বুকের প্রদীপ : মূল : বানু মুশতাক

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন
[বানু মুশতাকের জন্ম ৩ এপ্রিল, ১৯৪৮। ভারতের কর্নাটক রাজ্যের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি জীবিকাসূত্রে একজন আইনজীবী, এছাড়া সমাজকর্মী হিসেবে বিখ্যাত। তিনি কন্নড় ভাষায় লেখেন। ২০২৫ সালে তাঁর ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প-এর জন্য আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লাভ করেন।]আধখোলা দরজাটা পুরোপুরি খুলে মেহেরুন ঘরে পা রাখতে না রাখতেই ড্রয়িংরুমের খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে ওর বাবা ওর ভাইয়ের সঙ্গে নিচু গলায় ফিসফিস করে যে কিছু একটা পরিকল্পনা করছিল, তা থেমে যায়। দুজনেই ওর দিকে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর ছোট্ট ভাতিজি রাবেয়া ছুটে এসে চিৎকার করে বলতে লাগল―‘মেহেরুন ফুপি এসেছে, মেহেরুন ফুপি এসেছে।’ রাবেয়ার বাবা আমান ওর মেজ ভাই। গালে শেভিং ক্রিম মাখা অবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। হাতে এখনও ব্রাশ ধরে আছে। ড্রয়িংরুমে মেহেরুনের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন ওর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। ওর বড় ভাই আতিজ বাচ্চাদের সুরেলা কণ্ঠে কোরআন পড়াতে পড়াতে বাহিরে চলে আসে। ড্রয়িংরুমে এসে ওর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। মাথা থেকে শাড়ির আঁচলটা কখন যে পড়ে গেছে, সে দিকে ওর কোনও খেয়াল নেই। ওর মা কঞ্চির মতো সরু আঙ্গুলে তসবি ধরে বজ্রাহতের মতো ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন জিজ্ঞাসা করতে চান তিনি সত্যি সত্যিই দেখছেন তো ? তিনি কি আসলেই ঠিক দেখছেন ? ওর ছোট দুবোন রেহানা আর সাবিহা ড্রয়িং রুমের ওপাশ থেকে উঁকি দেয়। তাওয়ায় যে রুটি পুড়ে যাচ্ছে সেদিকে কোনও খেয়াল নেই। ভাগ্যিস ওর ছোট ভাই আতিক এই মুহূর্তে বাসায় নেই।
পুরো বাড়ি মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। ওর কাছে এ দৃশ্য অচেনা মনে হলো। যে মা ওকে নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছেন, তিনিও বললেন না, ‘ও আচ্ছা, তুই এসেছিস। ভেতরে আয়, মা।’ ওর বাবা যার প্রশস্ত বুকে ছোট্ট মেয়েটা যখন খেলা করত তখন আনন্দ পেতেন, তিনিও মেয়েটাকে স্বাগতম জানিয়ে সামান্য হাসলেনও না। ওর ভাইও না। যে এক সময় ওকে বলত, ‘আমার পরি, আমার এঞ্জেল,’ আমানও না। এই আমান একসময় বলত যে, ওকে অবশ্যই কলেজে পড়াতে পাঠাবে। ওদের স্ত্রীরা ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন সে অন্য কোনও গ্রহ থেকে এসেছে।
মেহেরুনের মনটা ভেঙ্গে গেল। যখন ওর কোলের নয় মাসের বাচ্চাটা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল কেবল তখনই সবাই যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। ওর বড় ভাই জানতে চাইল, ‘ইনায়েত কোথায় ?’
ও এমনভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে যেন ও বড়সড় কোনও অপরাধ করে বসেছে।
এরপর উত্তর দেয়, ‘ও শহরে নেই।’
‘তাহলে তুই কার সঙ্গে এলি ?’
‘একাই এসেছি।’
‘একা ?’ সবাই সমস্বরে ওর চারপাশ থেকে বলে ওঠে। ও সবার মাঝখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।
‘এই ফারুক, ওকে ভিতরে নিয়ে যা’, ওর বড় ভাই এ কথা বলার পর মেহেরুন ভেতরে যায়। ওর পা দুটো ভারী হয়ে গেছে। যেন চলতে চায় না। সবাই মিলে যেন ওকে নিয়ে বিচার বসিয়েছে। কোলের বাচ্চাটা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। বোরকা না খুলে শুধু নেকাবটা সরায়। ওর বাবার বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ে। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়। এখনও মুখটা পর্যন্ত ধোয়নি। বাচ্চাটা দুধ খায়। ক্ষুধায় ওর পেটটা চোঁ চোঁ করতে থাকে। গতরাত থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও দানাপানি পেটে যায়নি। তবে এখন ওর মা ছাড়া আর কোনও মহিলা ধারেকাছে নেই।
‘মেহের, আসার আগে তুই কি কাউকে আগেভাগে খবর দিয়েছিলি ?’
‘নাহ।’
‘কেন ? বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে ওদেরকে বলিসনি কেন ? মনে হচ্ছে তুই আমাদের মান-সম্মান নষ্ট করার জন্য পণ করেছিস।’
‘কাকে আগে-ভাগে জানাব ?’
‘কে আছে ? এক সপ্তাহ আগে ও বাড়ি এসেছে। ও কোথায় যাচ্ছে সে-ব্যাপারে আমাকে একটাও কথা বলেনি। ওকে চিঠি লিখতাম। কিন্তু কোনও উত্তর পাইনি। মরে গেছি না বেঁচে আছি, সে ব্যাপারে কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই।’
‘তুই লিখেছিলি যে, তোর স্বামী নাকি কোনও এক নার্সের সঙ্গে ভেগে গেছে। সেই কাহিনি তুই আমাদের বিশ্বাস করাতে চাস ?’
‘আমার কথা বিশ্বাস না হলে ওখানে গিয়ে তোমরা নিজের চোখে দেখে এস। লোকজন ওদেরকে একসঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াতে দেখেছে।’
‘ওখানে গিয়ে ওদেরকে একসঙ্গে দেখলে কী করব ? ধর, ওকে হাতে-নাতে ধরে ফেললাম। তারপর ব্যাপারটা ওর কাছে জানতে চাইলাম। আর ও বলল, হ্যাঁ, ঘটনা সত্য। তাহলে আমরা কী করব ? আমরা কি মসজিদের মুতাওয়াল্লির কাছে বিচার দেব ? তখন ও বলবে, ভুল হয়ে গেছে। আমি ওকে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করব। এরপর ঐ মেয়েটা হবে তোর সতিন। ধরে নে, এরপর ওকে আমরা আরও গালাগালি করলাম। তারপর ও যদি বলে, আমি আর এই মহিলা অর্থাৎ মেহেরুনের সঙ্গে সংসার করব না। ওকে তালাক দিব। তখন কী করব ?’
এতক্ষণে মেহেরুন অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। বাচ্চাকে বুকের একপাশ থেকে সরিয়ে আরেক পাশে দুধ পান করাতে থাকে। বোরকার নিচ থেকে শাড়ির আঁচল টেনে বের করে নাক, মুখ মুছতে লাগল। মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্থবির হয়ে যায়।
‘তার মানে তোমাদের কারও কিছু করার নেই। তাই না ?’ কারও মুখে কোনও রা নেই। ও বলে চলে, ‘তোমাদের পায়ে পড়ে বলেছিলাম, এ বিয়ে আমি করব না। তোমরা কি আমার কথা শুনেছিলে ? বলেছিলাম, বোরকা পরে কলেজে যাব। অনুরোধ করেছিলাম যেন আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে না যায়। তোমরা কেউ আমার কথায় কর্ণপাত করোনি। আমার অনেক সহপাঠীর এখনও বিয়েই হয়নি। অথচ আমি বুড়ি হয়ে গেছি। পাঁচ পাঁচটা সন্তানের বোঝা আমার ওপর চেপে বসেছে। ওদের বাবা সিনা টান করে ঘুরে বেড়ায়। আমার জীবন বলে আর কিছু নেই। যখন কোনও লোক এমন নাজায়েজ কাজ করে তখন কি তাকে জিজ্ঞাসা করবে, কেন সে এমনটা করছে ?’
‘যথেষ্ট হয়েছে। মেহের, যথেষ্ট হয়েছে।’ ওর মা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ে।
‘হ্যাঁ, আম্মা, যথেষ্ট হয়েছে। প্রথম দিকে লোকজন ফিসফিস করছিল। পরে ওদের যখন সিনেমা হল ও হোটেলে একসঙ্গে দেখে তখন সবাই সরাসরি এসে আমার কাছে সব ফাঁস করে দেয়। এরপর সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মেয়েটির বাড়িতে যাওয়া শুরু করে। সবাই যখন ওকে গালমন্দ করা শুরু করে, তখন ও চলে যায় বেঙ্গালুরু। হাজার হাজার টাকা উড়ায়, ওর বদলি করিয়ে ছাড়ে। এখন গত আট দিন ধরে ওর সঙ্গে থাকছে। আর কত দিন আমাকে এসব সহ্য করতে হবে ? বাঁচব কীভাবে ?’
‘ধৈর্য ধর রে, মা। ওকে ভালোবাসা দিয়ে শোধরা।’
‘আম্মা, আমার কি মন বলে কিছু নেই ? আমার কি কোনও অনুভূতি নেই ? ও এভাবে চললে স্বামী হিসেবে ও তো আমার ভালোবাসা পাবে না। ওকে দেখলে ঘৃণায় আমার সারা শরীর ঘিন ঘিন করে ওঠে, ভালোবাসা তো দূরের কথা। ও আমাকে তালাক দিবে কি-না, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। বরং আমিই ওকে তালাক দিব। আমি আর ওর বাড়িতে ফিরছি না।’
‘মেহের, তুই বলিস কি রে ? খুব বাড়াবাড়ি করছিস। ও একজন পুরুষ। ও যদি গু পাড়ায় তবু পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে ঘরে ঢুকতে পারে। এমন কোনও কালিমা নেই যা ওকে কলঙ্কিত করতে পারে।’
ও কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই আমান বাধ সাধল।
‘দেখ, দেখ, আমাদের সবার সামনে ও কীভাবে কথা বলে ? এভাবে ওর স্বামীর সঙ্গেও কথা বলে। এজন্য ও রেগেমেগে ওকে ছেড়ে চলে গেছে।’ এবার ও থামল। সুরটা নরম করে বলে, ‘এ বাড়ির বউয়েরা যদি এটা দেখে, তা হলে তো বেশ মজা হবে, তাই না ?’ মেহেরের দুঃখ শীঘ্রই রাগে আর রাগ শীঘ্রই হতাশায় পরিণত হলো।
‘ভাই, তুমি ভালোই কথা বলো দেখছি। আল্লাহ তোমাদের ভালো রাখুক। এ কথা সত্য, আমি খারাপ মানুষ। আমি আদব-কায়দা শিখিনি। বোরকা ছাড়া আমি বাহিরে যাই না। ও আমাকে বোরকা ছাড়তে বলে। শাড়ি পরতে বলে। তাও আবার নাভির নিচে। তারপর ওর হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে বলে। কিন্তু তোমরা আমাকে বোরকা পরা শিখিয়েছ। শাড়ির আঁচলটাও আমি মাথা থেকে নামাই না। ঘোমটা সরালে নিজেকে উলঙ্গ মনে হয়। তোমরা আমার মধ্যে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করেছ। ও আমাকে যা করতে বলে, আমি তা করতে চাইনি। তাই ও এমন একজনকে বেছে নিয়েছে যে ওর কথামতো ওঠে-বসে। এখন তোমরা ভয় পাচ্ছো যে, ও আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি তোমাদের বোঝা হয়ে যাব। তাই আমাকে সব সহ্য করতে বলছ। কিন্তু সেটি তো এখন সম্ভব নয়। আমি বরং নরকযন্ত্রণা সহ্য করব তবু ওর ঘর আর করব না। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কোথাও ঝিয়ের কাজ করব। তোমাদের বোঝা হব না। একদম না।’
‘মহিষের শিং কি মহিষের কাছে ভারী লাগে, মেহের ? এসব আবোল তাবোল বকিস না তো।’ ওর মা বাধা দিয়ে বলে।
‘আম্মা ওকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কিছু খেতে দাও,’ ওর বড় ভাই গুরুগম্ভীরভাবে বলে। ‘দশ মিনিটের মধ্যে আমরা চিকমাগালুরের উদ্দেশে রওনা দেব। বাস পেয়ে গেলে বাসেই রওনা দেব। না পেলে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। ওর কথা শুনে আমাদের তো নাচলে চলবে না।’
‘তোমাদের বাড়িতে আমি পানি পর্যন্ত খাব না। চিকমাগালুরেও যাব না। তোমরা জোর করে নিয়ে গেলে আমি দিব্যি দিয়ে বলছি, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করব।’
‘মেহের অনেক হয়েছে। যারা মরতে চায় তারা বলে বেড়ায় না। তবে এই পরিবারের মান-সম্মান নিয়ে তোর যদি মাথা ব্যথা থাকত তবে তুই এখানে না এসে তাই করতিস। যে বাড়িতে তোর পালকি ঢুকেছে সেই বাড়ি থেকে তোর খাটিয়া বের হবে। ভদ্র ঘরের মেয়েদের জীবন তো এটাই। তোর একটা হাই স্কুল পড়ুয়া মেয়ে আছে। বিবাহযোগ্য ছোট দুটি বোন আছে। তোর একটা ভুল পদক্ষেপ ওদের ভবিষ্যৎ বরবাদ করে দেবে। তোর কথা শুনলে আমাদের তোর বাড়িতে গিয়ে তোর স্বামীর সঙ্গে মারামারি করতে হবে। কিন্ত আমাদেরও স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি আছে। কাজেই, ভেতরে যা। কিছু খেয়ে নে।’
মেহেরুন ওর ভাইয়ের দিকে তাকায়। তারপর আবার নিজের দিকে তাকায়। ‘আমান দৌড় দিয়ে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আয়। আর মেহের শোন, যদি তোর কোনও প্রতিবেশী কিছু জিজ্ঞেস করে তবে বলবি, বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলি। অথবা বানিয়ে ছানিয়ে কিছু একটা বলিস।’
‘এখানে আসার জন্য কয়টার সময় রওনা হয়েছিলি ?’
মেহেরুন কোনও কথা বলে না।
‘এখন সাড়ে নটা বাজে,’ আমান বলে। ‘ও নয়টায় এসেছে। তিন ঘণ্টার পথ। নিশ্চয় ছয়টার সময় রওনা দিয়েছিল। আমরা এখন বেরিয়ে পড়লে ঠিক সাড়ে বারোটায় পৌঁছে যাব।’
‘মেহেরুন যেখানে বসেছিল সেখান থেকে নড়ল না। ওর মা আর ছোট বোনেরা ওকে খাবার খেতে অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু ও এক দানা খাবার বা এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলে না। ট্যাক্সি এসে পৌঁছলে ও একটা কথাও বলে না। বাচ্চাটাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে ধরে বাহিরে যায়। বড় ভাইয়েরা ওর পাশাপাশি হাঁটে। ও কাউকে বিদায় বলে না। যাওয়ার সময় শুধু পেছনে ফিরে বাড়িটার দিকে একটু তাকায়। এই বাড়িতেই ওর জন্ম হয়েছিল। এখানেই ও বেড়ে উঠেছে। চোখ দুটো জলে ছল ছল করে ওঠে। ওর বাবা বুক ঠেসে ধরে কাশতে থাকে। মা কাঁদতে থাকে। মেয়েটার দিকে তাকায়। তারপর তার স্বামীর দিকে। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকে। শরীরে পানি ছিটিয়ে দেয়। তারপর নিজে নিজেই বলতে থাকে, ‘আল্লাহ, জীবনে যদি কোনও সওয়াবের কাজ করে থাকি, তবে তার বিনিময়ে আমার মেয়েটাকে ভালো রেখো।’
‘আমান গাড়ির দরজা খুলে মেহেরকে চোখের ইশারায় ভেতরে বসতে বলে। রাগে গরগর করতে থাকে। মেহের এক সময় ওর ভাইদের নিয়ে গর্ব করত। ওর স¦ামী ইনায়েতের ওপর রাগ হলে বলত, ‘আমার ভাইয়েরা শের-ই-বাব্বার-এর মতো দাঁড়িয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। তুমি যদি আর এমন আচরণ করো তবে তোমাকে টুকরো টুকরো করে ওরা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেবে। সাবধান হয়ে যাও!’ কিন্তু এখন সেই গর্ব পুরোপুরি উবে গেছে। ওর ভাইদের কথাগুলো ওর কানে বাজে। ‘আমাদের পরিবারের মান-সম্মানের প্রতি যদি তোর কোনও দরদ থাকে তবে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিস। এখানে আর আসবি না।’
গাড়িতে উঠে সে আর তার বাড়িটির দিকে তাকায় না। ওর মার দিকেও না। মা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। ওর যে বোনেরা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল, তাদের দিকেও আর ফিরে তাকায় না। ওর ভাবিদের দিকেও না। ওরা এ সময় বাসার ভিতরে ঘর-গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। কিন্তু বোরকার নিচে ওর দু চোখ বেয়ে জলপ্রপাতের মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। বসে বসে ঠোঁট কামড়ায় আর অশ্রু সম্বরণ করার চেষ্টা করে।
গাড়ি দ্রুত চলতে লাগল। কেউ কিছু বলল না। আমান গাড়ির সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসেছে। ড্রাইভার ওদের মহল্লারই লোক। কেউ কি ওর সামনে পরিবারের গোপন বিষয় শেয়ার করতে পারে ? তাই যাত্রাপথে ওরা চুপচাপ বসে থাকে। ষোল বছর ধরে সে ইনায়েতের দাবার চালের গুটির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘ ষোল বছর ধরে সে তার নারীত্বকে অপমান করেছে। ‘তুমি তো মরার মতো শুয়ে থাকো। তোমার কাছ থেকে আমি কী সুখ পেয়েছি!’ এসব কথা বলে তার স্বামী তাকে উত্যক্ত করে। ‘আমি তোমাকে কী দিইনি ? খাবার, কাপড় ? আমাকে থামাবে সাধ্য কার ? আমি এখন সেই মহিলার সঙ্গে আছি যে আমাকে সুখ দেবে।’
তার নজর গাছগুলোর দিকে নয়, দৃশ্যগুলোর দিকেও নয়। রাস্তার দিকেও নয়। গাড়িটা যখন হঠাৎ থামল তখন সে বাইরে তাকাল। ওরা বলল, বাড়িতে এসে গেছে। ছোট্ট একটা মেয়ে, চেহারা উস্কো খুস্কো। আম্মি বলে ছুটে এল বাড়ির সামনের দরজা থেকে। বলে, ‘আম্মি, অবশেষে ফিরে এলে! আমার তো খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।’ ওর মার কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে টেনে নেয়। তারপর বাসার মধ্যে দৌড় দেয়।
মেহেরুন ধীরে ধীরে বাসায় ঢোকে। খালি খালি লাগে। অন্য বাচ্চারা স্কুলে চলে গেছে। ষোল বছরের বড় মেয়েটা, যে ওর কষ্ট বোঝে, কেবল সে-ই ছিল বাড়িতে। সালমা ওর বড় ভাই-বোনদের পড়তে পাঠায়। তারপর উদি¦গ্নতার সঙ্গে ওর মার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ওর মা’র সঙ্গে মামাদের দেখে স্বস্তির শ্বাস নেয়। মামাদের দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হয়। ভাবে, মামারা ওই মহিলার চুলের মুঠি ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। হরিণের মতো লাফাতে লাফাতে মামাদের নাস্তা খেতে দেয়। চুলোয় চায়ের পানি উঠিয়ে দেয়। মেহেরুন ওর ঘরে শুয়ে থাকে। সালমা ঘরে ঢুকে ওর মার চোখ থেকে অশ্রু মুছে দেয়। মা’র মুখে কয়েক গ্রাস ভাত তুলে খাওয়ায়। তারপর উচ্ছিষ্টাংশসহ থালা হাতে বের হয়। একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ওর কানে ভেসে আসে।
আবার ঘরে দৌড় দেয়। বলে, ‘আম্মি, আম্মি, আব্বা এসেছে।’ মেহেরুন ভান করে যে, ও কিছুই শোনেনি। আরও বেশি করে সারা গায়ে কম্বল জড়িয়ে নেয়। সালমা ড্রয়িংরুমে যেতেই ওর মাথায় রক্ত উঠে যায়। ওর মামারা বাইরে যায়। সালমা ওদের কথোপকথন শুনতে পায়। ওরা সালাম বিনিময় করে, গল্পগুজব করে, হাসি-তামাশা করে।
‘আরে ভাইয়া! কখন এলেন ?’ ইনায়েত জিজ্ঞাসা করে।
‘আমরা এইমাত্র এসেছি। তুমি কেমন আছ ?’
‘আলহামদুলিল্লাহ’ আপনাদের দোয়ায় ভালো আছি।’
আমান জানতে চায়, ‘ইনায়েত ভাই, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে ?’
‘এই তো এখানেই, এটা-সেটা করছি। আপনি তো জানেনই। ঘুম থেকে উঠে তো আর বাসায় বসে থাকতে পারি না। সালমা, সালমা, তোর মা কোথায় রে ? দেখ কে এসেছে। তোর মাকে বাহিরে আসতে বল।’
বাসার ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসে না। ‘আশ্চর্য, ও কোথায় ?’ ইনায়েত জিজ্ঞেস করে। ‘বাচ্চাদের নিয়ে ভেতরেই আছে। দাঁড়ান, আমি ডাকছি।’ ভেতরে এসে সালমাকে দেখে। ফিস ফিস করে জিজ্ঞাসা করে, ‘এরা সবাই কখন এসেছে ? তোর আম্মা কোথায় ?’ মনের ভেতর নানা সন্দেহের বুদ্বুদ ওঠে।
‘মামারা এইমাত্র এসেছেন। আর আম্মা এখনও ঘুমাচ্ছে।’ চালাকি করে সালমা এ উত্তর দেয়। ইনায়েত স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।
‘এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি ? কী হয়েছে ?’ ও শোবার ঘরের দরজায় আসে। কম্বলে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় মেহেরুনকে দেখে জঘন্য লাগে। ওর একমাত্র দাবি, সন্তানগুলো তার। ও বাচ্চাদের নিতে চায় কিন্তু ওর পা দুটো এতটা ভার বইতে পারে না।
মেহেরুন ভাবে, ও এতক্ষণে নিশ্চয়ই দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর পোশাক, সিগারেটের চিমসা গন্ধ, ঘামের গন্ধ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে যাওয়া শরীর, আর বড় বড় দুটো চোখ। যে লোকের প্রতিটি স্নায়ুর সঙ্গে ওর জানাশোনা আছে সেই লোককে ওর আজকে অপরিচিত ঠেকছে। ওর গলা শুনে মেহেরুন আরও শক্ত করে কম্বল দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে নেয়।
‘সালমা এখানে আয়, তোর মাকে নাটক করতে মানা কর। ও যদি আমাকে না সহ্য করার জন্য ওর ভাইদের এখানে ডেকে আনে, তবে ও নিজের ফাঁস নিজের গলায় নিজেই পরবে। ওকে বল, ওদের এক ফুঁতে উড়িয়ে দেওয়া আমার কাছে কোনও ব্যাপার না। ওকে জিজ্ঞাসা কর, ওর তালাকের পর ও ওর ছোট বোনদের আর মেয়েদের বিয়ে হোক সেটা দেখতে চায় কি না। ওকে বল, ওর মেহমানদের সামনে পরিবারের মান-সম্মান ধূলিসাৎ করছে। তোর মাকে বল, ওর ভাইদের আপ্যায়ন করতে মুরগির মাংস লাগবে, না-কি খাসির মাংস লাগবে। প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। রান্না শুরু করতে বল।’
সালমা ওখানে ছিল না। কিন্তু সে সব কথা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। ভাবল, সালমা ওখানে আছে।
ইনায়েত ওর শালা-সম্বন্ধির সঙ্গে এমনভাবে গল্পগুজব করে চলল যেন কিছুই ঘটেনি। ওরা কফির দরদাম নিয়ে গালগল্প করল। কাশ্মীরের নির্বাচন নিয়েও। পাশের এলাকায় এক বয়স্ক দম্পতির হত্যাকান্ড নিয়েও। এক মুসলিম মেয়ে এক হিন্দু ছেলেকে আইনগতভাবে বিয়ে করেছে। এটিও ওদের গল্পের বিষয় হলো। এভাবে ওরা এটা-ওটা নিয়ে গল্প করতে লাগল। গল্প চলতে লাগল। ইতিমধ্যে প্রেসার কুকারের শিস শোনা গেল। ব্লেন্ডার মেশিন ঘরঘর করে শব্দ করতে লাগল। মসলার সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অবশেষে চিকেন রান্না হয়ে গেল। পরিবেশন করা হলো। মেহেরুন রান্না করেছে। সালমা দৌড়ঝাঁপ করে মাকে সাহায্য করেছে। এর মধ্যে মেহেরুন শুধু একবার অল্প সময়ের জন্য রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
ভালো রকমের খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই পান খায়। এরপর মেহেরুনের ভাইয়েরা বিদায় নেবার প্রস্তুতি নেয়। চলে যাবার পূর্বে আমান রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। ‘একটু স্মার্ট ভাবে ব্যাপারটা সামলে নিস। আগামী সপ্তাহে আসব। কয়েক দিন এমনটা সে করবে। তারপর নিজেই সুপথে ফিরে আসবে। তোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। যেসব স্বামী মদ খায় বা শাশুড়ি ছেলের বৌকে ধরে পেটায়, তাদের বৌয়ের এমন সমস্যা হয়। আল্লাহর শোকর আদায় করি যে, তোর এমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। ও একটু উদাসীন। এই আর কি। তোকেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে।’ ওর ভাইয়েরা চলে গেল। গাড়ির শব্দ শূন্যে মিলিয়ে যেতে না যেতেই ইনায়েতও হাওয়া হয়ে গেল। সালমা ওর মার কাছে গেল সাহায্য করতে। ওর মামারা সান্ত্বনাও দিল না, সাহায্যও করল না। ও ওর মার কষ্টটা অনুভব করতে লাগল। ওর বাবা বাসার বাইরে চলে যাওয়া মাত্রই ওর চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। বাড়িটা বিষণ্নতায় ভারী হয়ে উঠেছে। স্কুল থেকে ফিরে এসে ওর ভাই-বোন বিষয়টা বুঝতে পারে না। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ কষ্ট আছে; কাজের চাপ আছে।
বিকেল যখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এল তখন বাড়ির ভেতরে এখানে সেখানে আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু মেহেরুনের হৃদয়-প্রদীপ অনেক আগেই নিভে গেছে। ও আর কার জন্য বাঁচবে ? বেঁচে থেকে লাভ কী ? বাড়ির দেয়ালগুলো, ছাদ, থালা-বাটি, চুলা, বিছানা, জলপাত্র, সামনের আঙিনায় গোলাপ ফুলের চারা―কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। ওর চারপাশের যে ঝাপসা চোখগুলো ওর দিকে তাকিয়ে আছে সেগুলো সে লক্ষ্য করেনি। সালমা ওর বইয়ে মুখ গুঁজে রাখার চেষ্টা করল। ও সামনে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ওর মাকে ঘিরে বিরাট এক উদ্বিগ্নতা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। রাতের সুনসান নীরবতা ভেদ করে মেহেরুন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতটা তার জীবনের মতোই অন্ধকার। কালো। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু সালমা জেগে আছে। ড্রয়িংরুমে বসে পড়ছে। ওর চোখ দুটো ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহেরুনের ঘুম পালিয়ে গেছে। ভেবে ভেবে অবাক হয়, সংসারে ওর যুদ্ধটা সহজ ছিল না! ওর বিকম দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার এক মাস পূর্বে ইনায়েতের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়। আকুতি মিনতি করে বলেছিল যে, পরীক্ষাটা শেষ হোক। কিন্তু কেউ ওর কথায় কান দেয়নি। বিয়ের সপ্তাহখানেক বাদে সংশয়ে, সংকোচে ও স্বামীকে কথাটা বলে। এ কথা শুনে ওর স্বামী ওকে ‘আমার সোনা’, ‘আমার প্রিয়া’, ‘জানের জান’ ইত্যাদি বলে সম্বোধন করে বলে, ‘তুমি এখানে না থাকলে আমি মরে যাব।’ মেহেরুনও বিশ্বাস করেছিল, ও এখানে না থাকলে ওর স্বামী মরেই যাবে। ও খুশি হয়েছিল। ভেবেছিল, ও ওর স্বামীর হৃদয়-মন্দিরের প্রদীপ।
কেবল বছরখানেক আগে ওর শ্বশুর-শাশুড়ি মারার যাবার পর ও ওর স্বামীকে পুরোপুরিভাবে পেয়েছে। ওর ননদরা স্বামীদের বাড়ি চলে গেছে। ওর দেবররাও যে যার মতো করে চলে গেছে। পুরো সংসারটা নিজের করে পাওয়ার ওর পুরাতন স্বপ্ন এতদিনে পূরণ হয়েছে। কিন্তু এখন চিন্তায় ওর কপালে ভাঁজ পড়েছে। পায়ের গোড়ালি ফেটে গেছে। নখের ভেতর স্থায়ী ময়লা জমেছে। কিন্তু কোনও কিছুই আর ওর নজরে পড়ে না। ইনায়েতেরও নজরে সম্ভবত আর কিছুই পড়ে না। এপেন্ডিক্সের চিকিৎসার সময় প্রাইভেট হাসপাতালের কম বেতনের একজন নার্সের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়। মেয়েটার চোখে-মুখে হাজার স্বপ্ন। যেন বাতাসে ফুরফুর করে উড়ে বেড়ায়। শরীরের ত্বক ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়। চোখের রং মধুর মতো। জলের ঘূর্ণির মতো হেঁটে বেড়ায়। বয়স তিরিশের কোটায়। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে, আর স্বপ্নপূরণে ও সবকিছু করতে পারে।
ইনায়েত নার্সকে ‘সিস্টার’ বলে সম্বোধন করেনি। হাসপাতালের প্রথম দিন থেকে ও ওকে নাম ধরে সম্বোধন করত।
এরপর থেকে যে মহিলা তার অনেকগুলো সন্তানের জন্ম দিয়েছে, তাকে সে অপমান, লাঞ্ছিত করতে শুরু করে। পেটের চামড়া ঢিলা হয়ে গেছে বলে মেহেরুনকে টিটকারি করতে থাকে। ওর বাচ্চাদের ক্ষুধা মেটাতে মেটাতে ওর যে স্তন দুটো ঝুলে পড়েছে, সেগুলো নিয়েও সে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। ইনায়েত ওকে হীনম্মন্যতায় ভোগায়। একদিন বলে, তুমি আমার মার মতো। এ কথা বলে ওকে সে জ্যান্ত নরকে ঠেলে দেয়। এরপর থেকে কয়েক মাস যাবৎ ও প্রতিটি গ্রাস ভাত মুখে তোলে আর ভাবে ও পাপ করছে। নিজের বাড়িতে নিজেকেই অচেনা ঠেকে। ওকে যেন আগুনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ও ওর পরিবারের সাহায্য চায়।
রাত আরও নিকষ কালো হয়ে আসছে। মেহেরুনের বুকের ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আগে কখনও ওর এতটা একা লাগেনি। ওর আর কোনও আশা নেই; আকাক্সক্ষা নেই। ওর অবস্থা জানতে চাওয়ারও কেউ নেই। বিছানায় বসে থাকে। কেউ নেই ওকে আদর করে বুকে টেনে নেবার, চুম্বন করার। যে ব্যক্তি আদর করত সে এখন অন্য কারও। জীবন যেন আর চলতে চায় না। পেছনে বড়সড় শব্দ হলেও ও নড়ে না। ও জানে, একটা বড় ফটোগ্রাফ পড়ে কাচের ফ্রেম ভেঙে যায়। কাচের টুকরো এখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেদিকে ওর কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই। ওর ভেতরে এক ধরনের উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে পড়েছে। তাই কাচের টুকরোগুলো সাবধানে তুলে নিয়ে কোথাও ফেলার চিন্তা ওর এখন নেই। ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়ে। অনেকক্ষণ ধরে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো তখন ঘুমাচ্ছে।
ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখে সালমা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। টেবিলে মাথা রেখে। ঘুমন্ত মেয়েটার পাশে দাঁড়ায়। তারপর ওকে ধরে ঝাঁকুনি দেয়। ভেবেছিল, ওর অনুভূতি মরে গেছে। কিন্তু সালমার দিকে তাকাতেই ওর হৃদয়ের গভীরে মাতৃত্ব উছলে ওঠে। সালমার দিকে তাকিয়ে ওর সব অভিমান পানি হয়ে যায়। মেয়েটাকে আলিঙ্গন করার গভীর আবেগ সে নিয়ন্ত্রণ করে। ‘তুই অবশ্যই বাচ্চাদের মা হবি রে মা।’ মেহেরুন মনে মনে বলে ওঠে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। যে চারাগাছগুলোর ও যত্ন করে সেগুলোও যেন ওর দুঃখে কাঁদে। ও যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, চারাগুলো মাথা নুইয়ে যেন সেটির সঙ্গে সম্মতি জ্ঞাপন করে। ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। রান্নাঘরে ঢোকে। কেরোসিনের বোতলটা নিয়ে বাইরে যায়। ঠিক করতে পারে না। কোথায় গিয়ে কেরোসিন গায়ে ঢালবে। আরেকবার থামে ঘুমন্ত বাচ্চাদের দেখার জন্য। ড্রয়িংরুমে ফিরে আসে।
সালমার দিকে তাকায় না।
দ্রুত রান্নাঘরে যায়। দিয়াশলাইয়ের বাক্স নেয়। ডান হাতে দিয়াশলাইয়ের বাক্স শক্ত করে ধরে দরজা খুলে আঙিনায় নেমে পড়ে। নিকষ অন্ধকার। মেহেরুন চারপাশে তাকায়। কেউ আছে কি-না দেখে নেয়। কেউ ওকে চায় না। কেরোসিন ঢেলে দেয় সারা গায়ে। একটা শক্তি এসে ওর ওপর ভর করে। ওর এটির উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। চারপাশে তাকায়। কোনও শব্দ কানে পড়ে না। কোনও অনুভূতি নেই। কোনও স্মৃতি নেই। কোনও সম্পর্ক তাকে টানে না। ও এখন সজ্ঞানতা-সচেতনতার ঊর্ধ্বে।
কিন্তু বাসার ভেতরে ক্ষুধার্ত বাচ্চার কান্নার শব্দে সালমা জেগে ওঠে। ছুটে গিয়ে বাচ্চাকে কোলে নেয়। যে ঘরে ওর ভাই-বোন ঘুমাচ্ছিল সেখান থেকে বের হয়ে ‘আম্মি আম্মি’ বলে চিৎকার করে। এরপর সারা বাড়ি ওর মাকে খুঁজতে থাকে। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে অন্ধকার আঙিনায়। ওর মার সারা শরীরে কেরোসিনের গন্ধ পায়। কোনও কিছু না ভেবেই ওর মা’র কাছে ছুটে যায়। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ও ওর মাকে শক্ত করে ধরে। হাতে দিয়াশলাইয়ের বাক্স। মেয়ের দিকে তাকায়। নিরাবেগ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকায়। যেন ও অন্য কাউকে কামনা করছে। সালমা বাচ্চাটাকে মাটিতে রেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আম্মি, আম্মি, আমাদের ছেড়ে যেওনা।’ ওর মার পা চেপে ধরে।
সালমা কাঁদছে। ছোট্ট বাচ্চাটা মাটিতে পড়ে কাঁদছে। মেহেরুন ওদের দিকে তাকায়। ওর ওপর ভর করা অদ্ভুত অচেনা এক শক্তি থেকে মুক্তি পেতে মেহেরুন চেষ্টা করে। হাত থেকে দিয়াশলাইয়ের বাক্স পড়ে যায়। সালমা তখনও ওর মার পা দুটো ধরে থাকে। ‘আম্মি’, ও বলে, ‘শুধু একজনকে হারানোর জন্য তুমি কি আমাদের সবাইকে ঐ মহিলার করুণার কাছে ঠেলে দিতে চাও ? তুমি আব্বার কারণে মরতে চাও। কিন্তু তুমি কি আমাদের সবার জন্য বাঁচতে চাও না ? আম্মি, তুমি কীভাবে আমাদের এতিম করে রেখে যাবে ? আমরা তো তোমাকে চাই।’ সালমার কথার চাইতে ওর শরীরের স্পর্শ ওকে বেশি করে টানে।
মাটিতে পড়ে ক্রন্দনরত বাচ্চাটাকে টেনে কোলে নেয়। বুকে চেপে ধরে। যেন কোনও বন্ধুর শীতল, কোমল স্পর্শ ওকে আলিঙ্গন করে। মেহেরুনের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। রাতের আঁধার কেটে যাচ্ছে। যে কথাটা ওকে তাড়া করে, তা হলো―‘আমাকে মাফ করে দে, মা।’
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



