আর্কাইভকবিতা

আবিদ আনোয়ার-এর দুটি অনূদিত বিদেশি কবিতা

অনূদিত কবিতা

শার্ল বোদলেয়ার-এর ‘Une Charogne’

শব

মনে পড়ে, ও আমার চৈতন্যের নিত্য সহচরী,

সেদিন পথের মোড়ে কী দেখে চমকে-গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ?

আ-মরি গ্রীষ্মের ভোর, হাওয়া যেন খুলেছিলো স্বর্গের খড়খড়ি;

পাথুরে শয্যায় এক মৃত পশু পড়েছিলো উদলা-উদাম।

ঊর্ধ্বে তার জঙ্ঘা তুলে চিৎ-হয়ে আছে যেন কামার্ত রমণী,

উত্তাপে ও ঘামে ভেজা, রক্তে-রন্ধ্রে ছড়িয়েছে বিষ―

অবারিত উদরের লজ্জাহীন নগ্ন প্রদর্শনী,

ফোলা-পেটে নষ্টবায়ু, ঘিনঘিনে অকথ্য পুরীষ।

জ্বলন্ত সূর্যের আলো যেন এক গৃহলক্ষ্মী নিপুণা রাঁধুনি

প্রকৃত রান্নায় তাকে পরিপূর্ণ শুদ্ধ-করে নিয়ে

তাকেই ফিরিয়ে দেবে যার ধন কেড়েছিলো নিয়তির খুনি,

প্রকৃতির রন্ধ্রে-রন্ধ্রে দেবে তাকে আবারও বিলিয়ে।

গলিত জঠর জুড়ে ওড়ে-বসে ভনভনে মাছি;

উল্লসিত কৃমিপুঞ্জ যেন এক কৃষ্ণ সৈন্যদল

ভক্ষ্যের দখল নিতে শবাংশের ছোটে কাছাকাছি

প্রমত্ত স্রোতের মতো নেচে-কুদে: চল্ চল্ চল্…

সমস্ত শবের দেহ উঠছে-নামছে ঢেউয়ের মতন,

ফুলে-ফেঁপে নড়ছে যেন উদ্ভাসিত সমুদ্রের ফেনা

যেন সে-ও মৃত নয়, প্রাণবায়ু আছে যেন, আছে তো স্পন্দন,

শতখণ্ডে পুনর্জন্ম দিচ্ছে তাকে কোনো এক রহস্য অচেনা।

এসব ছাপিয়ে যেন ভেসে এলো সূক্ষ্ম এক সঙ্গীতের ধ্বনি,

সে কি মৃদু হাওয়ার নিস্বন, প্রবাহিত জলের কল্লোল,

নাকি সে-সঙ্গীত কোনো ছন্দোময় কুলোর সিম্ফনি,

শস্য-ঝাড়ানিয়া কোনো কিষানীর মধুর হিল্লোল ?

সব দৃশ্য ক্ষীয়মাণ, শুধু এক স্বপ্ন যেন বাকি,

বিস্মৃত ক্যানভাস জুড়ে ধীরে ধীরে ফোটে এক ছবি;

শিল্পী যেন ভুলে গেছে সব রং, সব আঁকা-আঁকি,

কেবল স্মরণে ভাসে অতীতের খিন্ন প্রতিচ্ছবি।

তোমার কি মনে পড়ে একটি খুব ব্যাকুল কুক্কুরী

শিলার পশ্চাৎ থেকে ক্যামন তাকিয়েছিলো আমাদের দিকে ?

রুষ্ট তার চোখ থেকে ঠিকরে-পড়া হিংস্রতার ছুরি

যেনবা কঙ্কাল থেকে তখনই খুবলে নেবে তার প্রাপ্যটিকে!

আমার নয়ন-তারা, জীবন-সবিতা, দেবী কিবা প্রাণের স্বরূপ,

পশুর বিষ্ঠার মতো তুমিও তো হয়ে যাবে পূতিগন্ধময়,

একদিন এই দেহ হয়ে যাবে কীটাণুর স্তূপ―

সেই দিন সমাগত, বুঝি আর বেশি দূরে নয়।

শেষকৃত্য সাঙ্গ হলে তুমি ঠিক হয়ে যাবে তা-ই!

হে আমার মোহময়ী লাবণ্যের রানি,

আগাছা-ঘাসের গুচ্ছে মিশে যাবে অবশিষ্ট ছাই;

বিচূর্ণ হাড়ের মাটি ঢেকে-দেবে জীবনের তুমুল তড়পানি।

জঘন্য কীটের পঙ্ক্তি যখন তোমাকে খাবে চুম্বনে-চুম্বনে

তখন তাদের কাছে, হে রূপসী, বলে দিয়ো তুমি:

রূপের জ্যামিতি আমি নিজেই তো গড়েছি যতনে;

আমারই নশ্বর প্রেমে স্বর্গ হয়ে উঠেছিলো দীন মর্ত্যভূমি।

[দ্রষ্টব্য: কবিতাটির সপ্তম স্তবকে শার্ল বোদলেয়ার তাঁর মূল রচনায় শস্যঝাড়ার দৃশ্য ও ধ্বনিবাহী যে দ্বিমাত্রিক চিত্রকল্পটি রচনা করেছেন তাতে শস্যঝাড়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিটি একজন পুরুষ। শস্যঝাড়াইয়ের কাজে বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বিবেচনায় রেখে আমি আমার অনুবাদে ‘কিষানের’ পরিবর্তে ‘কিষানীর’ শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছি]

…………………………………………..

স্যাম ওয়াল্টার ফস-এর ‘The Calf-Path

গো-শাবকের পথ-ধরে

পুরাকালে এক সবুজ-শ্যামল নিবিড় বনের পাশে

গোবৎস এক বিকেলের দিকে মুখ-রেখে শেষ ঘাসে

ভাবলো এবার ফিরে যেতে হয়―সুবোধেরা ফেরে বাড়ি;

কী যেন কী ভেবে অবোধ বাছুর বন দিয়ে ধরে পাড়ি।

রেখে গেলো বাঁকা পথের চিহ্ন কুমারী বনের বুকে

যেমনটি ঘটে যে কোনো বাছুর হেঁটে গেলে সম্মুখে।

হাজার হাজার সাল কেটে গেছে, আমি আজ নিশ্চিত

কবে সে বাছুর মরে গেছে, তার স্মৃতিও যে আজ মৃত।

পথ রয়ে গেলো, এবং আমার গল্পের প্রয়োজনে

পরের দিনেই ভবঘুরে এক কুকুরের হলো মনে:

এ যে দেখি কার পায়ের চিহ্ন, এই পথে যাই হেঁটে―

পদাঙ্ক আরো গাঢ়তর হলো―বনতল ছিলো মেটে।

পরে গেলো ভেড়া, গলায় ঘণ্টি, পেছনে গড্ডলিকা―

টিলা-টক্করে-সমতলে হলো পায়ের চিহ্ন লিখা।

সেই পথে শেষে হাজারো মানুষ রেখে গেছে পদধূলি

হেলেদুলে কত আলাপে-প্রলাপে মাতিয়ে প্রহরগুলি;

ন্যায়-অন্যায়, সুখ-দুখ নিয়ে কত কথা হলো বলা,

কখনো থামেনি সেই পথ-ধরে মানুষের পথচলা।

পথের স্রষ্টা অবুঝ বাছুর―হাসবার কিছু নেই:

বক্র এ-পথ, বাছুরের-চলা বাঁকা সে তো স্বভাবেই।

আদিকালে সেই পথ ছিলো কাঁচা, সরু এক মেটে গলি

দুই পাশে তার বনতরু ছিলো―গজারী কি শাল্মলি।

ধীরে ধীরে তার পরিধি বেড়েছে―রাস্তাই বলা যায়:

বোঝা-নিয়ে পিঠে ঘোড়া গেলো কত সকালে ও সন্ধ্যায়

হাঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কত দুপুরের তপ্ত রোদের নিচে

প্রতি ঘণ্টায় তিনমাইল কিবা তারও বেশি ফেলে পিছে।

এভাবে কখন কেটে গেলো প্রায় হাজার দেড়েক সাল

বাছুরের-গড়া পথ-ধরে গেলো মানুষ ও পশুর পাল।

দিন যায় আরো, হাজারো জনের দর্পিত পদভারে

সেই পথ হলো প্রধান সড়ক একটি গ্রামের ধারে।

ধীরে ধীরে তার পরিধি বেড়েছে মানুষের অগোচরে

সে-পথ হয়েছে নগর-সরণি বিস্তৃৃত পরিসরে;

মহানগরীর বড় রাজপথ বলতেও নেই মানা

অথচ প্রথম বানালো সে-পথ একটি গরুর ছানা।

পদাঙ্ক রেখে মরার পরেও কেটে গেছে কতকাল,

অনুমানে বলি: হবে হয়তো-বা আড়াই হাজার সাল!

যে-পথ মুখর নিত্যদিনের সহস্র কোলাহলে

নির্মিত হলো এলেবেলে এক বাছুরের খেলা-ছলে।

সারা মহাদেশ চষে-ফেরা কত যানবাহনের সারি

বিস্ময়ে দেখি প্রবল গতিতে এই পথে ধরে পাড়ি।

হাজার তিনেক বছর গিয়েছে, গো-শাবক গেছে মরে;

শত-সহস্র মানুষ হেঁটেছে তারই পথ ধরে-ধরে।

প্রবীণের কৃতি ভুলিয়ে দিয়েছে মানুষের সঙ্গতি;

একদিনে যায় শতেক বছর সময়ের এত গতি!

এই কবিতায় পাওয়া যাবে কিছু শিক্ষার উপাদান

বাণী প্রচারের ক্ষমতা আমাকে কেউ যদি করে দান:

মানুষ মূলত অন্ধ-আবেগে চিরদিন পথ চলে,

সেদিকেই যায় মনের বাছুর যেইদিকে যেতে বলে।

ব্যষ্টিকে খায় সমষ্টি মানে অন্যের পথে হাঁটে;

নিজস্ব বলে কিছু নেই এই জীবনের তল্লাটে।

যেখানে পড়েছে যুগ-যুগ ধরে সময়ের গাঢ় পলি

আরাধ্য তার সেই মাঠ-ঘাট, পরিচিত  অলিগলি।

বনের দেবতা হেসে কুটি কুটি মহাজ্ঞানী মহাজন

যিনি দেখেছেন বাছুর যেদিন পাড়ি দিলো ঘন বন।

এই গল্পেই আরো বাণী আছে বলবো না কিছু তার―

আমি নই কোনো আদিষ্টজন, নই কোনো অবতার!

………………………………………………………..

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button