আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : সাহিত্যধারার পাঠ : সরল শ্রেণিকরণ ও সাহিত্যতত্ত্ব : মোহিত কামাল

সাহিত্যতত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশের গতিপথ খুঁজতে গেলে আমরা দেখব যুগে যুগে নানা ধারা-বৈশিষ্ট্য বা তত্ত্বের সৃজন ঘটেছে।

‘অধ্যয়নযোগ্য কোনও বিষয়ের ধারণাগত ভিত্তিই হলো তত্ত্ব।’ খানিকটা গভীরে খুঁজতে গেলে দেখব, ‘সাহিত্যতত্ত্ব হলো সাহিত্য হিসেবে আমরা যা পড়ি তার ধারণাগত দিক।’

আর ‘সাহিত্যতত্ত্বের ব্যবহারিক দিক হলো সাহিত্য সমালোচনা।’

গ্রিকযুগের প্লেটো কিংবা এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব, মাইমেসিস থিওরি, ইতালির হোরেস কিংবা লঙ্গিনাসের (Longinus)  সাবলাইম তত্ত্ব, পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে নিওক্লাসিসিজম, রোমান্টিসিজম, নিউ ক্রিটিসিজম, ফরমালিজম বা আঙ্গিকবাদ, কার্নিভাল থিওরি বা বাখতিনিজম, রিডারস রেসপন্স থিওরি, স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ, পোস্ট স্ট্রাকচারালিজম ও বিনির্মাণবাদ, মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব, মনোসমীক্ষণবাদী সাহিত্যতত্ত্ব, নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনা, সর্বোপরি আধুনিকতাবাদ ও উত্তর আধুনিকতাবাদ। অর্থাৎ দেখা যায় ভাবনাতত্ত্ব, যুক্তিবাদ, রিয়ালিজম, সুররিয়ালিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম, সেন্টিমেন্টালিজম কিংবা রোমান্টিক যুগের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে কোথাও সাহিত্যের সংজ্ঞা স্থায়ীভাবে আসন গ্রহণ করে থাকেনি। তবে একেকটা মতবাদ একেক দিকে আলো ছড়িয়েছে। সাহিত্যতত্ত্ববিদেরা এসব মতবাদ জানেন, আগ্রহী লেখকেরাও এসবের ভেতর থেকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে উন্নত করতে পারেন। সাধারণ পাঠকের কি এগুলো জানা উচিত, বা জানার প্রয়োজন আছে?

প্রয়োজন থাকুক কিংবা না থাকুক, উল্লিখিত মতবাদ থেকে অন্তত দুটি বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কারণে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমে তুলে ধরছি নিওক্ল্যাসিসিজম বিষয়ে―শব্দটির অর্থ হলো, ‘ক্ল্যাসিকসের ভিত্তিতে দাঁড় করানো সাহিত্যভাবনা।’ 

মূলত গ্রিক ও রোমান কথাকারদের সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছে নিওক্লাসিসিজম বা নব্যধ্রুপদীবাদ। ওই কালটাকে সাহিত্যবিষয়ক ফতোয়ার কালও বলা যেতে পারে। এ সময় কোনটা সাহিত্য বলে বিবেচিত হবে তা মূলত নির্ভর করত গ্রিক ও রোমান ক্ল্যাসিকস্ পণ্ডিতদের গ্রহণ ও বর্জনের ওপর। ওই সময়টি সাহিত্য-শাসনের যুগ হলেও ক্লাসিকসের অন্ধ অনুকরণ সাহিত্যে কল্পনার জায়গা ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে ফেলে নিওক্ল্যাসিকাল যুগে। ফলে বিপুল শক্তিধর তাত্ত্বিকদের এই চর্চার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার মধ্য দিয়ে জন্ম হলো ‘রোমান্টিসিজম’ নামের নতুন সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব। শব্দটির উদ্ভব হয়েছে প্রাচীন ইতালির রোম (Rome) শহরের লাতিন ভাষা থেকে। রোমের লাতিন থেকে উদ্ভব হয়েছে ইউরোপের অনেক ভাষা―যেমন পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ফরাসি, ইতালিয়ান ইত্যাদি। সব কটি ভাষাকে এক নামে রোমান্স (Romance) ভাষা বলা হয়। ‘রোমান্স’ শব্দটি ইতালির রাজধানী রোম বলয় থেকে বেরিয়ে একটি সাহিত্যধারার মুকুট পরে নেয়। এই ধারায় অবিশ্বাস্য বীরের গল্প থাকত, সতী নারীর প্রেমের বিষয় থাকত, জিন-পরি জগতের চরিত্ররাও হাজির হতো। আজগুবি, কল্পিত, যুক্তিহীন বানানো কাহিনি থাকত। সাহিত্যে এ সময়টা মধ্যযুগীয়, রেনেসাঁস-এর আগের। এসব আখ্যান পাঠককে আনন্দ দিত, আজগুবি আর কল্পনাজাত বলে কেউ এগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়নি, মিথ্যা বা যুক্তিহীনতার দায়ে অভিযুক্তও করেনি। কিন্তু নিওক্লাসিকাল যুগে যা কিছু কল্পনায় সৃজন করা হয়েছে, লালন করা হয়েছে তাকেই মূর্খতা উপাধি দিয়ে বর্জন শুরু হয়েছিল। অপরদিকে ক্ল্যাসিকাল যুগের যুক্তিবুদ্ধিচর্চাকে সাহিত্য ও সমাজ দুইয়ের জন্য আবশ্যিক করে তুলেছিল। প্লেটো-অ্যারিস্টটলের মাইমেসিস থিওরিকে খানিকটা চ্যালেঞ্জ করল। মাইমেসিস থিওরিতে অ্যারিস্টটল যেমন বলেছেন, ‘সাহিত্য হলো জীবন ও জগতের অনুকৃতি (imitation)’― তাঁদের এই ক্লাসিকাল এবং নিওক্লাসিকাল মতাদর্শকে আমূল পাল্টে দিয়ে রোমান্টিকরাই কল্পনায় সৃজনক্ষমতা অবলম্বন করে সর্বপ্রথম দেখিয়ে দিলেন যে, সাহিত্যের কাজ অনুকরণ নয়; সৃজনও।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন যে, কল্পনাশক্তি এবং সৃষ্টিশীল ক্ষমতা মানুষের মেধার উপাদান, অঙ্গ। মেধার অন্যান্য অনুষদের মধ্যে আছে মেমোরি, অর্থপূর্ণ উপলব্ধি এবং যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা, সমস্যার সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। একজন সৃজনশীল লেখক এসব অনুষদ ব্যবহার করে সৃজন করতে পারেন যাপিত সমাজে জীবনঘনিষ্ঠ আখ্যান, অমর সাহিত্যভাণ্ডার।

রবীন্দ্রনাথ কিংবা লঙ্গিনাসের যুগের কথা স্মরণ করে বলতে চাই, সাহিত্যে মানবমনের প্রতিধ্বনি ঘটে, হোক সেটা কল্পিত, হোক বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে নির্মিত, হোক ঐতিহাসিক ঘটনা বা জীবনভিত্তিক কিংবা ভৌতিক-হরর।

কল্পনাশক্তি প্রসঙ্গে রোমান্টিসিজমের যুগের তাত্ত্বিক কোলরিজ তাঁর বায়োগ্রাফিয়া লিটারেরিয়া গ্রন্থে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, কল্পনার উদ্ভব-প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপে রয়েছে ‘স্মৃতি’। বর্তমান অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেমিশে একরকম নতুন নকশা তৈরি করে স্মৃতির ভাণ্ডারে রক্ষিত তথ্য-উপাত্ত। কোলরিজ এই স্তরের নাম দিয়েছেন ‘ফ্যান্সি’ বা কল্পনা। তিনি আরও বলেছেন, এই কল্পনা পৃথিবীর সব মানুষেরই আছে।

তাহলে কবির কল্পনা কী?

তাঁর মতে, ‘কবির কল্পনা হলো কল্পনার দ্বিতীয় স্তর, বিকশিত স্তর। এ স্তরে মনে জমে থাকা অন্য সকল বস্তু ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান অভিজ্ঞতাকে জারিত করে, দ্রবীভূত করে লীন করে দেয় এবং এসবের মাধ্যমে সৃষ্টি করে নতুন এক রূপ যা স্মৃতির বস্তু নয়, কিংবা বর্তমান অভিজ্ঞতাও নয়।’

এটাই কি কল্পনাশক্তি? সাহিত্যজগতে প্রচলিত ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের সঙ্গে মিলছে কি?

পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের সহযোগিতা ছাড়াই মস্তিষ্কে বা মনে আচমকা যে আইডিয়া বা ভাবনাতরঙ্গের উদয় ঘটে সেটাই কল্পনা, সৃজনশীল কল্পনাশক্তি―এমনটাই প্রচলিত আছে বর্তমান সাহিত্যজগতে। ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে মিলুক কিংবা না মিলুক আমরা লক্ষ্য করেছি ইংরেজ রোমান্টিকেরা অনুকরণের পরিবর্তে সৃজনে নামলেন। ‘যাপিত জীবনের দুঃখ-জরা, যন্ত্রণা, ক্লান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রত্যেকে একটি আদর্শজগৎ নির্মাণের চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন অপরিমেয় কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে।’ তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কিটস, শেলি, কোলরিজ প্রমুখ দুনিয়ার শীর্ষ রোমান্টিক কবিগণ। তাঁরাও ‘আমিময়’ হয়ে যাবার দোষে কটাক্ষের শিকার হলেন। তাঁদের মধ্যে বাস্তবতা থেকে পলায়নপর মনোবৃত্তির উদয় ঘটেছে―এমন সমালোচনার মধ্য দিয়ে জন্ম হলো নিউ ক্রিটিসিজম।

এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা ভালো, ইংরেজিতে ক্রিয়েটিভ শব্দটি বেশ প্রচলিত। ক্রিয়েট থেকে এসেছে ক্রিয়েটিভ। ক্রিয়েট ক্রিয়াপদটার মানে হচ্ছে সৃষ্টি করা, মৌলিক কিছু সৃষ্টি করা, মৌলিক সত্যের উন্মোচন করা, মৌলিক পথ নির্মাণ করে সামনের জটিল পথ সহজ করা। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে আরও কয়েকটি শব্দের যোগসূত্র রয়েছে। শব্দগুলো হচ্ছে প্রতিভা, মেধা, বুদ্ধি। প্রতিভাবানেরাই সাধারণত হয়ে থাকেন মেধাবী, বুদ্ধিদীপ্ত। প্রতিভার মূল উপাদান হচ্ছে স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, অর্থপূর্ণ উপলব্ধি ও ধারণা বিশ্লেষণের নৈপুণ্য, যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা। প্রতিভার এসব উপাদানও সাহিত্য সৃজনে প্রভাব রাখে―প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো কোন সাহিত্য মতবাদে এসব বিষয় আলোচিত হয়েছে, বিশ্লেষিত হয়েছে? ধাপে ধাপে আমরা তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

এসব বিতর্ক এবং উপরে উল্লিখিত মতবাদগুলোর সংজ্ঞা এবং বিস্তৃত ব্যাখ্যা এড়িয়ে ছোট পরিসরে এই আলোচনায় আমরা রবীন্দ্রনাথের কথার দিকে মনোযোগ দিতে পারি। তাঁর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কথার একটির সারমর্ম হলো, ‘জীবনের সহিত যা সম্পর্কিত তা-ই সাহিত্য!’ এখানে ‘সহিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কেবল জীবনচিত্র কিংবা জীবনকাহিনিই কি সাহিত্য? উপন্যাসে অবশ্যই জীবনচিত্র থাকবে আর জীবনের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মন আর বিজ্ঞান, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্ম। তাহলে দেখা যাচ্ছে জীবনের সঙ্গে জড়িত মন-বিজ্ঞান, দৃশ্যমান সমাজ এবং না-দেখার বাইরেও আছে আরও কিছু। সেই আরও কিছুটা কী? সৃজনশীলতা, সৃষ্টিশীল কল্পনা কিংবা ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন নয়? রোমান্টিক যুগের কবিদের মত হলো কবিতার প্রকৃত স্রষ্টা কবিকল্পনা―এটি ফ্যান্টাসি নয়, কল্পনাশক্তি। তাঁদের মতে কবিকল্পনা আসলে সৃজনশীল প্রক্রিয়া বা সৃজনশীল কল্পনা আর রবীন্দ্রনাথ কল্পনাকে আরও বিশাল শক্তিধর মনোক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। রোমান্টিক যুগের মতাদর্শের কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষের রয়েছে কল্পনাশক্তি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে শক্তির দ্বারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিলন কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের মিলন না হয়ে মনের হয়ে ওঠে সেই শক্তি হচ্ছে কল্পনাশক্তি।’ অর্থাৎ স্মৃতি, অভিজ্ঞতা নির্ভরতা কিংবা কেবল অলৌকিক কবিকল্পনা ইত্যাদি বিতর্কের যে কোনও আঙ্গিক বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই কল্পনা হচ্ছে মনেরই শক্তি, মনেরই অঙ্গ, উপাদান। মনেরই বিপুল শক্তির উদ্গিরণ।

এখানেও আলোচিত গ্রিক সাহিত্যতত্ত্ববিদদের মাইমেসিস থিওরি কিংবা জীবনজগতের অনুকরণবাদ এই তথ্যের আলোকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। আমরা দেখছি উপন্যাসের পাতায় পাতায় উঠে আসে যাপিত জীবনের কাহিনি। সেই সঙ্গে আনন্দ-বেদনা- ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, রাগ-ক্রোধ, ঈর্ষা-হিংসা কিংবা প্রতিহিংসার মতো আবেগ।

মানবমনের অন্তর্জগৎ ও চারপাশের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যপূর্ণ যোগাযোগ, যোগসূত্র। এর ভেতরেই প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে মনোবৈজ্ঞানিক উপাদান এবং সাহিত্যে প্রকাশিত মানবমনের প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই মনোবৈজ্ঞানিক সূত্রের অন্তর্ভুক্ত। এখানে বলে রাখা ভালো, আলোচনায় তুলে ধরা এবং আলোচনার বাইরের সব সাহিত্য মতবাদের ভেতরই মনস্তাত্ত্বিক সূত্র কিংবা তত্ত্বের প্রতিধ্বনি রয়েছে― নিউরোসায়েন্স, বিহেভিয়ারাল, কগনিটিভ বা স্ট্রিম অব কনশাসনেস, সাইকোডায়নামিক কিংবা হিউনিস্টিক মতবাদ―প্রতিটি মনস্তাত্ত্বিক থিওরিই সাহিত্য মতবাদের প্রাণের ভেতরের প্রাণ হিসেবে উৎসারিত হয় যা বিশ্লেষণ করেছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ, লঙ্গিনাস এবং অ্যারিস্টটলও।  

সাহিত্যতত্ত্বের নানামুখী আলোচনা- সমালোচনার রেশ টেনে ধরে একই সঙ্গে আমরা নজর দিতে পারি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত একটি উক্তির দিকে―‘সাহিত্যের কোনও শর্ত নেই।’

বর্তমান সময়ে সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন পণ্ডিত হলেন জ্যাঁক দেরিদা। তিনি ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক। গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন ব্যক্তিত্ব জ্যাক লাকাঁ। তিনি ছিলেন মনোচিকিৎসক আর স্ট্রাকচারালিজমের জনক ক্লদ লেভি স্ট্রস ছিলেন নৃবিজ্ঞানের পণ্ডিত। সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে তাঁরা অবশ্যপাঠ্য নাম। তিনজনই সাহিত্যে দর্শন, মনোবিজ্ঞান ও স্ট্রাকচারালিজমের কথা তুলে ধরেছেন।

তাহলে সাহিত্যতত্ত্বের উৎপত্তিস্থল কোথায়?    

সমাজ-জীবন-মন, এক কথায় মনোসামাজিক মূল্যবোধ, সোশ্যাল কগনিশন, কাঠামোবদ্ধ সামাজিক দর্শন নয়? এমন হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায় না?

এ কারণেই লঙ্গিনাসের (Longinus) মূল কথাকে সামান্য বদলে বলা যায়, সাহিত্য রচনার উৎকর্ষ হচ্ছে মানবমনের প্রতিধ্বনি, শৈল্পিক স্বর। কথাটা মনস্তাত্ত্বিকভাবেও যৌক্তিক―উপন্যাসে ব্যবহৃত আবেগ, চিন্তা, প্রত্যক্ষণ, মোটিভেশন, সামাজিক অভিজ্ঞান বা সোশ্যাল লার্নিংয়ের কারণে বদলে যেতে পারে প্রত্যক্ষণ প্রক্রিয়া, বদলে যেতে পারে চারপাশ প্রত্যক্ষ করার ধরন, চিন্তনে ঢুকে যেতে পারে ত্রুটি, নানামুখী আবেগের প্রকাশ কিংবা বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে চরিত্র থেকে চরিত্রের মনোজগতে। এভাবে উপন্যাসের মধ্যে ঘনীভূত হতে পারে মনস্তাত্ত্বিক উপাদান, জটিল জীবন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আলাদা ভাষিক ইঙ্গিতময় সংকেত, সাহিত্যশিল্প আর তা ঘটে থাকে লেখকের মেধার গুণে, কেবল অনুকরণে নয়। এখানে উল্লেখ করা আবারও প্রাসঙ্গিক যে মেধা মনেরই অঙ্গ।

এই সাহিত্যশিল্প ‘কনশাস স্ট্রিম অব থটস’, মনস্তাত্ত্বিক মতবাদ কগনিটিভ থিওরি ও ফ্রয়েডের সাইকোডাইনামিক থিওরিকেও প্রতিধ্বনিত করে, চেতন-অবচেতন কিংবা নির্জ্ঞান মন বিশ্লেষণ করে। সমাজ- সংস্কৃতিকেও। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটও সাহিত্যের মনোজাগতিক অনুষদ হিসেবে সমকালীন বিশ্বসাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

দুই

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বেশ বুঝতে পারছি সাহিত্যে যুগে যুগে নানা তত্ত্ব বা ধারা কিংবা বৈশিষ্ট্য এসেছে। নির্মম সমালোচনার পরও কোনও ধারা উচ্ছেদ হয়ে যায়নি। যুগের ধারায় কোনও নির্মাণশৈলীকে হেয় বা তুচ্ছ করা হয়নি, তবে প্রত্যেকের যুগেই নতুন ধারা সৃজনকারীদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। অথচ আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে নদীর মতো প্রবহমান আছে সাহিত্য। উপন্যাস মূলত সময়ের মনস্তত্ত্ব। সমাজ যেমন বদলায় উপন্যাসও তেমনি রূপান্তরিত হয়। তাই সমকালীন সাহিত্যের পণ্ডিতগণ সাহিত্য-আসরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা শেষ কথা হিসেবে  ঘোষণা করতে পারেন না যে বর্তমানে সাহিত্যে শুধু তিনটি ধারা রয়েছে: সিরিয়াস, জনপ্রিয় ও বিকল্প ধারা। এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত ব্যক্তিগত মত বা সরলীকৃত শ্রেণিবিভাগ হতে পারে, তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ‘ধারা’ নয়। 

‘সাহিত্যে শুধু তিনটি ধারা রয়েছে’―এই কথাকে ‘টানেল ভিশন’ বা সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়। ব্যক্তির মতকে উড়িয়েও দেওয়া যায় না, আবার চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করাও যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যতত্ত্ব অনুযায়ী সাহিত্যধারার বিভাজন আরও বহুস্তর ও বিবর্তনশীল― যেমন ঘরানা, রীতি, স্টাইল, যুগ, মতাদর্শ, রোমান্টিক, আধুনিক, উত্তর-আধুনিক বা উত্তর- ঔপনিবেশিক বা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি পাঠকের রিসেপশনের ওপরও নির্ভর করে।

আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায়, ‘সিরিয়াস বনাম জনপ্রিয়’―এই সরল শ্রেণিকরণ  অবশ্যই সমীচীন নয়―এটা আসলে reception-based বিভাজন।  কিন্তু সাহিত্যে ‘বিকল্প ধারা’র বিষয়টা গ্রহণযোগ্য। গতানুগতিক সৃজন থেকে সরে গিয়ে যুগে যুগে লেখকগণ বিকল্পধারা তৈরির চেষ্টা করেছেন। এই উদ্যোগকে সমালোচকগণ মাঝে মাঝে বলে থাকেন experimental or avant-garde।

কিন্তু ‘সাহিত্যের শুধু তিনটি ধারা রয়েছে’―এমন তত্ত্ব কোনও স্বীকৃত সাহিত্য সমালোচনায় প্রতিষ্ঠিত নয়।

তিন

সাহিত্যতত্ত্বে ‘ধারা’ কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়?

ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে সহজ বিভাজনের মাধ্যমে ধারা প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, যেমনটা উপরে তুলে ধরা হয়েছে। এই বক্তব্যকে অসম্মানিত করছি না, যুক্তির খাতিরে শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আরও আছে তাত্ত্বিক বা স্বীকৃত বিভাজন; রীতি বা সাহিত্যশৈলী (Form, Style); যুগ বা আন্দোলন যেমন Romanticism, Modernism; মতাদর্শিক ধারা যেমন Marxist, Feminist, সাইকোডাইনামিক কিংবা মনস্তত্ত্ব; ন্যারেটিভ স্ট্র্যাটেজি। পোস্টমডার্ন বা উত্তরাধুনিক বিষয়গুলোও সাহিত্যের ধারা নির্ণয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘সাহিত্যের ধারা শুধু লেখকের গুরুত্ব বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ধারিত হয় ভাষা, বর্ণনাশৈলী, তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, এমনকি  পাঠকের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েও। আগেই বলা হয়েছে সাহিত্য অনেক বেশি প্রবাহমান। তাত্ত্বিকভাবে সাহিত্যধারা অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। একে তিন ভাগে সীমাবদ্ধ করলে ঐতিহাসিক কাল থেকে চলমান সাহিত্যতত্ত্বের সামগ্রিকতা ধরা পড়ে না।

সাহিত্যধারার school of thought বোঝাতে হলে রোমান্টিক, রিয়ালিস্টিক, এক্সিস্টেনশিয়াল, সুররিয়ালিস্টিক, ম্যাজিক রিয়ালিজম, পোস্টমডার্ন… এসব বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। এই যুগে এসব ছাড়া সাহিত্য ভাবা যায় না।

আবারও বলছি, ‘সাহিত্যে কেবল তিনটি ধারাই রয়েছে’, বক্তব্যটা এককভাবে ব্যক্তিগত শ্রেণিকরণ (categorization) মাত্র, সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ নয়। আলোচনায় এটা কোনও বক্তার ব্যক্তিগত মত হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, শেষ কথা বা চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়।

চার

জমজমাট সাহিত্য-আসরে দেশের দুজন খ্যাতিমান লেখকের সাহিত্যকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে শ্রেণিবিভাগ করেছেন এ সময়ের একজন সাহিত্যিক। সেই মতামতকে অশ্রদ্ধা না করে বলছি, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনকে কেবল ‘জনপ্রিয় ধারার লেখক’ হিসেবে সরলীকরণ করলে সাহিত্যতাত্ত্বিকভাবে তা অসম্পূর্ণ। সাহিত্যিকের গুরুত্ব কেবল পাঠকসংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। হুমায়ূন আহমেদ যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি বাংলা উপন্যাসে মনস্তত্ত্ব, স্বতন্ত্র গদ্যশৈলী এবং আধুনিক চরিত্র নির্মাণে তিনি দারুণ অবদান রেখেছেন। তাঁকে কেবল জনপ্রিয়তা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সাহিত্য-প্রতিভা ও ধারা সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। ‘জনপ্রিয়’ আর ‘গুরুত্বপূর্ণ’―দুটি শব্দ একে অপরের বিপরীত নয়। বরং অনেক সময় জনপ্রিয় লেখকরাই সাহিত্যে নবতর প্রবণতা তৈরি করেন। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাই বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন এক পাঠক-সমাজ গড়ে দেয়, যা নিজেই একটি সাহিত্যিক ধারা। তাই তাঁকে ‘জনপ্রিয়’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক না―বরং বলা যেতে পারে তিনি ‘জনপ্রিয়তা অর্জনকারী গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক’। একই কথা ইমদাদুল হক মিলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সাহিত্যতত্ত্বে ‘popular’ শব্দটি অনেক সময় sociological category হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সাহিত্যিকের তাত্ত্বিক অবস্থান নির্ধারণে প্রয়োগ করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে টলস্টয়, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, এমনকি ও. হেনরিও বহু সময় জনপ্রিয় ছিলেন―কিন্তু তাঁরা মূলত canonical with high literature -এর অংশীদার।

 ‘জনপ্রিয়’ হওয়া আর শুধু ‘জনপ্রিয় সাহিত্যিক’ হওয়াও এক নয়। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ‘পাঠক-নির্মাতা’ লেখক। তাঁর মতো করে বাংলা ভাষা সহজ করে কেউ লেখেননি। তাঁকে শুধু জনপ্রিয় বললে সাহিত্যই আপত্তি করবে।

‘Literature is not great because it is popular; it becomes popular because something in it is great.’ যুক্তরাজ্যের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ও সাহিত্যসমালোচক ঞবৎৎু ঊধমষবঃড়হ-এর সাহিত্য ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ, এই আলোচনায় তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক।

পাঁচ

বাংলাদেশের সাহিত্য কি তিনটি ধারায় বিভক্ত ?

এই বিতর্কিত প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো―‘না’।

  ‘কেন?’

কারণ এই বিভক্তি মোটা দাগের পাঠকভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, সাহিত্যতাত্ত্বিক নয়। সাহিত্যতত্ত্ব কখনওই সাহিত্যের ধারাকে কেবল ক্ল্যাসিক-পপুলার-বিকল্প ―এই তিন ভাগে সীমাবদ্ধ করে না। এ কথার যৌক্তিকতা আমরা কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে ভিন্নভাবেও খুঁজে দেখতে পারি।

গ্রিসের প্লেটো-এরিস্টটল, রোমের হোরেস-লঙ্গিনাস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টোডরভ, বাখতিন, জুলিয়া ক্রিস্তেবা ও নর্থ্রপ ফ্রাই স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, সাহিত্যের শ্রেণিবিন্যাস সর্বদাই বহুস্তরীয় ও বহু-মাত্রিক।

সাহিত্যের বহুস্তরীয় ও বহুমাত্রিক শ্রেণিবিন্যাস

এই বিভাজন সাধারণত হয় রূপভিত্তিক, প্রকরণ, নান্দনিকতা ও বয়ানভিত্তিক, পাঠক প্রতিক্রিয়া কিংবা বাজারভিত্তিক। কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো :

১. রূপভিত্তিক (Formal): ট্র্যাজেডি, কমেডি, এপিক, ড্রামা, ন্যারেটিভ ফিকশন ও লিরিক।

ট্র্যাজেডি

ট্র্যাজেডি সাহিত্যধারায় মানবজীবনের সংঘাত, সংকট, ভুল, নিয়তি বা নৈতিক দুর্বলতা একসময় ভয়াবহ পতন বা বেদনাদায়ক পরিণতিতে পৌঁছে দেয়। এই ধারায় নায়ক সাধারণত শক্তিশালী বা সম্ভ্রান্ত হলেও নিজের চরিত্রদোষ (hamartia), ভাগ্য বা সামাজিক শক্তির চাপে ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকে। পাঠক বা দর্শক তার সংগ্রাম ও পতনের মধ্য দিয়ে গভীর করুণা ও ভয় অনুভব করে, আর শেষ পর্যন্ত মানবজীবনের ভঙ্গুরতা ও মহত্ত্বের এক মর্মন্তুদ সত্য উপলব্ধি হয়।

কমেডি

কমেডি সাহিত্যে মানবজীবনের দুর্বলতা, ভুল বোঝাবুঝি, সামাজিক অসঙ্গতি ও দৈনন্দিন কৌতুককে হাস্যরসের আলোয় দেখানো হয়। এখানে চরিত্ররা নানা বিপাকে পড়লেও পরিস্থিতি কখনওই অমোচনীয় সংকটে রূপ নেয় না; বরং নাটকীয়তার ঘূর্ণিতে হাস্য, বুদ্ধি, বক্রোক্তি ও হালকা ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে সমস্যা গলে যায়। কমেডির লক্ষ্য পাঠক বা দর্শকের বিনোদন, স্বস্তি ও মানবিক দুর্বলতার প্রতি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা―শেষে সবকিছুই সাধারণত মিলনের, সমাধানের বা আনন্দের দিকে গড়ায়।

এপিক

এপিক হলো বীরত্ব, জাতির উত্থান-পতন, দেবতা-মানবের লড়াই বা বৃহৎ ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত এক বিস্তৃত, মহাকাব্যিক সাহিত্যরূপ। এতে সময়ের ব্যাপ্তি দীর্ঘ, চরিত্রের পরিধি বিশাল, আর ঘটনাবলির পরিসর প্রায়ই পৌরাণিক বা ইতিহাস-সংলগ্ন। এপিক শুধু গল্প নয়―এটি একটি সভ্যতার স্মৃতি, বীরত্বের আদর্শ, নৈতিকতার প্রকৃতি ও মানবজীবনের মহত্ত্বকে বৃহৎ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার শিল্প। বীরের ব্যক্তিগত যাত্রা এখানে গোটা জাতির অভিজ্ঞতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

ড্রামা

ড্রামা হলো এমন সাহিত্যধারা যা মূলত মঞ্চায়নের জন্য রচিত। অর্থাৎ চরিত্রদের কথোপকথন, দ্বন্দ্ব, আচরণ ও পরিস্থিতির সরাসরি অভিনয়ের মাধ্যমে কাহিনি প্রকাশ পায়। এতে মানবজীবনের টানাপোড়েন, নৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সম্পর্ক, আবেগের সংঘর্ষ একদম ‘এখন-এখানে’ দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়। বর্ণনা বা বিবরণ অপেক্ষা কর্ম, সংলাপ ও দৃশ্যায়নই এখানে প্রধান শক্তি। ড্রামা কখনও ট্র্যাজিক, কখনও কমিক, কখনও মিশ্র হতে পারে―কিন্তু সব সময়ই মানবজীবনের নাটকীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে।

ন্যারেটিভ ফিকশন (Narrative Fiction)

এটা হলো গল্পনির্ভর সৃজনশীল সাহিত্য। এক্ষেত্রে চরিত্র, প্লট, সময়, স্থান, ঘটনাপ্রবাহ―এসব মিলিয়ে একটা ‘কাহিনি’ বলা হয়।

উপন্যাস, নভেলা, ছোটগল্প―এসব ন্যারেটিভ ফিকশনের ভেতর পড়ে।

লিরিক

এই খুৎরপ ক্যাটাগরিতে ব্যক্তিগত অনুভূতি, আবেগ, মনের সুরের সংক্ষিপ্ত, গীতিময় প্রকাশ ঘটে।

কাহিনির চেয়ে অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘অনুভূতি’।

কবিতা, গীতিকবিতা লিরিকধর্মী ধারার উদাহরণ।

আর ট্র্যাজেডি, কমেডি ও ড্রামা আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি জগতে বেশ পরিচিত ধারা।

২. প্রকরণ (Genre-based): যেমন সামাজিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রহস্য, গোয়েন্দা, ঐতিহাসিক, জীবনভিত্তিক উপন্যাস, আধুনিকতাবাদী, উত্তর-আধুনিক, মেটাফিকশন ইত্যাদি।

সামাজিক উপন্যাস

সামাজিক উপন্যাসে  সমাজের গঠন, প্রথা, শ্রেণিবিন্যাস, সম্পর্ক, বৈষম্য, সংঘাত ও পরিবর্তনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। এখানে ব্যক্তির গল্প আসলে সমাজের গল্প―একটি পরিবার, পাড়া, শহর বা সময়ের ভেতর দিয়ে সমাজের নৈতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। ব্যক্তিগত বেদনা, প্রেম, সংগ্রাম বা বিপর্যয় বৃহত্তর সামাজিক সত্যকে উন্মোচন করে, ফলে চরিত্রগুলো সমাজের আয়নায় মানবজীবনের অবস্থান বুঝতে শেখায়।

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস

সাহিত্যে মূলত প্রতিধ্বনিত হয় মানবমন। অর্থাৎ প্রতিটি উপন্যাসের মধ্যেই মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত কিংবা অপ্রকাশিত থাকে। তবু মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসকে আলাদা ক্যাটাগরি হিসেবে বলা যায়। এ ধারা মানুষের মনের গোপন স্তর, অবচেতন প্রবণতা, স্মৃতি, ভয়, আকাক্সক্ষা, দ্বিধা ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাহিনির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে বাহ্যিক ঘটনা অপেক্ষা চরিত্রের ভেতরের ঝড়, চিন্তার প্রবাহ ও মানসিক পরিবর্তনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রের অভ্যন্তরীণ কথোপকথন, স্বগতোক্তি, স্বপ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে লেখক মনের গভীর গহ্বর উন্মোচন করেন। ফলে গল্পটি একপ্রকার আত্ম-অন্বেষণের যাত্রা। মানুষ নিজের ভেতরে কী দেখে, কী লুকায়, কীভাবে ভাঙে এবং আবার কীভাবে পুনর্গঠিত হয়।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনি (Science Fiction)

এই ধারায় বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত আবিষ্কার, মহাকাশ, টাইম-ট্রাভেল, ভবিষ্যৎ সভ্যতা বা অজানা জগৎকে কল্পনার ভিত্তিতে নির্মাণ করা হয়। এটি বাস্তব বিজ্ঞানের যুক্তিকে ধরে নিয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বা বিকল্প বাস্তবতার এক পরীক্ষাগার তৈরি করে, যেখানে মানবজাতির নৈতিকতা, ভয়, অগ্রগতি, বিপদ বা স্বপ্ন নতুন আলোয় দেখা যায়। গল্পের উদ্দেশ্য শুধু রোমাঞ্চ নয়―মানুষ প্রযুক্তির সঙ্গে কোথায় যাচ্ছে, সভ্যতার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে―তার দার্শনিক প্রশ্নও উসকে দেওয়া।

গোয়েন্দা (Detective Fiction)

গোয়েন্দা উপন্যাস রহস্য, অপরাধ, তদন্ত, যুক্তি ও সত্য অনুসন্ধানের উপর নির্মিত। সাধারণত একটি খুন, চুরি, রহস্যজনক ঘটনা বা গোপন ষড়যন্ত্র গল্পের অক্ষরেখা তৈরি করে, আর গোয়েন্দা চরিত্র― পেশাদার বা অপেশাদার―পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, অনুমান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করে। পাঠকও ধাপে ধাপে ক্লু-র খোঁজে যুক্ত হয়। ফলে গল্পটি হয়ে ওঠে এক বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা। শেষ মুহূর্তে রহস্য ভেদ হওয়ার সাথে সাথে মানবচরিত্রের অন্ধকার কোণও আলোকিত হয়ে ওঠে।

ঐতিহাসিক উপন্যাস

ঐতিহাসিক উপন্যাস অতীতের বাস্তব ঘটনার পটভূমিতে রচিত, যেখানে ইতিহাসের সত্যতা ও কল্পনার শিল্পসম্মত ব্যবহার মিলেমিশে নতুন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এতে নির্দিষ্ট সময়ের রাজনীতি, সমাজ, যুদ্ধ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়; আবার চরিত্রের অভ্যন্তরীণ যাত্রা সেই সময়ের মানবিক সত্যকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কল্পনার সূক্ষ্ম বুনন পাঠককে অতীতের অন্দরমহলে নিয়ে যায়। সময় ক্ষয় হলেও  মানবিক আবেগ অমোচনীয় থাকে।

জীবনভিত্তিক উপন্যাস (Life-based)

জীবনভিত্তিক উপন্যাস কোনো ব্যক্তি- মানুষের বেড়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, শিক্ষাগ্রহণ, ভুল ও আত্ম-নির্মাণের ধারাবাহিক যাত্রাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। এখানে একটি চরিত্রের শৈশব, কৈশোর, যৌবন বা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম ও আত্ম-উপলব্ধি গল্পের প্রাণ। পৃথিবীকে জানতে জানতেই সে নিজেকে চেনে এবং তার এই যাত্রা পাঠকের জন্য হয়ে ওঠে মানবজীবনের সর্বজনীন রূপক। এমন উপন্যাস জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে বড় সত্যে রূপান্তর করে, যেখানে ব্যক্তি হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিনিধি।

মডার্নিজম (Modernism)

এখানে Modernism -এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো আধুনিকতাবাদ। পূর্ব-নির্দিষ্ট রীতি ভেঙে নতুন ফর্ম খোঁজা এ ধারার প্রধানতম লক্ষ্য। মানবমনের ভাঙাচোরা অভিজ্ঞতা, বিভ্রান্তি, নতুন নতুন ফর্মের নিরীক্ষা, টুকরো টুকরো বয়ান, অন্তর্জগতের গুরুত্ব আধুনিকতাবাদকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। এর সময়কালকে ধরা হয় মূলত ১৯০০-১৯৫০ সাল।

পোস্টমডার্নিজম (Postmodernism)

সাহিত্যধারার বিচারে উত্তর- আধুনিকতাবাদকে Postmodernism -ই বোঝানো হয়ে থাকে। এর বৈশিষ্ট্য হলো : সত্যের এককতা নেই, বহুস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে উত্তর-আধুনিকতাবাদে। বাস্তব- কল্পনার সীমানা ভেঙে বড় বড় মতাদর্শ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে মেটাফিকশন, প্যারোডি সৃজন করার সময়কাল শুরু হয় প্রায় ১৯৬০-এর পর। অন্যান্য প্রচলিত ধারাগুলো আমাদের সবারই জানা আছে।

মেটা ফিকশন

মেটাফিকশন হলো এমন এক ধরনের সাহিত্যকৌশল যেখানে গল্প নিজেই নিজের দিকে তাকায়―অর্থাৎ লেখার প্রক্রিয়া, কাহিনির ভেতরের কাহিনি, লেখক-পাঠকের সম্পর্ক, গল্পের কৃত্রিমতা বা নির্মাণশৈলীকে গল্পের ভেতরেই আলোচনায় আনা হয়। এতে চরিত্র হঠাৎ জানতে পারে সে একটি গল্পের চরিত্র, লেখক সরাসরি পাঠকের সঙ্গে কথা বলে, বা গল্পের ভেতর গল্প লেখার দৃশ্য দেখা যায়। ফলে পাঠক শুধু গল্প পড়ে না―গল্প কীভাবে তৈরি হয়, সেই সচেতনতাও অনুভব করে। এটা এক ধরনের আত্মসচেতন বা ংবষভ-ৎবভষবীরাব ফিকশন।

৩. নান্দনিকতা বা মীমাংসাভিত্তিক সাহিত্যবিভাজনের মধ্যে আছে ক্ল্যাসিসিজম, রোমান্টিসিজম, রিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, মডার্নিজম, পোস্টমডার্নিজম।

নিচে এসব সাহিত্যবিভাজনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার বৈশিষ্ট্য অল্পকথায় তুলে ধরা হলো।

ক্ল্যাসিসিজম (Classicism)

ক্ল্যাসিসিজম হলো শৃঙ্খলা, পরিমিতি, ভারসাম্য, বুদ্ধিবৃত্তি ও শৈল্পিক সংযমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নান্দনিক ধারা। প্রাচীন গ্রিক-রোমান শিল্পরীতির অনুকরণে এটি মানবজীবনকে যুক্তির আলোয় দেখতে চায়―আবেগকে অতি উচ্ছ্বাসে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত সৌন্দর্যে ধরে রাখতে মনোযোগী। এখানে ফর্ম বা গঠন, চরিত্রের নৈতিক দৃঢ়তা, কাহিনির সামঞ্জস্য ও শিল্পের শুদ্ধতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ক্ল্যাসিসিজম চায় সাহিত্য হয়ে উঠুক সুশৃঙ্খল, পরিশীলিত, বোধনির্ভর এবং মানবমনের আদর্শ রূপের প্রতিনিধিত্ব।

রোমান্টিসিজম (Romanticism)

রোমান্টিসিজম হলো ব্যক্তির আবেগ, কল্পনা, অন্তর্দৃষ্টি, প্রকৃতি, স্বাধীনতা ও ব্যতিক্রমী অনুভূতির উন্মুক্ত উৎসব। এখানে যুক্তি নয়―হৃদয়ই প্রধান পথপ্রদর্শক; প্রকৃতি হয়ে ওঠে আত্মার প্রতিচ্ছবি, আর ‘আমি’-এর অভ্যন্তরীণ সুরই সৃজনের মূল ছন্দ। রোমান্টিকরা বিশ্বাস করেন, শিল্পের শক্তি মানুষের গভীরতম অনুভূতিকে মুক্ত করে, সমাজ ও নিয়মের সীমাবদ্ধতা ভেঙে ব্যক্তিত্বকে প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। এই ধারায় সৃজন এক রকম আত্ম-উন্মোচন― যেখানে আনন্দ ব্যথা, স্বপ্ন, প্রেম ও রহস্য মিলেমিশে কবিত্বময় সত্য তৈরি করে।

রিয়ালিজম (Realism)

রিয়ালিজম মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজের বাস্তব অবস্থা, স্বাভাবিক আচরণ, ভাষা ও অভিজ্ঞতাকে অলংকারহীন, নির্ভেজাল রূপে উপস্থাপন করতে চায়। এতে অতিরঞ্জন, রোমান্টিক উচ্ছ্বাস বা কৃত্রিম নাটকীয়তা নেই; আছে সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের সত্য। চরিত্ররা মাটির মানুষ, তাদের সমস্যা বাস্তব, তাদের সুখ-দুঃখ আমাদের চারপাশেরই প্রতিচ্ছবি। রিয়ালিজমের উদ্দেশ্য― জীবনকে তার প্রকৃত রূপে দেখানো, যেন সাহিত্য হয়ে ওঠে সমাজ-মানসের একটি স্বচ্ছ আয়না।

ন্যাচারালিজম (Naturalism)

ন্যাচারালিজম হলো রিয়ালিজমের আরও কঠোর ও বৈজ্ঞানিক রূপ। এখানে মানবজীবনকে জীববিজ্ঞান, বংশগতি, পরিবেশ, দারিদ্র্য, সমাজ ও নিয়তির নির্মম প্রভাবের ফল হিসেবে দেখানো হয়। ভাষ্য হচ্ছে মানুষ স্বাধীন নায়ক নয়―বরং পরিবেশ ও পরিস্থিতির দ্বারা চালিত এক সীমাবদ্ধ সত্তা। লেখকের দৃষ্টি প্রায় গবেষকের মতো: জীবনকে নিরপেক্ষ, কখনও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পর্যবেক্ষণ করা। ন্যাচারালিজম তাই রোমান্টিক অলংকার নয়, বরং সমাজ-জীবনের গভীরতম অন্ধকার কোণ, সংগ্রাম ও অবশ্যম্ভাবী নিয়তির মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠককে।

আর মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজম ‘প্রকরণ’ বিভাগে তুলে ধরা হয়েছে।

৪. বয়ানভিত্তিক (Narratology) : মনোলজিক/ডায়ালজিক, পলিফনিক, হেটারোগ্লসিক, ক্রনিকল-স্টাইল, স্ট্রিম-অফ-কনশাসনেস।

মনোলজিক/ডায়ালজিক

(Monologic / Dialogic)।

মনোলজিক বয়ানে লেখক বা বর্ণনাকারীর কণ্ঠই গল্পের প্রধান শক্তি―অন্য কণ্ঠ, মত বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে গুরুত্বহীন বা অনুপস্থিত। ফলে কাহিনি এক ধরনের একক সত্য বা নির্দিষ্ট মূল্যবোধের দিকে পাঠককে চালিত করে। বিপরীতে ডায়ালজিক বয়ান বহুকণ্ঠী। এখানে চরিত্রদের মত, ভাষা, সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতা একে অন্যের সঙ্গে সক্রিয় সংলাপে জড়ায়। সত্য একক নয়―বিভিন্ন কণ্ঠের সংঘর্ষ, প্রতিধ্বনি ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই গল্পের অর্থ উদ্ভাসিত হয়।

পলিফনিক (Polyphonic)

পলিফনিক বয়ান বহুকণ্ঠের স্বাধীন সমবেত সঙ্গীত; প্রতিটি চরিত্রের কণ্ঠ, ভাষা ও চিন্তা পরস্পরের সমান শিল্পগত মর্যাদা পায় এবং লেখকের কণ্ঠ তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে না। বাখতিনের ধারণা অনুযায়ী, এটি এমন গল্পরীতি যেখানে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ, বিশ্বাস, স্মৃতি, দৃষ্টিকোণ ও মানসিকতা পাশাপাশি, কখনও সংঘাতে জড়ায়। পাঠক তাই কোনও একক সত্যে বাঁধা থাকে না; বরং নানা স্বরের মধ্যে দিয়ে জটিল বাস্তবতার বহুস্তর উপলব্ধি করে।

হেটারোগ্লসিক (Heteroglossic)

হেটারোগ্লসিক বয়ান একই টেক্সটের ভেতরে বহু ভাষা, উচ্চারণ, সামাজিক-শ্রেণিগত রেজিস্টার ও সাংস্কৃতিক স্বরকে একসঙ্গে বহন করে। এতে যেমন সাধারণ কথ্যভাষা থাকে, তেমনি থাকে শিক্ষিত ভাষা, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ভাষার সুর―যা মিলেমিশে একটি সংস্কৃতি বা সমাজের বৈচিত্র্যময় বাস্তবতা তৈরি করে। এই রীতিতে গল্প কেবল চরিত্র নয়, তাদের পরিবেশ, ইতিহাস ও শ্রেণিগত অবস্থানও ভাষাগত বুননে প্রকাশ পায়। ফলে টেক্সট হয়ে ওঠে বহুভাষিক, বহুরূপী ও সামাজিকভাবে গভীর।

ক্রনিকল-স্টাইল (Chronicle-style)

ক্রনিকল-স্টাইল বয়ান সময়ক্রম অনুসারে ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরে―যেমন দিনলিপি, ইতিহাসলেখা বা নথিভিত্তিক বিবরণে দেখা যায়। এখানে বর্ণনাকারী সাধারণত কোনও ঘটনা ‘যা ঘটেছে ঠিক তার মতো’ নথিভুক্ত করার ছাপ তৈরি করেন; ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা বা আবেগ কম থাকে, আর ঘটনার ধারাবাহিকতা মূল শক্তি। এ রীতি কাহিনিকে বাস্তবসম্মত, নিরপেক্ষ ও ডকুমেন্টারি-ধর্মী অনুভূতি দেয়, যেন পাঠক সময়ের প্রবাহে হাঁটতে হাঁটতে গল্পের বিকাশ প্রত্যক্ষ করে।

স্ট্রিম অব কনশাসনেস (Stream of Consciousness)

এই বর্ণনাশৈলীতে চরিত্রের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, স্বপ্ন, বিভ্রান্তি, মনোযোগের বিচ্যুতি―সবকিছু অবিরাম, প্রায় অগোছালো প্রবাহে প্রকাশ পায়। বিনা বিরতিতে মনের ভেতরের কথোপকথন চলতে থাকে, যেন পাঠক চরিত্রের চেতনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত―সময়, যুক্তি বা কাঠামো এখানে গৌণ। এতে মনের গভীরতম স্রোতগুলো দৃশ্যমান হয়, আর গল্প হয়ে ওঠে বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে বেশি অন্তর্লোকের অনন্ত যাত্রা।

৫. Canonical/Conventional/Serious.

ক্যাননিক্যাল বা সিরিয়াস সাহিত্য নান্দনিক গভীরতা, ভাষার পরিশীলন, বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে ‘মূলধারা’ বা সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উত্তীর্ণ হতে পারলে সেটা হয়ে যায় কালজয়ী। এসব রচনা সময়ের জনপ্রিয়তা, গুণগ্রাহীদের একপেশে অতিশয়োক্তিমূলক মূল্যায়নে গৃহীত হয় না, আবার বিরাগভাজন পণ্ডিতদের বর্জনেও বিলীন হয়ে যায় না, বরং সামগ্রিক মূল্যায়নে ধারণা, শৈলী ও মানব-অভিজ্ঞতার গভীর বিশ্লেষণের জন্যই সময়ের পরিক্রমায় স্বীকৃতি পায়। এ ধরনের ক্যাননিকাল সাহিত্য সাধারণত একাডেমিক আলোচনায় জায়গা করে নেয় এবং বহু প্রজন্ম ধরে পাঠ ও ব্যাখ্যার সূত্রবিন্দু হয়ে থাকে।

৬. পাঠক-প্রতিক্রিয়া/বাজারভিত্তিক ধারা।

সাহিত্যতত্ত্বকে উপেক্ষা করে শুধু বাজারনির্ভর পাঠকের ধারণা দিয়ে শ্রেণিবিন্যাস করলে তিন ভাগে আনা যায়। এই শ্রেণিবিন্যাস সাহিত্যসমাজতত্ত্বের একটা সাব-ক্যাটাগরি, চূড়ান্ত বা পরিপূর্ণ সাহিত্যতাত্ত্বিক বিন্যাস নয়। অতএব এটি আংশিক। সাহিত্যের মূল বা চূড়ান্ত শ্রেণিবিন্যাস হিসেবে একে দাবি করা একপেশে। এ ধারায় আছে Popular, Alternative/ Non-conventional।

শ্রেণিবিন্যাসটিই তিন ভাগে বিভক্ত―

Popular Literature

পপুলার সাহিত্যে  সাধারণ পাঠকের আবেগ, রোমাঞ্চ, বিনোদন, রহস্য, সম্পর্ক বা জীবনের সহজবোধ্য অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে দ্রুত পাঠযোগ্য ও মনোগ্রাহী গল্প তৈরি করে। এতে ভাষা সহজ, প্লট গতিশীল, চরিত্র পরিচিত, আর গল্পের উদ্দেশ্য পাঠককে টেনে রাখা। বাণিজ্যিক সাফল্য, পাঠকের প্রশস্ত আগ্রহ ও বাজারচাহিদার ওপর এটি দাঁড়িয়ে থাকে। তবে জনপ্রিয় সাহিত্য মানেই অগভীর―এমন নয়; পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছানোর ক্ষমতা ও সহজগ্রাহ্যতা তার প্রধান সাফল্য।

Alternative/Non-conventional Literature

অলটারনেটিভ বা নন-কনভেনশনাল সাহিত্য প্রচলিত রীতি, বাজারচাহিদা বা মূলধারার নান্দনিকতার বাইরে নতুন ভাষা, নতুন ফর্ম ও নতুন অভিজ্ঞতা অনুসন্ধান করে। এতে কাঠামোভঙ্গ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আখ্যানের অপ্রচলিত কৌশল, প্রান্তিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বা উপনিবেশ-পরবর্তী চেতনা এবং সাবকালচারভিত্তিক প্রকাশ দেখা যায়। এ ধারার লক্ষ্য জনপ্রিয়তা নয়―বরং সাহিত্যের সীমা বাড়ানো, নিরাভরণ সত্য প্রকাশ করা ও পাঠককে ভাবনার নতুন অঞ্চল খুলে দেওয়া। ফলে এটি একই সঙ্গে প্রতিরোধ, সৃজন এবং নিরীক্ষামূলক সাহসের জায়গা।

সবশেষে বলতে চাই বাংলাদেশের সাহিত্য বাস্তবে আরও অনেক ধারায় বিস্তৃত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নান্দনিক/শৈলিভিত্তিক ধারা : যেমন আধুনিকতাবাদী, উত্তর-আধুনিক, মেটাফিকশনাল নির্মাণধারা আর বিষয়ভিত্তিক ধারায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, শহর-অর্থনীতি, অভিবাসী বিষয়ক, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন।

ভাষারীতি বিবেচনায় আছে: কথ্যভাষার উপন্যাস, আঞ্চলিক-ভাষাভিত্তিক রচনা, পরীক্ষামূলক গঠন।

তাই শুধু তিনটি ধারার মধ্যে ফেলে এসব উপধারা ও প্রকরণকে উপেক্ষা করা যায় না―সামগ্রিক সাহিত্যশৈলীকে ‘অজগরের মতো গিলে’ ফেলাও ঠিক হবে না।

বরং বলা যায়―‘সিরিয়াস-পপুলার- বিকল্প’―এই তিনটি সরল সমীকরণ মূলত ন্যূনতম বিভাজন মাত্র।

এই তিন ধারার মৌলিক সীমাবদ্ধতা হলো সাহিত্যিক শৈলী নির্ধারণে এগুলো যথেষ্ট নয়।

একজন লেখকের জনপ্রিয়তা তাঁর রচনার formal innovation, stylistic contribution ev narrative architecture -কে বাতিল করে না।

বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সংকুচিত করে দুই শতাধিক বছরের উপন্যাস-ইতিহাসকে তিনটি বর্গে নামিয়ে আনা যৌক্তিক নয়―সবার মত এবং বিশ্লেষণকে সম্মান করে বলছি, এটাই আমার নিজস্ব মত।

বাংলা সাহিত্যের গবেষণায় এসব বিষয় স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে― কোন লেখক কোন ঘরানায় লিখছেন, কার সাহিত্যিক শিল্পমান কেমন―এসবই এমফিল, পিএইচডিসহ নানা গবেষণার ক্ষেত্র। সোজাসাপ্টা উক্ত তিন ভাগের বিভাজন সাহিত্যের একটি আংশিক চিত্র মাত্র।

আমাদের মনে রাখতে হবে―সাহিত্য সর্বদাই বহুধারা-বহুমাত্রার, নদীর মতো বহমান।

ছয়

প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে মুহূর্তিক বিনোদনের নানা উপকরণ এখন হাতের মুঠোয়। ফলে সাহিত্য পাঠের প্রতি মনোযোগী হতে পারছি না আমরা অনেকেই। সাহিত্যের পাঠকও কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সাহিত্যশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সাহিত্যিকদের সচেতন হতে হবে, পাঠক তৈরির দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। কেবল ‘মহান সাহিত্য’ সৃষ্টির নামে আত্মতৃপ্তিতে ভুগে সাহিত্যের জমিনে অহংকারী হয়ে উঠলে দায়ভার শেষ হয়ে যায় না।

আসুন নতুন নতুন পাঠক সৃষ্টি এবং বইমুখী প্রজন্ম গড়ে তুলতে আন্দোলন গড়ে তুলি। দুই/তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও কল্পনার রথে চড়ে তাদের মনোজগৎ ছুঁয়ে সাহিত্য নির্মাণ করি, কিংবা ৬ থেকে ১২ বছরের শিশুদের জন্য নির্মাণ করি কল্পনা এবং বুদ্ধির মিশেলে ভিন্নতর  সাহিত্যধারা। তাদের কৌতূহলী মন জাগিয়ে তুলি।

কৈশোরের মনোজগতের গতিপ্রকৃতি বুঝেও যদি সাহিত্য রচনা করা যায়, রচিত যে হচ্ছে না, তা নয়। হচ্ছে, তা পাঠ করলে ভার্চুয়াল নেশামুক্ত থাকতে সৃজনশীল পথ পেয়ে যাবে তারা। নেশায় ডুবে যাওয়ার পথে বাধা হিসেবে কাজ করবে পাঠপ্রিয়তা। এসব শিশুসাহিত্য বড়রা পড়েও মজা পেয়ে থাকেন। বয়সভিত্তিক লিখলেও তা সামগ্রিক বয়সকেও প্রভাবিত করে, আলোড়িত করে। আসলে আমাদের সবার মধ্যেই বাস করে মৌলিক এক শিশু, যে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে এবং দৃশ্যমান জগতে সফল হয়, নিজস্ব মেধার উজ্জ্বলতা থেকে আলো পেয়ে নায়ক হয়ে বেঁচে থাকে।

কৃতজ্ঞতা : সহায়ক গ্রন্থসমূহ

১.            মুহম্মদ মুহসিন, সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা; ঐতিহ্য, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৩

২.           বদিউর রহমান, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব: সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হোরেস, লঙ্গিনাস; ঐতিহ্য, ডিসেম্বর ২০২৩

৩.           হীরেন চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যতত্ত্ব: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য; দে’জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ : আগস্ট ২০১৬

৪.           Paul Harrison, Philip Cowen, Tom Burns, Mina Fazel, Shorter Oxford Textbook of Psychiatry; Oxford university press 17 edition 2018

৫.           Andrew B. Crieder et al, Psychology; Herper 1993 Collins college publishers

৬.           Denis Green Berger & Padesky CA; Mind Over Mood; the Guilford, inc. New York 1995

লেখক : কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমি ফেলো

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button