাছোস, তুই ?’ সাবানী উত্তর দেয় : ‘হ, ঠিক কইতাছি। আল্লাহ মনে অয় আমার মনের আশা পূরণ করব!’
‘চুপ, বেয়াদপ’ মোল্লার এমন ধমক-খেয়ে চুপসে যায় সাবানী। বুঝতে পারে না সাবানীর বাচ্চা হলে মোল্লার কী এমন ক্ষতি হবে! অন্য বিবিদের তো একেকজনের দুই তিনটা করে বাচ্চা আছে!
নেকাব্বর মোল্লা তার রাগ ধরে রাখতে পারছেন না। সাবানীর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রাতে আর ফিরে আসেন নাই। সাবানী তার অপেক্ষায় থেকে ছটফট করতে-করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরবেলা ছৈরতের মা তাকে ডেকে-তুলে বলল : ‘ও সাবানী ভাবি! বাইরে মোল্লা সায়েব খাড়ায়া আছেন। আপনেরে রেডি-অয়া যাইতে কইছেন। আপনেরে লয়া সদর হাসপাতালে যাইব।’
৬.
চর ডুমুরিয়া সদর হাসপাতাল। সাবানীর প্রস্রাব পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে নার্স রাজিয়া বেগম হাসতে-হাসতে এসে বলল : ‘খবর ভালো, পজিটিভ পাওয়া গেছে; রক্ত পরীক্ষা আর আলট্রাসনো করলে বুঝা যাইব কয় মাসের; টেস্টগুলা করায়া ফেলেন।’
নার্সের কথা শুনে সাবানীর চোখে মুখে কী এক অজানা আনন্দের উদ্ভাস খেলা করছে। কিন্তু নেকাব্বর মোল্লা এমন এক আচরণ করে বসলেন যে, নার্স রাজিয়া বেগম প্রথমে ভাবতে বাধ্য হলো সাবানী তার মেয়ে। অবৈধ সন্তান পেটে ধরেছে। বাপ হিসেবে এই জ¦ালা সইতে না-পেরে এমন আচরণ করছে লোকটা। কিন্তু তার কথাগুলো শোনার পর আসল ঘটনা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সাবানীর চুলের মুঠি-ধরে হাসপাতালের করিডোরেই ছেঁচড়িয়ে নিতে-নিতে, কোমরে লাথি দিতে-দিতে তিনি বার বার বলছেন: “অই হারামজাদী খানকি মাগী, তোর কোন লাঙের বাচ্চা পেডে লইছোস, আমারে ক। মোল্লাবাড়ির বউ-হয়া তুই বেশরা কাম করবি, খানকিগিরি করবি আর আমি তরে আস্তা রাখুম ভাবলি ক্যামনে ? তাড়াতাড়ি ক এইডা তর কোন্ লাঙের বাচ্চা! কইবি না! কইবি না! এই আমি তরে তালাক দিলাম : ‘এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, বাইন তালাক!’ সাবানী একটুও কাঁদে নাই। মোল্লার চেঁচামেচিতেই হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স-কর্মচারী সবাই এসে জড়ো হলো। নার্সের মুখে ঘটনা শুনে একজন তরুণ-বয়সী ডাক্তার নেকাব্বর মোল্লাকে বললেন : ‘আপনাকে আমরা পুলিশে দিব! নারাী নির্যাতনের মামলা দিব!’ তিনি কর্মচারীদের বললেন: ‘তোমরা ওরে ঘেরাও দিয়া রাখো, আমি থানায় কল দিচ্ছি।’
নেকাব্বর মোল্লা অবস্থা বেগতিক দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন কিন্তু পুলিশের গ্রেফতার এড়ানো এবং সাবানীসহ সবাইকে বিষয়টি বোঝানোর জন্য ডাক্তারের উদ্দেশে তেজ-দেখিয়ে বললেন : ‘পুলিশে দিব তো আমি নিজে এই হাসপাতালের সবাইরে। চেক-কইরা দেহেন আপনেরা আমার ভেসেকটমি করছেন চাইর-বছর আগে; ১৯৯৭ সালের জুন মাসের ২২ তারিখে। খাতা আনেন, দেখেন। মাঝখানে চেক-করাইয়া গেছি তিনবার―আপনেরা কইছেন সব ঠিকাছে। আমার বউয়ের পেডে বাচ্চা আইব ক্যামনে! আমার বাচ্চা-কাচ্চার অভাব নাই। আমার আরও তিন বউ আছে। হেরার লগেও মিলি-মিশি মধ্যেমধ্যে। হেরার পেডে বাচ্চা আইয়ে না চাইর বছর-ধইরা। এর পেডে আইল কোনথনে, নিজের বিবেকরে একটু জিগায়া দেখেন! চেঁচামেচি কইরেন না! বিপদে পইড়বেন নিজেরাই। কীসের ভেসেকটমি করেন আর কীসের চেকিং করেন ? আপনারা কীসের ডাক্তার! এইটা কীসের হাসপাতাল! আমি আজকেই মামলা করব! উল্টা আমারে ভয় দেখান!’
উত্তেজিত ডাক্তার নিমিষেই ঠান্ডা হয়ে যান। মোল্লা ও সাবানীর বয়সের পার্থক্য দেখে উপস্থিত নারী-পুরুষদের অনেকেই ভাবতে থাকে : এটা সাবানীরই কোনও অপকর্মের ফল! সবাই চুপ হয়ে যায়। কিন্তু সাবানী নিজে আর তার আল্লাহ জানেন সাবানী নষ্ট মেয়ে মানুষ না। বাইন তালাক-দেওয়া স্ত্রীকে হাসপাতালের করিডোরে ফেলে-রেখে নেকাব্বর মোল্লা বাড়ি চলে গেছেন নির্বিঘ্নে। সাবানী নিশ্চুপ শুয়ে আছে করিডোরের এক কোণে। কিছু ভাবার শক্তিও সে হারিয়ে ফেলেছে। নার্স রাজিয়া বেগমের ডিউটি শেষ। পাঁচটা বাজে। সাবানীকে দেওয়া মোল্লার লাথিগুলো সরাসরি দেখেছে নার্স রাজিয়া। তার সন্দেহ হয় সাবানীর গর্ভ এতে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যাবার আগে একবার পরীক্ষা-করে দেখা দরকার। করিডোরের ফ্লোরে নিথর পড়ে-থাকা সাবানীকে উঠিয়ে নার্স তাকে ধরে-ধরে নিয়ে গেল ক্লিনিকের ভেতর। রোগী-দেখার লম্বা-টেবিলে তাকে শুইয়ে-দিয়ে পরীক্ষা করল। না, কোনও ব্লিডিংয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না! তবে, এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না মোল্লার লাথি-খেয়ে স্বাভাবিক অ্যাবোরশন হয়ে যাবে কি না! নার্স রাজিয়া নিজের টাকায় একটা পাউরুটি আর দুটি কলা কিনে আনালো বয়কে-দিয়ে। সাবানীকে বলে : ‘ন্যাও, এইগুলা খাও। আরেকটা কথা! আমার কাছে কিছু গোপন করবা না! অন্য বিবিদের বেলায় মোল্লা সায়বের ভেসেকটমি কাজ করল, তোমার বেলায় করল না কেন ? এইটা কিন্তু আসলেই ভাবনার বিষয়!’
সাবানী সহজে কাঁদে না। সেই কবে শৈশবে কেঁদেছিল কি না তার মনে নাই। আপন বলতে কেউ ছিল না তার। এমন নিষ্ঠুরভাবে কেউ তাকে মারেনি কোনওদিন। বাচ্চা না-হওয়ার জন্য মনে দুঃখ থাকলেও শুক্কুরালি তাকে গালিগালাজ-মারধোর করা তো দূরের কথা, শুক্কুরালিকে রাগ করতেই সে দেখে নাই কোনওদিন! আজ এই মুহূর্তে নার্স রাজিয়ার কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারে নাই সাবানী। এতদিনের জমা পানি দু চোখ বেয়ে নেমে আসছে দরদর করে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো। নার্স রাজিয়ার দুই পা’ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে-কাঁদতে বলছে : ‘আমি পাপ করছি আফা, আমারে শাস্তি দ্যান। আমার স্বামী শুক্কুরালিরে আমি ছাইড়া আইছি তালাক ছাড়াই। আমার বাচ্চা অয় না দেইখ্যা হে নতুন বিয়া করছিল। বাড়ি ছাড়ার পরে মোল্লার খপ্পরে পড়ছিলাম। দশদিন যাইতে-না-যাইতেই মোল্লা আমারে বিয়া-কইরা ফালাইছে, নব্বই দিন তো দূরের কথা। তর সইতে না-পাইরা নিজের হাদিস নিজে বানাইছে। আমি পাপ করছি আল্লার আইন অমান্য-কইরা। আল্লা আমারে শাস্তি দিছে, আফা। কিন্তু আল্লা সাক্ষী আছেন, আপনে আমারে বিশ্বাস করেন, আমি কোনও বেগানা পুরুষের লগে মেলামেশা করি নাইা! মোল্লা সাইবের ভেসেকটমি যদি ঠিক থাহে তাইলে আমার পেডে আমার আগের আসল স্বামী শুক্কুরালির বাচ্চা!’
নার্স রাজিয়া বেগম ভেবেচিন্তে বলল : ‘এই অবস্থায় তোমার শুক্কুরালির বাড়িতে যাওয়া ঠিক হইব না। তোমার স্বামী এত কিছু শোনার পরে তোমাকে তো গ্রহণ করতে রাজি না-ও হইতে পারে! নতুন বিয়া করছে। তোমারে তার অত প্রয়োজন কী!’
সাবানী কাতরকণ্ঠে বলে : ‘আমার যে আর যাওনের কোনও জা’গা নাই, আফা!’ নার্স রাজিয়া বলল: ‘আপাতত আমার সঙ্গে চলো। এরপর ধীরেসুস্থে চিন্তা-কইরা দেখো, আমিও দেখবোনে তোমার কোথায় গেলে মঙ্গল হইব। তোমার পেটের বাচ্চা ইচ্ছা করলে তুমি নষ্ট-কইরা দিতে পারো। এই হাসপাতালেই ব্যবস্থা আছে।’
শুক্কুরালির মায়ের গঞ্জনা, শুক্কুরালির সঙ্গে সালমার বিয়া, নেকাব্বর মোল্লার আচরণ কিংবা জীবনের অন্য কোনও ঘটনায় সাবানী এতটা দুঃখ পায় নাই বা বিচলিত হয় নাই যতটা হলো নার্স রাজিয়ার মুখে বাচ্চা নষ্ট করার কথা শুনে! আমর্ম আঁতকে ওঠে সাবানী! অলক্ষ্যেই তার ডানহাতটি চলে যায় তলপেটের সেই জায়গাটিতে যেখানে সাবানী ভাবছে তার আদরের ধনটি ঘুমিয়ে আছে! নার্সের কথার উত্তরে বলে: ‘এমুন কথা কইবেন না, আফা! আমি এইডা পারুম না। ঢাকায় গিয়া একলা থাকুম, মাইনষের বাড়িতে কাজ-কইরা খামু কিন্তুক আমার পেডের বাচ্চা নষ্ট করুম না আমি!’
৭.
নার্স রাজিয়া বেগমের সঙ্গে তার বাসায় গিয়ে সাবানী দেখে সেখানে অন্য কেউ নাই। রাজিয়া একলা থাকে। দুই রুমের একটা বাসা। বাসাটি দোতলায়। সাবানী জানে না এটি রাজিয়ার সরকারি বাসা-না-ভাড়া বাসা। হাসপাতাল থেকে বেশ দূরে। যাবার পথে তিন-চার বছরের একটা ছেলেকে তুলে-নিয়ে গেছে অন্য একটা বাসা থেকে। হাসপাতালে ডিউটিতে আসার সময় ওকে হয়তো রোজই রেখে যায় অই বাসায়। রাজিয়া কিছু না-বললেও সাবানী বুঝে নিয়েছে বাচ্চা ছেলেটি তার নিজের সন্তান। স্বামী হয়তো নাই বা থাকলেও এখন এখানে নাই।
রাজিয়া তার বাসায় গিয়েই সাবানীকে শুইয়ে দিল একটা বিছানায়। বলল : ‘শুয়ে-শুয়ে বিশ্রাম করো, অনেক ধকল গেছে তোমার উপর দিয়া।’ রাজিয়া ছেলেকে সঙ্গে-নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে কীসব কাটাকুটি করছে, সাবানী শুয়ে-শুয়েই তা বুঝতে পারে। ধীরে ধীরে উঠে উঁকি দেয় রান্নাঘরে। বুঝতে পারে রাজিয়া রাতের খাবার তৈরি করছে। সাবানী বলে : ‘আফা, দেন আমি আনাজ কাটি, ক’য়া দেন কীভাবে কাটব! আপনে বাবুরে নিয়া বিশ্রাম করেন, সারাদিন ডিউটি করছেন।’ রাজিয়া বলল : ‘তুমি ওরে তোমার কাছে নিয়া যাও, কাটাকুটি-রান্নাবান্না আমিই করব। পরে দেখা যাবেনে, আজকের দিনটা যাক।’
সাবানী বুঝতে পারে নার্স রাজিয়া তাকে তাড়িয়ে দেবে না খুব তাড়াতাড়ি। এখানে তার একটা আশ্রয় জুটেও যেতে পারে। বাবুকে সঙ্গে নিয়ে সে বারান্দায় চলে যায়। গিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে : ‘বাবু, তোমার নাম কী ?’
আমার নাম রানা।
তোমার বাপ…আব্বু কই ?
আব্বু নাই। মা বলছেন আমার আব্বু বিদেশ থাকে।
তুমি কুনুদিন দেখো নাই তারে ?
না।
সাবানী হঠাৎ বাবুর সঙ্গে তার কথা থামিয়ে দেয়। ভয় পায় রাজিয়া এসব শুনতে পেলে অনধিকার চর্চা ভেবে তার ওপর রেগে যেতে পারে। কারণ এমনও হতে পারে তার মতোই কোনও এক ভাগ্য-বিড়ম্বনার মধ্যেই রাজিয়া এই সন্তানের মা হয়েছে! সে বরং অন্যরকম কিছু প্রশ্ন করতে শুরু করে রানাকে….
ও রানা বাবু, তোমার আম্মু যখন অফিসে যায় তখন তুমি কী করো, কার কাছে থাকো ?
অই যে, অই যে, মিতুদের বাসায়; আজকে তুমি না আমার মা’র সাথে গেছো অইখানে! অইখানে থাকি। মিতুর সঙ্গে খেলা করি। কিন্তু মিতু না, আমারে শুধু মারে! সে ভালো না!
সাবানী এখানে তার আশ্রয়ের সূত্র পেয়ে গেছে। সুযোগমতো রাজিয়াকে সে বুঝিয়ে বলবে তাকে এখানে ঠাঁই দিতে। সে রানাকে দেখে রাখবে। রান্নাবান্না এমনকি বাজার-সদাই করাসহ সংসারের সব কাজ করবে। রাজিয়া শান্তিতে নার্সের কাজ করে বাসায় ফিরে দেখবে সবকিছু সে করে রেখেছে। রানাকেও ঠিকঠাক দেখে রেখেছে।
সাবানীকে বলতে হলো না। রাতের খাবার খেয়ে রানাকে ঘুম পাড়িয়ে রাজিয়া নিজেই সাবানীকে নিয়ে বসল তার ছোট্ট বারান্দায়। বলল : ‘সাবানী, তোমার যে অবস্থা, আমার মনে হয় তুমি আমার এখানে থাকলেই ভালো হবে। তোমার পেটের বাচ্চাটা যাতে সুন্দরভাবে হয়, আমি হাসপাতালের নার্স হিসাবে সাহায্য করতে পারব আমি ডিউটিতে গেলে তুমি যদি রানাকে দেখে রাখো, কাজেকর্মে একটু সাহায্য করো, আমারও খুব বড় রকমের উপকার হইব!’
নার্স রাজিয়ার কথা শুনে সাবানীর চোখ ভিজলো এই দ্বিতীয়বার। আবারও রাজিয়ার পা-জড়িয়ে বলতে লাগল : ‘আফা, আমার মনে অইতাছে আপনে আমার মায়ের পেডের বইন, আমারে তাড়ায়া দিয়েন না; আমি আপনের সবকিছু কইরা দিমু, আফা! রানারে দেইখ্যা রাখুম নিজের ছেলের মতো! আমার বাচ্চাডা হওনের আগে পর্যন্ত আমারে একটু জা’গা দ্যান!’
৮.
নার্স রাজিয়ার তত্ত্বাবধানে সাবানীর বাচ্চা ডেলিভারির পর তার আর তর সইছিল না কবে শুক্কুরালি আর তার মাকে দেখাতে যাবে। আজ শুক্কুরালিকে বাচ্চা-দেখিয়ে, রিহার্সাল-দেওয়া কথাটা শুনিয়ে মনের ঝাল অনেকটা মিটে গেছে। কিন্তু শুক্কুরালির দৃষ্টি থেকে দূরে যেতে মন চাইছে না তার। তাকে যে একটা কথা বলার ছিল সুস্থ মুখে, ঠান্ডা মাথায়! ভাগ্যিস রোস্তম বেপারীর ক্ষেতের আল-ধরে হনহন-করে হাঁটার সময় বাচ্চাটা কেঁদে উঠেছিল। দুধ-খাওয়ানোর জন্য কাছেই এমন একটা গাছের নিচে বসল যেখান থেকে শুক্কুরালিকে দেখা যায়। একটা জরুরি কথা জানানোর জন্য শুক্কুরালিকে তার বড় প্রয়োজন। আজ না হোক, কোনওদিন কথাটা তাকে বলতেই হবে!
‘হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়, ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না!’
রোস্তম বেপারীর ধানক্ষেতের পাশে মবারকের শেষ কথাটারও উত্তর দিতে গিয়ে সাবানী দিতে পারে নাই, যদিও এসব বিষয়ে মুখ তার কৈশোর থেকেই ছুরির মতো ধারালো। এই কথার ছুরি দিয়েই বহু বিপদ থেকে সে নিজেকেও রক্ষা করেছে। ক্ষেতের আলপথ ধরে সে হনহন করে সামনে এগিয়ে এসে এখন এই গাছের নিচে বসেছে। তাকিয়েও আছে শুক্করালির দিকেই! হঠাৎ তার এই হাঁটার মধ্যে বাড়তি গতিসঞ্চারের কারণ যদি কেউ সত্যি সত্যি আবিষ্কার করতে পারত তবে দিব্যি দেখতে পেত শুক্কুরের ভাবনাটিই ঠিক! শুক্করালিকে ভুলতে না-পারাটাই এই ঝাল-দেখানোর আসল কারণ! কিন্তু সাবানীর এই গতিবেগ সইতে না-পেরে পোটলার জ্যান্ত বস্তুটি প্রথমে ‘ওয়াও’, পরে ‘অ্যাঁ-অ্যাঁ’ করে এখন সাবানীর বুকের কাছে রীতিমতো কলের-গানের মতো বেজে চলেছে! অগত্যা এই কলের গান থামানোর জন্য বাচ্চার মুখে-পুরে দিতে হলো দুধভর্তি সুপুষ্ট স্তনের বোঁটা।
কচি-মুখের টানে-টানে তার স্তন থেকে যে দুধের ফোয়ারা বইছে সেই আনন্দ প্রাণভরে উপভোগ করছে সাবানী। সেই আনন্দ আর ক্লান্তিতে নিমেষেই তন্দ্রার কোলে ঢুলে পড়ে সে। সেই তন্দ্রার ঘোরে সাবানী দেখতে পায় : তার ছেলেটা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। ম মাম মা আর দা, দাদদা….পেরিয়ে যখন কিছু কথা বলতে শিখেছে তখনও শুক্কুরালির মতোই তোতলিয়ে কথা বলছে সে-ও! সেই তন্দ্রার ঘোরেই সাবানী দেখতে পায় : একদিন সুযোগ পেয়ে সব কথা সে শুক্কুরালিকে খুলে বলেছে! শুক্কুরালি তখনও নিঃসন্তান। সালমাও তাকে সন্তান দিতে পারে নাই। সাবানীর বাচ্চাকে বুকে-জড়িয়ে নিতে-নিতে শুক্কুরালি বলে ওঠে: বা বাজান! ছেলেও তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে-পড়তে বলে : বাব বাজান!! হঠাৎ শরীরে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে সাবানীর তন্দ্রার ঘোর কেটে যায়। চেয়ে দেখে দুধ-খেয়ে তৃপ্ত শিশুটি তার দিকে তাকিয়ে আছে! মুখজুড়ে তার শুক্কুরালির অবয়ব!
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



